সিদ্ধির অপেক্ষায়

আমার আশ্রমের সামনে দিয়ে বয়ে যায় ছোট নদী
চার পাশের গাছ গুলোয় ফুটে আছে লাল ফুল
ধোঁয়ার অন্য রকম গন্ধে এখানে সব কিছু শান্ত
আমার সৌম্য মূর্তি ভস্ম মাখা বরাভয় ছড়িয়ে দেয় পরিবেশে

লোকে বলে আমি সিদ্ধ পুরুষ, আমার দর্শনে তারা
সাহস পায় জীবনের যুদ্ধ গুলোর মুখোমুখি হতে
আমার জটাজালের ভার আমার বয়সের সাক্ষী তারা জানে
জানে আমি চাইনা কিছুই, তবু দিয়ে যায় খাবার

তারা শুধু জানেনা আমার রক্তাম্বর তোমার রুধিরে ছোপানো
জানেনা যজ্ঞধূমের গন্ধটা তোমার মেদের আহুতিতে
জানেনা সকালের যত্নে শরীরে মেখে নিই তোমার চিতাভস্ম
জানেনা আমার জপমালাটার হাড়ের পুঁতিগুলো তোমার অবদান

তারা জানেনা মধ্যরাতের গুহ্য সাধনার অছিলায় আসনের নীচে
স্মৃতির কবর খুঁড়ে তুলে আনি তোমার বহুব্যবহারে পচা দেহটা
আমার সাধনা তোমার নিস্পন্দ চোখে গেঁথে দেয় একটা প্রশ্ন
যে প্রশ্নের অস্তিত্ত্ব তুমি বার বার অস্বিকার করেছ ঘন কাল নিস্তব্দতায়

মুখোশের আড়াল

অনেক নাটক হয়ে গেছে
সুশীল, সুবোধ বা গান্ডু যাই বলনা কেন
জন্ম থেকে মুখের চামড়ায়
জোড় করে সেলাই করে দেওয়া মুখোশটা
চুলকে লাল করে ফেলেছি

যৌনপল্লীর রাস্তায় নিষিদ্ধ গন্ধের গোপন
অভিসারে ব্যস্ত নাকটাকে অনেকবারের
কষ্টে সিঁটকোনোর পোজ দেওয়া করিয়েছি
তোমার বহুগামীতাকে মেনে নিয়ে
সমাজের সামনে ক্ষমাশীল মৈত্রেয়ের অবতার
হইনি, অভিনয় করেছি …

আমি হতে চাইনা সাজানো গোছানো
দারু খোর দেবদাস বা ব্যর্থ কবিতাকার
হতে চাইনা, তোমাদের বাড়তি করুণার
ডোনেশন বক্স, হতে চাইনা
যন্ত্রণায় জন্মনেওয়া আর্ট ওয়ার্ক…

হতে চাইছি লাশকাটা ঘরের একনীষ্ঠ শীল্পি,
অশনাক্ত নারী শরীরের থ্যাঁতলানো মুখ দেখে
জ্বলজ্বলে আশায় দাঁত বের করে হাসতে
মুন্ডু খুঁজে না পাওয়া রেলেকাটা নগ্ন শরীরটার
দিকে তাকিয়ে ছুরি চালাতে চাইছি এঁটো আঁস্তাকুড়ে,
যেটা দিয়ে তুমি খুন করেছ আমার প্রতিবিম্বদের

আত্মকথন – ৩

হাজার হাজার ফুট উঁচুতে মাইনাস ৪৫ ডিগ্রী সেন্ট্রিগেট তাপমাত্রায় । সামান্য কিছু মাইনে আর কিছুটা গর্বের বিনিময়ে । পর পর পাওয়া একের পর এক প্রমিসিং চাকরির অফার ছেড়ে । কেন যেতে চাইছি ??? প্রশ্নটা এই ক দিনে অনেকবার শুনেছি আলাদা আলাদা উৎস থেকে ।

আসলে প্রতিদিন একটু একটু করে মনুষ্যসমাজের বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠছি । ছটফট করছি অব্যক্ত কিছু অস্বস্তিতে । আমার উপস্থিতিতে ভারাক্রান্ত হচ্ছে অনেকগুলো সুস্থ মনন । তাই পালাতে চাইছি অনেক অনেক দূরে । বরফের নিশ্তব্দ দেশে উদ্দেশ্য ও বিধেয়হীন জীবন নিয়ে । যেখানে সুখ বা ভুলের স্মৃতিরা ভীড় করবেনা অধিকাংশ অবকাশে ।

