সিদ্ধাই

প্রধানপুরের হাটতলায় আজ প্রচুর ভীড় । প্রত্যেক মঙ্গলবারেই এরকম ভীড় থাকে । আজ যে পাগলাবাবার দর্শন দেওয়ার দিন । অতবড় সিদ্ধপুরুষ এ তল্লাটে আর কোথাও নেই । যে রোগ ডাক্তার বদ্যি ভাল করতে পারেনা সে রোগ বাবার সামান্য স্পর্শেই ভাল হয়ে যায় । এই তো গত মঙ্গলবারের আগের মঙ্গলবার, এক চলচ্ছক্তিহীন জড়ভরত ছেলেকে তার বাপ মা ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল বাবার কাছে । বাবার এক লাথি খেয়ে সেই ছেলে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বাপ-মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে গেল । হাটতলার সব্বাই দেখেছে সেই অলৌকিক দিব্য ঘটনা । যারা স্বচক্ষে দেখেনি তারাও শুনেছে প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের মুখ থেকে । সত্যি এমন সাধক এ যুগেও হয়, না দেখলে প্রত্যয় হবে না ।

তাই আজকেও ব্যতিক্রম হয়নি । ভোর থেকে লম্বা লাইন । কেউ এসেছে বহু দিনের পুরোনো রোগ থেকে নিশ্চিত মুক্তি পাবার আশায় । কেউ এনেছে কোন মরণাপন্ন প্রিয়জনকে । হাটের পাশের শ্মশানের পঞ্চবটীতলায় বাবা বসে আছেন । পরণে লাল পাড় সাদা কাপড়, মাথায় সেটাকেই ঘোমটা করে দেওয়া । বাবা আসলে মা কালীকার সখীভাবে সাধনা করেন তো । চোখ মাথায় আঁকা সিঁদুরের তিলকের মতই লাল । পাশে একটা নরকরোটিতে কারণ বারি রাখা রয়েছে । বাবার একপাশে দুই চেলা । দুজনেই সিড়িঙ্গে, দেখলে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় এরা আদৌ জীবিত মানুষ কিনা । তাদের সামনে স্তূপাকৃতি হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন দানসামগ্রী । ফলমূল, কারণ বারির দেশী ও বিদেশী বোতল, চালডাল । আরেকদিকে পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে রয়েছে খুচরো আর নোট । বাবা কারুর থেকে কিছু চাননা, কেউ কিছু দিলে তা স্পর্শ অব্দি করেন না । যা করার শিষ্যরাই করে ।

বাবার সামনে এখন একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা । সে উঠে দাঁড়াতে পারেনা । তার বাপ-মা গরীব চাষি, অনেক আশা নিয়ে ছুটে এসেছে পাগলা বাবার কাছে । চাষি তার হাতের মস্ত ডালা ভর্তি চাল, আলু কলা, কারণবারির বোতল বাবার পায়ের কাছে রেখে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল । তার পর ডালাটা নিয়ে গিয়ে শিষ্যদের কাছে জমা করে দিল । এদিকে চাষি বউ এতক্ষণে ইনিয়ে বিনিয়ে বাবার পা ধরে কান্না শুরু করেছে । পেছনের লাইন থেকে অন্য লোকেরা তাড়া দিয়ে উঠছে “কই হে তাড়াতাড়ি সার, আমরাও তো আছি নাকি, বেলা বেড়ে যাচ্ছে”

“চোপ !!!” বাবার এক ধমকে লাইনের ভিতর থেকে ওঠা অসন্তোষের গুঞ্জনটা একদম থেমে গেল । পাগলা বাবা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন “এই শালা, ওঠ … ওঠ বলছি”

পিলে চমকানো গলায় আদেশে ছেলেটা নড়ে নড়ে ওঠার চেষ্টা করল । কিন্তু পারল না ।

“তবেরে হারামজাদা, উঠবিনা , ওঠ বলছি ওঠ” বলে পাগলা বাবা সটান ছেলেটার কাঠির মত সরু সরু পা গুলোর ওপরে দাঁড়িয়ে পড়লেন । ছেলেটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল । পা দিয়ে আচ্ছা করে রগড়ে পাগলা বাবা নেমে দাঁড়িয়ে বললেন “ওঠ এবার, ওঠ বলছি নইলে তোর পা দুটো এবারে একদম ভেঙ্গে দেব, ওঠ খালভরা”

