মৃত্যুকীট

“সে আসে নিঃশব্দে, কুরে কুরে খায় দেহ, ভয়লতম মহামারীর চেয়েও দ্রুত, পৃথিবীর আদিম অধিপতিদের প্রতিনিধি সে … তীব্র অজেয় বিষধর, অমর … সে আসছে তার প্রাচীন অধিকার কায়েম করতে …”


********

ঘটনা ১, সাল ২০১৫, স্থান – লন্ডণের সাউথকেনিংস্টন,

বাইরে ঠান্ডা হাওয়ার ঝলক বন্ধ করার জন্য দরজাটা টেনে দিলেন ডাক্তার জোহানা রোডস। রাত বেশী হয় নি। বড়দিনের ছুটির এই সময়টা তাঁর একান্ত ভাবেই পড়াশোনায় ডুবে নিজের মত সময় কাটানোর একটা সুযোগ বলেই বরাবর বিবেচনা করে এসেছেন তিনি। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। রাতের খাবার আগেই সারা হয়ে গেছে। এবার ট্যাবে নতুন কয়েকটা রিসার্চ পেপার পড়বেন বলে মিনিমাইজ করে রেখেছেন। ট্যাব টা হাতে নিতেই দেখলেন দুখানা ইম্পর্ট্যান্ট মার্কড ইমেল। জন ! খুব জরুরী দরকার না থাকলে তো সে এই সময় পারতপক্ষে তার শান্তি বিঘিত করবে না। না জন তো নয় ! তবে ? ইমেলটা খুলে পড়তে থাকলেন তিনি –“ প্রিয়, ডাক্তার রোডস,রয়্যাল ব্রম্পস এ অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের আই সি ইউ ও এইচডি ইউ পেসেন্টরা হঠাত করেই এক ভয়ঙ্কর সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন ও অধিকাংশই মারা যাচ্ছেন । মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশী, প্রায় ৭০% । বহু চেষ্টা করেও আমরা এই সংক্রমণএর মোকাবিলা করতে পারছি না। আমাদের জানা সমস্ত ওষুধ প্রয়োগ করেও এর সামান্যতম ক্ষতিও আমরা করে উঠতে পারছি না। অতি দ্রুত এই সংক্রমণ এক রোগীর দেহ থেকে অন্য রোগীর দেহে ছড়িয়ে পড়ছে, আর তার জন্য স্যালাইনের নল থেকে, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, অক্সিজেনের নল যেকোন কিছুকেই ব্যবহার করে নিচ্ছে মাধ্যম হিসাবে। এই ভয়াণক পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছে ……”
বার্তার আকস্মিকতায় বেশ কিছুক্ষণের জন্য অভিভূত হয়ে রইলেন জোহানা, বাইরে তখন হিমেল হাওয়ার গর্জন বেড়ে চলেছে। রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল , হৃদযন্ত্রের অসুখের ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চিকিৎসাকেন্দ্র। সবসময়েই লোকে গমগম করে চারতলা হসপিটালের প্রতিটি তলা। জোহানা এই হসপিটালে আগেও এসেছেন। অনেকটা অষ্টাদশ শতাব্দীর কাউন্ট দের প্রাসাদের মত এর গড়ন চিরকালই তাঁর অদ্ভুত লাগে, হসপিটালটা যেন অন্যান্য সব হসপিটালের থেকে আলাদা। দেখতেও যেমন অভিনব, তেমনই সেরা এদের কেবিন ও ওয়ার্ডগুলি, আর নার্সদের ব্যবহার।“ডক্টর রোডস ? নমস্কার, আমি অ্যালিনা, সিডিসি আর ডি ৩১ মেম্বার। আশা করি, আপনি সবই জানেন তবু আমার দায়িত্ব পুরোটা আরেকবার আপনাকে ব্রিফ করা, আসুন, পিপিই টা ড্রেসিং রুমে রাখা রয়েছে, ওখানে যেতে যেতেই আপনাকে ব্রিফ করি” জোহানা এগিয়ে চললেন অ্যালিনার সাথে, তাঁদের এখানে গন্তব্য আইসিউ, কোয়ারেন্টাইনড এলাকা এবং তার পর ল্যাবরেটরি। যে ল্যাবরেটরির একটা কালচার ডিস মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখতে দেখতে বছর পাঁচেক পর তিনি লিখবেন সেই ভয়ঙ্কর উক্তি … “আপনারা করোনাকে ভয়াণক ভাবছেন, আপনারা এখনও এই মাইক্রোস্কোপের নীচের এই বিভীষিকাটির সাথে পরিচিত হননি বলে”।


