Happy Parents’ Day

এসিটা চলছে তবু গরম যেন আর কমছেই না। নাঃ এইচ ভি এ সি ডিপার্মেন্টের ছেলেগুলোকে ডেকে একবার ডাক্টিং টা দেখতে বলতে হবে। বসে বসে এসব ভাবছেন মিস্টার মজুমদার আর ঠিক সেই সময় ফোনটা এল।

– ইয়েস, মজুমদার স্পিকিং, … তাই নাকি ? … বেশ … তাহলে তো আর কোনো চিন্তাই রইল না । … আচ্ছা শোনো পুলিশ কোনো ঝামেলা করবে না তো ? … ওকে ওকে, থ্যাঙ্কস … হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই, কলকাতায় ফের, তোমার জন্য সারপ্রাইজ রেডি করছি হে।

যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। অত বড় জমিটা পেতে আর কোন সমস্যাই রইল না। এই জন্য স্যান্নালকে এত ভালবাসেন মজুমদার। নাছোড়বান্দা ফ্যামিলিটাকে নিশ্চই আচ্ছা করে কড়কেছে। যাই হোক রিয়েলেস্টেটের বিজনেস করতে গেলে ওরকম একটু করতেই হয়। আর তা ছাড়া ওরকম একটা জঙ্গুলে গাছ গাছড়ায় ভর্তি বুনো জমি ফেলে রেখে কারোর তো কোন লাভ হচ্ছিল না।

কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরে দেখতে পাচ্ছেন মজুমদার। রিশেপসনে অনুশ্রীর সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে, দেখে যদ্দুর মনে হচ্ছে সিডিউল ট্রাইব। হাবে ভাবে মনে হচ্ছে ওনার ঘরেই আসতে চাইছে। যদিও সিকুরিটি দুজন প্রায় টানাটানি লাগিয়ে দিয়েছে ওকে আটকাতে। অফিসবয়কে ডাকার বেলের সুইচে চাপ দিলেন জে এন মজুমদার।

* * *

– সারনেম আই মিন টাইটেল কি ?

সামনের চেয়ারে জড়সড় হয়ে বসে চায়ে চুমুক দিতে থাকা ছেলেটা মাথাটা একটু তুলে সসঙ্কোচে বলল “মাহাতো”

নাঃ অনুমান ভুল হয়নি তাহলে … বেশ একটু আত্মপ্রসাদ উপভোগ করলেন মজুমদার। …… “আর নাম টা কি যেন বললে?”

– আজ্ঞা স্যার পীপ্পহ্লাদ, পিপ্পহ্লাদ মাহাতো।

– পীপ্পহ্লাদ, নামটা খুব আনকমোন বাট কোথায় যেন শুনেছি শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। যাকগে এবার বলত, কি ব্যাপার ? মানে আমায় কি বলতে চাও ?

ছেলেটাকে ভাল করে অবজার্ভ করতে থাকেন মজুমদার। কারণ তাঁর অভিজ্ঞতা বলে এই ভালো করে অবজার্ভেশন এবং রিলেটিং ভবিষ্যতে অনেক কাজে দেয়। ছেলেটার গায়ের রঙ কালো হলেও খুব কালো নয়। কপালের বাঁদিকে একটা কাটা দাগ। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল – শক্তপোক্ত চেহারা। সরল সাদাসিধে বলেই মনে হয়।

– স্যার আমার বাড়ি অনেক দূর, সেই রাঁচির নেতারহাট থেকে শুরু হয়ে গভীর জঙ্গলের ভিতরে। স্যার আমি আপনাকে একটা প্রস্তাব দিতে এত দূর এসেছি। তবে কথাটা খুব গোপনীয়।

এর আবার কি গোপনীয় কথা থাকতে পারে ? কিছু গছিয়ে টছিয়ে পয়সা ঝাড়ার তাল নাকি ?

