আশা

আজকের দিন টা শুরু ই হল একটা ব্যক্তিগত গোমড়া মেজাজ নিয়ে, কলেজের ইম্পর্টান্ট সেমিনার ছিল, তাড়াহুড়ো করে সব সেরে, ছাতা নিয়ে গিয়ে রিক্সায় উঠলাম, মিনিট কয়েকের মধ্যেই শুরু হল যে বৃষ্টি তা যদি এখন অব্দি চলত তাহলে মনে হয় নোয়ার মহাপ্লাবনকেও ছাড়িয়ে যেত । যাই হোক সেই বৃষ্টির ভয়ানক আগ্রাসী আদ্রতায় আমার জামা-প্যান্ট ভিজে ন্যাতা হয়ে তো গেলই এক্সট্রা হিসাবে আমার প্লাস্টিকে মোড়া মোবাইলটা কে ও ভিজিয়ে দিল ।

গরীব মানুষ, তায় কিপ্টে বলে বাজারে আমার বেদম বদনাম আছে, অতি কষ্টে মাস খানেক আগে নোকিয়ার এই ৫০১ আশার ছলনে ভুলি কিনেছিলাম পুরো সা—ড়ে—- চা ——র হাজার কড়কড়ে টাকা দিয়ে, আমাকে গোটা বেচে দিলেও বোধ হয় অত টাকা পাওয়া যাবেনা । সেই সাধের মোবাইলটি গেল মিইয়ে ।

কলেজে পৌঁছে পকেট থেকে বার করে দেখি, বাবুর এল সি ডি, হিস্টিরিয়া রুগির মত কম্পমান, দেখে তো আমার ব্রেণও পুরো জেনারেল থেকে ভাইব্রেশণ মোডে। সঙ্গে সঙ্গে অফ করলাম, ব্যাককভার খুলে ফেলতেই দেখলাম ঝরণার মত জল বেরিয়ে এল ভিতর থেকে । যাই হোক, ভাল করে ঝেড়ে মুছে, খানিক্ষণ শুকোতে দিলাম, বেশকিছুক্ষণ পর সেটাকে ব্যাটারি লাগিয়ে অন করতেই বাবু একবার ব্লিঙ্ক করে চিরনিদ্রার আভাস দিয়ে নিদ্রিত হয়ে পড়লেন, শত চেষ্টা করেও তাকে আর জাগানো গেল না ।

কি জানি কেন আমার মনে হচ্ছিল যে ভিতরে হয়ত আরও জল জমে আছে বলেই বোর্ড শর্ট হয়ে গিয়ে মোবাইল টা অন হচ্ছেনা । বাড়ি এসে মোবাইল টা খুললাম, নোকিয়ার এই মডেলে কোনো ওয়ারেন্টি ব্রেক স্টিকার থাকেনা কোনো স্ক্রুর মাথায়, আমার কম্পিউটার রিপেয়ারিং এর স্ক্রুড্রাইভারের সেট টা বের করলাম, গুগুলে খুঁজে পেয়ে গেলাম এটা —- https://www.youtube.com/watch?v=g24s3wvCnSA । ব্যাস, শুরু হয়ে গেল আমার হাতের কাজ।

1610752_10202392529803718_470761194961084494_n

পুরো বোর্ডটা খুলে ফেললাম, যা অনুমান করা গেছিল, ভিতরে আরও প্রচুর জল জমে ছিল, প্রথমে কাপড় দিয়ে মুছলাম, তার পর সন্তুষ্ট না পেরে নিয়ে এলাম ভ্যাকিউম ক্লীনারটা । এটা অনেক দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ঘরবাড়ি পরিস্কার করার জন্য, কিন্তু মা ও কাজের মাসির খাঁটি স্বদেশী ঝ্যাঁটার ওপর অগাধ বিশ্বাস থাকায় ওটা পড়ে থেকে থেকে শেষে আমার নানা গবেষণামূলক কাজের অপরিহার্য্য অঙ্গ হয়ে ওঠে, ওটা এক্ষেত্রে ব্যবহার হল হট এয়ার ব্লোয়ার হিসাবে, ওটার গরম হাওয়া দিয়ে পুরো বোর্ড টা শুকনো করলাম আমি । তার পর খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে আশাকে জাগানোর চেষ্টা করলাম ।