*****ঘটনা ২, সাল ২০১৫, ডিসেম্বর মাস, স্থান – হাওড়া, ধূলাগড়, ভারত

কদিন আগেই আগেই এই কোম্পানিটায় জয়েন করেছে রুদ্র। ওর জীবনে প্রথম হার্ডকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল চাকরি এটাই। এর আগে বিভিন্ন সার্ভিস প্রোভাইডিং , হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের টেকনিক্যাল পোস্টে কাজ করলেও ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাহিদাটা ছিলই কোর সেক্টরে কাজ করার। এই অদ্ভুত ধূলো ধোঁয়া গ্যালাভানাইজারের জিঙ্কের ঝাঁঝালো বাষ্প, অ্যাসিড পিটের সোঁদা গন্ধ নেহাত খারাপ লাগে না ওর। শুধু সমস্যা হয় ক্যান্টিনে খাওয়ার সময়। মারোয়াড়ী কোম্পানির ক্যান্টিনের সেই চিরকালীন একঘেয়ে নিরামিষ খাবার। তাই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খায় ও আর ওর সাবর্ডিনেট টেকনিশিয়ানের দল। সেদিন ও বাইরে থেকে আনিয়ে নেওয়া ঝুরি-ভাজা খাচ্ছিল ওরা সবাই। বলাই বাহুল্য রুদ্রই স্পন্সর। খেতেও যেমন ভালবাসে, খাওয়াতেও তাই। হঠাতই চিবোনোর সময় একটা টুকরো বেকায়াদায় মুখের ভিতরে উপরের অংশে, তালুতে আঘাত করল আর সঙ্গে সঙ্গে অপ্রত্যাশিত তীব্র যন্ত্রণায় দিগ্বিদিক অন্ধকার হইয়ে উঠল রুদ্রর সামনে।একটা সাধারণ খাবার খেতে গিয়ে এতটা ব্যাথা কিভাবে হতে পারে ভেবে অবাক হচ্ছিল রুদ্র, তাই মোবাইলের ক্যামেরার মাধ্যমে মুখের ভিতরের একটা ছবি তুলল সে । তালুতে অদ্ভুত গভীর এক ক্ষত, যা কোন ভাবেই খাবারের ছোট্ট একটা কণার আঘাতে হওয়া সম্ভব নয়। হাত ধুয়ে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে রুদ্র বুঝতে পারল তার তালুর প্রায় সম্পূর্ণটাই অবশ হয়ে রয়েছে, ব্যাথায় নয় … এ যেন ঠিক লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ইঞ্জেকশনের প্রভাবে হওয়া অবশতা … তবে ??

