বাঁশ

চাদ্দিকে প্রচুর বাঁশের মড়মড়ানি শুনতে পাচ্ছি । তো এই পোসোঙ্গে ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল ।

পড়ন্ত বেলার ভাঙা জমিদারবাড়ি কেমন হয় দেখেছেন তো ? আমার মামারবাড়ি বলতে তার একটা একজ্যাক্ট এগজাম্পেল চোখে ভাসে এখনও । তা বছর শ দুই আগে যখন অবস্থা ভাল ছেল, বুইলেন কিনা তখন পাশাপাশি দুই তালুকের জমিদার একদম তাদের তালুকের শেষ প্রান্তে বাড়ি করেছিলেন । যাতে একে অপরের ওপর নজরদারী করা যায় এবং টেক্কা দেওয়া যায় ।

যাই হোক, সেসব তো পুরোনো কথা । এখন সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই ।

এই খেয়েছে, সরি দাদা ভুল করে ওসব “সাম্পোদায়িক শব্দ” লিখে ফেল্লুম । কিছু মনে করবেন না । আমি কিন্তু মৌল, যৌগ, মাও কোনোটার ই বাদী পক্ষ নই ।

তো দুপক্ষেরই সেই বিশাল জমিদারী ইদানিং দুটো বটে খাওয়া লাল ইঁটের পাঁজর বারকরা ধ্বংসস্তূপ আর কয়েকটা পুকুর, কয়েকটা আমবাগান, ১০ – ১২ বিঘা জমি আর কটা বাঁশ বাগানে এসে ঠেকেছিল ।

তো একবার দাদুর কিছু একটা কাজের জন্য বাঁশের কয়েকটা মই লাগবে । কিন্তু দাদুর বাঁশ বাগানে কয়েকদিন আগেই বেড়া দেওয়ার জন্য বাঁশ কাটায় ভাল বাঁশ নেই । তো বাধ্য হয়ে দাদুকে ওতরফের সুন্দরগোপাল দাদুর কাছে যেতে হত । ওদের বাঁশ বাগানে বেশ ভাল ভাল পাকা বাঁশ রয়েছে ।

দাদু গিয়ে বলল “সুন্দর তোমার বাঁশ বাগানে তো অনেক বাঁশ রয়েছে । আমায় গোটা কুড়ি দাও, খুব দরকার, চাষের মই গুলো একদম নষ্ট হয়ে গেছে, মুনিষরা তাগাদা করছে, বলছে ভাল মই না দিলে কাজ করবেনা আজ থেকে । এই কটা দাও আপাতত, তুমি আমার বাগানের থেকে পরে নিয়ে নিও ।”

সুন্দর দাদু উত্তর দিলেন, “বিশ্বনাথ দা, আমার যে বাঁশ এখন খুব দরকার । আমার গোয়াল গুলো একটু মেরামত করতে হবে । তার পর পূব সিমানার মাটির ঘর গুলো ও পড়ে যাবে একটু দেখভাল না করলে । তারপর একটা গরুর গাড়ি ও বানাতে হবে নতুন । আপনাকে কী করে দিই বলুন তো”

দাদু বলল, “সুন্দর তোমার তো অতবড় বাগান অত বাঁশ, তোমার এই এত সব কিছু করেও তো আদ্ধেক বাগান ভর্তি থাকবে । আমায় কটা দিলে তোমার এমন কিছু ক্ষতি হবে না”

সুন্দর দাদুর চট জলদি উত্তর ” না দাদা, কিছু বাঁশ তো রেখেও দিতে হবে । কখন কার পিছনে দিতে দরকার পড়ে”

অত্যন্ত ক্ষেপে দাদু সুন্দরদাদুর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে আমায় বলল, “দেমাক দেখলি । ঐ যে এবারের দূর্গাপূজোয় কলকাতা থেকে গানের আর্টিস্ট আনিয়েছিলুম, তার শোধ নিল । হিংসা, হিংসা । হাতি কাদায় পড়লে চামচিকিতেও লাথি মারে বুঝলি । আচ্ছা আমিও দেখব, এক মাঘে তো শীত যায় না । চঃ আপাতত কেশবচকের আড়তটা একটু ঘুরে যাই, যদি বাঁশ পাওয়া যায় ।”

কেশবচকেও বাঁশ পাওয়া গেল না । তবে তারা প্রতিশ্রুতি দিল যে দুদিন পরে এলে অবশ্যই পাওয়া যাবে ।

যেতে যেতে দাদু বলল, “পাওয়া যখন গেলনা কিছু তো করার নেই, মুনিষগুলো এই দুদিন না হয় বসেই থাকুক, কী আর করা যাবে । বাঁশের দামটাও বড় বেশী পড়বে, এই আড়তটা পাক্কা গাঁটকাটা, কিন্তু কিছু করার ও নেই কাছাকাছি কোথায়ই বা আর পাব ? যাক সেসব ছাড়, আজ সকালে যে কাতলাটা উঠেছে দেখেছিস । পেল্লায় মাছ । তাড়াতাড়ি চল আজ ওটার মুড়ো দিয়ে নিশ্চই মুড়িঘন্ট রাঁধবে তোর দিদা । পা চালিয়ে চল, গিয়েই পুকুরে ডুবটা দিয়ে খেতে বসে যাব । ”

বাড়ি ফিরে মজুর গুলোর একটাকেও দেখতে না পেয়ে দাদু দিদাকে জিজ্ঞাসা করল ” কি গো ? মুনিষ গুলো কি বাড়ি চলে গেল নাকি ?”

দিদার ঝামটা, ” ক্ষ্যাপার মরণ, বাড়ি যাবে কি জন্য শুনি ? তোমার পাঠানো মই গুলো নিয়ে ক্ষেতে গেছে ।”

এবার দাদুর মুখ ভ্যাবলা ” আমার পাঠানো মই !!!!!”

“ন্যাকা, এই তো খানিক্ষণ আগে সুন্দরঠাকুরপো কটা মুনিষ নিয়ে এসে তিনটে মই দিয়ে গেল । বলে গেল তুমি ওকে দিয়ে যেতে বলেছ । আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পও করে গেল ।
বলল ওর চাষটা এবারে বন্ধ রেখেছে, মই টই ওর এখন লাগছে না, আরও কিছু দরকার হলে গিয়ে বলতে বলেছে । আরও বলছিল কি সব গোয়াল – টোয়াল মেরামত করবে ।
আমি তখন মুড়িঘন্ট রাঁধছিলাম । তো বলল বৌঠানের হাতের রান্না সত্যি ই ঘ্রাণেন অর্ধ ভোজনম । তা আমি মুড়ি ঘন্টটা আর মাছের কালিয়ার থেকে গোটা পাঁচেক দাগা ওর বাড়ির জন্য দিয়ে দিলাম । বড় ভাল মানুষ । তোমার মত কুঁদুলে নয় ।”

দাদু ব্যাজার মুখে বিড়বিড় করে বলল, “সুন্দর হতচ্ছাড়া এই ভাবে আমায় বাঁশ দিলি !”

************

বাঁশ দেওয়া আমাদের বাংলার অতি প্রাচীন একটি ট্র্যাডিশন এবং সেটি সমানে চলছে শুধু হারিয়ে গেছে বাঁশে বাঁশে ঠোকাঠুকির পরও মিষ্টিমুখ করে “মধুরেণ সমাপয়েৎ” করার ঐতিহ্য ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s