যুক্তি বিশ্বাস

সম্প্রতি ছ্যাঁকা খেয়েছি । পূর্বে যে কখনও ছ্যাঁকা খাইনি এমন নয় । তবে শুধু অভিজ্ঞ মাথা নেড়ে তো আর পোড়ার জ্বালা মেটানো যায়না । তাই বাস্তবিক ক্ষতস্থানে প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যাপক প্রদাহের সৃষ্টি হয়েছে ।

সেই কবে দশমশ্রেণীপাঠরত বালক প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর নয় । অবশ্য বালক আদৌ বলা যেত কিনা জানিনা, কারণ অন্য কারুর সাক্ষ্য দিবার প্রয়োজন নাই, নিজের কাছে মিথ্যে বলে কী লাভ । মনের পরিপক্কতা দেহের পরিপক্কতাকে রেসে বেশ পিছনেই ফেলে দিয়েছিল সে তথ্য রেসিং ট্রাক স্বরূপ বালক বা লোক টি ছাড়া কে ভাল জানবে ! যাই হোক সেই নৈব নৈব চ যে কখন কোন নালা দিয়ে গড়িয়ে গঙ্গা ভায়া হয়ে সাগরে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও ইতিহাস বিলীন করে দিল তার হিসেব লিখে রাখতে বেমালুম ভুলে গেছি ।

এর জন্য আমায় দোষ দিলে কিন্তু অনুচিত হবে । আছাড় খাওয়া, পোড়া ইত্যাদি বলে কয়ে, সাবধানতার ধার ধরে আসে না । সেজন্যই তো এগুলোকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে । সাবধানতা নিলে তবুও দুর্ঘটনা কিছুটা আটকানো যায় । কিন্তু বাঙালীর বিরহ মন্থিত দীর্ঘশ্বাসোদ্ভুত প্রতিজ্ঞা এক্ষেত্রে নির্জন গলির দেওয়ালে “এখানে প্রস্রাব করিবেন না” লেখার মতই নিষ্ফল ।

যাই হোক ক্যারদানী মারতে গিয়ে দুর্ঘটনার একটা মদীরার ন্যায় পূর্বরাগ থাকে । ট্রেণে ঘা খেয়ে অকালে চন্দ্রবিন্দু হওয়া ছেলেটাও “এই সেলফি টা ক হাজার লাইক পাবে” হিসেব গুণে মিচকি দাঁত কেলিয়ে টেলিয়ে টপকায় । তা আমার ছ্যাঁকা খাওয়াপূর্ব মধুচন্দ্রিমা (বাস্তবিক মনে করবেন না, অত সাহস আমার নেই, রূপকার্থে ব্যবহৃত) বছর চারেক চলেছিল । দিব্যি উড়ছিলুম, আগুনের লেলিহান সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে দেদার ঘি ঢেলে চলেছিলুম । আসলে আগের ছ্যাঁকা খাওয়ার স্মৃতি যে ততদিনে বেদম হাওয়া । ঘৃতপুষ্ট অগ্নী যে সময়-সুযোগ মত আমাকেই গ্রাস করবে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে স্বমেধ যজ্ঞ মোটামুটি অর্গানাইজ করে ফেলছিলুম ।

যাই হোক সে যা হয়েছে হয়েছে । গায়ে আবার একই রকম ফোস্কা পড়েছে । জ্বালার অভিন্নচরিত্রও হাড়ে হাড়ে মালুম হচ্ছে । পর্যায়ক্রমে ক্ষোভ, দুঃখ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, অসূয়াদি স্তর কেটে গিয়ে এখন কেবল বিষম জ্বালা আর “প্রমিসেস আর মেড টু বি ব্রোকেন” প্রবাদানুমতির দরাজ সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে অবিরাম খিস্তি করতে করতে এগেন প্রমিস (এবারে এক্কেবারে ক্ষত্রিয় টাইপ প্রমিস বুইলেন কিনা মশাই) পর্যায় চলছে মনে ।

তো বিরহ অতি বদ জিনিস । এমনি বিবাহিত লোকেদের বউ দুদিন বাপের বাড়ি গেল কিম্বা নবীন প্রেমী যুগলের (নবীন বললুম কারণ প্রেমের প্রবীণত্বের পরিণতির ভুক্তভুগী তো) বিরহ বেশ অম্ল-মধুর একটা জিনিস । কিন্তু “প্রাক্তন প্রেমিকা পাত্তা দিচ্ছেনা, সম্ভবতঃ অন্যকারুর সাথে মাল্টিপ্লেক্সে বসে পপকর্ণ খেতে খেতে নিউ রিলিজড সিনেমা দেখছে” এই টাইপের বিরহ অত্যন্ত অস্বস্তির একটা ব্যাপার যেটা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অনর্থক একটা বিরাগ তৈরি করে দেয় । যদিও সেটা গোপন অনুরাগের একটা রূপভেদ মাত্র তবুও সেই বিরাগ প্রথম প্রথম বাঁশের কেল্লার মতই আবেগদুর্ভেদ্য থাকে ।

তো বিরাগের সার্বক্ষণিক আঘাতে এবং এমনিতে অবদমিত কিন্তু অদৃশ্য প্রতিপক্ষ রিপ্লেসমেন্টটির প্রতি অসূয়াবশতঃ সহসাজাগ্রত শরীরের উৎপাতে তিতিবিরক্ত হয়ে একদিন গিয়ে হাজির হলুম বেণুদার আস্তানায় ।

বেণুদা লোকটি অত্যন্ত্য জ্ঞানী একজন ব্যক্তি । শুধু আনন্দ ঘন্টা জাতীয় মিডিয়ায় সশব্দ উপস্থিতির জন্য আবশ্যকর্ম তাঁবু বহন করে পশ্চাদানুসরণের পটুত্ব না থাকায় বাঙালী তাকে সেইভাবে চিনল না । তাতে অবশ্য তাঁর বিশেষ দুঃখ নেই । পেশায় ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার বেণুদা নির্দিষ্ট কোনো চাকরী করেন না । এখনও পর্যন্ত আমার জানা মতে ১৬ টি চাকরী ছেড়েছেন । এখন সম্ভবতঃ ১৭ নম্বরটির জন্য রেডি হচ্ছেন । চাকরী যে নিজেই ছেড়েছেন তা ১৬টি চাকরীর বিরাট লিস্ট দেখলেই বোঝা যায় । আসলে তাঁর অনন্যসাধারণ মেধার কথা কম্পানীগুলি ভাল ভাবেই জানে । তাই চাকরী ছাড়তে তাকে বিস্তর বেগ পেতে হলেও পেতে কোনো সমস্যা হয় না । চাকরীর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মৌলিক গবেষণা মাঝে মাঝে আমরা ইন্টারনেট ও ফেসবুকের কল্যাণে জানতে পারতাম । চাকরী সূত্রে মাঝে মাঝেই ভিন রাজ্যে উধাও হয়ে যাওয়া এবং আস্তানা পাল্টানো বেণুদার স্বভাব ছিল ।

তা গেছো দাদা কোথায় আছে পদ্ধতিতে রীতিমত হজবরল নেটওয়ার্ক খাটিয়ে বের করলুম গুজরাটের ১৬ নম্বর চাকরীটিতে ইস্তফা দিয়ে বাংলায় ফিরে ইদানিং তিনি বেহালার পৈত্রিক বাড়ির বদলে আমাদের পুরাতন আনন্দক্ষেত্র, কলেজস্মৃতি বিজড়িত বেলঘড়িয়ায় একটি মেস ভাড়া করে বসবাস করছেন ।