ঘটনা ৩, সাল ২০১৬, স্থান – কলকাতার পার্কস্ট্রীট


স্মিয়ার টেস্টের রিপোর্ট হাতে নিয়ে বসে আছেন ডক্টর শুভম আগরওয়াল, ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ ম্যাক্সিবুলার অংকোলজিস্ট ডক্টর সৈদুল ইসলামের প্রিয় ছাত্র। কিন্তু সব হিসাব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাঁর পেসেন্ট এই ছেলেটির রোগের গতিপ্রকৃতি খুবই অদ্ভুত। প্রথম দিন ওর মুখের ভিতরের আক্রান্ত জায়গাটা দেখে তিনি বুঝেছিলেন এটা ক্যান্ডীডীয়াসিস। কিন্তু হিসেব টা মিলছে না …
ক্যান্ডীডীয়াসিস একটি ছত্রাক ঘটিত অবস্থা। ক্যান্ডিডা পাঁউরুটি তৈরিতে যে ইস্ট ব্যবহার হয় তার খুব কাছাকাছি গোত্রের একটি ছত্রাক বা পরজীবি (ব্যাক্টেরিয়া), মানুষের দেহে বিভিন্ন জায়গায় যেমন ত্বক, পাকস্থলী, মুখ ইত্যাদি জায়গায় অল্প পরিমাণে বর্তমান থাকে আজীবন। এরা বাতাসে ভেসে বেড়ায় স্পোর হিসাবে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পেলে বা বলা ভাল অনুকুল পরিবেশ পেলে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে। এরা দেহের বিভিন্ন নিসৃত পদার্থর মধ্যে থাকা শর্করা বা পুষ্টিদ্রব্যের উপর নির্ভর করে বাঁচে। কিন্তু কোন কারণে শরীরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অর্থাৎ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে এরা গোটা শরীরটাকেই খাদ্য বানিয়ে ফেলতে সচেষ্ট হয়। এই ধরণের ক্যান্ডিডার আক্রমণেই আমাদের অতি পরিচিত ত্বকের বিভিন্ন চর্মরোগ, নখের পচন ইত্যাদি হয়। আর একবার যদি এটি কোনভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশের উপায় খুঁজে পায়, তাহলে তার মাধ্যমে এটি সারা দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে আর সেগুলিকে ভিতর থেকে বিকল করতে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন শরীর কোন একটা ভাবে দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার অবস্থায় বা ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড হয়ে পড়বে। এটা অনেক ভাবে হতে পারে । কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করার জন্য হতে পারে, আর্সেণিক বা পারদের মত বিষাক্ত ধাতু অনেকদিন একটু একটু করে শরীরে বিষক্রিয়া করলে হতে পারে, অপুষ্টি – ভিটামিন বা খনীজ পদার্থের অভাব ঘটলে হতে পারে, কেমো বা রেডিয়েশন চললে হতে পারে, বড় কোন অপারেশনের জন্য হতে পারে, অত্যাধিক রক্তপাত হলে হতে পারে, ধূমপান – মদ্যপান করলে হতে পারে, জন্মগত রক্তাল্পতা থাকলেও হতে পারে, এরকম আরও বিভিন্ন কারণে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে চর্মরোগ ছাড়াও ক্যান্ডীডার অন্যতম প্রিয় আক্রমণস্থল হল মুখের ভিতরের মিউকাশ মেমব্রেন – গাল, জিভ, দাঁতের মাড়ি এছাড়াও যোনীমুখ ইত্যাদি, এই সব জায়গায় ক্যান্ডীডা সাদা পণীরের মত আস্তরণ তৈরী করে ও সেখানের মিউকাশ লেয়ার গুলিতে ছত্রাকের দেহে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দিয়ে অবশতা তৈরি করে । এর সঙ্গে বেশ কিছু অন্যান্য উপসর্গ জুড়ে যায় যদি ক্যাণ্ডীডা দেহের ভিতরে, অর্থাৎ পাকস্থলি বা অন্ত্রে পৌঁছে যায়। ডায়েরিয়া, যেকোন সময় খাওয়ার পরেই তীব্র নিম্নচাপ, প্রস্রাবে অ্যালকোহলিক গন্ধ, দুর্বলতা এসবও ক্যাণ্ডীডার লক্ষণ। এছাড়া ক্যান্ডীডা সুপার ইনভেসিভ স্টেটে যদি ব্লাডস্ট্রীমে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তীব্র জ্বর ও পরবর্তীতে আস্তে আস্তে মাল্টি অরগ্যান ফেলিওরের দিকে