জাগল না সে ।

এই সময় কম্পিউটারের মিডিয়া প্লেয়ারে সুমনের “হাল ছেড়োনা বন্ধু …” বাজিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেলুম । এবার মনে হল যে জল তো শুকিয়েছে, কিন্তু নিশ্চয়ই বাষ্প হওয়ার আগে আমাকে বাষ্পাকুল করার জন্য দ্রবীভূত বিভিন্ন লবণের দানা গুলো রেখে গেছে । সেগুলো কেলাসরূপে কন্ডাকটারের আভ্যন্তরীন রোধ বাড়িয়ে দেওয়াতেই মোবাইলটা সচল হচ্ছে না ।

কিন্তু কোথায় ঘটেছে সেটা বুঝব কী করে ? পি.সি.বি. তে সদ্য পড়া অক্সাইড বা সালফেট দেখতে কেমন হয় সেটা দেখিনি তো এর আগে ! আর মাইক্রোস্কোপিক অ্যানালিসিস করার যন্ত্র ও তো নেই আমার কাছে , কী করি ??? !!!

ফোন টা ওয়ারেন্টি তে ছিল, কিন্তু সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলেই যদি ধরে ফেলে লিকুইড ড্যামেজ !!! তাহলেই তো ওয়ারেন্টির কেল্লাম ফতেম !!!

তারপর ভাবলুম, আচ্ছা লিকুইড ড্যামেজ বলে ওয়ারেন্টি ক্যান্সেল করতে হলে তো আগে ধরতে হবে ড্যামেজটা কোথায় … আর সেটা ধরলেও আমার অল্প হলেও লাভ আছে ।

চলে গেলুম ব্যারাকপুরের নোকিয়া কেয়ারে । কাউন্টারে বসা সুন্দরীর কিউট হাসি দেখে ফোন খারাপ তো দূরের কথা, আমার যে একটা ফোন আছে, সেটাই ভুলে গেলাম (এটাও নোকিয়ার বিজনেস স্ট্রাটেজী নাকি !!!) … তার পর ফোনে কী সমস্যা সেটা দেখার অছিলায় সুন্দরী যখন হাতে হাত রাখল তখন তো নোকিয়ার সোকেশে সাজানো রঙ্গিন ব্যাক কভার গুলোকে একেকটা রঙ্গীন উড়ন্ত প্রজাপতি বলে বোধ হতে লাগল । ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া ( হৃদয় দেওয়া নেওয়ার আধুনিক ফার্স্ট স্টেপ ) ও হয়ত হয়ে যেত কিন্তু ওই যে একটা বিখ্যাত কথা আছে না কার যেন, “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

যাই হোক, ফোনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল স্পেশালিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে, রোগনির্ণয়ের জন্য । কিছুক্ষণ পর সুন্দরী তার সেটিং করে সাদা করা দাঁত কান অব্দি চওড়া করে বের করে আমাকে ডেকে বলল যে সে নাকি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছে যে আমার ফোনটিতে লিকুইড ড্যামেজ পাওয়া গেছে এবং সেটা নাকি এ——-ত গ—-ভী——র যে ওয়ারেন্টি তো ক্যান্সেল হবেই উপরন্তু আমি যদি টাকা দিয়ে অদের সারাতে বলি তাহলে ও নাকি ওদের ইঞ্জিনিয়ার রা রিস্ক নিয়ে কাজ করবে এবং আদৌ ঠিক করা যাবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই । আমি খুব শান্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম যে কত খরচা পড়তে পারে, সে বলল সেটা নাকি বলা যাচ্ছেনা । কারণ গ—ভী—র ড্যামেজ তো !!!