মনের জ্বালা মেটাতে একদিন তাই বুড়ো সাধুর একটা পাঁট নিয়ে চললুম গুরুর কাছে । বেণুদা আমাকে দেখেই স্বভাবসিদ্ধ ভাবে খিস্তিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল । দুপুরে জমিয়ে শূল্যপল সহযোগে ভাত আর বুড়ো সাধুর উত্তাপ নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হল । প্রেমের অসারতা সম্পর্কে বেণুদা আমার সমস্ত সংশয় দূর করে দিল । ভেনডায়াগ্রামাদি করে এবং রীতিমত ক্যালকুলাশ কষে আমায় বুঝিয়ে দিল । প্রেম আসলে অগাণিতিক শূন্যের মতই একটা অসম্ভব বস্তু । বাংলা গল্প ও বিদেশের নানা কাহিনীর বিপথগামী নায়ক নায়িকাদের দৃষ্টান্ত ও তাঁর বক্তব্যকেই সমর্থন করল । জগতে প্রেমের আসল চরিত্র আমার কাছে একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল । বেদে যেমন বলেছে “ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা” তেমনি “অভিনয় সত্য, প্রেম মিথ্যা” এ বিষয়ে আমার আর কোনো সংশয়ই রইল না । যাক দোলাচলে দোলার চেয়ে এ একরকম ভাল হল । এখনও ভালবাসে কি ভালবাসেনা ভাবতে ভাবতে প্রাত্যহিক হোয়াটসঅ্যাপের স্টেটাস চেক আর ফেসবুক ওয়াল আঁতিপাতি করে খোঁজার চেয়ে এ সত্যোপলব্ধী অনেক ভাল ।

বেশ হৃষ্ট চিত্তে সিগারেট টানতে বারান্দায় গেছিলাম । এসে দেখলাম বেণুদা মোবাইলে কার সঙ্গে যেন খুব হাসিখুশী ভাবে কথা বলছে । ফোন রাখার পরে আমার প্রশ্নের উত্তরে নির্বিকার ভাবে বলল “তোর হবু বউদি ফোন করেছিল” ।

আমি বিস্ময়ের চোটে প্রায় সাতহাত বাঞ্জি জাম্পিং এর মত লাফ দিয়ে বললাম, “মানে ???? তুমি ই না এই মাত্র আমায় প্রমাণ করে দেখালে যে প্রেম ট্রেম সব অসার । থিওরিটিক্যালি অসম্ভব জিনিস !!! আবার সেই তুমি তুমি এখন ……”

অত্যন্ত্য বিজ্ঞ মুখ করে বেণুদা বলল “তো কি হয়েছে !!!, তুই একটা আস্ত পাঁঠা । ওটা থিয়োরী, এটা বাস্তব । ওটা যুক্তি, এটা বিশ্বাস”

***********************

দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সেই মুহুর্তে বেণুদার চুরুটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে চলে এসেছি । সেই থেকে আর বেণুদার মুখদর্শন করছিনা, মেসেজের উত্তর ও দিচ্ছিনা । বোদ্ধা লোকজনকে আজকাল যদ্দুর পারছি এড়িয়ে চলছি … হুঃ !!!

Status Single !!!

অনেকে অনেক বার নানা মুহুর্তে প্রশ্ন করেছে, স্বর বা ধরণ আলাদা হলেও
ঘুরে ফিরে অবয়ব বদলে আসা প্রশ্নটা একই, তুমি ! তুমি সিঙ্গেল ? সে কী !

আর তার পরেই অবিশ্বাসী চোখ নিয়ে সেই একই প্রশ্ন, “কিন্তু কেন !!! ??”
উত্তরটা না দিয়ে মৃদু হেসে চলে আসি রহস্য ঘেরা হাবভাব আর বোদ্ধা মুখে

আসলে সত্যি কথাটা কী করে বলি বলুন তো, আপনাদের ব্যক্তিগত ঠুলিতে
যদি পাগল কিম্বা মিথ্যেবাদী ভাবেন ? ভাবেন প্রতারক, ভন্ড কিম্বা গাঁজাখোর

তাই বার বার বলতে চাওয়া সত্যিকথাটা গিলে নিই সাবধানে, নিপুন অভিনয়ে
আমার প্রাণহীন প্রেমের লাশেরা যে আজও ঘোরে রাস্তায় অন্যকোনো সাইকেলে

জলছবি

তিন্না মেয়েটা বরাবরই বড্ড অদ্ভুত । একটা এই বয়সের টিনেজারের স্বাভাবিক লক্ষণগুলো যে তার নেই, এমনটা নয় । সেগুলোতো আছেই, তার সঙ্গে এক্সট্রা প্যাকেজ হিসেবে আছে তার অবিরাম ছেলেমানুষী । কখনও রাস্তার মাঝখানেই বাচ্ছাদের মত লাফালাফি শুরু করে দেয়, পাগলের মত উচ্চস্বরে হেসে ওঠে রাস্তার লোকের তীর্যক বা ভ্যাবলা দৃষ্টির তোয়াক্কা না করেই । কখনও কোনো পাঁচিলের ওপর দুপুরের আলস্যে শুয়ে থাকা বেড়ালকে তুলে নিয়ে চটকে আদর করে সে কী কান্ড ! অবস্থা এমন যে ওর কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময়টাতে পথের দু ধারের যত বেড়াল ওর নাগালের বাইরে কারুর বাড়ির ছাদ বা কার্ণীশে উঠে বসে থাকে । এতটাই ছেলেমানুষ যে গোয়াল টাইপ কোচিং ক্লাসে চারদিকের চব্বিশ জোড়া বয়সের ধর্মে নীম্নগামী চোখের অস্তিত্ব বেমালুম বেখেয়াল করে স্কার্টের অসুবিধাজনক অবস্থানে বিন্যস্ত্য হয়ে যাওয়াকে কেয়ার ই করেনা । সেটা অবশ্য ওর পক্ষে খুব একটা দোষের নয়, ভাবেন অনামিত্র বাবু । ওর জন্মের বছর দুয়েক আগে থেকেই তো তিনি আর আইটি কোম্পানিতে কর্মরতা তাঁর স্ত্রী স্টেটসে চলে যান কোম্পানির ট্রান্সফারে । তিন্নার শৈশব আর কৈশোরের বেশ কিছুটা তো ওদেশেই ।

সে যাই হোক এই ছেলেমানুষির জন্যই কি তিন্না আজ এরকম একটা ভুল নেশায় মজেছে ? প্রতিদিন কলেজ ছুটির পর ঐ আধবুড়ো লোকটার বাড়ি কিসের জন্য যায় ও ? এমন কী কলেজ যেদিন থাকেনা সেদিনও বন্ধুদের সঙ্গে হ্যাং আউটে যাওয়ার নাম করে ঐ রকম নির্জন একটা বাড়িতে লোকটার সঙ্গে কী করে ও ? কী যে করে সেটা বিলক্ষণ আন্দাজ করতে পারছেন অনামিত্র বাবু । ইদানিং ওর মন বেশ খুশী খুশী থাকছে । ওর চিরকালীন সেই মুড সুইঙ্গের সমস্যাটাও আজকাল নেই বললেই চলে । এসব কিসের লক্ষণ তা ভালোই বুঝতে পারা যাচ্ছে । নাঃ ব্যাপারটা কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবেনা ।

প্রতিপত্তির জোড়ে হয়না এরকম কাজ খুব কমই আছে । অনামিত্র বড় কোম্পানীর ম্যানেজার এখন । তিনটে ফ্ল্যাট, অনেকগুলো গাড়ি । পকেট থেকে আই ফোনটা বার করলেন, “হ্যালো, বিধান নগর থা…”

রাত্রের মেনুতে আজ একটা স্পেশাল জিনিস রয়েছে । অনেক দিন পর তিহান নিজের হাতে কুকীস বানিয়েছে । অফিসের প্রেসারে আজকাল নিজের হাতে তো ওর কিছু বানানোই হয়ে ওঠেনা । আজ বোধ হয় অফিস থেকে একটু আগে ফিরেছে, কাজের মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে এইসব বানিয়েছে ।

ক্রীম কালারের মাঝে চকলেটের ডোরা দেওয়া বিভিন্ন আকারের কুকী । কোনোটা মাছের মত, কোনোটা স্টার কয়েকটা হার্ট শেপ বানাতে গেছিলো কিন্তু বেশী পাতলা হওয়ায় ভেঙ্গে গেছে । তিন্না মায়ের তৈরি কুকি খেয়ে ভীষণ এক্সাইটেড । মেয়েটাও মায়ের মতই খেতে ভালবাসে, বড্ড মিল সবকিছুতেই মায়ের সঙ্গে, এমনকি মা – মেয়ের গজদাঁতগুলোও একদম অবিকল ।
তিন্না মা কে বলছে “মম তোমার কাল ছুটি আছে না ? কাল তোমায় আমার এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে মিট করাবো, দারুণ কেক বানায়” । মেয়েটা মায়ের ন্যাওটা বড্ড বেশী । আসলে কাজের প্রেসারে দুজনের কেউই খুব বেশী সময় মেয়েকে দিতে পারেন না । হয়ত মেয়েটার সেই একাকিত্বের সুযোগ টা নিয়েই ঐ আধবুড়ো স্কাউন্ড্রেল পারভার্টটা … । ভাগ্যিস সেদিন ঐ রাস্তায় একটা কাজ সেরে পার্কিং থেকে গাড়িটা বেরোতে গিয়ে ব্যাপারটা হঠাত করেই চোখে পড়ে যায় সাম্যর, ঐ তো এতবড় ডিজাস্টারের খবর টা দেয় অনামিত্রকে । সাম্য তিহানের কলেজ ফ্রেন্ড । সত্যিই ফ্রেন্ডের কাজ করেছে ও ।