এগোতে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তি। এছাড়াও বেশ কিছু আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই ক্যান্ডীডা খুব তাড়াতাড়ি মানুষ্কের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে ব্রেন ডেথ ঘটাতে পারে খুব অল্প সময়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডিডা আক্রান্ত জায়গায় পরবর্তীতে ম্যালিগ্ন্যানান্সি বা ওরাল ক্যান্সার দেখা দিয়েছে , গবেষণাগারে দেখা গেছে ক্যান্ডীডীয়াসিস ওরাল ক্যান্সারের চান্স অনেকগুণে বাড়িয়ে দেয়।
তবে ক্যান্ডীডীয়াসিস দুরারোগ্য নয়, সাধারণতঃ অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ (ফ্লুকোনোজল ইত্যাদি) প্রয়োগ করলে, ইমিউনিটির উন্নতি ঘটালেই একে কাবু করে ফেলা যায়। নির্মূল ও করা যায়। কিন্তু হিসেবটা সত্যিই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে এই পেসেন্টটির ক্ষেত্রে …
এই ছেলেটির ক্যান্ডীডীয়াসিস তা কনফার্ম করা হয়েছে আগেই (কারণ ক্যান্ডীডীয়াসিস এর মত আরও অনেক অসুখ যেমন লাইক্যান প্লানুস ইত্যাদি মুখের ভিতরে সাদা দাগ – লিউকো প্ল্যাকিয়া তৈরি করতে পারে) । যথারীতি ওষুধও চলছে কড়া ডোজের । খাবার খাওয়ার সময় ন্যাচারাল স্ক্র্যাপিং হয়ে ক্যান্ডীডার ওপরের পণীরের মত সাদা স্তরের আস্তরণ টা উঠে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু ঐ জায়গায় (ছত্রাকের বেশ কিছুটা অংশ মিউকশাল লেয়ারের ভিতরে ইনভেড করায় আস্তরণ টা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সেই জ্যগাটা রক্তাভ লাল হয়ে থাকে ও তীব্র জ্বালার অনুভূতি থাকে) সাধারণ গোলাপী রঙ ফিরে আসার পরে পরেই দেখা যাচ্ছে যে আবার উপরের সাদা লেয়ারটা তৈরি হতে শুরু করেছে অর্থাৎ ক্যান্ডীডা নির্মূল হয় নি। ডিসেম্বর থেকে গত ৫ মাসে প্রায় বার দশেক এই ভাবেই ক্যান্ডীডা কক্ষনোই পুরোপুরি চলে যায় নি। এদিকে ওষুধ কখনও বন্ধ হয়নি। ক্যান্ডীডীয়াসিস ক্রণিক বা রিপিটেড হওয়ার নিদর্শন থাকলেও সেই সব ক্ষেত্রে একবার সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়ার অনেক দিন পরে আবার ইমিউনিটি কম হয়ে গেলে ক্যান্ডীডীয়াসিস ফিরে আসে কিন্তু এরকম একদমই নিরাময় না হওয়ার ঘটনা ডাক্তার আগরওয়াল আগে কখনও দেখেননি বা কোথাও পড়েনওনি। ছেলেটির রক্তে লৌহের মাত্রা কম থাকার কথা আগেই পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল বটে কিন্তু সঠিক সাপ্লিমেন্ট, ডায়েট পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে তা তো এখন নিয়ন্ত্রণে। তবে ? রোগিকে ডাক্তার আগরওয়াল পাঠালেন তাঁর অগ্রজপ্রতীম ডাক্তার অজয় মুখার্জ্জীর কাছে।উপায় একটা ডাক্তার মুখার্জ্জী খুঁজে বার করলেন ঠিকই, তবে সেটা আগে কখনও কেউ করেননি ক্যান্ডীডীয়াসিস নির্মূল করতে, এবং তাতে কাজ হল (চিকিৎসামন্ত্রকের বিশেষ বিধি-নিষেধ থাকায় বিস্তারিত পদ্ধতিটি এখানে লেখা সম্ভব হল না) । পরবর্তীতে যখন দুই ডাক্তার একত্রে বসে তাঁদের কাছে আসা গত কয়েক বছরের রোগীদের কেস ফাইলগুলি পর্যালোচনা করে দেখছিলেন তখন তাঁরা লক্ষ্য করলেন বেশ কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডীডা গোত্রের ছত্রাকের আক্রমণে (সাধারণতঃ ক্যান্ডীডা অ্যালবিকেন্স) সাধারণ অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ সহজে কাজ করছে না। অর্থাৎ ??? অর্থাৎ ক্যান্ডীডা আস্তে আস্তে তার উপর প্রয়োগ করার জন্য তৈরি ছত্রাকনাশক গুলিকে সহ্য করে বেঁচে থাকতে শিখে যাচ্ছে।

