সুখের বড়ি

আজ শরীরটা ভাল নেই, বর তাই জোড় করে অফিস যেতে দেয় নি । একলা দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আইপ্যাডটায় হিজিবিজি করছিল তিতান, ফেসবুক, বিয়ের ছবিগুলো, শিমলায় হানিমুনের ভিডিও গুলো, আরও কত কী । ইনবক্সে পুরোনো মেইলগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে কিছু ছবি, মন কেমন করা মেসেজ হিস্ট্রি । তাড়াতাড়ি উইন্ডোটা ক্লোজ করে দেয় তিতান । ওসব অল্পবয়সের অপরিণত ভুলের কথা ভেবে নিজের ওপর রাগ করতে ভাল লাগছেনা তার ।

একটা শ্যাওলা পড়া দেওয়ালের ছবি, ব্যাকগ্রাউন্ডে রবিঠাকুরের থেকে ধার করা গানের মেলডি । এই ভিডিওটা ওদের শেষ কনভার্সেসনগুলোর মধ্যে একটা । ইমোশ্যনাল প্রোপাগান্ডার চেষ্টা, মুখ বেঁকিয়ে হাসে তিতান । নাহঃ অসম্ভব শ্রুড ছেলেটার ফাঁদটা এড়িয়ে যেতে পেরেছিল সে । তত দিনে যে তার ও বুদ্ধিটা বাড়তে শুরু করেছিল, কলেজের ফ্রেন্ডসরা তাকে একটু একটু করে শিখিয়েছিল লাইফের টেস্টটা পরখ করে নিতে । ভাগ্যিস ! নইলে হয়ত ওই আনকালচার্ড ছাপোষা ছেলেটার সঙ্গে তার জীবনটা জড়িয়ে যেত । উফ ভাবতেও ভয় লাগে । গলে যাওয়ার সম্ভবনা যথেষ্টই ছিল, যতই হোক সে তো জানে আজও ওই দেওয়ালের ছবিটা দেখলে প্রথম আদরের আবেশ তাকে ঘিরে ধরে, কোনো কারণ ছাড়াই সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে । অনেক ভেবেও এই ফাঁকা লাগার কারণটা সে বুঝতে পারেনি ।

বেশ সুখেই আছে তিতান, ওর বর আর ও একই কোম্পানিতে চাকরী করে । অভি ভীষণ হ্যান্ডসাম আর কুল । ইনফোসিস এর বেশ উঁচু পদে আছে । ওদের বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে চলল । বিয়ের মাত্র মাস চারেক পরেই দুজনকেই ইউ এস এ তে ট্রান্সফার করে দিয়েছে কোম্পানি । হায়দ্রাবাদে থাকাকালীন অফিসের চাপে সময় না পেলেও এখানে কিন্তু সময় পেলেই রোমান্স ছাড়াও চুটিয়ে এনজয় করছে দুজনে । উইকএন্ডে ছুটিছাটা পেলেই এদিক সেদিক ঘুরতে যাওয়া, মাঝে মাঝে পার্টি, বিভিন্ন শো আর লং ড্রাইভ । তবু মাঝে মাঝে কেন জানেনা ভীষণ মুড অফ হয়ে যায় তিতানের । বিশেষ করে অভি কাছে না থাকলে । এটা অবশ্য তিতানের বহু দিনের উপসর্গ । সেই বদ ছেলেটার সঙ্গে যে ক’বছর ঘুরেছিল তখনও প্রায়ই মুড অফ হয়ে যেত তিতানের । তখন মনে হত এরকম একটা চালচুলোহীন, কালচারহীন, ভবঘুরের সঙ্গে সাতপাঁচ না ভেবেই রিলেশন করে ফেলার বোকামিটার জন্য তার মনের অন্তর্দ্বন্দের ফল এটা । কিন্তু এখন বোঝে আসলে এটা অন্য কিছু, যার কারণ জানা নেই তার নিজের ও …

