আশা

আজকের দিন টা শুরু ই হল একটা ব্যক্তিগত গোমড়া মেজাজ নিয়ে, কলেজের ইম্পর্টান্ট সেমিনার ছিল, তাড়াহুড়ো করে সব সেরে, ছাতা নিয়ে গিয়ে রিক্সায় উঠলাম, মিনিট কয়েকের মধ্যেই শুরু হল যে বৃষ্টি তা যদি এখন অব্দি চলত তাহলে মনে হয় নোয়ার মহাপ্লাবনকেও ছাড়িয়ে যেত । যাই হোক সেই বৃষ্টির ভয়ানক আগ্রাসী আদ্রতায় আমার জামা-প্যান্ট ভিজে ন্যাতা হয়ে তো গেলই এক্সট্রা হিসাবে আমার প্লাস্টিকে মোড়া মোবাইলটা কে ও ভিজিয়ে দিল ।

গরীব মানুষ, তায় কিপ্টে বলে বাজারে আমার বেদম বদনাম আছে, অতি কষ্টে মাস খানেক আগে নোকিয়ার এই ৫০১ আশার ছলনে ভুলি কিনেছিলাম পুরো সা—ড়ে—- চা ——র হাজার কড়কড়ে টাকা দিয়ে, আমাকে গোটা বেচে দিলেও বোধ হয় অত টাকা পাওয়া যাবেনা । সেই সাধের মোবাইলটি গেল মিইয়ে ।

কলেজে পৌঁছে পকেট থেকে বার করে দেখি, বাবুর এল সি ডি, হিস্টিরিয়া রুগির মত কম্পমান, দেখে তো আমার ব্রেণও পুরো জেনারেল থেকে ভাইব্রেশণ মোডে। সঙ্গে সঙ্গে অফ করলাম, ব্যাককভার খুলে ফেলতেই দেখলাম ঝরণার মত জল বেরিয়ে এল ভিতর থেকে । যাই হোক, ভাল করে ঝেড়ে মুছে, খানিক্ষণ শুকোতে দিলাম, বেশকিছুক্ষণ পর সেটাকে ব্যাটারি লাগিয়ে অন করতেই বাবু একবার ব্লিঙ্ক করে চিরনিদ্রার আভাস দিয়ে নিদ্রিত হয়ে পড়লেন, শত চেষ্টা করেও তাকে আর জাগানো গেল না ।

কি জানি কেন আমার মনে হচ্ছিল যে ভিতরে হয়ত আরও জল জমে আছে বলেই বোর্ড শর্ট হয়ে গিয়ে মোবাইল টা অন হচ্ছেনা । বাড়ি এসে মোবাইল টা খুললাম, নোকিয়ার এই মডেলে কোনো ওয়ারেন্টি ব্রেক স্টিকার থাকেনা কোনো স্ক্রুর মাথায়, আমার কম্পিউটার রিপেয়ারিং এর স্ক্রুড্রাইভারের সেট টা বের করলাম, গুগুলে খুঁজে পেয়ে গেলাম এটা —- https://www.youtube.com/watch?v=g24s3wvCnSA । ব্যাস, শুরু হয়ে গেল আমার হাতের কাজ।

1610752_10202392529803718_470761194961084494_n

পুরো বোর্ডটা খুলে ফেললাম, যা অনুমান করা গেছিল, ভিতরে আরও প্রচুর জল জমে ছিল, প্রথমে কাপড় দিয়ে মুছলাম, তার পর সন্তুষ্ট না পেরে নিয়ে এলাম ভ্যাকিউম ক্লীনারটা । এটা অনেক দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ঘরবাড়ি পরিস্কার করার জন্য, কিন্তু মা ও কাজের মাসির খাঁটি স্বদেশী ঝ্যাঁটার ওপর অগাধ বিশ্বাস থাকায় ওটা পড়ে থেকে থেকে শেষে আমার নানা গবেষণামূলক কাজের অপরিহার্য্য অঙ্গ হয়ে ওঠে, ওটা এক্ষেত্রে ব্যবহার হল হট এয়ার ব্লোয়ার হিসাবে, ওটার গরম হাওয়া দিয়ে পুরো বোর্ড টা শুকনো করলাম আমি । তার পর খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে আশাকে জাগানোর চেষ্টা করলাম ।

জাগল না সে ।

এই সময় কম্পিউটারের মিডিয়া প্লেয়ারে সুমনের “হাল ছেড়োনা বন্ধু …” বাজিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেলুম । এবার মনে হল যে জল তো শুকিয়েছে, কিন্তু নিশ্চয়ই বাষ্প হওয়ার আগে আমাকে বাষ্পাকুল করার জন্য দ্রবীভূত বিভিন্ন লবণের দানা গুলো রেখে গেছে । সেগুলো কেলাসরূপে কন্ডাকটারের আভ্যন্তরীন রোধ বাড়িয়ে দেওয়াতেই মোবাইলটা সচল হচ্ছে না ।

কিন্তু কোথায় ঘটেছে সেটা বুঝব কী করে ? পি.সি.বি. তে সদ্য পড়া অক্সাইড বা সালফেট দেখতে কেমন হয় সেটা দেখিনি তো এর আগে ! আর মাইক্রোস্কোপিক অ্যানালিসিস করার যন্ত্র ও তো নেই আমার কাছে , কী করি ??? !!!

