D + R

সে অনেকদিন আগের কথা । তখন ও সাদা হাফশার্টের সঙ্গে খাঁকি ফুল প্যান্টের অনুমতি মেলেনি । স্কুল কর্তৃপক্ষের এই অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের মানসিক প্রতিবাদ করতে করতে ক্লাস ফোরের আমি অজিত কাকুর ভাড়া রিক্সায় স্কুল যেতাম । স্কুল শেষে আবার রিক্সার ওপর চাপানো কাঠের এক্সট্রা বেঞ্চিতে বসে বাড়ি । প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিনে একমাত্র নুন-ঝাল-মশলা চাটতে পারতাম আমার জন্য বরাদ্দ নির্দিষ্ট সময়টুকুতে হামলে পড়ে “কারেজ দ্য কাওয়ার্ডলি ডগ”, “স্কুবি ডু”, “পপাই” বা “টম এন্ড জেরী” দেখায় । এর মধ্যেই সিন্থাসাইজার শেখার ক্লাসে একদিন পরিচয় হল রোজির সঙ্গে । ও শিখত অরগ্যান । আমারই বয়সী, রাজা রোডের কাছে থাকে ।

আস্তে আস্তে আমি জানতে শুরু করলাম ওর পছন্দের খাবার, পছন্দের ড্রেস, পছন্দের কার্টুন প্রায় সবকিছু এবং দুজনেই সবিস্ময়ে লক্ষ করতে লাগলাম আমাদের পছন্দ, অপছন্দের তালিকাটা যেন কার্বণ কপি করা । বন্ধুত্বটা আমাদের একঘেয়ে রুটিনের মধ্যে একটা ওয়েসিসের মত ছিল । প্রতি সপ্তাহে ওই একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করা আর কথা জমিয়ে রাখা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছিল । দিনগুলো আমাদের অজান্তেই অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল । বড়দিনের উৎসবের ঠিক আগে রোজি বলল, “এই সানডে কিন্তু আমি আসব না, এই কার্ডটা ধর”। মনটা মিইয়ে গেল । সামনে খুললে যদি হ্যাংলা ভাবে তাই রোজি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াতাড়ি খাম থেকে বের করে কার্ডটা খুললাম — উইলমল্ট ফ্যামিলি তাদের ক্রিস্টমাস ইভে আমাকে নেমন্তন্ন করেছে । কার্ডটা দোকান থেকে কেনা, তবে ছোট ছোট করে কাটা রিবন ভাঁজ করে আঠা দিয়ে লাগিয়ে কার্ডটা দারুন সাজিয়েছে রোজি । লেখাটাও ওর । কি সুন্দর ছাপার মত হাতের লেখা ওর । কার্ডটা যত্ন করে খাতার ভাঁজে রেখে বাড়ি ফিরলাম । ক্রিসমাসের অপেক্ষা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষন মনে মনে ।

ক্রিসমাসের দিন গেলাম ওর বাড়িতে । অজিত কাকুকে বলা ছিল, রিক্সায় করে আমাকে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে । খুব মিশুকে পরিবার । আঙ্কেল আন্টির সঙ্গে পরিচয় হল । রোজির ঘর দেখলাম । কত সুন্দর সুন্দর ছবি । দেখে আমার তো চোখ কপালে — আরিব্বাস কী সুন্দর ছবি আঁকে মেয়েটা !!! শুধু একটাই জিনিস দেখলাম বাজে, ঘরের একদিকের দেওয়ালে হিজি-বিজি আঁকিবুকি কেটে ভর্তি করেছে । কোনো জায়গায় নটিলাসের ছবি আঁকা, কোথাও ভূত প্রেত আঁকা, কোথাও নামতা লেখা, কোথাও ডি + আর লেখা কোথাও আবার পপাই – অলিভ আঁকা । আমার বাবা মা ছোট বেলা থেকে আমায় বুঝিয়েছিল যে দেওয়াল নোংরা করতে নেই । রোজি বোধ হয় ওসবের ধার ধারত না । রোজি, ওর কয়েকজন কাজিন আর পাড়ার বেশ কিছু ছেলে মেয়ে প্রচুর হুল্লোর হল । সে এক দারুণ মজার ব্যাপার । পার্টি শেষ হলে আবার অজিত কাকুর রিক্সায় বাড়ি ।

একসঙ্গে বড় হতে হতে ক্লাস ফাইভে উঠলাম । আমার নামটা নিয়ে রোজির ছিল ঘোর অনীহা । বলত “কী শক্ত নাম” । বলত, “তার চেয়ে তোকে ডেভিড বলে ডাকব, আমার দিদির এক বন্ধুর নাম আছে ডেভিড, কি সুন্দর নাম” । আমি আবার নিজের পিতৃদত্ত নাম বজায় রাখার ব্যাপারে এককাট্টা ছিলাম । রোজি তর্কে পারত না । লাস্টে আমায় খুশী করার জন্য “শতদূর” জাতীয় কিছু একটা বলে ডাকত । আমার শুনে হাসি পেয়ে যেত ।

