রাখালিয়া – সংকলিত প্রথম পর্ব

শতদ্রু ও সায়ন্তনী

রাজকুমারী তোমার ছবি দেখি দূর থেকে দেওয়ালে। অনেক বড় হয়ে গেছ । কিন্তু দেখতে সেই আগের মতই মিষ্টি আর নিষ্পাপ । বিশাল বিশাল দুটো চোখের জ্বলজ্বলে আর্দ্রতা যেন দুটো ছোট্ট পৃথিবী। তোমার হাসি মাখা মুক্তোর মত ছোট্ট ছোট্ট দাঁত সেই আগের মতই প্রশান্তি ঢেলে দেয়। অবশ্য এসবই দেখা ঐ ছবিতে। মুখোমুখি চোখের নাগালে যে তোমায় দেখিনি কত দিন।

জানি এখন তুমি অনেক ব্যস্ত। কত দায়িত্ব, নতুন কর্তব্যের ভার তোমার ওপর। কত নানান দেশের রাজকুমার রাজকুমারীদের সঙ্গে তোমার নিত্যদিনের আনন্দ সমাবেশ। সেই ছেলেবেলার মত আমার বাঁশির সুর আর তোমায় মুগ্ধ করতে পারবেনা এখন। আমার একটা একটা করে খুঁজে পাওয়া বৈঁচির মালা আজ তোমার জন্য আসা সপ্তসাগরের সব চেয়ে দামী উপহারের সামনে লজ্জায় মুখ লুকোবে।

সেই মনে পড়ে সবুজ মাঠের জারুল গাছের তলায়, আমি তোমায় শোনাতাম রূপকথার গল্প ? তুমি শুনতে দুচোখ ভরা অপার বিস্ময়ে। আজ সেসব গল্প তোমার বিশ্বাস হবেনা। কারণ আজ তোমার পাণ্ডিত্য সর্বজন বিদিত। নানা দেশের পণ্ডিত বিদুষীরা তোমার নিত্য সহচর। আজ অক্ষর না চেনা রাখাল ছেলেটার গল্প যুক্তিহীনতার অপরাধে নির্বাসিত হবে প্রাসাদ থেকে অনেক অনেক দূরে, যেখানে আজও নীল কমল লাল কমলের ঠাকুমা চরকা চালায় আর ফোকলা গালের টোল খাওয়া মুখে চাঁদের আলো চমকায়।

সেই মনে পড়ে নবাবের মেলায় ? যেদিন নবাবের বাগানে হাজির হয়েছিল তোমারই বয়সী রাজকুমার আর রাজকুমারীরা। সেই তাদের সঙ্গে তোমার প্রথম আলাপ। কত খেলা, আনন্দ নৃত্য গীত। সেদিন তোমায় দেখব বলে বসেছিলাম সারা দিন ফটকের পাশে। আমি যে রাখাল ছেলে, ফটক পেরিয়ে তোমার সঙ্গে খেলার অধিকার যে আমার ছিলনা। তার পর আস্তে আস্তে কখন যেন বড় হয়ে গেলে তুমি।

তোমায় দেখতে গেছি অনেক বার। কখনও কটা বুনো কুল, কখনও কটা কাঁঠালি চাঁপা, আবার কখনও শুধুই আমাদের পুরোনো দিনের বন্ধু বাঁশিটা হাতে করে। প্রহরীরা আমায় ঢুকতে দেয়নি । তবু গেছি বার বার। শেষে সেদিন যেদিন তুমি হুকুম পাঠালে প্রহরীর মুখে। “তুমি রাজকুমারী, স্বৈরিণী তুমি, সামান্য রাখাল ছেলের সাথে দেখা করে কটা মনগড়া গল্প আর প্রলাপ শুনে সময় নষ্ট করার জন্য জন্ম হয়নি তোমার”। অদৃশ্য রক্ত ঝরেছিল অঝোরে। আর যাইনি। তুমি যে বড় হয়ে গেছ। রাখাল ছেলের সাথে কথা বলা যে আর মানায় না তোমায়।

আমাদের ছোটবেলার সেই রূপকথার গল্পগুলোতে কত অধরা স্বপ্নরা কি করে যেন সত্যি হয়ে যেত। রাখাল ছেলে তার রাজকন্যার সাথে সুখে ঘর বাঁধত ছোট্ট পর্ণকুটিরে। কিন্তু আজ রূপকথারা হারিয়েছে কোন দূর অরণ্যের গুহায় কিম্বা সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে।  আজ  যে  তোমার  রাজ প্রাসাদের  দরজায় কম্বিনেশন লক আর বন্ধুদের সমাবেশ আলো করে ডিজে বক্স। আজ আর রাখাল ছেলের প্রবেশাধিকার নেই তোমার জীবনের ভিজিটিং রুমেও।

তাই বাস্তবের বাস্তবিকতাকে মেনে নিয়ে স্বপ্ন দেখিনা আর। তোমার সমকক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার, ছিল না কোন কালেই। বুঝি। তাই রাখাল ছেলে আজ একা একাই ভালবেসে যায়।

দেওয়াল থেকে সন্তর্পণে খুলে আনা তোমার একটা ছবি আজ রাখাল ছেলের কথা বলার সাথী আর সকাল বিকেলের বন্ধু। রাখাল ছেলে এখনও সেই সবুজ মাঠের ধারে কুয়াশা ভরা ভোরে গরু চড়ায়, কাঁঠালি চাঁপার মালা গাঁথে আর দেশবিদেশের হরেক রূপকথা বলে যায় আপন মনেই। আর সন্ধ্যার কালচে নীল আকাশে যখন একটা একটা করে হীরের দানার মত তারারা ফুটে ওঠে, তখন সেই পুরোনো দিনের মতই পাতা ছাওয়া জারুল গাছের নীচে বাঁশিতে সুর তোলে রাখাল। বাঁশির সুর মাঠ ঘাট নদী পেরিয়ে মহাকালের পথ বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে দূর, বহু দূরের দিগন্তে।

ও বাঁশি ওভাবেই বাজবে চিরকাল। কত একসাথে বৃষ্টি ভেজা বিকেল, দু পয়সার সস্তা মিঠাই ভাগাভাগি করে খাওয়া, দুই প্রাণের সখার আরও কত হারানো দিনের, কথা বলবে। একটা সময়ের কথা, যখন তুমি রাজকন্যা হওনি। যখন তোমার সব আনন্দ অভিমান রাখাল ছেলের সাথে ভাগ করে নিতে মানা ছিল না, সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।

