বোধন

“জাতির জনক, মহাত্মা গান্ধী সবসময় নিজের জীবনে মিতব্যয়ীতা ও পরিচ্ছন্নতাকে জোড় দিতেন, তিনি মনে করতেন, পরিচ্ছন্নতাই হল পূজার অন্যরূপ। এই প্রকৃতি আমাদের মাতৃস্বরূপা, তাই একে নির্মল, জঞ্জালমুক্ত রাখা আমাদের সবার কর্তব্য। তাই বন্ধুগণ আমাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে গেলে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোড় দিতে হবে। ফ্যাক্টরির প্রতিটি শেড পরিষ্কার ও সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে হবে, তবেই আমরা আমাদের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পালন করব। এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি, জয় হিন্দ।”
 
অবিন্যস্ত হাততালিতে মাহুর্তিক মুখরতা মেখে থাকল গিয়ার ফ্যাক্টরির অক্টোবরের দ্বিতীয় সকালটা।
 
মনোজ সেন পকেট থেকে একটা বেনসন এন্ড হেজেসের প্যাকেট বার করলেন, একটাই সিগারেট রয়ে গেছে ভিতরে। ঝটাপট ঠোঁটের ফাঁকে ব্যালেন্স করে লাইটার জ্বালিয়ে অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় খালি প্যাকেট টা ছুঁড়ে ফেললেন পাশের ঝোপে। দুটো টান মেরেই কাঁচ ঘেরা অফিস রুমটায় ঢুকে কাজে লেগে গেলেন দেরী না করে। আজ একটু বেলাবেলি বেরিয়ে পড়বেন ফ্যাক্টরি থেকে, মণিকাকে নিয়ে মলে যেতে হবে, পূজো তো আর মাত্র কটা দিন।
 
বেলা-বেলি বেড়িয়ে পড়লেও বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে সেই, সাড়ে চারটে হয়ে গেল, যা জ্যাম রাস্তায়, যত প্যান্ডেল বাড়ছে – ক্রাউড ও তত পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, ইস মণিকা নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ রেডি হয়ে ওয়েট করছে। আরে সামনের মোড়ে ওটা শুভ্র না !!! কি করছে ও ওখানে ? অবশ্য এখন তো ওর স্কুল থেকে ফেরারই সময়, বাসটা বোধহয় ড্রপ করে দিয়ে গেল। সুরযকে ওর কাছে গাড়িটা থামাতে বলে সিটের ডানপাশে চেপে বসলেন মনোজ।
 
একটা তেঢ্যাঙা মার্কা গাছ, কোন বাহারি গাছ হবে হয়ত, একটু শুকনো শুকনো, টবেই ছিল হয়ত এতদিন, এখন আর নেই, বোঝাই যাচ্ছে কারুর বাড়িতে ছিল, স্থান সংকুলান না হওয়ায় রাস্তার পাশে রেখে দিয়ে চলে গেছে। শুভ্র এক মনে তার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছে।
 
গাড়ির দরজাটা খুলে ডাকতেই বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল শুভ্র। “কি করছিলি বাবা এখানে ? স্কুল কখন ছুটি হল ?” প্রত্যাশিত ভাবেই শুভ্র নিরুত্তর রইল, ও একটু এরকমই চাপা ধরনের তাই মনোজ ও আর ওকে না ঘাঁটিয়ে মোবাইলের মেলবক্সে মন দিলেন।
 
 
দিনকয়েক ধরেই স্কুল থেকে বাড়ি আসতে একটু দেরী হচ্ছে শুভ্রর। মণিকা চুপিচুপি ফলো করে দেখেছে ওকে, ঐ গাছটার সামনে আজকাল শুভ্র বেশ কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে, কি যেন বিড়বিড় করে, যেন গল্প করছে গাছটার সাথে। মণিকা ভয় পাচ্ছে, মনোজকে বলেছে কিন্তু শুভ্র এতটাই চুপচাপ যে ওকে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও খুব একটা সাহস হয়না ওদের দুজনের।
 
 
সোমবার টা ছুটি আছে মনোজের। তাই একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠলেন মনোজ, শুভ্র সেই সক্কালবেলা উঠে টিউশন এ চলে গেছে। একটু ফ্রেশ হয়ে মনোজ আজ অফিসারস ক্লাবে যাবেন একটু, অনেকদিন খেলা হয় না। সূরয কে গাড়িটা বের করতে বললেন।
 
একি সেই গাছটার সামনে ওটা শুভ্র না !! টিউশন থেকে ফেরার পথেও ও এখানে দাঁড়িয়ে !! সূরযকে গাড়িটা থামাতে বলে গাড়ি থেকে নেমে নিশ্চুপে শুভ্রর দিকে হেঁটে গেলেন মনোজ।
 
শুভ্র নিজের মনেই কি সব যেন বলে চলেছে, কোন দিকে মন নেই, যেন নিজের মধ্যে নিজেই তন্ময়। আরেকটু এগিয়ে গেলেন মনোজ।
 
“ঠাম্মা জান, তোমার মত করে আর কেউ জিজ্ঞেস করে না সারাদিন স্কুলে কি কি হল, আমার পিঠে পরশুদিন অনেকটা কেটে গেছে বেঞ্চে লেগে, কেউ জানেই না, কারুর চোখেই পড়েনি। তুমি কেমন আছ ঠাম্মা ? আচ্ছা ঠাম্মা তোমার কি শরীর খারাপ ? পাতাগুলো হলুদ হয়ে যাচ্ছে কেন ? তোমার কি জল তেষ্টা পেয়েছে ??? সেই সেবার রাতে যেমন হয়েছিল তোমার, রাত্রে কেউ ঘুমোতে পারেনি, সকালে মাম্মাম খুব রাগারাগি করছিল, সেরকম হয়েছে ?? আচ্ছা দাঁড়াও আমার বোতলে জল আছে”
 
 
এক পা এক পা করে পিছিয়ে এলেন মনোজ, নিশ্চুপে, অনেকটা যেন নিজের অজান্তেই। গাড়িতে উঠে সূরযকে সংক্ষেপে শুধু বললেন, “গাড়ি ঘোরাও, প্রবীণাবাসে চল……, ময়ের ট্রাঙ্ক আর হুইলচেয়ারটা ডিকিতে তুলে নিও …”
 
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের কাঁচ দিয়ে দেখতে লাগলেন মনোজ, —
শুভ্রর হাতে জলের বোতল, আস্তে আস্তে ভিজে যাচ্ছে গাছটার তলার খটখটে মাটি।
পাশের পুকুর ঘাট থেকে সমস্বরে ভেসে আসছে —
 
ওঁ নমঃ আ-ব্রহ্মভুবনাল্লোকা, দেবর্ষি-পিতৃ-মানবাঃ ,
তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্ব্বে , মাতৃ-মাতামহাদয়ঃ ।
অতীত-কুলকোটীনাং, সপ্তদ্বীপ-নিবাসিনাং ।
ময়া দত্তেন তোয়েন, তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ং ।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s