তত্ত্ব

সাদা হয়ে যাওয়া দাড়ি আর চুলে হাত বুলিয়ে নিল ওঁ। তার প্রতিচ্ছবিতে মাথার দুপাশে অতিরিক্ত লোব গুলো আবার সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্রিয়েটম ফর্মুলা গুলো একবার মনে মনে আবৃত্তি করে নিল । নাঃ ঠিক আছে, ঠিক সময় মত খেয়ে নেওয়া গেছে। না হলে কমতে কমতে আবার একটা বলের মত ক্ষুদ্র গুটি তে সমস্ত সত্তা গুটিয়ে নিয়ে অনন্ত কালের অপেক্ষায় চেতনাহীন সুষুপ্তিতে লীন হয়ে যেতে হত।
 
সময় চলে যাচ্ছে, ছায়াপথ এর মধ্যেই এক চতুর্থাংশ আবর্তন সেরে ফেলেছে, আজ আর কালকের মত দেরী করলে চলবে না। খুব সন্তর্পণে নিজের শরীর থেকে এক কণা দেহকোষ তুলে নিল ওঁ।
 
* * *
 
আরো বেশ কিছুটা সময় চলে গেছে, কৃত্রিম কালচার মাধ্যমে রাখা দেহকোষটা ইতিমধ্যে আয়তনে বেশ কিছুটা বেড়ে গেছে। কালচারে খুব যত্ন নিয়ে কিছুটা পোষক দ্রবণ ঢেলে দিল ওঁ। গভীর মমতায় লালিত কোষটির দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, ওটি যে তারই অংশ, সন্তানবত্। ইতিমধ্যেই তার শরীরে আস্তে আস্তে পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। পাকা চুলের বদলে দেখা দিয়েছে কুঞ্চিত কাজলকৃষ্ণ কেশরাজী, বলিরেখারা অদৃশ্য হয়ে দেখা দিয়েছে পেলব কমনীয়তা। ফ্যাকাসে গাত্রবর্ণ হয়ে উঠেছে নীহারিকার মত উজ্জ্বল নীলাভ। সময় যে বেশী নেই বুঝতে পারছে ওঁ।
 
* * *
 
ছায়াপথের একটি সম্পূর্ণ আবর্তন সম্পূর্ণ করতে আর বেশী দেরী নেই …. ওঁ এখন প্রায় শিশুবত, মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তার জটাজাল ; কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না সে …. তার সমৃদ্ধ প্রজ্ঞার অধিকাংশই বিস্মৃতি গ্রাস করেছে এখন। সর্বগ্রাসী ক্ষুধা তাকে উন্মাদপ্রায় করে তুলছে … সময় যে আজকের মত শেষ .. কোনক্রমে অস্থির অঙ্গ সঞ্চালনে কালচার থেকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আপন দেহকোষটি তুলে নিয়ে ভক্ষণ করল ওঁ।
 
* * *
 
ছায়াপথের একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পূর্ণ হল, ধ্যানসুষুপ্ত ওঁর শরীরে বিপরীত পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে …. শিশুসুলভ কোমল দেহে এক এক করে ফুটে উঠছে বলিরেখা …..
 
© Satadru Banerjee

নুনশাক, এক অবহেলিত বন্ধু

আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে এমন অনেক লতা-গুল্ম যাদের আমরা আগাছা বলে অবজ্ঞাই করে এসেছি চিরকাল, কিন্তু তাদের অদ্ভুত ভেষজ গুণের অজানা কাহিনী রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। সেরকমই কিছু অচেনা বন্ধুদের তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করব এই দুর্বল কলমসহায়ে। আজ প্রথম কিস্তিতে থাকুক, আমাদের বাড়ির আশেপাশের অযাচিত ভাবেই জন্মানো, অনাদরে বেড়ে ওঠা এই প্রতিবেশী।

এটি সংস্কৃতে লোণিকা নামে পরিচিত। বাংলায় কেউ বলে নুন শাক, কেউ বলে নুনে শাক, আবার কেউ বলে নুনিয়া বা নুন্তা শাক, ওড়িয়ায় বলে পুরনিশাক, হিন্দিতে খুরসা বা কুলফা । বিজ্ঞান সম্মত ল্যাটিন নাম – Portulaca oleracea ।

এটি আমার মতে একটি মিরাক্যাল গাছ। সব দিক থেকে প্রকৃতি ও মানুষের উপকারী একটি গুল্ম। এটি প্রবল খরাতেও নিজের বিপাকীয় ধরণ পরিবর্তন করে টিকে থাকতে পারে। মাটির আদ্রতা ধরে রেখে অন্যান্য গাছকে বাঁচতে সাহায্য করে। হয়ত এত গুণের জন্যই সেই কোন প্রাচীন কাল থেকে মানুষ এটিকে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে নানা সভ্যতায়। তারা যে শুধু এটিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত তাই নয়, অনেক সংস্কৃতিতে মনে করা হত, এই গাছ অপদেবতা ও বিপদকে দূরে রাখে।

এবার আসি এর ভেষজ ও খাদ্যগুণের কথায়, প্রথমেই বলি খাদ্যগুণ। নুনে শাক এর পাতা, ফুল, কান্ড পুরোটাই কাঁচা বা রান্না করে দুভাবেই খাওয়া যায়। গ্রীস, ফ্রেঞ্চ ও বেশ কিছু ইউরোপিয় সংস্কৃতিতে এটিকে স্যালাড হিসাবে টমেটো ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার চল ছিল। স্পেনে স্যুপ, স্ট্যু ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হত এটি আর মেক্সিকোতে তো এই শাক দিয়ে একদম মৌলিক একটা চিকেনের পদই জনপ্রিয় ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এর ছোট্ট ছোট্ট পোস্তদানার মত বীজগুলি সংগ্রহ করে বেঁটে বড়া বানানো হত। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এটিকে ভাজা, সিদ্ধ বা পালংশাকের মত করে রান্না করে খাওয়ার চল আছে।

নুনে শাকের টক – নোনতা স্বাদটি আসে মূলতঃ এর মধ্যে থাকা দুটি অ্যাসিডের কারণে, অক্সালিক অ্যাসিড ও ম্যালিক অ্যাসিড। এই ম্যালিক অ্যাসিড আমাদের অতি পরিচিত ফল আপেলেও থাকে। নুনে শাকে ভোরের দিকে ম্যালিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশী থাকে। তাই ঐ সময়ে এই শাক তুললে তা বেশী ম্যালিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ হয়।

১০০ গ্রাম পরিমাণ এই শাক ২০ ক্যালরি শক্তি দিতে পারে মানবদেহে। প্রায় ২ গ্রাম মত প্রোটিন ও খুবই সামান্য ফ্যাট থাকে। এছাড়াও এর থেকে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, পটাশিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মৌলগুলিও যথেষ্ট মাত্রায় পাওয়া যায়। এছাড়াও এর থেকে আমাদের অপরিহার্য্য ভিটামিনগুলির (Vitamin A, B1, B2, B3, B6, B9, C, E etc.)  প্রাত্যহিক চাহিদার ২০ শতাংশেরও অধিক পাওয়া যায়।

 

এবার আসি ভেষজগুণে —

১) গনোরিয়ায় – এই বিরক্তিকর যৌনরোগটিতে একটি ভয়ঙ্কর উপসর্গ হল প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া এবং অতিরিক্ত পিপাসা। এক্ষেত্রে ১০ গ্রাম নুনেশাক ৪ কাপ জল দিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে ২ কাপ করতে হবে, এর পর ওটাকে ছেঁকে ঠান্ডা করে সকালে বিকেলে এক কাপ করে খেতে হবে প্রতিদিন। এটি ডায়াবেটিসের কিছু ক্ষেত্রেও সমান ধরনের উপসর্গের উপশম করতে সক্ষম।

২) বাচ্চাদের কাশি হলে – নুনশাকের রস একটু গরম করে ঠান্ডা হলে ১৫ ফোঁটা সেই রসে ৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সিরাপ তৈরি করা যায়। এটি দিনে ৩-৪ বার করে খাওয়ালে সাধারণ কাশি হলে ২-১ দিনের মধ্যে কাশি ভাল হয়ে যাবে। এছাড়াও শিশুদের অম্বল, আমাশয়েও এই সিরাপ সকালে ও সন্ধ্যায় ২-৪ ফোঁটা খাওয়ালে উপকার হয়।

৩) তোতলামিতে – দন্ত্য বর্ণ,  ওষ্ঠ বর্ণ বাদ দিয়ে বিশেষ কোন বর্গের অন্তর্গত বর্ণ গুলি (যেমন মূর্ধা বর্ণ) উচ্চারণে সমস্যা থাকলে নুনে শাকের রস দুচামচ পরিমাণ অন্ততঃ ১৫ মিনিট মুখে নিয়ে বসে থাকলে অনেকটা উপকার হয়।

৪) চোখ ওঠা বা চোখ লাল হওয়ায় – নুনেশাকের রস ছেঁকে যে স্বচ্ছ রস পাওয়া যায় তাকে সামান্য গরম করে ঠান্ডা করে একফোঁটা করে ২ – ৩ দিন দিলে উপশম হয়।

৫) চুলকানি ও বিষাক্ত কীট দংশনে – সাধারণ চুলকানিতে এবং বোলতা মৌমাছি পিঁপড়ে ইত্যাদি কামড়ালে, শুঁয়ো লাগলে কিম্বা বিছুটি আলকুশি ইত্যাদি লেগে চুলকালে নুনেশাক বেঁটে অল্প গরম করে প্রলেপ দিলে কার্যকরী হয়। তবে ভীমরুল বা কাঁকড়াবিছের বেলায় কিন্তু এটি নিষ্ক্রিয়।

৬) অর্শ্ব, বদহজম, কোলাইটিস ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রে নুনেশাক খাদ্য হিসাবে উত্তম যা এই রোগগুলির নিরাময় করে।

৭) নুনেশাকের বীজ জল দিয়ে খেলে তা ক্রীমি নাশ করে।

এছাড়াও এটি শরীরের বলকারক, তৃষ্ণা নিবারক, চোট আঘাত জনিত ফুলে যাওয়া বা সোয়েলিং কমাতে অত্যন্ত্য কার্য্যকারী।

পরিশেষে বলি, এমন যে গুণসম্পন্ন উদ্ভিত তাকে আমরা না চিনে প্রায়শঃই উপড়ে ফেলি নিতান্তি আগাছা ভেবে, তাই ভয় হয় অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এই বন্ধু হয়ত মানুষের সান্নিধ্য হারিয়ে আবার অরণ্যভূমীর গোপনিয়তাতেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

বোধন

“জাতির জনক, মহাত্মা গান্ধী সবসময় নিজের জীবনে মিতব্যয়ীতা ও পরিচ্ছন্নতাকে জোড় দিতেন, তিনি মনে করতেন, পরিচ্ছন্নতাই হল পূজার অন্যরূপ। এই প্রকৃতি আমাদের মাতৃস্বরূপা, তাই একে নির্মল, জঞ্জালমুক্ত রাখা আমাদের সবার কর্তব্য। তাই বন্ধুগণ আমাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে গেলে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোড় দিতে হবে। ফ্যাক্টরির প্রতিটি শেড পরিষ্কার ও সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে হবে, তবেই আমরা আমাদের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পালন করব। এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি, জয় হিন্দ।”
 
অবিন্যস্ত হাততালিতে মাহুর্তিক মুখরতা মেখে থাকল গিয়ার ফ্যাক্টরির অক্টোবরের দ্বিতীয় সকালটা।
 
মনোজ সেন পকেট থেকে একটা বেনসন এন্ড হেজেসের প্যাকেট বার করলেন, একটাই সিগারেট রয়ে গেছে ভিতরে। ঝটাপট ঠোঁটের ফাঁকে ব্যালেন্স করে লাইটার জ্বালিয়ে অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় খালি প্যাকেট টা ছুঁড়ে ফেললেন পাশের ঝোপে। দুটো টান মেরেই কাঁচ ঘেরা অফিস রুমটায় ঢুকে কাজে লেগে গেলেন দেরী না করে। আজ একটু বেলাবেলি বেরিয়ে পড়বেন ফ্যাক্টরি থেকে, মণিকাকে নিয়ে মলে যেতে হবে, পূজো তো আর মাত্র কটা দিন।
 