রাজকন্যা, যদি আবার কোনোদিন পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসে, হয়ে আসে চার দেওয়ালে বন্দী। জানালায় এসে বাতাসে কান পাত। রাখাল ছেলের বাঁশির সুর শুনতে পাবে।

প্রিয় রাজকুমারী,
তোমার দয়াপরবশতার ভিক্ষার মত করুণায় ছুঁড়ে দেওয়া চিঠি লেখার সম্মতির জন্য তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আসলে কি করা যাবে বল, সেই কোন ছোট্ট বেলা থেকে মনের সব কথা, অনুভূতি পরস্পরের সাথে ভাগ করে নেওয়া আমাদের অভ্যাস। ।
না না ভুল বললাম, আমাদের নয়, কারণ তুমি তো এই অভ্যাসটা কবেই ঝেড়ে ফেলেছ, ঠিকই করেছ, দৈন্য-সর্বস্ব তুচ্ছ মানুষরা পরজীবীর মত, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বদ অভ্যাস না থাকাই তো ভাল।
যাই হোক, তবু একতরফা বার্তা পাঠানোরও একটা স্বস্তি আছে, ছবির সঙ্গে কথা বলে যাওয়ার থেকে অন্ততঃ এ অনেক অনেক ভাল। আমার পাঠানো চিঠির খামে তোমার হাতের স্পর্শ লাগছে, এতেই আমার শান্তি। সে যতই তোমার প্রাসাদের পিছনের আস্তাকুড়ে না খোলা খামের পাহাড় জমা হোক না কেন।
এমন দয়াটুকুই বা কে করে বল। ছোট্ট বেলার সেই তুচ্ছ কয়েকটা বৈঁচি ফল আর বুনো ফুলের মালার প্রতিদানে তোমার এত করুণা ! … সত্যিই তুমি যথার্থ রাজকুমারী।
রাজকুমারী, তোমার প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার, এমনকি কোন অভিমান ও না। সে যা ছিল সেসব মান অভিমান তুলে রাখা আছে তোমার ছোটবেলার জন্য।
আবার যদি কোন দিন কুয়াশা ভরা মাঠের ধারে সেই ছোটবেলায় ফিরে যাই অন্য কোন জন্মে, যদি আবার দেখা হয় ভীষণ মিষ্টি এক ছোট্ট রাজকুমারীর সঙ্গে এক ছোট্ট রাখাল বালকের। রাজরক্ত বা সাধারণের পরিচয়ের খোলস ফেলে রেখে সবুজ ঘাসের ওপর, সেই দিন হিসেব হবে যত মান অভিমানের।
এখন যে আমি শুধুই এক মেঠো লোক, রাজকুমারীর করুণাভিক্ষুক।
তবে রাজকুমারী তোমার জন্য বড্ড চিন্তা হয় আজকাল। সময় যে তার খাতার পাতায় পাতায় কালপ্রবাহে ভেসে যাওয়া শুকনো পাতাদের তুলে রাখে যত্ন করে।
তাদের প্রতিটি হিসেব লেখা থাকে খাতার তলায়।
রাজকুমারী, তোমার নিষ্ঠুরতা, তোমার অবজ্ঞা যে তোমার দিকেই অমোঘ গতিতে ফিরে আসছে, তুমি তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছ কি ? অন্য কোন আয়না থেকে বিচ্ছুরিত প্রতিফলন যে একদিন ছুঁয়ে ফেলবেই তোমাকে তোমার অজান্তে।
সেদিন যদি লাল কমলের নীল কমলের দেশে ফিরে যাও রূপকথা আর রাখালিয়া সুরের খোঁজে, বুলডোজার আর বৈদ্যুতিক করাতের শব্দে নতুন ঠিকানা শুনতে পাবে তো ??? অচীনপুরের রাস্তায় ওঠা বড় বড় ফ্ল্যাটের আর আই টি নগরের স্কাইস্ক্র্যাপারে দাঁড়িয়ে মাটি ছুঁতে পারবে তো ??? শিকড়টা… ???

ইতি, তোমার ছেলেবেলার রাখাল

“রাখাল পিছু ফিরে একবার দেখল আর এগিয়ে চলল মগ দেশের দিকে।
কুহকিনীকে কুহকিনী জেনেও ভালবাসা যায়, আপন করে নেওয়া যায়। হয়ত তার মায়া জগতের স্বরূপ বুঝেও তাতে স্বচ্ছন্দ থাকার অভিনয় করা যায়। কিন্তু সে বড় ভঙ্গুর, কারণ কুহকী হৃদয় থেকে উৎসারিত গরলের সংক্রমণে রাখালের হৃদয় যে অভ্যস্ত হয়ে যাবে …… নিজের সমস্ত অনুভূতিগুলো অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যের মত ছুঁড়ে ফেলে দিতে।
মাথা নাড়ল রাখাল, নাঃ এভাবে পরিণতি আসে না। আবার এগিয়ে চলল, সামনে অনেক পথ ……”
* * *
খুব শিগগীরই আসছে “কুহক দেশে রাখাল” … তার শেষ অংশটাই টিজার হিসেবে রইল ।

