পারপাস

নাহঃ বেশ বেলা হয়ে গেছে … অ্যালার্মটা কখন বেজে বেজে থেমে গেছে, উঠতে হবে
সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা, প্রতিদিনের মতই।

আস্তে আস্তে উঠে বসল ছেলেটা। ধীরপায়ে হেঁটে বেসিন পর্যন্ত গেল মুখ ধোবার জন্য। বেসিনের ওপরের আয়নাটায় তাকিয়ে মাথায় একবার হাতবুলিয়ে নিল। চিরুনি নেই।

অল্পপয়সায় ভাড়া নেওয়া এক কামরার ফ্ল্যাটটায় একটা ঘরেই শোয়া থাকা, বাথরুমের পাশেই এক কোণে জানালার ধারে একটা ইলেক্ট্রিক ইন্ডাকশন, দেওয়ালের হুকে ঝোলানো ক’টা জামা, পাঞ্জাবী। ছোটোবেলা থেকে এরকমই একটা সন্ন্যাসী ধরণের জীবনের কথা ভাবত, ফ্যান্টাসাইজ করত ছেলেটা।
যতটুকু দরকার তার চেয়ে বেশী না, এই জীবনদর্শন নিয়ে থাকার ভাগ্য সবার হয়না। তাই এক কামরার ফ্ল্যাট। তবু এর মধ্যেই একটু বেশী পয়সা খরচ করে ফেলেছে, একটা ব্যালকনির জন্য। ব্যালকনিওয়ালা ফ্ল্যাট না নিলে আরেকটু কম দামে পাওয়া যেত। তবু ব্যালকনিটা ওর দরকার। ওই ব্যালকনি দিয়ে ও রাস্তা দেখে, ভোরবেলা, কিম্বা রাত্রির নির্জনতায়। ব্যালকনিটা প্রয়োজনের মধ্যেই পড়ে তাই।

ব্যালকনিটার ঠিক উল্টোদিকেই একটা পার্ক। বাচ্চাদের দোলনা, কয়েকটা ঢেঁকি, একটা হাতি মডেলের স্লিপ। বাচ্চারা আসেনা যদিও খুব একটা। পার্কের পাশ দিয় পিঠে ব্যাগ নিয়ে, হেডফোন কানে কোচিং যাওয়ার সময় দুয়েকবার তাকিয়ে দেখে কেউ কেউ। তবে একটা বাচ্চা প্রতিদিন আসে নিয়ম করে। তার বাবার হাত ধরে। তার বাবা বোধহয় কোনো কারখানায় কাজ করে। সম্ভবতঃ ছটা থেকে ছটা ডিউটি। অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করে নিতে পারে ছেলেটা।

ঠিক সাড়ে ছটা নাগাদ বাপের হাত ধরে আসে বাচ্চাটা। কতই বা বয়স, দুবছর হবে। বাবার দুলিয়ে দেওয়া দোলনার শিকল ধরে কয়েকটা দাঁত বের করে সে কি হাসি। প্রতিদিন নিয়মকরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখে ছেলেটা। কোথাও একটু অন্যরকম লাগে কি ?
বাচ্চাটা বাবা বলতে গিয়ে বলে বাব্ব, সেই শুনে তার বাপের কি হাসি। কাঁধে বসিয়ে বাচ্চাটাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় টুইঙ্কিল টুইঙ্কিল বলতে বলতে আর নিজের নাম উচ্চারণ করতে শেখায় লোকটা।
তার যদি ছেলে হত কি নাম দিত … না না তার হলে মেয়ে হত, মিষ্টি পাকাবুড়ি একটা মেয়ে … নাম দিত ছায়া, কিরকম একটা স্নিগ্ধ ভাব আছে নামটায় … ধুর এসব কি ভাবছে ছেলেটা, নিজের মনেই কোথাও একটু সামলে নিল ও।