– দেখ আমার চেম্বার সাউন্ডপ্রুফ। আর এই কাঁচটার ভিতর থেকে বাইরে দেখা গেলেও বাইরে থেকে ভিতরে দেখা যায়না। সুতরাং তুমি এখানেই যা বলার বলতে পার।

– স্যার আমি খবর কাগজে আপনার ছবি দেখেছি, পড়েছি, তাই আপনার কাছে ছুটে এসেছি। আমি জানি একমাত্র আপনিই আমায় সাহায্য করতে পারেন।

ঠিক যা ভেবেছিলেন তাই। ইনিয়ে বিনিয়ে সাহায্য চাওয়া কেস। সময়টাই নষ্ট হল। তবু যতদূর সম্ভব বিরক্তি চেপে বললেন, “ঠিক আছে, বুঝলাম, কিন্তু কি ব্যাপারে সেটা তো বলতে হবে …”

– স্যার আমাদের জঙ্গলের অনেক ভিতরে একটা জায়গায় আমি কয়েকটা জিনিস পেয়েছি। আমার মনে হচ্ছে মাটির তলায় উ জিনিস আরো আছে। অনেক মাটি খুঁড়ে যন্তর পাতি দিয়ে তুলতে হবে। খুব চুপে চুপে ভি করতে হবে। গরমেন্ট খবর পেলে আর কারুর নসিবেই কিছু জুটবে না। কিন্তু আমার তো অত টাকা নেই স্যার তাই আপনার কাছে এলাম। যদি আপনি আমার কথায় রাজি থাকেন স্যার তাহলে উ জায়গাটা আমি আপনাকে দেখিয়ে দেব।

– আরে জিনিসটা কি সেটা তো আগে শুনি।

একটা ছোট্ট নেকড়ার পুঁটুলি এগিয়ে দিল ছেলেটা। হাতে নিয়ে তালুতে উপুর করে বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত স্থির হয়ে গেলেন মজুমদার। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ যদি ভুল না করে থাকে তাহলে তাঁর হাতের তালুর উপর রয়েছে উৎকৃষ্ট কোয়ালিটির তিনটে বড় বড় আনকাট ডায়মন্ড।

সামলাতে একটু সময় লাগল। অপহরণ টপহরণ কেস নয়ত ? পরখ করার জন্য বললেন, “এগুলো তো ক্রিস্টাল পাথর বলে মনে হচ্ছে, এগুলো তুলে কি আর এমন লাভ হবে ?”

– স্যার আপনি ভালই জানেন এগুলো কি, শুধু শুধু আমার সঙ্গে মজা করছেন। আচ্ছা ঠিক আছে, এই তিনটে আমি আপনাকে দিয়েই দিলাম। আপনি এগুলো যেভাবে খুশী দেখে নিন। আমার কাছে আরও গোটা পাঁচেক আছে। আমার শর্তটা শুনে রাখুন, যা মুনাফা হবে, তার ফিফটি ফিফটি। আজ আসি, দুদিন পরে আবার আসব। রাজি থাকলে বলবেন।

রুমালের ক্ষিপ্রতায় বিন্দু বিন্দু ঘাম আড়াল করে মজুমদার বললেন, “আরে শোন শোন, কোথায় থাক তুমি? তোমার ফোন নাম্বারটা তো দিয়ে যাও”

– লাগবে না স্যার, আমি ঠিক দু দিন পর আসব।

* * *

দু দিনে বেশ কয়েক জায়গায় পরীক্ষা করিয়ে মজুমদার সিওর হলেন ওগুলো শুধু জেনুইনই নয়। এ ক্লাস কোয়ালিটির। কি করবেন ঠিক করে ফেলেছেন মজুমদার। না না এ সুযোগ ছাড়া যাবেনা। আগে দেখে তো নেবেন জায়গাটা তারপর ওই ছোকরার যা করার করবেন। ছোকরা ধুরন্ধর, কিন্তু তাঁর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেনা। তবে যা করতে হবে সব গোপনে, স্যান্নালকেও জানানো যাবেনা।

* * *

অতিগোপনীয়তার কারণে নতুন কেনা ছোট্ট অল্টো গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে যাচ্ছেন মজুমদার। পাশের সিটে ছেলেটা। বেশ খোশ মেজাজে দুজনেই, টুকটাক গল্প চলছে।

– জানো আজকের ডেটটা মানে ১লা জুন একটা স্পেশাল দিন ?

