বিষকুম্ভং পয়োমুখম – ১

গুপ্তশত্রুর সন্ধানে, পর্ব -১ (রংবাজী)
 
ছোটবেলায় বাবা একটু রঙচঙা মিষ্টি দেখলেই বলত, “খাসনা, রঙ দেওয়া আছে”। অনেকেই বলেন, এবং সযত্নে পরিহার করে চলেন বিভিন্ন রঙিন শরবত ইত্যাদি, এই বেপরোয়া বয়সের যুগে অনেক টিনেজারও স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে রঙিন খাদ্যবস্তুকে এড়িয়ে চলে, এটা একটা ইতিবাচক প্রবণতা। কিন্তু এর মাধ্যমে আদৌ কি আমরা এড়িয়ে যেতে পারছি অস্বাস্থ্যকর রঙ দেওয়া খাবার ???
 
উত্তরটা খুবই হতাশাব্যাঞ্জক, না আমরা পারছি না বরং আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্রায় ৭০% বস্তুতেই মিশিয়ে দেওয়া আছে কৃত্রিম রঙ, যা শুধু নিছক রঙ নয়, প্রাণঘাতি কার্সিনোজেন (যে পদার্থ শরীরে অবধারিত ভাবে ক্যানসার তৈরী করে)।
 
আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব এমন একটি জিনিসের সঙ্গে যেটি শুধু বিভিন্ন বাইরের খাবারেই মেশানো থাকে না, আমরা নিজেরাও সম্পূর্ণ অশিক্ষিতের মত বাজার থেকে কিনে এনে বাড়ির খাবারে মেশাই। অশিক্ষিত বললাম কেন ??? কারণ এই প্রোডাক্টটির গায়ে প্রস্তুত কর্তারা ছোট ছোট হরফে হলেও “FOR INDUSTRIAL USE ONLY, NOT FOR HUMAN CONSUMPTION” লিখে নিজেদের আইনগত ভাবে বাঁচার রাস্তা পরিস্কার করে রেখেছে। আর আমরা সেই লেখা পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে না করে যথেচ্ছ পরিমাণে বিষ ইচ্ছাকৃত ভাবে খেয়ে চলেছি প্রতিদিন। আজ্ঞে হ্যাঁ বিষ, ফুডকালারিং হিসাবে ব্যবহার করলেও এটিকে “বিষ” বলে অভিহিত করলে কিছু মাত্র ভুল হবে না।
 
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল বেশ কিছুদিন আগে আমেরিকার এক নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতার একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিদ্যালয় একত্রে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। আমার জিগরি দোস্ত এই গবেষনায় যুক্ত থাকার সুবাদে আমিও কাঠবেরালির মত সেতু বন্ধনে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাজার থেকে গুঁড়ো হলুদ ও গুঁড়ো লঙ্কার স্যাম্পেল সংগ্রহ করার দায়িত্ব বর্তেছিল আমার উপর। সেই মত বিভিন্ন বাজার ঘুরে বহু আনপ্যাকেজড হলুদ, লঙ্কা গুঁড়োর পাশাপাশি বেশ কিছু নামী দামী কম্পানির প্যাকেজড টারমারিক পাউডার আর চিলি পাউডারের প্যাকেটও সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম একটা কামধেনু রঙের প্যাকেট, কৌতুহল বশতঃ। পরীক্ষানিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একদিন বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি পাওয়া গেল ? সে জানিয়েছিল লুজ বিক্রি হওয়া গুঁড়োয় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ আর প্যাকেজড গুলোয় ১২ থেকে ৩৫ শতাংশ কার্সিনোজেনিক রাসায়নিক রঙ উপস্থিত। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আর কামধেনু ? সে হেসে বলেছিল, “ভাই ওটা পুরো খাঁটি” , আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করায় সে জানায় ওটির ১০০ শতাংশই খাঁটি বিষ, অর্থাৎ কার্সিনোজেনিক কেমিক্যাল।
 
