ঘন্টা, দরজা ও এক পাগলের গল্প

“পালাও পালাও, বেরিয়ে এসে পালাও, কিচ্ছু নিতে হবে না ।”

“কেন ? কি হয়েছে ”

“অগ্নীদেবতা জেগে গেছে । আকাশ থেকে গরম ছাই নেমে এল বলে ।”

“কি আজেবাজে বকছ ! বলি সেরকম কিছু হলে কি একটু আওয়াজ বা কাঁপুনিও শুনতে পেতাম না ?”

“কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখেছি …”

“কোথায় ? কোথায় দেখেছ ?”

“আজ ভোরের স্বপ্নে আমি স্পষ্ট দেখেছি । অগ্নীদেবতার গর্ভ প্লাবিত হয়ে উঠে আসছে গরম লাভা … জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে আমাদের এই সুন্দর শহরটা ।”

“তুমি পাগল হয়ে গেছ মসকাস । এমন সুন্দর দিন আর তুমি কিনা এসব আজগুবি অলুক্ষুণে কথা বলছ …”

“ডোমিনিকা তুমি বিশ্বাস কর আমার কথা, ঈশ্বরের দোহাই বিশ্বাস কর ।”

“ও বুঝেছি, আজ ইয়েন্তিনের আসার কথা আমার কাছে । তাই তুমি এভাবে ভয় দেখিয়ে আমায় জিততে চাইছ । শোনো মসকাস, তুমি যাই কর না কেন, লাভ হবে না, ইয়েন্তিনের অনেক ক্ষমতা, অনেক সম্পদ । অলডারম্যান ইয়েন্তিনই হবে, তুমি হেরে যাবে । আর জানই তো আমি শুধুমাত্র বিজয়ীকেই বরণ করে নেব । সুতরাং এভাবে সময় অপচয় না করে যাও নিজের কাজে যাও । আমাকে বিরক্ত করবার চেষ্টা কোর না ।”

“ডোমিনিকা … তুমি একটি বার আমার কথা শোন …”

ভারী কাঠের দরজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল মসকাসের মুখের ওপর …

সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের কাছে গিয়ে তাদের বোঝাবার চেষ্টা করে জুটল শুধু তামাসা আর টিটকিরি । নাহ অলডারম্যান নির্বাচনের জন্য এটা তার কোনো বিশেষ চমক নয়, এই সত্যি কথাটা সে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারল না কাউকে । প্রশাসকের কাছে বিশেষ অনুমতি নিয়ে সাক্ষাত করতে গিয়ে এই বিপদের কথা জানাতে তাকে পাগল সাব্যস্ত্য করে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ জারি হয়ে গেল গুজব রটানোর অপরাধে। ঢেঁড়া পড়ল শহরে …

সব হারিয়েও মসকাস প্রিয় কয়েকজন বন্ধুর কাছে গিয়েছিল তাদের সাবধান করতে । তার উন্মাদ রোগের কথা আগেই প্রচার হয়ে গিয়েছিল শহরময় । তাই অতি প্রিয় বন্ধুদের কারুর থেকে জুটল অবহেলায় ছুঁড়ে দেওয়া কয়েকটা রুটি, কোনো জায়গায় প্রহরী সহযোগে অর্ধচন্দ্র ।

এভাবে কেটে গেল কয়েকটা সপ্তাহ । আশ্রয়হীন মসকাস রাস্তায় পড়ে থেকে বুঝে গেল, স্বপ্নের উপর ভরসা করা মূর্খামি কারণ স্বপ্ন স্বপ্নই । অবসাদে মুষড়ে মসকাস চরম সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল । সত্যিই তো এভাবে বেঁচে লাভ কী ? শুধু যদি শেষবারের মত ডোমিনিকাকে একবার, মাত্র একটি বার দেখতে পেত …

নাহ এসব ভেবে লাভ নেই … ওসব বিজয়ী দের জন্য …… তার মত জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া মানুষদের অধিকার নেই ভালোবাসায় …

* * * * * * * *

উঁচু পাথরটা থেকে অনেকটা নীচে সমুদ্র, শেষ বারের মত তার আজন্ম পরিচিত শহরটা দেখে নিল মসকাস … তখনই …

“কি মসকাস … মরতে চাইছ তো ?” … ভরাট সুন্দর গলায় কে যেন বলে উঠল ।

পিছনে তাকিয়ে মসকাস দেখে এই নির্জন পাথরের টীলায় নিঃশব্দে কখন যেন আবির্ভাব ঘটেছে অদ্ভুতদর্শন এক লোকের ।

দীর্ঘকায় লোকটার পরণে অদ্ভুত পোশাক, কিছুটা আলখাল্লার আদলে মাথা ও শরীরের বাঁদিকটা ঢাকা । ঘন নীল ডান চোখ থেকে দুর্বোধ্য এক দ্যূতি যেন বিচ্ছুরিত হয়ে তাকে বিহবল করে দিচ্ছে । আর লোকটার পিছনে একটা অদ্ভুত দরজা ফ্রেমে আটকানো । খোলা দরজা দিয়ে এপাশ ওপাশ দেখা যাচ্ছে ………… এসব কী দেখছে মসকাস ! এসবই কি তার কল্পনা ! তবে কি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেল সে …

“কিন্তু তোমায় যে আসতে হবে আমার সঙ্গে, অনেক কাজ আছে তোমার জন্য, চল” … কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মসকাসের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল লোকটা । বরফের মত ঠান্ডা লোকটার বাম হাতে যেন অচেনা এক ধাতব অনুভূতি । স্বপ্নাবিষ্টের মত চলল মসকাস । তার মন অদ্ভুত এক বিস্ময়ে বাধা দেওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে ।

দরজা দিয়ে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল ছায়াছবির মত দুটো লোক আর অদ্ভুত এক দরজা ।

মসকাস শুনতে পেলনা, শহরে বাজছে পাগলা ঘন্টী, হঠাত কম্পনে কাঁপছে সারা শহর । শহরের বাসিন্দারা ভয়বিহবল হয়ে ছুটে বেরিয়ে আসছে রাস্তায়, দেবতার রোষ থেকে বাঁচার জন্য ।

মসকাস জানলো না এ কম্পন একসময় থেমে যাবে, আরও প্রবল হয়ে ফিরে আসার জন্য …… জানলো না, এক দিন আকাশ থেকে নেমে আসবে জ্বলন্ত পাথর জমা ছাই, মাটি ফাটিয়ে বেরিয়ে আসবে লাভা, মুছে যাবে তার আজন্ম পরিচিত শহর পম্পেয়াই, ঠিক যেমনটি সে দেখেছিল এক ভোরের স্বপ্নে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s