ব্রেকাপের পরেও বেশ কয়েকদিন যোগাযোগ ছিল , ছেলেটা তার মিথ্যে মিথ্যে ভালবাসার ন্যাকামিটা চালিয়েও যাচ্ছিল । অসহ্য লাগত তার । মাঝে মাঝে বলেও দিত, “যাও না প্রচুর মেয়ে আছে তো বাজারে, একটা খুঁজে নাও না, আমাকে ভালবাস কিসের জন্য ? আমাদের মধ্যে কোনো কিছু হওয়া কোন দিনই সম্ভব নয় । কেন কষ্ট পেতে ভালবাস ?”

সত্যি সত্যি একদিন চলে গিয়েছিল ছেলেটা, কোথায় গেছিল কেউ জানেনা । ইউ এস এ আসার আগেও ওদের বাড়িটা চোখে পড়েছে তিতানের । অনেক স্বপ্ন নিয়ে বানানো প্রাসাদের মত বাড়িটা একদম ফাঁকা, গেটে তালা । ওদের উঠোন ভরে ছিল লাল গোলাপের ঝোপ । অসংখ্য গোলাপ ফুটে থাকত সারা বছর । পরিচয় হওয়ার দ্বিতীয় দিনে বাংলা স্যারের কোচিংএ ঐ গোলাপ তিতানের জন্য নিয়ে এসেছিল ছেলেটা । গোলাপ ঝাড়গুলোর অস্তিত্ব কবেই বিলুপ্ত । ওর ভীষণ আদরের বেড়ালগুলো কোথায় আছে, বা আদৌ আছে কিনা তার খোঁজ রাখার মত বেকার সময় কারুরই নেই, তিতানের তো না ই ।

চলে যাবার আগের দিন রাত্রে ছেলেটা তিতানকে মেসেজে লিখেছিল “চললাম, অসুখী রানীর মেঝেয় ছড়ানো ওষুধের বড়ির খোঁজে, পেলে তোমায় খবর দেব, তোমার দরকার পড়তে পারে” । সেই শেষ আর কোনো যোগাযোগ হয় নি । অবশ্য সে অনেক কিছুর সঙ্গেই তো কতদিন যোগাযোগ নেই তিতানের । ভারতের সঙ্গে, কলকাতার সঙ্গে, ফুচকার সঙ্গে, পূজোয় স্কুলের তিন প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে উদ্দাম ঘোরার সঙ্গে । বড্ড মিস করে তিতান, কিন্তু ছুটি তো চাইলেই পাওয়া যায়না । বিরাট অঙ্কের মাইনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দায়িত্ব ও যে প্রতিমাসে বুঝে নিতে হয় । তাই ইচ্ছে, সাধ্য দুটো থাকলেও দু বছরে একবারের বেশী ফেরা হয়না কলকাতায় । তাই মা, দিদা বা ছোট বোন ইন্দুর সঙ্গে মাঝে মাঝে ভিডিও কনফারেন্স বা স্কুলের ভীষণ প্রিয় বান্ধবী, নয়না, শাবানা বা ডক্টর শ্রেয়ার সঙ্গে মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপে স্মৃতিচারণ, টুকটাক আড্ডা আর ভারতীয় কোন শীল্পির অনুষ্ঠান যদি কাছাকাছি হওয়ার খবর পায় তাহলে অফিসের কাজ না থাকলে অ্যাটেন্ড করার প্রাণপণ চেষ্টা করে । যোগ বলতে এইটুকুই ।

তবে সব যে অ্যাটেন্ড করতে পারে তা নয় । এই কদিন আগে সুখরাম ফকিরের একটা অনুষ্ঠান ছিল সানফ্রান্সিকো তে । এমনই কাজের চাপ পড়ল যে সে বা অভি কেউই সময় বার করতে পারল না । যাক গে, কদিন পরে তো ইন্ডিয়ায় ফিরছেই তারা, লম্বা ছুটি আছে এবারে ।

