কুহক দেশ, রাখালের বড় হয়ে যাওয়ার গল্প …

জোড় করে কোনো অজানা উদ্দেশ্যে রিইনফোর্সড রাসায়নিক নেশাটা কাটিয়ে উঠল রাখাল । হেমা, কেন এই নামটা মনের মধ্যে মিশে যাওয়ায় স্বত্তারা অবাক হচ্ছেনা ? কে এই হেমা ?

মনের বিশৃঙ্খল চিন্তারাজির অস্থিরতায় দিশাহীন রাখাল কোঁচড় থেকে বাঁশিটা টেনে বের করল । কিন্তু এ কী বাঁশির গায়ে এ কী অদ্ভুত রক্তিম অধর লিপি ? ভুলে যাওয়া প্রতিবর্তক্রিয়ার মত স্মৃতির কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা রাখাল সুর তুলল বাঁশিতে । কিন্তু এ সুর যে রাখালের অচেনা, কোথায় তার সেই আনন্দময় ভোরাই বা বিষাদঘন সান্ধ্য মুর্ছনা ? তার ভাঙা বাঁশিতে এমন পূর্ণতার সুর এল কী করে ?

ভাবনা সমুদ্রের গভীর তল স্পর্শ করার বৃথা চেষ্টা না করে রাখাল ডুব দিল সুরলহরীর স্রোতে । আর তার চোখে ভেসে উঠল সেই দিনটি যেদিন গ্রাম ছেড়ে, রাজকণ্যার রাজত্ব পেরিয়ে সে এসে পৌঁছল অদ্ভুত এক অরণ্য সমীপে । সন্ধ্যার অন্ধকারে তখন একটি একটি করে তারা ফুটে উঠছে আকাশে । কিছুতেই সেই অরণ্য কোথায় মনে করতে পারছেনা রাখাল, খুঁজে পাচ্ছেনা কোন পথ নির্দেশ …

সে অরণ্যের গাছগুলি যেন অন্য কোনো লোকের অপার মায়াবী আলোকে নিজেদের রূপ, রস, গন্ধের ডালি সাজিয়ে পথিককে আহ্বান জানাচ্ছে, “এস পথশ্রমক্লান্ত পথিক, আমার আশ্রয়ে এসে নিজের ক্লান্তি জুড়িয়ে যাও, আমার দেহরস মন্থিত ফলে রসনা তৃপ্তি কর, আমার সৌন্দর্যে শ্রান্ত চোখদুটিকে পুনরুজ্জীবিত কর” । রাখাল অপার বিস্ময়ে এই অপূর্ব সৌন্দর্য্যকে প্রাণভরে দেখতে লাগল, এমন সময় কোনো এক অজানা উৎস থেকে বয়ে আশা বাতাসে ভীষণ চেনা এক গন্ধ তার সমস্ত স্বত্তাকে আবীষ্ট করে ফেলল । এ সুবাস তার খুব চেনা, অনেকটা সাঁঝ প্রদীপ জ্বালবার অবকাশে মায়ের পাটের শাড়ীর আঁচলের মত, অনেকটা সেই সব কুয়াশা মাখা ভোরের মত, অনেকটা রাজকণ্যার এলো চুলের পাগল করা ঘ্রাণের মত ।

মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে চলল রাখাল । তার অনুভবের অগোচরে পায়ের চাপে গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকল পথের নীচে জমে থাকা অগণিত বাঁশি ধরা হাতের ব্যর্থ ফসিল ।

**********************

চলতে চলতে রাখাল এসে পৌঁছাল সুন্দর এক প্রাসাদের সামনে । স্মৃতির জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা তার চোখ লক্ষ্যও করল না মাথার উপর তারকা খচিত কালচে আকাশ অদৃশ্য হয়ে তার স্থানে আবির্ভাব ঘটেছে শরতের সোনা ঝরা অলৌকিক নিলীমার ।

প্রাসাদে প্রবেশ করল রাখাল ।

অসম্ভব সুন্দর ভাবে সাজানো কক্ষগুলি অচেনা মায়াবী আলোয় আলোকিত । কক্ষের কোণে কোণে সাজান নিখুঁত মর্মর মানবমূর্তি, ঠিক যেন জীবন্ত । কোনো কক্ষে সাজান নাম না জানা দেশী বিদেশী ফল, কোথাও মদীরা, কোথাও বা রাজৈশ্বর্য্য । রাখাল দুচোখ ভরা বিস্ময়ে দেখল সব কিন্তু তার মনের দেওয়ালে কোথাও লেখা হলনা কিছু কারণ তার সমস্ত মনন তখন অধিকার করে রেখেছে নাম না জানা এক গন্ধ, খুব চেনা আবার চেনা নয়ও ।

