অ্যান্থেম …

ভরত বাবু তাঁর সন্তানের নাম আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন । এমনকি পাতার পর পাতা তার সম্বন্ধে নানা কাল্পনিক কবিতাও লিখে রেখেছিলেন । তার সঙ্গে কি করবেন, কোথায় যাবেন, তাকে কি কি শেখাবেন … আসলে চিন্তাশীল মানুষ তো । আর ডাইরির প্রথম পেজে বড় বড় করে লিখে রেখেছিলেন অনাগত অতিথির নাম ।

আশা দেবীর প্রসব বেদনা উঠেছে মনে হওয়ায় আর দেরী করেননি ভরত বাবু । অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষাও না । সোজা একটা ট্যাক্সি ডেকে বেরিয়ে গিয়েছেন তাঁকে নিয়ে । কাছের রেপুটেড একটা নার্সিংহোমের উদ্দেশ্যে ।

সব ব্যবস্থা পাকা করে দিয়ে ডাক্তারদের অনুমতি নিয়ে ভরত বাবু বাড়ী ফিরলেন অনেক রাত্রে । আজকে হওয়ার কোনো চান্স নেই । যা হবার হবে কাল ।

ঘরটা একটু নিজের মত করে সাজালেন, নতুন অতিথির জন্য । বেশ তাড়াতাড়িই হয়ে গেল । আসলে কয়েক দশকের অভ্যাস তো । উদযাপন না অভিনয় বোঝেন না ভরত বাবু তবু ঘড়ির কাঁটার মত অভ্যস্ত ট্র্যাকে পুতুলের মত নিষ্পন্দ হয়ে দেখেন পুনরাবর্তিত ঘটনা আর ট্রের উপর মৃতসন্তান ।

সব সত্যির অন্ধকার মিথ্যের তাপবীক্ষণ চশমায় দেখেও প্রতিবার ঘর সাজান, জিনিস পত্র এদিক ওদিক করেন নিবিষ্ট চিত্তে আর তারপর সময়ের ভারে স্পর্শকাতর ডাইরিটার পাতা ওল্টান যেটার প্রথম পাতায় তাঁর অনাগত সন্তানের নাম লিখেছিলেন নিজের হাতে ।

কবিতা গুলো পড়তে পড়তে কখন যেন তাঁর স্ত্রীর স্বপ্নগুলোয় বিভোর হয়ে যান বাস্তবকে মিথ্যুকের জোব্বা পড়িয়ে । ডাইরির প্রথম পাতাটা বার বার হাত বুলিয়ে দেখেন পরম মমতায় । যে পাতাটা হয়ত একদিন ইতিহাসের দলিল হয়ে উঠবে, যে পাতাটায় গোটা গোটা হাতে “গণতন্ত্র” লেখা আছে ।

শয়তানের রুটিন

বাড়ির নম্বর ৬৬৬ । কলকাতার অভিজাত পার্ক্সট্রীট এলাকায় চারিদিকের কনভেন্ট আর গীর্জা পরিবৃত হয়েই আপাতঃ বৈশীষ্ট্যহীন ৫ তলা ইমারতটার গর্বিত অবস্থান । কুচকুচে কালো রঙ বাড়িটাকে অন্যান্য বাড়ির থেকে কিছুটা আলাদা করেছে যদিও। বাড়ির গেটে থাকা যমদূতের মত দারোয়ানদুটো যদিও বলে যে বার বার রঙ করার খরচ বাঁচাতে কাল রঙ করা হয়েছে তবুও এদিক ওদিক কান পাতলেই শোনা যায় হাড়হীম করা কিছু কাহিনী, কিছু নিষিদ্ধ সাধনার কথা ।

বাড়ির মালিককে কেউ দেখেনি কখনও । কানাঘুষোয় শোনা যায় বাড়িতে এক রাজা থাকে আর থাকে তার রাণী ।  এই জেট প্লেনের যুগেও মানুষ তাসের রাজারাণী ছাড়াও অন্য কোনো রাজারাণীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করছে ভাবতে কষ্ট হলেও ব্যাপারটা বিশ্বাস করা স্বাভাবিক কারণ তারা বিশ্বাস করে এই বাড়ির মালিক – মালকীন শয়তানের পূজারী, অলৌকিক শক্তিধর । আর এই বিশ্বাসে জোড়দার স্ট্যাম্প মেরেছে সকাল বিকেল রাত্রি সব সময় ঢোকা বেরনো করা গাদা গাদা কালো রঙের গাড়ি । গায়ে লেখা “SATAN” ।

তা শহরের মাঝে এরকম একটা অধার্মিক ব্যাপার বেশীদিন চলতে দেওয়া তো আমাদের প্রতিক্রিয়াশীল শহরের ধাতে নেই তাই গেরুয়া, সাদা সবুজ সব শিবিরই একবার করে এসেছে, লোকজন জমিয়ে ভাঙচুরের চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু লাভ কিছু হয়নি । কারণ লোকজন ভয়েই আধমরা হয়ে ছিল । বোধ হয় গড আল্লা বা ভগবানের ভরসার থেকে শয়তানের উপর তাদের ভয় বেশী বলেই । কিম্বা হয়ত ভগবান এই সব বিভিন্ন রঙ্গের শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে তার প্রভাবও কমে এসেছে সব ধর্মেই কমন শয়তানের তুলনায় ।

