রাষ্ট্র ও গামছা

আকাশী রঙের বিশাল লাক্সারী বাসটা রায়পুর থেকে চলতে শুরু করল । বাসে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বন্ধুরা, দাদারা মিলে জনা ২০ লোক জন ।

– শুনেছিস ভাই, ট্রেণে আসতে আসতে যে মাওবাদী হামলার কথা শুনেছিলাম তাতে ৫ টা লোক টপকে গেছে ! এই দেখ ফেসবুকে একটা বন্ধু লিখেছে ! ভাই আমাদের বাসটা ও তো ঐ রাস্তা দিয়েই যাবে ! কী হবে বাঁড়া ! যদি আমাদেরও অ্যাটাক ফ্যাটাক করে !

– করলে করবে, কী আর করা যাবে … চুপচাপ থাকো না, আমার কান খাচ্ছ কেন । ঘুমোতে দাও তো, ট্রেণে ঘুম হয়নি ।

– এই বোকাচোদা, খালি ঘুম না ? তুই টিমের লিডার বলে কথা । এবার থেকে বেরোনোর আগে আমাদের এল আই সি করে বেরোবি নইলে চুঙ্কু কেটে রেখে দেব … হে হে হে হে

এরা নিজেরাও ঘুমোবেনা, আমাকেও ঘুমোতে দেবেনা বুঝে অত্যন্ত্য অনিচ্ছা সহকারেও জানালার ধারে গিয়ে বসলাম । প্রায় ঘন্টা পাঁচেক লাগবে । লাল মাটির দেশের সবুজ জঙ্গল চিরে একটা মসৃণ পীচের রাস্তা । একটুক্ষণ পর পর থেকেই চোখে পড়তে লাগল জঙ্গলের মাঝে মাঝেই একটা করে বস্তা দিয়ে ঘেরা ছাউনি আর তার আড়ালে জলপাই টুপি আর উঁচিয়ে থাকা নল ।

যাইহোক রাস্তায় একবার মোটে গাড়ি থামিয়ে আর্মির লোকেরা কাগজপত্র দেখে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি । নির্বিঘ্নেই পৌঁছেছিলাম নারাইনপুরে ।

ব্যাপক জায়গা । চারিদিকে ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গল । অল ইন্ডিয়া ইউথ কনভেনশন । সারা ভারত থেকে প্রায় ১৫ হাজার লোক এসেছে । সে বিশাল ব্যাপার ।

দশদিন ব্যাপী বিরাট উৎসবের ইনগোরেশোন হল আমাদের অনুষ্ঠান দিয়ে । সেই প্রথম একসাথে প্রায় ১২ হাজার লোকের সামনে পারফরম্যান্স । অনবদ্য একটা অভিজ্ঞতা ।

যাই হোক তার পরের ৯ দিন কোনো কাজ কর্ম নেই । মালপত্র তো সেই রাত্রেই আবার বাক্সবন্দী হয়ে গিয়েছে । তাই পরের ৯ দিন চুপ চাপ খাওয়া ঘুমোনো ঘোরা আর অনুষ্ঠান দেখা ।

আমি শালা বোর হয়ে যাচ্ছিলাম । তাই ওখানকার আবাসিক ছাত্র আদিবাসী গোটা তিনেক বাচ্চার সঙ্গে জঙ্গল চষতে শুরু করলাম ।

একদিন ওদের বললাম ওদের গ্রামে নিয়ে যেতে । অদ্ভুত ভাবে সব কিছুতে দাঁত বের করে হেসে হ্যাঁ করা ছেলেগুলো কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গিয়ে কিছুতেই রাজি হতে চায়না । আমরা অনুষ্ঠান করার পরের দিনই হসপিটালে ভর্তি থাকা আহত বিদ্যাচরণ শূক্লের জীবনাবসানের খবর পাই । ভাবলাম হয়ত তারই জন্য কোনো চেকিং এর কড়াকড়ি আছে । তবু খুব জোড়াজুড়ি করতে থাকায় ওরা রাজি হল ।

বনের অনেক ভিতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যাওয়া । সোজা রাস্তায় গেলে মিলিটারি আইডেন্টিটি কার্ড দেখে পত্রপাঠ ঘর পাঠিয়ে দেবে । জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গেলে খোচর ভেবে বিপক্ষ দল সোজা ওপরে পাঠিয়ে দেবে । দূর থেকে দেখলাম মিলিটারীতে একটা এন জি ও ট্রাক থামিয়ে পেটি পেটি বিস্কুট, ওষুধ নামিয়ে নিজেদের গুদামে মজুদ করছে । শুনলাম ঐ এন জিও সংস্থা গুলো মাঝে মাঝেই আসে নানা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আদিবাসী গ্রামগুলোতে দিতে । কিন্তু মিলিটারী সব বাজেয়াপ্ত করে নিজের গুদামে মজুত করে নেয় । ওসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ, হাই প্রোটিনের বিস্কুট, দুধের প্যাকেট এসব মাওবাদীদের হাতে পড়তে পারে, তাদের হাত শক্ত হতে পারে এই কারণ দেখিয়ে ।