ঘটনা ৪, সাল ২০০৯, স্থান – নিউ দিল্লী

ডাক্তার অনুরাধা চৌধুরী তাঁর ল্যাবরেটোরিতে বজ্রাহতের মত বসে আছেন। নিওনেটাল ইউনিট থেকে আসা এই টেস্ট স্যাম্পেলগুলি কিসের ??? এমন কোন ছত্রাক তো তিনি আগে দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না তাঁর। এই ক্যান্ডীডা সদৃশ জীবানুটি একের পর এক শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে চলেছে আর তার চেয়েও বড় কথা প্রচলিত কোন ছত্রাকনাশক ওষুধই কার্য্যকারী হচ্ছে না এর প্রতিরোধে, অ্যাজোল, অ্যাম্ফোটেরিশিন, ফাঙ্গীন সব গ্রুপের ওষুধেই এরা শুধু যে বেঁচে থাকছে তাই না, বৃদ্ধিও হচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই। তবে কি এ নতুন কোন প্রজাতি আবিষ্কার করে ফেললেন তিনি ? হঠাত মনে পড়ে গেল জাপানের মেডিক্যাল জার্ণালে প্রকাশিত বছর দুয়েক আগের একটি ঘটনা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির কান থেকে প্রাপ্ত এই ছত্রাকের উল্লেখ ছিল, আর কানের ল্যাটিন নাম অরিস অনুযায়ী যার নামকরণ করা হয় ক্যান্ডিডা অরিস।
তড়িঘড়ি ডাক্তার চৌধুরী নির্দেশ দেন, সিল করে ফেলতে হবে আক্রান্ত সমস্ত ইউনিট গুলি, মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কারণ তিনিযে দেখেছেন কি ভয়ঙ্কর দ্রূত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে এই ছত্রাক, লেগে থাকে টেবিল, পোশাক, দরজার হাতল সর্বত্র … দৃঢ় ভাবে, সাবান, স্পিরিট কোন কিছু দিয়েই সহজে দূর করা যায় না একে, অতয়েব … আটকে দিতে হবে উৎসেই ……
ডাক্তার অনুরাধার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতকে এক ভয়ানক মহামারির হাত থেকে সেদিন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল, শুধু সেদিনই নয়, আবার কর্মীদের গাফিলতিতে ২০১৩ সালে যখন ছড়িয়ে পড়ছিল ক্যান্ডিডা অরিস বা সি অরিস দ্রুত গতিতে, তখনও মাঠে নেমেছিলেন ডাক্তার চৌধুরী … ত্রাতা হয়ে … যে খবর দেখানো হয়নি কোন সংবাদ মাধ্যমে …

ঘটনা ৫, সাল ২০২১, স্থান – পৃথিবী

ছত্রাক, পৃথিবীর অন্যতম আদিম অধিবাসী। প্রাণীর সঙ্গে যার অনেক মিল বৈশিষ্ট ও ব্যবহারে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক হল ছত্রাকের মাইসিলিয়ামের নেটওয়ার্ক যার জাল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মতই। তারা প্রবল, মৃত্যু তাদের পরিচারক, মৃত বস্তুই যে তাদের আহার। তারা অসীম শক্তিশালী, অনন্য সাধারণ তাদের ছড়িয়ে পড়ার, বংশ বিস্তারের ক্ষমতা।এ পৃথিবীর কিছুই তাদের অভক্ষ্য নয়।
এতদিনে চিকিৎসা জগতে ক্যান্ডীডা অরিস পরিচিত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এর ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতা, সত্তর শতাংশের কাছাকাছি মৃত্যুহার ভয় ধরিয়েছে সবার মনেই। আমেরিকার সিডিসি এটিকে পৃথিবীর অন্যতম বিপদ চিহ্নিত করেছে ২০১৯ সালে এবং হসপিটাল গুলিতে নিরন্তর এই ইনফেকশন খুঁজে বের করে তাকে কোয়ারেন্টাইন করে নির্মূল করার রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। যেহেতু এই সংক্রমণ মূলতঃ হাসপাতালে অসুস্থ (কোমরবিডীটিযুক্ত, ইমিউনোকম্প্রোমাইজড) ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ছড়াতে শুরু করে তাই এই সুপারবাগটিকে যাতে হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যায় তার জন্য কঠীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা, জাপান, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ভারতের মত দেশ। এই ভয়াণক সংক্রমণ যদি লোকালয়ে … বিশেষত ভারতের মত অধিক জনঘনত্বের দেশে ছড়িয়ে পড়ে তবে তার ফল হবে মারাত্বক। কিন্তু নিয়তির নির্মম অঙ্গুলীহেলনে করোনা ভাইরাস মহামারীর আঘাতে সম্ভব হল না এই পরিকল্পনা সফল করা। বিশাল সংখ্যক জনসংখ্যাকে হাসপাতালমুখী হতে হল কোভিড সংক্রমণ নিয়ে আর তার সাথে সাথেই সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ক্যান্ডীডা অরিস নামের অদৃশ্য শত্রু, যা করোনার থেকেও নির্মম মারক (করোনার ডেথ রেট যেখানে এক শতাংশের মত সেখানে ক্যান্ডিডা অরিসের মৃত্যু হার প্রায় ৩০ – ৭০ শতাংশ)। মাত্র কিছুদিন আগে আন্দামানের মত নির্জন সৈকতেও উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে ক্যান্ডিডা অরিস বা সংক্ষেপে সি অরিস এর, যার অর্থ সমুদ্রপথে বাহিত হয়ে এই ভয়ানক মৃত্যুকীট পৌঁছে গেছে সবকটি মহাদেশেই, পৃথিবীর কোন প্রান্তই আজ আর সুরক্ষিত নয় !