সাপার সেরে উঠে অনেক খরচা করে বানানো ব্যক্তিগত সেলরটার দিকে যাচ্ছিল অনামিত্র । এমন সময় ফোন বেজে উঠল,

“হ্যাঁ স্যার হ্যালো, কড়কে দিয়েছি স্যার আচ্ছা করে । আর কোনো লাফড়া করার সাহস পাবেনা”

“হ্যাঁ স্যার একদম, কিচ্ছু চিন্তা করবেন না । আমরা তো স্যার আপনাদের সেবাতেই আছি, আর স্যার ইয়ে …”

“মানে প্যাকেটটা একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবেন হেঁ হেঁ”

ফোনটা কেটে মুচকী হাসে অনামিত্র । সেলারটা খুলে ব্ল্যাকডগের কর্কটা খুলে পাঞ্চ করতে থাকে গভীর প্রশান্তিতে …

* * * * * *

কালকে রাত্রে ঝামেলাটা মিটে গেলেও অনামিত্রর নিজের একবার দেখে আসার ইচ্ছা করছে । কে এমন সে লোক যার জন্য তিন্নার মত মেয়ে হাবুডুবু খায় !!! বেলার দিকে সেক্রেটারিকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে গাড়িটা নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়ল অনামিত্র ।

বাব্বাঃ ! বাড়ীটা তো বেশ এলিগ্যান্ট ! যদিও বেশ পুরোনো । বোঝাই যাচ্ছে মেন্টেনেন্স হয়নি বহুদিন । লোকটা এই বাড়িটায় একলা থাকে ! এখানেই আসে তিন্না প্রতিদিন ! কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল অনামিত্রর মনে । লোকটাকে একবার দেখলে হয় । পরিচয় না দিলেই চলবে । গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকে কলিং বেলের সুইচ টিপল অনামিত্র । কোনো আওয়াজ নেই । নেই নাকি ব্যাটা বাড়িতে ? নাকি কাল কড়কানী খেয়ে কেটে পড়েছে ? দরজায় নক করে দেখবে ? নক করতে যেতেই হাতের চাপে দরজাটা সড়ে গেল । আসলে আটকানোই ছিল না ওটা ।

কিসের এক অদম্য আকর্ষণে সাত পাঁচ না ভেবেই বাড়ির ভিতরে ঢুকল অনামিত্র ।

এ কী ! গোটা দেওয়ালে টাঙ্গানো অসংখ্য হাতে আঁকা ছবি । লোকটা আর্টিস্ট নাকি ! ছবির মধ্যে অধিকাংশ ছবি আবার তিন্নার । নাহ একদম ঠিক ঠাক তাহলে আন্দাজটা । ঘরটা অসম্ভব অগোছালো আর ড্যাম্প । এতটাই খারাপ অবস্থা যে ছবিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ১৫ – ২০ বছরের পুরোনো । কয়েকটা ছবিতে আবার তিন্নার পাশে একটা ছেলেকে দেখা যাচ্ছে । এটা যদি ঐ লোকটার নিজের ছবি হয়, তাহলে ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত, কারণ ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে তিন্নারই বয়সী । কেস টা কী !!! অবশ্য মানুষের শখ তো অনেক কিছুই হয় । ছবিতে নিজেকে কমবয়সী করে আঁকা অস্বাভাবিক কিছু নয় । আরে !!!

পায়ে হোঁচট খেয়ে চমকে নীচের দিকে তাকালেন অনামিত্র, এতক্ষণ দেওয়ালের ছবি দেখতে দেখতে খেয়াল করেন নি নীচেটা । নীচে পড়ে আছে একটা আধবুড়ো লোক । গালে জমাটবাঁধা রক্তের দাগ । চোখের তলায় কালশীটে । শরীর বরফের মত ঠান্ডা । জমে কাঠ । মুখ থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত কালো হয়ে জমে আছে মেঝেতে । সম্ভবতঃ কাল রাত্রেই ।

হঠাত করেই বাইরে তিন্নার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল । কিংকর্তব্যবিমূঢ় অনামিত্রর কিছু ঠিক করতে পেরে ওঠার আগেই দরজা ঠেলে মা কে নিয়ে ঘরে ঢুকল তিন্না । বাপি কে দেখে অবাক হওয়াটা আটকে গেল নীচে পড়ে থাকা লাশটা দেখে । প্রচন্ড এক চীৎকার করে মায়ের বুকে মাথা গুঁজল তিন্না ।

পাথরের মত নিশ্চল তিহান তখন এক দৃষ্টে চেয়ে আছে লাশটার দিকে । ঘরে অনামিত্রর উপস্থিতি যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে তার নিষ্পন্দ চোখের তারায় ।

অভিজ্ঞ ম্যানেজার অনামিত্রর ধাতস্ত হতে কয়েক সেকেন্ডের বেশী লাগল না । কিন্তু চোখ আটকে গেল এক কোণে রাখা ইজেলে আটকানো একটা অসমাপ্ত ছবিতে । ধবধবে সাদা কাগজে কালো পেন দিয়ে আঁকা তিন্না আর আধবুড়ো লোকটার ছবি । নাঃ বয়স কমানো নেই । নীচে লেখা আছে “জন্মদিনে আমার পাতানো মামণীকে অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা”

লেখার নীচে সইটা বোধ হয় আর করা হয়ে ওঠেনি বাইশ বছর আগে রঙিন প্রেমে মশগুল তিহানের সঙ্গে একটা সুখী সংসার, একটা ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্ন দেখা লোকটার ।

যাদবপুর প্রসঙ্গে

আমার অবস্থান ও ব্যক্তিগত মতামত খুবই স্পষ্ট ।

যাদবপুরের ভিসি অনৈতিক ভাবে পুলিশ এনে ছাত্র-ছাত্রীদের (যাদবপুর ও অন্যান্য শিক্ষায়তনের) উপর ঠ্যাঙারেবৃত্তি চালিয়েছিলেন । তার জন্য যাদবপুর তথা বিভিন্ন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদ করেছিল অনমনীয় মনোভাব নিয়ে । ভিসির পদত্যাগের দাবী সফল হয়েছে । সবাই এ ব্যাপারে উল্লাসিত ।

ব্যাক্তিগত ভাবে এই আন্দোলন আমার চোখে ডায়রিতে নোট করার মত কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয় । নোট করার মত ব্যাপার শুধু ঐ ছাত্রছাত্রীদের একগুঁয়ে অনমনীয় মানসিকতা । যেটা দল-মত-বয়স-বৃত্তি নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধা করার মত । বাকী সাফল্য ব্যর্থতার হিসেব আমার কাছে স্পষ্টতই অর্থহীন ।

ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস সুপ্রাচীন । শুধু ভারতের মাটিতে বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সিংহভাগই ছিলেন অল্পবয়স্ক কিশোর ও যুবা ছাত্রদল । তাঁরা মিছিল করেছেন, পিকেটিং করেছেন, গুলি খেয়েছেন, পুলিশের বেদম মার খেয়েছেন, জেলে গেছেন, বীরমদে ভরপুর হয়ে দেশমাতৃকার নাম করতে করতে ফাঁসিতে ঝুলেছেন ।

