কুহক দেশ, রাখালের বড় হয়ে যাওয়ার গল্প …

জোড় করে কোনো অজানা উদ্দেশ্যে রিইনফোর্সড রাসায়নিক নেশাটা কাটিয়ে উঠল রাখাল । হেমা, কেন এই নামটা মনের মধ্যে মিশে যাওয়ায় স্বত্তারা অবাক হচ্ছেনা ? কে এই হেমা ?

মনের বিশৃঙ্খল চিন্তারাজির অস্থিরতায় দিশাহীন রাখাল কোঁচড় থেকে বাঁশিটা টেনে বের করল । কিন্তু এ কী বাঁশির গায়ে এ কী অদ্ভুত রক্তিম অধর লিপি ? ভুলে যাওয়া প্রতিবর্তক্রিয়ার মত স্মৃতির কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা রাখাল সুর তুলল বাঁশিতে । কিন্তু এ সুর যে রাখালের অচেনা, কোথায় তার সেই আনন্দময় ভোরাই বা বিষাদঘন সান্ধ্য মুর্ছনা ? তার ভাঙা বাঁশিতে এমন পূর্ণতার সুর এল কী করে ?

ভাবনা সমুদ্রের গভীর তল স্পর্শ করার বৃথা চেষ্টা না করে রাখাল ডুব দিল সুরলহরীর স্রোতে । আর তার চোখে ভেসে উঠল সেই দিনটি যেদিন গ্রাম ছেড়ে, রাজকণ্যার রাজত্ব পেরিয়ে সে এসে পৌঁছল অদ্ভুত এক অরণ্য সমীপে । সন্ধ্যার অন্ধকারে তখন একটি একটি করে তারা ফুটে উঠছে আকাশে । কিছুতেই সেই অরণ্য কোথায় মনে করতে পারছেনা রাখাল, খুঁজে পাচ্ছেনা কোন পথ নির্দেশ …

সে অরণ্যের গাছগুলি যেন অন্য কোনো লোকের অপার মায়াবী আলোকে নিজেদের রূপ, রস, গন্ধের ডালি সাজিয়ে পথিককে আহ্বান জানাচ্ছে, “এস পথশ্রমক্লান্ত পথিক, আমার আশ্রয়ে এসে নিজের ক্লান্তি জুড়িয়ে যাও, আমার দেহরস মন্থিত ফলে রসনা তৃপ্তি কর, আমার সৌন্দর্যে শ্রান্ত চোখদুটিকে পুনরুজ্জীবিত কর” । রাখাল অপার বিস্ময়ে এই অপূর্ব সৌন্দর্য্যকে প্রাণভরে দেখতে লাগল, এমন সময় কোনো এক অজানা উৎস থেকে বয়ে আশা বাতাসে ভীষণ চেনা এক গন্ধ তার সমস্ত স্বত্তাকে আবীষ্ট করে ফেলল । এ সুবাস তার খুব চেনা, অনেকটা সাঁঝ প্রদীপ জ্বালবার অবকাশে মায়ের পাটের শাড়ীর আঁচলের মত, অনেকটা সেই সব কুয়াশা মাখা ভোরের মত, অনেকটা রাজকণ্যার এলো চুলের পাগল করা ঘ্রাণের মত ।

মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে চলল রাখাল । তার অনুভবের অগোচরে পায়ের চাপে গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকল পথের নীচে জমে থাকা অগণিত বাঁশি ধরা হাতের ব্যর্থ ফসিল ।

**********************

চলতে চলতে রাখাল এসে পৌঁছাল সুন্দর এক প্রাসাদের সামনে । স্মৃতির জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা তার চোখ লক্ষ্যও করল না মাথার উপর তারকা খচিত কালচে আকাশ অদৃশ্য হয়ে তার স্থানে আবির্ভাব ঘটেছে শরতের সোনা ঝরা অলৌকিক নিলীমার ।

প্রাসাদে প্রবেশ করল রাখাল ।

অসম্ভব সুন্দর ভাবে সাজানো কক্ষগুলি অচেনা মায়াবী আলোয় আলোকিত । কক্ষের কোণে কোণে সাজান নিখুঁত মর্মর মানবমূর্তি, ঠিক যেন জীবন্ত । কোনো কক্ষে সাজান নাম না জানা দেশী বিদেশী ফল, কোথাও মদীরা, কোথাও বা রাজৈশ্বর্য্য । রাখাল দুচোখ ভরা বিস্ময়ে দেখল সব কিন্তু তার মনের দেওয়ালে কোথাও লেখা হলনা কিছু কারণ তার সমস্ত মনন তখন অধিকার করে রেখেছে নাম না জানা এক গন্ধ, খুব চেনা আবার চেনা নয়ও ।

হর্ম্যসোপান বেয়ে দ্বিতলে পৌঁছাল রাখাল । এতলের সব কিছুই গাঢ় লাল । চোখ ঝলসে দেয় তার উগ্রতায় । কক্ষের পর কক্ষ পেরিয়ে চলল রাখাল । জনহীন নিশ্চুপ, শুধু সেই অদ্ভুত গন্ধ । হঠাত এক আধোছায়া কক্ষে এসে থমকে দাঁড়াল রাখাল । কক্ষের রূপসজ্জায় হালকা হাওয়ায় মৃদু দুলতে থাকা অর্ধস্বচ্ছ পর্দার আড়ালে ঐ লাল মখমল শয্যায় ফিনফিনে রেশমের সামাণ্য আবরণে ও কে ?

