হারমোনিয়াম

একটা বহু পুরোনো হারমোনিয়াম। দিদা দাদু তারকেশ্বরের বাড়ি বিক্রি করে চলে আসার পর নতুন “মামার বাড়ি” তে এলিগ্যান্ট মামীর আদেশে ওই অপ্রয়োজনীয় জঞ্জালটার ঠাঁই না হওয়াতে নিয়ে এসেছিলাম আমার বাড়ি । প্রতি দিনই ইচ্ছা হত ওটা সারিয়ে একবার যদি সুর বাঁধতে পারি তবে বেশ হয় । কিন্তু যন্ত্রটা বোধ হয় মানুষের অবহেলাতে অভিমান করে চিরদিনের মত নীরব হওয়ার পণ করেছিল । তাই প্রথম প্রথম একটু আধটু খুটখাট করার পরও তার অভিব্যক্তির কোন প্রকাশ ঘটাতে পারিনি সুরের ভাষায় । তাই পড়ে ছিল । মাঝে মাঝে দেখতাম মা তার ধূলো ঝেড়ে দিচ্ছে । সুর বাজবেনা জেনেও রিড গুলো নাড়াচাড়া করছে যেন ভুলে যাওয়া অভ্যাসে ।

মাঝে মাঝে মায়ের অন্যমনস্কতার লেন্সে যন্ত্রটার গায়ে একের পর এক ছায়াছবি পড়ত । আমি নিরব বিস্ময়ে মানস দর্শনে কখনও পৌঁছে যেতাম মায়ের ছোট্টবেলার সেকেন্ডহ্যান্ড হারমোনিয়ামের দেহরাখার অবকাশে যেদিন প্রথম বার নতুন অতিথি হয়ে এই ফোরঅক্টেভের গর্বিত মালিকের আবির্ভাব হয়েছিল । আবার কখনও পৌঁছে যাই আঞ্চলিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থানাধীকারিণীর উচ্ছসিত হাতের স্পর্শে যেদিন ঝকঝক করত ওর বেলোর নকশা । কখনও এইচ এম ভির রেকর্ডিং রুমে । আবার কখনও বাবা ও মায়ের প্রথম দেখার দিন যেদিন দুপক্ষের সম্পূর্ণ অপরিচয়ও দুজনের একই সুরে বাঁধা হৃদয়কে আনন্দবিস্মিত করেছিল, মায়ের কন্ঠে নিজের অজান্তেই অনুরণিত হয়েছিল দুজনেরই প্রিয় গান “নয়ন ভরা জল গো … তোমার আঁচল ভরা ফুল”, সঙ্গতে ছিল এই হারমোনিয়াম ।

সেসব ওর সোনালী দিন । তার পর একদিন পুরোনো খেলামবাটি – বর বউ পুতুলের মত স্মৃতির ভার বুকে চেপে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হল বাক্সের অন্ধকারে । পরিত্যক্ততার আকস্মিক বিস্ময়ে চীৎকার করে ওঠার ক্ষমতা যে ছিলনা ওর, ওর ভাষা যে মানুষের হাতে বাঁধা ।

তারপর বহুদিন পরে ওর ঘুম ভাঙ্গালো এক ঝাঁকড়া চুলের কিশোর । ততদিনে বার্ধক্য গ্রাস করতে শুরু করেছে ওকে । টুপটাপ করে পড়া কাঁচা আম কুড়োনোর গরমের ছুটিতে মামারবাড়ীর একঘেয়ে দুপুরে এককোণে পড়ে থাকা বিরাট বাক্সটার মধ্যে থেকে অনেক কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করা অদ্ভুত যন্ত্রটার রীডে কচি হাত চালানোয় প্রথমে অবাক হলেও ভীষণ খুশী হয়ে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিল ও ।