হর্ম্যসোপান বেয়ে দ্বিতলে পৌঁছাল রাখাল । এতলের সব কিছুই গাঢ় লাল । চোখ ঝলসে দেয় তার উগ্রতায় । কক্ষের পর কক্ষ পেরিয়ে চলল রাখাল । জনহীন নিশ্চুপ, শুধু সেই অদ্ভুত গন্ধ । হঠাত এক আধোছায়া কক্ষে এসে থমকে দাঁড়াল রাখাল । কক্ষের রূপসজ্জায় হালকা হাওয়ায় মৃদু দুলতে থাকা অর্ধস্বচ্ছ পর্দার আড়ালে ঐ লাল মখমল শয্যায় ফিনফিনে রেশমের সামাণ্য আবরণে ও কে ?

এ তো রাজকণ্যা নয় তবে কেন এর শরীরে সেই একই চেনা সুবাস ? এ তো তার কৌশোরের সাথী, তার একমাত্র প্রেম নয়, তবে কেন এর আয়ত চক্ষুদুটি থেকে চোখ ফেরাতে পারছেনা রাখাল । কেন ঐ নিষিদ্ধতার মত গাঢ় লাল রেশমের দিকে বার বার তাকাতে ইচ্ছে করছে ? এ কোন অজানা অনুভূতির আক্রমণে ভেসে যাচ্ছে রাখালের সমস্ত স্বত্তা ?

“রাখাল তুমি এসেছ ? আমার কাছে এস রাখাল, আমি যে কত দিন ধরে অপেক্ষা করেছি তোমার”

আচ্ছন্নের মত এগিয়ে গেল রাখাল । শয্যাপার্শ্বে উপবিষ্ট রাখালের হাতে মাখন কোমল হাতের স্পর্শ আগুণ ধরিয়ে দিল রাখালের চেতনায় । কয়েক মুহুর্তের আকস্মিক সুনামীতে কোথায় যেন ভেসে গেল রাখালের শৈশব । এক অপ্রতিরোধ্য কৌতুহল  আকর্ষণের রূপ নিয়ে জানতে চাইল তার অদেখা পৃথিবীকে, চিনতে চাইল  তার অচেনা অনুভবকে । রাখাল হারিয়ে গেল, তলিয়ে গেল এক নতুন অনুভূতির চোরা স্রোতে । পথের নীচে চাপাপড়া, ঘরের কোণের ফসিলরা তারস্বরে জয়ধ্বনী দিতে লাগল । প্রতিবিষের দহনের মত হঠাত জ্বলে ওঠা দাবানলে ছাই হয়ে গেল রাজকণ্যার অস্তিত্ব । উড়ে গেল দক্ষিণা বাতাসে ।

নিদাঘের ছাতিফাটা তৃষ্ণায় কপিত্থ সুবাসিত তক্রের মত মধুর অনুভূতির গহীন থেকে হঠাত জেগে উঠল রাখাল । তার নিরাবরণ শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে জেগে উঠল উইথড্রলের খিঁচুনি । কতকাল কেটে গেছে খেউরি তে মনে করতে পারল না রাখাল ।

না স্বপ্ন নয় কারণ চোখের সামনে এখনও যে সেই মোহময়ী দুটি চোখ । কিছুটা কৌতুহলী কিছুটা আশঙ্কিত, এক দৃষ্টে কিসের সন্ধানে রাখালের মুখে নিবদ্ধ ? শৈশবের ছেড়ে যাওয়া কক্ষের দখল নেওয়া পরিপক্ক উপলব্ধীরা রাখালের মস্তিষ্কে ক্যালকুলেটেড বোধ কে সম্যক করে ফুটিয়ে তুলল তার চোখের তারায় । মুখ ফিরিয়ে নিল রাখাল ।

