মুক্তমনা অনলাইন পত্রিকার সুমিত দেবনাথ বাবু সমীপেষু

মুক্তমনা নামের একটি অনলাইন ম্যাগাজিন আছে সেখানে শ্রীযুক্ত সুমিত দেবনাথ এই অদ্ভুত এবং ইন্টারেস্টিং পোস্টটি করেছেন —– অলৌকিক পুরুষ রামকৃষ্ণ

আমি এর উত্তরে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম —-

হে অশেষ জ্ঞানী লেখক আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন আপনার এই নির্ভিক সত্যবাদীতার জন্য । যেকোনো যুক্তিবাদী বিচার হওয়া উচিত পক্ষপাত শূণ্য । আপনি লেখাটির শেষে আপনার লেখার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে পাঠক গণকে জানিয়ে দিয়েছেন যে আপনার মূল উদ্দেশ্য সেই ডক্টরেটধারী ব্যক্তিটির উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা । এতেই বোঝাযায় আপনার লেখায় যুক্তিবাদের বিশুদ্ধতা কতটা । যাই হোক এমন অকপট ভাবে নিজের যুক্তিবাদের স্বরূপ উন্মুক্ত করাটা যদি আপনার স্বভাবতঃ নির্বুদ্ধিতা না হয় তাহলে বলতেই হবে আপনার সাহস আছে নিজের উলঙ্গ প্রতিহিংসাপরায়ণতাকে সোজা সাপটা ভাবে স্বীকার করার ।

প্রথমতঃ বলি আমার মনে হয় কোনো কিছু সম্বন্ধে কিছু বলা বা লেখার আগে সেই বিষয়টি সম্বন্ধে ভাল ভাবে পড়াশোনা না করে কোনো মন্তব্য করা যুক্তিবাদের পর্যায়ে মনে হয় পড়েনা, মুক্তমনের পর্যায়ে তো নয়ই । এই লেখাটি লেখার আগে শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধিয় অস্বীকৃত কোনো ভুলভাল বই না পড়ে কথামৃত, স্বামীজীর পত্রাবলী জাতীয় প্রামাণ্য গ্রন্থ গুলি পড়া উচিত ছিল বলে আমার মনে হয় । দ্বিতীয়তঃ অলৌকিকতা ও তার উপায়গুলি সম্বন্ধে যথাযথ পড়াশুনা করা দরকার ছিল ।

আমি উপরিউক্ত বই গুলি মন দিয়ে পড়েছি বলেই আমার বিশ্বাস এবং আমি একজন যাদুকর, তাই অলৌকিকতার ঘাঁচ-ঘোঁচ গুলো মোটামুটি আমার চেনা । এই বকলমেই আমার কিছু বলার আছে, ভাল ভাবে পড়ে বুঝে প্রকৃত যুক্তির সঙ্গে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন । অবশ্য যদি উত্তর দেওয়ার মত মানসিকতা আপনার থাকে ।

শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনের যেটুকু কথা জানা যায় তার মধ্যে ভক্তদের ভক্তিরসাপ্লুত আরোপিত ঘটনাগুলি বাদ দিলে এবং একই গাছের ডালে দু রঙের ফুলের ঘটনাটি ছাড়া আর কোন ঘটনাকে মঞ্চোপযোগী যাদু বা হস্তলাঘব বলে ব্যাখ্যা করা যায় ??? প্রামাণ্য গ্রন্থগুলি পড়লে জানতে পারবেন স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব বার বার অলৌকিকতা বা সিদ্ধাইকে ঈশ্বরলাভের অন্তরায় বলে প্রচার করেছেন ।

ভক্তরা তাঁর সম্বন্ধে কি কি অলৌকিকতা আরোপ করেছে সেজন্য তাঁর বিরুদ্ধে আপনি কলম তুলছেন এবং তাঁর মায়ের চরিত্র সম্বন্ধে কটু মন্তব্য করছেন । এখন আপনার এই লেখাটি পড়ে যদি অন্য ধর্মের কোনো বন্ধু সমস্ত হিন্দুধর্মের মানুষদের প্রতি আঙ্গুল তোলেন এবং আপনার মায়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাহলে সেটার যুক্তিযুক্ততা যতটুকু, আপনার লেখার যৌক্তিকতাও ঠিক ততটাই ।

আপনি পৈতে খুলে রাখা ও পরার দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন । খুব ভাল কথা । আশা করব আপনি নিজে দ্বিচারিতামুক্ত । তাই যদি হয় তাহলে এই কথা গুলো শুধু এই অনলাইন ব্লগের নিরাপদ আশ্রয়ে না বলে ঐ বিরিঞ্চি বা সাঁই দের জনসভাতেও গিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলতে পারতেন । পেরেছেন কি ???  পারেন নি কারণ আপনি ভাল করেই জানেন যে ওখানে বললে ভক্তের দল আপনাকে ততক্ষণাত কবরে পাঠাবার ব্যবস্থা করত । মানুষকে দ্বিচারিতা করতে হয় অবস্থা বিশেষে । অবতারের ও ক্ষিদে পায়, ঘুম পায়, শরীর খারাপ হয় । কারণ মানুষের মনটা অবতার বা দেবসুলভ হতে পারে, শরীরটা নয় ।

