মহাকাব্যিক …

“আকাশগঙ্গা মেট্রো পরিষেবা ব্যবহারকারী যাত্রিগণকে স্বাগত । মেরিবুসা সোলার সিস্টেমের গোল্ডেনপিপার গ্রহে যাত্রাকারী এই মেট্রোটির পরবর্তী স্টেশন আর্যভট্ট, এক্সস্ট চেম্বার বাঁ দিকে …”

চোখের মণিতে সেট করা মডিউলে ফেসক্লাউডটা খোলার চেষ্টা করল রাঘব । নাঃ পৃথিবীর লিঙ্ক অফ হয়ে গেছে । আর্যভট্টয় থামলে একবার ওখানকার লিঙ্ক ইউজ করে দেখতে হবে । অনেকটা রাস্তা … ক্লাউড ও তো এক্সেস করা যাবেনা । অবশ্য লোকাল স্টোরেজে কিছু শর্টমুভিস, গেমস, ভার্চুয়াল টুরস, হাবিজাবি আছে । ওগুলো দিয়েই সময়টা কাটাতে হবে আর কি । ব্রাউজ করার জন্য পলক ফেলল রাঘব …

আরে এটা কখন এসেছে, খেয়াল করা হয়নি তো ! ক বার করে আর পাঠাবে ! কালই তো একবার পাঠিয়েছে অ্যালার্ট টা । বার বার ছবিটা দেখতে ভাল লাগছেনা রাঘবের । এই ছবিটা জাঙ্কির আর তার বিয়ের পরে তোলা ছবি । মুন ক্রেটর রিসর্ট সার্ভিসের কটা উদ্দাম রাতের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । সেই জাঙ্কি … কত মিষ্টি স্বপ্ন দুজনে মিলে । হঠাত করেই সব এলোমেলো হয়ে গেল এর পর । এক ঝড়ের রাতে রাঘব যখন তার শিফট ডিউটিতে । সবার অলক্ষ্যেই হারিয়ে গেল জাঙ্কি । কয়েকজন অবশ্য উইটনেস ছিল । তাদের কথা মেনে নিলে জাঙ্কিকে ফিরে পাওয়ার আসা ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল । কারণ প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী জাঙ্কি কে অপহরণ করে নিয়ে গেছিল কুখ্যাত ক্যানিব্যাল গ্যাং – হাইড্রার গুন্ডারা । কিন্তু রাঘব আশা ছাড়েনি … তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে নক্ষত্রে নক্ষত্রে । শুধু একটা বার জাঙ্কির মুখটা দেখার জন্য সব কিছু দিতে রাজি ছিল ও … সবাই বলেছে জাঙ্কি বেঁচে থাকা অসম্ভব তবুও আশা ছাড়েনি রাঘব ।

তারপর রাঘবকে চলে যেতে হল ইন্টারগ্যালাক্টিক ওয়ারে ব্ল্যাকএপ স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতে । যুদ্ধের নৃশংসতায় কেটে গেল কতগুলো বছর । এখন যুদ্ধ শেষ । আপাতঃদৃষ্টিতে সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্টিত শান্তি । এতদিনে হঠাত করে খবর এলো জাঙ্কির । মেরিবুসার গোল্ডেন পিপারে পরাজিত হাইড্রাগ্যাং এর সেক্স স্লেভ ডাঞ্জেন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাকে । রাঘব তার খোঁজে বিশ্ব তোলপাড় করেছে একথা উদ্ধারকারীদের কাছ থেকে শুনে নাকি শুধু চোখের জল ফেলে গেছে জাঙ্কি । সে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে রাঘবকে কাছে পাওয়ার …

গা টা ঘেন্নায় গুলিয়ে উঠল রাঘবের । কী করে পারল জাঙ্কি । তিল মাত্র লজ্জাও কি নেই ওর ? ঐ অমানুষগুলো ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোড় করে নিজেদের যৌনদাসীর কাজ করিয়েছে … ওকে নষ্ট করেছে , তার পরেও কী নির্লজ্জের মত রাঘবের কাছে ফেরার কথা বলতে পারল ও … ছিঃ । … ঐ নষ্ট শরীর নিয়ে একটা মেয়ে ওর পাশে শুয়ে আছে, ভাবতেই অপরিসীম বিতৃষ্ণায় জিভের ডগা অব্দী কেমন তেতো তেতো হয়ে উঠল রাঘবের ।
যাই হোক নিজের কর্তব্য করবে রাঘব । ওকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে কোনো একটা স্যাভেজহোমে থাকার ব্যবস্থা করে দেবে । আর নিজের জমানো কারেন্সি থেকে অর্ধেকটা দিয়ে দেবে ওকে । সারা জীবন ওতেই দিব্যি চলে যাবে জাঙ্কির । খেতে পড়তে অসুবিধা থাকবেনা । আর কি চাই …

“আকাশগঙ্গা মেট্রো পরিষেবা ব্যবহারকারী যাত্রিগণকে স্বাগত । মেরিবুসা সোলার সিস্টেমের গোল্ডেনপিপার গ্রহে যাত্রাকারী এই মেট্রোটির পরবর্তী স্টেশন গৌতম-৯১, মেট্রো সার্ভিসে কিছু যান্ত্রিক গোলোযোগ দেখা দেওয়ায় যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে তাঁরা যেন পরবর্তী স্টেশনে মেট্রোর কেবিন গুলি খালি করে দেন । পরিষেবায় ব্যাঘাত ঘটায় আমরা দুঃখিত ।”