এছাড়াও বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন দেশে ৬০ থেকে ৮০ এর দশকে একের পর এক ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে । ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকার এস.ডি.এস. বা স্টুডেন্টস ডেমোক্র্যাটিক সোসাইটি এই যাদবপুরের মতই বিশাল এক উন্মাদনা তৈরী করেছিল ছাত্র মননে । তাদের সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হত তুলে ধরা মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি । অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে তারা অচল করে দিয়েছিল আমেরিকার জনজীবন । এদেরই অহিংসায় অবিশ্বাসী কিছু নেতৃত্ত্ব বেরিয়ে গিয়ে তৈরী করেছিল “ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড” যারা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দপ্তর বিষ্ফোরণের মাধ্যমে ধংস করতে শুরু করেছিল ৭০ এর দশকে । এছাড়াও সে সময়ে চীন, জাপান সহ বহুদেশে রাষ্ট্রীয় দূর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্র আন্দোলন চলেছিল জোর কদমে । একই সময়ে কলকাতা সহ বঙ্গে নকশাল আন্দোলন দ্রষ্টব্য ।

কিন্তু এই বিপ্লবের নীটফল কী ? আমার মতে বিপ্লবের নীটফল শূণ্য না হলেও ১০০ এর মধ্যে ২ বা ৩ এর বেশী নয় । সরকারের প্রবল ক্ষমতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটনীতির সঙ্গে কোনো দিনই শুধু কিছু স্বপ্নিল চোখের ছাত্ররা পেরে ওঠেনি পারবে ও না ।

এস.ডি.এস. বিপ্লব শুরু করার দীর্ঘ ৬ বছর পর আমেরিকা সরকার ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করার  ঘোষণা করে, ততদিনে ভিয়েতনামে গুঁড়ো করার মত বাড়িই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর । ছাত্রসংগঠনের জয়োল্লাস শুরু হয় । কিন্তু তার পরেই কোথায় যেন হারিয়ে যায় এই সংগঠন । কারণ ঐ যে, ভুল প্রাথমিক লক্ষ্য স্থির করে তাতেই সমস্ত ফোকাস কেন্দ্রীভূত করেছিল তারা । তাদের দাবী হওয়া উচিত ছিল রাষ্ট্রের আগ্রাসন ও দূর্নীতিকে টার্গেট করা, সেটা না করে তারা লক্ষ্য বানিয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধকে । তার উপরেই সমস্ত প্রচার কর্মসূচী চালিয়েছিল । তাই সেটা পূরণ হতেই সংগঠনের আর কোন যৌক্তিকতাই থাকল না । বিপ্লবী ছাত্ররা “বাঃ কী এক খানা বিপ্লব জিতলুম রে” ভেবে হৃষ্টচিত্তে বাড়ি গিয়ে সংসার ধর্মে মন দিল এবং বিপ্লবের স্মৃতিচারণ করে বই-টই লিখতে থাকল ।

ঠিক এই ভাবেই রাষ্ট্র চিরকাল ছাত্রদের সামনে “ফলস গোল” ক্রিয়েট করেছে নিজের প্রয়োজনে । প্রকৃত বিপ্লবী ছাত্রদের সংগ্রামী সত্ত্বাকে রাষ্ট্রনায়করা নষ্ট করেছে তাদের কৃত্রিম অযৌক্তিক লক্ষ্যের অযাচিত পূরণে, নিজেদের মহান প্রমান করেছে জনমানসে । অপমৃত্যু হয়েছে বিপ্লবের ।

ভিসি সরল কি থাকল তাতে কী এসে যায় ? শ্লীলতাহানী ঘটা ছাত্রিটির অপমানকারীরা শাস্তি পায় ? তার মুখে পারিবারিক মদতে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সেলোটেপটা খুলে যায় ? নাকি নির্দোষ ছাত্রদের উপরে আর কখনও বর্বর ভাবে লাঠিচার্জ হবেনা তার গ্যারান্টী পাওয়া যায় ? শুধু বিপ্লব করলে আজকের দিনেও যে জয় পাওয়া যায় (সেটার যৌক্তিকতা যতটাই হোক না কেন) তার একটা প্রতীকী উদাহরণ পাওয়া যায় ভবিষ্যতে প্রচারের কাজে ব্যবহার করার জন্য । লোকের মনে আশা জাগানোর জন্য ।

বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রবৃন্দ বলছেন যে আন্দোলনের রাস্তা সুদূর প্রসারী । কিন্তু অনুগামী মাস, বা কলেজ নির্বিশেষে ছাত্রবৃন্দ কী চলতে প্রস্তুত ? আসলে যত কিছুই হোক ছাত্র আন্দোলন কার্যকারী হওয়া কঠীন । কারণ টা আগেই বলেছি । একা ছাত্রদের পক্ষে সম্ভব নয় শুধু আবেগ সম্বল করে কূটীল রাষ্ট্রযন্ত্রকে মোকাবিলা করা । সঠিক ফলদায়ী আন্দোলন সম্ভব সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে । তাদের বাঁকা শিরদাঁড়াটা সোজা করার মাধ্যমে । প্রয়োজনে সহিংস শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে ।

আসলে আমাদের আমজনতার মাথায় ছোটবেলা থেকেই একটা কথা গেঁথে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম (পড়ুন আগ্রাসন / সন্ত্রাস) ছাড়া আর বাকী সবকিছুই জঙ্গিবৃত্তি । তাই সাধারণ মানুষ সহজে সেই পথে হাঁটতে চায় না । যাদবপুরের ছেলে মেয়েগুলোকে দেখে যদি এদের ধারণার পরিবর্তন হয় । শিরায় শিরায় বিপ্লবের অনুভুতি সংক্রামিত হয় । যাদবপুরের মতই নিজেদের ইস্যু নিয়ে নিজেরাই অনমনীয় ভাবে সংগ্রাম করতে পারে আর আস্তে আস্তে জিগস পাজেলের মত বিপ্লব জুড়তে থাকে হাতে হাত আর চেতনার একাত্মতায় তবেই সার্থক হয়ে উঠবে যাদবপুরের আন্দোলন বা বিজয়োৎসবের ছবিটা ।

আবহাওয়াবীদেরা জেগে আছে

একদা পথের দুই ধার মুকুলিত হইয়াছিল বিচিত্র গুল্মের পুষ্পে । কিন্তু কিয়দ্দূর চলিবার পরেই পথচারীর বোধগম্য হইল যে উহা প্রকৃতপক্ষে কৃত্রিম ও চিত্তবিভ্রমের জন্য রচিত । বুঝিয়া প্রকৃতিস্থ হইতেই পথচারীর উপলব্ধী হইল পুষ্পশোভিত বংশদন্ডযুগলকে বিমুগ্ধ নয়নে দেখিবার অবকাশে তাহার পকেটস্থিত কষ্টসঞ্চিত যৎসামান্য অর্থ নিপুণ মস্তিষ্কে কেহ হরণ করিয়াছে । মুকুলিত পথপার্শ্বের আশারূপিনী মদনবাণের উদ্দেশ্য ও স্বীয় ধনহরণের মধ্যবর্তী সমীকরণ উপলব্ধী হইবামাত্র পথচারী সবিস্ময়ে সম্মুখে এক ভীসণাসুরের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ্য করিল । তার বিভিষিকাময় রূপ প্রত্যক্ষ্য করিয়া অর্থশোক বিস্মৃত হইয়া প্রাথমিক ভীত ও পরবর্তিতে ইহার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলিবার প্রচেষ্টায় রত হইল । ভীষণ সংগ্রামের মাঝে কালের অমোঘ অঙ্গুলীহেলনে যখন মদনবানের তেজ ফুরাইয়া গেল, মুকুল ঝড়িয়া গেল, পথীপার্শ্বের সজ্জিত পুষ্পযুগলের দীর্ণ কীটদংষ্ট রূপ সবাকার সম্মুখে উন্মোচিত হইয়া গেল তখন উপায়ন্তরশূণ্য হইয়া অকস্মাত আশাদেবী বিনা সংবাদে আবির্ভূতা হইলেন ও তাঁহার জ্যোতিতে ত্রিলোক আলোকিত করিয়া অসুরবধ করিলেন । পথচারীগণ ভক্তিগদগদ চিত্তে দেবীর জয়ধ্বনী করিতে লাগিল । পথিপার্শ্বের পুষ্পসজ্জা পুনরায় স্থাপিত হইল । পথচারীরা চারণগীতি ছাড়িয়া ভক্তিবণত চিত্তে দেবী বন্দনা করিতে করিতে অগ্রসর হইয়া চলিল বহুকালের অপরিবর্তীত রাস্তা ধরে ।