**********************************

উফফ … কদ্দিন পর ভারতীর সঙ্গে দেখা হল তিতানের, সেই কবে দুজনে একসঙ্গে চাকরি পেয়েছিল কগনিজেন্টে তার পর তিতান গেল ইনফোসিস এ আর ভারতী রয়ে গেছিল কগ্নিজেন্টেই । সম্প্রতি অবশ্য ভারতীও চাকরি বদল করেছে, এখন সে আছে উইপ্রো তে । দুজনে মিলে অনেক দিন পর উইন্ডো শপিং করছে সেই কলেজের দিন গুলোর মত । আর বাইরে বেরিয়ে ফুচকাটা ওদের মাস্ট । এই ফুচকার জন্য কত কতওওও দিন জিভ সুড়সুড় করেছে ইউ এস এ তে থাকা কালীন ।

খুব একটা পাল্টায় নি কলকাতা, হয়ত কোনো দিন পাল্টাবেওনা । শহরটার কই মাছের জান । হাইরাইজ উঠুক আর শপিং মলই বসুক না কেন, স্নেহশীলা মায়ের মত শাড়ীর আঁচলে আড়াল করে রাখবে ফুটপাথের ঘিঞ্জি বাজার, কাটা ফলের দোকান, লিট্টি, রাইস হোটেল, ইটালিয়ান সেলুনের মত আরও কত কী । আঁচড়টি ও লাগতে দেবেনা । আর ওদের মধ্যেই বেঁচে থাকবে কলকাতা ।

আর একটা অবিচ্ছেদ্য জিনিস ভিকিরি । কলকাতায় এমন রাস্তা খুঁজে বের করা দায় যেখানে এনারা স্বমহিমায় বিরাজমান নন । এখনই একটা দলকে দেখা যাচ্ছে, তিতানরা যে ফুটে ফুচকা খাচ্ছে, তার উল্টো ফুটে বসে মহা আনন্দে গোগ্রাসে রুটি খাচ্ছে । ফুটপাথের ধূলোর ওপরেই একটা প্লাস্টিক পেতে রাখা রয়েছে রুটি । ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া একমাথা চুল আর বিরাট দাড়িওয়ালা লম্বা একজনের কোলে ময়লা লুঙ্গির ওপর একটা ভাঁড়ে রাখা রয়েছে একটু আচার, আরেক জনের হাতে ধরা একটা মস্ত পেঁয়াজ । সেটা হাতে হাতে ঘুরছে । হাইজিন বলে যে পৃথিবী নামক গ্রহে কোনো শব্দ আছে, এদের দেখলে সেটা বিশ্বাস করা শক্ত । ভারতী তো বলেই বসল ডিসগাস্টিং ।

ফেরার পথে হঠাত করেই তিতানের চোখে পড়ে গেল একটা ফ্লেক্স । আরে !!! সুখরাম ফকিরের শো রবীন্দ্রসদনে । এবারে আর মিস করা যাবেনা । সেবারে মিস করে ফেলেছিল, আর সুযোগ পাওয়া যাবে কিনা বলা যায় না । একে তো দিন পনের পরেই তাদের ফেরা তায় এই ফকির নাকি সারা বছরই এদেশ ওদেশ ঘুরে বেড়ায় গানের প্রোগ্রামে । ট্রেণটা মিস করেও দুটো টিকিট কাটল তিতান ।

************************************

অভি কে নিয়ে রবীন্দ্রসদন এসেছে তিতান, মোহরকুঞ্জে কিছুটা ঘোরাঘুরি করল দু জনে, প্রোগ্রাম শুরু হতে দেরী আছে । বাইরে লম্বা লাইন টিকিটের । টিকিট নাকি শেষ, তবু লোকে লাইন দিয়ে রেখেছে । ভাগ্যিস সে সেদিন টিকিট দুটো কেটে রেখেছিল । ভিক্টোরিয়া যাওয়ার কথা অভি কয়েকবার বলছিল । কিন্তু তিতানের একদম ইচ্ছা নেই ভিক্টোরিয়া যাবার । ঘোড়ার গাড়িতে উঠতেও তার কিরকম একটা বিরক্তি লাগে । তার চেয়ে মোহরকুঞ্জই ভাল ।