ছেলেটা এবার অতি কষ্টে পাগলাবাবার পা ধরে ধরে উঠে দাঁড়াল । তবে বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারল না। আবার পড়ে গেল ।

“যাঃ নিয়ে যা একে, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে ।”

জয় পাগলা বাবার জয় … চারদিকে জয়ধ্বনী উঠল । চাষি তার বউ আর ছেলেকে নিয়ে প্রণাম করে চলে গেল ।

লাইনে পরের জন একজন পঙ্গু । অতি কষ্টে ঘষে ঘষে বাবার বেদীর সামনে এগিয়ে এল । হাতে একটা একশ টাকার নোট আর একটা একটাকার কয়েন । বাবার পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করল । বাবা তাকে দেখেই বললেন ” তোর রোগ ভাল হওয়ার নয়, অনেক পাপ করেছিস” ।

“বাবা একটু আপনার চরণের ছোঁয়া দিন । আমার বিশ্বাস আমি ওতেই ভাল হয়ে যাব । যতটুকু হয় ভাল হয়ে যাব, দয়া করুণ বাবা” – কাকুতি মীনতি করে পঙ্গু লোকটা ।

“আচ্ছা যাঃ ভাগ” বলে পাগলা বাবা লোকটাকে সজোড়ে একটা লাথি মারতেই পাগলা বাবা ছিটকে পড়েন গাছের গোড়া থেকে । থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে তারস্বরে চীৎকার করতে থাকেন “ওরে মরে গেলুম, মরে গেলুম” । সিড়িঙ্গে শিষ্যদুটো লাফিয়ে উঠে পঙ্গুটাকে ঠেলে পাগলা বাবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই তাদের দুজনের ও হাল হয় একই রকম । দুজন ছিটকে পড়ে দু দিকে । আর কাটা পাঁঠার মত ছটফট করতে থাকে ।

হঠাত পঙ্গু লোকটার চারদিকে এক উজ্বল আগুণের মত আলোয় ভরে যায় । সমস্ত লোকের চোখ ঝলসে যায় তাতে । লোকজন চোখ চেয়ে দেখে সেই পঙ্গু লোকটার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন এক সন্ন্যাসী । জটাজুটধারী রক্তাম্বর পরণে । এই অদ্ভুত অলৌকিক ঘটনায় চারপাশের লোক ভয়ে ভক্তিতে বিহবল হয়ে জোড় হাত করে দাঁড়িয়ে থাকে ।

বজ্রগম্ভীর কন্ঠস্বরে পাগলা বাবার দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসী বলে উঠলেন “মূর্খ, তোর সামান্য সিদ্ধাই এর জোড়ে এই ভাবে অনাচার শুরু করেছিস ! জানিস না সাধনার পথে অর্জিত সিদ্ধাইয়ের ব্যবহার অন্যায় ? এতে মানুষের সাময়িক উপশম হলেও পরে অনেক বড় ক্ষতি হয় । এসব জেনেও তুই প্রণামীর লোভে এই মানুষ গুলোকে মিথ্যে আশা দিচ্ছিস !!! ধিক তোকে !!!”

এবার সন্ন্যাসী শূণ্যে হাত বাড়াতেই হাতে এক বিশাল ত্রিশূল উপস্থিত হল । সেই ত্রিশূল বাগিয়ে তিনি পাগলা বাবা ও তার দুই চ্যালাকে বললেন “আজ এই মুহুর্তে এখান থেকে পালা, নইলে আমার এই ত্রিশূল দিয়ে তোদের ভস্ম করে দেব” । শুনে পাগলা বাবা আর তার দুই সিড়িঙ্গে শিষ্য আর সেখানে দাঁড়ালো না কাঁপতে কাঁপতেই উঠে দাঁড়িয়ে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে দৌড় লাগাল ।

এবার চারপাশের ভেবলে যাওয়া লোকজন কে সন্ন্যাসী গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন “যাও তোমরা যে যার কাজে যাও, বিপদে পড়লে ঠাকুর কে ডেকো ওতেই হবে । তবে শুধু ঠাকুর কে ডাকবে, নিজে বিপদ কাটানোর কিছু চেষ্টা করবেনা তাহলে হবেনা । যে কর্ম করে, চেষ্টা করে, মা তাকেই দয়া করেন । যাও যাও ।”