কারণ কি ?

এই ছত্রাকের প্রজাতিগুলি বহুবছর ধরে মানুষের সাথে সহাবস্থান করছে, তাহলে আজ হঠাত এদের এই ভয়ানক হয়ে ওঠার প্রবণতা কেন ? বৈজ্ঞানিকরা বলছেন মূলতঃ দূষণ এবং মানুষের নির্বোধতা। গত কিছু দশকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে অনেকটা, আর তার সর্বোচ্চ প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর নিরক্ষীয় উষ্ণ অঞ্চলগুলিতে। আগে দেহের জীবাণু নিধনের অন্যতম অস্ত্র ছিল জ্বর। সংক্রমণ ঘটলে দেহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করার নামই জ্বর। কিন্তু এখন বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে জীবাণুগুলি বেশী তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাই জ্বর তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সংগে আছে বিভিন্ন রাসায়নিক মাত্রাতিরিক্ত হারে জলে ও মাটিতে ছড়িয়া পড়ে এই জীবানুগুলিকে বিষাক্ত পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম করে তোলা, আর সর্বোপরি মানুষের নিজে ডাক্তারী করার স্বভাব। অধিকাংশ মানুষই যেকোন রোগ হলে বিন্দুমাত্র পড়াশোনা, পরীক্ষা না করে, ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজে অথবা ফার্মাসিস্টের মুখস্ত বিদ্যার উপর ভরসা করে বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে নেন। এবং যে ওষুধটি খাচ্ছেন তার নিয়ম অনুযায়ী পুরো কোর্সটা কমপ্লিট করেন না। ধরা যাক কারোর সর্দি জাতীয় অসুখ হয়েছে, তিনি ডাক্তার না দেখিয়ে সর্দির গতিপ্রকৃতি বিচার না করে দোকানে গিয়ে অ্যাজিথ্রোমাইসিন কিনে আনলেন। দুটি খাওয়ার পরেই তাঁর সর্দি মোটামুটি কমে গেল, আর তিনিও বেশী অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কিডনি খারাপ হয়ে যাবে ইত্যাদি বিজ্ঞবাক্য স্মরণ করে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের বাকি তিনটি ওষুধ আর খেলেন না। এদিকে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মিনিমাম ডোজ হয়তো পাঁচটার। এর ফলে কি হল ? তিনি নিজের তো ক্ষতি করলেনই সাথে সাথে সমাজের ক্ষতি করলেন। দুটি ট্যাবলেট খাওয়ায় তাঁর শরীরে থাকা অধিকাংশ জীবানু হয়ত ধ্বংস হল, সেই কারণেই তাঁর অসুখের কিছুটা উপশম হল। কিন্তু কিছু জীবাণু যারা একটু বেশী সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন তারা সংখ্যায় কম হলেও কিন্তু টিকে গেল। এদের মারার জন্য দরকার ছিল ঐ বাকি তিনটি ট্যাবলেটও নিয়ম মত খেয়ে কোর্স কমপ্লিট করা। এই যে অ্যাজিথ্রোমাইসিন সহ্য করেও টিকে যাওয়া জীবানুগুলি ন্যাচারাল সিলেকশন অনুযায়ী যখন আবার বংশবিস্তার করে একটি নতুন কলোনী তৈরি করবে তাদের উপর কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিন আর তেমন করে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এই জীবানুগুলি হল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু, এখন এরা যদি এই প্রথম ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য কোন ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হয় তাহলে তিনি কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিনের পুরো কোর্স অনুযায়ী সব কটি ওষুধ খেলেও কিন্তু আর কাজ হবে না। এঁকে অন্য কোন গ্রুপের ওষুধ খেতে হবে। দ্বিতীয়ব্যক্তিও যদি আবার নতুন গ্রুপের ওষুধের কয়েকটি মাত্র খেয়ে আর কোর্সটা কমপ্লিট না করেন, তাহলে রয়ে যাওয়া জীবাণূগুলি অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সাথে সাথে এই নতুন অ্যান্টিবায়োটিকটিতেও রেজিস্ট্যান্ট হবে। এটা একটা সাধারণ উদাহরণ দিলাম মাত্র, কিন্তু বাস্তবিক এই রকম ভাবেই কিন্তু মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (অর্থাৎ যাদের উপর কোন পরিচিত ওষুধই কাজ করে না) জীবাণু তৈরি হয়। ক্যান্ডিডা প্রজাতির বিভিন্ন জীবাণুর যথা, অ্যারিস, অ্যালবিকন্স, হাইমুলনী ইত্যাদির মাল্টিড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠার পিছনে এগুলিই সম্ভাব্য কারণ।