আর সবচেয়ে অবাক হয়েছিল যখন অনেকটা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া ওর বহুকালের পুরোনো বন্ধু অনেকদিন পরে আবার সযত্নে ওর নতুন বন্ধুকে হাতে হাত ধরে শেখাচ্ছিল ওর মুখে ভাষা ফোটানোর অ – আ – ক -খ স্বরগম । নতুন আনন্দে নতুন আশায় ও যেন ওর বার্ধক্যকে হারিয়ে দিয়ে আবার সুরের ভাষায় একটা গোটা গল্প বলার জন্য ছটফট করছিল ।

কিন্তু সুখ বেশীদিন সইলনা । গরমের ছুটি তো একদিন শেষ হয়ে যায় । মানুষের ওপর চরম বিতশ্রদ্ধ হয়ে ও চিরকালের মত ঘুমিয়ে পড়ল কাঠের চৌকো কফিনটায় ।

যাই হোক মামীর গঞ্জনায় অস্থির হয়ে হারমোনিয়ামটার মতই পরিত্যক্ত বুড়ো বুড়ির ও ঠাঁই হল আমাদের বাড়িতে । সদা উচ্ছল নামকরা শিল্পী বলে খ্যাত দাদুকে দেখলে আজকাল চেনাই যায়না । ঠিক যেন হারমোনিয়ামটার মত । বিতশ্রদ্ধ, নির্বাক, মহাকালের যাত্রী ।

আজকে হাতে কিছুটা সময় ছিল, হারমোনিয়ামটাকে নিয়ে বসলাম । মনে অদম্য জেদ । খুব আদরে হাত রাখলাম ওর অন্তরে । গুটি কয় সন্ত্রস্ত আরশোলার সঙ্গে সঙ্গে আমার ছোট্ট বেলার কিছু সুখ স্মৃতি, বিক্রি হয়ে যাওয়া অত্যন্ত্য প্রিয় বাড়িটার কিছু টুকরো ছবিও যেন আমার দিকে উড়ে এল । শিথীল হয়ে যাওয়া ওর তন্ত্রীতে আন্তরিক আঁট আর আমার অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও অবজ্ঞা ভরে লক্ষ্য করছিল । কিছুটা অবাক ও হচ্ছিল নিশ্চই । আমি ওর কানে কানে বলছিলাম, “আর কখনও তোমাকে কেউ ফেলে রাখবেনা অনাদরে, আমি কথা দিচ্ছি ।”

মনে হয় ওর অভিমানটা কমে এসেছিল, হয়ত ও বুঝতে পেরেছিল ওই ঝাঁকড়া চুল ছেলেটা তখন ছোট ছিল । বায়না করার একটা সীমা ছিল তার । আজ সে বড় হয়েছে, নিজের সিদ্ধান্ত সে নিজে নিতে পারে । তাই বহু দিন পরে অনেক দিনের অনভ্যস্ত কন্ঠে আবার বেজে উঠল তার সুরধুনি । তার সুরের টানে রান্নাঘরের জ্বলন্ত গ্যাসে কড়া ফেলে রেখে ছুটে এল মা । ছাদের রোদের আদর ছেড়ে ছুটে এল কাঠের মত নিশ্চল বুড়োটা ।

তার পর সারাদিন শুধু গান আর গান । যদিও বুঝতে পারছিলাম বহুদিনের অবহেলায় ওর ফুসফুস জখম হয়েছে । আর কোনদিন হয়ত ও আর ওর আগের সুর ফিরে পাবে না । তবুও আজ ওর জন্য দাদু আবার তার যৌবন আর মা কৈশোরে ক্ষণিক হলেও পা রাখতে পারল । জীবনের কষ্ট, অনিশ্চয়তাকে ভুলে কিছুক্ষণের জন্য হলেও এ শুধু গানের দিন ।

এখন আমার ঘরে টেবিলের ওপর বসে ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে, কারণ আমি ওকে বলেছি আমার স্বপ্নের কথা । বলেছি ওকে থাকতেই হবে আর কটা দিন । নইলে আমার অনাগত অতিথিদের সুরের ভাষা শেখাবে কে …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s