পথস্তং …

ট্রেনটা মন্থরগতিতে স্টেশনে ঢুকলেও দ্রুত বেরিয়ে গেল প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বর্ষার পূর্বাভাষ পাওয়া পিঁপড়ের গতিতে ট্রেণপ্রসবিত যাত্রিরা কেউ লাইন টপকে আর অতিসাবধানীরা ওভারব্রিজ পথে যে যার নিজের পথে, পিছনে ফেলে একটা নিস্তব্দ নিরালা স্টেশন। শুধু রয়ে গেল স্বপ্নলীনা । সিঁড়িতে তোলা একটা পা, রেশম চুল আর লংস্কার্ট ফিচেল হাওয়ার স্পর্শলোভিতায় পতাকার মত উড়ছে, লম্বাটে ফ্রেমের চশমার পিছনে দুটো চোখ স্থির, আকাশের দিকে। মেঘের পাশে পাশে টুইঙ্কিলিং তারাদের ছায়া পড়ছেনা ওই গভীর কালো মণিদুটোর অতলে। ওদের লক্ষ্য কেউ জানেনা, ঠিক যেমন জানেনা স্বপ্নলীনা নিজেও কেন মাঝে মাঝে ও হারিয়ে যায় শূন্যতার এক অন্য পৃথিবীতে।
প্রতিবারের মতই হঠাত করে আসা শূন্যতার শেষও হয় হঠাত করেই আর স্বপ্নলীনা নিজেকে আবিস্কার করে জনশূণ্য স্টেশনটায় একলা দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি পা চালায় ও, অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে অনেক্ষণ হল, ৯ টা কিছু কম রাত নয় । মোবাইলটা আজকাল হাতেই রাখে স্বপ্নলীনা। নিতান্ত ফর্মাল ছাড়া ফোন করার কেউ নেই ওর, তাও। ওটা হাতে থাকলে অবশ্য একটা সুবিধা, কোথাও হঠাত দাঁড়িয়ে গেলে লোকে অবাক হয়না, ভাবে কারুর অপেক্ষা করছে মেয়েটা।
স্টেশনের পাশেই ব্রীজে ওঠার সিঁড়ি। তাড়াতাড়ি পা চালাল স্বপ্নলীনা, অন্যান্যদিন আটটার বাসটা পেয়ে যায়, নটার লাস্ট বাসটা না পেলে আজ আর বাড়ি ফেরাই হবেনা হয়ত, নটার পরে আর কোন গাড়িই যেতে চায় না যে ওদিকে।
উফফ কি লাক !!! ঐ তো আসছে বাসটা। হাত দেখাল স্বপ্নলীনা।

স্বদেশ অনেক্ষন থেকে দেখছিল ছেলেটাকে। রাত প্রায় দশটা, প্রতিদিনের মতই আজও ছেড়ে দিয়ে গেছে অফিসের পিক-আপ বাস। তবু প্রতিদিনের মত ছুটে গিয়ে অটো ধরার তাড়া নেই।
ছেলেটার পকেটে অনেকগুলো পাঁচ-দশটাকার নোট, অনেকগুলো। মার্কারী ভেপারের গাঢ় হলুদ আলোয় ছেলেটার চোখমুখ দিয়ে ঠিকরে পড়া একটা অদ্ভুত-অজানা অভিব্যক্তি মিলে মিশে কোথাও যেন রাতের রহস্যময়তার সঙ্গত করছে। ঝিরঝির করে আণুবীক্ষণিক বৃষ্টি চিরে চাকায় কুয়াশা তোলা বাসগুলোও ধরার কোন তাড়া নেই ছেলেটার। ছোট্ট চায়ের গুমটিটায় গিয়ে বসল ছেলেটা, একটা চা আর একটা তিনটাকার সিগারেট নিল, রসালো গজাগুলো দেখল কয়েকবার, নেবে ? চারটাকা করে দাম, নিয়েই নিল একটা। কতদিন পর সিগারেট। মুখের ঘা টা যদিও অনেক দিন হল ভাল হয়ে গেছে, তবু…, অবশ্য আজ একটা খাওয়াই যায়। এবার বাড়ির দিকে যাওয়া যাক। নাঃ ছাতা বার করবেনা আজ। এরকম ইলশেগুঁড়ি … একটা ছেলেবেলা আর প্রথমপ্রেম মেশানো ফিলিংস। দোকানটা বন্ধ করবে করবে করছে, মায়ের ওষুধ গুলো কিনছে ছেলেটা। কটা নোট বেঁচে আছে। এই সেন্টটার, এই যে “ওসা” এটার দাম কত ? একশো আশি! ও … রেখে দিল আবার। ২৫ টাকায় মায়ের জন্য কি কেনা যায় ? ফলের দোকান গুলোও তো বন্ধ। এত রাতে, এই বৃষ্টির দিনে কে ই বা ওর জন্য বসে থাকবে। অনেকদিন এই জায়গাগুলো ভাল করে দেখতে পায়নি … অনেকগুলো বছর। প্রতিদিনই তো সেই কোন ভোরে বেরনো আর এই এত রাতে ফেরা। সপ্তাহে একটা উইক্লিঅফ, সেদিনও সারাদিন কয়েক ব্যাচ ছাত্র পড়ানো…
এই বৃষ্টির মধ্যেও ঘটিগরমওয়ালাটা এখনও একলা রাস্তায় ঝুমুরটা বাজিয়েই চলেছে। খাবে ? পাঁচটাকার নিয়েই নেওয়া যাক। এবার বাড়ির দিকে … সাহস করে একটা সি এল নিয়েই নিয়েছে ছেলেটা, কাল ওর ছুটি … একটা গোটা দিন শুধু ওর নিজের … ভাবতে ভাবতে ঠোঁটের কোনে একটু মুচকি হাসি নিয়ে হাঁটতে লাগল ছেলেটা …