হলে ঢুকে বেশ অদ্ভুত একটা ফিলিং হচ্ছিল সবাইকার । গোটা হলে একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ, চন্দন না কস্তুরী কি যেন একটা । মনের মধ্যে অটোমেটীক্যালই একটা প্রশান্ত ভাব চলে আসে । বেশ সামনের দিকেই বসেছিল তিতানরা । মঞ্চে যখন সুখরাম ফকির উঠল তখন গোটা হলে কান পাতা দায় হাততালির আওয়াজে । আরে এ তো সেই লম্বা ভিকিরিটা আর তার দলবল । কী অদ্ভুত কান্ড ! এত বড় একটা লোক । মাথায় সব কিছু তালগোল পাকিয়ে গেল তিতানের । কী আজব কান্ড রে বাবা !

ফকির হাত তুলে দাঁড়াতেই মূহুর্তে নিশ্চুপ হয়ে গেল  গোটা হল । দলের লোকেরা একে একে কেউ দোতারা, কেউ খমক, কেউ ডুবকি নিয়ে রেডি হল । সুখরাম একটা ছোট ইলেকট্রিক অর্গ্যান গলায় ঝুলিয়ে নিল, তারপর পকেট থেকে একটা কাপড়ের টুকরো বের করে একবার বুকে আরেকবার ঠোঁটে ছোঁয়াল । এবারে তার সুরলহরী বার্মুডা ট্র্যাঙ্গেলের মত অপ্রতিরোধ্য গতিতে দর্শকদের সমস্ত মনকে আকর্ষণ করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসে কয়েকঘন্টার জন্য পঞ্চভূতে লীন করে দিল ।

**********************************

ট্যাক্সিতে চুপচাপ বসে রয়েছে তিতান । সেই বদ ছেলেটা থাকলে এতক্ষণ নানা বোকা বোকা কথা বলে তার মুড ভাল করার বিরক্তিকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেত । কিন্তু অভি তার এই মুড সুইং এর সাথে পরিচিত । তাই তাকে তার মত থাকতে দেয়, বিরক্ত করেনা । অভি কানে হেডফোন দিয়ে ওপাশের জানালাটা দিয়ে হুহু করে পেরিয়ে যাওয়া রাতের কলকাতা দেখছে । তিতান ও দেখছে কিন্তু সেই দেখা মস্তিষ্কে দর্শনের অনুভূতি তৈরী করছে কিনা সেটা বলা শক্ত ।

সুখরামের হাতের রোঁয়া ওঠা কাপড়ের টুকরোটা তিতান চেনে । ঐ রুমালটা তার হাত থেকে রাস্তায় পড়ে যাওয়ায় আর ধূলো ঝেড়ে তুলে নিতে চায়নি নতুন রুমাল কিনে নেবে ভেবে । যদিও সেই পাগল বদ ছেলেটা ঘামে ভেজা রুমালটা পরম আগ্রহে কুড়িয়ে নিয়েছিল নিজের কাছে রাখবে বলে ।

তাকে পাবে না জেনেও ভালবাসত ছেলেটা । বলত তাকে ভালবেসে কষ্ট পাচ্ছে খুব । ছেলেটা আস্ত মিথ্যুক একটা । সুখের বড়ি গুলো শুধু তার সাথে ভাগ করে নেওয়ার কথাছিল ছেলেটার । কিন্তু দেখ,আজ সবাইকে সুখ বিলিয়ে বেড়াচ্ছে ছেলেটা, বাদ শুধু সে ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s