পিছনে পড়িয়া রহিল বিশাল অসুরের শব । কালে যাহার উপর মাইল ফলক স্থাপিত হইবে । স্মারকে লিখিত থাকিবে দেবীর আশীর্বাদে মানবকূলের অসুর জয়ের বীরগাথা । শুধু লিখিত থাকিবেনা সেই অজ্ঞাত তথ্যগুলি যা আবহাওয়াবীদ গণের দিনলীপিতে লিখিত হইবে । লিখিত থাকিবেনা অসুরের প্রকৃত স্বরূপ, লিখিত থাকিবেনা উহা প্রকৃতপক্ষে একটি দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রমানব ছিল । লিখিত থাকিবেনা উহার নিয়ন্ত্রক সুইচটি ছিল দেবীর হস্তের আয়ুধে লুক্কায়িত । শুধু উদ্দাম হাওয়া বহিবে দিকশূন্যপুরে আর মৃদুস্বরে উপহাস করিয়া চলিবে বিজয়োৎসবে মগ্ন পথচারীদিগকে, দ্বিতীয়বার বিভ্রান্ত হইবার নির্বুদ্ধিতাকে …

*********************************************

বোমাটা ফাটতে পারে যেকোনো সময়ে, ফাটাতে পারে যে কেউ … আবহাওয়াবীদেরা জেগে আছে ।

ছিনাথের ল্যাজ

মাঝে মাঝে নতুন জামা পরেনিতে ইচ্ছা করে সবার আড়ালে কোনো গলি ঘুঁজিতে
লাল নীল সবুজ, আলখাল্লা বা কুর্তায়, পাগরী কিম্বা ফেজ কখনওবা দাড়ি কখনও
শুধুই কামানো মাথা বা হাতে কড়া, না না, সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কথা বলতে বসিনি
এটা একান্তই ব্যক্তিগত শখ বা ভণিতা, বহুরূপী জন্মগত কেউ, কেউ শুধু নির্মল
শখে, কারুর নিষ্ফল আক্রোশে নিজের বোকামির লজ্জা ঢাকতে ছিনাথের ল্যাজ
কাটা যায়, পৌরুষের ফিনাইল গন্ধী ঘরের দেওয়াল আলো করে ঝোলে স্টাফড
ট্রোফির মাথা দাঁত বের করা, চোখে বোকা বোকা মার্বেল গোঁজা, আমারও ইচ্ছা
করে তোমার ঘরে তোমার অতীত কৃতিত্ত্বের সাক্ষি হয়ে ঝুলে তোমায় বিকৃত মুখে
অনন্তকাল দাঁত খিঁচোতে, তোমার শেষজীবনের বিকারে জীবন্ত হওয়া দুঃস্বপ্ন হতে

ছিনাথেরা তোমার মত পবিত্রতায় বিশেষ সময়ের তৃষ্ণায় শরীরের গোপন অংশের
আবরণ খুলেদিতে পারেনা অন্ধকার ঘরের মুষ্টিমেয় দেনাপাওনার হিসেবের আসরে
ছিনাথের শরীরের সঙ্গে যে মিশে যায় ওর সাজের চামড়া, কখনও বাঘ, কখনও
ফকির, কখনও রাজা, ছিনাথেরা রাজপথে পথে ঘোরে হাতের বাটিতে কাগজ পিন
ছিনাথেরা খোলা বাজারে আবরণ খুলে নগ্ন হতে জানে, তোমাদের বিদ্রুপের সামনে

মুক্তমনা অনলাইন পত্রিকার সুমিত দেবনাথ বাবু সমীপেষু

মুক্তমনা নামের একটি অনলাইন ম্যাগাজিন আছে সেখানে শ্রীযুক্ত সুমিত দেবনাথ এই অদ্ভুত এবং ইন্টারেস্টিং পোস্টটি করেছেন —– অলৌকিক পুরুষ রামকৃষ্ণ

আমি এর উত্তরে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম —-

হে অশেষ জ্ঞানী লেখক আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন আপনার এই নির্ভিক সত্যবাদীতার জন্য । যেকোনো যুক্তিবাদী বিচার হওয়া উচিত পক্ষপাত শূণ্য । আপনি লেখাটির শেষে আপনার লেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে পাঠক গণকে জানিয়ে দিয়েছেন যে আপনার মূল উদ্দেশ্য সেই ডক্টরেটধারী ব্যক্তিটির উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা । এতেই বোঝাযায় আপনার লেখায় যুক্তিবাদের বিশুদ্ধতা কতটা । যাই হোক এমন অকপট ভাবে নিজের যুক্তিবাদের স্বরূপ উন্মুক্ত করাটা যদি আপনার স্বভাবতঃ নির্বুদ্ধিতা না হয় তাহলে বলতেই হবে আপনার সাহস আছে নিজের উলঙ্গ প্রতিহিংসাপরায়ণতাকে সোজা সাপটা ভাবে স্বীকার করার ।

প্রথমতঃ বলি আমার মনে হয় কোনো কিছু সম্বন্ধে কিছু বলা বা লেখার আগে সেই বিষয়টি সম্বন্ধে ভাল ভাবে পড়াশোনা না করে কোনো মন্তব্য করা যুক্তিবাদের পর্যায়ে মনে হয় পড়েনা, মুক্তমনের পর্যায়ে তো নয়ই । এই লেখাটি লেখার আগে শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধিয় অস্বীকৃত কোনো ভুলভাল বই না পড়ে কথামৃত, স্বামীজীর পত্রাবলী জাতীয় প্রামাণ্য গ্রন্থ গুলি পড়া উচিত ছিল বলে আমার মনে হয় । দ্বিতীয়তঃ অলৌকিকতা ও তার উপায়গুলি সম্বন্ধে যথাযথ পড়াশুনা করা দরকার ছিল ।

আমি উপরিউক্ত বই গুলি মন দিয়ে পড়েছি বলেই আমার বিশ্বাস এবং আমি একজন যাদুকর, তাই অলৌকিকতার ঘাঁচ-ঘোঁচ গুলো মোটামুটি আমার চেনা । এই বকলমেই আমার কিছু বলার আছে, ভাল ভাবে পড়ে বুঝে প্রকৃত যুক্তির সঙ্গে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন । অবশ্য যদি উত্তর দেওয়ার মত মানসিকতা আপনার থাকে ।

শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের যেটুকু কথা জানা যায় তার মধ্যে ভক্তদের ভক্তিরসাপ্লুত আরোপিত ঘটনাগুলি বাদ দিলে এবং একই গাছের ডালে দু রঙের ফুলের ঘটনাটি ছাড়া আর কোন ঘটনাকে মঞ্চোপযোগী যাদু বা হস্তলাঘব বলে ব্যাখ্যা করা যায় ??? প্রামাণ্য গ্রন্থগুলি পড়লে জানতে পারবেন স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব বার বার অলৌকিকতা বা সিদ্ধাইকে ঈশ্বরলাভের অন্তরায় বলে প্রচার করেছেন ।

ভক্তরা তাঁর সম্বন্ধে কি কি অলৌকিকতা আরোপ করেছে সেজন্য তাঁর বিরুদ্ধে আপনি কলম তুলছেন এবং তাঁর মায়ের চরিত্র সম্বন্ধে কটু মন্তব্য করছেন । এখন আপনার এই লেখাটি পড়ে যদি অন্য ধর্মের কোনো বন্ধু সমস্ত হিন্দুধর্মের মানুষদের প্রতি আঙ্গুল তোলেন এবং আপনার মায়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাহলে সেটার যুক্তিযুক্ততা যতটুকু, আপনার লেখার যৌক্তিকতাও ঠিক ততটাই ।

আপনি পৈতে খুলে রাখা ও পরার দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন । খুব ভাল কথা । আশা করব আপনি নিজে দ্বিচারিতামুক্ত । তাই যদি হয় তাহলে এই কথা গুলো শুধু এই অনলাইন ব্লগের নিরাপদ আশ্রয়ে না বলে ঐ বিরিঞ্চি বা সাঁই দের জনসভাতেও গিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলতে পারতেন । পেরেছেন কি ???  পারেন নি কারণ আপনি ভাল করেই জানেন যে ওখানে বললে ভক্তের দল আপনাকে ততক্ষণাত কবরে পাঠাবার ব্যবস্থা করত । মানুষকে দ্বিচারিতা করতে হয় অবস্থা বিশেষে । অবতারের ও ক্ষিদে পায়, ঘুম পায়, শরীর খারাপ হয় । কারণ মানুষের মনটা অবতার বা দেবসুলভ হতে পারে, শরীরটা নয় ।

