খেকো ও জাজমেন্ট

– দূর বাঁড়া একটা শোঁশাও ঠিক ঠাক কিনতে পারিস না ।

– কেন কি হয়েছে ?

– এই দেখ ল্যাওড়া, এদিকটা খেকো হয়ে রয়েছে, শালা কিসে ঠুকরেছে কে জানে ।

– কই ? ও তো একটু দাগ হয়ে গেছে ।

– আরে বাঁ… যেটা বুঝিস না সেটা নিয়ে কথা বলিস না। এটা কিসে ঠুকরেছে কে জানে, ফুটোটা দেখা যাচ্ছেনা, কিন্তু পাশে পচাটা ছড়িয়ে গেছে । আগে এসব খেয়ে টেয়ে নিতাম, এখন বুঝেছি স্বাস্থের পক্ষে ক্ষতিকর খুব । দূর খাব না বাল এটা …

১০টা ৪৫ এর ট্রেণে ফিরতে ফিরতে কমলের হাত থেকে হুইস্কি মেশানো কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতলটা নিয়ে চাট ছাড়া মাল খাওয়ার বিকৃতি মুখে কয়েক ঢোক লাগাল সুজিত ।

– হ্যাঁ রে খবর ঠিক তো ?

– কোন খবর ?

– ঐ যে বললি মণিকা না কি যেন নাম ।

– দেখ সুজিত দা, এর আগে তোমায় যতবার খবর দিয়েছি কোন বার ভুল খবর হয়েছে ?

– না তবুও এটা একদম অচেনা জায়গা না ।

– আরে তুমি জান না, চিঙ্গড়িঘাটায় এরকম কেস প্রচুর । আরে এরকম অনেক আছে, কারুর বর বাইরে থাকে , কারুর বরের সুগার । আরে আমি নিজে খেয়েছি বলেই না বলছি ।

– দেয় বলছিস তাহলে ? আচ্ছা নাম্বার টা দে, কালই ট্রাই নেব ।

– এই নাও, কিন্তু শোনো রবিবার ফোন কোরো না । বর ধরবে …

********** দিন কয়েক পরের এক রাত্রিতে সুজিতের টালি ছাওয়া দু কামরার বাড়িটা থেকে মত্ত গলায় ভেসে আসা “খানকি মাগি, আজ কাল খুব পিরিত হয়েছে না পলাশের সঙ্গে ? ভাই মারানো হচ্ছে ??? শালা নষ্ট মেয়ে মানুষ কোথাকার …” জাতীয় চিৎকার আশেপাশের লোকেদের কানে পৌঁছালেও কেউ বিশেষ আমল দেয়নি হয়ত প্রাত্যহিক অভ্যেসে কিম্বা চিরকালের মতই সুজিতের  নীরিহ শান্ত বউটা সব মানিয়ে নেবে এই বিশ্বাসে ।

তবে ছ্যাতলা পড়া টালি ছাওয়া প্রাণ ও প্রাণী হীন  ঘরটার পচা গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে যেদিন মাছির মত ভীড় করে এল আশে পাশের লোকজন । সেদিন তারা দেখেছিল অর্ধউলঙ্গ সুজিতের দেহটার গলায় গাঁথা ছুরিটা ছাড়াও দেহের পচনে সাহায্য করছে ছড়িয়ে পড়া গনোরিয়ার সংক্রমণ ।

আবর্জনার গাড়িতে ডাস্টবিন খালি করার মত করে মর্গগামী ভুটভুটিটায় যখন দেহটা টান মেরে ছুঁড়ে ফেলল পুলিশের মাইনে করা খ্যা খ্যা করে হাসতে থাকা, বিড়ি ফোঁকা ডোমের দল …… কেউ হয়ত দেখতে পায়নি খেকো জায়গার চিহ্নটা … কেউ কেউ যদিও বুঝেছিল খেকো ছুঁড়ে ফেলতে শেখাটা জরুরী … খুব শীগগির …