প্রচণ্ড ক্রোধ আর অস্তিত্বের টানে কামনালাল ওষ্ঠের দুই ধার হতে বেরিয়ে আসা সুতীক্ষ্ণ দুটি দাঁত তার উদ্দাম আক্রমণে রাখালের শরীর ভেদ করে তাজা রক্তস্রোতে পৌঁছে থমকে গেল ঘটনার আকস্মিক উপলব্ধীতে । রাখালের রুধীর জুড়ে এ কোন অপূর্ব স্বাদ ! এ তো ঘৃণা নয়, লালসা নয়, এ যে গভীর অনুকম্পা । এ স্বাদ তো আগে কখনও তার সমস্ত মননকে এভাবে ধিক্কার দেয়নি । মোহময়ী জ্বলন্ত অক্ষিপটে এমন শান্তির বর্ষা নামায়নি । তার সমস্ত হৃদয়কে এমন ভাবে ভালবাসার স্রোতে উত্তাল করে তোলেনি । কিন্তু না, এখন থাক … এখনও যে সময় আসেনি …

না, হেমা নামের কুহকিনী এখন তার স্বরূপ জানতে দেবেনা রাখালকে , কিছুতেই দুর্বল হয়ে পড়বেনা সে, বুঝতে দেবেনা রাখালের অন্তরে সঞ্চিত গভীর প্রেমের মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছে তার সত্যিকারের ভালবাসা, মুক্তির মন্ত্র । অলৌকিক মন্ত্রে ভুলিয়ে দেবে কুহক দেশের স্মৃতি । অভিমানী রাখালকে এগিয়ে যেতে দেবে তার নিরুদ্দেশ যাত্রায়, নিজেকে আবিষ্কারের যাত্রায় ।

ত্রিকালজ্ঞা হেমা জানে মহাকালের অমোঘ নিয়মে একদিন ফিরবে রাখাল, স্রষ্টার অপর স্বত্তার প্রকাশ রূপে । সেই রুদ্রের স্পর্শেই শাপমুক্তি তার । যেদিন সাধিকা তার কামনাময়ী দুঃসহ আগুণের রূপের খোলস ছেড়ে ফিরে পাবে তার তুষারের মত শান্তির তপঃক্লিষ্ট রূপ । সেই শুভক্ষণটির পথ চেয়ে আজ থেকে সে জন্ম দেবে নতুন নতুন লহরীর, বাল্মিকি কিম্বা প্রতিভার গল্প শুনিয়ে …… আর অপেক্ষা করবে … তার সত্যিকারের ভালবাসার, … পরিপূর্ণতার

পাতি

ধুর শালা কালই রেজিগনেশন দেব । এত ঝামেলা পোষায় না । সামান্য কটা টাকার জন্য এত উটকো লোকের মুখনাড়া সওয়ার কোনও মানেই হয়না । মিস্টার রয়ের কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে মনে মনে এই কথাটাই ভাবছিলাম ।

কদিন হল নতুন চাকরীতে ঢুকেছি, মোটের ওপর ভাল পোষ্টেই, অফিসের লোকজন আলাদা আলাদা ডাইসের হলেও মোটামুটি নিয়ে চলার মত । কিন্তু বিশ্বব্রম্ভান্ডের সমস্ত ভাল বা মোটামুটি ভাল জিনিসের মতই এই চাকরী জীবনের বালতিতেও বেশ কয়েক ফোঁটা বিশুদ্ধ চোনা মিশে আছে । আর তার মধ্যে সবচেয়ে অসহ্য অংশটা হল কাস্টমার গ্রিভেন্স ফেস করা । আর কিছু কিছু দিন সেটা যে শুধু সীমা অতিক্রম করে যায় তাই নয়, আমাকেও অফিসের বেঁধে দেওয়া কথা বলার নির্দিষ্ট টোনের ভয়েসকে অতিক্রম করে যেতে প্ররোচিত করে ।

যেমন আজকে । আরে বাপু তুমি গভমেন্টের যতবড় অফিসারই হও । তাই বলে কী তোমার অন্ডকোশে তেলমালিশ করতে হবে ? আরে এই কাজটা ডেলিভারির সময় তো আমি কোম্পানি জয়েনই করিনি । সেসময় যে ইঞ্জিনিয়ার ছিল তার থেকে তোমার সমস্ত জিজ্ঞাসা বুঝে নিতে কি আমি বারণ করেছিলাম ? এখন তোমার লোক কিছু ঠিক ঠাক না বুঝে শুনে বোট নিয়ে শ্যালো ওয়াটারে গিয়ে তলা ফাটিয়ে ফেললে কি তোমার আমাকে যা নয় তাই ভাবে চোটপাট করার অধিকার জন্মায় ?
এদিকে আবার উলটে এনাকে কিছু বলারও উপায় নেই । গায়ে বিছুটি ঘষার জ্বালা ধরলেও কান অব্দী চওড়া হাসি মুখে ঝুলিয়ে ধৈর্য্য ধরে এর মুখনিসৃত থুতুবৃষ্টি ও বাণী সহ্য করে যেতে হবে, কারণ এনার থেকেই নাকি কোম্পানি বছরে কয়েক কোটি টাকার অর্ডার পায় । আর সেই সুবাদে ইনি আমাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া চাকর হিসাবে ট্রীট করার সুযোগ পান ।