ছেলেটার ঘরের ব্যালকনিতে কয়েকটা ডালিয়া, বাটারফ্লাই ফ্লাওয়ার … নাঃ ফুল গাছ লাগানোটা নেশায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে কয়েকদিন ধরে … একটার পর একটা … ফুলটা বড় হয় যতদিন গাছটার সেকি হাঁপাহাঁপি, যেন বিশাল বড় একটা ফুল ফোটাবার জন্য পৃথিবীর যত জল-আলো আছে সব ও শুষে নিতে পারে। তারপর ফুলটা ফুটে যাওয়ার পর কেন কে জানে আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায় গাছটা। ওর উদ্দেশ্যপূরণ হয়ে গেছে যদিও। ঐ ফুল আর পরাগের মধ্যে দিয়েই যে ও বেঁচে থাকবে।
কিছু কিছু লেখক লিখেছেন গাছের সঙ্গে কথা বলার কথা, নাঃ সেরকম কিছু পারেনা ছেলেটা তবু ভাল লাগেনা ছেলেটার। আবার কিনে এনে টবে লাগায় ও। নাঃ নেশায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটা কমাতে হবে। অবশ্য যা জমানো আছে ঠিকঠাক হিসেব করে খরচ করলে চলে যাবে। যেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে “অন্য জাতের মেয়ে বিয়ে করে তাকে নিয়ে বহুদূরে পালানোর” মিথ্যে কথাটা চিঠিতে লিখে, তার দিনকয়েক আগেই পরিচিত একজনের সাহায্যে একটা বেনামে অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে হিসেব করে একটা অ্যামাউন্টের টাকা ডিপোজিট করে দিয়েছে ও। এই কবছর চাকরী আর ব্যাবসা করে যা জমিয়েছিল ও তার বাকিটা রেখে দিয়ে এসেছে বাবার অ্যাকাউন্টে। তাছাড়া ব্যাবসাটা তো আছেই, ওটা বোনের নামে করে দিয়েছিল আগেই। সঙ্গে কিছুই নিয়ে আসেনি, প্রাণপ্রিয় ল্যাপটপ, এমনকি ফোনটাও না। অবশ্য ফোন একটা সে কিনে নিয়েছে, সস্তা অ্যান্ড্রয়েড। সিম ও একটা জোগার করে নিয়েছে বেনামে।

ব্যাঙ্ক শুধু নয়, ফেসবুকেও একটা বেনামি বা ফেক অ্যাকাউন্ট খুলেছে ছেলেটা, বেশীদিনের জন্য নয়, সময়মত নিজেই ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেবে। বেশ কিছু ফ্রেন্ডও জুটে গেছে, মাঝে মাঝে গল্প করে তাদের সাথে, কয়েকটা মেয়ে আবার ফ্লার্ট করার চেষ্টা করে। এড়িয়ে যায় ও, স্বাভাবিক ভাবেই। সিমন্তিনীর কথা মনে পড়ে ? ওকে দেখতে ইচ্ছে করে ? নিজের কাছে মিথ্যে বলে কি লাভ ? আগে তো প্রায়ই, এখন খুব মাঝে মাঝে একেকবার দেখে ওর প্রোফাইল। প্রথম প্রথম ওর প্রোফাইলে পেত অপরিসীম কষ্ট আর প্রতারিত হওয়ার জ্বালায় পোড়া কিছু পোস্ট। এখন কিছু মাস সেগুলো আর দেখা যায়না, বদলে কিছু রিলেশনশিপ আর লাভ কোটস দখল নিয়েছে ওর টাইমলাইনের। কভার ফটোটাও শপিংমলের ফুডকোর্টে, ছেলেটার হাত দেখা যাচ্ছে, একটা এন লেখা ব্রেসলেট।

সারাদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফ্ল্যাটের দরজাপর্যন্ত এসে দিয়ে যায়। তাই একজনের মত ভাতেভাত ছাড়া বাকি সময়টায় ফেসবুকটাই সঙ্গী ছেলেটার। টুকটাক লেখে কখনসখনও। ফ্রেন্ডলিস্টটা দুইঅঙ্ক ছাড়িয়ে তিনঅঙ্কে ঐ লেখাগুলোর জন্যই।
নতুন করে প্রেমে পড়া সম্ভব নয় ওর মত মানুষের ক্ষেত্রে। তবু কখনো কখনো নির্দিষ্ট কোনো একজনের সঙ্গে কথা বলে মানুষ আনন্দ পায়, অপেক্ষা করে অনলাইন হওয়ার। তেমন একজন আছে ছেলেটার প্রোফাইলে, ঐশিকা। কমিটেড, একটা বেসরকারি হাইস্কুলে পড়ায়। ওর সঙ্গে দিনে আধঘন্টা – একঘন্টা গড়ে কথা হয় ছেলেটার। বিভিন্ন বিষয়ে। ফোনে নয় অবশ্যই, চ্যাটে। ছেলেটার ফোন নম্বর দেওয়া নেই ফেসবুক প্রোফাইলে।

