ফেব্রুয়ারী

 
“প্যায়ার মহব্বত …” সেলুনে চুল কাটতে কাটতে মাথা নাড়াতে ইচ্ছে করলেও পারছিলাম না ক্ষুর ও কাঁচির যুগপৎ প্রহরায় ।
 
যাইহোক গোটা গায়ে সহসাদ্ভুত সজারু ফিলিং নিয়ে বেরিয়ে দেখি “প্রেম বোলে” সিনেমার পোস্টারে ছয়লাপ চারিদিকের দেওয়াল । সিনেমাটা দেখতে যাব কিনা ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে গেল যে সুনন্দ দা একবার যেতে বলেছিল ওর বাড়ি কি যেন দরকার আছে বলে ।
 
অফিসের পথে যেতে মৌ এর সাথে দেখা অনেকদিন পর ভোরের বাসে । ফর্মাল কেমন আছিস, কি করছিসের পরেই সেই চিরকালীন প্রশ্ন যা যে কোনো সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবী অনেকদিন পর দেখা হলে পরস্পরকে করে থাকে – “কেমন চলছে তোর ?” । কোন প্রসঙ্গে বুঝতে না পারার ভনিতা সেরে চিরকালীন খোলসা করা উত্তর “মানে বলছি প্রেম ট্রেম করছিস ?”
 
মৌ এর সাবলিল ঝটিতি জবাবে জানলাম, হ্যাঁ সে প্রেম করছে । তার পর জিজ্ঞেস না করতেই বলে চলল বার বার বলে অভ্যস্ত স্ক্রিপ্টে, তার বসের সঙ্গে তার প্রেমের কথা আর একই সঙ্গে হয়তবা নিজের অজান্তেই বিবরণ দিয়ে যেতে থাকল তার বসের গাড়ির সংখ্যার, হাবিবে কাটা ফ্যাশন্ড চুলের স্টাইলের, মহার্ঘ্য ফ্ল্যাট আর তার বিছানার ইমপোর্টেড গালিচার কোমলতার ।
 
শুনতে শুনতে কখন যে শুধু দেহটা পড়েছিল জানালার দিকে তাকিয়ে আর মৌ নেমে গেছে করুণাময়ীতে ঝটিতি বাই বলে খেয়াল হয়নি । মনে পড়ে যাচ্ছিল সমর্পিতার কথা । সুনন্দদার প্রেমিকা সমর্পিতা । অবশ্য এখন আর প্রেমিকা নয়, বউ । বছর দুয়েক আগেই আইটি জায়েন্ট ইনফোসিসের উচ্চপদাসীন সুনন্দদাকে বিয়ে করেছে সমর্পিতা । আমি কোন দিনই কিছু বলিনি, সুনন্দদা বা অন্য কেউই আমার মনের অচেনা দিকটার খেয়াল বেখেয়ালের খবর রাখেনা । না রাখাটাই স্বাভাবিক ।
 
তবু মেয়েরা বোধ হয় মন পড়তে পারে তাই একদিন কোচিং সেরে একসঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে আমায় বলেছিল, “জানিস এবারে আমার জন্মদিনে সুনন্দ কি গিফট করেছে আমায় ? একটা অওসাম ডায়মন্ড পেন্ডেন্ট । তোকে দেখাব । বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি আনব একদিন । আর আমাকে হায়াতে ট্রীট দিয়েছিল জানিস ? আলিয়া, মীনতিরা সবাই গেছিল । তোকে তো বলতেই ভুলে গেছি , ইস দারুন একটা ট্রীট মিস করলি । যাইহোক বল এবার আমাদের চেয়ে বেশী লাভিং আর একটাও কাপল দেখেছিস কিনা !”
 