যাই হোক, অতি কষ্টে নিজেকে সামলে পচা তিমির মত মিটিংটা গিলে রয় বাবুর কেবিনে এসে ঢোকার কারণ হল গোটা অফিসের মধ্যে এই ভদ্রলোক সবচেয়ে নীরিহ আর ভালমানুষ । মাঝবয়সী একজন লোক, অতি সাধারণ বৈশিষ্টহীন চেহারা। ব্যাচেলর মানুষ, সামান্য কটা টাকা মাইনের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটেন । অত্যন্ত্য অমায়িক এই মানুষটির পিতৃতুল্য সহানুভূতি মাখা দু চারটে কথা শুনে প্রাণের জ্বালা জুড়ানোই হল প্রকৃতপক্ষে এই কেবিনে আসার কারণ ।

আড়চোখে আমার মুখের বিরক্তির উদ্বায়ী ছাপটা দেখে উনি হাতের কাজটা একটু বন্ধ রেখে আমায় বললেন, – “দেখো জীবনে এই তোমাদের পথ চলা শুরু, মনে রেখো সব সময় ধীরে সুস্থে ঠান্ডা মাথায় এগোতে হয় কারণ জীবনে কখনও কখনও এমন কিছু সিচুয়েশন আসবে যখন তোমার প্রতিটা ডিশিসনই ফাইনাল ডিশিসন, দ্বিতীয়বার করে ভেবে শুধরোনোর সুযোগ পাবেনা । বুঝি তোমাদের বয়স কম, ওরকম করে বললে তোমাদের মান সম্মানে কতটা লাগে, কিন্তু কী করবে বল সবাইকেই জীবনের শুরুতে এরকম কষ্ট একটু আধটু সহ্য করতে হয়”

কিছুটা স্নেহের স্পর্শ পেয়ে মনটার চেপে থাকা গোমড়া ভাবটা একটু ফিকে হচ্ছিল । মিস্টার রয় আবার নিজের কাজে মন দিলেন । আমিও ও ঘর থেকে বেরিয়ে আমার কেবিনে ফিরে যাচ্ছিলুম এমন সময় আমার কোম্পানীর দেওয়া মোবাইলটা ভাইব্রেট করতে শুরু করল । অচেনা নাম্বার । তুলে একটু কেতা মেরে গলাটাকে ব্যারিটোন করার প্রাণপণ চেষ্টা করে বললাম “হ্যালো” !

– হ্যালো সি সিম্বা মেরিন সার্ভিস ?

– হ্যাঁ বলছি , বলুন

– আচ্ছা আপলোগোকা ডাইভিং বোটের রেট এখোন কী আছে ?

– হালের সাইজ কত চাই আপনার ? আর কত এইচ পি মোটর ? কতজন ডাইভারের সিট রাখতে হবে ?

– আরে আপলোগোকা ওফিসমে রয় বাবু আছেন না ? উনাকে বলিয়ে দিন কি ইউনিমেরিন থেকে বডোলা ফোন করিয়েছে , উনি আপনাকে ডাইভিং কা সব কুছ ঠিকসে বুঝিয়ে দেবেন ।

– মিস্টার রয় !!!! কী বলছেন !!! উনি ডাইভিং এর কী জানবেন ??? উনি তো আমাদের অফিসিয়াল কাজ কর্ম দেখেন । টেকনিক্যাল নিয়ে কিছু বলার হলে আমাকেই বলুন ।

– আপনি কি ওখানে নতুন জয়েন করিয়েছেন ?

– হ্যাঁ কেন বলুন তো ?