অবুঝমার পাহাড়ের মাথায় গ্রামটা প্রস্তর যুগ থেকে সামান্যই এগিয়েছে । এমনকি এখনও অনেকে চামড়া পরে । শীকার আর বনের মধ্যে হওয়া ফল পাকুরই প্রধান উপজীব্য । এই গ্রামেই ধনসিং এর বাড়ি । ধনসিং তার বাড়ি অর্থাৎ একটা কঞ্চি আর পাতা দিয়ে তৈরি ঘরে আমায় যত্ন করে নিয়ে গেল । বাড়িতে শুধু ওর বুড়ি দাদিমা । তোবড়ানো কুঁচকোনো মুখ । একটা নেকড়া পড়ে আছে । ঊর্ধাঙ্গ এখানকার বেশীর ভাগ লোকের মতই অনাবৃত । পিঠের দিকে একটা গভীর ক্ষত, পুরোনো কিন্তু ট্রীটেবল । বোঝাই যাচ্ছে একটু বিটাডাইন কিম্বা টিংচার অব আয়োডীন ও পড়েনি । একটা পাথরের খোরায় পিঁপড়ের ডিম জড়ো করছে । আমার পকেটে বন জঙ্গলে ছড়ে টরে যাওয়ার ভয়ে একটা সুক্রাল এম ইউ মলম ছিল । ধনসিংকে দিয়ে বললাম ওর দাদীকে বলতে প্রতিদিন লাগানোর জন্য ।

একটু পরে ধনসিং ওর পিসিকে কোত্থেকে যেন ডেকে নিয়ে এল । হাতে কিছু উই ঢিবি থেকে তুলে আনা ছাতু । লাজুক মুখে মাঝে মাঝেই দাঁত বের করে হাসি টা লুকোচ্ছে । একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে । এর বরকে মিলিটারীরা ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে গিয়ে গুলি করার সময় এই লাজুক মেয়েটা বাধা দিয়েছিল । একটা মোটা সেগুনের ডালের বাড়ি পড়েছিল একটা মিলিটারী হেলমেটে । তাই পুরস্কার স্বরূপ তলপেটে আর দু পায়ের ফাঁকে কাঁটার নাল লাগানো বুটের লাথি জুটেছিল এলোপাথাড়ি । লাজুক মেয়েটার পরণে একটুকরো সাদা ন্যাকরা আর ঊর্ধাঙ্গে একটা শতচ্ছিন্ন গামছা । যার ফাঁকফোকড় দিয়ে মাঝে মাঝেই অনাবৃত হয়ে পড়ছে আবলুশ নিটোল স্তনবৃন্ত । একুশ বাইশ বছরের খোলা শরীর দেখে আমার অঙ্গবিশেষ শক্ত হয়ে উঠল না কোনো অজানা কারণে । বরং গোটা গায়ে রী রী করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এক অবর্ণনীয় অনুভূতি । ঘৃণা না অক্ষমতার …… জানিনা ।

শুনলাম গামছা ও নাকি মিলিটারীদের বাজেয়াপ্তকরণের হাত থেকে ছাড় পায়না । মাওবাদীরা মুখে গামছা নিয়ে যাতে ঘুরতে না পারে তার জন্য । সেদিন ওদের কে অঙ্গিকার করেছিলাম কয়েকটা গামছা ধনসিং আর তার বন্ধুদের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব আমার সীমিত সাধ্যানুসারে ।

নারাইনপুর থেকে ফেরার দিন কিছু গামছা কিনে ওদের হাতে দিয়েও ছিলাম ।

জানিনা সেগুলো পৌঁছেছে নাকি গামছা আর অবুঝমারের মাঝে অবুঝ রাষ্ট্র এসে পাঁচিল তুলেছে আর নিরুপায় হয়ে কটি প্রথম প্রজন্ম শিক্ষিত ছেলে গামছা গুলি মুখে বেঁধে নিয়েছে … কি করবে বল, পুরুষ তো, কাপুরুষের মত গলায় দিয়ে ঝুলে পড়তে তো আর পারেনা  …