রামকৃষ্ণ বাঙলার ধর্মবিপ্লবের গতি রুদ্ধ করেননি বরং তাকে ডায়নামিক রূপ দিয়েছিলেন । ব্রাহ্ম ধর্ম সম্বন্ধে লেখার আগে আপনার ব্রাহ্ম ধর্মকে জানা উচিত ছিল সঠিক ভাবে । ব্রাহ্ম ধর্ম ব্রহ্ম বা একেশ্বরবাদের কথা বলে যা আদি বৈদিক ঈশ্বরচেতনার সঙ্গে সমগোত্রিয় । শ্রীরামকৃষ্ণ কখনই একে মিথ্যে বলেননি বা হেয়জ্ঞান করেন নি । গীতার সর্বধর্ম পরিত্যাজ্য মামেকং স্মরণং ভজ বা অন্যান্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থে দাবী করা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের বদলে তিনি শুনিয়েছেন পরিমার্জিত ডায়নামিক এক ধর্মের বাণী, “যত মত, তত পথ” এবং তার স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দিয়েছেন । এই মতবাদ প্রকৃতপক্ষেই ইউনিভার্সাল হিউম্যানিসম । পূর্বে সুফি সাধকরা এবং সম্রাট আকবর এই ধরণের মতবাদ প্রচারের চেষ্টা করলেও সাধারণের কাছে এর মর্মোপলব্ধী দূর্বোধ্য হওয়ায় তা হালে পাণি পায় নি । শ্রীরামকৃষ্ণ এটাকে সর্বসাধারণের বোঝার মত করে প্রচার করায় এই মত সাধারণ মানুষ গ্রহণ করতে পেরেছিল সহজেই । একে কি ধর্মবিপ্লব বলব না ?

ব্রাহ্ম ধর্ম সাধারণের কাছে স্বীকৃতি পাওয়া এমনিতেই কঠীন ছিল । কিছু উচ্চশিক্ষিতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই ধর্ম । সাধারণ মানুষ এই ধর্মের ব্রহ্মের বিশালত্বের ধারণা নিতে পারেনি । উদাহরণ স্বরূপ বলি সিলিকন ভ্যালীতে কর্মরত আল্ট্রামর্ডান কোনো প্রবাসী ভারতীয়কে যদি এই শ্লোক টি বোঝাতে যাই সে প্রথাগত ভাবে সহজে বুঝতে পারবে কী ?

বাসাংসী জীর্ণাণী যথা বিহায়, নবানী গৃহ্নাতি নরোহপরাণী
তথা শরীরাণী যথা বিহায় জীর্ণানন্যানী, সংযাতি নবানি দেহি ।।

কিন্তু তাকে যদি এই ভাবে শ্লোকটির অনুবাদ করে দিই তাহলে তার পক্ষে বোঝা সহজ হবে —

When All the memories are full …No more place is left to use in the temp folders ….The system reboots to clearup the memories and to start a new session …But that reboot doesn’t mean the termination of the system ….Only running processes are killed temporarily ..

ঠিক একই কাজটি করেছিলেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব । ধর্মের সূক্ষতম ধারণাটিকে চলতি কথায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলেছিলেন । কোটী টাকা খরচা করে যজ্ঞ করতে বলেন নি । মানসপূজা করতে বলেছিলেন ।

এবারে আসি মানবদরদীতার কথায় । আচ্ছা আপনি এই লেখাটা লিখেছেন কেন ??? মানুষের যুক্তিবোধ জাগরণের জন্য ? তা এখানে কেন ? আপনার এই লেখায় ধর্মধ্বজীদের তো একটা চুল ও ছেঁড়া যাবেনা, যান না ফিল্ডে গিয়ে ধর্ম সভা গুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বলুন, “সব ঝুঠা হ্যায়” । আপনি বলবেন অল্প অল্প করে মানুষ জাগবে, আপনার এই লেখা পড়ে অন্য কেউ লিখবে, সেটা পড়ে অন্যকেউ । ঠিক এই ভাবে ভাবুন শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন একটা সিম্বল । একটা ট্রাবলশুটিং গাইড । সারা জীবনটাই তিনি ছোটো ছোটো করে তাঁর শিষ্যদের ভবিষ্যত কর্মপন্থার উপদেশ হাতে কলমে দিয়ে গেছেন ।

মিশনের বাইরে থেকে ওই সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতিকের খিল্লি উড়িয়ে চলে না এসে মিশনের কাজ সম্পর্কে জানুন । দরিদ্রনারায়ণের সেবায় অংশ নিয়ে দেখুন অলৌকিকতা নয় ভগবানের কোন সন্ধান শ্রীরামকৃষ্ণ দিয়ে গেছেন । দোরে দোরে ঘুরে জমা করা কিছু জামা কাপড়, আপনার তথাকথিত “কুসংস্কারী” রামকৃষ্ণভক্তদের সাধ্য মত দান করা কম্বলের বিশাল বিশাল বস্তা কাঁধে নিয়ে যখন শীতের ভোরে কিছু দুরন্ত দামাল ছেলে কোনো কিছুর লোভে নয় জাস্ট এমনি ই কণকণে ঠান্ডা নদী হেঁটে পেরোয়, তখন তাদের মধ্যে থেকে বোঝার চেষ্টা করুন ঠিক কোন ভগবানের সন্ধান শ্রীরামকৃষ্ণ দিয়ে গেছেন । সারাদিন ভাগারের ময়লা ঘাঁটা কচি কচি ছেলে-মেয়ে গুলোকে যখন বিকেলের পড়ন্ত বেলায় নিয়ে এসে পড়ানো লেখানো গান শেখানো ছবি আঁকানোর মধ্যে দিয়ে জীবনের মূল স্রোতটা চেনানোর চেষ্টা হয়, আর তাদের রাত্রের খাবার পরিবেশন করতে, তাদের এঁটো বাসন ধুতে  নিয়মিত আসে নামী শিল্পপতিরা, তাদের মধ্যে থেকে বুঝুন ঠিক কোন আদর্শের সূচনা সেদিন মথুরবাবুর সামনে করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ।

সেদিন ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ একটা গ্রামের কিছু মানুষকে কয়েকটা কাপড় দেওয়া আর একবেলার জন্য পেটপুরে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন । আজ তাঁর নির্দেশিত ভাবধারায় স্বামীজীর সৃষ্টি রামকৃষ্ণ মিশন হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে জীবনের মূল স্রোতে ফেরাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বছরের পর বছর । সেদিন তাঁর কথায় নাগ মহাশয় ব্যবসায়িক ডাক্তারীর সমস্ত কিছু গঙ্গায় বিসর্জন দিয়েছিলেন, আজ যখন চারিদিক সুবিধাবাদী অর্থপিশাচ ডাক্তারে ভরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, তখন খোঁজ নিয়ে দেখুন প্রতি বছর শয়ে শয়ে বড় বড় ডাক্তার কেউ সব ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়ে কেউ বা আবার সংসারে থেকেই বিনামূল্যে রামকৃষ্ণ মিশনের স্বাস্থকেন্দ্রগুলিতে নিরলস সেবা দিয়ে চলেছেন ।

মশাই এগুলো আপনার এদিক ওদিক থেকে শোনা বা কোনো বিশেষ একটি দেশের প্রভাবশালী ধর্মের বাহবা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কল্পিত তথ্য নয় । একদম নিজের চক্ষু-কর্ণের অভিজ্ঞতা। প্রমাণ চাইলে দিতে পারি । তাই বলছি বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণকে যা খুশী গালাগালি দিন না বারণ করবনা । কিন্তু তাঁদের অবদান বা কাজের সম্বন্ধে না জেনে অকারণে কালীমালিপ্ত করার চেষ্টা করলে সেটা যুক্তিবাদী সাজার ভন্ড প্রচেষ্টা বা ইচ্ছাকৃত ভাবে আপনার নির্দিষ্ট স্বার্থসিদ্ধির (সম্ভবতঃ কোনো একটি ধর্মের লোকের চোখে হিরো সাজার) প্রচেষ্টা বলেই ধরে নেব ।

