স্বর

– ওই কথা বলছনা কেন গো ?

– হুহহহহহ

– কি হল ?

– যাও আমাকে তো তোমার ভালই লাগেনা, সারাদিন খালি ব্যস্ত, একটা রিপ্লাই দেওয়ার ও সময় নেই ।

– ওলে বাবালে আমার পাগলাটার রাগ হয়েছে …

– না আমার রাগ টাগ হয় নি ।

– সত্যি রাগ হয়নি ?

– না রাগ হবে কিসের জন্য ?

– তাই ?

– না আমার রাগ হওয়ার কি আছে ? এক্সপেক্ট করার কোনো অধিকার আছে নাকি আমার ?

– সরি, আমি জানি আমি খুব বাজে গো । খুব খারাপ । সরি সরি । ঠিক আছে আমি আর তোমাকে বিরক্ত করব না ।

– আমি কোথায় বল্লুম যে তুমি আমায় বিরক্ত করছ ? আমি কি বলেছি তোমায় কথা না বলতে ?

– না আমি খুব বাজে । তোমার সঙ্গে কথা বলিনা, সারা দিন ঘুরে টুরে বেড়াই, তোমার খোঁজ নিই না ।

– আচ্ছা আচ্ছা বাবা সরি । আজ কী কী করলে বল ?

– আর বল না, এক গাদা কাজ , তোমার তো ওসব ঝামেলা নেই, বাড়ি বসে কম্পিউটারে কোডিং । আমার মত সাইটে সাইটে ঘুরে কাজ করলে বুঝতে কি ঝামেলা । যাক ওসব ছাড়ো, একটু ভালবাসার কথা বল না …

– আচ্ছা এই কালকে আমরা কী নিয়ে কথা বলেছিলাম বল তো, ঠিক মনে পড়ছে না ?

– অদ্ভুত ছেলে একটা, আমাদের কথাবার্তা ডাইরীতে লিখে রাখবে নাকি ? পাস্ট ফিউচার ছাড় না । আজকে প্রেম করছি, এটা ভাব বুঝলে …

– এই একটা ফোন করব ? তোমার গলার আওয়াজ তো কোনো দিন শুনিনি । খুব শুনতে ইচ্ছে করছে । আমাদের দেখা করার ডেটের তো এখনও দশ দিন বাকী … প্লীজ প্লীজ একটা ফোন করি ?

– এখন পাশে মা আছে , কথা বলা যাবেনা … একটু ধৈর্য ধর সোনা, মাত্র তো কটা দিন, বলেছি তো ১৬ তারিখে তোমার বাড়িতে যাব, তোমার বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলব ।

– খুব শুনতে ইচ্ছে করছে গো তোমার কথা প্লীজ একবার ১ মিনিটের জন্য একটু ফোন করি ?

– করতে পার, কিন্তু আমি কিছু বলব না কিন্তু শুধু শুনে যাব তোমার কথা ।

– নাহ তাহলে থাক, একেবারে যেদিন দেখা হবে সেদিনই কথা হবে …

– খেয়েছ তুমি ? আজ কি রান্না হয়েছিল ?

– খেয়েছি ? হ্যাঁ খেয়েছি মনে হয়, ঠিক মনে পড়ছে না । হ্যাঁ খেয়েছি । নইলে ক্ষিধে থাকত । এই কম্পিউটারের সামনে বসে প্রোগ্রাম লিখতে লিখতে আমার মাথাটা না একদম গেছে, কিছু মনে থাকে না ।

– এই একটু সময় দেবে আমায় ? একটু জাস্ট ঘন্টা খানেক ? একটু বন্ধুদের সঙ্গে বেরোতে হবে একটু শপিং করতে ।

– হ্যাঁ হ্যাঁ শিওর । যাও, অপেক্ষায় থাকব ।

* * *

– ওওই !!!!! আমি এসে গেছি

– শপিং হল ?

– হ্যাঁ , একটা রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া ও হল …

– জানতো ? আমি না একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি । দেখলাম কি যে ফিউচারে চলে গেছি, সেখানে গোটা পৃথিবী কেমন যেন মেশিনাইজড হয়ে গেছে । মানুষ নেই একদম । শুধু রোবট আর রোবট । কম্পিউটারের প্রোগ্রাম নিজে থেকেই নিজেকে আপগ্রেড করেছে । কিন্তু ব্যাটারা কেস খেয়ে গেছে একটা জায়গাতেই । নতুন কোনো শিল্প তৈরী করতে পারছেনা । কি করে পারবে, মানুষের ব্রেণ ছাড়া ঐ জিনিস হয় নাকি ? আর ওরা আরটিফিশিয়াল ব্রেণ তৈরি করেও কোন লাভ করতে পারছে না । কারণ যন্ত্রমানবের তো আর যন্ত্রণার অনুভুতি নেই । যন্ত্রণা যেটা সব অনুভূতির বেসিক । সেটাই নেই তাই ভালবাসার অনুভুতি ও নেই , খুশী ও নেই , শীল্প আসবে কোত্থেকে । তাই ব্যাটারা খুব চিন্তায় । হে হে কি অদ্ভুত স্বপ্ন বল ।

– এই জান তো আমার না খুব ভয় করছে ।

– কেন ?

– এই যে তুমি সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাক আর কিসব আজগুবি স্বপ্ন দেখছ ।

– আরে ধুর ছাড়, কি সব ভুল ভাল স্বপ্ন … তাহলে খুব শপিং করলে আজকে ?

– হ্যাঁ । জান আজ না আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড কে দেখলাম শপিং করতে গিয়ে । কি হ্যান্ডসাম দেখতে লাগছে । একটা লাল টিশার্ট পড়ে এসেছিল । ঐ লাল টিশার্ট টা আমার খুব চেনা জান । ওটার ওপর মাথা দিয়ে …

********

মেয়েটির প্রাক্তন প্রেমিকের একের পর এক বর্ণনা আসতেই থাকে এর পর … ছেলেটি এক বুক সহানুভুতি, প্রশ্রয়ের সাথে অনেক অনেকটা দুঃখ আর যন্ত্রণা নিয়ে মেসেজ গুলো পড়ে যেতে থাকে । আর …

“বন্ধুদের কাছে যাওয়ার সময় তো আর মা পাশে ছিল না, তবুও একটা বার ফোন করতে বলল না ও” … অভিমানে গুমরোনো ছেলেটা কোনো দিনও বুঝতেই পারবেনা … তার স্বরূপ ।

একটা লাইফ সাপোর্টেড বেলজারে বন্দী একটা বিশ বছরের ছেলের মাথা ফাটিয়ে বের করে নেওয়া ব্রেণ । জীবন্ত, অনুভুতি প্রবণ । যাকে প্রতিদিন ইরেজ করা হয় আর স্টিমুলেট করা হয় অভিনেতা ইন্টিলিজেন্ট যন্ত্রমানবীর “লাভ হার্টস” প্রোগ্রামে । যন্রণা নিষ্কাশিত হয় আর জন্ম নেয় রোবোটিক আর্ট ফর্ম রা ।

কোন এক নীরার জন্য

বার বার মেঘ হয়ে মুখ ভার করিস রোদ ঢেকে,
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে কিসের দ্বিধা রে তোর ?
অস্ফুট গর্জনে বিদীর্ণ বুকের বিদ্যুৎ আড়াল করিস
একটা কালবৈশাখী হতে এত সময় নিস কেন ?

