পাতি

ধুর শালা কালই রেজিগনেশন দেব । এত ঝামেলা পোষায় না । সামান্য কটা টাকার জন্য এত উটকো লোকের মুখনাড়া সওয়ার কোনও মানেই হয়না । মিস্টার রয়ের কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে মনে মনে এই কথাটাই ভাবছিলাম ।

কদিন হল নতুন চাকরীতে ঢুকেছি, মোটের ওপর ভাল পোষ্টেই, অফিসের লোকজন আলাদা আলাদা ডাইসের হলেও মোটামুটি নিয়ে চলার মত । কিন্তু বিশ্বব্রম্ভান্ডের সমস্ত ভাল বা মোটামুটি ভাল জিনিসের মতই এই চাকরী জীবনের বালতিতেও বেশ কয়েক ফোঁটা বিশুদ্ধ চোনা মিশে আছে । আর তার মধ্যে সবচেয়ে অসহ্য অংশটা হল কাস্টমার গ্রিভেন্স ফেস করা । আর কিছু কিছু দিন সেটা যে শুধু সীমা অতিক্রম করে যায় তাই নয়, আমাকেও অফিসের বেঁধে দেওয়া কথা বলার নির্দিষ্ট টোনের ভয়েসকে অতিক্রম করে যেতে প্ররোচিত করে ।

যেমন আজকে । আরে বাপু তুমি গভমেন্টের যতবড় অফিসারই হও । তাই বলে কী তোমার অন্ডকোশে তেলমালিশ করতে হবে ? আরে এই কাজটা ডেলিভারির সময় তো আমি কোম্পানি জয়েনই করিনি । সেসময় যে ইঞ্জিনিয়ার ছিল তার থেকে তোমার সমস্ত জিজ্ঞাসা বুঝে নিতে কি আমি বারণ করেছিলাম ? এখন তোমার লোক কিছু ঠিক ঠাক না বুঝে শুনে বোট নিয়ে শ্যালো ওয়াটারে গিয়ে তলা ফাটিয়ে ফেললে কি তোমার আমাকে যা নয় তাই ভাবে চোটপাট করার অধিকার জন্মায় ?
এদিকে আবার উলটে এনাকে কিছু বলারও উপায় নেই । গায়ে বিছুটি ঘষার জ্বালা ধরলেও কান অব্দী চওড়া হাসি মুখে ঝুলিয়ে ধৈর্য্য ধরে এর মুখনিসৃত থুতুবৃষ্টি ও বাণী সহ্য করে যেতে হবে, কারণ এনার থেকেই নাকি কোম্পানি বছরে কয়েক কোটি টাকার অর্ডার পায় । আর সেই সুবাদে ইনি আমাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া চাকর হিসাবে ট্রীট করার সুযোগ পান ।

যাই হোক, অতি কষ্টে নিজেকে সামলে পচা তিমির মত মিটিংটা গিলে রয় বাবুর কেবিনে এসে ঢোকার কারণ হল গোটা অফিসের মধ্যে এই ভদ্রলোক সবচেয়ে নীরিহ আর ভালমানুষ । মাঝবয়সী একজন লোক, অতি সাধারণ বৈশিষ্টহীন চেহারা। ব্যাচেলর মানুষ, সামান্য কটা টাকা মাইনের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটেন । অত্যন্ত্য অমায়িক এই মানুষটির পিতৃতুল্য সহানুভূতি মাখা দু চারটে কথা শুনে প্রাণের জ্বালা জুড়ানোই হল প্রকৃতপক্ষে এই কেবিনে আসার কারণ ।

আড়চোখে আমার মুখের বিরক্তির উদ্বায়ী ছাপটা দেখে উনি হাতের কাজটা একটু বন্ধ রেখে আমায় বললেন, – “দেখো জীবনে এই তোমাদের পথ চলা শুরু, মনে রেখো সব সময় ধীরে সুস্থে ঠান্ডা মাথায় এগোতে হয় কারণ জীবনে কখনও কখনও এমন কিছু সিচুয়েশন আসবে যখন তোমার প্রতিটা ডিশিসনই ফাইনাল ডিশিসন, দ্বিতীয়বার করে ভেবে শুধরোনোর সুযোগ পাবেনা । বুঝি তোমাদের বয়স কম, ওরকম করে বললে তোমাদের মান সম্মানে কতটা লাগে, কিন্তু কী করবে বল সবাইকেই জীবনের শুরুতে এরকম কষ্ট একটু আধটু সহ্য করতে হয়”

কিছুটা স্নেহের স্পর্শ পেয়ে মনটার চেপে থাকা গোমড়া ভাবটা একটু ফিকে হচ্ছিল । মিস্টার রয় আবার নিজের কাজে মন দিলেন । আমিও ও ঘর থেকে বেরিয়ে আমার কেবিনে ফিরে যাচ্ছিলুম এমন সময় আমার কোম্পানীর দেওয়া মোবাইলটা ভাইব্রেট করতে শুরু করল । অচেনা নাম্বার । তুলে একটু কেতা মেরে গলাটাকে ব্যারিটোন করার প্রাণপণ চেষ্টা করে বললাম “হ্যালো” !