– কি স্যার ?

– আজকে হচ্ছে পেরেন্টস ডে। মানে বাবা মা এর দিন। তা তোমার বাবা মা কোথায় থাকেন ?

– “আমার বাবা সেই কোন ছোট বেলায় যাদুগোড়ার খনিতে কাজ করতে গিয়ে কি একটা অসুখ হয়ে মরে গেল। খনির বাবুরা কিছু আচার বিচার করতে দিলনা। কঙ্কালসার বাপটার দেহটা ভ্যানে উঠায়ে নিয়ে চলে গেল। মা খুব চেঁচামিচি করায় মায়ের মুখ টিপে ধরে পাশের ঝোপে নিয়ে গিয়ে … তার পর এক মুঠো নোট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। মা টা সেই রাত্রেই গায়ে আগুন দিল” … একটু চুপচাপ হয়ে গেল ছেলেটা।

– আহারে, তার পর তুমি কোথায় থাকতে ?

– তার পর স্যার আমি যাদের কাছে মানুষ হয়েছি উরাই আমায় খুব যত্নে রেখেছিল। উরাই আমার বাবা মা… এই যে স্যার এসে গেছে এবার পায়ে হাঁটা।

* * *

এই দেখুন স্যার এই গর্তটা দেখুন। দেখছেন নীচে ?

গর্তের নীচে দেওয়ালে লেগে থাকা চিকচিক করা হীরের টুকরো গুলো দেখে আনন্দবিহবল মজুমদারের মনে তখন কিন্তু প্রবল হয়ে উঠছে অন্য পরিকল্পনা। তাঁর জুতোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট পিস্তলটার গুলি অব্যর্থ। এই জঙ্গল থেকে বেরিয়েই সেটা ঠিক নিশানায় আঘাত করে তাঁকে এই হীরের খনীর একক মালিকে পরিণত করবে। ভাবতে ভাবতে পুলকিত মজুমদার হঠাতই অনুভব করলেন তাঁর পায়ের নীচে কিছুর একটা অমোঘ টানে তিনি গর্তের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ভয়ে অস্ফুট একটা আওয়াজ বের হল, আর প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গেই মজুমদার তলিয়ে গেলেন বিশাল গর্তটায়।

সর্পিল গতিতে দ্রুত এগিয়ে আসা গাছের মূলগুলো আস্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে দম আটকে দেওয়ার সময় হঠাত মজুমদারের মনে পড়ল … “পীপ্পহ্লাদ, দধিচীর পুত্র” … ছোটবেলায় পুরাণে পড়েছিলেন। বাবা মা আত্মাহুতি দেওয়ার পর বনের গাছপালা পশুপাখিদের হাতে মানুষ হওয়া অভিমানী পীপ্পহ্লাদ!

আর ঠিক তখনই দিল্লীর বিখ্যাত রিয়েল-এস্টেট জায়েন্ট মিস্টার নারায়ণমূর্তী, হিমাচলের কুখ্যাত কাঠ মাফিয়া শঙ্কর আর আরো অনেকের অফিসে ঢুকছে একটা কালো ছেলে, কপালে কাটা দাগ, হাতে একটা ছোট্ট কাপড়ের পুঁটুলি … “স্যার আসতে পারি ?”

* * *

পীপ্পহ্লাদ একবার শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে দেখল, মুখে তার তৃপ্তির প্রশান্তি। তার পর পিছন ফিরে হেঁটে চলল … ওদের পেরেন্টস ডের এখনো চার দিন বাকি।