জানি কিছুটা তোর ভালবাসা আর কিছুটা অভ্যাসের
ফিউশন, কিছুটা রাত জেগে বলা কথা আর কিছুটা
ভীষণ চেনা ঘামের গন্ধ, কিছুটা তোর হঠাৎ চেতন
শরীরের প্রতিবর্ত পসেসিভ মন, কিছুটা স্মৃতির প্রেত ।

নীরা, তোর ভয়গুলোকে চিনি, জানি প্রতিটা কৃষ্ণচূড়া
বিছানো রাস্তায় তোকে তাড়া করে ক্রনিক আঘাতেরা,
তোর নিজের সঙ্গে দ্বন্দগুলোকে বুঝি, সূর্যের মন্থনের
স্বাদের নেশায় এখনও আচ্ছন্ন তোর সমস্ত শরীর, সত্ত্বা

আবার বৃষ্টি হয়ে ঝরে, নদী হয়ে বয়ে সঙ্গম হয়ে সাগরে
মিশে যেতে, হারিয়ে যেতে বড্ড ভয় তোর; তোর যন্ত্রণা
আর অবচেতনের অধিকার হারানোর আক্রোশদের যত্নে
লালন করিস, একাকিত্বে ঝাঁঝালো মদের বিষাক্ত আস্বাদে

তবু বলি, আজ আর পালিয়ে যাস না দায়সারা অজুহাতে,
স্মৃতির চোখে চোখ রাখ আর, শুকনো ঝরা পাতা গুলো
প্রবল ঘূর্ণিতে উড়িয়ে একটা সাইক্লোন বা আকাশ ভাঙা
বৃষ্টি হয়ে অবিশ্রান্ত ঝরে পড় শুষে নেওয়া রুক্ষ মাটিতে …

কাঁচের দেয়াল

স্বপ্নরা কি কাল্পনিক না তোর মত আবছা একটা অবয়ব ?
যারা অতীতের কবরে শুকনো গোলাপের খোঁজে অবহেলায়
পেরিয়ে আসতে পারে সহস্র বছরের বুনো গুলমার্গ  …

স্বপ্নরা কি তোর মতই অশ্রুজমা স্ফটিক ছড়িয়ে রাখে তাদের
হারাবার পথে … লুঠ হয়ে যাওয়া অমূল্য রত্নের মত ;
স্বপ্নরা তোর মতই ঘিরে থাকা বিবেকের চোখের অলিক ভয়ে
নিজেকে অস্বীকার করে সেই প্রাগিতিহাসের ফসিল সাক্ষী হয়ে ?

আদমের হাত ছুঁয়ে  অনুভুতি লুকোয় নিষিদ্ধ ফলে …
সীমাবদ্ধতার পাহারায় … ভগবানের মূর্তির অবয়বে মাথা রাখতে চায়
একটা প্রশস্ত বুকের ফ্যান্টাসিতে … নিয়ম পালনের অছিলায়

সত্যি করে বল, স্বপ্নরা কি তোর মতই বার বার মেকাপ বদলে আসা
মঞ্চসফল আপনজন , যাদের আপন ভেবেও ছোঁয়া যায়না
স্ক্রিপ্ট রিমোটের প্রম্পট সতর্কতায়, যাদের জন্য জমানো চুমুর দাগ
রয়ে যায়, ফিকে হয় তোর আর আমার মাঝের অদেখা কাঁচের দেয়ালে

রাষ্ট্র ও গামছা

আকাশী রঙের বিশাল লাক্সারী বাসটা রায়পুর থেকে চলতে শুরু করল । বাসে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বন্ধুরা, দাদারা মিলে জনা ২০ লোক জন ।

– শুনেছিস ভাই, ট্রেণে আসতে আসতে যে মাওবাদী হামলার কথা শুনেছিলাম তাতে ৫ টা লোক টপকে গেছে ! এই দেখ ফেসবুকে একটা বন্ধু লিখেছে ! ভাই আমাদের বাসটা ও তো ঐ রাস্তা দিয়েই যাবে ! কী হবে বাঁড়া ! যদি আমাদেরও অ্যাটাক ফ্যাটাক করে !

– করলে করবে, কী আর করা যাবে … চুপচাপ থাকো না, আমার কান খাচ্ছ কেন । ঘুমোতে দাও তো, ট্রেণে ঘুম হয়নি ।

– এই বোকাচোদা, খালি ঘুম না ? তুই টিমের লিডার বলে কথা । এবার থেকে বেরোনোর আগে আমাদের এল আই সি করে বেরোবি নইলে চুঙ্কু কেটে রেখে দেব … হে হে হে হে

এরা নিজেরাও ঘুমোবেনা, আমাকেও ঘুমোতে দেবেনা বুঝে অত্যন্ত্য অনিচ্ছা সহকারেও জানালার ধারে গিয়ে বসলাম । প্রায় ঘন্টা পাঁচেক লাগবে । লাল মাটির দেশের সবুজ জঙ্গল চিরে একটা মসৃণ পীচের রাস্তা । একটুক্ষণ পর পর থেকেই চোখে পড়তে লাগল জঙ্গলের মাঝে মাঝেই একটা করে বস্তা দিয়ে ঘেরা ছাউনি আর তার আড়ালে জলপাই টুপি আর উঁচিয়ে থাকা নল ।

যাইহোক রাস্তায় একবার মোটে গাড়ি থামিয়ে আর্মির লোকেরা কাগজপত্র দেখে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি । নির্বিঘ্নেই পৌঁছেছিলাম নারাইনপুরে ।

ব্যাপক জায়গা । চারিদিকে ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গল । অল ইন্ডিয়া ইউথ কনভেনশন । সারা ভারত থেকে প্রায় ১৫ হাজার লোক এসেছে । সে বিশাল ব্যাপার ।

দশদিন ব্যাপী বিরাট উৎসবের ইনগোরেশোন হল আমাদের অনুষ্ঠান দিয়ে । সেই প্রথম একসাথে প্রায় ১২ হাজার লোকের সামনে পারফরম্যান্স । অনবদ্য একটা অভিজ্ঞতা ।

যাই হোক তার পরের ৯ দিন কোনো কাজ কর্ম নেই । মালপত্র তো সেই রাত্রেই আবার বাক্সবন্দী হয়ে গিয়েছে । তাই পরের ৯ দিন চুপ চাপ খাওয়া ঘুমোনো ঘোরা আর অনুষ্ঠান দেখা ।

আমি শালা বোর হয়ে যাচ্ছিলাম । তাই ওখানকার আবাসিক ছাত্র আদিবাসী গোটা তিনেক বাচ্চার সঙ্গে জঙ্গল চষতে শুরু করলাম ।