– আরে ওহি জন্যেই তো আপ কো মালুম নহি হ্যায় কি রয় বাবু কি আছেন । আরে আপনি জানেন না উনি তো ইন্ডিয়াকা সব সে আচ্ছা ডাইভার ছিলেন । কিতনা এক্সপিডিশোন মে লিড করিয়েছেন উনি । যাইয়ে উনকো পুছিয়ে । আউর জলদ সে জলদ আমায় একঠা কোটেশোন ভেজ দিজিয়ে ।

এমন টুইস্ট মনে হয় সিনেমাতেও আশা করা যায়না …… জীবনে তো দূরের কথা । তাই এরকম ভাবে শকড হয়ে আমি কিছুক্ষণ ফোনটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম । তার পরেই তীব্র গতিতে অ্যাবাউট টার্ণ করে ফিরে চল্লুম ।

ঢুকেই সরাসরি আক্রমণ, “এটা কি ঠিক হল কাকু ?”

– কি বল তো ?

– এই যে আপনি যে এত কিছু করেছেন সেসব তো কই কখনও কিছু বলেন নি …

– কি করলাম আবার ?

– এই যে এত অ্যাডভেঞ্চার টেঞ্চার করেছেন … কিচ্ছু বলেন নি তো কখনও …

– তোমায় আবার কে বলল ? আরে সেসব এমন কিছু না …

– ওসব বলে কাটালে চলবেনা, বলতে আপনাকে হবেই ।

– কি করবে ওসব শুনে ? এমন কিছু আহামরি ব্যাপার নয় …

– না তবুও আপনাকে বলতে হবে । আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখতে পারিনা । আমার পাঠকরা ঘ্যানঘ্যানে রাখাল আর খ্যানখ্যানে রাজকণ্যার গল্প শুনতে শুনতে বোর হয়ে গেছে … আপনি এখন কাঁচামাল হিসাবে কিছু ঘটনার সাপ্লাই দিলে রীতিমত উপকার হয় আমার ।

– বটে, শুনবে ? বেশ শোন তাহলে —

————————

এর পর তিনি বলে চললেন, আর আমি এক মনে শুনে চললাম এক অদ্ভুত জীবনের কাহিনী, যেমন অভিনব, তেমনই রোমাঞ্চকর । স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার, হাতে নিয়ে তার স্বাদ ঘ্রাণ অনুভব করার সেইসব কাহিনীই আমি তুলে ধরব একের পর এক আপনাদের সামনে ।

এ কাহিনী কোনো কল্পলোক থেকে আমদানী করা নয় । এ কাহিনীর গায়ে “সত্য ঘটনা অবলম্বনে” ট্যাগ চিটিয়ে এর নির্ভেজালতা প্রমাণ করতে হয়না ।

এ কাহিনী হাজার হাজার সেই সব সাধারণ মানুষদের, যাদের ট্রেণে বাসে রাস্তায় বাজারে আমরা দেখি প্রতিদিন । কয়েকটা ধূলোপড়া বইয়ের মত । এদের ক্লেদাক্ত, ছাপোষা অতি সাধারণ মুখায়বয়বের মলাট আগ্রহ জাগায়না, আর পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রাখে নানা অজানা অভিজ্ঞতার স্বাদ, চেনা লোকটার অচেনা কোনো পরিচয় ।

এ কাহিনী কিছু গোলা, পাতি বা সাধারণ হিসাবে চিহ্নিত মানুষের সযত্নে নিজের অসাধারণত্বকে লুকিয়ে রাখার কাহিনী …

_______________________________________
(আপনাদের ভাল লাগলে চলবে …)

একা

অনেক দিন ছড়া লিখিনি …..

আজ এই ছেলেমানুষি লাইন দুটো রাখা রইল “হেমা”র জন্য ….

যাওয়াআসার পথের ধারে ভয়ালরূপে তোমায় দেখা
যদিও জানি আসল তুমি মনে মনে বড্ড একা

স্রষ্টা, প্রেম ও মুক্তি

আচ্ছা জন্মের জন্য তো জননপ্রক্রিয়া লাগে, তাহলে এই সমগ্র মহাবিশ্বের সৃষ্টি জনন ব্যতীত কীভাবে হল ? আর কল্পকাহিনীর আদম ইভের থেকে মানব সৃষ্টি যদিও বা ধরে নেওয়া যায় তবে তাদের বাসস্থান ইডেন উদ্যানটির জন্মই বা হল কী ভাবে ?

