খুঁত

– ধুর ধুর । কি যে তখন মতিচ্ছন্ন হয়েছিল । সালা ধরিবাজ দালালটার কথা শুনে এই জমিটা কিনে বাড়ি করলাম । কী যে তখন ভিমরতি ধরেছিল একবারও ভাল করে খেয়াল করিনি যে এখানে গাড়ি ঢোকানোর মত রাস্তা নেই । কি অবস্থা ভাব একবার নিজের বাড়িতে এতবড় গ্যারেজের জায়গা থাকা সত্ত্বেও শুধু রাস্তা না থাকায় একটা গাড়ি কিনতে পারছিনা । ইস কি ভাল অফারে পেয়েছিলাম । এই দামে আর কখনও পাব !

– আচ্ছা বাবা ঠিক আছে । এত চিন্তা করার কি আছে । আমরা কি একেবারে প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরোচ্ছি নাকি ? নাকি গাড়ি না হলে আমাদের চলছেনা । ওসব বাদ দাওতো । বেশ তো চলে যাচ্ছে, তারপর তেলের দামটাও তো ভেবে দেখতে হবে নাকি ! নাও জলখাবারটা খেয়ে নাও ।

– তুমি আর কি বুঝবে জমি জায়গার । যত্ত সব … একবারও তখন মাথায় এলনা !

বউ রুমার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নিজের মনেই গজ গজ করতে লাগলেন তাপস বাবু । অবশ্য রুমার হাতের ফাটাফাটি চানামশালা দিয়ে গরম গরম ফুলকো লুচি খেতে খেতে তাঁর ব্যাজার মুখ বেশীক্ষণ স্ববিরক্তির ব্যাজ এঁটে থাকতে পারল না ।

ছুটির দিন তাই তাপসবাবু একটু ছেলেকে নিয়ে ইংরাজি পড়াতে বসবেন অ্যাকুয়ার্ড অভ্যাসবশতঃ । আজ ছেলেকে নিউ হরাইজনটা একটু পড়াতে হবে । ওর থেকে বেশ কয়েকটা স্টোরি আছে এবার পরীক্ষায় ।

পড়ানোটা বেশ দক্ষতার সঙ্গেই করান তাপস বাবু । এই গভমেন্ট জব টা পাওয়ার আগে তো ব্যাচের পর ব্যাচ টিউশন করতেন, তাতে আয় ও মন্দ হত না । তাই ইংরাজী পড়ানোর সময় পেশাদার প্রাইভেট টিউটর দের মতই আগে গল্পটা পুরো ইংরেজীতে পড়ে শোনান ছেলেকে । তার পর তার বাংলা মানেটা বলে দেন । তারপর তাকে নিজেকেই পড়ে দেখতে বলেন । কোনো অজানা ওয়ার্ডে আটকালে তবেই সাহায্য করেন ।

তেমনই আজ তাপসবাবু ইংরেজী তে গোটা টা পড়ে শোনানোর পর বাংলায় অনুবাদ করে বলছেন,

– তো রাজা মন্ত্রীকে বললেন “কি আমার আঙুলে ক্ষত হয়েছে, আমি কষ্ট পাচ্ছি, আর তুমি বলছ যা হয়েছে মঙ্গলের জন্যই হয়েছে ! তুমি আমার নিমক খেয়ে আমারই সাথে বেইমানি কর ! দূর হয়ে যাও তুমি , এমন মন্ত্রী আমার দরকার নেই” । তো এর কয়েকদিন পরে রাজা তাঁর কয়েকজন সভাসদকে নিয়ে ছদ্মবেশে রাজ্য পরিভ্রমণকালে শিকারে গিয়ে ডাকাতের হাতে পড়লেন । তাঁদের যথা সর্বস্ব লুঠ করে ডাকাতরা তাঁদের ধরে নিয়ে গেল নরবলি দেওয়ার জন্য । কিন্তু নরবলি দেওয়ার সময় তারা দেখতে পেল রাজার হাতের আঙুলে ক্ষত । তখন তারা বলল যে এর তো খুঁত আছে । একে তো বলি দেওয়া যাবে না ।

– খুঁত কি বাবা ?

– খুঁত মানে ডিফেক্ট বা কোনো ফল্ট । ঐ যে রাজাটার হাতে কাটা ছিল না ঐ জন্য বলছে । যাই হোক শোনো, ডাকাতরা রাজাকে না বলি দিয়ে ছেড়ে দিল আর বাকি যাদের কে ধরেছিল তাদের সব্বাইকে বলি দিয়ে দিল ।

– বাবা ডাকাতরা সব্বাইকে বলি দিয়ে দিল ? রাজা কিচ্ছু বলল না ? ওরা তো ওর ফ্রেন্ডস ছিল, না ?