বেলা-বেলি বেড়িয়ে পড়লেও বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে সেই, সাড়ে চারটে হয়ে গেল, যা জ্যাম রাস্তায়, যত প্যান্ডেল বাড়ছে – ক্রাউড ও তত পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, ইস মণিকা নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ রেডি হয়ে ওয়েট করছে। আরে সামনের মোড়ে ওটা শুভ্র না !!! কি করছে ও ওখানে ? অবশ্য এখন তো ওর স্কুল থেকে ফেরারই সময়, বাসটা বোধহয় ড্রপ করে দিয়ে গেল। সুরযকে ওর কাছে গাড়িটা থামাতে বলে সিটের ডানপাশে চেপে বসলেন মনোজ।
 
একটা তেঢ্যাঙা মার্কা গাছ, কোন বাহারি গাছ হবে হয়ত, একটু শুকনো শুকনো, টবেই ছিল হয়ত এতদিন, এখন আর নেই, বোঝাই যাচ্ছে কারুর বাড়িতে ছিল, স্থান সংকুলান না হওয়ায় রাস্তার পাশে রেখে দিয়ে চলে গেছে। শুভ্র এক মনে তার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছে।
 
গাড়ির দরজাটা খুলে ডাকতেই বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল শুভ্র। “কি করছিলি বাবা এখানে ? স্কুল কখন ছুটি হল ?” প্রত্যাশিত ভাবেই শুভ্র নিরুত্তর রইল, ও একটু এরকমই চাপা ধরনের তাই মনোজ ও আর ওকে না ঘাঁটিয়ে মোবাইলের মেলবক্সে মন দিলেন।
 
 
দিনকয়েক ধরেই স্কুল থেকে বাড়ি আসতে একটু দেরী হচ্ছে শুভ্রর। মণিকা চুপিচুপি ফলো করে দেখেছে ওকে, ঐ গাছটার সামনে আজকাল শুভ্র বেশ কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে, কি যেন বিড়বিড় করে, যেন গল্প করছে গাছটার সাথে। মণিকা ভয় পাচ্ছে, মনোজকে বলেছে কিন্তু শুভ্র এতটাই চুপচাপ যে ওকে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও খুব একটা সাহস হয়না ওদের দুজনের।
 
 
সোমবার টা ছুটি আছে মনোজের। তাই একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠলেন মনোজ, শুভ্র সেই সক্কালবেলা উঠে টিউশন এ চলে গেছে। একটু ফ্রেশ হয়ে মনোজ আজ অফিসারস ক্লাবে যাবেন একটু, অনেকদিন খেলা হয় না। সূরয কে গাড়িটা বের করতে বললেন।
 
একি সেই গাছটার সামনে ওটা শুভ্র না !! টিউশন থেকে ফেরার পথেও ও এখানে দাঁড়িয়ে !! সূরযকে গাড়িটা থামাতে বলে গাড়ি থেকে নেমে নিশ্চুপে শুভ্রর দিকে হেঁটে গেলেন মনোজ।
 
শুভ্র নিজের মনেই কি সব যেন বলে চলেছে, কোন দিকে মন নেই, যেন নিজের মধ্যে নিজেই তন্ময়। আরেকটু এগিয়ে গেলেন মনোজ।
 
“ঠাম্মা জান, তোমার মত করে আর কেউ জিজ্ঞেস করে না সারাদিন স্কুলে কি কি হল, আমার পিঠে পরশুদিন অনেকটা কেটে গেছে বেঞ্চে লেগে, কেউ জানেই না, কারুর চোখেই পড়েনি। তুমি কেমন আছ ঠাম্মা ? আচ্ছা ঠাম্মা তোমার কি শরীর খারাপ ? পাতাগুলো হলুদ হয়ে যাচ্ছে কেন ? তোমার কি জল তেষ্টা পেয়েছে ??? সেই সেবার রাতে যেমন হয়েছিল তোমার, রাত্রে কেউ ঘুমোতে পারেনি, সকালে মাম্মাম খুব রাগারাগি করছিল, সেরকম হয়েছে ?? আচ্ছা দাঁড়াও আমার বোতলে জল আছে”
 
 
এক পা এক পা করে পিছিয়ে এলেন মনোজ, নিশ্চুপে, অনেকটা যেন নিজের অজান্তেই। গাড়িতে উঠে সূরযকে সংক্ষেপে শুধু বললেন, “গাড়ি ঘোরাও, প্রবীণাবাসে চল……, ময়ের ট্রাঙ্ক আর হুইলচেয়ারটা ডিকিতে তুলে নিও …”
 
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের কাঁচ দিয়ে দেখতে লাগলেন মনোজ, —
শুভ্রর হাতে জলের বোতল, আস্তে আস্তে ভিজে যাচ্ছে গাছটার তলার খটখটে মাটি।
পাশের পুকুর ঘাট থেকে সমস্বরে ভেসে আসছে —
 
ওঁ নমঃ আ-ব্রহ্মভুবনাল্লোকা, দেবর্ষি-পিতৃ-মানবাঃ ,
তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্ব্বে , মাতৃ-মাতামহাদয়ঃ ।
অতীত-কুলকোটীনাং, সপ্তদ্বীপ-নিবাসিনাং ।
ময়া দত্তেন তোয়েন, তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ং ।।

KURU-ক্ষেত্র

– ডাক্তার সাহেব আসব ?
 
– আসুন, বসুন ওখানে, বলুন কি সমস্যা ?
 
– কেমন আছেন ডাক্তারবাবু ? আমায় চিনতে পারছেন ?
 
– অ্যাঁ কে ? না ঠিক,… আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি রমেন না ? একি হাল হয়েছে তোমার !!!
 
– হ্যাঁ ডাক্তারসাহেব, আমি রমেন।
 
– My God !!!
 
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ধপ করে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন ডাক্তার রায়। মনে পড়ে গেল বেশ কয়েকটা বছর আগের কথা।
 
তিনি তখন মাসে চার বার করে বসতেন ট্রপিকাল মেডিসিনে। প্রচুর ভীড় হত পেশেন্টের। তাঁর অনন্য রোগনির্ণয় প্রতিভা, সিমট্যমের আভাসমাত্র পেয়ে রোগের চরিত্র নিমেষে আঁচ করে নেওয়ার ক্ষমতা তখনই তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল। সেই সময়েই একদিন ট্রপিকালের নার্স তুলসীর অনুরোধে তাদের পাড়ার ছেলে রমেনকে তাঁর পার্সোনাল চেম্বারে কিছুক্ষণ টাইম দিয়েছিলেন।
 
ঘাড়ে গর্দানে বিশাল চেহারার রমেন যখন তাঁর চেম্বারে ঢুকেছিল তখনই ডাক্তার রায় বুঝেছিলেন, একে সারানোর ক্ষমতা তাঁর নেই, ওবেসিটির কেস ট্রিটমেন্ট করা ভীষণ কঠিন, কারণ এতে ওষুধের চেয়েও বেশী জরুরী নিয়ন্ত্রিত জীবন, যেটা সম্পুর্ণ ভাবেই পেশেন্টের উপর নির্ভরশীল।
 
ডাক্তার রায় চিরদিনই স্পষ্ট কথার মানুষ, সোজা বলে দিয়েছিলেন যে ওষুধ দিতে তিনি পারবেন না।
রমেন সেদিন খুব অনুনয় করেছিল, কান্নাকাটি ও করেছিল। বলেছিল ওর বেকারত্বের কথা, এত মোটা বলে কেউ কাজ দেয় না। বলেছিল, একটা মেয়েকে খুব ভালবাসত ও, বলেওছিল তাকে, কিন্তু “বেকার, হাতির মত মোটা কুমড়োপটাশের কি যোগ্যতা আছে ?” প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে মাথা হেঁট করে চলে এসেছে ।
কিন্তু তাতে ডাক্তার রায়ের উত্তরটা পাল্টায় নি। অবশ্য তিনি ভাল করে বুঝিয়ে বলেছিলেন বাইরের তেলেভাজা খাবার না খাওয়ার কথা, নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, শরীরচর্চার কথা … তবে ওর ভাবভঙ্গী দেখে বুঝেছিলেন যে ভস্মে ঘী ঢালা হচ্ছে ।
 
আজ এত বছর পর সেই রমেন ! সেই বিশাল চেহারার বদলে কঙ্কালসার একটা মানুষ, টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, চলতে গেলে হাত কাঁপছে ! যেন দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর থেকে উঠে আসা, বহু দিন না খেতে পাওয়া একটা মানুষ !
 
কিন্তু সেদিনের ফুটো গেঞ্জী আর রংচটা প্যান্ট পরা রমেনের গায়ে আজ ব্র্যান্ডেড চকচকে পোশাক, হাতে দামী ঘড়ি। তাই আর যাই হোক খেতে না পেয়ে এই হাল এটা ভাবতে পারছেন না ডাক্তার রায়। তবে ???
 
– কি কর আজকাল ? কোথায় থাক ?
 
– বোম্বাই তে ডাক্তারবাবু , ওখানের ঐ মহাবলজী হসপিটাল আছে না ? ওর পাশে একটা সিনেমা হল আছে, রকি সিনেমা।
 
– হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি, ঐ তো হাসপাতালের মর্গটা, তার পেছন দিক টায় যে রাস্তাটা আছে ওর opposite এ তো ? ওখানে গেছি বেশ কয়েক বার। তো ওখানে থাক তুমি ?
 
– হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, ওখানে রেহানিয়া রেস্টুরেন্টে কাজ করি আমি। আগে ডিশ ওয়াশার ছিলাম, এখন সার্ভিং করি। সেই যে আপনার কাছে এসেছিলাম, তার মাস খানেক বাদেই কাজ খুঁজতে বোম্বে তে চলে গিয়েছিলাম, তখনই ওখানে কাজে ঢুকি। ভাল মাইনে দেয় আর মালিক আমাদের খুব ভালবাসে তাই ওখানেই রয়ে গেছি। হিঃ হিঃ হিঃ
 
ডাক্তার রায় অপলকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন রমেনের দিকে, মাঝে মাঝেই অকারণে হেসে উঠছে সে, হয়ত না বুঝেই হাসছে, ওর চোখ যেন কেমন মরা মাছের মত, যেন সব কিছুতেই মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছে …
 
– তা আজকাল কি খাওয়া দাওয়া একদম বন্ধ করে দিয়েছ নাকি ? শরীরের এই হাল বানালে কি করে ?
 
– না না ডাক্তারবাবু, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করব কেন, আমাদের জন্য মালিক ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যে শিফটে ডিউটি থাকবে সে শিফটে তো বটেই অন্য শিফটেও আমাদের যা ইচ্ছা আমরা খেতে পারি ফ্রি তে। আমাদের রেস্টুরেন্টে মাংসের চপ, রেজালা, আটু মুলাই মানে মুড়ীঘন্ট এসব খুব বিখ্যাত। প্রচুর কাস্টমার আসে প্রতিদিন। তাই আমি বেশীরভাগ দিন দু বেলাই নান নয়ত পরোটার সঙ্গে রেজালা নয়ত আটু মুলাই খাই। অবশ্য আটু মুলাই টা ই আমার বেশী প্রিয়। তাও তো আজকাল বেশী খেতে পারি না … আগে রাত্রে ৮ -১০ পিস পরোটা আর দু তিন প্লেট মাংস খেয়ে ফেলতাম।
 
– তা রেস্টুরেন্টে তো প্রায় সব জায়গাতেই হাইজিনের কোন বালাই থাকে না। নিশ্চই ক্রনিক পেটের রোগ বাধিয়েছ ?
 
