Wicca একটি অপভ্রংশের কাহিনী

উইচক্র্যাফট এখন উঠতি টিনেজ কলেজ বা একটু ইংলিশ ঘেঁষা স্কুলের বড় ক্লাসের ছেলে মেয়ে প্রধানতঃ মেয়েদের একটা বড় আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে । তারা সর্টকাটে কাজ হাসিল করা, মানে কোনো পছন্দের মানুষকে আকৃষ্ট করা, কেউ “বাওয়াল” করলে শক্তিতে তার সঙ্গে না পেরে উঠে অন্য উপায়ে তাকে জব্দ করা ইত্যাদির অলীক আশায় গুগল মামার সাজেস্টেড সার্চে বিভিন্ন “চ্যান্টিং”, “সার্কেল”, লাল নীল মোমবাতি নিয়ে গভীর মনযোগ দিয়ে বিভিন্ন ক্রিয়া কর্মের অভ্যাস করে যাচ্ছে । অনেকে আবার স্রেফ বন্ধুদের চোখে নিজেকে একটু অন্য রকম, একটু “হটকে” প্রমাণ করার জন্য উইচক্র্যাফটের চর্চা করছে । অদ্ভুত ব্যাপার হল যে এই বাচ্চাগুলি কিন্তু ভারতীয় তন্ত্র বা মোহিনী বা ডাকিনী বিদ্যা সম্বন্ধে তেমন ওয়াকিবহাল নয় । স্বাভাবিক ব্যাপার, কারণ এগুলির ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্যের যোগান গুগলে নেই । তাই এই উঠতি টিনেজ উইচরা তন্ত্রের ব্যাপারে প্রায় জ্ঞানহীন শুধু তাই নয়, তন্ত্রের চর্চা যারা করে তাদের এরা বেশ কিছুটা অবজ্ঞার চোখেই দেখে ।

দেখুন মশাই, আমি কিন্তু এখানে “সবই ব্যাদে আছে” অ্যাজেন্ডার প্রচার করতে আসিনি, নেহাত রাখাল আর রাজকণ্যার গল্প বুনতে বুনতে কলমটা হাঁপিয়ে গেছে তাই রাখাল একটু অন্য কিছুর খোঁজে। শুধু স্বার্থপর সুবিধাবাদী রাজকণ্যার কথা ভেবে জীবন কাটিয়ে দিলে কি চলবে ??? রাখালেরও তো একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে, সেই পৃথিবীর কত অচেনা গলি, রাজপথে ঘোরা বাকি আছে, কত অ্যাডভেঞ্চার বাকী আছে হারানো দিনের গল্পের, ইতিহাসের খোঁজে । চলুন আজ রাখালের হাত ধরে সেরকমই একটা লতায় ঢেকে যাওয়া, ভুলে যাওয়া গলির সন্ধানে যাত্রা করা যাক ।

ভারতীয় প্রকৃতি উপাসনা যা মূলতঃ আফ্রিকা থেকে লক্ষ বছর আগে ভারতের দক্ষিণ উপকূলে আসা মানুষদের সঙ্গে ভারতের তন্ত্রীতে সঞ্চারিত হয়েছিল তাই তামসিক সাধনা রূপে পরে পরবর্তী উন্নততর স্বাত্বিক বা একেশ্বরবাদী ব্রহ্ম উপাসক আর্যদের দ্বারা লীপিবদ্ধ হয় । পরে আর্য উপাসনার মূল স্রোতের সঙ্গে এর মিশ্রণে একটি স্বতন্ত্র ধারা তন্ত্র নামে আত্মপ্রকাশ করে । এই তন্ত্র ছিল মূলত বস্তুতান্ত্রিক ও বামধর্মী । তন্ত্রের বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো কিছুর সংযম বা সাধন তখনই সম্ভব যখন বস্তুটিকে সম্পূর্ণ রূপে জানা যাবে । বৈদিক একেশ্বরবাদের মত এটি শুধু সবই এক এই বিশ্বাস নির্ভর উপলব্ধীতে সীমাবদ্ধ ছিল না । বরং তন্ত্র ব্যবহারিক পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়ম গুলি উপলব্ধী করতে ও তাদের কে আয়ত্ত করে নিজ কাজে ব্যবহার করতে উৎসাহ দিত । যে কারণে প্রাচীন তান্ত্রিক দের কিমীয়া বিদ্যা বা অ্যালকেমী জানা আবশ্যিক ছিল । তন্ত্র বিশ্বাস করত একটি মানুষ যদি রসগোল্লার মিষ্টত্ব কখনও আস্বাদনই না করে, যদি কখনও সঙ্গমের সুখ অনুভবই না করে তবে সে তার অস্থায়ীত্ব ও অসারতা বুঝবেই বা কী করে আর স্বরূপ উপলব্ধী করার মাধ্যমে তাকে সংযমই বা করবে কী করে ।

তন্ত্রের কীমিয়া ও আয়ুর্বেদ অংশটি কোনো এক অজানা পথ ধরে একসময় ইউরোপে পৌঁছায় (সম্ভবতঃ ইজিপ্ট হয়ে) এবং বিভিন্ন রূপান্তর ও স্থানীয় প্রকৃতি উপাসনার অলৌকীকতা আরোপিত হয়ে উইক্কা নামে আত্মপ্রকাশ করে । মনযোগ দিয়ে দেখলে আজও তন্ত্রের নানা অবশেষ উইক্কার মধ্যে খুঁজে পাবেন । যদিও সেগুলি এতটাই পরিবর্তিত যে প্রায় চেনাই যায়না ।

উইক্কান সার্কেল বা গ্রীড আসলে স্থন্ডীল বা যন্ত্রমের পরিবর্তীত রূপ, এছাড়াও হেক্সিং – মারণ উচাটন, বশীকরণ, এরকম আরও অনেক কিছু খুঁজলেই পাওয়া যাবে যা আসলে তন্ত্রের ক্ষীণ স্মৃতিচিহ্ন । তবে তন্ত্রের সঙ্গে উইক্কার কিছু মূল ভাবগত পার্থক্য আছে । উইক্কা মূলত বিভিন্ন অলৌকিক প্রাকৃতিক শক্তির আয়ত্তকরণ ও নিজ প্রয়োজনে তাদের ব্যবহারের কথা বলে । কিন্তু তন্ত্র বলে উল্টো কথা । শক্তির প্রাপ্তীর মাধ্যমে ও তাকে স্বেচ্ছায় পরিহারের মাধ্যমে রিপু সংযম তথা আমিত্বের নাশ বা চরম সত্যের উপলব্ধির কথা বলে তন্ত্র । তন্ত্র পথের সাধনায় অলৌকিক শক্তি বা সিদ্ধাই অন্তরায় স্বরূপ । যদিও কিছু নীম্নস্তরের তান্ত্রিক মূলতঃ এই শক্তিগুলি পাবার জন্যই সাধনা করে থাকে । কিন্তু তাকে প্রকৃত সাধনা বলেনা এবং সেই ব্যক্তিকে গুণীন ওঝা বা ডাইন বলে চিহ্নিত করা হয়, যোগী বা সাধক নয় ।

আজ এখানেই কলম থামালাম, আপনাদের ভাল লাগলে পরে তন্ত্র ও উইক্কার বিভিন্ন বিভাগ গুলি নিয়ে আলোচনা করা যাবে ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s