রাখাল যদি সত্যিই কল্পনার জগতের চরিত্র হত, তাহলে কাহিনীটা হয়ত বেশিদূর গড়াত না। কারণ কল্পনা বুনে তোলা কল্কার মত রাখালের জীবনটাও হত ব্যালেন্সড আর পারফেক্ট। সে ডাইমেনশনের রাখাল কুহক দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক পা হাঁটার পরেই কোথা থেকে এক কবুতর টুপ করে তার কাঁধে বসত। কয়েক দণ্ড তীর বেগে ওড়ার ক্লান্তি জুড়িয়েই পায়ে বাঁধা লিপি তুলে দিত রাখালের হাতে।
“রাখাল তুমি পারলে আমায় ফেলে রেখে চলে যেতে ? পারলে আমার নিশ্চিত বন্ধুহীনতা আর একাকীত্বের পরিণতি জেনেও দেশান্তরের পথে পা রাখতে ? চেয়ে দেখ আমার মায়াদণ্ড আমি নিক্ষেপ করেছি উপলব্ধির আগুনে। কালের অমোঘ নিয়মে আমার মায়াশহরের লুণ্ঠিত পরিত্যক্ত পরিণতি আজ আমার দু চোখ ভরে ডেকে আনছে হঠাত করেই হারিয়ে যাওয়ার ভয়। যে ভয়কে দুর্বলতা ভেবে এতদিন উপহাস করেছি, তার আর্তনাদ চাপা পড়েছে স্বার্থান্বেষী স্তাবকদের জয়ধ্বনিতে।
রাখাল আজ যখন সন্ধ্যা নামছে পৃথিবীর বুকে তখন আমার মায়ায় আমার অলকাপুরীতে শরতের রোদ। কিন্তু আমি যে ক্লান্ত, একঘেয়ে জয়ধ্বনির শব্দে। আমার অনন্ত যৌবন, আমার মাদকতার অভিশাপ আমার কন্ঠ রোধ করছে।
রাখাল, আজ প্রাণ চাইছে মায়ার আবরণ সরিয়ে জগতের মুখোমুখি হতে। শরতের শ্যামলিমা আর নীলাকাশের অভিনয় কাটিয়ে গোধূলি ভরা সন্ধ্যাকে প্রত্যক্ষ করতে। হীরক খচিত কেয়ূরে পার্লার ফ্যাশনড কেশরাজীকে উন্মুক্ত করে দিয়ে তোমার হাত ধরে বেরিয়ে পড়তে পৃথিবীর খোঁজে। একটা বাস্তব দিনের শেষে, কোন বন্য ঝরনার পাশে তোমার চওড়া বুকে মাথা রেখে মনের কবরে দাফন করা অনুভূতিগুলো পুনরজ্জীবিত করতে।
আমায় সঙ্গে নেবে না রাখাল ?”
কিন্তু দুঃখের কথা হল যে আমার কলমের ভিতর দিয়ে আপনাদের সামনা সামনি হেঁটে আসা রাখাল বাস্তবের এক কার্বণিত অনুলিপি, কার্বনের প্রলেপে তার রঙ কখনও চেঞ্জ হয়ে হয় নীল কখনও কাল, কিন্তু অবয়ব বদলায় না।
তাই আমাদের রাখাল অবাস্তবের কবুতরের অর্থহীন অপেক্ষা করেনা। দিনের শেষে যখন আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটে ওঠে তখন ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার বাঁশির সুর আকাশ বাতাসে ক্ষণিকের স্বপ্ন আঁকে । কিন্তু সে ক্ষণিক মাত্র … কাল যে তাকে আরও পূর্বে এগিয়ে যেতে হবে, মগ দেশের দিকে, অনেক পথ যে বাকি ………

পাঠকগণ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে রাজকন্যার ছ্যাঁকা ভুলতে রাখাল তার আরেক ছোটবেলার অম্লমধুর বান্ধবী সম্রাজ্ঞী ঐশিকার রাজ্যে যাত্রাকালে কৈশোর কৌতূহল বশতঃ পথীপার্শ্বের সন্ন্যাসী দের ছিলিম হইতে কিঞ্চিত গঞ্জিকা সেবন করিয়া তূরীয়লোকে বিরাজ কচ্ছে এবং “কুহকীনি, মগ , বালতি” ইত্যাদি ভুল বকিতেছে।
পাঠক ঐসব প্রলাপে কর্ণ দিয়া কালক্ষেপণ করবেন না।

কি পাঠক ? আগের ঝটকা টা হজম হয়েছে তো ? কোথায় কিসব কুহকিনী-ফিনি বেশ একখানা রহস্য রহস্য কিছুটা আঁশটে টাইপ একটা ব্যাপারের আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। ওমা ! বেরসিকের মত সব গাঁজার ধোঁয়ায় উড়ে গেল !!!!
একী খিল্লি হচ্ছে নাকি ?
* * *
ধীরে পাঠক ধীরে, উত্তেজিত হবেন না। এই গাঁজার ব্যাপারটা আপনার “গ্যাঁজা” লাগেনি ?
সুকুমারমতি রাখাল যার গালের ঘ্রাণ নিলে এখনও দুধের মৃদু গন্ধের অনুভব হবে, যার মন এখনও পড়ে আছে সেই ছোটবেলার পাতা ঝরার দিন গুলোয়, যে রাখাল প্রেম বলতে শুধু ছোটো বেলার মান অভিমানে গড়া বন্ধুত্বের সম্পর্ক বোঝে তার হাতে কীভাবে এল গাঁজার কলকে ??? এই খটকাটা লাগেনি একবারও?
* * *
হ্যাঁ পাঠক, গোলমালটা আপনার মত রাখালের নিজেরও চোখ এড়ায়নি। গাঁজার রাসায়নিক বিষক্রিয়ার মধ্যেও অন্তরের কোন গোপন কোণ থেকে একটা অস্বস্তি, একটা জেনেও না জানা প্রশ্ন যেন উঠে আসতে চেয়েও কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে । হঠাত মুক্তি পাওয়া কিছু অচেনা অদেখা অনুভূতি যেন শিরার আড়ালে গোপনে ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। এ কেন হল ? কীভাবেই বা হল ? কেনই বা সে তার নিজের গ্রামটি ছেড়ে বেরিয়ে এই অচেনা অরণ্যে এল ? কীভাবেই বা এল ?
প্রশ্নের ভিড়ে শিয়ালকাঁটার মত চিন্তারা যখন জড়িয়ে যাচ্ছে , জট পাকাচ্ছে তার স্বত্বায়, কিছুতেই নিজেকে আলাদা করতে পারছে না এই নেশাতুর বিহ্বলতা থেকে, তখনই একটা অচেনা কিন্তু গভীর অনুভূতিময় নাম রত্নাকরের গহীন ডুবন্ত তল থেকে উঠে আসা রজতশুভ্র বুদবুদের মত উঠে এল তার মননে ……”হেমা”।
আর প্রায় বিদ্যুৎ চমকের মত তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছু দৃশ্যপট। ভীষণ চেনা কিন্তু পূর্বজন্মের স্মৃতির মত, অবিশ্বাস্য।
হ্যাঁ পাঠক, আজ সেই চিত্রকল্পগুলো বুনে চলব ঊর্ণনাভের মত জটিল গঠনে। এ কাহিনী এক অচেনা অনুভূতির …
এ কাহিনী রাখালের বড় হয়ে ওঠার …