ভাগ্যের পার্শিয়াল সহায়ে যদি পাই ঘুমের হঠাত ছুটি । উদ্দেশ্যহীন জীবন ব্যর্থ যাবেনা । একটুখানি গর্ব আর অনেকখানি শান্তি নিয়ে চিরযৌবনের ঘুম ঘুমোবো নিশ্চুপে নীল তুষারের দেশে, হয়ত অন্য কোনো জন্মের একটা সত্যিকারের উষ্ণতার জন্য ।

আত্মকথন – ২

সম্পর্কেরা বাতাসের মত । দেখি আর না দেখি, আছে, এই অনুভুতিটা থাকলেই বাঁচা যায় । নইলে দম আটকে যায় ।

একেক জায়াগার বাতাসের প্রপার্টিস একেক রকম । কোথাও অক্সিজেনের পরিমাণ ২০ শতাংশ তো কোথাও ১৫ শতাংশ । কোথাও কার্বণ ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ শতকরা ০.৩৮ তো কোথাও ০.৫০ ।

সম্পর্কের ও রকমফের আছে । কিছু সম্পর্ক সময়ের সাথে সাথে পরিণত হয় , কিছু আবার সময়ের সাথে সাথে বদলায় । সম্পর্কের টানাপোড়েন যেমন থাকে, তেমনই থাকে বুক ভরে অরণ্যের বাতাসে শ্বাস নেওয়ার মত সতেজতা, প্রশান্তি । কিন্তু জলের তলায় সিলিন্ডার ছাড়া ডুবুরী বা বায়ুশূণ্য কাঁচের ঘরে বন্দী ল্যাবর‍্যাট যেমন হাওয়ার অভাবে ছটফট করে কাঁচের দেওয়ালে হাতড়ায় মুক্তির রাস্তা খুঁজতে তেমনই সম্পর্কের কখনও ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত বা দীর্ঘসূত্রিতায় ভেঙ্গে পড়ায় মানুষের দম আটকে আসে । হয়ত একটু আগে বা পরে ।

থিওরিটিক্যালি কিছু সম্পর্ক কখনও বদলায় না । কিন্তু বাস্তব আর থিয়োরির মাঝের কন্সট্যান্ট গোঁজামিলের ব্যাতিক্রম তার সীমাকে অতিক্রম করে অহরহ । তাই নিজের, অন্যের বা মিউচুয়াল ভুলের ফাটল দুদেশের প্লেটতত্ত্বে আলোড়ণের যে সাগর তুলেছে বার বার বিবিধ ভুখন্ডে তার মাঝে অন্তরীপ খুঁজে বেড়াই সন্ধ্যা নামার আগের দুপুরে ।

আজ দুটো সেট বিচ্ছিন্ন পাথরের মাঝে সরু গুল্মলতার শেকড় বা ছত্রাকের সন্ধান করলাম । একটা তার মধ্যে জমা শ্যাওলাঢাকা বর্ষার জলকে বইতে দিল আমার দুচোখ ভিজিয়ে । আরেকটা শুধুই মরুভূমী আর কাল্পনিক দোষারোপের অর্থহীন পান্ডুলিপির হিসেব মেলানোয় জাল বুনছে ঘৃণার মুখোশে অভিমানের ।

কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগে আবার হয়ত দেখা হবে । কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা হঠাত কোনো অনাকাঙ্খিত শেষ স্টেশনে । তখনো কি হিসেব নিবি কটা ঠিক আর কটা ভুলের ?

হারিয়ে যাওয়ার আগে

শুধু নিজের বলে দাবী করার কাউকে খুঁজছি দিনের পর দিন
যার সঙ্গে ভাগ করা যাবে মস্তিষ্কের যে কোন কোণের ভার

যার সঙ্গে ভালবাসা বা কাল্পনিক কোনো অনুভুতি সত্যি বলে
ধরে নেওয়াযাবে নির্দ্বিধায়, শুধু হাতে হাত ধরে চোখ বন্ধ করে

মাথার ওপর একটা প্লাস্টারহীন ছাদ আর বসের কড়া চোখে
নীরবে পেরিয়ে যাওয়া উপহার হীন জন্মদিনেরা ব্যর্থ যাবেনা

পুরোনো তোষকের ওপর ভাগাভাগি করা একটা চাদর যার
সঙ্গে হয়ে উঠবে স্বপ্নকল্পিত বরফের নিস্তব্দ নীলাভ কন্দর

আসলে খুঁজছি পরশ পাথর জানি সেটা শুধু সিনেমা বা গপ্পে
ঝিলিক দিয়ে যায় অযৌক্তিক আশাকে উস্কে দিতে তবুও