স্বদেশও হাঁটছে।
একটা গুমটির ঝাঁপ বন্ধকরে ভিতরে ছোট্ট বিছানা করে শুয়ে আছে অল্পবয়সী ছেলেটা। চারদিকে পানের বাটা, বিড়ি আর সিগারেটের প্যাকেট, সুপুরির জার। মোবাইলটার স্ক্রিনে আসা যাওয়া করছে মেসেজ। নেট প্যাক ভরেছে আজ। মাঝে মাঝেই মুখ ভর্তি হাসি ছেলেটার। আবার টাইপিং চলছে।
প্যামের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে কি স্বদেশের ? এরকমই এস এম এস। অবশ্য এরকম পাতি চায়না ফোনে নয়, স্বদেশের ব্ল্যাকবেরী। ফেসবুকে স্বদেশ স্টেটাস চেঞ্জ করে করে দিল কমিটেড। সেই সেবার পূজোয় ভি আই পি পাস নিয়ে কলকাতার সবকটা প্যান্ডেলে ও আর প্যাম। এই রকমই একটা পানের গুমটির পাশে গাড়ি থামিয়ে বাবাএলাচ কিনেছিল ওরা। হেবি কাজের জিনিস, মদের গন্ধ পুরো হাওয়া করে দেয়।
এগারটা বেজে গেছে, কটা নাইট মিনিটস ফ্রি আছে হয়ত। গুমটির ছেলেটা হুড়মুড় করে ফোন লাগাচ্ছে, একটুখানি কথা হবে মাত্র, “কাল দেখা হবে তো ? তোর জন্য একটা জিনিস এনে রেখেছি, কি বলত ? নাঃ এখন বলব না। কাল আয়। আচ্ছা রে বাবা আচ্ছা, বলছি বলছি, ঐ নতুন উঠেছে সোনার মোহরের মত চকলেট, এখানে পাওয়া যায়না বুঝলি, আমি তোর জন্য আনিয়েছি। … আচ্ছারে বাবা কাল নিয়ে থ্যাঙ্কিউ বলিস, এখন বলতে হবেনা। এখন ঝট করে একটা দে তো, আঃ বাবা তো সবসময়ই থাকবে, আড়াল করে একটা … আহহ, আমার সোনাটা, আই লাভ ইউ … আচ্ছা আমি দেব ? এই নে, মুয়াহহহ … খুশী? এই পিঁক পিঁক করছে, রাখি? টা টা”…
ফোনটা বুকে চেপে ধরে ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ল …