অফিসের পরিবেশটা এমনই সেখানে ঢুকলে কিছুক্ষণের জন্য অতিপ্রাচীন কিছু আদীম জীবে রূপান্তরিত হয়ে যেতে হয় বাই ডিফল্ট । ওখানে গলানো জিঙ্কের বাষ্প মেশানো বাতাসে নেশার গন্ধ ভাসে । আধো অন্ধকারে জ্বলে থাকে কামনা লাল সোডিয়াম ল্যাম্প । পদে পদে গনগনে তেতে থাকা গলিত লোহার ও মুভিং হয়েস্ট ক্রেণের সম্মিলনে সেখানে মৃত্যুরূপার মোহময়ী হাতছানি । তাই ফ্যাক্টরিতে ঢোকার পর বাধ্য হয়েই একরকম দেহবোধে ডুবে থাকে লোকজন পাশের বাড়ির বৌদি কিম্বা পানুর নায়িকার পাছার, যোনির গঠনের আলোচনায় । উপায় নেই যে, এখানে একবার যদি মন অন্য কোথাও ওড়ে কাজের মাঝে তবে দেহের পড়ে থাকাটা চিরকালীন হয়ে যাওয়াটা খুবই সাধারণ আর বারবার মহড়া হওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা ।
 
ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে এলেই আবার গেটে অ্যাটেন্ডেন্স খাতায় বন্ধক রেখে যাওয়া সত্ত্বাটা আপনায়িত হয় কানে গোঁজা হেডফোনে বাজা এলভিস কসলোর “শ্যি” এর সুরে । গুটি গুটি রাতের পরতে ঘুম জড়াতে থাকা শহরের বুকের গোপন খাঁজ বেয়ে অভস্ত্য খিলাড়ির আঙ্গুলের মত এগিয়ে চলে কিছু বাস বাড়ি নামক কয়েক ঘন্টার দৈনন্দিন আশ্রয়ে ।
 
সাইকেল নেওয়ার সময় দেখা হল শশির সঙ্গে । যেদিন চেনা লোকেদের সঙ্গে দেখা হয় সেদিন হয়েই যেতে থাকে একের পর এক । শশি আমার পাতানো বোন, বেশ কয়েক বছরের জুনিয়র, স্কুলতুতো । অসম্ভব মিষ্টি দেখতে এই মেয়েটার সঙ্গে শেষ যখন দেখা হয়েছিল তখন ওর মাথা ভর্তি ঘন কাল চুল । এখনকার অনেকটাই কেশহীন মাথা ওর সৌন্দর্য্য ম্লান করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও অভিজ্ঞ চোখ সহজেই চিনে নিতে পারে থাইরয়েড ও অপুষ্টির যুগপৎ নখ দাঁতের পুরনো আঁচড় ।
 
ওকে জিজ্ঞাসা করতে হলনা, ভীষণ আদরের শশি অনেকদিন পর তার অন্যতম প্রিয় দাদা / বন্ধুকে কাছে পেয়ে অনর্গল বকে চলল প্রাণোচ্ছল স্বতঃস্ফূর্ততায় । তার বাবার আকস্মিক প্যারালিসিস, মাথার ওপর থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং এর পাহাড়প্রমাণ লোন, নিজের করা টিউশনি আর হ্যাঁ অবশ্যই জিৎ এর কথা । জিৎ আমার জুনিয়র, ওর কিশোরী বেলার বন্ধু আর যৌবনের ভালবাসা । মনে পড়ে এখনও ওদের মধ্যে হঠাত হঠাত করে অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে বেড়ে যাওয়া দূরত্বগুলো একসময় কিভাবে সামাল দিতে হত আমাকে । দুজনের দুজনকে নিয়ে যত অনুযোগ অভিমানের সাক্ষি ও প্রশ্রয়দাতা ছিলাম একমাত্র আমি ।
 
