যুক্তি বিশ্বাস

সম্প্রতি ছ্যাঁকা খেয়েছি । পূর্বে যে কখনও ছ্যাঁকা খাইনি এমন নয় । তবে শুধু অভিজ্ঞ মাথা নেড়ে তো আর পোড়ার জ্বালা মেটানো যায়না । তাই বাস্তবিক ক্ষতস্থানে প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যাপক প্রদাহের সৃষ্টি হয়েছে ।

সেই কবে দশমশ্রেণীপাঠরত বালক প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর নয় । অবশ্য বালক আদৌ বলা যেত কিনা জানিনা, কারণ অন্য কারুর সাক্ষ্য দিবার প্রয়োজন নাই, নিজের কাছে মিথ্যে বলে কী লাভ । মনের পরিপক্কতা দেহের পরিপক্কতাকে রেসে বেশ পিছনেই ফেলে দিয়েছিল সে তথ্য রেসিং ট্রাক স্বরূপ বালক বা লোক টি ছাড়া কে ভাল জানবে ! যাই হোক সেই নৈব নৈব চ যে কখন কোন নালা দিয়ে গড়িয়ে গঙ্গা ভায়া হয়ে সাগরে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও ইতিহাস বিলীন করে দিল তার হিসেব লিখে রাখতে বেমালুম ভুলে গেছি ।

এর জন্য আমায় দোষ দিলে কিন্তু অনুচিত হবে । আছাড় খাওয়া, পোড়া ইত্যাদি বলে কয়ে, সাবধানতার ধার ধরে আসে না । সেজন্যই তো এগুলোকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে । সাবধানতা নিলে তবুও দুর্ঘটনা কিছুটা আটকানো যায় । কিন্তু বাঙালীর বিরহ মন্থিত দীর্ঘশ্বাসোদ্ভুত প্রতিজ্ঞা এক্ষেত্রে নির্জন গলির দেওয়ালে “এখানে প্রস্রাব করিবেন না” লেখার মতই নিষ্ফল ।

যাই হোক ক্যারদানী মারতে গিয়ে দুর্ঘটনার একটা মদীরার ন্যায় পূর্বরাগ থাকে । ট্রেণে ঘা খেয়ে অকালে চন্দ্রবিন্দু হওয়া ছেলেটাও “এই সেলফি টা ক হাজার লাইক পাবে” হিসেব গুণে মিচকি দাঁত কেলিয়ে টেলিয়ে টপকায় । তা আমার ছ্যাঁকা খাওয়াপূর্ব মধুচন্দ্রিমা (বাস্তবিক মনে করবেন না, অত সাহস আমার নেই, রূপকার্থে ব্যবহৃত) বছর চারেক চলেছিল । দিব্যি উড়ছিলুম, আগুনের লেলিহান সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে দেদার ঘি ঢেলে চলেছিলুম । আসলে আগের ছ্যাঁকা খাওয়ার স্মৃতি যে ততদিনে বেদম হাওয়া । ঘৃতপুষ্ট অগ্নী যে সময়-সুযোগ মত আমাকেই গ্রাস করবে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে স্বমেধ যজ্ঞ মোটামুটি অর্গানাইজ করে ফেলছিলুম ।

যাই হোক সে যা হয়েছে হয়েছে । গায়ে আবার একই রকম ফোস্কা পড়েছে । জ্বালার অভিন্নচরিত্রও হাড়ে হাড়ে মালুম হচ্ছে । পর্যায়ক্রমে ক্ষোভ, দুঃখ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, অসূয়াদি স্তর কেটে গিয়ে এখন কেবল বিষম জ্বালা আর “প্রমিসেস আর মেড টু বি ব্রোকেন” প্রবাদানুমতির দরাজ সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে অবিরাম খিস্তি করতে করতে এগেন প্রমিস (এবারে এক্কেবারে ক্ষত্রিয় টাইপ প্রমিস বুইলেন কিনা মশাই) পর্যায় চলছে মনে ।

তো বিরহ অতি বদ জিনিস । এমনি বিবাহিত লোকেদের বউ দুদিন বাপের বাড়ি গেল কিম্বা নবীন প্রেমী যুগলের (নবীন বললুম কারণ প্রেমের প্রবীণত্বের পরিণতির ভুক্তভুগী তো) বিরহ বেশ অম্ল-মধুর একটা জিনিস । কিন্তু “প্রাক্তন প্রেমিকা পাত্তা দিচ্ছেনা, সম্ভবতঃ অন্যকারুর সাথে মাল্টিপ্লেক্সে বসে পপকর্ণ খেতে খেতে নিউ রিলিজড সিনেমা দেখছে” এই টাইপের বিরহ অত্যন্ত অস্বস্তির একটা ব্যাপার যেটা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অনর্থক একটা বিরাগ তৈরি করে দেয় । যদিও সেটা গোপন অনুরাগের একটা রূপভেদ মাত্র তবুও সেই বিরাগ প্রথম প্রথম বাঁশের কেল্লার মতই আবেগদুর্ভেদ্য থাকে ।

তো বিরাগের সার্বক্ষণিক আঘাতে এবং এমনিতে অবদমিত কিন্তু অদৃশ্য প্রতিপক্ষ রিপ্লেসমেন্টটির প্রতি অসূয়াবশতঃ সহসাজাগ্রত শরীরের উৎপাতে তিতিবিরক্ত হয়ে একদিন গিয়ে হাজির হলুম বেণুদার আস্তানায় ।