আমি এবার একটু সোজা হয়ে বসে অপেক্ষাকৃত কড়া গলায় বললাম, যে আমি কীকরে বুঝব যে আপনারা সত্যি বলছেন ? সত্যি ই লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে ? সে স্মার্ট হওয়ার উৎসাহে সঙ্গে সঙ্গে আমার ফোনের কোথায় কোথায় লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে সেই ছবি জুম করে করে কম্পিউটারে আমাকে দেখিয়ে দিল, আমিও বিমর্ষ মুখ নিয়ে সেগুলো দেখলাম । মেয়েটি সোৎসাহে আমাকে বুঝিয়ে চলল যে ড্যামেজের গভীরতা কতটা । ছবির সবুজ সবুজ অংশ গুলো নাকি লিকুইড ( বটে !!! … আমি তো জানতাম ওটাকে পি.সি.বি. বলে ) । তার বোঝানোর মাজে তাকে থামিয়ে দিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোনটা ফেরত চাইলাম । এবার বিমর্ষ হওয়ার পালা তার । ওই যে বলে — “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

বাড়ি এসে ফোন টা খুলে ছবি তে দেখে নেওয়া জায়গা গুলো তে ম্যাগনিফাইন্ড গ্লাস, এল ই ডী টর্চ আর একটা শক্ত ব্রাশ (রঙ করার) নিয়ে আলতো আলতো করে ঘসে সাদা সাদা কেলাসিত লবণ গুলোকে উঠিয়ে ফেললাম । গুঁড়ো গুলোকে আবার ক্লীনারের সাহায্যে পরিস্কার করলাম । সমস্ত পরিস্কারের পর স্ক্রু এঁটে, ব্যাটারী লাগিয়ে, আশার বোতামে চাপ ।

তার পর ?

ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাস ঠিকঠাক থাকলে আশা কি না জেগে পারে ?