একদিন ওদের বললাম ওদের গ্রামে নিয়ে যেতে । অদ্ভুত ভাবে সব কিছুতে দাঁত বের করে হেসে হ্যাঁ করা ছেলেগুলো কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গিয়ে কিছুতেই রাজি হতে চায়না । আমরা অনুষ্ঠান করার পরের দিনই হসপিটালে ভর্তি থাকা আহত বিদ্যাচরণ শূক্লের জীবনাবসানের খবর পাই । ভাবলাম হয়ত তারই জন্য কোনো চেকিং এর কড়াকড়ি আছে । তবু খুব জোড়াজুড়ি করতে থাকায় ওরা রাজি হল ।

বনের অনেক ভিতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যাওয়া । সোজা রাস্তায় গেলে মিলিটারি আইডেন্টিটি কার্ড দেখে পত্রপাঠ ঘর পাঠিয়ে দেবে । জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গেলে খোচর ভেবে বিপক্ষ দল সোজা ওপরে পাঠিয়ে দেবে । দূর থেকে দেখলাম মিলিটারীতে একটা এন জি ও ট্রাক থামিয়ে পেটি পেটি বিস্কুট, ওষুধ নামিয়ে নিজেদের গুদামে মজুদ করছে । শুনলাম ঐ এন জিও সংস্থা গুলো মাঝে মাঝেই আসে নানা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আদিবাসী গ্রামগুলোতে দিতে । কিন্তু মিলিটারী সব বাজেয়াপ্ত করে নিজের গুদামে মজুত করে নেয় । ওসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ, হাই প্রোটিনের বিস্কুট, দুধের প্যাকেট এসব মাওবাদীদের হাতে পড়তে পারে, তাদের হাত শক্ত হতে পারে এই কারণ দেখিয়ে ।

অবুঝমার পাহাড়ের মাথায় গ্রামটা প্রস্তর যুগ থেকে সামান্যই এগিয়েছে । এমনকি এখনও অনেকে চামড়া পরে । শীকার আর বনের মধ্যে হওয়া ফল পাকুরই প্রধান উপজীব্য । এই গ্রামেই ধনসিং এর বাড়ি । ধনসিং তার বাড়ি অর্থাৎ একটা কঞ্চি আর পাতা দিয়ে তৈরি ঘরে আমায় যত্ন করে নিয়ে গেল । বাড়িতে শুধু ওর বুড়ি দাদিমা । তোবড়ানো কুঁচকোনো মুখ । একটা নেকড়া পড়ে আছে । ঊর্ধাঙ্গ এখানকার বেশীর ভাগ লোকের মতই অনাবৃত । পিঠের দিকে একটা গভীর ক্ষত, পুরোনো কিন্তু ট্রীটেবল । বোঝাই যাচ্ছে একটু বিটাডাইন কিম্বা টিংচার অব আয়োডীন ও পড়েনি । একটা পাথরের খোরায় পিঁপড়ের ডিম জড়ো করছে । আমার পকেটে বন জঙ্গলে ছড়ে টরে যাওয়ার ভয়ে একটা সুক্রাল এম ইউ মলম ছিল । ধনসিংকে দিয়ে বললাম ওর দাদীকে বলতে প্রতিদিন লাগানোর জন্য ।

একটু পরে ধনসিং ওর পিসিকে কোত্থেকে যেন ডেকে নিয়ে এল । হাতে কিছু উই ঢিবি থেকে তুলে আনা ছাতু । লাজুক মুখে মাঝে মাঝেই দাঁত বের করে হাসি টা লুকোচ্ছে । একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে । এর বরকে মিলিটারীরা ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে গিয়ে গুলি করার সময় এই লাজুক মেয়েটা বাধা দিয়েছিল । একটা মোটা সেগুনের ডালের বাড়ি পড়েছিল একটা মিলিটারী হেলমেটে । তাই পুরস্কার স্বরূপ তলপেটে আর দু পায়ের ফাঁকে কাঁটার নাল লাগানো বুটের লাথি জুটেছিল এলোপাথাড়ি । লাজুক মেয়েটার পরণে একটুকরো সাদা ন্যাকরা আর ঊর্ধাঙ্গে একটা শতচ্ছিন্ন গামছা । যার ফাঁকফোকড় দিয়ে মাঝে মাঝেই অনাবৃত হয়ে পড়ছে আবলুশ নিটোল স্তনবৃন্ত । একুশ বাইশ বছরের খোলা শরীর দেখে আমার অঙ্গবিশেষ শক্ত হয়ে উঠল না কোনো অজানা কারণে । বরং গোটা গায়ে রী রী করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এক অবর্ণনীয় অনুভূতি । ঘৃণা না অক্ষমতার …… জানিনা ।

শুনলাম গামছা ও নাকি মিলিটারীদের বাজেয়াপ্তকরণের হাত থেকে ছাড় পায়না । মাওবাদীরা মুখে গামছা নিয়ে যাতে ঘুরতে না পারে তার জন্য । সেদিন ওদের কে অঙ্গিকার করেছিলাম কয়েকটা গামছা ধনসিং আর তার বন্ধুদের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব আমার সীমিত সাধ্যানুসারে ।

নারাইনপুর থেকে ফেরার দিন কিছু গামছা কিনে ওদের হাতে দিয়েও ছিলাম ।

জানিনা সেগুলো পৌঁছেছে নাকি গামছা আর অবুঝমারের মাঝে অবুঝ রাষ্ট্র এসে পাঁচিল তুলেছে আর নিরুপায় হয়ে কটি প্রথম প্রজন্ম শিক্ষিত ছেলে গামছা গুলি মুখে বেঁধে নিয়েছে … কি করবে বল, পুরুষ তো, কাপুরুষের মত গলায় দিয়ে ঝুলে পড়তে তো আর পারেনা  …

ঘন্টা, দরজা ও এক পাগলের গল্প

“পালাও পালাও, বেরিয়ে এসে পালাও, কিচ্ছু নিতে হবে না ।”

“কেন ? কি হয়েছে ”

“অগ্নীদেবতা জেগে গেছে । আকাশ থেকে গরম ছাই নেমে এল বলে ।”

“কি আজেবাজে বকছ ! বলি সেরকম কিছু হলে কি একটু আওয়াজ বা কাঁপুনিও শুনতে পেতাম না ?”

“কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখেছি …”

“কোথায় ? কোথায় দেখেছ ?”