গুটিকয় মামলাও হয়েছে । ৬৬৬ নম্বর বাড়ির মালিক নিজে না গেলেও তার উকিলেরা গিয়ে মামলা জিতে এসেছে । আসলে ভগবানের দালালরা ঠিক প্রমাণ করতে পারেনি যে ঐ বাড়ির কার্যকলাপ কার কোন পাকা ধানে মই দিচ্ছে । তাই লোকে হাল ছেড়ে দিয়েছে ঐ বাড়িটার ওপর । ঐ বাড়ির লোকেদের গতিবিধির ওপর । নতুন পার্থ দে , দেবযানীর মত মুখরোচক বা গায়ের লোমে আল্লাহো লেখা ভেড়া কিম্বা গণেশের মত শুঁড় নিয়ে জন্মানো বাচ্চা ইত্যাদি ভগবানের মহিমার খবরে প্রতিদিন চায়ের কাপে ঝড় উঠছে দোকানে বাজারে বাসে ট্রেণে …

* * *

অনেকগুলো বছর হয়ে গেল শতরূপা আর সায়নাংশুর বিয়ে হয়েছে । এখনও দুজন দুজনকে জমিয়ে আদর করার অভ্যাসটা ফিকে হয়নি যদিও, দিনকে দিন আরও বেড়েই চলেছে । ছোট্ট একটা চাকরি থেকে দুজনের চেষ্টায় আজ প্রায় ১৭ টা কোম্পানির মালিক তারা । কোম্পানি থেকে কালেক্টেড রেভিনিউ এর ৯০ শতাংশ দিয়েই তারা তাদের সারাজীবনের স্বপ্ন গুলোকে বাস্তবায়িত করে ।

শুরুটা হয়েছিল সেই বিয়ের কদিন পরপরই যখন ওরা সমস্যাটার কথা জেনেছিল । ওদের দুজনের জীবন যাত্রার মধ্যে শুধু মাত্র নিরোধ কেনা বন্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু পরিবর্তন হয়নি । অবশ্য ওদের কিছু না এলেও সমাজের অনেক কিছু এসে গিয়েছিল, বাঁজা বা আঁটকুড়ো দম্পতীকে পাড়ায় রাখলে ভগবান অসন্তুষ্ট হয়ে অন্যদের অমঙ্গল করবেন সেই অজুহাতে পাড়া ছাড়া হয়েছিল নিতান্তই অল্প সম্বলের দুটো বাচ্চা বর বউ ।

তার পর অমানুষিক পরিশ্রম, ভালবাসা আর উন্নতির গল্প, অবশ্য সবটাই লোকের চোখ বাঁচিয়ে । কারণ পয়া বা অপয়া কোনো মানুষেরই উন্নতি সবাই হঠাত করে মেনে নিতে পারেনা, অন্য সমীকরণ খোঁজে । স্বচ্ছলতার পরও যখন কটা পথশিশুকে নিয়ে তাদের ওপর অবরুদ্ধ মমত্ব তার অনেক বছরের একটু একটু করে মজে যাওয়া খাত বেয়ে সরল ধারায় বওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তখনই একটু একটু করে ভিজতে থাকা বালিয়ারীতে বাঁধ হয়ে দেখা দিল ভগবানের দালালরা, নিজেদের মনুষ্যত্বের গাফিলতিকে ঢাকতে অন্যের সহমর্মীতার প্রকাশ ভন্ডুল করার চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী ।

তারপর অনেক বছর পর জন্ম হল SATAN এর । বস্তি বা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বাচ্চাদের কয়েকটা মোবাইল স্কুল চালায় ওরা । কালো গাড়ি গুলোতে অত্যাধুনিক ক্লাসরুমের আইডিয়াটা শতরূপারই । আর তাদের বাড়ির নীচের নিজস্ব বেকারীতে বানানো কেক, বিস্কুট ফল টিফিন দেয় ওদের । সবই চলে চুপচাপ । মিডিয়ার ঝলকানী নেই, ফুটেজ খাওয়ার গল্প নেই তাই রঙিন বাবুরাও মাথা ঘামানো ছেড়ে দিয়েছে । যতই হোক তাদের প্রচারে বা ভোট ব্যাঙ্কে তো আর টান পড়ছে না ।

একটা কথা কিন্তু কেউ জানেনা । ঐ “এস” “এ” আর “টি” এর মাঝে একটা কালো রঙের “এন” আছে, গাড়ির মিশকালো রঙের মধ্যে যেটাকে আলাদা করে চেনা যায় না ।

আসলে ভগবানের মুখোশের আড়ালে আজ দানবেরা মৌরসীপাট্টা গেড়েছে তাই শতরূপা আর সায়নাংশুর মত অনেকেই শয়তানকে জেহাদের প্রতীক করে নিচ্ছে, মানুষ আর তার সন্তানের নিরপেক্ষ ভবিষ্যতের চিন্তায় ।