এ তো রাজকণ্যা নয় তবে কেন এর শরীরে সেই একই চেনা সুবাস ? এ তো তার কৌশোরের সাথী, তার একমাত্র প্রেম নয়, তবে কেন এর আয়ত চক্ষুদুটি থেকে চোখ ফেরাতে পারছেনা রাখাল । কেন ঐ নিষিদ্ধতার মত গাঢ় লাল রেশমের দিকে বার বার তাকাতে ইচ্ছে করছে ? এ কোন অজানা অনুভূতির আক্রমণে ভেসে যাচ্ছে রাখালের সমস্ত স্বত্তা ?

“রাখাল তুমি এসেছ ? আমার কাছে এস রাখাল, আমি যে কত দিন ধরে অপেক্ষা করেছি তোমার”

আচ্ছন্নের মত এগিয়ে গেল রাখাল । শয্যাপার্শ্বে উপবিষ্ট রাখালের হাতে মাখন কোমল হাতের স্পর্শ আগুণ ধরিয়ে দিল রাখালের চেতনায় । কয়েক মুহুর্তের আকস্মিক সুনামীতে কোথায় যেন ভেসে গেল রাখালের শৈশব । এক অপ্রতিরোধ্য কৌতুহল  আকর্ষণের রূপ নিয়ে জানতে চাইল তার অদেখা পৃথিবীকে, চিনতে চাইল  তার অচেনা অনুভবকে । রাখাল হারিয়ে গেল, তলিয়ে গেল এক নতুন অনুভূতির চোরা স্রোতে । পথের নীচে চাপাপড়া, ঘরের কোণের ফসিলরা তারস্বরে জয়ধ্বনী দিতে লাগল । প্রতিবিষের দহনের মত হঠাত জ্বলে ওঠা দাবানলে ছাই হয়ে গেল রাজকণ্যার অস্তিত্ব । উড়ে গেল দক্ষিণা বাতাসে ।

নিদাঘের ছাতিফাটা তৃষ্ণায় কপিত্থ সুবাসিত তক্রের মত মধুর অনুভূতির গহীন থেকে হঠাত জেগে উঠল রাখাল । তার নিরাবরণ শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে জেগে উঠল উইথড্রলের খিঁচুনি । কতকাল কেটে গেছে খেউরি তে মনে করতে পারল না রাখাল ।

না স্বপ্ন নয় কারণ চোখের সামনে এখনও যে সেই মোহময়ী দুটি চোখ । কিছুটা কৌতুহলী কিছুটা আশঙ্কিত, এক দৃষ্টে কিসের সন্ধানে রাখালের মুখে নিবদ্ধ ? শৈশবের ছেড়ে যাওয়া কক্ষের দখল নেওয়া পরিপক্ক উপলব্ধীরা রাখালের মস্তিষ্কে ক্যালকুলেটেড বোধ কে সম্যক করে ফুটিয়ে তুলল তার চোখের তারায় । মুখ ফিরিয়ে নিল রাখাল ।

প্রচণ্ড ক্রোধ আর অস্তিত্বের টানে কামনালাল ওষ্ঠের দুই ধার হতে বেরিয়ে আসা সুতীক্ষ্ণ দুটি দাঁত তার উদ্দাম আক্রমণে রাখালের শরীর ভেদ করে তাজা রক্তস্রোতে পৌঁছে থমকে গেল ঘটনার আকস্মিক উপলব্ধীতে । রাখালের রুধীর জুড়ে এ কোন অপূর্ব স্বাদ ! এ তো ঘৃণা নয়, লালসা নয়, এ যে গভীর অনুকম্পা । এ স্বাদ তো আগে কখনও তার সমস্ত মননকে এভাবে ধিক্কার দেয়নি । মোহময়ী জ্বলন্ত অক্ষিপটে এমন শান্তির বর্ষা নামায়নি । তার সমস্ত হৃদয়কে এমন ভাবে ভালবাসার স্রোতে উত্তাল করে তোলেনি । কিন্তু না, এখন থাক … এখনও যে সময় আসেনি …

না, হেমা নামের কুহকিনী এখন তার স্বরূপ জানতে দেবেনা রাখালকে , কিছুতেই দুর্বল হয়ে পড়বেনা সে, বুঝতে দেবেনা রাখালের অন্তরে সঞ্চিত গভীর প্রেমের মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছে তার সত্যিকারের ভালবাসা, মুক্তির মন্ত্র । অলৌকিক মন্ত্রে ভুলিয়ে দেবে কুহক দেশের স্মৃতি । অভিমানী রাখালকে এগিয়ে যেতে দেবে তার নিরুদ্দেশ যাত্রায়, নিজেকে আবিষ্কারের যাত্রায় ।

ত্রিকালজ্ঞা হেমা জানে মহাকালের অমোঘ নিয়মে একদিন ফিরবে রাখাল, স্রষ্টার অপর স্বত্তার প্রকাশ রূপে । সেই রুদ্রের স্পর্শেই শাপমুক্তি তার । যেদিন সাধিকা তার কামনাময়ী দুঃসহ আগুণের রূপের খোলস ছেড়ে ফিরে পাবে তার তুষারের মত শান্তির তপঃক্লিষ্ট রূপ । সেই শুভক্ষণটির পথ চেয়ে আজ থেকে সে জন্ম দেবে নতুন নতুন লহরীর, বাল্মিকি কিম্বা প্রতিভার গল্প শুনিয়ে …… আর অপেক্ষা করবে … তার সত্যিকারের ভালবাসার, … পরিপূর্ণতার

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s