“আজ ভোরের স্বপ্নে আমি স্পষ্ট দেখেছি । অগ্নীদেবতার গর্ভ প্লাবিত হয়ে উঠে আসছে গরম লাভা … জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে আমাদের এই সুন্দর শহরটা ।”

“তুমি পাগল হয়ে গেছ মসকাস । এমন সুন্দর দিন আর তুমি কিনা এসব আজগুবি অলুক্ষুণে কথা বলছ …”

“ডোমিনিকা তুমি বিশ্বাস কর আমার কথা, ঈশ্বরের দোহাই বিশ্বাস কর ।”

“ও বুঝেছি, আজ ইয়েন্তিনের আসার কথা আমার কাছে । তাই তুমি এভাবে ভয় দেখিয়ে আমায় জিততে চাইছ । শোনো মসকাস, তুমি যাই কর না কেন, লাভ হবে না, ইয়েন্তিনের অনেক ক্ষমতা, অনেক সম্পদ । অলডারম্যান ইয়েন্তিনই হবে, তুমি হেরে যাবে । আর জানই তো আমি শুধুমাত্র বিজয়ীকেই বরণ করে নেব । সুতরাং এভাবে সময় অপচয় না করে যাও নিজের কাজে যাও । আমাকে বিরক্ত করবার চেষ্টা কোর না ।”

“ডোমিনিকা … তুমি একটি বার আমার কথা শোন …”

ভারী কাঠের দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল মসকাসের মুখের ওপর …

সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের কাছে গিয়ে তাদের বোঝাবার চেষ্টা করে জুটল শুধু তামাসা আর টিটকিরি । নাহ অলডারম্যান নির্বাচনের জন্য এটা তার কোনো বিশেষ চমক নয়, এই সত্যি কথাটা সে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারল না কাউকে । প্রশাসকের কাছে বিশেষ অনুমতি নিয়ে সাক্ষাত করতে গিয়ে এই বিপদের কথা জানাতে তাকে পাগল সাব্যস্ত্য করে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ জারি হয়ে গেল গুজব রটানোর অপরাধে। ঢেঁড়া পড়ল শহরে …

সব হারিয়েও মসকাস প্রিয় কয়েকজন বন্ধুর কাছে গিয়েছিল তাদের সাবধান করতে । তার উন্মাদ রোগের কথা আগেই প্রচার হয়ে গিয়েছিল শহরময় । তাই অতি প্রিয় বন্ধুদের কারুর থেকে জুটল অবহেলায় ছুঁড়ে দেওয়া কয়েকটা রুটি, কোনো জায়গায় প্রহরী সহযোগে অর্ধচন্দ্র ।

এভাবে কেটে গেল কয়েকটা সপ্তাহ । আশ্রয়হীন মসকাস রাস্তায় পড়ে থেকে বুঝে গেল, স্বপ্নের উপর ভরসা করা মূর্খামি কারণ স্বপ্ন স্বপ্নই । অবসাদে মুষড়ে মসকাস চরম সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল । সত্যিই তো এভাবে বেঁচে লাভ কী ? শুধু যদি শেষবারের মত ডোমিনিকাকে একবার, মাত্র একটি বার দেখতে পেত …

নাহ এসব ভেবে লাভ নেই … ওসব বিজয়ী দের জন্য …… তার মত জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া মানুষদের অধিকার নেই ভালোবাসায় …

* * * * * * * *

উঁচু পাথরটা থেকে অনেকটা নীচে সমুদ্র, শেষ বারের মত তার আজন্ম পরিচিত শহরটা দেখে নিল মসকাস … তখনই …

“কি মসকাস … মরতে চাইছ তো ?” … ভরাট সুন্দর গলায় কে যেন বলে উঠল ।

পিছনে তাকিয়ে মসকাস দেখে এই নির্জন পাথরের টীলায় নিঃশব্দে কখন যেন আবির্ভাব ঘটেছে অদ্ভুতদর্শন এক লোকের ।

দীর্ঘকায় লোকটার পরণে অদ্ভুত পোশাক, কিছুটা আলখাল্লার আদলে মাথা ও শরীরের বাঁদিকটা ঢাকা । ঘন নীল ডান চোখ থেকে দুর্বোধ্য এক দ্যূতি যেন বিচ্ছুরিত হয়ে তাকে বিহবল করে দিচ্ছে । আর লোকটার পিছনে একটা অদ্ভুত দরজা ফ্রেমে আটকানো । খোলা দরজা দিয়ে এপাশ ওপাশ দেখা যাচ্ছে ………… এসব কী দেখছে মসকাস ! এসবই কি তার কল্পনা ! তবে কি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেল সে …

“কিন্তু তোমায় যে আসতে হবে আমার সঙ্গে, অনেক কাজ আছে তোমার জন্য, চল” … কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মসকাসের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল লোকটা । বরফের মত ঠান্ডা লোকটার বাম হাতে যেন অচেনা এক ধাতব অনুভূতি । স্বপ্নাবিষ্টের মত চলল মসকাস । তার মন অদ্ভুত এক বিস্ময়ে বাধা দেওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে ।

দরজা দিয়ে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল ছায়াছবির মত দুটো লোক আর অদ্ভুত এক দরজা ।

মসকাস শুনতে পেলনা, শহরে বাজছে পাগলা ঘন্টী, হঠাত কম্পনে কাঁপছে সারা শহর । শহরের বাসিন্দারা ভয়বিহবল হয়ে ছুটে বেরিয়ে আসছে রাস্তায়, দেবতার রোষ থেকে বাঁচার জন্য ।

মসকাস জানলো না এ কম্পন একসময় থেমে যাবে, আরও প্রবল হয়ে ফিরে আসার জন্য …… জানলো না, এক দিন আকাশ থেকে নেমে আসবে জ্বলন্ত পাথর জমা ছাই, মাটি ফাটিয়ে বেরিয়ে আসবে লাভা, মুছে যাবে তার আজন্ম পরিচিত শহর পম্পেয়াই, ঠিক যেমনটি সে দেখেছিল এক ভোরের স্বপ্নে।

মহাকাব্যিক …

“আকাশগঙ্গা মেট্রো পরিষেবা ব্যবহারকারী যাত্রিগণকে স্বাগত । মেরিবুসা সোলার সিস্টেমের গোল্ডেনপিপার গ্রহে যাত্রাকারী এই মেট্রোটির পরবর্তী স্টেশন আর্যভট্ট, এক্সস্ট চেম্বার বাঁ দিকে …”

চোখের মণিতে সেট করা মডিউলে ফেসক্লাউডটা খোলার চেষ্টা করল রাঘব । নাঃ পৃথিবীর লিঙ্ক অফ হয়ে গেছে । আর্যভট্টয় থামলে একবার ওখানকার লিঙ্ক ইউজ করে দেখতে হবে । অনেকটা রাস্তা … ক্লাউড ও তো এক্সেস করা যাবেনা । অবশ্য লোকাল স্টোরেজে কিছু শর্টমুভিস, গেমস, ভার্চুয়াল টুরস, হাবিজাবি আছে । ওগুলো দিয়েই সময়টা কাটাতে হবে আর কি । ব্রাউজ করার জন্য পলক ফেলল রাঘব …

আরে এটা কখন এসেছে, খেয়াল করা হয়নি তো ! ক বার করে আর পাঠাবে ! কালই তো একবার পাঠিয়েছে অ্যালার্ট টা । বার বার ছবিটা দেখতে ভাল লাগছেনা রাঘবের । এই ছবিটা জাঙ্কির আর তার বিয়ের পরে তোলা ছবি । মুন ক্রেটর রিসর্ট সার্ভিসের কটা উদ্দাম রাতের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । সেই জাঙ্কি … কত মিষ্টি স্বপ্ন দুজনে মিলে । হঠাত করেই সব এলোমেলো হয়ে গেল এর পর । এক ঝড়ের রাতে রাঘব যখন তার শিফট ডিউটিতে । সবার অলক্ষ্যেই হারিয়ে গেল জাঙ্কি । কয়েকজন অবশ্য উইটনেস ছিল । তাদের কথা মেনে নিলে জাঙ্কিকে ফিরে পাওয়ার আসা ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল । কারণ প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী জাঙ্কি কে অপহরণ করে নিয়ে গেছিল কুখ্যাত ক্যানিব্যাল গ্যাং – হাইড্রার গুন্ডারা । কিন্তু রাঘব আশা ছাড়েনি … তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে নক্ষত্রে নক্ষত্রে । শুধু একটা বার জাঙ্কির মুখটা দেখার জন্য সব কিছু দিতে রাজি ছিল ও … সবাই বলেছে জাঙ্কি বেঁচে থাকা অসম্ভব তবুও আশা ছাড়েনি রাঘব ।

