খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন

কদিন ধরেই নিজের ছেলেকে চিনতে পারছেনা আগম । ছেলেকে নয়, বলা ভাল ছেলেটার চাহনীটা । চাহনীটা তার খুবই পরিচিত কিন্তু ছেলেকে যেন তার সঙ্গে মেলাতে পারছেনা । চারদিক বড্ড বদলে যাচ্ছে ।

যাই হোক এসব ভেবে সময় নষ্ট করার মত অবসর আগমের নেই । অনেক সংগ্রাম করে তারা আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । মন্ত্রী সভার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পদ সে পেয়েছে তার যোগ্যতাতেই, তার কাজের পুরস্কার হিসাবে । সারাদিন একের পর এক ইন্সপেকশনের রিপোর্ট দেখে ব্রিফিং করতে হয় তাকে । প্রচুর চাপ । তারা যা চেয়েছিল হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে দায়িত্ব ও বেড়ে গেছে । এত কিছুর মধ্যে পার্সোনাল লাইফ নিয়ে এত ভাবনার সময় তার থাকেনা । অফিস থেকে বেড়িয়ে বিভিন্ন জমায়েতএ হাজিরা দিতে হয় নিয়ম করে, জমায়েত না থাকলে অবশ্য একটু অ্যায়েশ করতে যায় মেয়েবাজারে । তবে প্রাসাদোপম বাড়িটায় ফিরে কিছুটা অভ্যাসবশতঃই প্রিয়জনদের সাহচর্য্যে বেশ কিছুটা শান্তি পায় । বিশেষ করে তার ছোট ছেলেটা । আমনের মুখটা দেখলে সারাদিনের সব শ্রান্তি যেন জুড়িয়ে যায় । তাই আমনের বদলে যাওয়া দৃষ্টিটা একটু হলেও তার মনে হালকা একটা দাগ কাটছে । দাগটা কালকে অফিসের প্রেসারেই মিলিয়ে যাবে সেটা সে জানে, তবে আবার বাড়ি ফিরে বারো বছরের ছেলেটার চোখের দিকে তাকালেই পুরোনো ঘা এর ফ্যান্টম পেইনের মত দাগটা আবার চুলকোবে ।

কতজনের জীবনেই তো হঠাত করে সমস্যা তৈরী হয়, যেগুলো আগে থেকে কখনও কল্পনাও করা যায় না । দিন কয়েক আগে আগমের নীতিগত গুরুদেব যিনি, যাঁর কথা মত চলেই আজ তার এই উন্নতি তিনি মানসিক ভারসাম্য হারালেন । অত শক্ত ধাঁচের, কঠীন মনের মানুষ প্রায় হঠাত করেই বিনা নোটিশে একেবারে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেলেন । নাঃ অনেক বয়স হয়ে গেল ।

আজকের দিনটা ছুটি আগমের । আজ আমনকে স্কুলে দিতে যাবে সে । মার্সিডিজটা আজ সে নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে । সারাটা রাস্তা আমন কোনো কথাই বলল না । আগম একবার ভাবল ছেলেকে জিজ্ঞাসা করবে কী হয়েছে । কিন্তু ওই ভীষণ চেনা বদলে যাওয়া চোখদুটো যেন তার মুখে কোনো কথা জোগাতে দিচ্ছিল না ।

বাড়ি ফিরে বিশাল বাগানটা ঘুরে দেখছিল আগম । লাল গোলাপ গুলো বেশ বড় বড় হয়েছে তো ! কোনো উযযাপনে সামিল হওয়ার মত রাজকীয় সৌন্দর্য্য তাদের । বেশ ফুরফুরে ভাবালু মেজাজটা বিষম খেয়ে প্রকৃতিস্থ হল সেলফোনের রিংটোনে । ফোনটা ধরল আগম ।

***************************************

দুধসাদা মার্সিডিজটা অগোছালো ভাবে পার্ক করা । বাড়ি থেকে পিস্তল চুরি করে এনে নিজের মাথা ফুটো করা দলবদ্ধ বাচ্চাগুলোর লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিক ওদিক । আমনের বডিটার চোখ দুটো খোলা, নিষ্পন্দ হলেও চাহনিটা পাল্টায়নি, আর ঠোঁটের কোণে উঁকি দিচ্ছে দুর্বোধ্য এক টুকরো হাসি ।

বহু জেহাদে কায়েম করা রাজত্বের উচ্চপদাসীন প্রাক্তন জঙ্গিদের ছেলেগুলোর লাল হয়ে যাওয়া ইউনিফর্ম পরা দেহগুলো ঘিরে রয়্যাল স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে আগম ও আরও অনেক জেহাদের মুখোশ পরা সুবিধাবাদী ।

আজ ১৬ই বা ২৪শে ডিসেম্বর । রক্ত মাখা মুখের ফ্রেমে চাহনীটা আগম ও তার সঙ্গী সাথীদের আর অচেনা লাগছেনা । খোকাবাবুরা ফিরে আসছে ……

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s