রাখাল ছেলের গল্প

রাজকুমারী তোমার ছবি দেখি দূর থেকে দেওয়ালে । অনেক বড় হয়ে গেছ । কিন্তু দেখতে সেই আগের মতই মিষ্টি আর নিষ্পাপ । বিশাল বিশাল দুটো চোখের জ্বলজ্বলে আদ্রতা যেন দুটো ছোট্ট পৃথিবী । তোমার হাসি মাখা মুক্তোর মত ছোট্ট ছোট্ট দাঁত সেই আগের মতই প্রশান্তি ঢেলে দেয় । অবশ্য এসবই দেখা ঐ ছবিতে । মুখোমুখি চোখের নাগালে যে তোমায় দেখিনি কত দিন ।

জানি এখন তুমি অনেক ব্যস্ত । কত দায়িত্ব, নতুন কর্তব্যের ভার তোমার ওপর । কত নানান দেশের রাজকুমার রাজকুমারীদের সঙ্গে তোমার নিত্যদিনের অনন্দ সমাবেশ । সেই ছেলেবেলার মত আমার বাঁশির সুর আর তোমায় মুগ্ধ করতে পারবেনা এখন । আমার একটা একটা করে খুঁজে পাওয়া বৈঁচীর মালা আজ তোমার জন্য আসা সপ্তসাগরের সব চেয়ে দামী উপহারের সামনে লজ্জায় মুখ লুকোবে ।

সেই মনে পড়ে সবুজ মাঠের জরুল গাছের তলায়, আমি তোমায় শোনাতাম রূপকথার গল্প ? তুমি শুনতে দুচোখ ভরা অপার বিস্ময়ে । আজ সেসব গল্প তোমার বিশ্বাস হবেনা । কারণ আজ তোমার পাণ্ডিত্য সর্বজন বিদিত । নানা দেশের পন্ডিত বিদুষীরা তোমার নিত্য সহচর । আজ অক্ষর না চেনা রাখাল ছেলেটার গল্প যুক্তিহীনতার অপরাধে নির্বাসিত হবে প্রাসাদ থেকে অনেক অনেক দূরে, যেখানে আজও নীল কমল লাল কমলের ঠাকুমা চরকা চালায় আর ফোকলা গালের টোল খাওয়া মুখে চাঁদের আলো চমকায় ।

সেই মনে পড়ে নবাবের মেলায় ? যেদিন নবাবের বাগানে হাজির হয়েছিল তোমারই বয়সী রাজকুমার আর রাজকুমারীরা । সেই তাদের সঙ্গে তোমার প্রথম আলাপ । কত খেলা, আনন্দ নৃত্য গীত । সেদিন তোমায় দেখব বলে বসেছিলাম সারা দিন ফটকের পাশে । আমি যে রাখাল ছেলে, ফটক পেরিয়ে তোমার সঙ্গে খেলার অধিকার যে আমার ছিলনা । তার পর আস্তে আস্তে কখন যেন বড় হয়ে গেলে তুমি ।

তোমায় দেখতে গেছি অনেক বার । কখনও কটা বুনো কুল, কখনও কটা কাঁঠালী চাঁপা, আবার কখনও শুধুই আমাদের পুরোনো দিনের বন্ধু বাঁশিটা হাতে করে । প্রহরীরা আমায় ঢুকতে দেয়নি । তবু গেছি বার বার । শেষে সেদিন যেদিন তুমি হুকুম পাঠালে প্রহরীর মুখে । “তুমি রাজকুমারী, স্বৈরিণী তুমি, সামান্য রাখাল ছেলের সাথে দেখা করে কটা মনগড়া গল্প আর প্রলাপ শুনে সময় নষ্ট করার জন্য জন্ম হয়নি তোমার” । অদৃশ্য রক্ত ঝরেছিল অঝোরে । আর যাইনি । তুমি যে বড় হয়ে গেছ । রাখাল ছেলের সাথে কথা বলা যে আর মানায় না তোমায় ।

আমাদের ছোটোবেলার সেই রূপকথার গল্পগুলোতে কত অধরা স্বপ্নরা কী করে যেন সত্যি হয়ে যেত । রাখাল ছেলে তার রাজকণ্যার সাথে সুখে ঘর বাঁধত ছোট্ট পর্ণকুটীরে । কিন্তু আজ রূপকথারা হারিয়েছে কোনো দূর অরণ্যের গুহায় কিম্বা সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে । আজ যে তোমার রাজ প্রাসাদের দরজায় কম্বিনেশন লক আর বন্ধুদের সমাবেশ আলো করে ডিজে বক্স । আজ আর রাখাল ছেলের প্রবেশাধিকার নেই তোমার জীবনের ভিজিটিং রুমেও ।

তাই বাস্তবের বাস্তবিকতাকে মেনে নিয়ে স্বপ্ন দেখিনা আর । তোমার সমকক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার, ছিল না কোন কালেই । বুঝি । তাই রাখাল ছেলে আজ একা একাই ভালবেসে যায় ।

দেওয়াল থেকে সন্তর্পণে খুলে আনা তোমার একটা ছবি আজ রাখাল ছেলের কথা বলার সাথী আর সকাল বিকেলের বন্ধু । রাখাল ছেলে এখনও সেই সবুজ মাঠের ধারে কুয়াশা ভরা ভোরে গরু চড়ায়, কাঁঠালী চাঁপার মালা গাঁথে আর দেশবিদেশের হরেক রূপকথা বলে যায় আপন মনেই । আর সন্ধ্যার কালচে নীল আকাশে যখন একটা একটা করে হীরের দানার মত তারারা ফুটে ওঠে, তখন সেই পুরোনো দিনের মতই পাতা ছাওয়া জরুল গাছের নীচে বাঁশিতে সুর তোলে রাখাল । বাঁশির সুর মাঠ ঘাট নদী পেরিয়ে মহাকালের পথ বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে দূর, বহু দূরের দিগন্তে ।

ও বাঁশি ওভাবেই বাজবে চিরকাল । কত একসাথে বৃষ্টি ভেজা বিকেল, দু পয়সার সস্তা মিঠাই ভাগাভাগি করে খাওয়া, দুই প্রাণের সখার আরও কত হারানো দিনের, কথা বলবে । একটা সময়ের কথা, যখন তুমি রাজকণ্যা হওনি । যখন তোমার সব আনন্দ অভিমান রাখাল ছেলের সাথে ভাগ করে নিতে মানা ছিল না, সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প ।

রাজকণ্যা, যদি আবার কোনোদিন পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসে, হয়ে আসে চার দেওয়ালে বন্দী । জানালায় এসে বাতাসে কান পাত । রাখাল ছেলের বাঁশির সুর শুনতে পাবে ।