KURU-ক্ষেত্র

– ডাক্তার সাহেব আসব ?
 
– আসুন, বসুন ওখানে, বলুন কি সমস্যা ?
 
– কেমন আছেন ডাক্তারবাবু ? আমায় চিনতে পারছেন ?
 
– অ্যাঁ কে ? না ঠিক,… আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি রমেন না ? একি হাল হয়েছে তোমার !!!
 
– হ্যাঁ ডাক্তারসাহেব, আমি রমেন।
 
– My God !!!
 
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ধপ করে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন ডাক্তার রায়। মনে পড়ে গেল বেশ কয়েকটা বছর আগের কথা।
 
তিনি তখন মাসে চার বার করে বসতেন ট্রপিকাল মেডিসিনে। প্রচুর ভীড় হত পেশেন্টের। তাঁর অনন্য রোগনির্ণয় প্রতিভা, সিমট্যমের আভাসমাত্র পেয়ে রোগের চরিত্র নিমেষে আঁচ করে নেওয়ার ক্ষমতা তখনই তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল। সেই সময়েই একদিন ট্রপিকালের নার্স তুলসীর অনুরোধে তাদের পাড়ার ছেলে রমেনকে তাঁর পার্সোনাল চেম্বারে কিছুক্ষণ টাইম দিয়েছিলেন।
 
ঘাড়ে গর্দানে বিশাল চেহারার রমেন যখন তাঁর চেম্বারে ঢুকেছিল তখনই ডাক্তার রায় বুঝেছিলেন, একে সারানোর ক্ষমতা তাঁর নেই, ওবেসিটির কেস ট্রিটমেন্ট করা ভীষণ কঠিন, কারণ এতে ওষুধের চেয়েও বেশী জরুরী নিয়ন্ত্রিত জীবন, যেটা সম্পুর্ণ ভাবেই পেশেন্টের উপর নির্ভরশীল।
 
ডাক্তার রায় চিরদিনই স্পষ্ট কথার মানুষ, সোজা বলে দিয়েছিলেন যে ওষুধ দিতে তিনি পারবেন না।
রমেন সেদিন খুব অনুনয় করেছিল, কান্নাকাটি ও করেছিল। বলেছিল ওর বেকারত্বের কথা, এত মোটা বলে কেউ কাজ দেয় না। বলেছিল, একটা মেয়েকে খুব ভালবাসত ও, বলেওছিল তাকে, কিন্তু “বেকার, হাতির মত মোটা কুমড়োপটাশের কি যোগ্যতা আছে ?” প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে মাথা হেঁট করে চলে এসেছে ।
কিন্তু তাতে ডাক্তার রায়ের উত্তরটা পাল্টায় নি। অবশ্য তিনি ভাল করে বুঝিয়ে বলেছিলেন বাইরের তেলেভাজা খাবার না খাওয়ার কথা, নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, শরীরচর্চার কথা … তবে ওর ভাবভঙ্গী দেখে বুঝেছিলেন যে ভস্মে ঘী ঢালা হচ্ছে ।
 
আজ এত বছর পর সেই রমেন ! সেই বিশাল চেহারার বদলে কঙ্কালসার একটা মানুষ, টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, চলতে গেলে হাত কাঁপছে ! যেন দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর থেকে উঠে আসা, বহু দিন না খেতে পাওয়া একটা মানুষ !
 
কিন্তু সেদিনের ফুটো গেঞ্জী আর রংচটা প্যান্ট পরা রমেনের গায়ে আজ ব্র্যান্ডেড চকচকে পোশাক, হাতে দামী ঘড়ি। তাই আর যাই হোক খেতে না পেয়ে এই হাল এটা ভাবতে পারছেন না ডাক্তার রায়। তবে ???
 
– কি কর আজকাল ? কোথায় থাক ?
 
– বোম্বাই তে ডাক্তারবাবু , ওখানের ঐ মহাবলজী হসপিটাল আছে না ? ওর পাশে একটা সিনেমা হল আছে, রকি সিনেমা।
 
– হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি, ঐ তো হাসপাতালের মর্গটা, তার পেছন দিক টায় যে রাস্তাটা আছে ওর opposite এ তো ? ওখানে গেছি বেশ কয়েক বার। তো ওখানে থাক তুমি ?
 
– হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, ওখানে রেহানিয়া রেস্টুরেন্টে কাজ করি আমি। আগে ডিশ ওয়াশার ছিলাম, এখন সার্ভিং করি। সেই যে আপনার কাছে এসেছিলাম, তার মাস খানেক বাদেই কাজ খুঁজতে বোম্বে তে চলে গিয়েছিলাম, তখনই ওখানে কাজে ঢুকি। ভাল মাইনে দেয় আর মালিক আমাদের খুব ভালবাসে তাই ওখানেই রয়ে গেছি। হিঃ হিঃ হিঃ
 
ডাক্তার রায় অপলকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন রমেনের দিকে, মাঝে মাঝেই অকারণে হেসে উঠছে সে, হয়ত না বুঝেই হাসছে, ওর চোখ যেন কেমন মরা মাছের মত, যেন সব কিছুতেই মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছে …
 
– তা আজকাল কি খাওয়া দাওয়া একদম বন্ধ করে দিয়েছ নাকি ? শরীরের এই হাল বানালে কি করে ?
 
– না না ডাক্তারবাবু, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করব কেন, আমাদের জন্য মালিক ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যে শিফটে ডিউটি থাকবে সে শিফটে তো বটেই অন্য শিফটেও আমাদের যা ইচ্ছা আমরা খেতে পারি ফ্রি তে। আমাদের রেস্টুরেন্টে মাংসের চপ, রেজালা, আটু মুলাই মানে মুড়ীঘন্ট এসব খুব বিখ্যাত। প্রচুর কাস্টমার আসে প্রতিদিন। তাই আমি বেশীরভাগ দিন দু বেলাই নান নয়ত পরোটার সঙ্গে রেজালা নয়ত আটু মুলাই খাই। অবশ্য আটু মুলাই টা ই আমার বেশী প্রিয়। তাও তো আজকাল বেশী খেতে পারি না … আগে রাত্রে ৮ -১০ পিস পরোটা আর দু তিন প্লেট মাংস খেয়ে ফেলতাম।
 
– তা রেস্টুরেন্টে তো প্রায় সব জায়গাতেই হাইজিনের কোন বালাই থাকে না। নিশ্চই ক্রনিক পেটের রোগ বাধিয়েছ ?
 
– না না ডাক্তারবাবু, আমাদের কিচেন খুব পরিষ্কার। শাক-সব্জী সব টাটকা দেখে বাজার থেকে আসে। মাংস , মাছ সব প্যাকেট করে আসে, সব প্রসেস করা দামী কোম্পানির মাল। আর সত্যি বলতে কি এই কবছরে দু একবার বাদ দিলে সেরকম পেট খারাপ কখনও হয়নি। শুধু এই দুর্বলতাটা, নিঃশ্বাস নিতে মাঝে মাঝে বড্ড কষ্ট হয় … ডাক্তারবাবু একটু দেখুন না, সবাই বলে আপনি ধন্বন্তরি, আমায় একটু ওষুধ দিন না …
 
– আচ্ছা বেশ, এই ওষুধটা লিখে দিচ্ছি, খাও দুবেলা খাবার পরে একটা করে, আর শোন এখন কদিন বাড়িতে রেস্ট নাও, একটু ঠিক হলে বোম্বে যাবে না হয় …
 
এই প্রথম ডাক্তার রায় স্পষ্ট কথার বদলে মিথ্যে বললেন। তিনি জানেন তাঁর লিখে দেওয়া দিনে দুটো করে প্যারাসিটামল কেন, কোন ওষুধই আর সারিয়ে তুলতে পারবে না রমেন কে। রোগটা এখন স্পষ্ট তাঁর কাছে। KURU বা স্পঞ্জিফর্মে আক্রান্ত রমেন কে তাও মিথ্যেই দিলেন ওষুধটা। কারণ আরও বড় একটা রোগের সন্ধান যে তিনি পেয়েছেন, যেটা এখনই সমূলে উপড়ে না ফেললে যে বড্ড দেরী হয়ে যাবে।
 
– ঠিক আছে রমেন, ওষুধটা খাও, আমাকে একটু বেরোতে হবে এখন…
 
– আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আজ তবে উঠি। নমস্কার।
 
রমেন বেরিয়ে গেল, ডাক্তার রায় ও তাঁর গাড়িটা নিয়ে বের হলেন। খুব তাড়াতাড়ি তাঁকে একটা টেলিগ্রাম করতে হবে বোম্বের মহাবলজীনগর পুলিশ স্টেশনে – “রেহানিয়া রেস্টুরেন্টে মানুষের মাংস বিক্রি হয় …”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s