হ্যাঁ এই স্টিং রিপোর্টের প্রথম পর্বে আমি কামধেনু রঙ সম্বন্ধে বলব। অনেকেই এই লেখা পড়ে অবাক হচ্ছেন, কারণ এই রঙ এতদিন তাঁরা নির্বিচারে ব্যবহার করে এসেছেন বাড়িতে বিরিয়ানী বানাতে। যাঁরা নিজেরা কখনও দোকান থেকে কেনেননি বা বিরিয়ানি খান না তাঁদেরও আশ্বস্ত হবার কিছু নেই, শুধু হোটেলের বিরিয়ানি বা লাল লাল মাংসের ঝোল ই নয় , পাড়ার ফুটপাথে টিকিয়া চাট বা ঘুঘনি খেয়েছেন তো ? কিম্বা বিভিন্ন ফাস্টফুডের সঙ্গে দেওয়া টুকটুকে লাল সস ? কিম্বা ফলের দোকানে বিক্রি হওয়া চেরী ? এসব খান না ? আচ্ছা বেশ, লাল টুকটুকে ডালিম কিম্বা বাজারের সেরা টাটকা মাছ, যেটার লাল টকটকে রক্ত দেখে তাজা মাছ ভেবে কিনেছেন ? কিম্বা দোকান থেকে কেনা সোনার মত রঙের অঢ়র (অরহর) ডাল ? —— এসবের সব কটাতেই এবং আরও নানা খাবারে ইচ্ছাকৃত ভাবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মিশিয়ে দিচ্ছে কামধেনু রঙ। যা শুধু নিছক রঙ নয়, ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী বিষ।
 
বাজারে প্রধানতঃ দু ধরণের কামধেনু রঙ বেশী প্রচলিত। লাল আর হলুদ। কমবেশি সব মুদিখানার দোকানে পাওয়া যায়। বাড়িতে বিরিয়ানি করলে দোকানের মত সাজাতে এই রঙ বাঙালীর চাই ই চাই। বর্তমানে শুধু কামধেনুই নয়, তাকে নকল করে আরও কয়েকটি কোম্পানি বাজার ধরতে নেমে পড়েছে। এসব রঙের প্যাকেটের পিছনে ছোট ছোট হরফে সাবধানবাণী লেখা থাকলেও এরা ইচ্ছাকৃত ভাবে প্যাকেটের ভাঁজ এমন ভাবে করে যে ঐ সাবধানবাণী প্যাকেটের ভাঁজে ঢাকা পড়ে যায়। জনসচেতনতা না থাকায় এবং অতিরিক্ত লাভের আশায় মুদিখানাগুলিও খাবার রঙ বলে নির্বিচারে এগুলি বিক্রি করে।
 
আসুন দেখে নেওয়া যাক কি আছে এই কামধেনু রঙে। হলুদ রঙটি হল মেটানিল ইয়েলো (C18 H14 N3 Na O3 S) আর লাল রঙটি হল এস এস রেড (potassium dichromate – K2 Cr2 O7). এই দুটি রাসায়নিকই এতটা ভয়ঙ্কর যে এর একটা বিন্দুও ক্যানসার ডেকে আনতে পারে। তাই ল্যাবরেটরিতে এগুলি নিয়ে কাজ করার সময় গ্লাভস ও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও মেটানিল ইয়েলো ক্যানসারের পাশাপাশি আরও কিছু দীর্ঘস্থায়ী অসুখ তৈরী করতে পারে, যেমন অ্যালঝাইমার্স, প্যারানৈয়া, ইন্সোমনিয়া, কিডনি স্টোন, ব্রেণের ও নার্ভের বিভিন্ন সমস্যা। বিভিন্ন ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই কেমিক্যাল শরীরে একবার ঢুকলে তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। এমনকি মায়ের শরীরে থাকা এই কেমিক্যালের প্রভাবে বাচ্চার মস্তিষ্কের গঠন ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।
Potassium Dichromate রাসায়নিকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি পদার্থ যার প্রভাবে ক্যানসার ছাড়াও আমাদের শ্বসনতন্ত্র মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা দেখা যায়। এছাড়াও থাইরয়েড গ্ল্যান্ড, কিডনি, লিভার, লাংস, পাকস্থলি, জননতন্ত্র ইত্যাদিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল সম্ভবনা থাকে।
 