ম্যানিকুইন

অনেক্ষণ থেকেই ভেসে আসছে আওয়াজটা । অনেক লোকের হইহট্টগোল কান্নাকাটির আওয়াজ । একটু যে বেলা পর্যন্ত শান্তি করে যে ঘুমোবে তারও উপায় নেই, কি জ্বালা ! একটা মাত্র ছুটির দিন সপ্তাহে, আর বাকি ছটা দিন তো নরক। স্কুল কলেজের বন্ধুগুলো পর্যন্ত কেমন অচেনা হয়ে গেল অফিস নামক এই কর্পোরেট কনভার্টারটার চক্করে । কে কিভাবে কাকে কাঠি করে একটু ওপরের লোকের কাছে ডাউন দেবে সেই চিন্তায় মনান্তরালে মশগুল সব ছোটো খাটো কফি আর সিগারেট ব্রেক গুলো । আর বাকি সময় তো একটা রেকর্ড সর্বস্ব ঠুঁঠো মেশিন । যার সঙ্গে গল্প করার মত নির্বোধ চিন্তার ফ্যান্টাসি করতেও মন নিরুত্তাপ বোধ করে । কখনও কখনো নিজেকেও দেখা যায়না। এল ই ডি হাইটেক লাইটের আলোতেও কিছুটা গান্ধার শিল্পের মত নিষ্প্রাণতা প্রতিফলন করে নিরুপায় পারদ লুকোনো কাঁচ ।

এই তো সেদিন, বিমলদার শ্রাদ্ধ খেয়ে ফেরার পথে রাত্রে উশ্রীর বাড়িতে সে, সমীরণ আর দীপ নাইট স্টে করল যে শনিবারে । রাত্রের মায়াভরা ছাদে চারজনের উদ্দাম হ্যাল হওয়া আর শরীরকে স্বাধীন হতে দেওয়ার তাল কাটল যখন হঠাত করে আসা উশ্রীর ব্যাঙ্গালোর প্রবাসী বরের ফোন কল । টয়লেট করতে নীচের বাথরুমে এসে চোখে মুখে ছেটান জলের জন্যই কি আয়নায় শুধু একটা ম্যানিকুইন ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছিল না সুনন্দ ? কে জানে । তবে হ্যাঁ, ফোন কলটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিমলদার সুইসাইডের আনন্দে চলা পার্টিটা রিডিমড হতেই এসব আর মনে থাকেনি সুনন্দর । ওরা সবাই এনজয় করলেও আসল বাহবাটা কিন্তু বিমলদার স্কুল ফ্রেন্ড সমীরণেরই প্রাপ্য । ওই তো দায়িত্ব নিয়ে একটু একটু করে বিমলদাকে প্রোভোক করে করে আল্টিমেটলি ওদের প্রায়োরিটির পথের কাঁটাটা সরাতে পেরেছিল ।

আবার হট্টগোলটা বেড়ে গেল । আরে ভাই কি জ্বালাটা কি ? লাইফে এত অশান্তি কেন ? কি চায় এরা ? সুনন্দর বেডরুমের জানালাটা দিয়ে রাস্তা অব্দি দৃষ্টি যাচ্ছে । একটা পুলিশের গাড়ি ঢুকছে পাড়ায় । কিছু বাওয়াল টাওয়াল হল নাকি ? দেখবে একবার বেরিয়ে ? নাঃ থাক । অসম্ভব ল্যাদ লাগছে । গোটা শরীর অবশ হয়ে রয়েছে । শালা গোটা সপ্তাহের গাধার খাটুনি । আরেকটু বেশী না ঘুমোলে যায় ? সে তো শালা উপায় নেই সক্কাল সক্কাল ক্যাওড়া ক্যাচাল … আরও একবার পাড়ার লোকেদের ওপর মাথাটা গরম হয়ে গেল সুনন্দর ।

শালা লাইফটা পুরো পচে গেছে । কোত্থাও শান্তি নেই । সব কেমন যেন এনামেল কোটেড লাগে আজকাল । সবাই যেন জোড় করে তাকে তার প্রতিচ্ছবিটা দেখাতে চাইছে কিন্তু পারছে না । সারাদিন অস্বাভাবিক কোনো চর্মরোগের মত গহীন একটা অস্বস্তি । লজ্জাস্কর কিন্তু অদম্য, বার বার অস্বীকার করতে চাওয়া কিছু অতীত যেন তুলে এনে ফিতে দিয়ে মাপে বাস্তবের পাশে দাঁড় করিয়ে ।

সাইরেনের আওয়াজে ক্রিমির ওষুধের মত তেঁতো বিরক্তিটা চমকে উঠল ক্ষণিক, জানলা দিয়ে বাইরে চোখ গেল সুনন্দর । রাস্তা দিয়ে ঢুকছে একটা কাঁচ ঢাকা গাড়ি, ফাঁকা, পিছনে লেখা “শেষের খেয়া” । কাছে পিঠে কেউ টেঁসেছে নাকি এই সাত সকালে !