বাসটায় আলো নেই, একদম শেষের সারির জানলার পাশটায় বসেছিল স্বদেশ। কন্ট্যাক্টরটা বিড়ি খাচ্ছে। শেষবাস তাই স্টপেজের সংখ্যা হাতেগোনা।
সামনের দিকের লেডিস সিটে বসেছিল স্বপ্নলীনা। আর ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিনের ওপরের পাটাতনটায় ঝোলা কাঁধে আধবুড়ো লোকটা। এদিক ওদিক ছিটিয়ে কটা অল্পবয়সী ছেলে। সামনের স্টপেজটায় নামবে স্বপ্নলীনা, উঠে দাঁড়াল। হঠাত করেই গতি দ্বিগুণ করল বাসটা। ছেলেগুলো একটা একটা করে উঠে দাঁড়াচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গেটে পাহারায় কন্ট্যাক্টর আর এলোপাথারী কয়েকটা হাত শরীর থেকে অঙ্গগুলো উপড়ে নেওয়ার ক্ষিপ্রতায় গতিশীল হতে গিয়েও স্থির হয়ে গেল আচমকা গুলির শব্দে। আধবুড়ো লোকটার দুহাতে উঠে এসেছে দুটো পিস্তল। একটা ড্রাইভারের মাথায় ঠেকানো, আরেকটা এই মাত্র আগুণ ঝরিয়ে নিজের শক্তিপ্রমাণের পর উন্মত্ত জানোয়ারদের দিকে নিবদ্ধ। বাসটা থামল, আধবুড়ো লোকটা আর স্বপ্নলীনাকে নামিয়েই তিনগুণ গতিতে উধাও হয়ে গেল। লোকটা একটা পিস্তল স্বপ্নলীনার হাতে দিতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে বাঁটের কাছে কি খুঁজছে, নন্দরাম মার্কেট থেকে কেনা খেলনা বন্দুকের স্টিকারটা ঘষে ঘষে তুলে দিল, এবার হাতে দিয়ে বলল “ভবিষ্যতের জন্য” … তারপর ব্যাগ ভর্তি খবর কাগজের গোলায় পাটের দড়ি জড়িয়ে তৈরি করা জিনিসগুলোর মাঝে দ্বিতীয় পিস্তলটা রেখে হেঁটে চলল। কাল আরও অনেকের হাতে এরকমই “সাহস” তুলে দিতে হবে …
স্বপ্নলীনা আবার স্বপ্নের দেশে, হাতে ধরা পিস্তল, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে জামা ভিজছে … ফর্সা মুখে, কাল চশমা বেয়ে গড়াচ্ছে জলের ফোঁটা।
সুন্দর মুখটা, বাঁ চিবুকে একটা ছোট্ট তিল। প্যামেরও ছিল, তবে ডান চিবুকে। বোলেরো গাড়িটা নিয়ে লাস্টবার লংড্রাইভে যাওয়ার সময় ওর চিবুকেও ওরকম একটা তিল পেন দিয়ে এঁকে দিয়েছিল প্যাম। সেবার বেগুণি টপটা … ওটা পড়লে ওকে দারুণ মানাতো।
সেই বেগুণি টপটা তো সেদিনও পড়েছিল প্যাম, কিছু না বলেই যেদিন নীরজের পার্সোনাল জীমে ঢুকে পড়েছিল স্বদেশ। নীরজের কোলে মুখরেখে বসে থাকা প্যামকে দেখে থমকে গিয়েছিল স্বদেশ।
চারিদিকে অসংখ্য বোলতা, হলুদ ডোরা কাটা, এক্ষুনি পালাতে হবে তবু পালাতে পারছেনা … পা আটকে যায় এরকমই।
প্যাম মুখ সরিয়ে নিয়েছিল, শান্ত ভাবে, কিছু বলেনি। স্বদেশও কিচ্ছু বলেনি, বরং প্যান্টের জিপারটা আঁটতে আঁটতে নীরজই বলতে শুরু করেছিল। স্বদেশের বাবার দৌড় ঐ বোলেরো পর্যন্তই। নীরজরা কালই আরেকটা অডি কিনেছে। টেন প্লাস টু এর রেজাল্টটা বেরোলেই ওরা সুইজারল্যান্ড যাবে ঘুরতে। পামেলাও যাবে সঙ্গে। পামেলাকে ও কালকেই একটা আইফোন দিয়েছে, সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আগে একটা তানিস্কএর নেকলেসও দেবে, যেটা একবার ছুঁয়ে দেখতে পারলেই স্বদেশদের মত পাবলিকরা ধন্য হয়ে যায়। সুতরাং এর পর থেকে কারুর পার্সোনাল জীমে ঢোকার আগে পারমিশান নেওয়ার ভদ্রতাটা যেন শিখে রাখে স্বদেশ, আদারওয়াইজ ওদের নেপালী সিকিউরিটি গার্ড ঘাড়ধাক্কা দিতে কতটা দক্ষ তার ডেমো দেখিয়ে দেওয়া হবে স্বদেশকে …
নাইট্রাসিন টেন তিনপাতা ! হবেনা ভাই …… বেপরোয়া স্বদেশ হাজারটাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল …

ফুটপাথে বসে এক থালাতে ভাত খাচ্ছিল আনোয়ার আর অনিমা, বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে দুজনে। ওদের জমানোর কৌটোটায় ২০০ টাকা জমে গেছে। আনোয়ার শুনে অবাক ! তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে অনিমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আনোয়ার। এঃ এঁটো হয়ে যাচ্ছে না … কি যে করে ছেলেটা ! ছোট্ট মোবাইল স্ক্রিনটায় সিনেমা দেখছে বাচ্চা বর আর তার বাচ্চা বউ, একই সিনেমা, নতুন সিনেমা ভরানো হয়নি অনেক দিন, দু-এক টাকা যা বাঁচে সব কৌটোয় তুলে রাখে অনিমা, ওর পুঁচের জন্য, কবে এসে পড়ে ঠিক তো নেই। তবে এই সিনেমাটা ভাল লোকটা ব্যাবসা করে কেমন বড়লোক হয়ে যায় শেষে, আর তার বউকে কত্ত ভালবাসে, ঘুরে ঘুরে গান গায়। ঠিক আনোয়ারের মত।
নিজের মনে রাস্তায় চলতে চলতে বেঁচে যাওয়া কুড়ি টাকাটা কি মনে করে ওদের সামনে রেখে চলে গেল ছেলেটা। দুজনেই একটু চমকে গেলেও অনিমাই প্রথম তুলে দেখল একটা কুড়ি টাকার নোট। হঠাত করে পেয়ে যাওয়া টাকাটা নিয়ে দুজনেরই মুখে হাসি আর ধরেনা। তখনই ঠিক হয়ে গেল, এর মধ্যে দশটাকা কৌটোতে রেখে দেওয়া হবে আর বাকি দশ দিয়ে কাল একটা নতুন সিনেমা ভরানো হবে …

স্বদেশ এগিয়ে গেল … রাস্তার মোড়ে দেওয়ালে আটকানো ছবিটার সামনে। মোমবাতি গুলো পুরোটা জ্বলার আগেই বৃষ্টিতে নিভে গেছে। কয়েকটা বাসি গোলাপ বৃষ্টিতে ভিজে টাটকা লাগছে, চারদিক শুনশান ।
ঐ উল্টোদিকের ফ্ল্যাটে শুয়ে বাচ্চা মেয়েটা … ভালো রেজাল্ট করায় কাল ওর বাবা ওকে কলেজস্ট্রীটে নিয়ে যাবে, ওর পছন্দ মত গোটা দুয়েক গল্পবই কিনে দেবে প্রমিস করেছে।
দূরের ঝুপরিটায় মেঝেতে চোখ খুলে শুয়ে মুকেশ, কাল ওর নতুন পাওয়া চাকরিটার জয়েনিং ডে … প্রথম চাকরি।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিমা ভাবছে আর তো মাত্র কটা দিন কাল, পরশু তরশু তার পরেই তো ওর বর ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে আসছে।

নিজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে স্বদেশ, এইচ এসের আগে তোলা ছবিটা। টাইটা একটু বেঁকে গেছে। পরীক্ষার প্রতিদিন ঠাকুমা চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দিত …
কাল ওর বন্ধুদের জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোনোর ডেট … ওর ও হতে পারত …
কিন্তু সবার কাল থাকলেও স্বদেশের যে কাল বলে আর কিছু নেই …
আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টা,
রাতের অন্ধকারের সাথে সাথে ওর অস্তিত্বও ফিকে হতে থাকবে …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s