কি করে বোঝা যায় কোন খাদ্যে এই প্রাণঘাতী বিষ মেশানো আছে কিনা ? বোঝা খুবই শক্ত। ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করা ছাড়া উপায় নেই, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষা হিসাবে দেখা হয় রঙ পরিবর্তন (মেটানিল ইয়েলো ঘন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে গোলাপী বর্ণ ধারণ করে আর পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট সালফার ডাইঅক্সাইডের সংস্পর্শে ঘন নীলবর্ণ ধারণ করে)।
 
এই ভয়ংকর বিষের হাত থেকে বাঁচার রাস্তা কি ? চোখ কান খোলা রাখুন। দোকান থেকে এই কামধেনু রঙ কিনে ব্যবহার করা বন্ধ করুন, দোকানদার কে বোঝান যাতে তিনি এই বিষ দোকানে না রাখেন, আরও যাঁরা যাঁরা কেনেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন, তাঁদেরও বোঝান, সচেতন করুন। রাস্তাঘাটের বেশী রঙচঙ্গা খাবার এড়িয়ে চলুন । পরিচিত কেউ যদি ঘুঘনি বা আচার বা সস ইত্যাদি প্রস্তুত করার ব্যবসায়ে যুক্ত থাকেন তাহলে তাঁদেরকে সচেতন করুন। জনসচেতনতা ছাড়া এই সমস্যার অন্যকোন সমাধান আমাদের হাতে এই মুহুর্তে নেই। সরকার যদি দায়িত্ব নিয়ে এই রঙকে ডোমেস্টিক ইউজের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে বা নিদেনপক্ষে এর প্যাকেটের সামনে বড় বড় অক্ষরে পয়জন বা বিষ লেখা বাধ্যতামূলক করে দেয়, তাহলে কিছুটা কাজ হতে পারে।
 
অনেকে জিজ্ঞাসা করতেই পারেন, তাহলে খাবার রঙ করার বিকল্প ব্যবস্থা কি ? তাঁদের বলি যে রঙ গুলিতে ফুড কালারিং কথাটি লেখা থাকবে এবং fssai লেখা থাকবে একমাত্র সেই রঙগুলিই খাবার রঙ করতে ব্যবহার করবেন। আর কেউ অনুমোদনহীন রঙ দিয়ে খাবার বানিয়ে তা বিক্রি করলে FSSAI এর কাছে অভিযোগ করার পূর্ণ অধিকার আপনার কিন্তু সবসময় রয়েছে।
 
এই লেখাটি শেয়ার করুন যতভাবে পারেন, ইচ্ছা হলে কপি পেস্ট করুন, সচেতনতা ছড়িয়ে দিন। খুব শিগগীরই ফিরে আসছি “গুপ্তশ্ত্রু” সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে।
 