– না না ডাক্তারবাবু, আমাদের কিচেন খুব পরিষ্কার। শাক-সব্জী সব টাটকা দেখে বাজার থেকে আসে। মাংস , মাছ সব প্যাকেট করে আসে, সব প্রসেস করা দামী কোম্পানির মাল। আর সত্যি বলতে কি এই কবছরে দু একবার বাদ দিলে সেরকম পেট খারাপ কখনও হয়নি। শুধু এই দুর্বলতাটা, নিঃশ্বাস নিতে মাঝে মাঝে বড্ড কষ্ট হয় … ডাক্তারবাবু একটু দেখুন না, সবাই বলে আপনি ধন্বন্তরি, আমায় একটু ওষুধ দিন না …
 
– আচ্ছা বেশ, এই ওষুধটা লিখে দিচ্ছি, খাও দুবেলা খাবার পরে একটা করে, আর শোন এখন কদিন বাড়িতে রেস্ট নাও, একটু ঠিক হলে বোম্বে যাবে না হয় …
 
এই প্রথম ডাক্তার রায় স্পষ্ট কথার বদলে মিথ্যে বললেন। তিনি জানেন তাঁর লিখে দেওয়া দিনে দুটো করে প্যারাসিটামল কেন, কোন ওষুধই আর সারিয়ে তুলতে পারবে না রমেন কে। রোগটা এখন স্পষ্ট তাঁর কাছে। KURU বা স্পঞ্জিফর্মে আক্রান্ত রমেন কে তাও মিথ্যেই দিলেন ওষুধটা। কারণ আরও বড় একটা রোগের সন্ধান যে তিনি পেয়েছেন, যেটা এখনই সমূলে উপড়ে না ফেললে যে বড্ড দেরী হয়ে যাবে।
 
– ঠিক আছে রমেন, ওষুধটা খাও, আমাকে একটু বেরোতে হবে এখন…
 
– আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আজ তবে উঠি। নমস্কার।
 
রমেন বেরিয়ে গেল, ডাক্তার রায় ও তাঁর গাড়িটা নিয়ে বের হলেন। খুব তাড়াতাড়ি তাঁকে একটা টেলিগ্রাম করতে হবে বোম্বের মহাবলজীনগর পুলিশ স্টেশনে – “রেহানিয়া রেস্টুরেন্টে মানুষের মাংস বিক্রি হয় …”

উন্মাদের মস্তিষ্কলিপি

আশ্বিনের শারদ প্রভাতে বেজে উঠেছে আলোকমন্দির

পেঁজা তুলো মেঘরা ভাসে, বনসাই ছুঁতে চায় ঊর্ধ্ববাহু হয়ে

সাদা দিন কালো রাত, আর কিছু স্মৃতি আজো বরাদ্দ বন্দীর

টাকার বিছানা আর খ্যাতিরা তোলে সংযম পার্টিশন, সঙ্গদোষভয়ে

সাধারণ সাদা ঘর, ছেঁড়া চিঠির কিছু সস্তা অক্ষর কখনো পারেনি কোথাও দাগ কেটে যেতে

ছেলেবেলা, মেয়েবেলা, কিছু অপরিণত বিপ্রকর্ষী খেলা, কেউ কিছু ভাবত কি ঝালমুড়ি খেতে খেতে

এক গান, এক সুর, মিলিয়ে মিলিয়ে চলা বহুদূর তবু গুপ্ত থেকে যায় নিষিদ্ধ অসন্তোষ কিছু কিছু

ইচ্ছা অনিচ্ছা আদর, স্বার্থহীন স্নেহের চাদর উড়ে যায়, নিঃশব্দে পাল্টায় অভিমুখ সময়ের পিছু পিছু

ভূগোল খাতায় উপপাদ্য ইতিহাস উত্তর, অতি সাধারণ ম্যাড়মেড়ে সত্তর, কেরিয়ার ব্যারিয়ার সিন্ধু

হেসে খেলে ডিসকভারি পথে, অ্যারিজোনা নটিংহাম হয়ে বরবুদরের রথে, তবু মনে শিশিরবিন্দু

দ্বেষে দ্বেষে অবিরাম যুদ্ধে ক্লান্ত দ্বেষবাসী হেসে, ফলিডল মেশায় প্রতিগ্রাসে ভুলে গিয়ে, মরেছে সে অনেক আগেই

অকারণ ডাল ছিঁড়ে ঘোড়ানিম, নিষ্কাশে যন্ত্রণা অপরিসীম, যুগযুগ ধরে চলে একা অন্ধকার তবু থাকবেই…

রাখালিয়া – সংকলিত প্রথম পর্ব

শতদ্রু ও সায়ন্তনী

রাজকুমারী তোমার ছবি দেখি দূর থেকে দেওয়ালে। অনেক বড় হয়ে গেছ । কিন্তু দেখতে সেই আগের মতই মিষ্টি আর নিষ্পাপ । বিশাল বিশাল দুটো চোখের জ্বলজ্বলে আর্দ্রতা যেন দুটো ছোট্ট পৃথিবী। তোমার হাসি মাখা মুক্তোর মত ছোট্ট ছোট্ট দাঁত সেই আগের মতই প্রশান্তি ঢেলে দেয়। অবশ্য এসবই দেখা ঐ ছবিতে। মুখোমুখি চোখের নাগালে যে তোমায় দেখিনি কত দিন।

জানি এখন তুমি অনেক ব্যস্ত। কত দায়িত্ব, নতুন কর্তব্যের ভার তোমার ওপর। কত নানান দেশের রাজকুমার রাজকুমারীদের সঙ্গে তোমার নিত্যদিনের আনন্দ সমাবেশ। সেই ছেলেবেলার মত আমার বাঁশির সুর আর তোমায় মুগ্ধ করতে পারবেনা এখন। আমার একটা একটা করে খুঁজে পাওয়া বৈঁচির মালা আজ তোমার জন্য আসা সপ্তসাগরের সব চেয়ে দামী উপহারের সামনে লজ্জায় মুখ লুকোবে।

সেই মনে পড়ে সবুজ মাঠের জারুল গাছের তলায়, আমি তোমায় শোনাতাম রূপকথার গল্প ? তুমি শুনতে দুচোখ ভরা অপার বিস্ময়ে। আজ সেসব গল্প তোমার বিশ্বাস হবেনা। কারণ আজ তোমার পাণ্ডিত্য সর্বজন বিদিত। নানা দেশের পণ্ডিত বিদুষীরা তোমার নিত্য সহচর। আজ অক্ষর না চেনা রাখাল ছেলেটার গল্প যুক্তিহীনতার অপরাধে নির্বাসিত হবে প্রাসাদ থেকে অনেক অনেক দূরে, যেখানে আজও নীল কমল লাল কমলের ঠাকুমা চরকা চালায় আর ফোকলা গালের টোল খাওয়া মুখে চাঁদের আলো চমকায়।

সেই মনে পড়ে নবাবের মেলায় ? যেদিন নবাবের বাগানে হাজির হয়েছিল তোমারই বয়সী রাজকুমার আর রাজকুমারীরা। সেই তাদের সঙ্গে তোমার প্রথম আলাপ। কত খেলা, আনন্দ নৃত্য গীত। সেদিন তোমায় দেখব বলে বসেছিলাম সারা দিন ফটকের পাশে। আমি যে রাখাল ছেলে, ফটক পেরিয়ে তোমার সঙ্গে খেলার অধিকার যে আমার ছিলনা। তার পর আস্তে আস্তে কখন যেন বড় হয়ে গেলে তুমি।

তোমায় দেখতে গেছি অনেক বার। কখনও কটা বুনো কুল, কখনও কটা কাঁঠালি চাঁপা, আবার কখনও শুধুই আমাদের পুরোনো দিনের বন্ধু বাঁশিটা হাতে করে। প্রহরীরা আমায় ঢুকতে দেয়নি । তবু গেছি বার বার। শেষে সেদিন যেদিন তুমি হুকুম পাঠালে প্রহরীর মুখে। “তুমি রাজকুমারী, স্বৈরিণী তুমি, সামান্য রাখাল ছেলের সাথে দেখা করে কটা মনগড়া গল্প আর প্রলাপ শুনে সময় নষ্ট করার জন্য জন্ম হয়নি তোমার”। অদৃশ্য রক্ত ঝরেছিল অঝোরে। আর যাইনি। তুমি যে বড় হয়ে গেছ। রাখাল ছেলের সাথে কথা বলা যে আর মানায় না তোমায়।

আমাদের ছোটবেলার সেই রূপকথার গল্পগুলোতে কত অধরা স্বপ্নরা কি করে যেন সত্যি হয়ে যেত। রাখাল ছেলে তার রাজকন্যার সাথে সুখে ঘর বাঁধত ছোট্ট পর্ণকুটিরে। কিন্তু আজ রূপকথারা হারিয়েছে কোন দূর অরণ্যের গুহায় কিম্বা সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে।  আজ  যে  তোমার  রাজ প্রাসাদের  দরজায় কম্বিনেশন লক আর বন্ধুদের সমাবেশ আলো করে ডিজে বক্স। আজ আর রাখাল ছেলের প্রবেশাধিকার নেই তোমার জীবনের ভিজিটিং রুমেও।

তাই বাস্তবের বাস্তবিকতাকে মেনে নিয়ে স্বপ্ন দেখিনা আর। তোমার সমকক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার, ছিল না কোন কালেই। বুঝি। তাই রাখাল ছেলে আজ একা একাই ভালবেসে যায়।

দেওয়াল থেকে সন্তর্পণে খুলে আনা তোমার একটা ছবি আজ রাখাল ছেলের কথা বলার সাথী আর সকাল বিকেলের বন্ধু। রাখাল ছেলে এখনও সেই সবুজ মাঠের ধারে কুয়াশা ভরা ভোরে গরু চড়ায়, কাঁঠালি চাঁপার মালা গাঁথে আর দেশবিদেশের হরেক রূপকথা বলে যায় আপন মনেই। আর সন্ধ্যার কালচে নীল আকাশে যখন একটা একটা করে হীরের দানার মত তারারা ফুটে ওঠে, তখন সেই পুরোনো দিনের মতই পাতা ছাওয়া জারুল গাছের নীচে বাঁশিতে সুর তোলে রাখাল। বাঁশির সুর মাঠ ঘাট নদী পেরিয়ে মহাকালের পথ বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে দূর, বহু দূরের দিগন্তে।

ও বাঁশি ওভাবেই বাজবে চিরকাল। কত একসাথে বৃষ্টি ভেজা বিকেল, দু পয়সার সস্তা মিঠাই ভাগাভাগি করে খাওয়া, দুই প্রাণের সখার আরও কত হারানো দিনের, কথা বলবে। একটা সময়ের কথা, যখন তুমি রাজকন্যা হওনি। যখন তোমার সব আনন্দ অভিমান রাখাল ছেলের সাথে ভাগ করে নিতে মানা ছিল না, সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।

রাজকন্যা, যদি আবার কোনোদিন পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসে, হয়ে আসে চার দেওয়ালে বন্দী। জানালায় এসে বাতাসে কান পাত। রাখাল ছেলের বাঁশির সুর শুনতে পাবে।