– আপনার লেখাগুলো, মানে কি বলব, জাস্ট রিজুভিনেটস মি, বিশ্বাস করুন।
– তাই?
– আই স্যোয়ার, প্রথম যেদিন আপনার সঙ্গে কথা হল, সেদিন তো বিশ্বাসই হয়নি।
– কি বিশ্বাস হয়নি?
– এই যে এরকম একজন লেখক আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করেছেন, কথা বলছেন।
– কি যে বলেন, আমার তো কোনো বই নেই, ফেসবুকে একটু আধটু লিখি, তাতে লেখক হয়ে গেলাম।
– বিশ্বাস করুন, আপনার লেখায় অনুভুতিগুলো এত তীব্র! যখনই কোনো কারণে একটু ডাউন থাকি ফোনটা বের করে ফেসবুকে আপনার লেখাগুলো পড়ি।
– তাতে কি হয়? মন ভাল হয়ে যায়?
– না তা বলবনা। সব অনুভুতিতো আর আনন্দের নয়, তবে হ্যাঁ নর্মালাইজ হয়। ব্যালেন্সড হয়ে যায়।
– আচ্ছা কোনোদিন যদি আমার অ্যাকাউন্ট ডি অ্যাক্টিভেট হয়ে যায়? কি করবেন?
– এরকম বলছেন কেন? সত্যি ডি অ্যাক্টিভেট করে দেবেন নাকি? কেন?
– আরে না না এমনি বললাম। তারপরে আপনার ফিয়ন্সের কি খবর?
– আরে কি বলব, এত করে বলি, সব কিছু করবেন উনি, শুধু একটা ছুটি নিতেই যত ঝামেলা ওনার। কতদিন দেখিনি। কালকে আসবে বলেছে, দেখি স্কুল ছুটির পর গঙ্গার ধারে যাব দুজনে।
– গঙ্গার ধার…
– হ্যাঁ কেন ?
– সূর্যাস্তের সময় খুব খুব রোমান্টিক…

আজ আবার একটা ডালিয়া মরে গেল। ফুলটা দেখার মত হয়েছিল। তবে এবার আর চারা কিনতে হবেনা। অদ্ভুতভাবে এই প্রথমবার টবে একটা ছোট্ট চারা বেরিয়েছে, ডালিয়াই হবে মনে হয়।

– এই যে মশাই, আজ এত দেরী করে অনলাইন যে? নতুন কিছু লিখলেন? দেখি দেখি…
– না না, ঐ একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
– আচ্ছা একটা যেকোন নাম বলুন তো, আপনার সব চেয়ে প্রিয়।
– কেন?
– আরে বলুনই না… প্লিজ প্লিজ
– আচ্ছা, কিরকম নাম? মানে কিসের জন্য?
– আরে বলুন না কিছু একটা, আপনার সবচেয়ে ফেভারিট…
– বেশ, সিম… আমমম… ছায়া।
– ওকে দাঁড়ান
– কি ব্যাপার বলুনতো?
– দাঁড়ান না একটু
– বেশ
– এই নিন, কমপ্লিট —- ছায়া ডট ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম
– কি এটা?
– দেখুনইনা খুলে
– না আপনি বলুন
– এটা আপনার ব্লগ। আপনার সব লেখাগুলো ফেসবুক থেকে কপি করে এতে পোস্ট করা আছে, ফিউচারে কিছু লিখলে এতেই লিখবেন। বলছিলেন না ফেসবুক প্রোফাইল ডিঅ্যাক্টিভেট হয়ে গেলে… রিস্ক নিতে পারলাম না, বিশ্বাস করুন আপনার লেখাগুলো আমার মত কয়েকজনের দরকার, আজীবন, সময়ে সময়ে। ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ডটা পাঠিয়ে দিচ্ছি মেল করে।
– থ্যাঙ্ক, থ্যাঙ্ক ইউ

নিছক শুকনো ধন্যবাদ নয় ওটা, মোবাইলের এপারে ছেলেটার চোখেমুখেও একটা পূর্ণতার আনন্দ ঝড়ে পড়া দেখলেই বোঝা যায়।

রুটিনে বাঁধা লাইফ ওর। সকালে ওঠা, বেসিনের ওপরে আয়নায় তাকানো। মুখটা খুব ফুলে গেছে। ছোটোবেলায় নেড়া হওয়া বারণ ছিল ছেলেটার, পারিবারিক নিয়ম, মৃতাশৌচ ছাড়া ন্যাড়া হওয়া যাবেনা। তবুও পৈতের সময় ন্যাড়া হয়ে গেরুয়া পরার শখ মেটায় খুব মজা পেয়েছিল ছেলেটা।
ছেলেটার ফ্ল্যাটে চিরুনি নেই, দরকারও নেই। ফোর্থস্টেজ কেমো। ধরা পড়ার পর কাউকে জানায়নি ছেলেটা, এক্সপ্তাহের মধ্যে ঠিক করে নিয়েছিল করণিয়।

তবু আজকের সকালটা অন্যরকম। আজ ডালিয়া গাছটা বা বিকেলে পার্কে আসা লোকটাকে দেখলে ওর সেই কিরকম একটা অনুভূতি আর হবেনা।