পথস্তং …

ট্রেনটা মন্থরগতিতে স্টেশনে ঢুকলেও দ্রুত বেরিয়ে গেল প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বর্ষার পূর্বাভাষ পাওয়া পিঁপড়ের গতিতে ট্রেণপ্রসবিত যাত্রিরা কেউ লাইন টপকে আর অতিসাবধানীরা ওভারব্রিজ পথে যে যার নিজের পথে, পিছনে ফেলে একটা নিস্তব্দ নিরালা স্টেশন। শুধু রয়ে গেল স্বপ্নলীনা । সিঁড়িতে তোলা একটা পা, রেশম চুল আর লংস্কার্ট ফিচেল হাওয়ার স্পর্শলোভিতায় পতাকার মত উড়ছে, লম্বাটে ফ্রেমের চশমার পিছনে দুটো চোখ স্থির, আকাশের দিকে। মেঘের পাশে পাশে টুইঙ্কিলিং তারাদের ছায়া পড়ছেনা ওই গভীর কালো মণিদুটোর অতলে। ওদের লক্ষ্য কেউ জানেনা, ঠিক যেমন জানেনা স্বপ্নলীনা নিজেও কেন মাঝে মাঝে ও হারিয়ে যায় শূন্যতার এক অন্য পৃথিবীতে।
প্রতিবারের মতই হঠাত করে আসা শূন্যতার শেষও হয় হঠাত করেই আর স্বপ্নলীনা নিজেকে আবিস্কার করে জনশূণ্য স্টেশনটায় একলা দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি পা চালায় ও, অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে অনেক্ষণ হল, ৯ টা কিছু কম রাত নয় । মোবাইলটা আজকাল হাতেই রাখে স্বপ্নলীনা। নিতান্ত ফর্মাল ছাড়া ফোন করার কেউ নেই ওর, তাও। ওটা হাতে থাকলে অবশ্য একটা সুবিধা, কোথাও হঠাত দাঁড়িয়ে গেলে লোকে অবাক হয়না, ভাবে কারুর অপেক্ষা করছে মেয়েটা।
স্টেশনের পাশেই ব্রীজে ওঠার সিঁড়ি। তাড়াতাড়ি পা চালাল স্বপ্নলীনা, অন্যান্যদিন আটটার বাসটা পেয়ে যায়, নটার লাস্ট বাসটা না পেলে আজ আর বাড়ি ফেরাই হবেনা হয়ত, নটার পরে আর কোন গাড়িই যেতে চায় না যে ওদিকে।
উফফ কি লাক !!! ঐ তো আসছে বাসটা। হাত দেখাল স্বপ্নলীনা।

স্বদেশ অনেক্ষন থেকে দেখছিল ছেলেটাকে। রাত প্রায় দশটা, প্রতিদিনের মতই আজও ছেড়ে দিয়ে গেছে অফিসের পিক-আপ বাস। তবু প্রতিদিনের মত ছুটে গিয়ে অটো ধরার তাড়া নেই।
ছেলেটার পকেটে অনেকগুলো পাঁচ-দশটাকার নোট, অনেকগুলো। মার্কারী ভেপারের গাঢ় হলুদ আলোয় ছেলেটার চোখমুখ দিয়ে ঠিকরে পড়া একটা অদ্ভুত-অজানা অভিব্যক্তি মিলে মিশে কোথাও যেন রাতের রহস্যময়তার সঙ্গত করছে। ঝিরঝির করে আণুবীক্ষণিক বৃষ্টি চিরে চাকায় কুয়াশা তোলা বাসগুলোও ধরার কোন তাড়া নেই ছেলেটার। ছোট্ট চায়ের গুমটিটায় গিয়ে বসল ছেলেটা, একটা চা আর একটা তিনটাকার সিগারেট নিল, রসালো গজাগুলো দেখল কয়েকবার, নেবে ? চারটাকা করে দাম, নিয়েই নিল একটা। কতদিন পর সিগারেট। মুখের ঘা টা যদিও অনেক দিন হল ভাল হয়ে গেছে, তবু…, অবশ্য আজ একটা খাওয়াই যায়। এবার বাড়ির দিকে যাওয়া যাক। নাঃ ছাতা বার করবেনা আজ। এরকম ইলশেগুঁড়ি … একটা ছেলেবেলা আর প্রথমপ্রেম মেশানো ফিলিংস। দোকানটা বন্ধ করবে করবে করছে, মায়ের ওষুধ গুলো কিনছে ছেলেটা। কটা নোট বেঁচে আছে। এই সেন্টটার, এই যে “ওসা” এটার দাম কত ? একশো আশি! ও … রেখে দিল আবার। ২৫ টাকায় মায়ের জন্য কি কেনা যায় ? ফলের দোকান গুলোও তো বন্ধ। এত রাতে, এই বৃষ্টির দিনে কে ই বা ওর জন্য বসে থাকবে। অনেকদিন এই জায়গাগুলো ভাল করে দেখতে পায়নি … অনেকগুলো বছর। প্রতিদিনই তো সেই কোন ভোরে বেরনো আর এই এত রাতে ফেরা। সপ্তাহে একটা উইক্লিঅফ, সেদিনও সারাদিন কয়েক ব্যাচ ছাত্র পড়ানো…
এই বৃষ্টির মধ্যেও ঘটিগরমওয়ালাটা এখনও একলা রাস্তায় ঝুমুরটা বাজিয়েই চলেছে। খাবে ? পাঁচটাকার নিয়েই নেওয়া যাক। এবার বাড়ির দিকে … সাহস করে একটা সি এল নিয়েই নিয়েছে ছেলেটা, কাল ওর ছুটি … একটা গোটা দিন শুধু ওর নিজের … ভাবতে ভাবতে ঠোঁটের কোনে একটু মুচকি হাসি নিয়ে হাঁটতে লাগল ছেলেটা …