প্রিয় রাজকুমারী,
তোমার দয়াপরবশতার ভিক্ষার মত করুণায় ছুঁড়ে দেওয়া চিঠি লেখার সম্মতির জন্য তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আসলে কি করা যাবে বল, সেই কোন ছোট্ট বেলা থেকে মনের সব কথা, অনুভূতি পরস্পরের সাথে ভাগ করে নেওয়া আমাদের অভ্যাস। ।
না না ভুল বললাম, আমাদের নয়, কারণ তুমি তো এই অভ্যাসটা কবেই ঝেড়ে ফেলেছ, ঠিকই করেছ, দৈন্য-সর্বস্ব তুচ্ছ মানুষরা পরজীবীর মত, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বদ অভ্যাস না থাকাই তো ভাল।
যাই হোক, তবু একতরফা বার্তা পাঠানোরও একটা স্বস্তি আছে, ছবির সঙ্গে কথা বলে যাওয়ার থেকে অন্ততঃ এ অনেক অনেক ভাল। আমার পাঠানো চিঠির খামে তোমার হাতের স্পর্শ লাগছে, এতেই আমার শান্তি। সে যতই তোমার প্রাসাদের পিছনের আস্তাকুড়ে না খোলা খামের পাহাড় জমা হোক না কেন।
এমন দয়াটুকুই বা কে করে বল। ছোট্ট বেলার সেই তুচ্ছ কয়েকটা বৈঁচি ফল আর বুনো ফুলের মালার প্রতিদানে তোমার এত করুণা ! … সত্যিই তুমি যথার্থ রাজকুমারী।
রাজকুমারী, তোমার প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার, এমনকি কোন অভিমান ও না। সে যা ছিল সেসব মান অভিমান তুলে রাখা আছে তোমার ছোটবেলার জন্য।
আবার যদি কোন দিন কুয়াশা ভরা মাঠের ধারে সেই ছোটবেলায় ফিরে যাই অন্য কোন জন্মে, যদি আবার দেখা হয় ভীষণ মিষ্টি এক ছোট্ট রাজকুমারীর সঙ্গে এক ছোট্ট রাখাল বালকের। রাজরক্ত বা সাধারণের পরিচয়ের খোলস ফেলে রেখে সবুজ ঘাসের ওপর, সেই দিন হিসেব হবে যত মান অভিমানের।
এখন যে আমি শুধুই এক মেঠো লোক, রাজকুমারীর করুণাভিক্ষুক।
তবে রাজকুমারী তোমার জন্য বড্ড চিন্তা হয় আজকাল। সময় যে তার খাতার পাতায় পাতায় কালপ্রবাহে ভেসে যাওয়া শুকনো পাতাদের তুলে রাখে যত্ন করে।
তাদের প্রতিটি হিসেব লেখা থাকে খাতার তলায়।
রাজকুমারী, তোমার নিষ্ঠুরতা, তোমার অবজ্ঞা যে তোমার দিকেই অমোঘ গতিতে ফিরে আসছে, তুমি তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছ কি ? অন্য কোন আয়না থেকে বিচ্ছুরিত প্রতিফলন যে একদিন ছুঁয়ে ফেলবেই তোমাকে তোমার অজান্তে।
সেদিন যদি লাল কমলের নীল কমলের দেশে ফিরে যাও রূপকথা আর রাখালিয়া সুরের খোঁজে, বুলডোজার আর বৈদ্যুতিক করাতের শব্দে নতুন ঠিকানা শুনতে পাবে তো ??? অচীনপুরের রাস্তায় ওঠা বড় বড় ফ্ল্যাটের আর আই টি নগরের স্কাইস্ক্র্যাপারে দাঁড়িয়ে মাটি ছুঁতে পারবে তো ??? শিকড়টা… ???

ইতি, তোমার ছেলেবেলার রাখাল

“রাখাল পিছু ফিরে একবার দেখল আর এগিয়ে চলল মগ দেশের দিকে।
কুহকিনীকে কুহকিনী জেনেও ভালবাসা যায়, আপন করে নেওয়া যায়। হয়ত তার মায়া জগতের স্বরূপ বুঝেও তাতে স্বচ্ছন্দ থাকার অভিনয় করা যায়। কিন্তু সে বড় ভঙ্গুর, কারণ কুহকী হৃদয় থেকে উৎসারিত গরলের সংক্রমণে রাখালের হৃদয় যে অভ্যস্ত হয়ে যাবে …… নিজের সমস্ত অনুভূতিগুলো অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যের মত ছুঁড়ে ফেলে দিতে।
মাথা নাড়ল রাখাল, নাঃ এভাবে পরিণতি আসে না। আবার এগিয়ে চলল, সামনে অনেক পথ ……”
* * *
খুব শিগগীরই আসছে “কুহক দেশে রাখাল” … তার শেষ অংশটাই টিজার হিসেবে রইল ।

রাখাল যদি সত্যিই কল্পনার জগতের চরিত্র হত, তাহলে কাহিনীটা হয়ত বেশিদূর গড়াত না। কারণ কল্পনা বুনে তোলা কল্কার মত রাখালের জীবনটাও হত ব্যালেন্সড আর পারফেক্ট। সে ডাইমেনশনের রাখাল কুহক দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক পা হাঁটার পরেই কোথা থেকে এক কবুতর টুপ করে তার কাঁধে বসত। কয়েক দণ্ড তীর বেগে ওড়ার ক্লান্তি জুড়িয়েই পায়ে বাঁধা লিপি তুলে দিত রাখালের হাতে।
“রাখাল তুমি পারলে আমায় ফেলে রেখে চলে যেতে ? পারলে আমার নিশ্চিত বন্ধুহীনতা আর একাকীত্বের পরিণতি জেনেও দেশান্তরের পথে পা রাখতে ? চেয়ে দেখ আমার মায়াদণ্ড আমি নিক্ষেপ করেছি উপলব্ধির আগুনে। কালের অমোঘ নিয়মে আমার মায়াশহরের লুণ্ঠিত পরিত্যক্ত পরিণতি আজ আমার দু চোখ ভরে ডেকে আনছে হঠাত করেই হারিয়ে যাওয়ার ভয়। যে ভয়কে দুর্বলতা ভেবে এতদিন উপহাস করেছি, তার আর্তনাদ চাপা পড়েছে স্বার্থান্বেষী স্তাবকদের জয়ধ্বনিতে।
রাখাল আজ যখন সন্ধ্যা নামছে পৃথিবীর বুকে তখন আমার মায়ায় আমার অলকাপুরীতে শরতের রোদ। কিন্তু আমি যে ক্লান্ত, একঘেয়ে জয়ধ্বনির শব্দে। আমার অনন্ত যৌবন, আমার মাদকতার অভিশাপ আমার কন্ঠ রোধ করছে।
রাখাল, আজ প্রাণ চাইছে মায়ার আবরণ সরিয়ে জগতের মুখোমুখি হতে। শরতের শ্যামলিমা আর নীলাকাশের অভিনয় কাটিয়ে গোধূলি ভরা সন্ধ্যাকে প্রত্যক্ষ করতে। হীরক খচিত কেয়ূরে পার্লার ফ্যাশনড কেশরাজীকে উন্মুক্ত করে দিয়ে তোমার হাত ধরে বেরিয়ে পড়তে পৃথিবীর খোঁজে। একটা বাস্তব দিনের শেষে, কোন বন্য ঝরনার পাশে তোমার চওড়া বুকে মাথা রেখে মনের কবরে দাফন করা অনুভূতিগুলো পুনরজ্জীবিত করতে।
আমায় সঙ্গে নেবে না রাখাল ?”
কিন্তু দুঃখের কথা হল যে আমার কলমের ভিতর দিয়ে আপনাদের সামনা সামনি হেঁটে আসা রাখাল বাস্তবের এক কার্বণিত অনুলিপি, কার্বনের প্রলেপে তার রঙ কখনও চেঞ্জ হয়ে হয় নীল কখনও কাল, কিন্তু অবয়ব বদলায় না।
তাই আমাদের রাখাল অবাস্তবের কবুতরের অর্থহীন অপেক্ষা করেনা। দিনের শেষে যখন আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটে ওঠে তখন ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার বাঁশির সুর আকাশ বাতাসে ক্ষণিকের স্বপ্ন আঁকে । কিন্তু সে ক্ষণিক মাত্র … কাল যে তাকে আরও পূর্বে এগিয়ে যেতে হবে, মগ দেশের দিকে, অনেক পথ যে বাকি ………

পাঠকগণ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে রাজকন্যার ছ্যাঁকা ভুলতে রাখাল তার আরেক ছোটবেলার অম্লমধুর বান্ধবী সম্রাজ্ঞী ঐশিকার রাজ্যে যাত্রাকালে কৈশোর কৌতূহল বশতঃ পথীপার্শ্বের সন্ন্যাসী দের ছিলিম হইতে কিঞ্চিত গঞ্জিকা সেবন করিয়া তূরীয়লোকে বিরাজ কচ্ছে এবং “কুহকীনি, মগ , বালতি” ইত্যাদি ভুল বকিতেছে।
পাঠক ঐসব প্রলাপে কর্ণ দিয়া কালক্ষেপণ করবেন না।

কি পাঠক ? আগের ঝটকা টা হজম হয়েছে তো ? কোথায় কিসব কুহকিনী-ফিনি বেশ একখানা রহস্য রহস্য কিছুটা আঁশটে টাইপ একটা ব্যাপারের আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। ওমা ! বেরসিকের মত সব গাঁজার ধোঁয়ায় উড়ে গেল !!!!
একী খিল্লি হচ্ছে নাকি ?
* * *
ধীরে পাঠক ধীরে, উত্তেজিত হবেন না। এই গাঁজার ব্যাপারটা আপনার “গ্যাঁজা” লাগেনি ?
সুকুমারমতি রাখাল যার গালের ঘ্রাণ নিলে এখনও দুধের মৃদু গন্ধের অনুভব হবে, যার মন এখনও পড়ে আছে সেই ছোটবেলার পাতা ঝরার দিন গুলোয়, যে রাখাল প্রেম বলতে শুধু ছোটো বেলার মান অভিমানে গড়া বন্ধুত্বের সম্পর্ক বোঝে তার হাতে কীভাবে এল গাঁজার কলকে ??? এই খটকাটা লাগেনি একবারও?
* * *
হ্যাঁ পাঠক, গোলমালটা আপনার মত রাখালের নিজেরও চোখ এড়ায়নি। গাঁজার রাসায়নিক বিষক্রিয়ার মধ্যেও অন্তরের কোন গোপন কোণ থেকে একটা অস্বস্তি, একটা জেনেও না জানা প্রশ্ন যেন উঠে আসতে চেয়েও কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে । হঠাত মুক্তি পাওয়া কিছু অচেনা অদেখা অনুভূতি যেন শিরার আড়ালে গোপনে ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। এ কেন হল ? কীভাবেই বা হল ? কেনই বা সে তার নিজের গ্রামটি ছেড়ে বেরিয়ে এই অচেনা অরণ্যে এল ? কীভাবেই বা এল ?
প্রশ্নের ভিড়ে শিয়ালকাঁটার মত চিন্তারা যখন জড়িয়ে যাচ্ছে , জট পাকাচ্ছে তার স্বত্বায়, কিছুতেই নিজেকে আলাদা করতে পারছে না এই নেশাতুর বিহ্বলতা থেকে, তখনই একটা অচেনা কিন্তু গভীর অনুভূতিময় নাম রত্নাকরের গহীন ডুবন্ত তল থেকে উঠে আসা রজতশুভ্র বুদবুদের মত উঠে এল তার মননে ……”হেমা”।
আর প্রায় বিদ্যুৎ চমকের মত তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছু দৃশ্যপট। ভীষণ চেনা কিন্তু পূর্বজন্মের স্মৃতির মত, অবিশ্বাস্য।
হ্যাঁ পাঠক, আজ সেই চিত্রকল্পগুলো বুনে চলব ঊর্ণনাভের মত জটিল গঠনে। এ কাহিনী এক অচেনা অনুভূতির …
এ কাহিনী রাখালের বড় হয়ে ওঠার …