করণীয় ?

সর্বাগ্রে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা যেকোন উপায়ে বাড়িয়ে তোলা, ভাল সুষম খাবার খাওয়া, খাদ্যে লৌহের মাত্রা ঠিকঠাক বজায় রাখা, কাঁচা ফল ইত্যাদি খাওয়া, ভিটামিন যুক্ত খাবার খাওয়া । দেখা গেছে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাস্থবান মানুষকে খুব সহজে ক্যান্ডিডা আক্রমণ করতে পারে না। ডায়াবেটিস, রেনাল ফেলিওর, স্থূলত্ব ইত্যাদি ক্যান্ডীডার আক্রমণকে সহজতর করে দেয়। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, নিমপাতাযুক্ত জলে স্নান, পরিস্কার থাকা, খুব দরকার না হলে পারতপক্ষে হাসপাতাল এড়িয়ে চলা, এগুলি জরুরী। সাথে সাথেই যদি ব্যক্টেরিয়াল ইনফেকশনে কারুর জ্বর হয়, এবং জ্বর কমানোর ওষুধ দেওয়ার পরও তাপমাত্রা না নামে তবে তাকে দেরী না করে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনা দরকার। ক্যান্ডিডা অরিস, হাইমূলনী ইত্যাদির মৃত্যুহার খুব বেশী হলেও সময় মত চিকিৎসায় অনেকক্ষেত্রে নিরাময় সম্ভব, ডাক্তাররা বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অতি উচ্চ মাত্রায় “এচিনোক্যান্ডিন্স” নামক একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন। আরেকটি কথা ক্যান্ডীডা আক্রান্ত মানুষের দেহে মাসাধিক কাল, কিছু ক্ষেত্রে বছরও ক্যান্ডীডার অস্তিত্ব থেকে যায়, তাই সংক্রমণএর ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলা ও সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা দরকার। গরম ফুটন্ত জল ক্যান্ডিডার বিনাশ করতে স্বক্ষম, তাই স্যানিটাইজেশনের জন্য যে যে জায়গায় সম্ভব ফুটন্ত জল ব্যবহার করা যেতে পারে। সর্বোপরি প্রতিটি মানুষ দায়িত্ব নিলে, সচেতন হলে, হয়ত আগামীর এই মহামারীকে রুখে দেওয়া সম্ভব।

বিঃদ্রঃ – এটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প ভেবে ভুল করবেন না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s