যদি বলি সৃষ্টির আদি কারক হল প্রেম তাহলে কি আজগুবি বা ন্যাকামী ভেবে লেখাটা পড়া এখানেই বন্ধ করে দেবেন ? তবুও কিন্তু আমার কলম চলতেই থাকবে, রাখাল আর তার সখীদের প্রেমের রূপকথা বুনতে থাকবে অনন্ত কাল ধরে । কারণ রাখালের দেহাতীত কল্পপ্রেমেই যে কাহিনীর জন্ম হয়ে চলে কলমের নিব বেয়ে ।

কেউ কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন রাখালের ভালবাসা কী শুধু একটা ভেক বা সহানুভুতি কুড়োনোর মার্কেটিং নয় ? নইলে সে তার রাজকণ্যাকে ফেলে কুহকিনীর দেশেই বা যাবে কেন আর তার মনের অহঙ্কারের গরাদ ভেঙ্গে তাকে উদ্ধার করতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়ে মগ দেশের রাজকণ্যার উদ্দেশ্যেই বা যাত্রা করবে কেন ?

কারণটা খুবই সোজা, স্রষ্টা যেমন তাঁর সৃষ্টির কল্পনার সঙ্গে মিলনে জন্ম দেন মহাবিশ্বের তেমনই রাখালের অস্তিত্বও বেঁচে থাকে তার সহানুভূতির ক্রোড়ে জন্ম নেওয়া কাহিনীতে । তাই তো রাখাল বার বার তার মোহন বাঁশিতে সুর তোলে, প্রেম বিলোয় যুগযুগান্ত ধরে ।

কেউ কেউ এই ক্ষণে ক্ষণে বদলানো প্রেমের রূপ দেখে অবিশ্বাসী হন, ঠিক যেমন কবিগুরুর নাম মজলিশী পি এন পি সি তে হয়ে ওঠে বউদিবাজ । তাঁদের জানা নেই প্রেম মানেই শরীর সর্বস্ব, নিদেন পক্ষে নিষীদ্ধ আলাপচারিতা বা কঞ্জুগাল সম্পর্কের লিখিত আগরে বাঁধা পড়া নয়, প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ সহানুভূতি, প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ অফুরন্ত স্নেহের বরষণে একটি হৃদয়কে আশ্রয় দেওয়া, প্রেম মানে অনুভূতির আদান প্রদানে দুটি হৃদয়কে আলোকিত করা ।

সে প্রেম কোনো নির্দিষ্ট একটি মানুষের অবয়বের শীকলে বাঁধা না পড়ে প্রতিটি মানুষের ভালবাসাকে আস্বাদন করতে পারে, সে প্রেম প্রেমিক প্রেমিকার বন্ধুত্ব করাতে পারে । কারণ সে প্রেমই হল মুক্তি । দেহের বা স্থাবর মায়ার অর্গল ভেঙ্গে বিশাল ব্যাপ্তিতে জঙ্গমত্ব প্রাপ্তি । হাতে হাতের আগেও মনের সঙ্গে মনের পরিচিতি ।

প্রেমের নিয়ন্ত্রণ যদি সত্যিই হরমোনের হাতে থাকত, তাহলে দেহজ তৃষ্ণার নিবৃত্তির সাথে সাথেই প্রেম এবং সহানুভূতিরও নিবৃত্তি ঘটত ।

আর প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট গঠন হয়না বলেই অকলঙ্কিত স্রষ্টাচরিত্র বিবাহিতা বান্ধবী বা নিজের অর্ধেক বয়ঃক্রমের খুকীর প্রেমরসে সিক্ত হয়ে চিদানন্দসাগরে অবগাহন করতে পারে ।

এই প্রেমই যে সৃষ্টির আকর, প্রেমিকার হৃদয়দর্পণ হতে প্রতিফলিত স্বীয় মননের সহানুভূতি ।

এই তো শিকল ভাঙা, এই তো পূর্ণতা , এই তো মুক্তি ।

**********

বহু দিনের অব্যাবহারে বন্ধ পুরোনো ভোডাফোন মোবাইলের হঠাত দেওয়া চার্জটা একদিন আবার নীরব থেকে নিঃশেষিত হয়ে যাবে । শেষ হবে আরেকটা অধ্যায় ……জন্ম হবে নতুন কাহিনীর ।

ছেলেবেলা ছুঁয়ে দেখা – 1

আমার প্রিয় ঝড় …. সাইকেলের দোকানের গুমটিতে সাময়িক আশ্রয় , শীলাবৃষ্টি , ভিজে ভিজে রাস্তায় আধভিজে কাঁচা আম … সাইকেলের বলের পাশে থাকা নুনের কৌটো, সাইকেলের কাকা আর চিকু , টকে জরা জিভে …. আরেকবার ছেলেবেলা ছুঁয়ে দেখা ।

সূতো

কখনও কী মনে হয়, শরীরসর্বস্ব পরিচয় অনেক তো হল ?
স্তাবকদের একঘেয়ে জয়ধ্বনীতে অস্থিরতা বধীর করে কী ?
কখনও কী মনের গোপন কোনো কোণে হারানো ছোট্টবেলারা
ফিরে আসে খেলামবাটি আর সত্যি অনুভূতির বন্ধুত্ব খুঁজে ?