বাই দ্য ওয়ে, একটা গোপন খবর দিয়ে রাখি।
রাজ্যাভিষেকের দিন সক্কাল সক্কাল অচীনপুর গ্রামে বিশাল একদল সৈন্য কুচকাওয়াজ করতে করতে হাজির। সটান রাখালের বাড়ির সামনে গিয়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে, লোক জমিয়ে, রাজকন্যার পাঠানো শমন পড়ে শোনালো –
“এত দ্বারা নির্বোধমতি রাখালকে জানানো যাইতেছে যে রাখাল ও রাজকন্যার কৈশোরকালের যে যুগল তৈলচিত্রটি রাখালের ঘরের দেওয়ালে ঝুলন্ত ছিল সেটি রাজকন্যার বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিরিয়াস সমস্যা সৃষ্টি করছে। এরকম উচ্চ সিংহাসনে আবিষ্টা রাজকন্যার অভিজাত নতুন বন্ধুবর্গ যদি কোনভাবে এই চিত্রটি দৃষ্টিগোচর করে ফেলেন তাহলে তো রাজকন্যার মান সম্মান বলে আর কিছু থাকবেই না। অতয়েব যত শীঘ্র সম্ভব ওটিকে স্থানচ্যুত করে ধংস করে ফেলতে আদেশ প্রদান করা হল ”
শুরু হয়ে গেল হই হই রই রই, অবহেলার অফিসিয়াল প্রয়োগ।

 

বোকা রাজকন্যা জানেই না রাখাল আজ অনেক অনেক দূরের কোন দেশে নিরুদ্দেশ। আর যাওয়ার আগে তার সমস্ত ছোটবেলা সে জমা রেখে গেছে লুকোনো কোন পাহাড়ের গুহায় অনন্ত কালের জিম্মেদারীতে, সারা জীবনের খোঁজেও আর কখনও তাকে ছুঁয়ে দেখতে পাবেনা কোন উপায়েই।