রোজি আর আমার মধ্যে অদ্ভুত সব বিষয় নিয়ে কথা হত । যেগুলো অন্য কাউকে বলা যেত না । যেমন আমাদের প্ল্যান ছিল জলের তলায় কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটা শহর বানাবো যেখানে সব কিছু থাকবে । কখনও প্ল্যান করা হত আমরা বড় হয়ে একটা সাবমেরিন বানাবো যেটায় নটিলাসের মত সব জিনিস পত্র থাকবে । আসলে আমার গিফট পাওয়া একটা জুলে ভার্ণের বই তখন দুজনে মিলে একসঙ্গে পড়ছি তো ।

এই করতে করতে চলে এল ১৩ই সেপ্টেম্বর । রোজির জন্মদিন । সেবারে ওর জন্মদিন বড় করে সেলিব্রেট হবে । বাবা গিফট দেওয়ার জন্য বিরাট বড় একটা সাদা টেডি কিনে এনে দিল । কপাল এমন, সেই দিনই বিকেলে পাড়ার ফাংশানে আমাকে বাজাতে বলল । অতি বিরক্তি সহকারে “পুরানো সেই দিনের কথার” মুখস্ত করা সুর নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে দেখলাম, অজিত কাকু আসেনি । কিন্তু যেতে যে আমায় হবেই । অন্য রিক্সা ভাড়া করে চললাম । চুমকি অনুষ্ঠানগৃহ বিটিরোডের একদম পাশেই ।

রিক্সা থেকে নামার পরই সুর কেটে যাওয়ার গন্ধ যেন বাতাসে ভর করে আমার অবচেতন মনকে সজাগ করে তুলল । চারিদিকে অবিন্যস্ত অথর্ব লোকজন আর টেবিলের ওপর না কাটা কেক । যেটুকু কানে এল তার বেশী কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস না করে অন্ধের মত ছুটলাম বলরামের দিকে । রিক্সা ধরার কথা মনে নেই । পায়ের চটি খুলে বেরিয়ে গেছে । পাশ দিয়ে হু হু করে ছুটে যাওয়া গাড়ি । আমার চোখ যেন সব দেখেও অন্ধ হয়ে গেছে ।

বলরামে পৌঁছেই ছুটে ভিতরে ঢুকে কিছুটা চেনা মুখের ভিড় গুলোর জটলায় প্রাণপণে নিজেকে গুঁজে দেওয়ার অদম্য চেষ্টা থেকে রোজির কাকার বলীষ্ঠ হাতও আমায় আটকাতে পারল না । থেঁতলে যাওয়া ছোট্ট একটা দেহ । টকটকে ফর্সা মুখটা আর কোনো দিনও দেখতে পাবোনা এই চরম সত্যিটা বাস্তব আমার প্রতি মুহুর্তে অস্বিকার করা মনে গেঁথে দিচ্ছিল । পাশ থেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়া আন্টির অস্ফুট গলার স্বর ” সেই তো এলি বাবা এত দেরী করে ফেললি । ও যে তোর আসার জন্য কেকটাও কাটেনি” আমার কানে ঢুকলেও মাথায় যাচ্ছিল না ।

আর কখনও সিন্থ বাজাই নি । জানি কখনও বাজাতেও পারব না ।

দিন কয়েক আগে গিয়েছিলাম সিমেট্রিতে । মাঝে মাঝেই যাই । “হিয়ার লাইস রোজি উইলমল্ট, আ লিটল অ্যাঞ্জেল” । সিমেট্রির পাশে বেঞ্চে বসে থাকি । সেদিনও বসে আছি । একটু দূরে দুটো সেভেন এইটের ছেলে মেয়ে একটা দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে । ওরা আমাকে দেখতে না পেলেও আমি ওদের দেখতেও পাচ্ছি । কথাও শুনতে পাচ্ছি ।

ছেলেটা বলছে “এই নে এই পেন্ডেন্ট টা তোর জন্য জাবং থেকে অর্ডার করে আনিয়েছি । দেখ এটাকে আলোয় ধরলে দেখতে পাবি ভেতরে একটা লেখা এমবেড করা আছে, আমার আর তোর নামের ফার্স্ট লেটার দুটো” । মেয়েটা পেন্ডেন্ট টা উঁচু করে দেখে বলল ” হ্যাঁ দেখতে পেয়েছি, D + R, হ্যাঁরে দীপ আমার নাম তো সংঘমিত্রা, তাহলে এস না দিয়ে আর দিয়েছিস কেন ??? এটা অন্য কারুর জন্য আনিয়েছিলিস ??? সত্যি করে বল” দীপ নামের ছেলেটি হেসে হেসে বলছে “তুই তো আমার রিয়া” তোকে আমি সংঘমিত্রা বলে ডাকবই না, কী লেন্দী নাম, হুস”

হঠাত করে অনেকদিন আগেকার একটা ফিরোজা কালারের দেওয়াল আর তাতে ছাপার মত সুন্দর হাতের লেখায় লেখা কয়েকটা লেটার চোখের সামনে ভেসে উঠল ।

শীত পড়ে গেছে । সিমেট্রীর শুকনো খটখটে পাথর গুলো শিশিরে ভিজতে শুরু করেছে ।

দেওয়ালের সেই আঁকিবুকি গুলো আজ আর অর্থহীন মনে হচ্ছে না ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s