একটা সত্যিকারের থ্রীলার

পূজো এসে গেল প্রায়, আর সেই সঙ্গেই একে একে লেয়ারে লেয়ারে সাজানো-গোছানো, রঙ্গীন বিজ্ঞাপন আর সূতোঝোলানো বুকমার্কের সঙ্গী হয়ে হাজির হল নিত্যনতুন থ্রীলার । যার নায়কের অসাধ্য কিছুই নেই, যাদের প্রবল পরাক্রম গরুকে গাছ তো তুচ্ছ জেট প্লেনে করে পৃথিবীর উন্নততম বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণীর প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহান্তরেও পাঠিয়ে দিতে পারে । যদিও যুগ বদলেছে, অতীতের জয়ন্ত-মাণিক, প্রখর রুদ্রের এক্সপিরিয়েন্স ঝালিয়ে তারা হয়েছে পরিমার্জিত, তার ওপর নেট ঘেঁটে সন্দেহপ্রুফ বিজ্ঞানের রঙ্ লাগিয়ে নিয়েছে এক্সট্রা প্রিকশান ।
যাই হোক এদের সম্বন্ধে কিছুই বলার নেই, কারণ প্রথমতঃ এইসব কাহিনীর স্রষ্টারা আমার শ্রদ্ধেয় গুরুজন এবং দ্বিতীয়তঃ শহরটা কলকাতা আর “সাজানো ঘটনা” একটি রাজনৈতিক টার্ম , যা আমার মত “রাজ” বা “দূর” কোনোরকম নীতিতেই অপারদর্শী লোকেদের কাছে “মার্জার”বাদীত্বের স্বীকৃতি হয়ে উঠতে পারে ।
দেখেছেন ? শিবের গীত করতে গিয়ে ধান ভেনে ফেলছি, তাও আবার যার তার পশ্চাদ্দেশে । আসল কথায় আসি । আজ রসেবশের রসগ্রাহীদের একটা ঘটনা শোনাব । মনে রাখবেন, গল্প না, ঘটনা ।
আমাদের সবার জীবনেই কিছু স্বপ্ন থাকে, গোল নয়, ড্রীমস । যেটাকে টেনে হিঁচড়ে পাওয়ার জেদ বা সুযোগ সাধারণতঃ মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের প্রথম বয়সে থাকেনা । তাই স্বাভাবিক ভাবে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । আমাদের ঘটনাটা একটা ছেলেকে নিয়ে যার স্বপ্নটা অপ্রত্যাশিত ভাবে কিছুটা সত্যি হয়ে গেছিল ।
ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই পাগলাটে, বইপড়ায় খুব ঝোঁক, আবার ডানপিটেমোতেও সবার চেয়ে ওস্তাদ । ক্লাস থ্রী ফোর থেকেই অন্যান্য বিষয়ের থেকে ইতিহাস তাকে বেশী টানত । আদীম মানুষের ক্রমবিবর্তন, ইজিপ্টের পিরামিড, সিন্ধুসভ্যতার মূর্তিটা সব ছিল তার নখদর্পণে । প্রায়দিনই একলা দুপুরে তার খাটটা হয়ে উঠত রাখালদাসের নৌকো, আলনাটা ভেঙ্গেপড়া জিগগুরাটের দেওয়াল আর সে নিজে ন্যাশানাল জিয়োগ্রাফিতে দেখানো তুলি-বুরুশ হাতে আর্কিওলোজিস্ট ।
যেদিন তাকে প্রথম কলকাতার যাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হল, সেদিন তার চোখে সব পাওয়ার ঝিকমিকি, যা তার পরের কয়েকদিন তাকে যেন অন্যকোনও জগতে বিচরণ করাত । আস্তে আস্তে রাখালদাসের নৌকার পাশের দেওয়ালের তাক গুলোর সবচেয়ে নীচেরটায় জমতে লাগল, রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মূর্তি ভাঙ্গা, চিঠির খামের সঙ্গে আসা ডাকটিকিট আর একটু অন্যরকম দেখতে লাগা কয়েনের দল ।
সময় গড়াচ্ছিল নিজের হিসেবে, ছেলেটার বয়স বাড়ছিল, সাথে সাথে বাড়ছিল পাগলামীটা আঁকড়ে রাখার সাহস । এখন তার ক্লাস ফাইভ আর আজকাল সে সবসময়েই চারপাশে ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে বেড়ায় । যার ফল স্বরূপ তার ছোট্ট সংগ্রহশালা আজ স্থানাভাবে তাক থেকে একটা পুরোনো প্যাকিং বাক্সে স্থানান্তরিত হয়েছে ।