বাই দ্য ওয়ে, একটা গোপন খবর দিয়ে রাখি।
রাজ্যাভিষেকের দিন সক্কাল সক্কাল অচীনপুর গ্রামে বিশাল একদল সৈন্য কুচকাওয়াজ করতে করতে হাজির। সটান রাখালের বাড়ির সামনে গিয়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে, লোক জমিয়ে, রাজকন্যার পাঠানো শমন পড়ে শোনালো –
“এত দ্বারা নির্বোধমতি রাখালকে জানানো যাইতেছে যে রাখাল ও রাজকন্যার কৈশোরকালের যে যুগল তৈলচিত্রটি রাখালের ঘরের দেওয়ালে ঝুলন্ত ছিল সেটি রাজকন্যার বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিরিয়াস সমস্যা সৃষ্টি করছে। এরকম উচ্চ সিংহাসনে আবিষ্টা রাজকন্যার অভিজাত নতুন বন্ধুবর্গ যদি কোনভাবে এই চিত্রটি দৃষ্টিগোচর করে ফেলেন তাহলে তো রাজকন্যার মান সম্মান বলে আর কিছু থাকবেই না। অতয়েব যত শীঘ্র সম্ভব ওটিকে স্থানচ্যুত করে ধংস করে ফেলতে আদেশ প্রদান করা হল ”
শুরু হয়ে গেল হই হই রই রই, অবহেলার অফিসিয়াল প্রয়োগ।

 

বোকা রাজকন্যা জানেই না রাখাল আজ অনেক অনেক দূরের কোন দেশে নিরুদ্দেশ। আর যাওয়ার আগে তার সমস্ত ছোটবেলা সে জমা রেখে গেছে লুকোনো কোন পাহাড়ের গুহায় অনন্ত কালের জিম্মেদারীতে, সারা জীবনের খোঁজেও আর কখনও তাকে ছুঁয়ে দেখতে পাবেনা কোন উপায়েই।


কুহক দেশ, রাখালের বড় হয়ে যাওয়ার গল্প

জোর করে কোন অজানা উদ্দেশ্যে রিইনফোর্সড রাসায়নিক নেশাটা কাটিয়ে উঠল রাখাল। হেমা, কেন এই নামটা মনের মধ্যে মিশে যাওয়ায় স্বত্তারা অবাক হচ্ছেনা ? কে এই হেমা ?
মনের বিশৃঙ্খল চিন্তারাজির অস্থিরতায় দিশাহীন রাখাল কোঁচড় থেকে বাঁশিটা টেনে বের করল। কিন্তু এ কি বাঁশির গায়ে এ কি অদ্ভুত রক্তিম অধর লিপি ? ভুলে যাওয়া প্রতিবর্তক্রিয়ার মত স্মৃতির কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা রাখাল সুর তুলল বাঁশিতে। কিন্তু এ সুর যে রাখালের অচেনা, কোথায় তার সেই আনন্দময় ভোরাই বা বিষাদঘন সান্ধ্য মূর্ছনা ? তার ভাঙা বাঁশিতে এমন পূর্ণতার সুর এল কি করে ?
ভাবনা সমুদ্রের গভীর তল স্পর্শ করার বৃথা চেষ্টা না করে রাখাল ডুব দিল সুরলহরীর স্রোতে। আর তার চোখে ভেসে উঠল সেই দিনটি যেদিন গ্রাম ছেড়ে, রাজকন্যার রাজত্ব পেরিয়ে সে এসে পৌঁছল অদ্ভুত এক অরণ্য সমীপে । সন্ধ্যার অন্ধকারে তখন একটি একটি করে তারা ফুটে উঠছে আকাশে। কিছুতেই সেই অরণ্য কোথায় মনে করতে পারছেনা রাখাল, খুঁজে পাচ্ছেনা কোন পথ নির্দেশ …
সে অরণ্যের গাছগুলি যেন অন্য কোন লোকের অপার মায়াবী আলোকে নিজেদের রূপ, রস, গন্ধের ডালি সাজিয়ে পথিককে আহ্বান জানাচ্ছে, “এস পথশ্রমক্লান্ত পথিক, আমার আশ্রয়ে এসে নিজের ক্লান্তি জুড়িয়ে যাও, আমার দেহরস মন্থিত ফলে রসনা তৃপ্তি কর, আমার সৌন্দর্যে শ্রান্ত চোখদুটিকে পুনরুজ্জীবিত কর”। রাখাল অপার বিস্ময়ে এই অপূর্ব সৌন্দর্যকে প্রাণভরে দেখতে লাগল, এমন সময় কোন এক অজানা উৎস থেকে বয়ে আশা বাতাসে ভীষণ চেনা এক গন্ধ তার সমস্ত স্বত্তাকে আবিষ্ট করে ফেলল। এ সুবাস তার খুব চেনা, অনেকটা সাঁঝ প্রদীপ জ্বালবার অবকাশে মায়ের পাটের শাড়ীর আঁচলের মত, অনেকটা সেই সব কুয়াশা মাখা ভোরের মত, অনেকটা রাজকন্যার এলো চুলের পাগল করা ঘ্রাণের মত।
মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে চলল রাখাল। তার অনুভবের অগোচরে পায়ের চাপে গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকল পথের নীচে জমে থাকা অগণিত বাঁশি ধরা হাতের ব্যর্থ ফসিল।
চলতে চলতে রাখাল এসে পৌঁছল সুন্দর এক প্রাসাদের সামনে। স্মৃতির জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা তার চোখ লক্ষ্যও করল না মাথার উপর তারকা খচিত কালচে আকাশ অদৃশ্য হয়ে তার স্থানে আবির্ভাব ঘটেছে শরতের সোনা ঝরা অলৌকিক নীলিমার।
প্রাসাদে প্রবেশ করল রাখাল।
অসম্ভব সুন্দর ভাবে সাজানো কক্ষগুলি অচেনা মায়াবী আলোয় আলোকিত। কক্ষের কোণে কোণে সাজান নিখুঁত মর্মর মানবমূর্তি, ঠিক যেন জীবন্ত। কোন কক্ষে সাজান নাম না জানা দেশী বিদেশী ফল, কোথাও মদিরা, কোথাও বা রাজৈশ্বর্য্য। রাখাল দুচোখ ভরা বিস্ময়ে দেখল সব কিন্তু তার মনের দেওয়ালে কোথাও লেখা হলনা কিছু কারণ তার সমস্ত মনন তখন অধিকার করে রেখেছে নাম না জানা এক গন্ধ, খুব চেনা আবার চেনা নয়ও।
হর্ম্যসোপান বেয়ে দ্বিতলে পৌঁছল রাখাল। এতলের সব কিছুই গাঢ় লাল। চোখ ঝলসে দেয় তার উগ্রতায়। কক্ষের পর কক্ষ পেরিয়ে চলল রাখাল। জনহীন নিশ্চুপ, শুধু সেই অদ্ভুত গন্ধ। হঠাত এক আধোছায়া কক্ষে এসে থমকে দাঁড়াল রাখাল। কক্ষের রূপসজ্জায় হালকা হাওয়ায় মৃদু দুলতে থাকা অর্ধস্বচ্ছ পর্দার আড়ালে ঐ লাল মখমল শয্যায় ফিনফিনে রেশমের সামান্য আবরণে ও কে ?
এ তো রাজকন্যা নয় তবে কেন এর শরীরে সেই একই চেনা সুবাস ? এ তো তার কৈশোরের সাথী, তার একমাত্র প্রেম নয়, তবে কেন এর আয়ত চক্ষু দুটি থেকে চোখ ফেরাতে পারছেনা রাখাল। কেন ঐ নিষিদ্ধতার মত গাঢ় লাল রেশমের দিকে বার বার তাকাতে ইচ্ছে করছে ? এ কোন অজানা অনুভূতির আক্রমণে ভেসে যাচ্ছে রাখালের সমস্ত স্বত্তা ?
“রাখাল তুমি এসেছ ? আমার কাছে এস রাখাল, আমি যে কত দিন ধরে অপেক্ষা করেছি তোমার”
আচ্ছন্নের মত এগিয়ে গেল রাখাল। শয্যাপার্শ্বে উপবিষ্ট রাখালের হাতে মাখন কোমল হাতের স্পর্শ আগুণ ধরিয়ে দিল রাখালের চেতনায় । কয়েক মুহূর্তের আকস্মিক সুনামিতে কোথায় যেন ভেসে গেল রাখালের শৈশব । এক অপ্রতিরোধ্য কৌতূহল আকর্ষণের রূপ নিয়ে জানতে চাইল তার অদেখা পৃথিবীকে, চিনতে চাইল তার অচেনা অনুভবকে। রাখাল হারিয়ে গেল, তলিয়ে গেল এক নতুন অনুভূতির চোরা স্রোতে। পথের নীচে চাপাপড়া, ঘরের কোণের ফসিলরা তারস্বরে জয়ধ্বনি দিতে লাগল । প্রতিবিষের দহনের মত হঠাত জ্বলে ওঠা দাবানলে ছাই হয়ে গেল রাজকন্যার অস্তিত্ব । উড়ে গেল দক্ষিণা বাতাসে।
নিদাঘের ছাতিফাটা তৃষ্ণায় কপিত্থ সুবাসিত তক্রের মত মধুর অনুভূতির গহীন থেকে হঠাত জেগে উঠল রাখাল। তার নিরাবরণ শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে জেগে উঠল উইথড্রলের খিঁচুনি। কতকাল কেটে গেছে খেউরি তে মনে করতে পারল না রাখাল।
না স্বপ্ন নয় কারণ চোখের সামনে এখনও যে সেই মোহময়ী দুটি চোখ। কিছুটা কৌতূহলী কিছুটা আশঙ্কিত, এক দৃষ্টে কিসের সন্ধানে রাখালের মুখে নিবদ্ধ ? শৈশবের ছেড়ে যাওয়া কক্ষের দখল নেওয়া পরিপক্ব উপলব্ধিরা রাখালের মস্তিষ্কে ক্যালকুলেটেড বোধ কে সম্যক করে ফুটিয়ে তুলল তার চোখের তারায়। মুখ ফিরিয়ে নিল রাখাল।
প্রচণ্ড ক্রোধ আর অস্তিত্বের টানে কামনালাল ওষ্ঠের দুই ধার হতে বেরিয়ে আসা সুতীক্ষ্ণ দুটি দাঁত তার উদ্দাম আক্রমণে রাখালের শরীর ভেদ করে তাজা রক্তস্রোতে পৌঁছে থমকে গেল ঘটনার আকস্মিক উপলব্ধিতে। রাখালের রুধির জুড়ে এ কোন অপূর্ব স্বাদ! এ তো ঘৃণা নয়, লালসা নয়, এ যে গভীর অনুকম্পা। এ স্বাদ
তো আগে কখনও তার সমস্ত মননকে এভাবে ধিক্কার দেয়নি। মোহময়ী জ্বলন্ত অক্ষিপটে এমন শান্তির বর্ষা নামায়নি। তার সমস্ত হৃদয়কে এমন ভাবে ভালবাসার স্রোতে উত্তাল করে তোলেনি। কিন্তু না, এখন থাক … এখনও যে সময় আসেনি …
না, হেমা নামের কুহকিনী এখন তার স্বরূপ জানতে দেবেনা রাখালকে, কিছুতেই দুর্বল হয়ে পড়বেনা সে, বুঝতে দেবেনা রাখালের অন্তরে সঞ্চিত গভীর প্রেমের মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছে তার সত্যিকারের ভালবাসা, মুক্তির মন্ত্র । অলৌকিক মন্ত্রে ভুলিয়ে দেবে কুহক দেশের স্মৃতি। অভিমানী রাখালকে এগিয়ে যেতে দেবে তার নিরুদ্দেশ যাত্রায়, নিজেকে আবিষ্কারের যাত্রায় ।
ত্রিকালজ্ঞা হেমা জানে মহাকালের অমোঘ নিয়মে একদিন ফিরবে রাখাল, স্রষ্টার অপর স্বত্তার প্রকাশ রূপে। সেই রুদ্রের স্পর্শেই শাপমুক্তি তার। যেদিন সাধিকা তার কামনাময়ী দুঃসহ আগুণের রূপের খোলস ছেড়ে ফিরে পাবে তার তুষারের মত শান্তির তপঃক্লিষ্ট রূপ। সেই শুভক্ষণটির পথ চেয়ে আজ থেকে সে জন্ম দেবে নতুন নতুন লহরীর, বাল্মিকি কিম্বা প্রতিভার গল্প শুনিয়ে …… আর অপেক্ষা করবে … তার সত্যিকারের ভালবাসার, … পরিপূর্ণতার