স্বদেশও হাঁটছে।
একটা গুমটির ঝাঁপ বন্ধকরে ভিতরে ছোট্ট বিছানা করে শুয়ে আছে অল্পবয়সী ছেলেটা। চারদিকে পানের বাটা, বিড়ি আর সিগারেটের প্যাকেট, সুপুরির জার। মোবাইলটার স্ক্রিনে আসা যাওয়া করছে মেসেজ। নেট প্যাক ভরেছে আজ। মাঝে মাঝেই মুখ ভর্তি হাসি ছেলেটার। আবার টাইপিং চলছে।
প্যামের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে কি স্বদেশের ? এরকমই এস এম এস। অবশ্য এরকম পাতি চায়না ফোনে নয়, স্বদেশের ব্ল্যাকবেরী। ফেসবুকে স্বদেশ স্টেটাস চেঞ্জ করে করে দিল কমিটেড। সেই সেবার পূজোয় ভি আই পি পাস নিয়ে কলকাতার সবকটা প্যান্ডেলে ও আর প্যাম। এই রকমই একটা পানের গুমটির পাশে গাড়ি থামিয়ে বাবাএলাচ কিনেছিল ওরা। হেবি কাজের জিনিস, মদের গন্ধ পুরো হাওয়া করে দেয়।
এগারটা বেজে গেছে, কটা নাইট মিনিটস ফ্রি আছে হয়ত। গুমটির ছেলেটা হুড়মুড় করে ফোন লাগাচ্ছে, একটুখানি কথা হবে মাত্র, “কাল দেখা হবে তো ? তোর জন্য একটা জিনিস এনে রেখেছি, কি বলত ? নাঃ এখন বলব না। কাল আয়। আচ্ছা রে বাবা আচ্ছা, বলছি বলছি, ঐ নতুন উঠেছে সোনার মোহরের মত চকলেট, এখানে পাওয়া যায়না বুঝলি, আমি তোর জন্য আনিয়েছি। … আচ্ছারে বাবা কাল নিয়ে থ্যাঙ্কিউ বলিস, এখন বলতে হবেনা। এখন ঝট করে একটা দে তো, আঃ বাবা তো সবসময়ই থাকবে, আড়াল করে একটা … আহহ, আমার সোনাটা, আই লাভ ইউ … আচ্ছা আমি দেব ? এই নে, মুয়াহহহ … খুশী? এই পিঁক পিঁক করছে, রাখি? টা টা”…
ফোনটা বুকে চেপে ধরে ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ল …