সময় নদীর কাল স্রোতে যখন এক একটা করে খসে পড়বে
ঝলমলে রাজ প্রাসাদের ইঁট, যেদিন পরিত্যক্ত্য হবে অবহেলায়
শুনতে পাও কি সেদিনের আগাম ফোরকাস্ট আর অমোঘ নোটিশ
দেখতে পাওকি একটা ঘর চারটে দেওয়াল আর জানালায় পৃথিবী ?

তবে বাতাসে কান রেখো, শুনতে চেয়ো কোনো রাখালিয়া মোহনবাঁশি
যারা যুগ যুগান্তের সাক্ষীবটের তলায় কুয়াশা ভোরে অপেক্ষায় থাকে
না কোনো রাজকণ্যা নয়, একটা মানুষের, একটা অনুভবের, একটা
ভালবাসার যেখানে শরীরের আগে বাঁধা পড়ে মন, সহানুভূতির সূতোয়

কার্বণিত রাখাল

রাখাল যদি সত্যিই কল্পনার জগতের চরিত্র হত, তাহলে কিন্তু কাহিনীটা হয়ত বেশীদূর গড়াত না । কারণ কল্পনা বুনে তোলা কল্কার মত রাখালের জীবনটাও হত ব্যালেন্সড আর পারফেক্ট । সে ডাইমেনশনের রাখাল কুহক দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক পা হাঁটার পরেই কোথা থেকে এক কবুতর টুপ করে তার কাঁধে বসত । কয়েক দন্ড তীর বেগে ওড়ার ক্লান্তি জুড়িয়েই পায়ে বাঁধা লীপি তুলে দিত রাখালের হাতে ।

“রাখাল তুমি পারলে আমায় ফেলে রেখে চলে যেতে ? পারলে আমার নিশ্চিত বন্ধুহীনতা আর একাকীত্বের পরিণতি জেনেও দেশান্তরের পথে পা রাখতে ? চেয়ে দেখ আমার মায়াদন্ড আমি নিক্ষেপ করেছি উপলব্ধীর আগুণে । কালের অমোঘ নিয়মে আমার মায়াশহরের লুণ্ঠিত পরিত্যক্ত্য পরিণতি আজ আমার দু চোখ ভরে ডেকে আনছে হঠাত করেই হারিয়ে যাওয়ার ভয় । যে ভয়কে দুর্বলতা ভেবে এতদিন উপহাস করেছি, তার আর্তনাদ চাপা পড়েছে স্বার্থান্বেষী স্তাবকদের জয়ধ্বনীতে ।

রাখাল আজ যখন সন্ধ্যা নামছে পৃথিবীর বুকে তখন আমার মায়ায় আমার অলকাপুরীতে শরতের রোদ । কিন্তু আমি যে ক্লান্ত, একঘেয়ে জয়ধ্বনীর শব্দে । আমার অনন্ত যৌবন, আমার মাদকতার অভিশাপ আমার কন্ঠ রোধ করছে ।

রাখাল, আজ প্রাণ চাইছে মায়ার আবরণ সরিয়ে জগতের মুখোমুখি হতে । শরতের শ্যামলীমা আর নীলাকাশের অভিনয় কাটিয়ে গোধূলী ভরা সন্ধ্যাকে প্রত্যক্ষ্য করতে । হীরক খচিত কেয়ূরে পার্লার ফ্যাশনড কেশরাজীকে উন্মুক্ত করে দিয়ে তোমার হাত ধরে বেরিয়ে পড়তে পৃথিবীর খোঁজে । একটা বাস্তব দিনের শেষে, কোনো বন্য ঝরনার পাশে তোমার চওড়া বুকে মাথা রেখে মনের কবরে দাফন করা অনুভূতিগুলো পুনরজ্জীবিত করতে ।

আমায় সঙ্গে নেবেনা রাখাল ?”