ছেলেটা বছরে দুবার মামারবাড়ী যায়, কালী-পূজো আর পরীক্ষার পরের ছুটিতে, যখন হঠাত করে আসা কালবৈশাখীর উদ্দাম নৃত্যের মাঝে আম কুড়োনো কিশোর মনে জাগায় যুগান্ত প্রাচীন জোগাড়ে মানুষের আদিম আনন্দ । এরকমই এক কালবৈশাখীর দুপুরে আমকুড়োনোর নেশায় মেতে ছেলেটা আম পড়ার শব্দ ধাওয়া করে ঢুকে পড়ে মজা নদীটার পাশের প্রায় দুর্ভেদ্য জঙ্গলটায় । কিছুটা এগোতেই সে যেন তার এতদিনের চরম আকাঙ্খিত মুহুর্তের সম্মুখীন হয় ।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বহু প্রাচীন, জঙ্গলাবৃত একটা ভগ্ন প্রাসাদ । ভয়ডর এমনিতেই ছিলনা ছেলেটার, তায় পাকা মৎসশিকারি যেমন ভুমিকম্প হলেও বিরক্ত হয়ে বলে, “আঃ জলটা নাড়িয়ে দিলে, মাছ পালাবে” তেমনি প্রবল আকর্ষণে আগুপিছু না ভেবে সাপ, বিছের তোয়াক্কা না করে ছেলেটা ঢুকে পড়ল ঐ পোড়ো বাড়িতে, আর অনেক খোঁজাখুঁজির পর কয়েকটা খুব পুরোনো ভাঙ্গা বাসন, একটা কৌটো, দুটো ছোট ছোট তামার পয়সা আর একটা স্বাধীনতার আগের খবরের কাগজের উইয়ে খাওয়া টুকরো নিয়ে বিজয়ীর গর্বে বাড়ি ফেরে, অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখে তার প্যাকিং বাক্সে কারণ তার বাবা মা বাড়ির জঞ্জাল পরিস্কারের ক্ষেত্রে খুবই সজাগ ।
এরপর ছেলেটা তার এই “যুগান্তকারী” আবিস্কার সবাইকে জানানোর ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে উঠল, কিন্তু বাড়িতে তো বলা যাবেনা, অগত্যা স্কুলের বন্ধুরা হল তার প্রথম শ্রোতা কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে এই অসামান্য আবিস্কারকাহিনি শুনে বন্ধুরা তাকে এক নতুন খেতাবে ভূষিত করল, “ঢপবাজ” !!!
হাল ছাড়ল না ছেলেটা, বই পড়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বড় বড় সংগঠনগুলিকে চিঠি লিখতে শুরু করল সে । প্রত্যাশিত ভাবেই কোনো উত্তর এলনা কোনো জায়গা থেকেই । কিন্তু নেশা ধরে গেল ছেলেটার, যেকোনো জায়গায় বেড়াতে গেলেই সে আশেপাশে ভাঙ্গা বাড়ির খোঁজ করত, আর প্রায়ই বিভিন্ন পচা কাগজ, টুকরো টাকরা জিনিসপত্র জমতে লাগল তার প্যাকিং বাক্সে । ক্লাস সিক্সের পরীক্ষার পর ছেলেটা মাসির বাড়ি বেড়াতে গেল । প্রত্যন্ত গ্রাম । যাওয়ার আগের দিন বহুদিন ধরে জমানো স্কুল যাওয়ার রিক্সা ভাড়ার টাকা দিয়ে সে একটা স্পীডপোস্ট করল এশিয়াটিক সোসাইটির নামে, মরীয়া হয়ে চিঠির সঙ্গে আঠা দিয়ে জুড়ে দিল তার খুঁজে পাওয়া দু-একটা পচা কাগজ ।
মাসির বাড়িতে এসে ছেলেটা শুনল, তারা খুব ভুল সময়ে এসে পড়েছে, চারদিকে প্রচুর ডাকাতি হচ্ছে । ঠিক হল দুদিন থেকেই আবার বাড়ি ফিরে যাওয়া হবে । যাই হোক ছেলেটা তার কাজ চালিয়ে যেতে লাগল । পৌঁছোনোর পরেরদিন সকালেই সে খোঁজ পেল একটু দূরে বাঁধের ধারে ষষ্ঠীপুকুরের জঙ্গলে একটা বহুপুরোনো রাজার গড় আছে । ব্যাস ছেলেটাকে আর পায় কে । সঙ্গে সঙ্গে ছুট ।
