জলছবি

তিন্না মেয়েটা বরাবরই বড্ড অদ্ভুত । একটা এই বয়সের টিনেজারের স্বাভাবিক লক্ষণগুলো যে তার নেই, এমনটা নয় । সেগুলোতো আছেই, তার সঙ্গে এক্সট্রা প্যাকেজ হিসেবে আছে তার অবিরাম ছেলেমানুষী । কখনও রাস্তার মাঝখানেই বাচ্ছাদের মত লাফালাফি শুরু করে দেয়, পাগলের মত উচ্চস্বরে হেসে ওঠে রাস্তার লোকের তীর্যক বা ভ্যাবলা দৃষ্টির তোয়াক্কা না করেই । কখনও কোনো পাঁচিলের ওপর দুপুরের আলস্যে শুয়ে থাকা বেড়ালকে তুলে নিয়ে চটকে আদর করে সে কী কান্ড ! অবস্থা এমন যে ওর কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময়টাতে পথের দু ধারের যত বেড়াল ওর নাগালের বাইরে কারুর বাড়ির ছাদ বা কার্ণীশে উঠে বসে থাকে । এতটাই ছেলেমানুষ যে গোয়াল টাইপ কোচিং ক্লাসে চারদিকের চব্বিশ জোড়া বয়সের ধর্মে নীম্নগামী চোখের অস্তিত্ব বেমালুম বেখেয়াল করে স্কার্টের অসুবিধাজনক অবস্থানে বিন্যস্ত্য হয়ে যাওয়াকে কেয়ার ই করেনা । সেটা অবশ্য ওর পক্ষে খুব একটা দোষের নয়, ভাবেন অনামিত্র বাবু । ওর জন্মের বছর দুয়েক আগে থেকেই তো তিনি আর আইটি কোম্পানিতে কর্মরতা তাঁর স্ত্রী স্টেটসে চলে যান কোম্পানির ট্রান্সফারে । তিন্নার শৈশব আর কৈশোরের বেশ কিছুটা তো ওদেশেই ।

সে যাই হোক এই ছেলেমানুষির জন্যই কি তিন্না আজ এরকম একটা ভুল নেশায় মজেছে ? প্রতিদিন কলেজ ছুটির পর ঐ আধবুড়ো লোকটার বাড়ি কিসের জন্য যায় ও ? এমন কী কলেজ যেদিন থাকেনা সেদিনও বন্ধুদের সঙ্গে হ্যাং আউটে যাওয়ার নাম করে ঐ রকম নির্জন একটা বাড়িতে লোকটার সঙ্গে কী করে ও ? কী যে করে সেটা বিলক্ষণ আন্দাজ করতে পারছেন অনামিত্র বাবু । ইদানিং ওর মন বেশ খুশী খুশী থাকছে । ওর চিরকালীন সেই মুড সুইঙ্গের সমস্যাটাও আজকাল নেই বললেই চলে । এসব কিসের লক্ষণ তা ভালোই বুঝতে পারা যাচ্ছে । নাঃ ব্যাপারটা কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবেনা ।

প্রতিপত্তির জোড়ে হয়না এরকম কাজ খুব কমই আছে । অনামিত্র বড় কোম্পানীর ম্যানেজার এখন । তিনটে ফ্ল্যাট, অনেকগুলো গাড়ি । পকেট থেকে আই ফোনটা বার করলেন, “হ্যালো, বিধান নগর থা…”

রাত্রের মেনুতে আজ একটা স্পেশাল জিনিস রয়েছে । অনেক দিন পর তিহান নিজের হাতে কুকীস বানিয়েছে । অফিসের প্রেসারে আজকাল নিজের হাতে তো ওর কিছু বানানোই হয়ে ওঠেনা । আজ বোধ হয় অফিস থেকে একটু আগে ফিরেছে, কাজের মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে এইসব বানিয়েছে ।

ক্রীম কালারের মাঝে চকলেটের ডোরা দেওয়া বিভিন্ন আকারের কুকী । কোনোটা মাছের মত, কোনোটা স্টার কয়েকটা হার্ট শেপ বানাতে গেছিলো কিন্তু বেশী পাতলা হওয়ায় ভেঙ্গে গেছে । তিন্না মায়ের তৈরি কুকি খেয়ে ভীষণ এক্সাইটেড । মেয়েটাও মায়ের মতই খেতে ভালবাসে, বড্ড মিল সবকিছুতেই মায়ের সঙ্গে, এমনকি মা – মেয়ের গজদাঁতগুলোও একদম অবিকল ।
তিন্না মা কে বলছে “মম তোমার কাল ছুটি আছে না ? কাল তোমায় আমার এক ফ্রেন্ডের সঙ্গে মিট করাবো, দারুণ কেক বানায়” । মেয়েটা মায়ের ন্যাওটা বড্ড বেশী । আসলে কাজের প্রেসারে দুজনের কেউই খুব বেশী সময় মেয়েকে দিতে পারেন না । হয়ত মেয়েটার সেই একাকিত্বের সুযোগ টা নিয়েই ঐ আধবুড়ো স্কাউন্ড্রেল পারভার্টটা … । ভাগ্যিস সেদিন ঐ রাস্তায় একটা কাজ সেরে পার্কিং থেকে গাড়িটা বেরোতে গিয়ে ব্যাপারটা হঠাত করেই চোখে পড়ে যায় সাম্যর, ঐ তো এতবড় ডিজাস্টারের খবর টা দেয় অনামিত্রকে । সাম্য তিহানের কলেজ ফ্রেন্ড । সত্যিই ফ্রেন্ডের কাজ করেছে ও ।