***********************

কিন্তু দুঃখের কথা হল যে আমার কলমের ভিতর দিয়ে আপনাদের সামনা সামনি হেঁটে আসা রাখাল বাস্তবের এক কার্বণিত অনুলীপি । কার্বণের প্রলেপে তার রঙ কখনও চেঞ্জ হয়ে হয় নীল কখনও কাল, কিন্তু অবয়ব বদলায় না ।

তাই আমাদের রাখাল অবাস্তবের কবুতরের অর্থহীন অপেক্ষা করেনা । দিনের শেষে যখন আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটে ওঠে তখন ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার বাঁশির সুর আকাশ বাতাসে ক্ষণিকের স্বপ্ন আঁকে । কিন্তু সে ক্ষণিক মাত্র … কাল যে তাকে আরও পূর্বে এগিয়ে যেতে হবে, মগ দেশের দিকে, অনেক পথ যে বাকি ………

বহুরূপীর কালারটোন

যথাক্রমে ব্যাঘ্র ও সিংহ বেশধারী দুই বহুরূপীতে দেখা হওয়ার পর যদি তারা মুখোশ গুলো খুলে দুদন্ড সুখ দুঃখের গল্প বা মুখোশ ইত্যাদির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি- টিদ্ধি নিয়ে আলোচনা করে, তাহলে পৃথিবীটা আরেকটু সুন্দর হতে পারত ।কিন্তু বাস্তবে তো সেরকম হওয়া কষ্ট কল্পনা । বাস্তবে দুই বহুরূপীর দেখা হলে দুজন দুজনার স্বরূপ স্পষ্ট বোঝা সত্বেও একজন নিজেকে আসল বাঘ আরেকজন নিজেকে আসল সিংহ হিসেবে প্রতিপন্ন করার প্রাণপণ চেষ্টা করে ….

মানুষের স্বজাতি বিদ্বেষের সমান কালারটোনের কালিতে এ ঘটনা লেখা যায় কিনা জানা নেই তবে উড়ন্ত পাখীর চোখ দিয়ে দেখলে এই হার্দিক বা বৌদ্ধিক গোলযোগকেই সম্ভবতঃ

Egoল বলে ।

একটা তার

ছেঁড়া তারটা লাল কেন বলতে পার ???
হ্যাঁ, ওটা নিজের সঙ্গে সঙ্গে আমার জামাটাকেও রাঙ্গিয়েছে
কারণ একাকিত্ব কেউ কি চায় ?

তারটা বড্ড বেশী উঁচু ডালে বাঁধা হয়ে গেছিল
পৃথিবী পাক দেওয়া স্যাটেলাইটের দূরত্বের দুটো অবৈজ্ঞানিক
হৃদয় কিম্বা বৈজ্ঞানিক ব্রেণের আইলেটে

সত্যি-মিথ্যার কাল্পনিক রেফারেন্স ফ্রেমের
উচিত অনুচিতে যাবনা, কারণ ডিডি গেঞ্জী আর ধর্ম গ্রন্থের মত
ভালবাসার ক্যাচলাইনও একই টিউনে …

তারের ওপর আসা হঠাত আনক্যালকুলেটেড
স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্লাবনে ছিঁড়ে যাওয়া তথ্যের ময়না তদন্তের
স্বাক্ষী বদলের সাক্ষী থাক নির্বাক সময়

আর

নর্মদা নদীর অভিশ্রুতি চাপা দেয় একটা হাস্যমুখি লাশ, ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞায়
হাতে ধরা রিপোর্টে একটা তার যার এক প্রান্ত পুতুলের মাথার ছিদ্রে
আরেক প্রান্ত ছেড়ে গেছে মুঠো করা হাত থেকে

নেশা নেশা

আজ হঠাত করেই বেশ জ্বর চলে এল দুপুর বেলা । আমি তখন অফিসে । এখনও বেশ উত্তাপ … জ্বালা । তবু বেশ ভালো লাগছে, বেশ নেশা নেশা ……

আজ অনেক দিন পর পিয়ানোটা নিয়ে বসলাম … বাইরে মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া দিচ্ছে, পাশের গাছটা থেকে টুপটাপ দু একটা পাতা খসে যাচ্ছে হিসেব না লিখেই …

পিয়ানো তে অচেনা সুর বাজিয়ে চলেছি নিজের অজান্তেই … পিয়ানো অনেক কিছু মনে করায় … তবু পিয়ানোটা শান্তি দেয় । জ্বরের উত্তাপের মাঝেও কোনো পাহাড়ী ঝর্ণার ঠান্ডা জলের মত …