বাড়িটায় ঢুকে আঁতিপাতি খুঁজতে খুঁজতে হঠাত সে কুলুঙ্গীতে রাখা একটা বড়সড় কাঠের বাক্স দেখতে পেয়ে গেল । চেষ্টা চরিত্র করে সেটা খোলার পর তার চোখে গুপ্তধন পাওয়ার আনন্দ, বাক্সের ভেতরে থরে থরে সাজানো প্রাচীন পুঁথি, উইয়ে খাওয়া আর হলুদ হয়ে যাওয়া হলেও তার বেশীরভাগই এখনও গোটা আছে । আনন্দে বিভোর হয়ে যাওয়ায় ছেলেটা খেয়ালই করলনা যে কখন তার পেছনে দুটো লোক এসে দাঁড়িয়েছে । হঠাত করে পেছন থেকে ঘাড় চেপে ধরায় চমকে উঠে ছেলেটা বুঝতে পারল যে সে চরম কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছে । লোকদুটো তাকে জিজ্ঞেস করল যে সে কে, কেন এসেছে, কি করছে ? কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল ছেলেটার মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হল না ।
লোকদুটো বেশী কথার মানুষ নয় বোঝা গেল । একটা লোক বাইরে থেকে একগোছা নারকেল দড়ী নিয়ে এসে কষে বাঁধল ছেলেটাকে, একটা তেলচিটে গন্ধওয়ালা ছেঁড়া গামছা নিয়ে এসে মুখটা চেপে বেঁধে দিল ।
গল্পের গোগোল দের মত ছেলেটা ক্যারাটে বা জুডো জানতনা, কিম্বা তার কাছে কোনো পুলিশ কাকুর দেওয়া বন্দুক ও থাকতনা তাই চমকে যাওয়া ছেলেটার গায়ে কেটে বসে যাওয়া নারকেল দড়ির জ্বালা চুপ করে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না । লোকদুটোর মধ্যে একটা অন্যটাকে বলল “ভাই না এলে তো এ মালের কিছু হিল্লে করা যাবেনা, একে কুঠুরিতে নামিয়ে দে । ভাই এলে দেখা যাবে ভাই কী বলে”।
লোকদুটো ছেলেটাকে নিয়ে একটা অন্ধকার ঘরের এক কোণে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল । ছেলেটা বাইরে লোক গুলোর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল । ওপরের কোন একটা ফুটো থেকে একটু আলো আসছিল, সেই আলোয় ছেলেটা লক্ষ্য করতে চেষ্টা করল সে ঠিক কোথায় । চারদিকে ঝুল আর ভাঙ্গা কাঠের আসবাব পত্র, সাপখোপ লুকিয়ে না থাকাটাই অস্বাভাবিক ব্যাপার । বেশ কয়েকবার বাঁধন খোলার চেষ্টা করে ছেলেটা বুঝল, চেষ্টা বৃথা, উল্টে দড়ি আরও কেটে বসে যাচ্ছে । ডানপিটে ছেলেটার চোখ জীবনে খুব কম বার ভিজেছে, সে বুঝতে পারছিল তার চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে ।
এইভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল, প্রচন্ড জলতেষ্টায় ছেলেটা ছটফট করছিল, ফুটো দিয়ে আসা আলো কমে আসছিল, ছেলেটা বুঝতে পারল সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নামছে । হঠাত বাইরে কথাবার্তা একটু জোড়ে হল, বোঝা গেল আরো কয়েকটা লোক এসেছে । একজনের গলা বেশ উদ্বিগ্ন শোনাচ্ছিল, সে বলছিল, “এক্ষুনি বেরোতে হবে, শালা মামু লেগে গেছে, মাল সব প্যাকিং আছে তো ?” পাশ থেকে একজন বলল “হ্যাঁ ভাই সব ঠিকঠাক, এখান থেকে ট্রেকারে সোজা স্টেশন তাই তো ?” আরেকজন বলল “কিন্তু গুরু একটা কেস হয়েছে, একটা বাচ্চা এখানে কি করতে চলে এসেছিল, ওই কুঠরি তে ভরে রেখেছি বেঁধে বুঁধে, নামিয়ে দেব ?”
ছেলেটার বুক ধ্বক্ক করে উঠল, এতটা সে ভাবেনি । সে মরে যাবে ? তার ওই বাক্সটা তাহলে কী হবে ? মা কে সে আর দেখতে পাবেনা ? ইসস বাড়ি গিয়ে আর ডেক্সটরস ল্যাবরেটরি দেখা হবেনা । ছেলেটা বুঝতে পারল, তার দু চোখ ছাপিয়ে আবার বন্যা নামছে ।