কুহক দেশ, রাখালের বড় হয়ে যাওয়ার গল্প

জোর করে কোন অজানা উদ্দেশ্যে রিইনফোর্সড রাসায়নিক নেশাটা কাটিয়ে উঠল রাখাল। হেমা, কেন এই নামটা মনের মধ্যে মিশে যাওয়ায় স্বত্তারা অবাক হচ্ছেনা ? কে এই হেমা ?
মনের বিশৃঙ্খল চিন্তারাজির অস্থিরতায় দিশাহীন রাখাল কোঁচড় থেকে বাঁশিটা টেনে বের করল। কিন্তু এ কি বাঁশির গায়ে এ কি অদ্ভুত রক্তিম অধর লিপি ? ভুলে যাওয়া প্রতিবর্তক্রিয়ার মত স্মৃতির কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা রাখাল সুর তুলল বাঁশিতে। কিন্তু এ সুর যে রাখালের অচেনা, কোথায় তার সেই আনন্দময় ভোরাই বা বিষাদঘন সান্ধ্য মূর্ছনা ? তার ভাঙা বাঁশিতে এমন পূর্ণতার সুর এল কি করে ?
ভাবনা সমুদ্রের গভীর তল স্পর্শ করার বৃথা চেষ্টা না করে রাখাল ডুব দিল সুরলহরীর স্রোতে। আর তার চোখে ভেসে উঠল সেই দিনটি যেদিন গ্রাম ছেড়ে, রাজকন্যার রাজত্ব পেরিয়ে সে এসে পৌঁছল অদ্ভুত এক অরণ্য সমীপে । সন্ধ্যার অন্ধকারে তখন একটি একটি করে তারা ফুটে উঠছে আকাশে। কিছুতেই সেই অরণ্য কোথায় মনে করতে পারছেনা রাখাল, খুঁজে পাচ্ছেনা কোন পথ নির্দেশ …
সে অরণ্যের গাছগুলি যেন অন্য কোন লোকের অপার মায়াবী আলোকে নিজেদের রূপ, রস, গন্ধের ডালি সাজিয়ে পথিককে আহ্বান জানাচ্ছে, “এস পথশ্রমক্লান্ত পথিক, আমার আশ্রয়ে এসে নিজের ক্লান্তি জুড়িয়ে যাও, আমার দেহরস মন্থিত ফলে রসনা তৃপ্তি কর, আমার সৌন্দর্যে শ্রান্ত চোখদুটিকে পুনরুজ্জীবিত কর”। রাখাল অপার বিস্ময়ে এই অপূর্ব সৌন্দর্যকে প্রাণভরে দেখতে লাগল, এমন সময় কোন এক অজানা উৎস থেকে বয়ে আশা বাতাসে ভীষণ চেনা এক গন্ধ তার সমস্ত স্বত্তাকে আবিষ্ট করে ফেলল। এ সুবাস তার খুব চেনা, অনেকটা সাঁঝ প্রদীপ জ্বালবার অবকাশে মায়ের পাটের শাড়ীর আঁচলের মত, অনেকটা সেই সব কুয়াশা মাখা ভোরের মত, অনেকটা রাজকন্যার এলো চুলের পাগল করা ঘ্রাণের মত।
মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে চলল রাখাল। তার অনুভবের অগোচরে পায়ের চাপে গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকল পথের নীচে জমে থাকা অগণিত বাঁশি ধরা হাতের ব্যর্থ ফসিল।
চলতে চলতে রাখাল এসে পৌঁছল সুন্দর এক প্রাসাদের সামনে। স্মৃতির জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা তার চোখ লক্ষ্যও করল না মাথার উপর তারকা খচিত কালচে আকাশ অদৃশ্য হয়ে তার স্থানে আবির্ভাব ঘটেছে শরতের সোনা ঝরা অলৌকিক নীলিমার।
প্রাসাদে প্রবেশ করল রাখাল।
অসম্ভব সুন্দর ভাবে সাজানো কক্ষগুলি অচেনা মায়াবী আলোয় আলোকিত। কক্ষের কোণে কোণে সাজান নিখুঁত মর্মর মানবমূর্তি, ঠিক যেন জীবন্ত। কোন কক্ষে সাজান নাম না জানা দেশী বিদেশী ফল, কোথাও মদিরা, কোথাও বা রাজৈশ্বর্য্য। রাখাল দুচোখ ভরা বিস্ময়ে দেখল সব কিন্তু তার মনের দেওয়ালে কোথাও লেখা হলনা কিছু কারণ তার সমস্ত মনন তখন অধিকার করে রেখেছে নাম না জানা এক গন্ধ, খুব চেনা আবার চেনা নয়ও।
হর্ম্যসোপান বেয়ে দ্বিতলে পৌঁছল রাখাল। এতলের সব কিছুই গাঢ় লাল। চোখ ঝলসে দেয় তার উগ্রতায়। কক্ষের পর কক্ষ পেরিয়ে চলল রাখাল। জনহীন নিশ্চুপ, শুধু সেই অদ্ভুত গন্ধ। হঠাত এক আধোছায়া কক্ষে এসে থমকে দাঁড়াল রাখাল। কক্ষের রূপসজ্জায় হালকা হাওয়ায় মৃদু দুলতে থাকা অর্ধস্বচ্ছ পর্দার আড়ালে ঐ লাল মখমল শয্যায় ফিনফিনে রেশমের সামান্য আবরণে ও কে ?
এ তো রাজকন্যা নয় তবে কেন এর শরীরে সেই একই চেনা সুবাস ? এ তো তার কৈশোরের সাথী, তার একমাত্র প্রেম নয়, তবে কেন এর আয়ত চক্ষু দুটি থেকে চোখ ফেরাতে পারছেনা রাখাল। কেন ঐ নিষিদ্ধতার মত গাঢ় লাল রেশমের দিকে বার বার তাকাতে ইচ্ছে করছে ? এ কোন অজানা অনুভূতির আক্রমণে ভেসে যাচ্ছে রাখালের সমস্ত স্বত্তা ?
“রাখাল তুমি এসেছ ? আমার কাছে এস রাখাল, আমি যে কত দিন ধরে অপেক্ষা করেছি তোমার”
আচ্ছন্নের মত এগিয়ে গেল রাখাল। শয্যাপার্শ্বে উপবিষ্ট রাখালের হাতে মাখন কোমল হাতের স্পর্শ আগুণ ধরিয়ে দিল রাখালের চেতনায় । কয়েক মুহূর্তের আকস্মিক সুনামিতে কোথায় যেন ভেসে গেল রাখালের শৈশব । এক অপ্রতিরোধ্য কৌতূহল আকর্ষণের রূপ নিয়ে জানতে চাইল তার অদেখা পৃথিবীকে, চিনতে চাইল তার অচেনা অনুভবকে। রাখাল হারিয়ে গেল, তলিয়ে গেল এক নতুন অনুভূতির চোরা স্রোতে। পথের নীচে চাপাপড়া, ঘরের কোণের ফসিলরা তারস্বরে জয়ধ্বনি দিতে লাগল । প্রতিবিষের দহনের মত হঠাত জ্বলে ওঠা দাবানলে ছাই হয়ে গেল রাজকন্যার অস্তিত্ব । উড়ে গেল দক্ষিণা বাতাসে।
নিদাঘের ছাতিফাটা তৃষ্ণায় কপিত্থ সুবাসিত তক্রের মত মধুর অনুভূতির গহীন থেকে হঠাত জেগে উঠল রাখাল। তার নিরাবরণ শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে জেগে উঠল উইথড্রলের খিঁচুনি। কতকাল কেটে গেছে খেউরি তে মনে করতে পারল না রাখাল।
না স্বপ্ন নয় কারণ চোখের সামনে এখনও যে সেই মোহময়ী দুটি চোখ। কিছুটা কৌতূহলী কিছুটা আশঙ্কিত, এক দৃষ্টে কিসের সন্ধানে রাখালের মুখে নিবদ্ধ ? শৈশবের ছেড়ে যাওয়া কক্ষের দখল নেওয়া পরিপক্ব উপলব্ধিরা রাখালের মস্তিষ্কে ক্যালকুলেটেড বোধ কে সম্যক করে ফুটিয়ে তুলল তার চোখের তারায়। মুখ ফিরিয়ে নিল রাখাল।
প্রচণ্ড ক্রোধ আর অস্তিত্বের টানে কামনালাল ওষ্ঠের দুই ধার হতে বেরিয়ে আসা সুতীক্ষ্ণ দুটি দাঁত তার উদ্দাম আক্রমণে রাখালের শরীর ভেদ করে তাজা রক্তস্রোতে পৌঁছে থমকে গেল ঘটনার আকস্মিক উপলব্ধিতে। রাখালের রুধির জুড়ে এ কোন অপূর্ব স্বাদ! এ তো ঘৃণা নয়, লালসা নয়, এ যে গভীর অনুকম্পা। এ স্বাদ
তো আগে কখনও তার সমস্ত মননকে এভাবে ধিক্কার দেয়নি। মোহময়ী জ্বলন্ত অক্ষিপটে এমন শান্তির বর্ষা নামায়নি। তার সমস্ত হৃদয়কে এমন ভাবে ভালবাসার স্রোতে উত্তাল করে তোলেনি। কিন্তু না, এখন থাক … এখনও যে সময় আসেনি …
না, হেমা নামের কুহকিনী এখন তার স্বরূপ জানতে দেবেনা রাখালকে, কিছুতেই দুর্বল হয়ে পড়বেনা সে, বুঝতে দেবেনা রাখালের অন্তরে সঞ্চিত গভীর প্রেমের মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছে তার সত্যিকারের ভালবাসা, মুক্তির মন্ত্র । অলৌকিক মন্ত্রে ভুলিয়ে দেবে কুহক দেশের স্মৃতি। অভিমানী রাখালকে এগিয়ে যেতে দেবে তার নিরুদ্দেশ যাত্রায়, নিজেকে আবিষ্কারের যাত্রায় ।
ত্রিকালজ্ঞা হেমা জানে মহাকালের অমোঘ নিয়মে একদিন ফিরবে রাখাল, স্রষ্টার অপর স্বত্তার প্রকাশ রূপে। সেই রুদ্রের স্পর্শেই শাপমুক্তি তার। যেদিন সাধিকা তার কামনাময়ী দুঃসহ আগুণের রূপের খোলস ছেড়ে ফিরে পাবে তার তুষারের মত শান্তির তপঃক্লিষ্ট রূপ। সেই শুভক্ষণটির পথ চেয়ে আজ থেকে সে জন্ম দেবে নতুন নতুন লহরীর, বাল্মিকি কিম্বা প্রতিভার গল্প শুনিয়ে …… আর অপেক্ষা করবে … তার সত্যিকারের ভালবাসার, … পরিপূর্ণতার

কি ? বন্ধুরা সব রাখালকে ভুলে গেলেন নাকি ? সেই যে সেই অভিমানী ছেলেটা … যে তার অতীতের অবহেলার আত্মগ্লানি আর ব্যবহৃত উচ্ছিষ্টের মত পরিত্যক্ত হওয়ার ক্ষত বুকে নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল নিরুদ্দেশের যাত্রী হয়ে …জানেন সে আজ কোথায় ???
নাঃ আজ আর সে কোন রাজকন্যা বা কুহকিনীর নিষ্ফলা খোঁজে ঘুরবেনা দেশ থেকে দেশান্তর, অপেক্ষা করবেনা সাক্ষিবটের তলায় যুগ যুগান্ত পেরিয়ে … অবদমিত হীনমন্যতা আর ক্ষোভে ক্লীশে হয়ে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে না কম্প্রোমাইস আর নিজের সত্ত্বার রিমেকে …