যাঃ এ আবার কি কেলো হলো ! এই অ্যান্টিগ্রাভিটি সিস্টেমের নতুন আপগ্রেডেশন করার পর থেকেই নতুন মেট্রোগুলো যখন তখন মুখ থুবড়ে পড়ছে । এখন কতক্ষণে আবার রিপ্লেসমেন্ট দেয় কে জানে …

সামনেই ইন্টারগ্যালাকটিক মিউজিয়াম অব লাভ এন্ড ইমোশোনস । সারা বিশ্বের অন্যতম বড় মিউজিয়াম । প্রায় সমস্ত বাসযোগ্য গ্রহের নানা ঘটনা, অনুভূতির নিদর্শন দিয়ে সাজান এই মিউজিয়াম । দাঁড়িয়ে থেকে সময়টা নষ্ট করে বেসিক্যালি কিছু লাভ নেই তাই রাঘব এগিয়ে গেল মিউজিয়ামের দিকে ।

কত রকমের সংগ্রহ । দেখতে দেখতে শেষ করা যাবেনা । এদিকে রিপ্লেসমেন্ট মেট্রোটা চলে এলে মুশকিল । অবশ্য তার কনীনিকায় অ্যালার্ট এসে যাবে । যাই হোক, ঘুরতে ঘুরতে আর্থ গ্যালারীতে পৌঁছল রাঘব । প্রাচীন মিশরের ভাই বোনের প্রেম থেকে বিভিন্ন ধরণের চুমু কত কিছুর নিদর্শন । কিন্তু সবচেয়ে বেশী চোখ টানে গ্যালারীর ঠিক মাঝখানে একটা মূর্তি । না মূর্তি নয় তো ! নাইট্রোজেনে ফ্রোজেন অপূর্ব সুন্দর এক নারী । মমিফায়েড নয়, যেন জীবনকে হঠাত করেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে । সামনে একটা টাচ সেন্সার । পাশে লেখা – “গিভ দ্য টাচ অফ লাইফ টু দিস লস্ট সোল” । মানে টা কি ? এখানে টাচ করলেই মহিলা জীবন্ত হয়ে উঠবে !!! অদ্ভুত তো ! বুড়ো আঙুলটা ছোঁয়ালো রাঘব ।

নাঃ কিছুই হল না … ধুর যত সব মডেল আইটেম । আর তারও যে কি হয়েছে এরকম একটা সাজানো আইটেম কে সত্যি বলে ভেবে নিচ্ছিল । সত্যিই মাথাটা গেছে । কিন্তু এটা কী ? ইন্টারেস্টিং !

ডেস্ক্রিপশন উইন্ডোটা অন করল রাঘব । মূর্তিটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক প্রবাদ । একবিংশ শতাব্দীর কোনো এক মহান আবিষ্কারকের স্ত্রী এই নারীকে একলা পেয়ে একবার বলপূর্বক ধর্ষণ করে তাঁর স্বামীর একই সংস্থার এক উচ্চপদস্থ অফিসার । এ ঘটনা জানতে পেরে ক্রোধে হীতাহীত জ্ঞানশূণ্য সেই প্রফেসর তৈরী করেন এক অদ্ভুত মেকানিজিম । আর শাস্তি হিসাবে স্ত্রীর জীবনকে বন্দী করেন এই অদ্ভুত অবস্থায় অনন্ত কালের জন্য যাতে মরে শান্তি পাওয়ার অধিকারটুকুও না থাকে তার । সেই থেকে বন্দিনী … অনন্ত কালের শাস্তিপ্রাপ্তা ।

মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল রাঘবের । এভাবে কেউ নিজের ভালবাসার মানুষকে শাস্তি দিতে পারে । আর এখানে এ বেচারীর দোষই বা কোথায় ? নাঃ ভালবাসতে বোধ হয় সবাই পারে না ।

মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে রাঘব । জাঙ্কির প্রতি ঘৃণার বদলে গভীর অনুকম্পায় ভরে যাচ্ছে সমস্ত মনটা । তার প্রতি এতক্ষণের বিষাক্ত মনোভাবের জন্য কিছুটা অনুতাপও হচ্ছে । নাঃ, আর কোত্থাও হারিয়ে যেতে দেবে না সে জাঙ্কি কে । কত স্বপ্ন ছিল যে তাদের , দুটো জমজ ছেলে হবে, একসঙ্গে আরেকবার মুন রিসর্টের সন্ধ্যেয় বসে পশ্চিম আকাশে পৃথিবী উঠতে দেখা, আরও কত কিছু । তাদের বাকি থাকা স্বপ্ন গুলো এক এক করে পূরণ করবে সে ।

বিপ বিপ করে একটা অ্যালার্ট ঢুকল । আরে রিপ্লেসমেন্ট মেট্রো দিয়ে দিয়েছে ! মূর্তিটার গায়ে আরেকবার গভীর সহানুভূতির সঙ্গে হাত বুলিয়ে গ্যালারী থেকে বেরিয়ে চলল রাঘব ।

তার মনের মধ্যে ভালবাসা আর রিজনিং এর সাথে যুদ্ধে পরাজিত পুরুষালী ইগোটা তখন আস্তে আস্তে লুটিয়ে পড়ছে । আর সেই বদলে যাওয়ার স্পর্শে তার অলক্ষ্যে ফেলে আসা গ্যালারীটার আস্তে আস্তে সচল হয়ে উঠছে, একটু একটু করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে “অহল্যা” নামের মূর্তিটা ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s