বেণুদা লোকটি অত্যন্ত্য জ্ঞানী একজন ব্যক্তি । শুধু আনন্দ ঘন্টা জাতীয় মিডিয়ায় সশব্দ উপস্থিতির জন্য আবশ্যকর্ম তাঁবু বহন করে পশ্চাদানুসরণের পটুত্ব না থাকায় বাঙালী তাকে সেইভাবে চিনল না । তাতে অবশ্য তাঁর বিশেষ দুঃখ নেই । পেশায় ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার বেণুদা নির্দিষ্ট কোনো চাকরী করেন না । এখনও পর্যন্ত আমার জানা মতে ১৬ টি চাকরী ছেড়েছেন । এখন সম্ভবতঃ ১৭ নম্বরটির জন্য রেডি হচ্ছেন । চাকরী যে নিজেই ছেড়েছেন তা ১৬টি চাকরীর বিরাট লিস্ট দেখলেই বোঝা যায় । আসলে তাঁর অনন্যসাধারণ মেধার কথা কম্পানীগুলি ভাল ভাবেই জানে । তাই চাকরী ছাড়তে তাকে বিস্তর বেগ পেতে হলেও পেতে কোনো সমস্যা হয় না । চাকরীর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মৌলিক গবেষণা মাঝে মাঝে আমরা ইন্টারনেট ও ফেসবুকের কল্যাণে জানতে পারতাম । চাকরী সূত্রে মাঝে মাঝেই ভিন রাজ্যে উধাও হয়ে যাওয়া এবং আস্তানা পাল্টানো বেণুদার স্বভাব ছিল ।

তা গেছো দাদা কোথায় আছে পদ্ধতিতে রীতিমত হজবরল নেটওয়ার্ক খাটিয়ে বের করলুম গুজরাটের ১৬ নম্বর চাকরীটিতে ইস্তফা দিয়ে বাংলায় ফিরে ইদানিং তিনি বেহালার পৈত্রিক বাড়ির বদলে আমাদের পুরাতন আনন্দক্ষেত্র, কলেজস্মৃতি বিজড়িত বেলঘড়িয়ায় একটি মেস ভাড়া করে বসবাস করছেন ।

মনের জ্বালা মেটাতে একদিন তাই বুড়ো সাধুর একটা পাঁট নিয়ে চললুম গুরুর কাছে । বেণুদা আমাকে দেখেই স্বভাবসিদ্ধ ভাবে খিস্তিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল । দুপুরে জমিয়ে শূল্যপল সহযোগে ভাত আর বুড়ো সাধুর উত্তাপ নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হল । প্রেমের অসারতা সম্পর্কে বেণুদা আমার সমস্ত সংশয় দূর করে দিল । ভেনডায়াগ্রামাদি করে এবং রীতিমত ক্যালকুলাশ কষে আমায় বুঝিয়ে দিল । প্রেম আসলে অগাণিতিক শূন্যের মতই একটা অসম্ভব বস্তু । বাংলা গল্প ও বিদেশের নানা কাহিনীর বিপথগামী নায়ক নায়িকাদের দৃষ্টান্ত ও তাঁর বক্তব্যকেই সমর্থন করল । জগতে প্রেমের আসল চরিত্র আমার কাছে একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল । বেদে যেমন বলেছে “ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা” তেমনি “অভিনয় সত্য, প্রেম মিথ্যা” এ বিষয়ে আমার আর কোনো সংশয়ই রইল না । যাক দোলাচলে দোলার চেয়ে এ একরকম ভাল হল । এখনও ভালবাসে কি ভালবাসেনা ভাবতে ভাবতে প্রাত্যহিক হোয়াটসঅ্যাপের স্টেটাস চেক আর ফেসবুক ওয়াল আঁতিপাতি করে খোঁজার চেয়ে এ সত্যোপলব্ধী অনেক ভাল ।

বেশ হৃষ্ট চিত্তে সিগারেট টানতে বারান্দায় গেছিলাম । এসে দেখলাম বেণুদা মোবাইলে কার সঙ্গে যেন খুব হাসিখুশী ভাবে কথা বলছে । ফোন রাখার পরে আমার প্রশ্নের উত্তরে নির্বিকার ভাবে বলল “তোর হবু বউদি ফোন করেছিল” ।

আমি বিস্ময়ের চোটে প্রায় সাতহাত বাঞ্জি জাম্পিং এর মত লাফ দিয়ে বললাম, “মানে ???? তুমি ই না এই মাত্র আমায় প্রমাণ করে দেখালে যে প্রেম ট্রেম সব অসার । থিওরিটিক্যালি অসম্ভব জিনিস !!! আবার সেই তুমি তুমি এখন ……”

অত্যন্ত্য বিজ্ঞ মুখ করে বেণুদা বলল “তো কি হয়েছে !!!, তুই একটা আস্ত পাঁঠা । ওটা থিয়োরী, এটা বাস্তব । ওটা যুক্তি, এটা বিশ্বাস”

***********************

দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সেই মুহুর্তে বেণুদার চুরুটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে চলে এসেছি । সেই থেকে আর বেণুদার মুখদর্শন করছিনা, মেসেজের উত্তর ও দিচ্ছিনা । বোদ্ধা লোকজনকে আজকাল যদ্দুর পারছি এড়িয়ে চলছি … হুঃ !!!