*********************

লাল,লীল,সবুজ মিশে একাকার প্যালেট থেকে কালি মাখছে শ্বেতপাথরের মেঝে
পথের ধারে আমার দীর্ঘ ছায়াটার মত কাল, যেটার অবিনশ্বরতার গর্ব ভুলে যাবে তুমি

পয়সা বাঁচানোর ফিকির বা শেখার আনন্দে তাতালের উষ্ণ স্পর্শে যখন দক্ষিণা দেব
তোমার নিয়ন্ত্রিত ঘরের জানলায় নতুন বাঁচতে শেখার প্রতিবিম্বেরা হাসবে, জড়াবে

খেলতে খেলতে ঘুম আসার আগে সাফল্যের মুচকি হাসি আমার একান্ত নিজের
তোমাকে হাত ধরে ভাঙ্গাচোরা জঞ্জালের পৃথিবী থেকে পৌঁছে দিয়েছি তোমার অজান্তে

ঘুম আসতে হবেই কারণ সুন্দর নতুন পৃথিবীতে প্রবেশাধিকার চাইনি কখনও
শেষবারের মত ছুঁয়েছি তোমার হাত সীমান্তে, কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আগে

ফাউন্টেন ব্রেণ

প্রতিদিনই কলমের ছোঁয়ায় রামধনুরঙ্গা স্বপ্ন আঁকতে বসি
কিন্তু মস্তিষ্ক থেকে অঝোড়ে ক্ষরিত ভাবনার নির্যাসেরা
কলমের মুখবেয়ে শুধু বিষ ঝড়ায়, ঘন কালো অন্ধকার বা
ভুল হয়েযাওয়া সভ্য বাস্তবের জন্য জমানো খিস্তির মত

উইক্কান সংবাদ – ১

প্যাগান বা প্রকৃতিবাদী বা পরবর্তী কালে ডাইনতন্ত্রী (ইউক্কান) বলে পরিচিত মানুষদের চিরকাল স্থান হয়েছে জ্বলন্ত আগুণে বা সমাজের এক কোণে । কারণ তারা নাকি পৃথিবীর অমঙ্গল চায় । ধর্মের বিরোধি তারা । এই ধারণা কিছু অংশে এখনও বিদ্যমান । বহুকালের জমা অন্ধকার দূর করা আমার ক্ষুদ্র সাধ্যের অতীত । তাই ওসব কচকচানি তে না গিয়ে একটা লেখা লিখলাম । আসলে এটা একটা উইক্কান মন্ত্রর অনুবাদ । প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরের উপাসকরা (মূলতঃ ডাইনি রা) এটি প্রার্থনার কাজে ব্যবহার করত । এই মন্ত্র তাদের দিত অমিত শক্তি । মন্ত্রটির মূল ইজিপ্সিয়ান আবৃত্তিটি আমার কাছে আছে । দরকার পরলে বলবেন । পোস্ট করে দেব ।

————————————

আমিই সৃষ্টির আদি প্রেরণা , আমাতেই লয় ব্রহ্মান্ড
আমিই ত্রিলোকের পূজ্য, তবু আমিই বিশ্বের লজ্জা
আমিই পল্লীপ্রান্তের গণিকা, আমিই মোক্ষপথের সাধ্বী
আমিই অনূঢ়া কুমারী, এবং ভার্য্যা রূপে শয্যাসঙ্গিনী
আমি অবাধ্য দুহিতা এবং অনন্ত স্নেহশীলা জননী
আমার মতার বাহু দুটি আমারই প্রচ্ছন্ন প্রকাশ
আমিই বন্ধ্যা আর বহু সন্তানের জন্ম দায়িনী
আমি পরিণিতা এবং দায়গ্রস্ত পিতার বয়স্থা চিরকুমারী
আমি যন্ত্রণাক্ত জন্মদাত্রী তবু আমি অনাদি, অজাত
আমি অসহ্য প্রসব বেদনার সান্তনা, আমি পতি ও পত্নী
আমার সৃষ্টি আমার প্রেমিকের দেহ, আমার পিতার জন্ম আমারই জঠরে
আমিই আমার স্বামীর সহোদরা, আমার সঙ্গী আমারই পরিত্যক্ত পুত্র
আমার চিন্তাই তোমার স্থিতি ও জগত
আমার জঠরই তোমার সৃষ্টি ও অন্তিম গন্তব্য
আমি দেবী, তোমার সম্মুখে ও পার্শ্বে আমার অলক্ষ্যিত প্রকাশ