তারপর রাঘবকে চলে যেতে হল ইন্টারগ্যালাক্টিক ওয়ারে ব্ল্যাকএপ স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতে । যুদ্ধের নৃশংসতায় কেটে গেল কতগুলো বছর । এখন যুদ্ধ শেষ । আপাতঃদৃষ্টিতে সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্টিত শান্তি । এতদিনে হঠাত করে খবর এলো জাঙ্কির । মেরিবুসার গোল্ডেন পিপারে পরাজিত হাইড্রাগ্যাং এর সেক্স স্লেভ ডাঞ্জেন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাকে । রাঘব তার খোঁজে বিশ্ব তোলপাড় করেছে একথা উদ্ধারকারীদের কাছ থেকে শুনে নাকি শুধু চোখের জল ফেলে গেছে জাঙ্কি । সে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে রাঘবকে কাছে পাওয়ার …

গা টা ঘেন্নায় গুলিয়ে উঠল রাঘবের । কী করে পারল জাঙ্কি । তিল মাত্র লজ্জাও কি নেই ওর ? ঐ অমানুষগুলো ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোড় করে নিজেদের যৌনদাসীর কাজ করিয়েছে … ওকে নষ্ট করেছে , তার পরেও কী নির্লজ্জের মত রাঘবের কাছে ফেরার কথা বলতে পারল ও … ছিঃ । … ঐ নষ্ট শরীর নিয়ে একটা মেয়ে ওর পাশে শুয়ে আছে, ভাবতেই অপরিসীম বিতৃষ্ণায় জিভের ডগা অব্দী কেমন তেতো তেতো হয়ে উঠল রাঘবের ।
যাই হোক নিজের কর্তব্য করবে রাঘব । ওকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে কোনো একটা স্যাভেজহোমে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে । আর নিজের জমানো কারেন্সি থেকে অর্ধেকটা দিয়ে দেবে ওকে । সারা জীবন ওতেই দিব্যি চলে যাবে জাঙ্কির । খেতে পড়তে অসুবিধা থাকবেনা । আর কি চাই …

“আকাশগঙ্গা মেট্রো পরিষেবা ব্যবহারকারী যাত্রিগণকে স্বাগত । মেরিবুসা সোলার সিস্টেমের গোল্ডেনপিপার গ্রহে যাত্রাকারী এই মেট্রোটির পরবর্তী স্টেশন গৌতম-৯১, মেট্রো সার্ভিসে কিছু যান্ত্রিক গোলোযোগ দেখা দেওয়ায় যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে তাঁরা যেন পরবর্তী স্টেশনে মেট্রোর কেবিন গুলি খালি করে দেন । পরিষেবায় ব্যাঘাত ঘটায় আমরা দুঃখিত ।”

যাঃ এ আবার কি কেলো হলো ! এই অ্যান্টিগ্রাভিটি সিস্টেমের নতুন আপগ্রেডেশন করার পর থেকেই নতুন মেট্রোগুলো যখন তখন মুখ থুবড়ে পড়ছে । এখন কতক্ষণে আবার রিপ্লেসমেন্ট দেয় কে জানে …

সামনেই ইন্টারগ্যালাকটিক মিউজিয়াম অব লাভ এন্ড ইমোশোনস । সারা বিশ্বের অন্যতম বড় মিউজিয়াম । প্রায় সমস্ত বাসযোগ্য গ্রহের নানা ঘটনা, অনুভূতির নিদর্শন দিয়ে সাজান এই মিউজিয়াম । দাঁড়িয়ে থেকে সময়টা নষ্ট করে বেসিক্যালি কিছু লাভ নেই তাই রাঘব এগিয়ে গেল মিউজিয়ামের দিকে ।

কত রকমের সংগ্রহ । দেখতে দেখতে শেষ করা যাবেনা । এদিকে রিপ্লেসমেন্ট মেট্রোটা চলে এলে মুশকিল । অবশ্য তার কনীনিকায় অ্যালার্ট এসে যাবে । যাই হোক, ঘুরতে ঘুরতে আর্থ গ্যালারীতে পৌঁছল রাঘব । প্রাচীন মিশরের ভাই বোনের প্রেম থেকে বিভিন্ন ধরণের চুমু কত কিছুর নিদর্শন । কিন্তু সবচেয়ে বেশী চোখ টানে গ্যালারীর ঠিক মাঝখানে একটা মূর্তি । না মূর্তি নয় তো ! নাইট্রোজেনে ফ্রোজেন অপূর্ব সুন্দর এক নারী । মমিফায়েড নয়, যেন জীবনকে হঠাত করেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে । সামনে একটা টাচ সেন্সার । পাশে লেখা – “গিভ দ্য টাচ অফ লাইফ টু দিস লস্ট সোল” । মানে টা কি ? এখানে টাচ করলেই মহিলা জীবন্ত হয়ে উঠবে !!! অদ্ভুত তো ! বুড়ো আঙুলটা ছোঁয়ালো রাঘব ।

নাঃ কিছুই হল না … ধুর যত সব মডেল আইটেম । আর তারও যে কি হয়েছে এরকম একটা সাজানো আইটেম কে সত্যি বলে ভেবে নিচ্ছিল । সত্যিই মাথাটা গেছে । কিন্তু এটা কী ? ইন্টারেস্টিং !

ডেস্ক্রিপশন উইন্ডোটা অন করল রাঘব । মূর্তিটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক প্রবাদ । একবিংশ শতাব্দীর কোনো এক মহান আবিষ্কারকের স্ত্রী এই নারীকে একলা পেয়ে একবার বলপূর্বক ধর্ষণ করে তাঁর স্বামীর একই সংস্থার এক উচ্চপদস্থ অফিসার । এ ঘটনা জানতে পেরে ক্রোধে হীতাহীত জ্ঞানশূণ্য সেই প্রফেসর তৈরী করেন এক অদ্ভুত মেকানিজিম । আর শাস্তি হিসাবে স্ত্রীর জীবনকে বন্দী করেন এই অদ্ভুত অবস্থায় অনন্ত কালের জন্য যাতে মরে শান্তি পাওয়ার অধিকারটুকুও না থাকে তার । সেই থেকে বন্দিনী … অনন্ত কালের শাস্তিপ্রাপ্তা ।

মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল রাঘবের । এভাবে কেউ নিজের ভালবাসার মানুষকে শাস্তি দিতে পারে । আর এখানে এ বেচারীর দোষই বা কোথায় ? নাঃ ভালবাসতে বোধ হয় সবাই পারে না ।

মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে রাঘব । জাঙ্কির প্রতি ঘৃণার বদলে গভীর অনুকম্পায় ভরে যাচ্ছে সমস্ত মনটা । তার প্রতি এতক্ষণের বিষাক্ত মনোভাবের জন্য কিছুটা অনুতাপও হচ্ছে । নাঃ, আর কোত্থাও হারিয়ে যেতে দেবে না সে জাঙ্কি কে । কত স্বপ্ন ছিল যে তাদের , দুটো জমজ ছেলে হবে, একসঙ্গে আরেকবার মুন রিসর্টের সন্ধ্যেয় বসে পশ্চিম আকাশে পৃথিবী উঠতে দেখা, আরও কত কিছু । তাদের বাকি থাকা স্বপ্ন গুলো এক এক করে পূরণ করবে সে ।

বিপ বিপ করে একটা অ্যালার্ট ঢুকল । আরে রিপ্লেসমেন্ট মেট্রো দিয়ে দিয়েছে ! মূর্তিটার গায়ে আরেকবার গভীর সহানুভূতির সঙ্গে হাত বুলিয়ে গ্যালারী থেকে বেরিয়ে চলল রাঘব ।

তার মনের মধ্যে ভালবাসা আর রিজনিং এর সাথে যুদ্ধে পরাজিত পুরুষালী ইগোটা তখন আস্তে আস্তে লুটিয়ে পড়ছে । আর সেই বদলে যাওয়ার স্পর্শে তার অলক্ষ্যে ফেলে আসা গ্যালারীটার আস্তে আস্তে সচল হয়ে উঠছে, একটু একটু করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে “অহল্যা” নামের মূর্তিটা ।

একা …

সকালের শিশিরের টুপটাপ শব্দে রোজ ঘুম ভাঙ্গে দেবীর । তার পর আড়মোড়া ভেঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ঘুম জড়ানো উপত্যকাটা দেখে । ছোট ছোট ঘর পেরিয়ে গ্রামের ঠিক মাঝে যেখানে সারা দিন রাত জ্বলে ধুনী সেখান থেকে অবিশ্রান্ত উঠতে থাকা ধোঁয়ার কুন্ডলীটা কুয়াশার সঙ্গে কোথায় যেন মিশে যায় বুঝে উঠতে পারেনা দেবী ।

পাহাড়ের ঝর্ণায় স্নান সেরে আগের দিনের রয়ে যাওয়া ফলমূল দিয়ে খাওয়া টা সেরে নিয়ে পোষা বাঘের ছানাটাকে নিয়ে আদর করে খেলা করে সে । আর একঘেয়ে হয়ে গেলে মেঘ নিয়ে খেলা শুরু হয়, তার যে অন্য খেলনা নেই । মেঘেরা তার হাতের ইশারায় কেনই বা রূপ বদলায় কেনই বা তার ইচ্ছায় ফুলেরা ফোটে এত কিছু কখনও বুঝতে চায়নি দেবী, ভেবেও দেখেনি কখনও ।

একটু বেলায় নীচের উপত্যকাটা থেকে উঠে আসে কিছু দুপেয়ে জীব, দেখতে অনেকটা তারই মত । অদ্ভুত তাদের অঙ্গভঙ্গী । অদ্ভুত তাদের দৃষ্টি । সে দৃষ্টি মাঝে মাঝে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরতে ঘুরতে হঠাতই কিসের যেন ভয়ে চমকে উঠে নিবদ্ধ হয় তার পায়ের দিকে ।

অদ্ভুত এই জীবগুলো এসে সরু মোটা ইত্যাদি বিকট স্বরে “দাও দাও” করে ডাকতে থাকে । অনেকটা তার পোষা বাঘ ছানাটার ম্যাও ম্যাও করার মত, কে জানে হয়ত ওটাই ওদের ডাক । তবে এই দুপেয়ে গুলোই প্রতিদিন তার জন্য প্রচুর ফল মূল রেখে যায় । সে সব সে একা খেয়ে শেষ করতে পারেনা ।

***

একদিন ঝর্ণায় স্নান করতে গিয়ে একটা ঝোপের আড়াল থেকে দুটো পা বেরিয়ে থাকতে দেখল দেবী । সাহস করে কাছে গিয়ে দেখতে পেল কুচকুচে কাল রঙের চামড়ার এক দুপেয়ে ঘুমিয়ে আছে প্রাণপণে লুকিয়ে । তার মতই ছোট্ট আর মিষ্টি মুখটা দেখলে ঐ দাও দাও করা দুপেয়ে গুলোর মত অদ্ভুত লাগেনা । কেমন যেন মায়া হয়, কিসের যেন অচেনা এক অনুভূতিতে বুকটা টন টন করে ওঠে ।

শুকনো পাতায় মর্মর ধ্বনীতে ঘুম ভেঙ্গে হঠাতই ভীষণ সন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে পালাতে গেল ছেলেটা । কিসের ভয়ে কে জানে ! কিন্তু দেবীর হাতের ইশারায় মেঘেরা এসে ঢেকে দিল তার পথ ।

তার পর আস্তে আস্তে ভয় ভাঙ্গিয়ে কত কথা দুজনে । দেবী শুনল ঐ দাও দাও করে ডাকা জীব গুলোকে বলে মানুষ । আর তারা যেমন তাকে কেন ফলমূল দিয়ে যায় সেটা যেমন কেউ জানেনা তেম্নিই কোনো কারণ ছাড়াই এই ছেলেটাকে যেখানে দেখে সেখানেই তাড়া করে হাতে নিয়ে মশাল কিম্বা পাথর ।

এমন করে কেটে গেল গোটা একটা দিন, কোথা দিয়ে কেউ জানেনা । দেবীর কোলে মাথা দিয়ে বহুদিন পর শান্তির ঘুম ঘুমোলো ছেলেটা অজানা এক পাহাড়ের চূড়োয় ।

এসে পড়ল দুপেয়ে মানুষদের আসার সময় । দলে দলে আসা মানুষ আজ থমকে দাঁড়াল অবাক হয়ে আর তার পরেই দেবী জানল এক পরম সত্য মানুষের স্বর একরকম নয় । তা বহুরূপির রঙের মত পাল্টায় ।

দাও দাও শুনতে অভ্যস্ত্য কন্ঠগুলো থেকে আজ ধ্বনীত হল “মার অসুর মার”, “পোড়া শয়তান কে পোড়া” , ফলমূলের ডালি সাজানো হাতে উঠে এল মশাল, আগুন, পাথর, কুঠার … বাধ্য হয়েই তাই দেবীকে প্রথম বারের জন্য ম্যাচিওরড হতে হল, হাতে শূল এনে মিথ্যে নাটক করতে হল ছেলেটাকে গেঁথে ফেলার । তার মায়াবী অঙ্গুলীহেলনে ছেলেটা ঘুমোলো নিশ্চল নিস্পন্দ ভঙ্গিতে ।

হতবাক দুপেয়ে দর্শকরা চোখ বড় বড় করে দেখল সব । তার পর কিছুক্ষণ নাচানাচি করে আরও একবার কোরাসে “দাও দাও” করে ফির গেল তাদের উপত্যকায় । এখন তাদের উৎসব চলবে কদিন … মাংস আর সুরার ফোয়ারায় … বিজয়োৎসব ।