এই “শেষের খেয়া” নামটা কি অদ্ভুত । শুনলেই মনে হয় ম্যান্ডিটরি একটা স্বয়ংক্রিয় দরজা, যেটাকে বাইপাস করা যায় না । অনেকটা প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার মত । ঠিক এরকমই, জানে সবাই তবু প্রাত্যহিক ভুলে থাকায় অভ্যস্ত হয়ে যায় কখন নিজের অজান্তেই ।

একদিন সব শেষ হয়ে যেতে পারে জেনেও মধুরার প্রেমে পড়েছিল সে কয়েকমাস আগে । পাশাপাশি ডেস্কে কাজ, ঘটনাটা ঘটা অস্বাভাবিক ছিলনা একেবারেই । কত অনুভূতির স্রোতে পারস্পরিক অবগাহন হঠাত অচেনা কোন পিগমেন্টের বিষে আবিল হয়ে গেল দিন-চারেক আগে । সেই মধুরা, কিভাবে পারল এটা করতে … কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছেনা সুনন্দ । তিনটে, না না, চার চারটে দিন কেটে গেছে । কিভাবে কেটেছে কিছু মনেই পড়ছেনা । আচ্ছা কেন এমন করল মধুরা … অকারণে এমন নৃশংস অপমান করেই বা কি পেল ও ? আরে … !!!

জানালা দিয়ে হঠাতই একটূ দূরের কফিশপটায় মধুরাকে দেখে চমকে উঠল সুনন্দ । কি করছে ওরা এখানে এত সকালে !!! আর সঙ্গে ওটা দীপ আর শিবু না ? এই শিবু ই না তার কলেজের জিগরী দোস্ত । মধুরার সঙ্গে তার ব্রেকাপ হয়ে গেছে জেনেও ঐ শয়তান মেয়েটার সাথে দাঁড়িয়ে একসাথে হাসাহাসি করছে ফুরফুরে মেজাজে আর সিগারেট ফুঁকছে !!! শালা দুনিয়াটা বেইমানে ভরে গেছে … নাঃ কিচ্ছু ভাল লাগছে না ।

“জীবনে ঘেন্না ধরে গেল শালা” অভ্যাস হয়ে যাওয়া কথাটা আরেকবার বলে উঠল সুনন্দ, কিছুটা স্বগতোক্তির সুরেই । কিছু চিনেও না চিনতে চাওয়া বিশ্বাস ভাঙ্গার শব্দ কান বেয়ে সংক্রমণের গতীতে সত্তায় ছড়ানোর আগেই জানালা থেকে চোখ সরিয়ে নিল ।এখন তার ঘুম দরকার, সব কিছু ভুলে যাওয়ার মত একটা ঘুম । কটা স্টিক্কা ট্যাবলেট খাবে ? তারপর একটা টেনে ঘুম … নাহ যদ্দুর মনে হচ্ছে ওগুলো কবে যেন শেষ হয়ে গেছে। ধুসস শালা । তবুও ভুলতে হবে, সব ভুলতে হবে …… আচ্ছা কটা বাজছে এখন ? আবার উঠতে হবে দেখার জন্য … থাক । আর সময় যাই হোক না কেন, আজ কি এসে যায় ? আজ তো সুনন্দর ছুটি …

সময়ের নিয়ন্ত্রণ তো কোনো দিনই কারুর হাতে থাকেনা আর জীবনের নিয়ন্ত্রণ সে একটু একটু করে হাত থেকে ছেড়ে দিয়েছে ঐচ্ছিক নির্লিপ্তিতে । কিন্তু শরীরের নিয়ন্ত্রণটা যে দরকার খুব, কটা বাজে জানার জন্য । সত্যি তো কটা বাজে ??? একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে সুনন্দর ।

একটা সিগারেট খেতে খুব খুব ইচ্ছে করছে …… কিন্তু …… দরজাটা খুলে তার দিকে যে এগিয়ে আসছে স্ট্রেচার ধরা দুটো লোক, কিছু খাঁকি উর্দী আর কটা চেনা আদলের ম্যানিকুইন, …… যাদের শরীর তার মত হিমশীতল হয়ে যায়নি হয়ত  ……