কি ? বন্ধুরা সব রাখালকে ভুলে গেলেন নাকি ? সেই যে সেই অভিমানী ছেলেটা … যে তার অতীতের অবহেলার আত্মগ্লানি আর ব্যবহৃত উচ্ছিষ্টের মত পরিত্যক্ত হওয়ার ক্ষত বুকে নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল নিরুদ্দেশের যাত্রী হয়ে …জানেন সে আজ কোথায় ???
নাঃ আজ আর সে কোন রাজকন্যা বা কুহকিনীর নিষ্ফলা খোঁজে ঘুরবেনা দেশ থেকে দেশান্তর, অপেক্ষা করবেনা সাক্ষিবটের তলায় যুগ যুগান্ত পেরিয়ে … অবদমিত হীনমন্যতা আর ক্ষোভে ক্লীশে হয়ে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করবে না কম্প্রোমাইস আর নিজের সত্ত্বার রিমেকে …

আজ সে এক অন্য নেশায় মদির, জীবনকে ভালবাসার মন্ত্র শিখে। আজ তার গায়ে রেশমি চুলের ফুলেল তেলের গন্ধ ম ম করে। আজ তার বাঁশি মন ভাঙা বিষাদের সুর নয়, গায় পূর্ণতার গান ।

আজ কোন নাম না জানা গাঁয়ের শ্যাওলা ধরা নির্জন ঘাটের ধারে পাথরের আড়ালে চলে লুকোচুরি খেলা আর কিছু মুঠো আলগা হওয়া আদরেরা ঝরে পড়ে এদিক ওদিক …

সেই অচেনা গ্রাম থেকেই প্রবল দিকশূণ্য ঝড়ে উড়ে এসেছে একটা চেনা চিঠি …… রাখাল তার রাখালনীকে খুঁজে পেয়েছে

 

১০

এক টুকরো ছবি, চিঠির শুকনো হলদেটে পাতাটা থেকে চিত্রকল্পের হাত ধরে উঠে বসে, জগতকে শুনিয়ে যায় কিছু না জানা কথা । অতি সাধারণ দুটো মানুষ আর তাদের মিষ্টি একটুকরো প্রেমের গল্প।
ধানসিঁড়ির বালি চকচকে পাড়ে রাখালনি হয়ত তার খাটো করে পরা শাড়ির বাইরে উঁকি দেওয়া রোদ আর ধুলোমাখা শামলা পা দুটো অল্প অল্প জলে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
আর রাখাল তার কোলে মাথা রেখে আনমনে এক হাত জলের ওপর বোলাচ্ছে। কখনও হয়তো ইচ্ছাবশতই সেই জল স্পর্শ করে যাচ্ছে রাখালনীর পায়ের নরম পাতা আর অবাধ্য বুড়ো আঙ্গুল তার ছন্দমদিরা তে অবশ। তখনই সরল রাখালনীর মেঠো হাসির ঝংকারে রাখালের সব সত্তারা আচ্ছন্ন।
রাখালনীর হাতে একটা ছোট্ট বুনো ঘাস ফুল। রাখালের কপালে সে ছুঁয়ে দিল আলতো করে। রাখাল ঘুমিয়ে পড়তে চাইছে, কিন্তু রাখালনী যে তাকে দেবে না ঘুমোতে।
তারপর এক মিষ্টি বন্য হাওয়া, রাখালনীর রেশম চুলের আলগোছ হাত- খোঁপা মুহূর্তে এলোমেলো। আর রাখালের মুখের ওপর ঝরে পড়ল রেশম কোমল বন্যা। হঠাৎ অপ্রস্তুত রাখালনীর তার অবিন্যস্ত চুলের ভেতর দিয়ে একটা ভেজা মাটির গন্ধ নাকে এলো, তারপর ঝরল বৃষ্টি তার ঠোঁটে। সে খুব মুষল ধারে বৃষ্টি; ধানসিঁড়ির জলে তার প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি আর রাখালনীর শরীর জুড়ে তার উদ্ধত বিচরণ। তারপর রাখাল আর তার রাখালনী হারিয়ে গেল, একসাথে অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে গেল ধানের শিষের ওপর এক বৃষ্টি ফোঁটার আড়ালে।

১১

অচিন গাঁয়ের লোকগুলো না, কীইই রকম … যেন। বাঁকা চোখে যখন তখন নির্বাক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সংক্রামক অস্বস্তি আর সন্দেহের আরকে ডুবিয়ে। অবচেতনের চাওয়া আর না পাওয়াদের ভিড়ের স্রোতে, স্মৃতির পদধ্বনির কায়াহীন কুয়াশার ভয়ে রঙ পাল্টায় ড্যাবড্যাবে চোখের নজরদারীতে।

দেখছিস হাওয়াটা পোড়া লোহার মত আসতে যেতে শরীরের ভিতর অব্দী ছ্যাঁকা দিয়ে যাচ্ছে। রক্তরঙা পলাশের চোখ ধাঁধানো রূপের আগুণ সে নয়। এই তপ্ত জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় প্রহরে উল্টোমুখ উনুনের মত লেলিহান অদৃশ্য শিখায় সমস্ত চরাচরের অন্তরস্থ রস যেন কোন অদৃশ্য পথে প্রতিসরণ সৃষ্টির কম্পিত পদচিহ্ন ফেলতে ফেলতে অন্তর্হিত হচ্ছে, শোষিত হচ্ছে মহাশূন্যের বুকফাটা তৃষ্ণা নিবারণের নিষ্ফল প্রচেষ্টায় । এই পরিত্রাণহীন দহন থেকে মানুষ একটু জুড়োতে চাইবেনা, একটু ছায়া ঘেরা অর্ধবাস্তবের দেশে পালাতে চাইবেনা বল ?
তোরা বলিস, এসব অজুহাত। নইলে এই মাটি চিড় খাওয়া রোদ ঝলসানো নিদাঘের মেঠো পথে কি করে এরা দুটোয় একে অন্যের কোলে মাথা রেখে নদীর দুকুল ভাসানো স্রোতের ঠাণ্ডা আমেজ মেখে নেয় ? কি করেই বা রাখাল রাখালনীর আর রাখালনী রাখালের বুকে মুখ ডুবিয়ে বরফের শীতলতা, স্নিগ্ধতা অনুভব করে সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে ?
জানি এই অবুঝ প্রশ্নের অকাট্য উত্তর মেলেনা ফ্রয়েড কিম্বা বিশ্বকোষে, যেমন মেলেনা হিমশীতল বরফকন্দরে রাখাল রাখালনীর কালাতীত আলিঙ্গনের অফুরান উষ্ণতার রহস্যের সমাধান। শুধু দুটো প্রাণ তোদের দমবন্ধ করা আগ্রাসন থেকে বাঁচতে চায় আর পালিয়ে যায় আদিম বৃক্ষের আড়াল দেওয়া অরণ্যে
আলফা আলফা ঝোপ ঢাকা একটু গোপনীয়তার স্তেপে …… শুধু একটু সিক্ততার লোভে …

“আয় অতলান্ত প্রেমে ডুবিয়ে দিই,
ভিজিয়ে দিই, প্রেমহীন শহরটার
প্রাণহীন উন্নাসিক স্কাইস্ক্র্যাপারদের …”

১২
একটু পিছনো যাক

বহু দিগদিগন্ত ঘুরে; উত্তরের পর্বতমালা থেকে দক্ষিণের সাগরপার পেরিয়ে; পাহাড়িয়া , বন্য কিম্বা নোনা হাওয়ার কান্না সমস্ত তার বাঁশি তে জমিয়ে রাখাল তখন পরিশ্রান্ত। আর চাইনা তার রাজকুমারী, চায়না সে কোন কুহকিনীর মায়াজালে বন্দী পতঙ্গ হয়ে বাকি জীবন অর্ধমৃত হয়ে থাকতে । সে শুধু হেঁটে চলবে জন্ম-জন্মান্তরের আলপথ বেয়ে, নিজের ছায়াসঙ্গী হয়ে; সমস্ত চোখের জল তার বাঁশির মধ্যে দিয়ে বাতাসে মিশিয়ে দেওয়া হবে তার কাজ।
চলতে চলতে রাখাল শুনল প্রকৃতির অনেক গোপন কথা , জানল তাহার সকল ব্যথা।
তেপান্তরের মাঠের সেই সর্বজ্ঞ বৃদ্ধ, যার বয়সের হিসেব নেই রাখালের আয়ত্তে, তার কাছে শিখল অমরত্বের মন্ত্র।
বা সেই নদীর পারের ব্যঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী? জানলো দেশ-বিদেশের কতসব রহস্য। পাঠশালের পুঁথিতে যার খোঁজ নেই।

আর সেই লালমাটির দেশের চু-কিতকিত খেলা উলঙ্গ শিশু দের প্রাণোচ্ছল হাসি শুনে ভাবলো কতটা স্বার্থপর তার পার্থিব চাহিদা গুলো।
এত জেনেও, এত শিখেও রাখালের একটাই দীর্ঘশ্বাস।
সে বাঁশি তে এত রঙিন সুর বাজায়, এত দিকে দিকে তার সমাদর; তবু কোথায় যেন একটা কিসের অভাব। সারারাত জেগে করুণ সুরবিন্দু যখন ঝরে ঝরে পরে তার বাঁশি বেয়ে, কেউ পাশে থাকেনা তার চোখের জলের আলপনা আঁকতে। কোন আলতো স্পর্শ রাখালের মনের নীল বন্দরে নুড়ি বিছিয়ে প্রতীক্ষা করে না তার স্বপ্নালু প্রত্যাবর্তনের।
রাখাল জানে এ মরুতে বাঁচার মত জল নেই রাজকুমারীর চোখ-ঝলসানো রূপে বা হেমার মোহময়ী কামাতুর আহ্বানে। তাই আর সে ফিরে যাবে না সেসবখানে। সে জানে তার অভাব টা হয়তো খুব অমূলক, কারণ সে যে একটু আলাদা আর পাঁচজনের চেয়ে।
তাই থাকল সে বসে, ফিরতে লাগলো বাঁশি বাজিয়ে ।

সে রাত্রে ভীষণ ঝড় উঠেছিল, একাকী রাখালনীর কুটিরকোণের আলো ততক্ষণে নিভে গেছে। মা হারানো হরিণ শাবকের মত ভীত-চকিত সে অন্ধকারপানে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল আয়তনেত্রে। বাইরে তখন প্রলয়, রাখালনীর বুকের ভেতরেও অস্তিত্বের সমুদ্রমন্থন। কাল এমনই এক দুর্যোগরাতে তার ভিনদেশী সওদাগর, তার প্রেমিক, তাকে ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে চেনা হাতছানির টানে।