– আরে তখন তো ওরা রাজাকে ছেড়ে দিয়েছে । তো রাজা তো তখন পালাচ্ছে । যাতে ডাকাতরা আর ধরতে না পারে । বুঝলে । তো তার পর রাজা তাঁর প্যালেসে মানে প্রাসাদে ফিরে এসে মন্ত্রিকে ডেকে এনে বললেন, যে মন্ত্রী ই রাইট ছিল । ঐ উন্ড টার জন্যই রাজা বেঁচে গেছে । আর তাকে অনেক পুরস্কার দিয়ে আবার মন্ত্রি করে দিল । নাও এবার তুমি নিজে নিজে লাইন বাই লাইন পড়ে দেখ কিছু অসুবিধে হচ্ছে কিনা ……

– বাবা ঐ রাজাটার না রিয়েলি খুঁত আছে ।

– হ্যাঁ বল্লাম তো …

কিছুক্ষণ পর তাপস বাবু নিউজ চ্যানেল খুললেন আর সঙ্গে সঙ্গেই চার ও ছয় খোপ টেলিভিশন এক ভীষণ ব্যাস্ত মাছ বাজারের ন্যায় কলরব ছড়িয়ে দিল গোটা ঘরে । মহারাষ্ট্রে খরা হয়েছে । কিছু চাষী সুইসাইড করেছে । সেই নিয়ে বিরোধী পক্ষের নেতা সরকার পক্ষের এক নেতাকে তেলেবেগুণ টাইপ ফোড়ন দিচ্ছে আর তিনিও উত্তরে না না না না করে “নানা”বিধ আপত্তি সহযোগে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন । নাঃ পেঁয়াজের দাম আবার বেড়ে যাবে । চাদ্দিকে কি সব হচ্ছে ।

– এই শুনেছ ! কমল বাবুদের বাড়িতে টেলিফোন , কারেন্টের লাইন রাত্তির বেলা কারা যেন খালি কেটে দিয়ে যাচ্ছে । তার ওপর কালকে রাত্তিরে জনা পনের লোক নাকি এসে বন্দুক টন্দুক নিয়ে লুটপাট করে গেছে । কি অবস্থা ভাব । কমল বাবু সকাল সকাল বেরোলেন দেখলাম, মনে হয় পুলিশে রিপোর্ট করতে ।

– না না , কমলদা অত বোকা নয় । ওখানে গেলে কিছু লাভ হবে না জানে । এসব কেন হচ্ছে তাও জানে । দেখ সেখানেই গেছে সকাল সকাল রফা করে ফেলতে । আরে হবে নাই বা কেন, কাউন্সিলারের ছেলে কত দিন ধরে বলছে বাড়িটা ওকে বেচে দিতে । ফ্ল্যাট বানাবে বলে ।  তা নয় উনি আঁকড়ে বসে আছেন । আরে পারে নাকি কখনও ওদের সঙ্গে । লাস্ট এ সেই তো রাজি হতে হল । যাই হোক তোমার এসব নিয়ে বেশী আলোচনা করার দরকার নেই । ওর প্লটের লোকেশনটা ও ভাল ছিল । একদম রাস্তার ধারে তাই ওরকম । আমাদের তো গাড়ি ই ঢোকেনা । তাই আমাদের ওসব নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা । বুঝলে ?

বছর কয়েক পরের কথা …

তাপস বাবুদের বাড়ির চারপাশের প্লটেরা ব্যক্তিগত মালিক হারিয়ে বহুগামী হয়েছে । অবশ্য ঊর্ধ্বগামী ও বলা চলে । যেমন ঊর্ধ্বগামী প্রমোটারের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের পরিমাণ ।

একদিন রাতে তাপসবাবু নীল চেক চেক লুঙ্গীটা পরে বেতের চেয়ারে আধা গা এলিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন । বন্ধ হয়ে গেল আরও পাঁচটি জুটমিল । যাক বাবা সরকারী চাকরীটা ছিল ভাগ্যিস । ওঃহো ভুলেই গেছিলেন প্রায় । ফোনটা তুলে রাখতে হবে । এই সময়টা থেকে কে যেন ফোন করে আজে বাজে কথা বলতে থাকে প্রতিদিন । জ্বালাতন হয়েছে এক !

ফোনের রিসিভার টা তুলে রাখতে গিয়ে অভ্যাস মত কানে লাগালেন তাপস বাবু । রিসিভারের নিস্তব্দতা হঠাত করেই তাঁর হৃদপিন্ডকে শীতল করে চোখকে বাইরে স্ট্রীট লাইটের আলোর দিকে স্থির করে দিল কারণ গোটা ঘর জুড়ে হঠাতই নেমেছে ঘন অন্ধকার আর ত্রিফলা ফিকে করা রাস্তার ভেপার আলো মেখে তাঁর বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে কিছু লোক । সংখ্যায় জনা কুড়ি , অচেনা …

তাপস বাবুর মাথায় তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম ছাড়াও একটা কথা গড়িয়ে পড়ছিল কপাল বেয়ে বিড় বিড় করতে থাকা ঠোঁটে … “রাজাটার না রিয়েলি খুঁত আছে ।” ……

রাজাটারই মত , তবে একটা আঙুল নয় অন্যকিছু একটা যেন অ্যাম্পুটেড ফ্যান্টম পেইনের মত জেগে উঠছে তাপস বাবুর শরীরে পিঠের ঠিক মাঝখানে …… কোনোদিন কিছুর অস্তিত্ব ছিল হয়ত …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s