যাদবপুর প্রসঙ্গে

আমার অবস্থান ও ব্যক্তিগত মতামত খুবই স্পষ্ট ।

যাদবপুরের ভিসি অনৈতিক ভাবে পুলিশ এনে ছাত্র-ছাত্রীদের (যাদবপুর ও অন্যান্য শিক্ষায়তনের) উপর ঠ্যাঙারেবৃত্তি চালিয়েছিলেন । তার জন্য যাদবপুর তথা বিভিন্ন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদ করেছিল অনমনীয় মনোভাব নিয়ে । ভিসির পদত্যাগের দাবী সফল হয়েছে । সবাই এ ব্যাপারে উল্লাসিত ।

ব্যাক্তিগত ভাবে এই আন্দোলন আমার চোখে ডায়রিতে নোট করার মত কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয় । নোট করার মত ব্যাপার শুধু ঐ ছাত্রছাত্রীদের একগুঁয়ে অনমনীয় মানসিকতা । যেটা দল-মত-বয়স-বৃত্তি নির্বিশেষে সবার শ্রদ্ধা করার মত । বাকী সাফল্য ব্যর্থতার হিসেব আমার কাছে স্পষ্টতই অর্থহীন ।

ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস সুপ্রাচীন । শুধু ভারতের মাটিতে বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সিংহভাগই ছিলেন অল্পবয়স্ক কিশোর ও যুবা ছাত্রদল । তাঁরা মিছিল করেছেন, পিকেটিং করেছেন, গুলি খেয়েছেন, পুলিশের বেদম মার খেয়েছেন, জেলে গেছেন, বীরমদে ভরপুর হয়ে দেশমাতৃকার নাম করতে করতে ফাঁসিতে ঝুলেছেন ।

এছাড়াও বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন দেশে ৬০ থেকে ৮০ এর দশকে একের পর এক ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে । ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকার এস.ডি.এস. বা স্টুডেন্টস ডেমোক্র্যাটিক সোসাইটি এই যাদবপুরের মতই বিশাল এক উন্মাদনা তৈরী করেছিল ছাত্র মননে । তাদের সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হত তুলে ধরা মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি । অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে তারা অচল করে দিয়েছিল আমেরিকার জনজীবন । এদেরই অহিংসায় অবিশ্বাসী কিছু নেতৃত্ত্ব বেরিয়ে গিয়ে তৈরী করেছিল “ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড” যারা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দপ্তর বিষ্ফোরণের মাধ্যমে ধংস করতে শুরু করেছিল ৭০ এর দশকে । এছাড়াও সে সময়ে চীন, জাপান সহ বহুদেশে রাষ্ট্রীয় দূর্নীতির বিরুদ্ধে স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্র আন্দোলন চলেছিল জোর কদমে । একই সময়ে কলকাতা সহ বঙ্গে নকশাল আন্দোলন দ্রষ্টব্য ।

কিন্তু এই বিপ্লবের নীটফল কী ? আমার মতে বিপ্লবের নীটফল শূণ্য না হলেও ১০০ এর মধ্যে ২ বা ৩ এর বেশী নয় । সরকারের প্রবল ক্ষমতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটনীতির সঙ্গে কোনো দিনই শুধু কিছু স্বপ্নিল চোখের ছাত্ররা পেরে ওঠেনি পারবে ও না ।