সাপার সেরে উঠে অনেক খরচা করে বানানো ব্যক্তিগত সেলরটার দিকে যাচ্ছিল অনামিত্র । এমন সময় ফোন বেজে উঠল,

“হ্যাঁ স্যার হ্যালো, কড়কে দিয়েছি স্যার আচ্ছা করে । আর কোনো লাফড়া করার সাহস পাবেনা”

“হ্যাঁ স্যার একদম, কিচ্ছু চিন্তা করবেন না । আমরা তো স্যার আপনাদের সেবাতেই আছি, আর স্যার ইয়ে …”

“মানে প্যাকেটটা একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবেন হেঁ হেঁ”

ফোনটা কেটে মুচকী হাসে অনামিত্র । সেলারটা খুলে ব্ল্যাকডগের কর্কটা খুলে পাঞ্চ করতে থাকে গভীর প্রশান্তিতে …

* * * * * *

কালকে রাত্রে ঝামেলাটা মিটে গেলেও অনামিত্রর নিজের একবার দেখে আসার ইচ্ছা করছে । কে এমন সে লোক যার জন্য তিন্নার মত মেয়ে হাবুডুবু খায় !!! বেলার দিকে সেক্রেটারিকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে গাড়িটা নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়ল অনামিত্র ।

বাব্বাঃ ! বাড়ীটা তো বেশ এলিগ্যান্ট ! যদিও বেশ পুরোনো । বোঝাই যাচ্ছে মেন্টেনেন্স হয়নি বহুদিন । লোকটা এই বাড়িটায় একলা থাকে ! এখানেই আসে তিন্না প্রতিদিন ! কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল অনামিত্রর মনে । লোকটাকে একবার দেখলে হয় । পরিচয় না দিলেই চলবে । গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকে কলিং বেলের সুইচ টিপল অনামিত্র । কোনো আওয়াজ নেই । নেই নাকি ব্যাটা বাড়িতে ? নাকি কাল কড়কানী খেয়ে কেটে পড়েছে ? দরজায় নক করে দেখবে ? নক করতে যেতেই হাতের চাপে দরজাটা সড়ে গেল । আসলে আটকানোই ছিল না ওটা ।

কিসের এক অদম্য আকর্ষণে সাত পাঁচ না ভেবেই বাড়ির ভিতরে ঢুকল অনামিত্র ।

এ কী ! গোটা দেওয়ালে টাঙ্গানো অসংখ্য হাতে আঁকা ছবি । লোকটা আর্টিস্ট নাকি ! ছবির মধ্যে অধিকাংশ ছবি আবার তিন্নার । নাহ একদম ঠিক ঠাক তাহলে আন্দাজটা । ঘরটা অসম্ভব অগোছালো আর ড্যাম্প । এতটাই খারাপ অবস্থা যে ছবিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ১৫ – ২০ বছরের পুরোনো । কয়েকটা ছবিতে আবার তিন্নার পাশে একটা ছেলেকে দেখা যাচ্ছে । এটা যদি ঐ লোকটার নিজের ছবি হয়, তাহলে ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত, কারণ ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে তিন্নারই বয়সী । কেস টা কী !!! অবশ্য মানুষের শখ তো অনেক কিছুই হয় । ছবিতে নিজেকে কমবয়সী করে আঁকা অস্বাভাবিক কিছু নয় । আরে !!!

পায়ে হোঁচট খেয়ে চমকে নীচের দিকে তাকালেন অনামিত্র, এতক্ষণ দেওয়ালের ছবি দেখতে দেখতে খেয়াল করেন নি নীচেটা । নীচে পড়ে আছে একটা আধবুড়ো লোক । গালে জমাটবাঁধা রক্তের দাগ । চোখের তলায় কালশীটে । শরীর বরফের মত ঠান্ডা । জমে কাঠ । মুখ থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত কালো হয়ে জমে আছে মেঝেতে । সম্ভবতঃ কাল রাত্রেই ।

হঠাত করেই বাইরে তিন্নার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল । কিংকর্তব্যবিমূঢ় অনামিত্রর কিছু ঠিক করতে পেরে ওঠার আগেই দরজা ঠেলে মা কে নিয়ে ঘরে ঢুকল তিন্না । বাপি কে দেখে অবাক হওয়াটা আটকে গেল নীচে পড়ে থাকা লাশটা দেখে । প্রচন্ড এক চীৎকার করে মায়ের বুকে মাথা গুঁজল তিন্না ।

পাথরের মত নিশ্চল তিহান তখন এক দৃষ্টে চেয়ে আছে লাশটার দিকে । ঘরে অনামিত্রর উপস্থিতি যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে তার নিষ্পন্দ চোখের তারায় ।

অভিজ্ঞ ম্যানেজার অনামিত্রর ধাতস্ত হতে কয়েক সেকেন্ডের বেশী লাগল না । কিন্তু চোখ আটকে গেল এক কোণে রাখা ইজেলে আটকানো একটা অসমাপ্ত ছবিতে । ধবধবে সাদা কাগজে কালো পেন দিয়ে আঁকা তিন্না আর আধবুড়ো লোকটার ছবি । নাঃ বয়স কমানো নেই । নীচে লেখা আছে “জন্মদিনে আমার পাতানো মামণীকে অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা”

লেখার নীচে সইটা বোধ হয় আর করা হয়ে ওঠেনি বাইশ বছর আগে রঙিন প্রেমে মশগুল তিহানের সঙ্গে একটা সুখী সংসার, একটা ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্ন দেখা লোকটার ।