– হ্যালো সি সিম্বা মেরিন সার্ভিস ?

– হ্যাঁ বলছি , বলুন

– আচ্ছা আপলোগোকা ডাইভিং বোটের রেট এখোন কী আছে ?

– হালের সাইজ কত চাই আপনার ? আর কত এইচ পি মোটর ? কতজন ডাইভারের সিট রাখতে হবে ?

– আরে আপলোগোকা ওফিসমে রয় বাবু আছেন না ? উনাকে বলিয়ে দিন কি ইউনিমেরিন থেকে বডোলা ফোন করিয়েছে , উনি আপনাকে ডাইভিং কা সব কুছ ঠিকসে বুঝিয়ে দেবেন ।

– মিস্টার রয় !!!! কী বলছেন !!! উনি ডাইভিং এর কী জানবেন ??? উনি তো আমাদের অফিসিয়াল কাজ কর্ম দেখেন । টেকনিক্যাল নিয়ে কিছু বলার হলে আমাকেই বলুন ।

– আপনি কি ওখানে নতুন জয়েন করিয়েছেন ?

– হ্যাঁ কেন বলুন তো ?

– আরে ওহি জন্যেই তো আপ কো মালুম নহি হ্যায় কি রয় বাবু কি আছেন । আরে আপনি জানেন না উনি তো ইন্ডিয়াকা সব সে আচ্ছা ডাইভার ছিলেন । কিতনা এক্সপিডিশোন মে লিড করিয়েছেন উনি । যাইয়ে উনকো পুছিয়ে । আউর জলদ সে জলদ আমায় একঠা কোটেশোন ভেজ দিজিয়ে ।

এমন টুইস্ট মনে হয় সিনেমাতেও আশা করা যায়না …… জীবনে তো দূরের কথা । তাই এরকম ভাবে শকড হয়ে আমি কিছুক্ষণ ফোনটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম । তার পরেই তীব্র গতিতে অ্যাবাউট টার্ণ করে ফিরে চল্লুম ।

ঢুকেই সরাসরি আক্রমণ, “এটা কি ঠিক হল কাকু ?”

– কি বল তো ?

– এই যে আপনি যে এত কিছু করেছেন সেসব তো কই কখনও কিছু বলেন নি …

– কি করলাম আবার ?

– এই যে এত অ্যাডভেঞ্চার টেঞ্চার করেছেন … কিচ্ছু বলেন নি তো কখনও …

– তোমায় আবার কে বলল ? আরে সেসব এমন কিছু না …

– ওসব বলে কাটালে চলবেনা, বলতে আপনাকে হবেই ।

– কি করবে ওসব শুনে ? এমন কিছু আহামরি ব্যাপার নয় …

– না তবুও আপনাকে বলতে হবে । আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখতে পারিনা । আমার পাঠকরা ঘ্যানঘ্যানে রাখাল আর খ্যানখ্যানে রাজকণ্যার গল্প শুনতে শুনতে বোর হয়ে গেছে … আপনি এখন কাঁচামাল হিসাবে কিছু ঘটনার সাপ্লাই দিলে রীতিমত উপকার হয় আমার ।

– বটে, শুনবে ? বেশ শোন তাহলে —

————————

এর পর তিনি বলে চললেন, আর আমি এক মনে শুনে চললাম এক অদ্ভুত জীবনের কাহিনী, যেমন অভিনব, তেমনই রোমাঞ্চকর । স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার, হাতে নিয়ে তার স্বাদ ঘ্রাণ অনুভব করার সেইসব কাহিনীই আমি তুলে ধরব একের পর এক আপনাদের সামনে ।

এ কাহিনী কোনো কল্পলোক থেকে আমদানী করা নয় । এ কাহিনীর গায়ে “সত্য ঘটনা অবলম্বনে” ট্যাগ চিটিয়ে এর নির্ভেজালতা প্রমাণ করতে হয়না ।

এ কাহিনী হাজার হাজার সেই সব সাধারণ মানুষদের, যাদের ট্রেণে বাসে রাস্তায় বাজারে আমরা দেখি প্রতিদিন । কয়েকটা ধূলোপড়া বইয়ের মত । এদের ক্লেদাক্ত, ছাপোষা অতি সাধারণ মুখায়বয়বের মলাট আগ্রহ জাগায়না, আর পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রাখে নানা অজানা অভিজ্ঞতার স্বাদ, চেনা লোকটার অচেনা কোনো পরিচয় ।

এ কাহিনী কিছু গোলা, পাতি বা সাধারণ হিসাবে চিহ্নিত মানুষের সযত্নে নিজের অসাধারণত্বকে লুকিয়ে রাখার কাহিনী …

_______________________________________
(আপনাদের ভাল লাগলে চলবে …)