একা …

সকালের শিশিরের টুপটাপ শব্দে রোজ ঘুম ভাঙ্গে দেবীর । তার পর আড়মোড়া ভেঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ঘুম জড়ানো উপত্যকাটা দেখে । ছোট ছোট ঘর পেরিয়ে গ্রামের ঠিক মাঝে যেখানে সারা দিন রাত জ্বলে ধুনী সেখান থেকে অবিশ্রান্ত উঠতে থাকা ধোঁয়ার কুন্ডলীটা কুয়াশার সঙ্গে কোথায় যেন মিশে যায় বুঝে উঠতে পারেনা দেবী ।

পাহাড়ের ঝর্ণায় স্নান সেরে আগের দিনের রয়ে যাওয়া ফলমূল দিয়ে খাওয়া টা সেরে নিয়ে পোষা বাঘের ছানাটাকে নিয়ে আদর করে খেলা করে সে । আর একঘেয়ে হয়ে গেলে মেঘ নিয়ে খেলা শুরু হয়, তার যে অন্য খেলনা নেই । মেঘেরা তার হাতের ইশারায় কেনই বা রূপ বদলায় কেনই বা তার ইচ্ছায় ফুলেরা ফোটে এত কিছু কখনও বুঝতে চায়নি দেবী, ভেবেও দেখেনি কখনও ।

একটু বেলায় নীচের উপত্যকাটা থেকে উঠে আসে কিছু দুপেয়ে জীব, দেখতে অনেকটা তারই মত । অদ্ভুত তাদের অঙ্গভঙ্গী । অদ্ভুত তাদের দৃষ্টি । সে দৃষ্টি মাঝে মাঝে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরতে ঘুরতে হঠাতই কিসের যেন ভয়ে চমকে উঠে নিবদ্ধ হয় তার পায়ের দিকে ।

অদ্ভুত এই জীবগুলো এসে সরু মোটা ইত্যাদি বিকট স্বরে “দাও দাও” করে ডাকতে থাকে । অনেকটা তার পোষা বাঘ ছানাটার ম্যাও ম্যাও করার মত, কে জানে হয়ত ওটাই ওদের ডাক । তবে এই দুপেয়ে গুলোই প্রতিদিন তার জন্য প্রচুর ফল মূল রেখে যায় । সে সব সে একা খেয়ে শেষ করতে পারেনা ।

***

একদিন ঝর্ণায় স্নান করতে গিয়ে একটা ঝোপের আড়াল থেকে দুটো পা বেরিয়ে থাকতে দেখল দেবী । সাহস করে কাছে গিয়ে দেখতে পেল কুচকুচে কাল রঙের চামড়ার এক দুপেয়ে ঘুমিয়ে আছে প্রাণপণে লুকিয়ে । তার মতই ছোট্ট আর মিষ্টি মুখটা দেখলে ঐ দাও দাও করা দুপেয়ে গুলোর মত অদ্ভুত লাগেনা । কেমন যেন মায়া হয়, কিসের যেন অচেনা এক অনুভূতিতে বুকটা টন টন করে ওঠে ।

শুকনো পাতায় মর্মর ধ্বনীতে ঘুম ভেঙ্গে হঠাতই ভীষণ সন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে পালাতে গেল ছেলেটা । কিসের ভয়ে কে জানে ! কিন্তু দেবীর হাতের ইশারায় মেঘেরা এসে ঢেকে দিল তার পথ ।

তার পর আস্তে আস্তে ভয় ভাঙ্গিয়ে কত কথা দুজনে । দেবী শুনল ঐ দাও দাও করে ডাকা জীব গুলোকে বলে মানুষ । আর তারা যেমন তাকে কেন ফলমূল দিয়ে যায় সেটা যেমন কেউ জানেনা তেম্নিই কোনো কারণ ছাড়াই এই ছেলেটাকে যেখানে দেখে সেখানেই তাড়া করে হাতে নিয়ে মশাল কিম্বা পাথর ।

এমন করে কেটে গেল গোটা একটা দিন, কোথা দিয়ে কেউ জানেনা । দেবীর কোলে মাথা দিয়ে বহুদিন পর শান্তির ঘুম ঘুমোলো ছেলেটা অজানা এক পাহাড়ের চূড়োয় ।

এসে পড়ল দুপেয়ে মানুষদের আসার সময় । দলে দলে আসা মানুষ আজ থমকে দাঁড়াল অবাক হয়ে আর তার পরেই দেবী জানল এক পরম সত্য মানুষের স্বর একরকম নয় । তা বহুরূপির রঙের মত পাল্টায় ।

দাও দাও শুনতে অভ্যস্ত্য কন্ঠগুলো থেকে আজ ধ্বনীত হল “মার অসুর মার”, “পোড়া শয়তান কে পোড়া” , ফলমূলের ডালি সাজানো হাতে উঠে এল মশাল, আগুন, পাথর, কুঠার … বাধ্য হয়েই তাই দেবীকে প্রথম বারের জন্য ম্যাচিওরড হতে হল, হাতে শূল এনে মিথ্যে নাটক করতে হল ছেলেটাকে গেঁথে ফেলার । তার মায়াবী অঙ্গুলীহেলনে ছেলেটা ঘুমোলো নিশ্চল নিস্পন্দ ভঙ্গিতে ।

হতবাক দুপেয়ে দর্শকরা চোখ বড় বড় করে দেখল সব । তার পর কিছুক্ষণ নাচানাচি করে আরও একবার কোরাসে “দাও দাও” করে ফির গেল তাদের উপত্যকায় । এখন তাদের উৎসব চলবে কদিন … মাংস আর সুরার ফোয়ারায় … বিজয়োৎসব ।

উৎসব শেষে যেদিন আবার গেল মানুষ পাহাড়ের চূড়ায় নৈবেদ্য সাজিয়ে, সেদিন সেখানে নেই কোনো দেবী বা অসুর ।

সম্মানের খাতিরে প্রচারিত হলনা নিরুদ্দেশ বার্তা । অসুর আর দেবী পালিয়েছে হাত ধরে একটা ছোট্ট সংসার আর একটুকরো শান্তির মত তুচ্ছ জিনিসের খোঁজে এসব শুনলে লোকে বলবে কি !!! তাই দেবীর প্রস্তরময় রূপে রূপান্তরের গল্প রটল দিকে দিকে, রটছে আজও , যদিও দেবী বা অসুর কোথায় গেল তা নিয়ে খুব বেশী ভাবিত নয় কেউ ই …… কিছু আটকাচ্ছে তো না এর জন্য ।

ঠিক সেই দিন থেকে মানুষ রয়ে গেছে কিন্তু একই রকম আওয়াজে, একই রকম চিন্তায় …… শুধু সেদিন থেকে মানুষ রয়ে গেছে “একা”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s