বাসটায় আলো নেই, একদম শেষের সারির জানলার পাশটায় বসেছিল স্বদেশ। কন্ট্যাক্টরটা বিড়ি খাচ্ছে। শেষবাস তাই স্টপেজের সংখ্যা হাতেগোনা।
সামনের দিকের লেডিস সিটে বসেছিল স্বপ্নলীনা। আর ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিনের ওপরের পাটাতনটায় ঝোলা কাঁধে আধবুড়ো লোকটা। এদিক ওদিক ছিটিয়ে কটা অল্পবয়সী ছেলে। সামনের স্টপেজটায় নামবে স্বপ্নলীনা, উঠে দাঁড়াল। হঠাত করেই গতি দ্বিগুণ করল বাসটা। ছেলেগুলো একটা একটা করে উঠে দাঁড়াচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গেটে পাহারায় কন্ট্যাক্টর আর এলোপাথারী কয়েকটা হাত শরীর থেকে অঙ্গগুলো উপড়ে নেওয়ার ক্ষিপ্রতায় গতিশীল হতে গিয়েও স্থির হয়ে গেল আচমকা গুলির শব্দে। আধবুড়ো লোকটার দুহাতে উঠে এসেছে দুটো পিস্তল। একটা ড্রাইভারের মাথায় ঠেকানো, আরেকটা এই মাত্র আগুণ ঝরিয়ে নিজের শক্তিপ্রমাণের পর উন্মত্ত জানোয়ারদের দিকে নিবদ্ধ। বাসটা থামল, আধবুড়ো লোকটা আর স্বপ্নলীনাকে নামিয়েই তিনগুণ গতিতে উধাও হয়ে গেল। লোকটা একটা পিস্তল স্বপ্নলীনার হাতে দিতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে বাঁটের কাছে কি খুঁজছে, নন্দরাম মার্কেট থেকে কেনা খেলনা বন্দুকের স্টিকারটা ঘষে ঘষে তুলে দিল, এবার হাতে দিয়ে বলল “ভবিষ্যতের জন্য” … তারপর ব্যাগ ভর্তি খবর কাগজের গোলায় পাটের দড়ি জড়িয়ে তৈরি করা জিনিসগুলোর মাঝে দ্বিতীয় পিস্তলটা রেখে হেঁটে চলল। কাল আরও অনেকের হাতে এরকমই “সাহস” তুলে দিতে হবে …
স্বপ্নলীনা আবার স্বপ্নের দেশে, হাতে ধরা পিস্তল, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে জামা ভিজছে … ফর্সা মুখে, কাল চশমা বেয়ে গড়াচ্ছে জলের ফোঁটা।
সুন্দর মুখটা, বাঁ চিবুকে একটা ছোট্ট তিল। প্যামেরও ছিল, তবে ডান চিবুকে। বোলেরো গাড়িটা নিয়ে লাস্টবার লংড্রাইভে যাওয়ার সময় ওর চিবুকেও ওরকম একটা তিল পেন দিয়ে এঁকে দিয়েছিল প্যাম। সেবার বেগুণি টপটা … ওটা পড়লে ওকে দারুণ মানাতো।
সেই বেগুণি টপটা তো সেদিনও পড়েছিল প্যাম, কিছু না বলেই যেদিন নীরজের পার্সোনাল জীমে ঢুকে পড়েছিল স্বদেশ। নীরজের কোলে মুখরেখে বসে থাকা প্যামকে দেখে থমকে গিয়েছিল স্বদেশ।
চারিদিকে অসংখ্য বোলতা, হলুদ ডোরা কাটা, এক্ষুনি পালাতে হবে তবু পালাতে পারছেনা … পা আটকে যায় এরকমই।
প্যাম মুখ সরিয়ে নিয়েছিল, শান্ত ভাবে, কিছু বলেনি। স্বদেশও কিচ্ছু বলেনি, বরং প্যান্টের জিপারটা আঁটতে আঁটতে নীরজই বলতে শুরু করেছিল। স্বদেশের বাবার দৌড় ঐ বোলেরো পর্যন্তই। নীরজরা কালই আরেকটা অডি কিনেছে। টেন প্লাস টু এর রেজাল্টটা বেরোলেই ওরা সুইজারল্যান্ড যাবে ঘুরতে। পামেলাও যাবে সঙ্গে। পামেলাকে ও কালকেই একটা আইফোন দিয়েছে, সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আগে একটা তানিস্কএর নেকলেসও দেবে, যেটা একবার ছুঁয়ে দেখতে পারলেই স্বদেশদের মত পাবলিকরা ধন্য হয়ে যায়। সুতরাং এর পর থেকে কারুর পার্সোনাল জীমে ঢোকার আগে পারমিশান নেওয়ার ভদ্রতাটা যেন শিখে রাখে স্বদেশ, আদারওয়াইজ ওদের নেপালী সিকিউরিটি গার্ড ঘাড়ধাক্কা দিতে কতটা দক্ষ তার ডেমো দেখিয়ে দেওয়া হবে স্বদেশকে …
নাইট্রাসিন টেন তিনপাতা ! হবেনা ভাই …… বেপরোয়া স্বদেশ হাজারটাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল …

ফুটপাথে বসে এক থালাতে ভাত খাচ্ছিল আনোয়ার আর অনিমা, বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে দুজনে। ওদের জমানোর কৌটোটায় ২০০ টাকা জমে গেছে। আনোয়ার শুনে অবাক ! তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে অনিমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আনোয়ার। এঃ এঁটো হয়ে যাচ্ছে না … কি যে করে ছেলেটা ! ছোট্ট মোবাইল স্ক্রিনটায় সিনেমা দেখছে বাচ্চা বর আর তার বাচ্চা বউ, একই সিনেমা, নতুন সিনেমা ভরানো হয়নি অনেক দিন, দু-এক টাকা যা বাঁচে সব কৌটোয় তুলে রাখে অনিমা, ওর পুঁচের জন্য, কবে এসে পড়ে ঠিক তো নেই। তবে এই সিনেমাটা ভাল লোকটা ব্যাবসা করে কেমন বড়লোক হয়ে যায় শেষে, আর তার বউকে কত্ত ভালবাসে, ঘুরে ঘুরে গান গায়। ঠিক আনোয়ারের মত।
নিজের মনে রাস্তায় চলতে চলতে বেঁচে যাওয়া কুড়ি টাকাটা কি মনে করে ওদের সামনে রেখে চলে গেল ছেলেটা। দুজনেই একটু চমকে গেলেও অনিমাই প্রথম তুলে দেখল একটা কুড়ি টাকার নোট। হঠাত করে পেয়ে যাওয়া টাকাটা নিয়ে দুজনেরই মুখে হাসি আর ধরেনা। তখনই ঠিক হয়ে গেল, এর মধ্যে দশটাকা কৌটোতে রেখে দেওয়া হবে আর বাকি দশ দিয়ে কাল একটা নতুন সিনেমা ভরানো হবে …

স্বদেশ এগিয়ে গেল … রাস্তার মোড়ে দেওয়ালে আটকানো ছবিটার সামনে। মোমবাতি গুলো পুরোটা জ্বলার আগেই বৃষ্টিতে নিভে গেছে। কয়েকটা বাসি গোলাপ বৃষ্টিতে ভিজে টাটকা লাগছে, চারদিক শুনশান ।
ঐ উল্টোদিকের ফ্ল্যাটে শুয়ে বাচ্চা মেয়েটা … ভালো রেজাল্ট করায় কাল ওর বাবা ওকে কলেজস্ট্রীটে নিয়ে যাবে, ওর পছন্দ মত গোটা দুয়েক গল্পবই কিনে দেবে প্রমিস করেছে।
দূরের ঝুপরিটায় মেঝেতে চোখ খুলে শুয়ে মুকেশ, কাল ওর নতুন পাওয়া চাকরিটার জয়েনিং ডে … প্রথম চাকরি।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিমা ভাবছে আর তো মাত্র কটা দিন কাল, পরশু তরশু তার পরেই তো ওর বর ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে আসছে।

নিজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে স্বদেশ, এইচ এসের আগে তোলা ছবিটা। টাইটা একটু বেঁকে গেছে। পরীক্ষার প্রতিদিন ঠাকুমা চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দিত …
কাল ওর বন্ধুদের জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোনোর ডেট … ওর ও হতে পারত …
কিন্তু সবার কাল থাকলেও স্বদেশের যে কাল বলে আর কিছু নেই …
আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টা,
রাতের অন্ধকারের সাথে সাথে ওর অস্তিত্বও ফিকে হতে থাকবে …