“নাহ, এখন আর লাফড়া বাড়াসনা, ঐ কুঠরিতে রেখেছিস তো, ও এমনিই খালাস হয়ে যাবে কদিনের মধ্যে । এখন আর লেট করিস না, চল” — কিছু ক্ষনের মধ্যে চারদিক নিস্তব্দ হয়ে গেল। এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারদিকে ঝিঁঝির আওয়াজ, জলতেষ্টাটা সত্যিই আর সহ্য করতে পারছে না ছেলেটা । এদিকে টয়লেটও পেয়েছে, অনেক্ষণ চেপে রেখেছে, আর পারছেনা, তলপেট ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায় । নিরুপায় ছেলেটার প্যান্ট ভিজে গেল একটু পরেই । প্রত্যেকবার খড়-খড় করে আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠতে লাগল ছেলেটা, প্রতি মুহুর্তে অপেক্ষা করতে লাগল তীক্ষ দুটো দাঁতের ত্বরিত আক্রমণের । এই ভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল । যেন অনন্তকাল । ডানপিটে ছেলেটা জীবনে প্রথমবার ভয়ে কাঁপতে লাগল, প্রথমবার মনে মনে বলতে লাগল “ভূত আমার পুত…” ইত্যাদি । একটা সময় ছেলেটার মাথাটা কেমন করতে লাগল, মুখ বাঁধা থাকায় সে ভাল করে দম নিতেও পারছিল না, ছেলেটা বুঝতে পারল, সে আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে এক অতল কূপে যেটা বাইরের অন্ধকারের থেকেও গাঢ় ।
কতক্ষণ কেটে গেছে হিসেব নেই, হঠাত করে যেন ক্ষীন হয়ে আসা কিছু দুর্বোধ্য কিন্তু চেনা শব্দ ছেলেটার ঘুম ভাঙাল । ঘরের ভিতরে ফুটো দিয়ে দুপুরের রোদ এসে পড়ছে আর বাড়ির খুব কাছেই যেন কারা তার নাম ধরে ডাকছে । ছেলেটা স্বভাববশে উঁ উঁ করে উঠতেই তার মনে পড়ে গেল যে তার মুখটা বাঁধা । ছেলেটা বুঝল এটা তাকে ভগবানের দেওয়া লাস্ট চান্স । কোনোক্রমে গড়িয়ে গড়িয়ে দরজার কাছে গেল ছেলেটা আর পা, মাথা যা পারল তাই দিয়ে দরজার গায়ে জোড়ে জোড়ে আঘাত করতে লাগল । কয়েকবার আঘাত করেই বুঝল তার কপাল জ্বালা করছে । তবু থামলোনা সে ।
আরো একবার অতল খাদটায় ডুবে যাওয়ার আগে সে এটুকু বুঝতে পারল দরজাটা খোলা হচ্ছে ।
এর মাস ৬-৭ পরের ঘটনা, এশিয়াটিক সোসাইটি ছেলেটিকে তার সাহসিকতার জন্য শংসাপত্র ও আজীবন গবেষক সদস্যের মর্যাদা প্রদান করেছে । তার বর্ণনা অনুযায়ী পুলিশ ডাকাতদলকে খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে । তার বাড়ির লোকজন তাকে প্যাকিংবাক্সের বদলে একটা শোকেশ কিনে দিয়েছে । তার খুঁজে পাওয়া পুঁথি পত্রের অনেকটাই আজ এশিয়াটিক সোসাইটির তত্বাবধানে বহু পণ্ডিতের গবেষণার কাজে লাগছে ।
কী পাঠক ? এর পর স্টোরিলাইনে কী থাকে ? মনে আছে তো ? বাঁধাধরা ছকে লেখা একটা থ্রীলার …
কিন্তু ঘটনার সঙ্গে গল্পের মিল যে সবসময় থাকবেনা সেটাই স্বাভাবিক । সিনেমার পাগলপ্রেমী নায়িকারা যদিও নায়ককে শত দুঃখকষ্টেও ছেড়ে যায়না কিন্তু বাস্তবের বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যেমন “সাজানো-সুখের সংসার আর শনি-রবি বারে স্বামীর হাতধরে সি সি ডি বা সিটি সেন্টারের” মত ঘটনা ঘটে তেমনই ইঞ্জিনিয়ারিং এর সঙ্গে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়ে যাওয়া ছেলেটা আজো প্রথম প্রেমের জমিয়ে রাখা এস এম এসের মত লুকিয়ে লুকিয়ে ইতিহাসের বই পড়ে ।