আজ সে এক অন্য নেশায় মদির, জীবনকে ভালবাসার মন্ত্র শিখে। আজ তার গায়ে রেশমি চুলের ফুলেল তেলের গন্ধ ম ম করে। আজ তার বাঁশি মন ভাঙা বিষাদের সুর নয়, গায় পূর্ণতার গান ।

আজ কোন নাম না জানা গাঁয়ের শ্যাওলা ধরা নির্জন ঘাটের ধারে পাথরের আড়ালে চলে লুকোচুরি খেলা আর কিছু মুঠো আলগা হওয়া আদরেরা ঝরে পড়ে এদিক ওদিক …

সেই অচেনা গ্রাম থেকেই প্রবল দিকশূণ্য ঝড়ে উড়ে এসেছে একটা চেনা চিঠি …… রাখাল তার রাখালনীকে খুঁজে পেয়েছে

 

১০

এক টুকরো ছবি, চিঠির শুকনো হলদেটে পাতাটা থেকে চিত্রকল্পের হাত ধরে উঠে বসে, জগতকে শুনিয়ে যায় কিছু না জানা কথা । অতি সাধারণ দুটো মানুষ আর তাদের মিষ্টি একটুকরো প্রেমের গল্প।
ধানসিঁড়ির বালি চকচকে পাড়ে রাখালনি হয়ত তার খাটো করে পরা শাড়ির বাইরে উঁকি দেওয়া রোদ আর ধুলোমাখা শামলা পা দুটো অল্প অল্প জলে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আর রাখাল তার কোলে মাথা রেখে আনমনে এক হাত জলের ওপর বোলাচ্ছে। কখনও হয়তো ইচ্ছাবশতই সেই জল স্পর্শ করে যাচ্ছে রাখালনীর পায়ের নরম পাতা আর অবাধ্য বুড়ো আঙ্গুল তার ছন্দমদিরা তে অবশ। তখনই সরল রাখালনীর মেঠো হাসির ঝংকারে রাখালের সব সত্তারা আচ্ছন্ন।
রাখালনীর হাতে একটা ছোট্ট বুনো ঘাস ফুল। রাখালের কপালে সে ছুঁয়ে দিল আলতো করে। রাখাল ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে, কিন্তু রাখালনী যে তাকে দেবে না ঘুমোতে।
তারপর এক মিষ্টি বন্য হাওয়া, রাখালনীর রেশম চুলের আলগোছ হাত- খোঁপা মুহূর্তে এলোমেলো। আর রাখালের মুখের ওপর ঝরে পড়ল রেশম কোমল বন্যা। হঠাৎ অপ্রস্তুত রাখালনীর তার অবিন্যস্ত চুলের ভেতর দিয়ে একটা ভেজা মাটির গন্ধ নাকে এলো, তারপর ঝরল বৃষ্টি তার ঠোঁটে। সে খুব মুষল ধারে বৃষ্টি; ধানসিঁড়ির জলে তার প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি আর রাখালনীর শরীর জুড়ে তার উদ্ধত বিচরণ। তারপর রাখাল আর তার রাখালনী হারিয়ে গেল, একসাথে অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে গেল ধানের শিষের ওপর এক বৃষ্টি ফোঁটার আড়ালে।

১১

অচিন গাঁয়ের লোকগুলো না, কীইই রকম … যেন। বাঁকা চোখে যখন তখন নির্বাক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সংক্রামক অস্বস্তি আর সন্দেহের আরকে ডুবিয়ে। অবচেতনের চাওয়া আর না পাওয়াদের ভিড়ের স্রোতে, স্মৃতির পদধ্বনির কায়াহীন কুয়াশার ভয়ে রঙ পাল্টায় ড্যাবড্যাবে চোখের নজরদারীতে।

দেখছিস হাওয়াটা পোড়া লোহার মত আসতে যেতে শরীরের ভিতর অব্দী ছ্যাঁকা দিয়ে যাচ্ছে। রক্তরঙা পলাশের চোখ ধাঁধানো রূপের আগুণ সে নয়। এই তপ্ত জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় প্রহরে উল্টোমুখ উনুনের মত লেলিহান অদৃশ্য শিখায় সমস্ত চরাচরের অন্তরস্থ রস যেন কোন অদৃশ্য পথে প্রতিসরণ সৃষ্টির কম্পিত পদচিহ্ন ফেলতে ফেলতে অন্তর্হিত হচ্ছে, শোষিত হচ্ছে মহাশূন্যের বুকফাটা তৃষ্ণা নিবারণের নিষ্ফল প্রচেষ্টায় । এই পরিত্রাণহীন দহন থেকে মানুষ একটু জুড়োতে চাইবেনা, একটু ছায়া ঘেরা অর্ধবাস্তবের দেশে পালাতে চাইবেনা বল ?
তোরা বলিস, এসব অজুহাত। নইলে এই মাটি চিড় খাওয়া রোদ ঝলসানো নিদাঘের মেঠো পথে কি করে এরা দুটোয় একে অন্যের কোলে মাথা রেখে নদীর দুকুল ভাসানো স্রোতের ঠাণ্ডা আমেজ মেখে নেয় ? কি করেই বা রাখাল রাখালনীর আর রাখালনী রাখালের বুকে মুখ ডুবিয়ে বরফের শীতলতা, স্নিগ্ধতা অনুভব করে সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে ?
জানি এই অবুঝ প্রশ্নের অকাট্য উত্তর মেলেনা ফ্রয়েড কিম্বা বিশ্বকোষে, যেমন মেলেনা হিমশীতল বরফকন্দরে রাখাল রাখালনীর কালাতীত আলিঙ্গনের অফুরান উষ্ণতার রহস্যের সমাধান। শুধু দুটো প্রাণ তোদের দমবন্ধ করা আগ্রাসন থেকে বাঁচতে চায় আর পালিয়ে যায় আদিম বৃক্ষের আড়াল দেওয়া অরণ্যে
আলফা আলফা ঝোপ ঢাকা একটু গোপনীয়তার স্তেপে …… শুধু একটু সিক্ততার লোভে …

“আয় অতলান্ত প্রেমে ডুবিয়ে দিই,
ভিজিয়ে দিই, প্রেমহীন শহরটার
প্রাণহীন উন্নাসিক স্কাইস্ক্র্যাপারদের …”

