কাজ / অলস সময়ে

অলস সময়ে বন্ধ ঘরের তালা গুলো খুলে খুলে দেখি । ঘর একটা নয় । অনেক গুলো । একেকটা ঘরের একেকজন বাসিন্দা । আলাদা আলাদা দেওয়ালের রঙ, আলাদা সাজগোজ । একজনের ঘরে অন্য জনের প্রবেশাধিকার নেই । কেউ যখন চলে যায় তখন তার ঘরেও চাবি পড়ে যায় । কিন্তু সে ঘর শুধু তারই । নতুন করে কেউ আর সেখানে দখলদারী নিতে পারেনা ।

তাই অলস সময়ে একেকটা ঘর খুলি । কখনও তার ভিতরে গিয়ে আরাম কেদারায় বসি । টেবিলে ফেলে যাওয়া অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পড়ি । কখনও ইঁট, ধূলোয় হাত বোলাই ।

আজ বার বার অসতর্ক মুহুর্তের স্বপ্নগ্রস্ততার তাড়ণায় যে ঘরটায় ঢুকে পড়েছিলাম তার দেওয়ালে একটা সাদাকালো বেড়ালের ছবি হেলে রয়েছে । টেবিলে একটা বোর্ণভিলের প্রাগৈতিহাসিক প্যাকেট । দেওয়ালের পলেস্তারা খসা অংশে বেরিয়ে থাকা ইঁটে হাত বোলালাম । মনে পড়ে গেল এই ঘরটা গাঁথার ইঁট এসেছিল কত্ত জায়গা থেকে । কোনোটা আধো অন্ধকার গলির বুড়ো সাক্ষী পাঁচিলটা থেকে, কোনোটা আগরপাড়া স্টেশনের বসার জায়গা গুলো থেকে, কোনোটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে, কোনোটা মানিস্কয়ার, সিটি সেন্টার বা কলেজের পাশের অনেক দীর্ঘ প্রতীক্ষার সাক্ষী বট গাছটার বাঁধানো গুঁড়ির থেকে ।

ক্যালেন্ডারে চোখ পড়ল । কয়েকটা ডেট ফিকে হয়ে যাওয়া কালিতে গোল করা আছে । তার মধ্যে একটা ১৬ই আগস্ট ।

তারিখটায় চোখ পড়তেই কোত্থেকে দমকা একটা হাওয়া এসে অসমাপ্ত পান্ডুলিপিটা ছত্রাকার করে উলটে দিল । হাতে এসে পড়ল একটা পাতায় আঁকা একটাই দৃশ্যের ছবি —-

একটা নির্জন পুকুরের ধার, দুজন নতুন প্রিয় বন্ধু পাশাপাশি, হঠাত করে খুঁজে পাওয়া স্বপ্নের চরিত্রটার বাস্তবতা সম্বন্ধে অবাক হয়ে ভাবছে আর কী যেন বলি বলি করেও বলে উঠতে পারছে না । শেষে বড় বড় টানা টানা চোখের মেয়েটাই অসহিষ্ণু হয়ে বলে উঠল, “তোর কিছু একটা বলা উচিত । বল”

ছেলেটা সব জেনেও ব্যাপারটা সত্যি এটা বিশ্বাস করতে পারছিল না । তাই বুঝলেও আরেকবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলল, “কি? কি বলব ?”

মেয়েটা, “দ্যাখ, আমি কিন্তু সেই সব লোকেদের একদম পছন্দ করিনা যারা ভিতু”

ছেলেটা বেশ কয়েকবার ঢোক গিলে অতি কষ্টে, “আই …”

মেয়েটা উজ্জ্বল – উচ্ছল চোখে, “হ্যাঁ হ্যাঁ বল, বল”

– ” আই লাভ ইউ”

১ মিনিটের নিস্তব্দতা, শুধু পুকুরের ধারের রাউল গাছটায় একটা পাখি “টির-টির টির-টির” করে ডাকছে ।

হঠাত মেয়েটার বিশাল বিশাল স্বপ্নালু চোখ গুলো আরেকটু বড় হল আর “এত দিন সময় নিলি ! আমি যে কবে থেকে এটা শোনার জন্য ওয়েট করে আছি …”

.
.
.
নাঃ …… ঘরের তালাটা বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম । আমার এখন প্রচুর কাজ আছে না । সামনে লক্ষ্ণৌএ শো, তার পর কতদিন ধরে ভাবছি সাইকেলের চেনটা ঠিক করতে হবে, ঘরটা একটু গোছাতে হবে … ধূলো ঝাড়তে হবে …

প্রচুর কাজ, প্রচুর …