মেরি এক্স মাস …………………

অন্যান্য বছরে আজকের দিনটা সকাল থেকে সাজো সাজো রব পড়ে যেত । কেক উৎসব বলে কথা । আগে আগে প্রেসার কুকারে হলেও মাইক্রো অভেন কেনার পর প্রতিবছর সেটার সদ্ব্যবহারে কোনো কার্পণ্য হয়নি । সকাল থেকে বেশ কএক কেজি ময়দা , ডজন খানেক ডিম , ভ্যানিলা, বেকিং সোডা ইত্যাদি নিয়ে কেক যজ্ঞ শুরু হয়ে যেত । তার পর চেনা লোকজনের বাড়িতে গিয়ে সেগুলো ডেলিভারি করার আনন্দ ।

এবারে সেসব কিছুই হয়নি । বহু সুযোগসুবিধা আর বড়লোকি লাইফস্টাইলের হাতছানিযুক্ত চাকরি স্বেচ্ছায় ছেড়ে কোর সেক্টারের স্বপ্নের পিছু পিছু লাফ দিয়ে পড়েছি হার্ডকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানির পাথুরে ধূলোওড়া জমি তে । ১১ ঘন্টার ডিউটি , ৪ ঘন্টার যাতায়াত আর তার সঙ্গেই সারাদিন গলানো লোহা – জিঙ্কের বিষাক্ত বাষ্প, লোহা কাটার তীক্ষ্ণ আওয়াজ । অবশ্য শেষ দুটো মন্দ লাগেনা । যন্ত্র আমার চিরকালীন নিজের করে না পাওয়া ক্রাশ । তাই জড়িয়ে ধরতে না পারলেও তার হাত ছুঁতে পারলে, তার শরীরের গন্ধ বা গলার আওয়াজ আমাকে নেশার মত আচ্ছন্ন করে । পঁচিশে ডিসেম্বরে আমার মত সামান্য কর্মচারীর ছুটি না পাওয়া তাই বঞ্চনা মনে হয়নি । অনেকটা তাকে দেখার আশায় ছুটির দিনেও কোচিং যাওয়ার মত ।

বেশ কয়েক মাস হল একটা বিরক্তিকর রোগ হয়েছে আমার । পায়ের আঙুলগুলো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক ঘেমে যাচ্ছে । কি জানি আমার মন কম্প্রোমাইসে অভ্যস্ত হলেও পায়ের আঙুল গুলো হয়ত কিছুতেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্যু এর দমবন্ধ আগলে নিজেদের স্বাধীনতা হরন মেনে নিতে পারছেনা তাই পচে যাচ্ছে একটু একটু করে গলিত কুষ্ঠের মত আমার গোপনীয়তায় ।

যাই হোক ধান ভাঙতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়া আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে । সে জন্যই উল্টোপাল্টা লিখে যাওয়ার মতই ফ্যাক্টরীর কাজ সামলানোর পাশাপাশি কখনও কখনও অন্য দিকেও চোখ চলে যায় । আজ যেমন চোখ পড়ে গেল একটা কনভার্সেশনের দিকে । কান পড়ে গেল বলাই ভাল ।

লিমিটেড হলেও কোম্পানির আসল মালিক একজনই । তার ইচ্ছাই কোম্পানির সংবিধান । তাই সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ বাবু ঢুকলে সবারই চোখ পড়ে । কি জানি কখন কার পেটে লাথি পড়ে যায় !

ইশান মিস্ত্রী বরাবর বাবুর জুতো পালিশ করে দেওয়ার ফ্রি সার্ভিস দিয়ে থাকে । দিয়ে আসছে গত সাঁইত্রিশ বছর । এই বাবুর বাবা যখন কোম্পানি তৈরী করেছিলেন তখন থেকে । ব্যান্ড স্য মেশিন চালায় । দৈনিক রোজ ১৪৩ টাকা । ওয়েজেস সিস্টেম, নো ওয়ার্ক নো পে। কোম্পানিকে বাঁ হাতের তিনটে আঙুল দিয়ে দিয়েছে বছর পনের হয়ে গেল । কোম্পানির কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি বাঁচাতে গিয়ে ।

– বাবু আজ এট্টু তারাতাড়ি বেরুব ? নাতিটা বড্ড কেকের বায়না ধরেছে, একটা কেক কিনতে যাব রানিহাটি বাজারে ।

– না না , অনেক কাজ আছে । মাসের শেষে পয়সা তো নিতে দেরী করনা । আর তুমি বেরোলে আমি ফেরার সময় জুতোটা কে পালিশ করে দেবে ? আজকে রাত্রে পার্টিতে যাব । পালিশ ছাড়া জুতো পরে যাব নাকি ?