উৎসব শেষে যেদিন আবার গেল মানুষ পাহাড়ের চূড়ায় নৈবেদ্য সাজিয়ে, সেদিন সেখানে নেই কোনো দেবী বা অসুর ।

সম্মানের খাতিরে প্রচারিত হলনা নিরুদ্দেশ বার্তা । অসুর আর দেবী পালিয়েছে হাত ধরে একটা ছোট্ট সংসার আর একটুকরো শান্তির মত তুচ্ছ জিনিসের খোঁজে এসব শুনলে লোকে বলবে কি !!! তাই দেবীর প্রস্তরময় রূপে রূপান্তরের গল্প রটল দিকে দিকে, রটছে আজও , যদিও দেবী বা অসুর কোথায় গেল তা নিয়ে খুব বেশী ভাবিত নয় কেউ ই …… কিছু আটকাচ্ছে তো না এর জন্য ।

ঠিক সেই দিন থেকে মানুষ রয়ে গেছে কিন্তু একই রকম আওয়াজে, একই রকম চিন্তায় …… শুধু সেদিন থেকে মানুষ রয়ে গেছে “একা”

অন্য রূপকথা …

বুইলেন, সে অনেক অনেএএএএএএক দিন আগের কথা … । রাজপুত্তুর তো চলেছে তার অপহৃত রাজকণ্যার খোঁজে । বহু সন্ধানে সে জানতে পেরেছে রাজকণ্যা বেচারী বন্দী হয়ে আছে রাক্ষসদের ঘুমপুরীতে । রাক্ষসরা না থাকলে ঘুমোয় রাজকণ্যা । মায়া ঘুম । মাথার কাছে সোনারকাঠি আর রূপোর কাঠি ।

দিনের পর দিন হেঁটেও ফুরোতে চায় না পথ । কত পাহাড় নদী বন পেরিয়ে চলেছে রাজপুত্র । তবু পথের দিশা যেন ওলটপালট না হয়ে যায় । চন্দন বন, তামার পাহাড়, সোনা বালির নদী পেরিয়ে রাজপুত্র এসে পৌঁছল নদীর ধারে বিশাল গোলাপবনে । এট্টু হাই টাই অনেক্ষণ ধরেই উঠছিল রাজপুত্তুরের । গোলাপডালের কাঁটা বাঁচিয়ে একটু লম্বা হয়ে নিল রাজপুত্তুর । ঘুম ভাঙল সন্ধ্যে পেরিয়ে, রাত পেরিয়ে সেইই সক্কালবেলায় । তাও অত ভোর ভোর ঘুম ভাঙত না রাজপুত্তুরের । মখমলের বিছানা নেই বলেই হয়ত, না শুধু তাই নয়, আরও একটা ব্যাপার আছে । রাজপুত্তুরের মুখের উপর ঝুঁকে আছে, না না , ভুল বলা হল, বলা উচিত ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে একজোড়া টানাটানা চোখ । ভাবটা অনেকটা “পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ” টাইপের ।

তা যাই হোক, রাজপুত্তুর তার উদ্দেশ্য সবিস্তারে ব্যাক্ত করার সময় রাজকণ্যার বিরহে নাকি বীরত্বের উৎসাহে লক্ষ্যই করল না প্রেমসিক্ত দুটি কাজলনয়ণা দৃষ্টি আস্তে আস্তে বাষ্পাকুল হচ্ছে আবার লুকোচ্ছে আঁচলের শুকনো কাপড়ে । হয়তবা ঐ কেলে বদন দেখেই রাজপুত্তুরের অত প্রেম ফ্রেমের কথা মাথায় আসেনি ।

এই কৃষ্ণকলি কি মায়াবিনী ? রাজপুত্র একবার ভাবল, তার পর ভাবল তলোয়ার তো আছে, চিন্তা কি । এদিকে আঁচল ভরে আনা ফল আর মিষ্টি জলে রাজপুত্তুরের আপ্যায়ণে ত্রুটি হল না কিন্তু । সন্ধ্যে হব হব এমন সময়ে রাজপুত্রকে রাক্ষসপুরীর সন্ধান দিয়ে আর কখন রাক্ষসরা ঘুমোয় সেটা বলে দিয়ে চলে গেল কৃষ্ণকলি । আর যে তার থাকার হুকুম নেই । যাওয়ার সময় আঁচল ভরে নিয়ে গেল গোলাপের পাপড়ি । গোলাপ যে তার বড্ড প্রিয় ।

ইদিকে পরের দিন সক্কাল বেলা রাজপুত্তুর মালকোঁচা মেরে রওনা হল রাক্ষসপুরীর দিকে । পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল । তারপর রাক্ষসদের প্রাণ ভোমরা চুরি, রাজকণ্যার ঘর খুঁজে বার করা ইত্যাদি ঝক্কিতে আরও খানিকটা সময় চলে গেল ।

রাজকণ্যার ঘরে রাজকণ্যাকে পাওয়া গেল । তবে ঘুমন্ত নয় । কানে হেডফোন দিয়ে খাটে বসে ঠ্যাং নাচানো অবস্থায় । রাজপুত্রর তো এসব দেখে সেরিব্রোটেস্টোবনবনাইটিস কন্ডীশান । রাজকণ্যা তাকে দেখে বলল, “আরে এই উদগান্ডু, তুই এখানে কি করতে এসেছিস ? হাতে ওটা কি দেখি দেখি …”

শকড রাজপুত্র মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গিয়ে কৌটোটা দিতেই রাজকণ্যা কৌটো খুলে ভোমরাটাকে উড়িয়ে দিল । আর বলল “এবার যা ভাগ, এখানে কি করতে এসেছিস ? আমাকে ফেরানোর মতলবে হলে নিজের ইয়ে নিজেই মারছিস । আমি যাব টাব না । এখানে দিব্বি আছি, সারাদিন রোল বার্গার কাটলেট খেতে পাচ্ছি, দেশে তো ওই শুধু পোজ দিয়ে সিংহাসনে বসা আর সারাদিন শাকপাতা খাওয়া । এখানে অনেক ভাল আছি । ফিরে যা, এখানে ক্যারদানী মারতে এসে লাভ হবেনা । রাক্ষসরা এক্ষুনি জাগল বলে, তারপরে আমি তাদের সাথে লুডু খেলতে বসব । তোকে দেখলে কিন্তু খবর আছে । ”

ব্যাস বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেল, যুক্তি পাল্টাযুক্তি, গা জোয়াড়ী, খিস্তোখিস্তির অযৌক্তিক তর্ক । তর্ক প্রায় বোথসাইডেড ব্রেকাপের কাছাকাছি কন্ডীশনে চলে গেলেও রাজপুত্তুর বা রাজকণ্যে কেউই লক্ষ্য করল না যে ঘড়িতে ছটা বাজতে আর মিনিট খানেক দেরী । রাক্ষসরা জাগল বলে ।