রামকৃষ্ণ বাঙলার ধর্মবিপ্লবের গতি রুদ্ধ করেননি বরং তাকে ডায়নামিক রূপ দিয়েছিলেন । ব্রাহ্ম ধর্ম সম্বন্ধে লেখার আগে আপনার ব্রাহ্ম ধর্মকে জানা উচিত ছিল সঠিক ভাবে । ব্রাহ্ম ধর্ম ব্রহ্ম বা একেশ্বরবাদের কথা বলে যা আদি বৈদিক ঈশ্বরচেতনার সঙ্গে সমগোত্রিয় । শ্রীরামকৃষ্ণ কখনই একে মিথ্যে বলেননি বা হেয়জ্ঞান করেন নি । গীতার সর্বধর্ম পরিত্যাজ্য মামেকং স্মরণং ভজ বা অন্যান্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থে দাবী করা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের বদলে তিনি শুনিয়েছেন পরিমার্জিত ডায়নামিক এক ধর্মের বাণী, “যত মত, তত পথ” এবং তার স্পষ্ট ব্যাখ্যাও দিয়েছেন । এই মতবাদ প্রকৃতপক্ষেই ইউনিভার্সাল হিউম্যানিসম । পূর্বে সুফি সাধকরা এবং সম্রাট আকবর এই ধরণের মতবাদ প্রচারের চেষ্টা করলেও সাধারণের কাছে এর মর্মোপলব্ধী দূর্বোধ্য হওয়ায় তা হালে পাণি পায় নি । শ্রীরামকৃষ্ণ এটাকে সর্বসাধারণের বোঝার মত করে প্রচার করায় এই মত সাধারণ মানুষ গ্রহণ করতে পেরেছিল সহজেই । একে কি ধর্মবিপ্লব বলব না ?

ব্রাহ্ম ধর্ম সাধারণের কাছে স্বীকৃতি পাওয়া এমনিতেই কঠীন ছিল । কিছু উচ্চশিক্ষিতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই ধর্ম । সাধারণ মানুষ এই ধর্মের ব্রহ্মের বিশালত্বের ধারণা নিতে পারেনি । উদাহরণ স্বরূপ বলি সিলিকন ভ্যালীতে কর্মরত আল্ট্রামর্ডান কোনো প্রবাসী ভারতীয়কে যদি এই শ্লোক টি বোঝাতে যাই সে প্রথাগত ভাবে সহজে বুঝতে পারবে কী ?

বাসাংসী জীর্ণাণী যথা বিহায়, নবানী গৃহ্নাতি নরোহপরাণী
তথা শরীরাণী যথা বিহায় জীর্ণানন্যানী, সংযাতি নবানি দেহি ।।

কিন্তু তাকে যদি এই ভাবে শ্লোকটির অনুবাদ করে দিই তাহলে তার পক্ষে বোঝা সহজ হবে —

When All the memories are full …No more place is left to use in the temp folders ….The system reboots to clearup the memories and to start a new session …But that reboot doesn’t mean the termination of the system ….Only running processes are killed temporarily ..

ঠিক একই কাজটি করেছিলেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব । ধর্মের সূক্ষতম ধারণাটিকে চলতি কথায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলেছিলেন । কোটী টাকা খরচা করে যজ্ঞ করতে বলেন নি । মানসপূজা করতে বলেছিলেন ।

এবারে আসি মানবদরদীতার কথায় । আচ্ছা আপনি এই লেখাটা লিখেছেন কেন ??? মানুষের যুক্তিবোধ জাগরণের জন্য ? তা এখানে কেন ? আপনার এই লেখায় ধর্মধ্বজীদের তো একটা চুল ও ছেঁড়া যাবেনা, যান না ফিল্ডে গিয়ে ধর্ম সভা গুলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বলুন, “সব ঝুঠা হ্যায়” । আপনি বলবেন অল্প অল্প করে মানুষ জাগবে, আপনার এই লেখা পড়ে অন্য কেউ লিখবে, সেটা পড়ে অন্যকেউ । ঠিক এই ভাবে ভাবুন শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন একটা সিম্বল । একটা ট্রাবলশুটিং গাইড । সারা জীবনটাই তিনি ছোটো ছোটো করে তাঁর শিষ্যদের ভবিষ্যত কর্মপন্থার উপদেশ হাতে কলমে দিয়ে গেছেন ।