যাক যাক যাক ভেসে সৃষ্টি। আসুক আজ বন্যা। ঘুমিয়ে পড়ুক রাখালনী, চিরতরের মত আচ্ছন্ন হয়ে যাক মায়া ঘুমে। যে ঘুম ভাঙবে না কোন জাদুকাঠির ছোঁয়ায়।
সে যে সামান্য রাখালনী। রাজা-রাজরা ,সওদাগরের স্বপ্ন দেখা কি তার সাজে?
তবু যেন কোথায় একটা খামতি। সওদাগর কে সে মন দিয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই নিজের সীমা-পরিসীমা উত্তীর্ণ করা সেই মাতাল ভালোবাসা? যার গল্প শুনেছে সে নদীর ঢেউয়ের কাছে, সেটা আস্বাদন করা হয়ে ওঠেনি রাখালনীর।
সব প্রেমের এক্সপায়রি ডেট থাকে যেমন, তার প্রেম ও নিভে যাবে অচিরেই , জানে সে। আগুন নিভে যাবে, কিন্তু পোড়া দাগ টা জ্বলবে অনেকদিন আরও।
সে প্রেমে পড়েছিল, কাল অবধি সে প্রেমকে ভালোবাসা ভাবার ছেলেমানুষি টুকু করেছিল।
আজ এই উত্তাল প্রলয়ের রাতের দুর্ভেদ্য ঘন নীলে রাখালনী মেলল তার চোখ।
তার কেবল একটাই দীর্ঘশ্বাস। কোথাও সে তার মনের মানুষ পেলে না।
একটা মানুষ যার সাথে দিনের বেলা নদীর পাড়ে কলমি লতার আদরে সে ডানা মেলার স্বপ্ন দেখবে; কালো মেঘ যখন কাজল পরবে তার গভীর চোখের ছায়ায় সে মানুষ তেষ্টা মেটাবে; তার কোঁচড় ভরা শুকনো বকুল যখন বেখেয়ালে ছড়িয়ে পরবে প্রাঙ্গনময়, সেই মানুষ টা তখন ঝরা বকুলের গন্ধ মেখে তাকে গান শোনাবে, গোধূলির তানে।
কিন্তু নেই যে কেউ । সে জানে। তার এই অদ্ভুতুড়ে চাওয়া গুলোকে প্রশ্রয় দেওয়ার মত অবিবেচক কেউ নেই , সে নিশ্চিত। তাই সে মালা গাঁথে রোজ, তার ছেঁড়া ছেঁড়া না পাওয়া গুলো কে জমিয়ে।
কোথায় যে বাঁশির সুরের ফ্রিকোয়েন্সি আর জমানো অপূর্ণতার ভাটিয়ালি গান রেসোনান্স সৃষ্টি করছিল বিধাতাও বোধহয় দ্বন্দ্বে ছিলেন তা নিয়ে।

১৩
“কেমন বাঁশি বাজায় শোনো মাঠেতে রাখাল”

দিকশূন্যপুরের এক কোণে তার ভাঙা হৃদয় আর আধপোড়া ভালোবাসাকে সম্বল করে থাকতো এক রাখালনী। তার না ছিল রূপ, না ছিল রস, না ছিল গন্ধ। কিংবা হয়তো সেগুলোর এসেন্স পাওয়ার লোক ছিল না তার জীবনে। রাখালনী থাকত একা, বিরহজ্বালার বহ্নি-শিখায় নিজের ইন্দ্রিয়দের জ্বলতে দিয়ে। ওরাই তার সন্ধ্যাপ্রদীপ, ওরাই তার শীতের ওম।
শীতের ছেঁড়া ছেঁড়া অপরাহ্ণের সেই কমলা-হলদে কান্না গুলো কে জমিয়ে নিয়ে রাখালনী মালা গাঁথত। আর সারারাত সেই মালা গলায় পরে নদীর পাড়ে ছিল তার অন্ধকার অপেক্ষা, যদি কোনদিন ফের পথভ্রান্ত হয়ে ফিরে আসে সেই ভিনদেশী সওদাগর।
সেই কতকাল আগে এক শিশির-শুকনো অপ্রস্তুত শরতের কামরাঙা রঙের ভোরে, সরল গ্রাম্য বালিকা এক রাখালনীর দরজায় আশ্রয় চেয়েছিল এক দিগভ্রান্ত ভিনদেশী। পথ হারানোর ক্লান্ত দেহভারে অবশ মন নিয়ে সে শরণ নিয়েছিল রাখালনীর। জল, সামান্য ভোজ্য, অকুণ্ঠিত সেবা, মুঠো ভরা স্নেহ, চোখ ভরা নির্মল ভালোবাসা আর অবশেষে তার পূর্ণযৌবনা শরীর নিয়ে মগ্ন হয়েছিল সওদাগর।
সে গল্প বলতে আসিনি।
স্বপ্নের হ্যালুসিনেটিং নেশার ঘোরে তাকে বন্দিনী রেখে একদিন সওদাগর পালালো তার আপন সংসারের টানে। আর রাখালনীর হল এই জীবন্ত মরণদশা।
শীত গেল। বসন্ত এল; গ্রামের চারিদিকে লাগল ফুল ফাগ আর প্রেমের আগুন। রাখালনীর ঘরটা গ্রামের একপ্রান্তে, তাই নদীর ধারের অবৈধ আগাছার আড়ালে জ্বলন্ত প্রেমানলের সাক্ষী থাকে সে, কেমন যেন নিষ্প্রভ, নিস্তেজ ভাবে। তার শুধু আছে রোজ একখানি কান্নার মালা আর অনন্ত অপেক্ষা।
একদিন সেরকম সারারাত স্থিরচিত্তে অপেক্ষার উদ্দেশ্য আর হাতে সেই অশ্রুমালা নিয়ে রাখালনী বেরোল তার একাকী নৈশ অভিসারে।
হঠাৎ, চমকে থমকে দাঁড়ালো তার সমস্ত সত্তারা কয়েক ক্ষণের জন্যে, তার আলতো পদশব্দকে ঢেকে দিল কোন সুদূর অতীত বা ভবিষ্যৎ থেকে ভেসে আসা এক অদ্ভুত মোহময় বাঁশির সুর। এই নির্জন প্রান্তে, এই গ্রীষ্ম-নির্বাক নদীর ধারে কোথা হতে আসতে পারে এমন মায়া মায়া বাঁশির সুর? কে বাজায় এমন সুর যা রাখালনীর হৃদয়ের তন্ত্রীতে গিয়ে প্রতিফলিত হয়? যা তার গায়ে এক অপূর্ব স্বর্গীয় শিহরণ জাগাতে পারে? কি যে হল রাখালনীর! সে হাতের মালা ফেলে , এলোচুল উন্মুক্ত করে ওই প্রান্তরেই মায়া ঘুমে আছন্ন হয়ে পড়ল অচিরেই।
পরদিন রাতেও এক কাণ্ড।
তার পরদিনও।
তার তার পরদিনও।
রাখালনীর আর নদীর ধারে যাওয়া হয়না, মালা গুলো আপনমনেই শুকিয়ে যায় তার গলায়। রোজই সেই বাঁশি তাকে মায়া ঘুম পাড়ায়।
আজ রাখালনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যাবেই সে আজ সেই বংশীবাদকের খোঁজে।
সারাদিন ধরে অনেক অনেক অশ্রু দিয়ে রাখালনী আজ এক বড় মালা গাঁথল। বড় মন কেমন করা গন্ধ তার। বাঁশির সুর খুঁজতে গেলে তার যে এটাই চাই।
বেরোল সে রাতে স্বপ্নসঞ্চারিনী।
বাঁশির সুরে তার দেহমন অবশ হয়ে আসতে লাগল এক অনির্বচনীয় প্রশান্তিতে। কিন্তু তবুও সে এগিয়ে গেল।
গ্রামের আরেকপ্রান্তে নামহীন পাহাড়। গিরিকন্দর লক্ষ্য করে রাখালনী এগিয়ে চলল। যত কাছে আসে তত যেন তার চেতনা অবসন্ন হয়ে আসে। আবার তার মালায় মুখ ডুবিয়ে তার বাস্তবে পুনঃ-পদার্পণ।
একী? এক ছোট পাহাড়ি গুহায়, আপনমনে বাঁশি বাজাতে নিমগ্ন এক ছেলে। বেশভূষা দেখে মনে হয় কোন রাখাল। তার বন্ধ চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার তলিয়ে গেল রাখালনী।
কত এলোমেলো স্বপ্নেরা কাঁচবন্দী রঙিন মাছের মত খেলা করে গেল রাখালনীর অবচেতনে।
ঘুম ভাঙল এক মিষ্টি গন্ধ মাখা ভোরে, এক অচেনা তবু বহুযুগের চেনা কণ্ঠস্বরে। রাখালনী উঠে বসল, ঘুম জড়ানো চোখে দেখল তার গলার মালা আজ শুকায়নি।
বংশীবাদক কিছু বলে ওঠার আগেই রাখালনী বলে বসল, “রাখাল, তুমি এতদিন পরে কেন এলে?”
ক্ষণিকের চমকে ওঠা পেরিয়ে রাখাল বলে ওঠে, “তোমার সবটাকে যে নইলে পেতুম না রাখালনী।“
কিভাবে যেন কখন রাখালনীর মালা উঠল রাখালের গলায়, ওরাও জানল না।

Shiva …

Let them think about an image of some Indian Deity “Who Smokes Weed Maaaan!” each time they hear this name ……

Let them shout out “Har Har Mahadeo” ….. Let them dip and pray for the betterment of their business or may be for an “Alike!” groom ……

Let them offer raw currencies or drenching with milk in exchange of their fulfilled “PRAYERS!” ….

Even let some of them crush a rock into dust for kafirs worship it as Shiva…..

Some will always remain in the remotest corners of the Earth to Inhale thy psychedelic reality.

WA.jpg

Shiva, who you are actually ????

Are you a deity who grants wishes ? are you the one with a trident having a dambaru tied to it ? are you some weird snake charmer ? who the hell are you ???

You answered within — “Think”

I thought and saw nothing but darkness, endless darkness, even in deep meditation I fathomed only the endlessness of someone, or should I say something …

Whom ? whom i know ? who is endless ???

My consciousness replied, “Time”.

So you are time itself ? infinite in both the gradients …. “Mahakal” thy name, announces for ages, the truth i ignored.

Again I asked, “why then the weed ? why the obsession of cremation ashes ?”

Again You answered within — “Think”

My trance called out…. “some cursed with the vision through time and space which bites him everytime as a snake to inject the venom of all the misery and affliction of the universe , some has no control on his own creation, some spiked with the faults too late to correct every moment, some pained with the accumulated sorrows of the minds, some understood uncertainty as the only certain thing in the creation needs weeds of wisdom to feel all those as dreams … needs cremation ashes of sense to cover the eternity within …. needs the madness of Tandav to make the dream named creation start a new lap ”

Just like i feel bad for persons suffering, just like the frustration for my disobedient sons, Just like the blunders of past which changed everything ….

Just like the fear for losing my loved ones some day, just like the treacheries, intense hurting of my calculated assumptions …

Just like every people around ….

Shiva, Now I Know …… You are me, everyone ….. the eternal persona …

This time ….. every thing silenced …… as the only true question of the universe is answered ….

বিষকুম্ভং পয়োমুখম – ১

গুপ্তশত্রুর সন্ধানে, পর্ব -১ (রংবাজী)
 
ছোটবেলায় বাবা একটু রঙচঙা মিষ্টি দেখলেই বলত, “খাসনা, রঙ দেওয়া আছে”। অনেকেই বলেন, এবং সযত্নে পরিহার করে চলেন বিভিন্ন রঙিন শরবত ইত্যাদি, এই বেপরোয়া বয়সের যুগে অনেক টিনেজারও স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে রঙিন খাদ্যবস্তুকে এড়িয়ে চলে, এটা একটা ইতিবাচক প্রবণতা। কিন্তু এর মাধ্যমে আদৌ কি আমরা এড়িয়ে যেতে পারছি অস্বাস্থ্যকর রঙ দেওয়া খাবার ???
 