পরিশেষে বলি ইন্টারনেটে লেখালিখি করছেন । তা সে লেখা যতই অযৌক্তিক, স্বার্থগন্ধযুক্ত এবং “বাল”খিল্য হোক না কেন । গুগলের সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচয় আছে । ওখানে গিয়ে প্লাসিবো শব্দটির অর্থ সার্চ করুন । ওটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেটা যুক্তিবাদী মননে কোনোভাবেই গৃহিত হওয়ার কথা নয় । কিন্তু মজার ব্যাপার হল ওটি এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত একটি অত্যন্ত কার্যকারী চিকিৎসা পদ্ধতী । প্রায় সমস্ত হাসপাতাল বা ক্লিনিকেই সময়ে সময়ে এর প্রয়োগ করা হয় । শিবজ্ঞানে জীবসেবার বা রামকৃষ্ণ মিশনের মূল মোটো “আত্মনোমোক্ষার্থং  জগদ্ধিতায় চ” আদর্শ প্রচারে শ্রীরামকৃষ্ণ যদি অলৌকিকতার ব্যবহার করেও থাকেন তাহলে জানবেন সেই সময়ের আচারসর্বস্ব ধর্মের রমরমা ভরা সমাজে এই প্লাসিবো বা মিসডায়রেক্সনের প্রয়োজন ছিল ।

নমস্কার

Screenshot (255) Screenshot (256) Screenshot (257) Screenshot (258) Screenshot (259) Screenshot (250) Screenshot (251) Screenshot (252) Screenshot (253)

সুখের বড়ি

আজ শরীরটা ভাল নেই, বর তাই জোড় করে অফিস যেতে দেয় নি । একলা দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আইপ্যাডটায় হিজিবিজি করছিল তিতান, ফেসবুক, বিয়ের ছবিগুলো, শিমলায় হানিমুনের ভিডিও গুলো, আরও কত কী । ইনবক্সে পুরোনো মেইলগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে কিছু ছবি, মন কেমন করা মেসেজ হিস্ট্রি । তাড়াতাড়ি উইন্ডোটা ক্লোজ করে দেয় তিতান । ওসব অল্পবয়সের অপরিণত ভুলের কথা ভেবে নিজের ওপর রাগ করতে ভাল লাগছেনা তার ।

একটা শ্যাওলা পড়া দেওয়ালের ছবি, ব্যাকগ্রাউন্ডে রবিঠাকুরের থেকে ধার করা গানের মেলডি । এই ভিডিওটা ওদের শেষ কনভার্সেসনগুলোর মধ্যে একটা । ইমোশ্যনাল প্রোপাগান্ডার চেষ্টা, মুখ বেঁকিয়ে হাসে তিতান । নাহঃ অসম্ভব শ্রুড ছেলেটার ফাঁদটা এড়িয়ে যেতে পেরেছিল সে । তত দিনে যে তার ও বুদ্ধিটা বাড়তে শুরু করেছিল, কলেজের ফ্রেন্ডসরা তাকে একটু একটু করে শিখিয়েছিল লাইফের টেস্টটা পরখ করে নিতে । ভাগ্যিস ! নইলে হয়ত ওই আনকালচার্ড ছাপোষা ছেলেটার সঙ্গে তার জীবনটা জড়িয়ে যেত । উফ ভাবতেও ভয় লাগে । গলে যাওয়ার সম্ভবনা যথেষ্টই ছিল, যতই হোক সে তো জানে আজও ওই দেওয়ালের ছবিটা দেখলে প্রথম আদরের আবেশ তাকে ঘিরে ধরে, কোনো কারণ ছাড়াই সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে । অনেক ভেবেও এই ফাঁকা লাগার কারণটা সে বুঝতে পারেনি ।

বেশ সুখেই আছে তিতান, ওর বর আর ও একই কোম্পানিতে চাকরী করে । অভি ভীষণ হ্যান্ডসাম আর কুল । ইনফোসিস এর বেশ উঁচু পদে আছে । ওদের বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে চলল । বিয়ের মাত্র মাস চারেক পরেই দুজনকেই ইউ এস এ তে ট্রান্সফার করে দিয়েছে কোম্পানি । হায়দ্রাবাদে থাকাকালীন অফিসের চাপে সময় না পেলেও এখানে কিন্তু সময় পেলেই রোমান্স ছাড়াও চুটিয়ে এনজয় করছে দুজনে । উইকএন্ডে ছুটিছাটা পেলেই এদিক সেদিক ঘুরতে যাওয়া, মাঝে মাঝে পার্টি, বিভিন্ন শো আর লং ড্রাইভ । তবু মাঝে মাঝে কেন জানেনা ভীষণ মুড অফ হয়ে যায় তিতানের । বিশেষ করে অভি কাছে না থাকলে । এটা অবশ্য তিতানের বহু দিনের উপসর্গ । সেই বদ ছেলেটার সঙ্গে যে ক’বছর ঘুরেছিল তখনও প্রায়ই মুড অফ হয়ে যেত তিতানের । তখন মনে হত এরকম একটা চালচুলোহীন, কালচারহীন, ভবঘুরের সঙ্গে সাতপাঁচ না ভেবেই রিলেশন করে ফেলার বোকামিটার জন্য তার মনের অন্তর্দ্বন্দের ফল এটা । কিন্তু এখন বোঝে আসলে এটা অন্য কিছু, যার কারণ জানা নেই তার নিজের ও …

ব্রেকাপের পরেও বেশ কয়েকদিন যোগাযোগ ছিল , ছেলেটা তার মিথ্যে মিথ্যে ভালবাসার ন্যাকামিটা চালিয়েও যাচ্ছিল । অসহ্য লাগত তার । মাঝে মাঝে বলেও দিত, “যাও না প্রচুর মেয়ে আছে তো বাজারে, একটা খুঁজে নাও না, আমাকে ভালবাস কিসের জন্য ? আমাদের মধ্যে কোনো কিছু হওয়া কোন দিনই সম্ভব নয় । কেন কষ্ট পেতে ভালবাস ?”

সত্যি সত্যি একদিন চলে গিয়েছিল ছেলেটা, কোথায় গেছিল কেউ জানেনা । ইউ এস এ আসার আগেও ওদের বাড়িটা চোখে পড়েছে তিতানের । অনেক স্বপ্ন নিয়ে বানানো প্রাসাদের মত বাড়িটা একদম ফাঁকা, গেটে তালা । ওদের উঠোন ভরে ছিল লাল গোলাপের ঝোপ । অসংখ্য গোলাপ ফুটে থাকত সারা বছর । পরিচয় হওয়ার দ্বিতীয় দিনে বাংলা স্যারের কোচিংএ ঐ গোলাপ তিতানের জন্য নিয়ে এসেছিল ছেলেটা । গোলাপ ঝাড়গুলোর অস্তিত্ব কবেই বিলুপ্ত । ওর ভীষণ আদরের বেড়ালগুলো কোথায় আছে, বা আদৌ আছে কিনা তার খোঁজ রাখার মত বেকার সময় কারুরই নেই, তিতানের তো না ই ।

চলে যাবার আগের দিন রাত্রে ছেলেটা তিতানকে মেসেজে লিখেছিল “চললাম, অসুখী রানীর মেঝেয় ছড়ানো ওষুধের বড়ির খোঁজে, পেলে তোমায় খবর দেব, তোমার দরকার পড়তে পারে” । সেই শেষ আর কোনো যোগাযোগ হয় নি । অবশ্য সে অনেক কিছুর সঙ্গেই তো কতদিন যোগাযোগ নেই তিতানের । ভারতের সঙ্গে, কলকাতার সঙ্গে, ফুচকার সঙ্গে, পূজোয় স্কুলের তিন প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে উদ্দাম ঘোরার সঙ্গে । বড্ড মিস করে তিতান, কিন্তু ছুটি তো চাইলেই পাওয়া যায়না । বিরাট অঙ্কের মাইনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দায়িত্ব ও যে প্রতিমাসে বুঝে নিতে হয় । তাই ইচ্ছে, সাধ্য দুটো থাকলেও দু বছরে একবারের বেশী ফেরা হয়না কলকাতায় । তাই মা, দিদা বা ছোট বোন ইন্দুর সঙ্গে মাঝে মাঝে ভিডিও কনফারেন্স বা স্কুলের ভীষণ প্রিয় বান্ধবী, নয়না, শাবানা বা ডক্টর শ্রেয়ার সঙ্গে মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপে স্মৃতিচারণ, টুকটাক আড্ডা আর ভারতীয় কোন শীল্পির অনুষ্ঠান যদি কাছাকাছি হওয়ার খবর পায় তাহলে অফিসের কাজ না থাকলে অ্যাটেন্ড করার প্রাণপণ চেষ্টা করে । যোগ বলতে এইটুকুই ।