এস.ডি.এস. বিপ্লব শুরু করার দীর্ঘ ৬ বছর পর আমেরিকা সরকার ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করার  ঘোষণা করে, ততদিনে ভিয়েতনামে গুঁড়ো করার মত বাড়িই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর । ছাত্রসংগঠনের জয়োল্লাস শুরু হয় । কিন্তু তার পরেই কোথায় যেন হারিয়ে যায় এই সংগঠন । কারণ ঐ যে, ভুল প্রাথমিক লক্ষ্য স্থির করে তাতেই সমস্ত ফোকাস কেন্দ্রীভূত করেছিল তারা । তাদের দাবী হওয়া উচিত ছিল রাষ্ট্রের আগ্রাসন ও দূর্নীতিকে টার্গেট করা, সেটা না করে তারা লক্ষ্য বানিয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধকে । তার উপরেই সমস্ত প্রচার কর্মসূচী চালিয়েছিল । তাই সেটা পূরণ হতেই সংগঠনের আর কোন যৌক্তিকতাই থাকল না । বিপ্লবী ছাত্ররা “বাঃ কী এক খানা বিপ্লব জিতলুম রে” ভেবে হৃষ্টচিত্তে বাড়ি গিয়ে সংসার ধর্মে মন দিল এবং বিপ্লবের স্মৃতিচারণ করে বই-টই লিখতে থাকল ।

ঠিক এই ভাবেই রাষ্ট্র চিরকাল ছাত্রদের সামনে “ফলস গোল” ক্রিয়েট করেছে নিজের প্রয়োজনে । প্রকৃত বিপ্লবী ছাত্রদের সংগ্রামী সত্ত্বাকে রাষ্ট্রনায়করা নষ্ট করেছে তাদের কৃত্রিম অযৌক্তিক লক্ষ্যের অযাচিত পূরণে, নিজেদের মহান প্রমান করেছে জনমানসে । অপমৃত্যু হয়েছে বিপ্লবের ।

ভিসি সরল কি থাকল তাতে কী এসে যায় ? শ্লীলতাহানী ঘটা ছাত্রিটির অপমানকারীরা শাস্তি পায় ? তার মুখে পারিবারিক মদতে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সেলোটেপটা খুলে যায় ? নাকি নির্দোষ ছাত্রদের উপরে আর কখনও বর্বর ভাবে লাঠিচার্জ হবেনা তার গ্যারান্টী পাওয়া যায় ? শুধু বিপ্লব করলে আজকের দিনেও যে জয় পাওয়া যায় (সেটার যৌক্তিকতা যতটাই হোক না কেন) তার একটা প্রতীকী উদাহরণ পাওয়া যায় ভবিষ্যতে প্রচারের কাজে ব্যবহার করার জন্য । লোকের মনে আশা জাগানোর জন্য ।

বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রবৃন্দ বলছেন যে আন্দোলনের রাস্তা সুদূর প্রসারী । কিন্তু অনুগামী মাস, বা কলেজ নির্বিশেষে ছাত্রবৃন্দ কী চলতে প্রস্তুত ? আসলে যত কিছুই হোক ছাত্র আন্দোলন কার্যকারী হওয়া কঠীন । কারণ টা আগেই বলেছি । একা ছাত্রদের পক্ষে সম্ভব নয় শুধু আবেগ সম্বল করে কূটীল রাষ্ট্রযন্ত্রকে মোকাবিলা করা । সঠিক ফলদায়ী আন্দোলন সম্ভব সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে । তাদের বাঁকা শিরদাঁড়াটা সোজা করার মাধ্যমে । প্রয়োজনে সহিংস শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে ।

আসলে আমাদের আমজনতার মাথায় ছোটবেলা থেকেই একটা কথা গেঁথে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম (পড়ুন আগ্রাসন / সন্ত্রাস) ছাড়া আর বাকী সবকিছুই জঙ্গিবৃত্তি । তাই সাধারণ মানুষ সহজে সেই পথে হাঁটতে চায় না । যাদবপুরের ছেলে মেয়েগুলোকে দেখে যদি এদের ধারণার পরিবর্তন হয় । শিরায় শিরায় বিপ্লবের অনুভুতি সংক্রামিত হয় । যাদবপুরের মতই নিজেদের ইস্যু নিয়ে নিজেরাই অনমনীয় ভাবে সংগ্রাম করতে পারে আর আস্তে আস্তে জিগস পাজেলের মত বিপ্লব জুড়তে থাকে হাতে হাত আর চেতনার একাত্মতায় তবেই সার্থক হয়ে উঠবে যাদবপুরের আন্দোলন বা বিজয়োৎসবের ছবিটা ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s