এখন জিৎ পড়ে মেসে থেকে । নিজের রোজকার বলতে একটা দুটো টিউশানি আর বাড়ির দেওয়া পকেটমানি । সাধ্য সীমাবদ্ধ হলেও শশির অধরা ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করার সাধ্যাতীত চেষ্টায় কোনও কোন দিন একবেলার খাওয়া বাদ তো কোনোদিন শুধুই পাঁউরুটি । অনেকদিন দেখা হয়নি তাই সুযোগ পেয়ে আমার কাছে শশির সে কি নালিশ — না খেয়ে খেয়ে যে ছেলেটার শরীর খারাপ হয়ে যাবে । “দেখা হয় ?” – উত্তরে সলজ্জ হেসে একসময়ের রীতিমত স্বচ্ছল বাড়ির মেয়েটা বলে, “হয় মাঝে মাঝে । মাসে একবার । জানই তো কত ভাড়া এখন যাওয়া আসার” … কথাটার বাস্তবিকতা ফুটে বেরচ্ছিল একশো টাকায় দু সপ্তাহের খরচ চালাতে শিখে যাওয়া মেয়েটার প্রাণবন্ত চোখের চঞ্চলতায় । সত্যি বোনটা আমার কত বড় হয়ে গেছে ।
 
লাস্ট ওদের দেখা হয়েছিল শশির জন্মদিনে । সেদিন জিৎ ওকে একটা পিঠে ঝোলানো ব্যাগ গিফট করেছে । ব্যাগটা খুব খুব দরকার হয়ে পড়েছিল যে শশির । নাঃ দামী দোকানের কেক আর সাধ্যে কুলোয়নি দশ বিশ করে প্রতিদিন টাকা জমানো ছেলেটার । তবে মেটিয়াবুরুজ স্টেশনের বেঞ্চিতে বসে সেদিন এলোমেলো পাগল হাওয়ায় প্যাকেটের ব্রিটানিয়া কেক ভাগাভাগি করে, কাড়াকাড়ি করে খেয়েছিল দুজনে । জিৎ স্বপ্নাবিষ্টের মত বলে চলেছিল একটা ছোট্ট বাড়ি আর দুজনের মোটামুটি দুটো চাকরির কথা । বুকে মুখ গুঁজে মুহুর্তের বাস্তব ভুলে স্বপ্নবিলাসসুখী মেয়েটা শুনে গিয়েছিল আর বিশ্বাস করেছিল মনে প্রাণে ।
 
রাত হয়ে গেছে অনেক তাই শশিকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাড়ির দিকে চলেছি । সুনন্দদার কাছে যাওয়ার ইচ্ছে নেই । ওর কোম্পানিরই আরও উচ্চপদস্থ একজনের সঙ্গে সমর্পিতার পালিয়ে যাওয়ার কথাটা দিন তিনেক আগেই সবাই জেনেছে পাড়ার । সেই সম্বন্ধেই কিছু হয়ত । নাঃ ওসবে মাথা দিতে ইচ্ছে করছেনা এখন ।
 
মন অভূতপূর্ব কিছু পাওয়ার আনন্দে মাতাল হয়ে গেছে আজ । অনেকদিনের পরে একটা উত্তর, একটা বাস্তব খুঁজে পেয়ে গেছি যে হঠাত করে পাওয়া মেঘমল্লারের সুরে ।
 
দেখা না-দেখায় মেশা হে বিদ্যুৎলতা,
 
কাঁপাও ঝড়ের বুকে একি ব্যাকুলতা ॥
 
গগনে সে ঘুরে ঘুরে খোঁজে কাছে, খোঁজে দূরে–
 
সহসা কী হাসি হাস’; নাহি কহ কথা ॥
 
আঁধার ঘনায় শূন্যে, নাহি জানে নাম,
 
কী রুদ্র সন্ধানে সিন্ধু দুলিছে দুর্দাম।
 
অরণ্য হতাশপ্রাণে আকাশে ললাট হানে,
 
দিকে দিকে কেঁদে ফেরে কী দুঃসহ ব্যথা ॥
 
————————————————
*** All the characters here are fictional.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s