ফোন টা ওয়ারেন্টি তে ছিল, কিন্তু সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলেই যদি ধরে ফেলে লিকুইড ড্যামেজ !!! তাহলেই তো ওয়ারেন্টির কেল্লাম ফতেম !!!

তারপর ভাবলুম, আচ্ছা লিকুইড ড্যামেজ বলে ওয়ারেন্টি ক্যান্সেল করতে হলে তো আগে ধরতে হবে ড্যামেজটা কোথায় … আর সেটা ধরলেও আমার অল্প হলেও লাভ আছে ।

চলে গেলুম ব্যারাকপুরের নোকিয়া কেয়ারে । কাউন্টারে বসা সুন্দরীর কিউট হাসি দেখে ফোন খারাপ তো দূরের কথা, আমার যে একটা ফোন আছে, সেটাই ভুলে গেলাম (এটাও নোকিয়ার বিজনেস স্ট্রাটেজী নাকি !!!) … তার পর ফোনে কী সমস্যা সেটা দেখার অছিলায় সুন্দরী যখন হাতে হাত রাখল তখন তো নোকিয়ার সোকেশে সাজানো রঙ্গিন ব্যাক কভার গুলোকে একেকটা রঙ্গীন উড়ন্ত প্রজাপতি বলে বোধ হতে লাগল । ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া ( হৃদয় দেওয়া নেওয়ার আধুনিক ফার্স্ট স্টেপ ) ও হয়ত হয়ে যেত কিন্তু ওই যে একটা বিখ্যাত কথা আছে না কার যেন, “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

যাই হোক, ফোনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল স্পেশালিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে, রোগনির্ণয়ের জন্য । কিছুক্ষণ পর সুন্দরী তার সেটিং করে সাদা করা দাঁত কান অব্দি চওড়া করে বের করে আমাকে ডেকে বলল যে সে নাকি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছে যে আমার ফোনটিতে লিকুইড ড্যামেজ পাওয়া গেছে এবং সেটা নাকি এ——-ত গ—-ভী——র যে ওয়ারেন্টি তো ক্যান্সেল হবেই উপরন্তু আমি যদি টাকা দিয়ে অদের সারাতে বলি তাহলে ও নাকি ওদের ইঞ্জিনিয়ার রা রিস্ক নিয়ে কাজ করবে এবং আদৌ ঠিক করা যাবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই । আমি খুব শান্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম যে কত খরচা পড়তে পারে, সে বলল সেটা নাকি বলা যাচ্ছেনা । কারণ গ—ভী—র ড্যামেজ তো !!!

আমি এবার একটু সোজা হয়ে বসে অপেক্ষাকৃত কড়া গলায় বললাম, যে আমি কীকরে বুঝব যে আপনারা সত্যি বলছেন ? সত্যি ই লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে ? সে স্মার্ট হওয়ার উৎসাহে সঙ্গে সঙ্গে আমার ফোনের কোথায় কোথায় লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে সেই ছবি জুম করে করে কম্পিউটারে আমাকে দেখিয়ে দিল, আমিও বিমর্ষ মুখ নিয়ে সেগুলো দেখলাম । মেয়েটি সোৎসাহে আমাকে বুঝিয়ে চলল যে ড্যামেজের গভীরতা কতটা । ছবির সবুজ সবুজ অংশ গুলো নাকি লিকুইড ( বটে !!! … আমি তো জানতাম ওটাকে পি.সি.বি. বলে ) । তার বোঝানোর মাজে তাকে থামিয়ে দিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোনটা ফেরত চাইলাম । এবার বিমর্ষ হওয়ার পালা তার । ওই যে বলে — “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

বাড়ি এসে ফোন টা খুলে ছবি তে দেখে নেওয়া জায়গা গুলো তে ম্যাগনিফাইন্ড গ্লাস, এল ই ডী টর্চ আর একটা শক্ত ব্রাশ (রঙ করার) নিয়ে আলতো আলতো করে ঘসে সাদা সাদা কেলাসিত লবণ গুলোকে উঠিয়ে ফেললাম । গুঁড়ো গুলোকে আবার ক্লীনারের সাহায্যে পরিস্কার করলাম । সমস্ত পরিস্কারের পর স্ক্রু এঁটে, ব্যাটারী লাগিয়ে, আশার বোতামে চাপ ।

তার পর ?

ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাস ঠিকঠাক থাকলে আশা কি না জেগে পারে ?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s