ইশান মুখ নামিয়ে নিল । দেখে বাবুর বুঝি করুণা হল ,

– আচ্ছা শোন । কোম্পানির সব লেবারদের আজ কেক দেওয়া হবে । কেক আনিয়েছি । আমি ক্যান্টিনে বলে দিচ্ছি । তোমায় যেন এক টুকরোর জায়গায় দু টুকরো দেয় । ওটা নিয়ে যেও নাতির জন্য । তোমার লাভই হল, নিজে কিনলে তো আর ওটার মত ভাল কেক কিনতে পারতে না । কি এবার খুশী তো ? যাও কাজ কর গিয়ে । ভাল কেক পাচ্ছ, কয়েকটা কাজ আছে , ক্রশ অ্যাঙ্গেল গুলো নর্থ শেড থেকে নিয়ে টাওয়ার শেডে সরিয়ে দিতে হবে, হিল গ্রাইন্ডিং মেশিনটার পাশে প্রচুর স্ক্র্যাপ জমে গেছে সরাতে হবে, আজ করে দেবে কিন্তু ।

অতিরিক্ত কাজের ফর্দ শুনিয়ে বাবু চলে গেলেন তাঁর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে । আর কেক পাওয়ার অনুগ্রহে কৃতার্থ হয়ে ইশা দা কাজ শুরু করে দিল ।

দুপুরে ক্যান্টিনে খেতে গেলাম । স্বাদহীন একঘেয়ে খাবারের সঙ্গে আজ এক্সট্রা প্রাপ্তি একটা কেক । এক কামড় দিয়েই মুখ ও মন দুটোই বিস্বাদ হয়ে গেল । বাজারের সবচেয়ে ওঁচা কেক বোধ হয় এটা । এমনকি এর চেয়ে বাপুজি কেক ও ভাল । লেবার রা অবশ্য তাই মহানন্দে একটু একটু করে বাঁচিয়ে ছোট ছোট কামড়ে খাচ্ছে …

এর মধ্যেই ঘটে গেল একটা দুর্ঘটনা । ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে এসব নিত্যনৈমিত্তিক রুটিনের অঙ্গ । প্রতিদিনই কারুর না কারুর কিছু না কিছু হচ্ছে । পরশু স্ট্যাম্পিং মেশিনে একজনের হাত কবজি থেকে কেটে বাদ হয়ে গেল তো আজ ১১ কেভি লাইনের তার ছিঁড়ে একজন কয়েক সেকেন্ডে জ্যান্ত রোস্ট হয়ে গেল, আবার কবে হয়ত গলন্ত দস্তা কারুর গায়ে পড়ে দিব্যি এক খানি ফুল সাইজ মানুষের কঙ্কাল যুক্ত মূর্তি হয়ে গেল ।
আসলে আমার ক্রাশ এমনিতে ভাল, স্নেহশীলা প্রেমিকার মত । কিন্তু আরও আরও মুনাফা আর কস্টকাটিং এ অসচেতন ধর্ষণের নীরোধহীনতার মতই তার শরীরে প্রবেশ করেছে মারণ ভাইরাসেরা ।

নিজের কাজ শেষ করে ইশা দা অতিরিক্ত কাজ করতে মানে গ্রাইন্ডিং মেশিনের পাশ থেকে স্ক্র্যাপ সরাচ্ছিল । গ্রাইন্ডিং মেশিন থেকে ছিটকে আসা লোহার টুকরো তার কপালে আর মুখের বিভিন্ন জায়গায় এসে লাগে । কেটে কুটে বেশ কয়েক জায়গায় ভাল ক্ষত হয়ে যায় ।

তবে ইশা দার কাছে এসব নতুন নয় সাঁইত্রিশ বছরে এমন কাটা কুটি হয়েছে বহুবার । তাই কোম্পানীর ডাক্তার, মানে কোনো এক অচীন গাঁ থেকে ধরে আনা কম্পাউন্ডারের লাগানো ট্যালট্যালে ডেটল , যাকে ডেটল জল বলাই ভাল । আর দু এক টুকরো তুলো । ইশা দা আবার রেডি ।

সময় মত বাবুর জুতো পালিশ ও করে দিল বাবুর বেরোনোর আগে । বাবু ফোনে কাকে যেন, ” ইয়েস সুইট হার্ট , আই অর্ডার্ড আ হিউজ ওয়ান ফ্রম ক্যাথলিন … ” ইত্যাদি বলতে বলতে গাড়ি নিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেলেন । আমরা সবাই সেদিনের মত হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম ।

আয়েশ করে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে জুতোটা খুল্লুম । অসম্ভব দুর্গন্ধ যুক্ত ভিজে যাওয়া মোজাটা বের করে আমার রুমের সামনের দড়িটায় টাঙ্গিয়ে দিলাম ।

তার পর দূরের দিকে চেয়ে থাকলাম । যেখানে হাইড্রার চাকায় ওড়া ধূলোয় সাদা হয়ে ইশা দা চলেছে কাঁধে লোহার ক্রশ অ্যাঙ্গেল নিয়ে , মাথার ক্ষতস্থানের তুলো থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত । পকেটে গোঁজা কাগজে মুড়িয়ে নেওয়া কেক । দু টুকরো । ভাত খাওয়ার সময় নিজের ভাগেরটাও না খেয়ে পকেটে ভরেছে ইশা দা ।

কখন যেন নিজের মনেই বলে ফেলেছি মেরি ক্রিশমাস …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s