তবে সব যে অ্যাটেন্ড করতে পারে তা নয় । এই কদিন আগে সুখরাম ফকিরের একটা অনুষ্ঠান ছিল সানফ্রান্সিকো তে । এমনই কাজের চাপ পড়ল যে সে বা অভি কেউই সময় বার করতে পারল না । যাক গে, কদিন পরে তো ইন্ডিয়ায় ফিরছেই তারা, লম্বা ছুটি আছে এবারে ।

**********************************

উফফ … কদ্দিন পর ভারতীর সঙ্গে দেখা হল তিতানের, সেই কবে দুজনে একসঙ্গে চাকরি পেয়েছিল কগনিজেন্টে তার পর তিতান গেল ইনফোসিস এ আর ভারতী রয়ে গেছিল কগ্নিজেন্টেই । সম্প্রতি অবশ্য ভারতীও চাকরি বদল করেছে, এখন সে আছে উইপ্রো তে । দুজনে মিলে অনেক দিন পর উইন্ডো শপিং করছে সেই কলেজের দিন গুলোর মত । আর বাইরে বেরিয়ে ফুচকাটা ওদের মাস্ট । এই ফুচকার জন্য কত কতওওও দিন জিভ সুড়সুড় করেছে ইউ এস এ তে থাকা কালীন ।

খুব একটা পাল্টায় নি কলকাতা, হয়ত কোনো দিন পাল্টাবেওনা । শহরটার কই মাছের জান । হাইরাইজ উঠুক আর শপিং মলই বসুক না কেন, স্নেহশীলা মায়ের মত শাড়ীর আঁচলে আড়াল করে রাখবে ফুটপাথের ঘিঞ্জি বাজার, কাটা ফলের দোকান, লিট্টি, রাইস হোটেল, ইটালিয়ান সেলুনের মত আরও কত কী । আঁচড়টি ও লাগতে দেবেনা । আর ওদের মধ্যেই বেঁচে থাকবে কলকাতা ।

আর একটা অবিচ্ছেদ্য জিনিস ভিকিরি । কলকাতায় এমন রাস্তা খুঁজে বের করা দায় যেখানে এনারা স্বমহিমায় বিরাজমান নন । এখনই একটা দলকে দেখা যাচ্ছে, তিতানরা যে ফুটে ফুচকা খাচ্ছে, তার উল্টো ফুটে বসে মহা আনন্দে গোগ্রাসে রুটি খাচ্ছে । ফুটপাথের ধূলোর ওপরেই একটা প্লাস্টিক পেতে রাখা রয়েছে রুটি । ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া একমাথা চুল আর বিরাট দাড়িওয়ালা লম্বা একজনের কোলে ময়লা লুঙ্গির ওপর একটা ভাঁড়ে রাখা রয়েছে একটু আচার, আরেক জনের হাতে ধরা একটা মস্ত পেঁয়াজ । সেটা হাতে হাতে ঘুরছে । হাইজিন বলে যে পৃথিবী নামক গ্রহে কোনো শব্দ আছে, এদের দেখলে সেটা বিশ্বাস করা শক্ত । ভারতী তো বলেই বসল ডিসগাস্টিং ।

ফেরার পথে হঠাত করেই তিতানের চোখে পড়ে গেল একটা ফ্লেক্স । আরে !!! সুখরাম ফকিরের শো রবীন্দ্রসদনে । এবারে আর মিস করা যাবেনা । সেবারে মিস করে ফেলেছিল, আর সুযোগ পাওয়া যাবে কিনা বলা যায় না । একে তো দিন পনের পরেই তাদের ফেরা তায় এই ফকির নাকি সারা বছরই এদেশ ওদেশ ঘুরে বেড়ায় গানের প্রোগ্রামে । ট্রেণটা মিস করেও দুটো টিকিট কাটল তিতান ।

************************************

অভি কে নিয়ে রবীন্দ্রসদন এসেছে তিতান, মোহরকুঞ্জে কিছুটা ঘোরাঘুরি করল দু জনে, প্রোগ্রাম শুরু হতে দেরী আছে । বাইরে লম্বা লাইন টিকিটের । টিকিট নাকি শেষ, তবু লোকে লাইন দিয়ে রেখেছে । ভাগ্যিস সে সেদিন টিকিট দুটো কেটে রেখেছিল । ভিক্টোরিয়া যাওয়ার কথা অভি কয়েকবার বলছিল । কিন্তু তিতানের একদম ইচ্ছা নেই ভিক্টোরিয়া যাবার । ঘোড়ার গাড়িতে উঠতেও তার কিরকম একটা বিরক্তি লাগে । তার চেয়ে মোহরকুঞ্জই ভাল ।

হলে ঢুকে বেশ অদ্ভুত একটা ফিলিং হচ্ছিল সবাইকার । গোটা হলে একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ, চন্দন না কস্তুরী কি যেন একটা । মনের মধ্যে অটোমেটীক্যালই একটা প্রশান্ত ভাব চলে আসে । বেশ সামনের দিকেই বসেছিল তিতানরা । মঞ্চে যখন সুখরাম ফকির উঠল তখন গোটা হলে কান পাতা দায় হাততালির আওয়াজে । আরে এ তো সেই লম্বা ভিকিরিটা আর তার দলবল । কী অদ্ভুত কান্ড ! এত বড় একটা লোক । মাথায় সব কিছু তালগোল পাকিয়ে গেল তিতানের । কী আজব কান্ড রে বাবা !

ফকির হাত তুলে দাঁড়াতেই মূহুর্তে নিশ্চুপ হয়ে গেল  গোটা হল । দলের লোকেরা একে একে কেউ দোতারা, কেউ খমক, কেউ ডুবকি নিয়ে রেডি হল । সুখরাম একটা ছোট ইলেকট্রিক অর্গ্যান গলায় ঝুলিয়ে নিল, তারপর পকেট থেকে একটা কাপড়ের টুকরো বের করে একবার বুকে আরেকবার ঠোঁটে ছোঁয়াল । এবারে তার সুরলহরী বার্মুডা ট্র্যাঙ্গেলের মত অপ্রতিরোধ্য গতিতে দর্শকদের সমস্ত মনকে আকর্ষণ করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসে কয়েকঘন্টার জন্য পঞ্চভূতে লীন করে দিল ।

**********************************

ট্যাক্সিতে চুপচাপ বসে রয়েছে তিতান । সেই বদ ছেলেটা থাকলে এতক্ষণ নানা বোকা বোকা কথা বলে তার মুড ভাল করার বিরক্তিকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেত । কিন্তু অভি তার এই মুড সুইং এর সাথে পরিচিত । তাই তাকে তার মত থাকতে দেয়, বিরক্ত করেনা । অভি কানে হেডফোন দিয়ে ওপাশের জানালাটা দিয়ে হুহু করে পেরিয়ে যাওয়া রাতের কলকাতা দেখছে । তিতান ও দেখছে কিন্তু সেই দেখা মস্তিষ্কে দর্শনের অনুভূতি তৈরী করছে কিনা সেটা বলা শক্ত ।

সুখরামের হাতের রোঁয়া ওঠা কাপড়ের টুকরোটা তিতান চেনে । ঐ রুমালটা তার হাত থেকে রাস্তায় পড়ে যাওয়ায় আর ধূলো ঝেড়ে তুলে নিতে চায়নি নতুন রুমাল কিনে নেবে ভেবে । যদিও সেই পাগল বদ ছেলেটা ঘামে ভেজা রুমালটা পরম আগ্রহে কুড়িয়ে নিয়েছিল নিজের কাছে রাখবে বলে ।

তাকে পাবে না জেনেও ভালবাসত ছেলেটা । বলত তাকে ভালবেসে কষ্ট পাচ্ছে খুব । ছেলেটা আস্ত মিথ্যুক একটা । সুখের বড়ি গুলো শুধু তার সাথে ভাগ করে নেওয়ার কথাছিল ছেলেটার । কিন্তু দেখ,আজ সবাইকে সুখ বিলিয়ে বেড়াচ্ছে ছেলেটা, বাদ শুধু সে ।