মিশনের বাইরে থেকে ওই সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতিকের খিল্লি উড়িয়ে চলে না এসে মিশনের কাজ সম্পর্কে জানুন । দরিদ্রনারায়ণের সেবায় অংশ নিয়ে দেখুন অলৌকিকতা নয় ভগবানের কোন সন্ধান শ্রীরামকৃষ্ণ দিয়ে গেছেন । দোরে দোরে ঘুরে জমা করা কিছু জামা কাপড়, আপনার তথাকথিত “কুসংস্কারী” রামকৃষ্ণভক্তদের সাধ্য মত দান করা কম্বলের বিশাল বিশাল বস্তা কাঁধে নিয়ে যখন শীতের ভোরে কিছু দুরন্ত দামাল ছেলে কোনো কিছুর লোভে নয় জাস্ট এমনি ই কণকণে ঠান্ডা নদী হেঁটে পেরোয়, তখন তাদের মধ্যে থেকে বোঝার চেষ্টা করুন ঠিক কোন ভগবানের সন্ধান শ্রীরামকৃষ্ণ দিয়ে গেছেন । সারাদিন ভাগারের ময়লা ঘাঁটা কচি কচি ছেলে-মেয়ে গুলোকে যখন বিকেলের পড়ন্ত বেলায় নিয়ে এসে পড়ানো লেখানো গান শেখানো ছবি আঁকানোর মধ্যে দিয়ে জীবনের মূল স্রোতটা চেনানোর চেষ্টা হয়, আর তাদের রাত্রের খাবার পরিবেশন করতে, তাদের এঁটো বাসন ধুতে  নিয়মিত আসে নামী শিল্পপতিরা, তাদের মধ্যে থেকে বুঝুন ঠিক কোন আদর্শের সূচনা সেদিন মথুরবাবুর সামনে করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ।

সেদিন ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ একটা গ্রামের কিছু মানুষকে কয়েকটা কাপড় দেওয়া আর একবেলার জন্য পেটপুরে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন । আজ তাঁর নির্দেশিত ভাবধারায় স্বামীজীর সৃষ্টি রামকৃষ্ণ মিশন হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে জীবনের মূল স্রোতে ফেরাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বছরের পর বছর । সেদিন তাঁর কথায় নাগ মহাশয় ব্যবসায়িক ডাক্তারীর সমস্ত কিছু গঙ্গায় বিসর্জন দিয়েছিলেন, আজ যখন চারিদিক সুবিধাবাদী অর্থপিশাচ ডাক্তারে ভরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, তখন খোঁজ নিয়ে দেখুন প্রতি বছর শয়ে শয়ে বড় বড় ডাক্তার কেউ সব ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়ে কেউ বা আবার সংসারে থেকেই বিনামূল্যে রামকৃষ্ণ মিশনের স্বাস্থকেন্দ্রগুলিতে নিরলস সেবা দিয়ে চলেছেন ।

মশাই এগুলো আপনার এদিক ওদিক থেকে শোনা বা কোনো বিশেষ একটি দেশের প্রভাবশালী ধর্মের বাহবা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কল্পিত তথ্য নয় । একদম নিজের চক্ষু-কর্ণের অভিজ্ঞতা। প্রমাণ চাইলে দিতে পারি । তাই বলছি বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণকে যা খুশী গালাগালি দিন না বারণ করবনা । কিন্তু তাঁদের অবদান বা কাজের সম্বন্ধে না জেনে অকারণে কালীমালিপ্ত করার চেষ্টা করলে সেটা যুক্তিবাদী সাজার ভন্ড প্রচেষ্টা বা ইচ্ছাকৃত ভাবে আপনার নির্দিষ্ট স্বার্থসিদ্ধির (সম্ভবতঃ কোনো একটি ধর্মের লোকের চোখে হিরো সাজার) প্রচেষ্টা বলেই ধরে নেব ।

পরিশেষে বলি ইন্টারনেটে লেখালিখি করছেন । তা সে লেখা যতই অযৌক্তিক, স্বার্থগন্ধযুক্ত এবং “বাল”খিল্য হোক না কেন । গুগলের সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচয় আছে । ওখানে গিয়ে প্লাসিবো শব্দটির অর্থ সার্চ করুন । ওটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেটা যুক্তিবাদী মননে কোনোভাবেই গৃহিত হওয়ার কথা নয় । কিন্তু মজার ব্যাপার হল ওটি এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত একটি অত্যন্ত কার্যকারী চিকিৎসা পদ্ধতী । প্রায় সমস্ত হাসপাতাল বা ক্লিনিকেই সময়ে সময়ে এর প্রয়োগ করা হয় । শিবজ্ঞানে জীবসেবার বা রামকৃষ্ণ মিশনের মূল মোটো “আত্মনোমোক্ষার্থং  জগদ্ধিতায় চ” আদর্শ প্রচারে শ্রীরামকৃষ্ণ যদি অলৌকিকতার ব্যবহার করেও থাকেন তাহলে জানবেন সেই সময়ের আচারসর্বস্ব ধর্মের রমরমা ভরা সমাজে এই প্লাসিবো বা মিসডায়রেক্সনের প্রয়োজন ছিল ।

নমস্কার

Screenshot (255) Screenshot (256) Screenshot (257) Screenshot (258) Screenshot (259) Screenshot (250) Screenshot (251) Screenshot (252) Screenshot (253)