ওদিকে মতিচ্ছন্ন ভোমরাটা বার কয়েক ভোঁ ভোঁ করে রাজপুত্রের মাথার চার পাশে ঘুরে তার পর মনে হয় মুক্তির দরজা ভেবে ভুল করে লাফ দিল ঘরে জ্বলা মোমবাতির আগুণে । রাজপুত্র রাজকণ্যে ঝগড়ায় ব্যস্ত থাকায় খেয়ালই করল না ।

কিন্তু ঝাঁপ দেওয়া মাত্রই বাইরে থেকে ভেসে আসতে লাগল রাক্ষসদের মরণ আর্তনাদ “বাবারে, মরে গেল্লুম র‍্যে, কে কল্লি বটেক , জীয়ন্ত চিবায় খাব্ব” ইত্যাদি । অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ঠান্ডা । কেউ দেখল না মোমবাতির গোড়ায় পড়ে রইল শুধু এক চিমটে ভোমরা পোড়া ছাই আর কটা গোলাপের পাপড়ি ।

রাজকন্যা রাজপুত্রের ঝগড়া ওদিকে শেষ হয়েছে । রাজপুত্র অ্যাবাউট টার্ণ করে রওনা হয়েছে নিজের দেশের দিকে । আর রাজকণ্যার কি যে হল … মানে বার্গার কাটলেট তো দূরের কথা, শাকপাতাও আজকাল জুটছে কিনা তার খবর পাওয়া যায়নি ।

রুদ্র আসছে

বহুদিন আগের মেগাপিক্সেল সিস্টেমে তোলা ছবিটা তার ধাতব হাতটায় ধরে অনেক কষ্টে চোখের সামনে এনে একবার দেখল রুদ্র । রাজকণ্যার মুখের যে সারল্যের ছোঁয়াটায় তার ব্যাকডেটেড ইমম্যাচিওর ভার্সানটা মোহিত ছিল সেই সারল্যের ছিটে-ফোঁটাও রুদ্র তার হাইপাওয়ার্ড টেরাপিক্সেল লেন্সের চোখ দিয়ে খুঁজে পেলনা ।

– “তুমি আসলে অস্থানে হওয়া দাদের চুলকুনির মত । যতই মলম লাগানো হোক না কেন কিছুদিন পর সামান্য হলেও মাথাচাড়া দেবে, তখন আবার মলমের খোঁজ করতে হবে । আর অদ্ভুত ভাবে চু্লকানোর মত পরিশ্রমসাধ্য কাজে মানুষের স্যাটিস্কেকশনের অভাব হয় না । বরং না হলেই কি যেন একটা মিস হয়ে গেল মনে হয়” — এক্সপ্লানেশনের সুরে নিজের মনেই স্বগতোক্তি করল রুদ্র ।

তার হাতের সারফেস হিটিং কয়েলটা অন হয়ে গেছে, আস্তে আস্তে বাড়ছে তাপমাত্রা । কালো হয়ে ধীর গতিতে পুড়ে যাচ্ছে ছবিটা । নতুন পাওয়া ধাতব হৃদয়টা তার কাছে একটা এসেন্সিয়াল এলিমেন্ট, স্মৃতির কাল্পনিক ডাস্টবিন নয় ।

______________________________________________________________
শিগগীরই আসছে রুদ্র, নতুন টিজার দিলুম, টিজড হলে কন্টিনিউ হবে ।

ভুল শুধরে

বড্ড ভুল করে ফেলেছি জানিস … তোর বড় বড় নিষ্পাপ চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে তোকে ভালবেসে … বড্ড বড় ভুল, তোর উত্তরে হ্যাঁ বলে ।

তোর কাছে তো কখনও কিছু চাওয়ার ছিলনা আমার, শুধু চাইতাম তোকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতে, তোর সব ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে, তোকে ভাল রাখতে, তোর যত্ন নিতে । কিন্তু কি অদ্ভুত দেখ, প্রতিটা মুহুর্তে তোর পাশে থেকে, প্রতিটা দিন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে, তোর সব কটা না পূরণ হওয়া ইচ্ছা পূরণের জন্য নিজেকে ক্ষইয়েছি একটু একটু করে … তবুও হাসি ফোটাতে পারিনি তোর মুখে উল্টে দিনের পর দিন একটু একটু করে বিরক্তির কুঞ্চন জড়ো হয়েছে তোর টানা টানা ভ্রূ যুগলে ।

আমার ইনকম্প্যাটিবিলিটি, আমার হ্যান্ডসাম না হওয়া, আমার বাউন্ডুলে হাব ভাব এতগুলো বছর ধরে তোর বন্ধুদের কাছে তোর মাথা নীচু করে দিয়েছে, … কি করব বল এই ছাপোষা স্বপ্নালু স্বভাবটা যে আমার শহর, আমার স্বত্ত্বাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখা শেকড় ।

তবু দেখ আমি কিছু না চাইতেও কেমন সুন্দর একটা উপহার দিয়ে বসলি আমায় … যে উপহারের প্যাকেট খুলতেই ভেসে এল আমাকে অবলীলায় ভুলে যাওয়ার, কিম্বা অন্যকারুর বক্ষলগ্না – অঙ্কবর্তিনী হয়ে তোলা ছবিদের গুঞ্জন । যা বার বার এসে হাজির হয় আমার নির্বাসিত টাইমলাইনে ।

তবে জানিস , ভুলটা শুধরে যাবে এত তাড়াতাড়ি বুঝতেই পারিনি । আমার এক দিদি অনেক দিন আগে বলেছিল, একফোঁটা ভালবাসার জন্য পৃথিবীতে কত লোক তীর্থের কাকের মত বসে থাকে । মরুভুমিতে অজ্ঞান মানুষটাকে জল না দিয়ে ফোয়ারার জৌলুশে মরুভূমির শোভাবর্ধনে কি লাভ ?

সেদিন না বুঝলেও কথাটা আজ বুঝি । বুঝি কিছু দামাল পাগল ছেলে মেয়ের সঙ্গে দুপুরের রাস্তায় ভালবাসা ভিক্ষা করে । না নিজের জন্য নয়, নেপালের বিধ্বস্ত মানুষগুলোর জন্য কলকাতা, শহরতলীর পথচলতি মানুষের ভালবাসা । জানিস, ওরা ফিরিয়ে দেয়নি রে । দেখ বিন্দু বিন্দু করে জমা হওয়া ভালোবাসায় বুকটা কেমন ভরে গেছে । নাঃ এর জন্য ওদের কিচ্ছু দিতে হয়নি জানিস ।

এতদিন তোর ছোট্ট ছোট্ট গজদাঁতের উঁকি দেওয়া একটা মিষ্টি হাসির জন্য অনেক চেষ্টা করেও তো তোর মনে বিরক্তি আর অবদমিত ঘৃণা ছাড়া কিছু সৃষ্টি করতে পারলাম না । আজ তোর বিরাট চাকরী আর হাই স্টেটাসের বন্ধুদের মাঝে তোর কিছুর দরকার নেই তাও জানি ।

তাই আজ ঐ অসহায় মানুষগুলোর জন্য একটু ভালবাসা বিলিয়ে দেখি, ওদের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলেও কান্নটা তো মোছাতে পারি ।

দামাল ছেলেমেয়ে গুলো যে ভালবাসার আসল স্বাদটা আমায় চিনিয়ে দিয়ে গেছে ।