১২
একটু পিছনো যাক

বহু দিগদিগন্ত ঘুরে; উত্তরের পর্বতমালা থেকে দক্ষিণের সাগরপার পেরিয়ে; পাহাড়িয়া , বন্য কিম্বা নোনা হাওয়ার কান্না সমস্ত তার বাঁশি তে জমিয়ে রাখাল তখন পরিশ্রান্ত। আর চাইনা তার রাজকুমারী, চায়না সে কোন কুহকিনীর মায়াজালে বন্দী পতঙ্গ হয়ে বাকি জীবন অর্ধমৃত হয়ে থাকতে । সে শুধু হেঁটে চলবে জন্ম-জন্মান্তরের আলপথ বেয়ে, নিজের ছায়াসঙ্গী হয়ে; সমস্ত চোখের জল তার বাঁশির মধ্যে দিয়ে বাতাসে মিশিয়ে দেওয়া হবে তার কাজ।
চলতে চলতে রাখাল শুনল প্রকৃতির অনেক গোপন কথা , জানল তাহার সকল ব্যথা।
তেপান্তরের মাঠের সেই সর্বজ্ঞ বৃদ্ধ, যার বয়সের হিসেব নেই রাখালের আয়ত্তে, তার কাছে শিখল অমরত্বের মন্ত্র।
বা সেই নদীর পারের ব্যঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী? জানলো দেশ-বিদেশের কতসব রহস্য। পাঠশালের পুঁথিতে যার খোঁজ নেই।

আর সেই লালমাটির দেশের চু-কিতকিত খেলা উলঙ্গ শিশু দের প্রাণোচ্ছল হাসি শুনে ভাবলো কতটা স্বার্থপর তার পার্থিব চাহিদা গুলো।
এত জেনেও, এত শিখেও রাখালের একটাই দীর্ঘশ্বাস।
সে বাঁশি তে এত রঙিন সুর বাজায়, এত দিকে দিকে তার সমাদর; তবু কোথায় যেন একটা কিসের অভাব। সারারাত জেগে করুণ সুরবিন্দু যখন ঝরে ঝরে পরে তার বাঁশি বেয়ে, কেউ পাশে থাকেনা তার চোখের জলের আলপনা আঁকতে। কোন আলতো স্পর্শ রাখালের মনের নীল বন্দরে নুড়ি বিছিয়ে প্রতীক্ষা করে না তার স্বপ্নালু প্রত্যাবর্তনের।
রাখাল জানে এ মরুতে বাঁচার মত জল নেই রাজকুমারীর চোখ-ঝলসানো রূপে বা হেমার মোহময়ী কামাতুর আহ্বানে। তাই আর সে ফিরে যাবে না সেসবখানে। সে জানে তার অভাব টা হয়তো খুব অমূলক, কারণ সে যে একটু আলাদা আর পাঁচজনের চেয়ে।
তাই থাকল সে বসে, ফিরতে লাগলো বাঁশি বাজিয়ে ।

সে রাত্রে ভীষণ ঝড় উঠেছিল, একাকী রাখালনীর কুটিরকোণের আলো ততক্ষণে নিভে গেছে। মা হারানো হরিণ শাবকের মত ভীত-চকিত সে অন্ধকারপানে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আয়তনেত্রে। বাইরে তখন প্রলয়, রাখালনীর বুকের ভেতরেও অস্তিত্বের সমুদ্রমন্থন। কাল এমনই এক দুর্যোগরাতে তার ভিনদেশী সওদাগর, তার প্রেমিক, তাকে ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে চেনা হাতছানির টানে।

যাক যাক যাক ভেসে সৃষ্টি। আসুক আজ বন্যা। ঘুমিয়ে পড়ুক রাখালনী, চিরতরের মত আচ্ছন্ন হয়ে যাক মায়া ঘুমে। যে ঘুম ভাঙবে না কোন জাদুকাঠির ছোঁয়ায়।
সে যে সামান্য রাখালনী। রাজা-রাজরা ,সওদাগরের স্বপ্ন দেখা কি তার সাজে?
তবু যেন কোথায় একটা খামতি। সওদাগর কে সে মন দিয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই নিজের সীমা-পরিসীমা উত্তীর্ণ করা সেই মাতাল ভালোবাসা? যার গল্প শুনেছে সে নদীর ঢেউয়ের কাছে, সেটা আস্বাদন করা হয়ে ওঠেনি রাখালনীর।
সব প্রেমের এক্সপায়রি ডেট থাকে যেমন, তার প্রেম ও নিভে যাবে অচিরেই , জানে সে। আগুন নিভে যাবে, কিন্তু পোড়া দাগ টা জ্বলবে অনেকদিন আরও।
সে প্রেমে পড়েছিল, কাল অবধি সে প্রেমকে ভালোবাসা ভাবার ছেলেমানুষি টুকু করেছিল।
আজ এই উত্তাল প্রলয়ের রাতের দুর্ভেদ্য ঘন নীলে রাখালনী মেলল তার চোখ।
তার কেবল একটাই দীর্ঘশ্বাস। কোথাও সে তার মনের মানুষ পেলে না।
একটা মানুষ যার সাথে দিনের বেলা নদীর পাড়ে কলমি লতার আদরে সে ডানা মেলার স্বপ্ন দেখবে; কালো মেঘ যখন কাজল পরবে তার গভীর চোখের ছায়ায় সে মানুষ তেষ্টা মেটাবে; তার কোঁচড় ভরা শুকনো বকুল যখন বেখেয়ালে ছড়িয়ে পরবে প্রাঙ্গনময়, সেই মানুষ টা তখন ঝরা বকুলের গন্ধ মেখে তাকে গান শোনাবে, গোধূলির তানে।
কিন্তু নেই যে কেউ । সে জানে। তার এই অদ্ভুতুড়ে চাওয়া গুলোকে প্রশ্রয় দেওয়ার মত অবিবেচক কেউ নেই , সে নিশ্চিত। তাই সে মালা গাঁথে রোজ, তার ছেঁড়া ছেঁড়া না পাওয়া গুলো কে জমিয়ে।
কোথায় যে বাঁশির সুরের ফ্রিকোয়েন্সি আর জমানো অপূর্ণতার ভাটিয়ালি গান রেসোনান্স সৃষ্টি করছিল বিধাতাও বোধহয় দ্বন্দ্বে ছিলেন তা নিয়ে।

১৩
“কেমন বাঁশি বাজায় শোনো মাঠেতে রাখাল”