এবার সন্ন্যাসী হাঁটা দিলেন উত্তর দিকে । ঝোপ জঙ্গলে ভরা রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে যাওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে দেখলেন লোক জনের ভিড় পাতলা হতে শুরু করেছে । এ কদিনের জন্য । আবার কদিন পরেই অন্য কোন গুরু এসে হাজির হবে এদের সমস্যা সমাধানে । সন্ন্যাসী এগিয়ে চলল ।

ত্রিশূলটা গুঁটিয়ে নিয়ে ঝোলায় ভরে নিয়েছে সে । ড্রেস চেঞ্জের সাজ টা খুলে সাধারণ পোশাকে ফিরতে অনেক সময় লাগবে আর এভাবে রাস্তার মাঝে অসুবিধাও বটে । অতি সাবধানে কোমর থেকে টেসলা মডিউলটা খুলে ঝোলায় ভরে নেয় । একটু এদিক ওদিক হলে নিজেই চারহাজার ভোল্টের শক খেয়ে বসে থাকবে ।

আরেকটু এগোলেই স্টেশন । টয়লেটে ঢুকে ড্রেসটা সুযোগ মত চেঞ্জ করে নিতে পারলে ভাল হয় । না পারলেও ক্ষতি নেই । টিকিট যখন আছে তখন এই পোশাকেই দিব্যি কলকাতা চলে যাওয়া যাবে ।

আজকের কাজটা ভালই হয়েছে । এই রকম না করে যদি ঐ ভক্তদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লৌকিক-অলৌকিক, বিজ্ঞানমনস্কতা এই সব নিয়ে এক্সপ্ল্যানেশন দিতে যেত তাহলে ওকে আজ আর বেঁচে ফিরতে হত না । ওখানেই ওকে সত্যিকারের পঙ্গু বানিয়ে রেখে দিত । হুঁ হুঁ বাবা গণধোলাই অতি ডেঞ্জারাস জিনিস । পাগলা বাবার মুখটা মনে পড়তে হেসে ফেলল শখের যাদুকর ও সমাজসেবী অনিন্দ্য । স্টেশন এসে গেছে ।

প্ল্যাটফর্মে উঠে কয়েকপা এগোতেই পিছন থেকে কী যেন একটা পায়ে জড়িয়ে গেল অনিন্দ্যর । ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে এক অশীতিপর বৃদ্ধা । চোখে হরলিক্সের শিশির কাঁচের মত মোটা মোটা লেন্সের চশমা । অজস্র কুঞ্চনে ভরা গাল চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে ।

রীতি মত বিব্রত হয়ে সে বৃদ্ধাকে পা থেকে সরিয়ে বসাতেই বৃদ্ধা কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল “বাবা আমায় দয়া কর, আমার তিন কূলে কেউ নেই। একটা নাতি যাও বা ছিল পাঁচ বছর আগে সে হারিয়ে গেছে বাবা, আমি প্রতি দিন এইখেনে এসে বসে থাকি গো বাবা, আমার সোনামাণিক কে একবার মরার আগে দেখতে না পেলে যে আমি মরেও শান্তি পাবনা”

“বাবা তুমি বল আমার নাতি আমার কাছে ফিরবে তো ? বল না বাবা বল না”

মনের মধ্যে যুক্তি অযুক্তি, উচিত অনুচিতের দ্বন্দে অস্থির হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত বুড়ির বাঁধ ভাঙা কান্নায় থাকতে না পেরে অনিন্দ্য বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, ফিরবে গো তোমার নাতি, তোমার চিন্তা নেই, খুব শিগগীরি ফিরবে”

এই তুচ্ছ একটা কথার আশ্বাসে বুড়ি কান্না থামাল, “তোমার অনেক দয়া বাবা, তুমি বলেছ, আর চিন্তা নেই, আমি রোজ এইখেনে এসে বসে থাকব”…. বুড়ি চলে গেল ।

একটু পরে একটা অল্পবয়সী মেয়ে এসে প্রণাম করে বলল, “বাবা, কাল আমার আমার পরীক্ষা, ভাল হবে তো বাবা ?”

এবারে আর দেরী হলনা, সহজ ভাবেই আশীর্বাদ করে অনিন্দ্য বলল “খুব ভাল হবে, যাঃ” ———– মনের ভেতর দ্বন্দটা এখন আর তাকে অস্থির করছেনা ।

কলকাতার ট্রেণের আর দেরী নেই । পাশে একটা কাগজওলা হাঁকছে, “তাজা খবর তাজা খবর, দিল্লীতে ক্ষমতায় এল আপ … তাজা খবর, গরম খবর”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s