দিকশূন্যপুরের এক কোণে তার ভাঙা হৃদয় আর আধপোড়া ভালোবাসাকে সম্বল করে থাকতো এক রাখালনী। তার না ছিল রূপ, না ছিল রস, না ছিল গন্ধ। কিংবা হয়তো সেগুলোর এসেন্স পাওয়ার লোক ছিল না তার জীবনে। রাখালনী থাকত একা, বিরহজ্বালার বহ্নি-শিখায় নিজের ইন্দ্রিয়দের জ্বলতে দিয়ে। ওরাই তার সন্ধ্যাপ্রদীপ, ওরাই তার শীতের ওম।
শীতের ছেঁড়া ছেঁড়া অপরাহ্ণের সেই কমলা-হলদে কান্না গুলো কে জমিয়ে নিয়ে রাখালনী মালা গাঁথত। আর সারারাত সেই মালা গলায় পরে নদীর পাড়ে ছিল তার অন্ধকার অপেক্ষা, যদি কোনদিন ফের পথভ্রান্ত হয়ে ফিরে আসে সেই ভিনদেশী সওদাগর।
সেই কতকাল আগে এক শিশির-শুকনো অপ্রস্তুত শরতের কামরাঙা রঙের ভোরে, সরল গ্রাম্য বালিকা এক রাখালনীর দরজায় আশ্রয় চেয়েছিল এক দিগভ্রান্ত ভিনদেশী। পথ হারানোর ক্লান্ত দেহভারে অবশ মন নিয়ে সে শরণ নিয়েছিল রাখালনীর। জল, সামান্য ভোজ্য, অকুণ্ঠিত সেবা, মুঠো ভরা স্নেহ, চোখ ভরা নির্মল ভালোবাসা আর অবশেষে তার পূর্ণযৌবনা শরীর নিয়ে মগ্ন হয়েছিল সওদাগর।
সে গল্প বলতে আসিনি।
স্বপ্নের হ্যালুসিনেটিং নেশার ঘোরে তাকে বন্দিনী রেখে একদিন সওদাগর পালালো তার আপন সংসারের টানে। আর রাখালনীর হল এই জীবন্ত মরণদশা।
শীত গেল। বসন্ত এল; গ্রামের চারিদিকে লাগল ফুল ফাগ আর প্রেমের আগুন। রাখালনীর ঘরটা গ্রামের একপ্রান্তে, তাই নদীর ধারের অবৈধ আগাছার আড়ালে জ্বলন্ত প্রেমানলের সাক্ষী থাকে সে, কেমন যেন নিষ্প্রভ, নিস্তেজ ভাবে। তার শুধু আছে রোজ একখানি কান্নার মালা আর অনন্ত অপেক্ষা।
একদিন সেরকম সারারাত স্থিরচিত্তে অপেক্ষার উদ্দেশ্য আর হাতে সেই অশ্রুমালা নিয়ে রাখালনী বেরোল তার একাকী নৈশ অভিসারে।
হঠাৎ, চমকে থমকে দাঁড়ালো তার সমস্ত সত্তারা কয়েক ক্ষণের জন্যে, তার আলতো পদশব্দকে ঢেকে দিল কোন সুদূর অতীত বা ভবিষ্যৎ থেকে ভেসে আসা এক অদ্ভুত মোহময় বাঁশির সুর। এই নির্জন প্রান্তে, এই গ্রীষ্ম-নির্বাক নদীর ধারে কোথা হতে আসতে পারে এমন মায়া মায়া বাঁশির সুর? কে বাজায় এমন সুর যা রাখালনীর হৃদয়ের তন্ত্রীতে গিয়ে প্রতিফলিত হয়? যা তার গায়ে এক অপূর্ব স্বর্গীয় শিহরণ জাগাতে পারে? কি যে হল রাখালনীর! সে হাতের মালা ফেলে , এলোচুল উন্মুক্ত করে ওই প্রান্তরেই মায়া ঘুমে আছন্ন হয়ে পড়ল অচিরেই।
পরদিন রাতেও এক কাণ্ড।
তার পরদিনও।
তার তার পরদিনও।
রাখালনীর আর নদীর ধারে যাওয়া হয়না, মালা গুলো আপনমনেই শুকিয়ে যায় তার গলায়। রোজই সেই বাঁশি তাকে মায়া ঘুম পাড়ায়।
আজ রাখালনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যাবেই সে আজ সেই বংশীবাদকের খোঁজে।
সারাদিন ধরে অনেক অনেক অশ্রু দিয়ে রাখালনী আজ এক বড় মালা গাঁথল। বড় মন কেমন করা গন্ধ তার। বাঁশির সুর খুঁজতে গেলে তার যে এটাই চাই।
বেরোল সে রাতে স্বপ্নসঞ্চারিনী।
বাঁশির সুরে তার দেহমন অবশ হয়ে আসতে লাগল এক অনির্বচনীয় প্রশান্তিতে। কিন্তু তবুও সে এগিয়ে গেল।
গ্রামের আরেকপ্রান্তে নামহীন পাহাড়। গিরিকন্দর লক্ষ্য করে রাখালনী এগিয়ে চলল। যত কাছে আসে তত যেন তার চেতনা অবসন্ন হয়ে আসে। আবার তার মালায় মুখ ডুবিয়ে তার বাস্তবে পুনঃ-পদার্পণ।
একী? এক ছোট পাহাড়ি গুহায়, আপনমনে বাঁশি বাজাতে নিমগ্ন এক ছেলে। বেশভূষা দেখে মনে হয় কোন রাখাল। তার বন্ধ চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার তলিয়ে গেল রাখালনী।
কত এলোমেলো স্বপ্নেরা কাঁচবন্দী রঙিন মাছের মত খেলা করে গেল রাখালনীর অবচেতনে।
ঘুম ভাঙল এক মিষ্টি গন্ধ মাখা ভোরে, এক অচেনা তবু বহুযুগের চেনা কণ্ঠস্বরে। রাখালনী উঠে বসল, ঘুম জড়ানো চোখে দেখল তার গলার মালা আজ শুকায়নি।
বংশীবাদক কিছু বলে ওঠার আগেই রাখালনী বলে বসল, “রাখাল, তুমি এতদিন পরে কেন এলে?”
ক্ষণিকের চমকে ওঠা পেরিয়ে রাখাল বলে ওঠে, “তোমার সবটাকে যে নইলে পেতুম না রাখালনী।“
কিভাবে যেন কখন রাখালনীর মালা উঠল রাখালের গলায়, ওরাও জানল না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s