উত্তরটা খুবই হতাশাব্যাঞ্জক, না আমরা পারছি না বরং আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্রায় ৭০% বস্তুতেই মিশিয়ে দেওয়া আছে কৃত্রিম রঙ, যা শুধু নিছক রঙ নয়, প্রাণঘাতি কার্সিনোজেন (যে পদার্থ শরীরে অবধারিত ভাবে ক্যানসার তৈরী করে)।
 
আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব এমন একটি জিনিসের সঙ্গে যেটি শুধু বিভিন্ন বাইরের খাবারেই মেশানো থাকে না, আমরা নিজেরাও সম্পূর্ণ অশিক্ষিতের মত বাজার থেকে কিনে এনে বাড়ির খাবারে মেশাই। অশিক্ষিত বললাম কেন ??? কারণ এই প্রোডাক্টটির গায়ে প্রস্তুত কর্তারা ছোট ছোট হরফে হলেও “FOR INDUSTRIAL USE ONLY, NOT FOR HUMAN CONSUMPTION” লিখে নিজেদের আইনগত ভাবে বাঁচার রাস্তা পরিস্কার করে রেখেছে। আর আমরা সেই লেখা পড়ে দেখারও প্রয়োজন মনে না করে যথেচ্ছ পরিমাণে বিষ ইচ্ছাকৃত ভাবে খেয়ে চলেছি প্রতিদিন। আজ্ঞে হ্যাঁ বিষ, ফুডকালারিং হিসাবে ব্যবহার করলেও এটিকে “বিষ” বলে অভিহিত করলে কিছু মাত্র ভুল হবে না।
 
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল বেশ কিছুদিন আগে আমেরিকার এক নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতার একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিদ্যালয় একত্রে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। আমার জিগরি দোস্ত এই গবেষনায় যুক্ত থাকার সুবাদে আমিও কাঠবেরালির মত সেতু বন্ধনে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাজার থেকে গুঁড়ো হলুদ ও গুঁড়ো লঙ্কার স্যাম্পেল সংগ্রহ করার দায়িত্ব বর্তেছিল আমার উপর। সেই মত বিভিন্ন বাজার ঘুরে বহু আনপ্যাকেজড হলুদ, লঙ্কা গুঁড়োর পাশাপাশি বেশ কিছু নামী দামী কম্পানির প্যাকেজড টারমারিক পাউডার আর চিলি পাউডারের প্যাকেটও সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম একটা কামধেনু রঙের প্যাকেট, কৌতুহল বশতঃ। পরীক্ষানিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একদিন বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি পাওয়া গেল ? সে জানিয়েছিল লুজ বিক্রি হওয়া গুঁড়োয় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ আর প্যাকেজড গুলোয় ১২ থেকে ৩৫ শতাংশ কার্সিনোজেনিক রাসায়নিক রঙ উপস্থিত। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আর কামধেনু ? সে হেসে বলেছিল, “ভাই ওটা পুরো খাঁটি” , আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করায় সে জানায় ওটির ১০০ শতাংশই খাঁটি বিষ, অর্থাৎ কার্সিনোজেনিক কেমিক্যাল।
 
হ্যাঁ এই স্টিং রিপোর্টের প্রথম পর্বে আমি কামধেনু রঙ সম্বন্ধে বলব। অনেকেই এই লেখা পড়ে অবাক হচ্ছেন, কারণ এই রঙ এতদিন তাঁরা নির্বিচারে ব্যবহার করে এসেছেন বাড়িতে বিরিয়ানী বানাতে। যাঁরা নিজেরা কখনও দোকান থেকে কেনেননি বা বিরিয়ানি খান না তাঁদেরও আশ্বস্ত হবার কিছু নেই, শুধু হোটেলের বিরিয়ানি বা লাল লাল মাংসের ঝোল ই নয় , পাড়ার ফুটপাথে টিকিয়া চাট বা ঘুঘনি খেয়েছেন তো ? কিম্বা বিভিন্ন ফাস্টফুডের সঙ্গে দেওয়া টুকটুকে লাল সস ? কিম্বা ফলের দোকানে বিক্রি হওয়া চেরী ? এসব খান না ? আচ্ছা বেশ, লাল টুকটুকে ডালিম কিম্বা বাজারের সেরা টাটকা মাছ, যেটার লাল টকটকে রক্ত দেখে তাজা মাছ ভেবে কিনেছেন ? কিম্বা দোকান থেকে কেনা সোনার মত রঙের অঢ়র (অরহর) ডাল ? —— এসবের সব কটাতেই এবং আরও নানা খাবারে ইচ্ছাকৃত ভাবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মিশিয়ে দিচ্ছে কামধেনু রঙ। যা শুধু নিছক রঙ নয়, ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী বিষ।
 
বাজারে প্রধানতঃ দু ধরণের কামধেনু রঙ বেশী প্রচলিত। লাল আর হলুদ। কমবেশি সব মুদিখানার দোকানে পাওয়া যায়। বাড়িতে বিরিয়ানি করলে দোকানের মত সাজাতে এই রঙ বাঙালীর চাই ই চাই। বর্তমানে শুধু কামধেনুই নয়, তাকে নকল করে আরও কয়েকটি কোম্পানি বাজার ধরতে নেমে পড়েছে। এসব রঙের প্যাকেটের পিছনে ছোট ছোট হরফে সাবধানবাণী লেখা থাকলেও এরা ইচ্ছাকৃত ভাবে প্যাকেটের ভাঁজ এমন ভাবে করে যে ঐ সাবধানবাণী প্যাকেটের ভাঁজে ঢাকা পড়ে যায়। জনসচেতনতা না থাকায় এবং অতিরিক্ত লাভের আশায় মুদিখানাগুলিও খাবার রঙ বলে নির্বিচারে এগুলি বিক্রি করে।
 
আসুন দেখে নেওয়া যাক কি আছে এই কামধেনু রঙে। হলুদ রঙটি হল মেটানিল ইয়েলো (C18 H14 N3 Na O3 S) আর লাল রঙটি হল এস এস রেড (potassium dichromate – K2 Cr2 O7). এই দুটি রাসায়নিকই এতটা ভয়ঙ্কর যে এর একটা বিন্দুও ক্যানসার ডেকে আনতে পারে। তাই ল্যাবরেটরিতে এগুলি নিয়ে কাজ করার সময় গ্লাভস ও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও মেটানিল ইয়েলো ক্যানসারের পাশাপাশি আরও কিছু দীর্ঘস্থায়ী অসুখ তৈরী করতে পারে, যেমন অ্যালঝাইমার্স, প্যারানৈয়া, ইন্সোমনিয়া, কিডনি স্টোন, ব্রেণের ও নার্ভের বিভিন্ন সমস্যা। বিভিন্ন ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই কেমিক্যাল শরীরে একবার ঢুকলে তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। এমনকি মায়ের শরীরে থাকা এই কেমিক্যালের প্রভাবে বাচ্চার মস্তিষ্কের গঠন ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।
Potassium Dichromate রাসায়নিকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি পদার্থ যার প্রভাবে ক্যানসার ছাড়াও আমাদের শ্বসনতন্ত্র মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা দেখা যায়। এছাড়াও থাইরয়েড গ্ল্যান্ড, কিডনি, লিভার, লাংস, পাকস্থলি, জননতন্ত্র ইত্যাদিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল সম্ভবনা থাকে।
 
কি করে বোঝা যায় কোন খাদ্যে এই প্রাণঘাতী বিষ মেশানো আছে কিনা ? বোঝা খুবই শক্ত। ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করা ছাড়া উপায় নেই, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষা হিসাবে দেখা হয় রঙ পরিবর্তন (মেটানিল ইয়েলো ঘন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে গোলাপী বর্ণ ধারণ করে আর পটাশিয়াম ডাইক্রোমেট সালফার ডাইঅক্সাইডের সংস্পর্শে ঘন নীলবর্ণ ধারণ করে)।
 
এই ভয়ংকর বিষের হাত থেকে বাঁচার রাস্তা কি ? চোখ কান খোলা রাখুন। দোকান থেকে এই কামধেনু রঙ কিনে ব্যবহার করা বন্ধ করুন, দোকানদার কে বোঝান যাতে তিনি এই বিষ দোকানে না রাখেন, আরও যাঁরা যাঁরা কেনেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন, তাঁদেরও বোঝান, সচেতন করুন। রাস্তাঘাটের বেশী রঙচঙ্গা খাবার এড়িয়ে চলুন । পরিচিত কেউ যদি ঘুঘনি বা আচার বা সস ইত্যাদি প্রস্তুত করার ব্যবসায়ে যুক্ত থাকেন তাহলে তাঁদেরকে সচেতন করুন। জনসচেতনতা ছাড়া এই সমস্যার অন্যকোন সমাধান আমাদের হাতে এই মুহুর্তে নেই। সরকার যদি দায়িত্ব নিয়ে এই রঙকে ডোমেস্টিক ইউজের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে বা নিদেনপক্ষে এর প্যাকেটের সামনে বড় বড় অক্ষরে পয়জন বা বিষ লেখা বাধ্যতামূলক করে দেয়, তাহলে কিছুটা কাজ হতে পারে।
 
অনেকে জিজ্ঞাসা করতেই পারেন, তাহলে খাবার রঙ করার বিকল্প ব্যবস্থা কি ? তাঁদের বলি যে রঙ গুলিতে ফুড কালারিং কথাটি লেখা থাকবে এবং fssai লেখা থাকবে একমাত্র সেই রঙগুলিই খাবার রঙ করতে ব্যবহার করবেন। আর কেউ অনুমোদনহীন রঙ দিয়ে খাবার বানিয়ে তা বিক্রি করলে FSSAI এর কাছে অভিযোগ করার পূর্ণ অধিকার আপনার কিন্তু সবসময় রয়েছে।
 
এই লেখাটি শেয়ার করুন যতভাবে পারেন, ইচ্ছা হলে কপি পেস্ট করুন, সচেতনতা ছড়িয়ে দিন। খুব শিগগীরই ফিরে আসছি “গুপ্তশ্ত্রু” সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে।
 

পথস্তং …

ট্রেনটা মন্থরগতিতে স্টেশনে ঢুকলেও দ্রুত বেরিয়ে গেল প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই বর্ষার পূর্বাভাষ পাওয়া পিঁপড়ের গতিতে ট্রেণপ্রসবিত যাত্রিরা কেউ লাইন টপকে আর অতিসাবধানীরা ওভারব্রিজ পথে যে যার নিজের পথে, পিছনে ফেলে একটা নিস্তব্দ নিরালা স্টেশন। শুধু রয়ে গেল স্বপ্নলীনা । সিঁড়িতে তোলা একটা পা, রেশম চুল আর লংস্কার্ট ফিচেল হাওয়ার স্পর্শলোভিতায় পতাকার মত উড়ছে, লম্বাটে ফ্রেমের চশমার পিছনে দুটো চোখ স্থির, আকাশের দিকে। মেঘের পাশে পাশে টুইঙ্কিলিং তারাদের ছায়া পড়ছেনা ওই গভীর কালো মণিদুটোর অতলে। ওদের লক্ষ্য কেউ জানেনা, ঠিক যেমন জানেনা স্বপ্নলীনা নিজেও কেন মাঝে মাঝে ও হারিয়ে যায় শূন্যতার এক অন্য পৃথিবীতে।
প্রতিবারের মতই হঠাত করে আসা শূন্যতার শেষও হয় হঠাত করেই আর স্বপ্নলীনা নিজেকে আবিস্কার করে জনশূণ্য স্টেশনটায় একলা দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি পা চালায় ও, অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে অনেক্ষণ হল, ৯ টা কিছু কম রাত নয় । মোবাইলটা আজকাল হাতেই রাখে স্বপ্নলীনা। নিতান্ত ফর্মাল ছাড়া ফোন করার কেউ নেই ওর, তাও। ওটা হাতে থাকলে অবশ্য একটা সুবিধা, কোথাও হঠাত দাঁড়িয়ে গেলে লোকে অবাক হয়না, ভাবে কারুর অপেক্ষা করছে মেয়েটা।
স্টেশনের পাশেই ব্রীজে ওঠার সিঁড়ি। তাড়াতাড়ি পা চালাল স্বপ্নলীনা, অন্যান্যদিন আটটার বাসটা পেয়ে যায়, নটার লাস্ট বাসটা না পেলে আজ আর বাড়ি ফেরাই হবেনা হয়ত, নটার পরে আর কোন গাড়িই যেতে চায় না যে ওদিকে।
উফফ কি লাক !!! ঐ তো আসছে বাসটা। হাত দেখাল স্বপ্নলীনা।

স্বদেশ অনেক্ষন থেকে দেখছিল ছেলেটাকে। রাত প্রায় দশটা, প্রতিদিনের মতই আজও ছেড়ে দিয়ে গেছে অফিসের পিক-আপ বাস। তবু প্রতিদিনের মত ছুটে গিয়ে অটো ধরার তাড়া নেই।
ছেলেটার পকেটে অনেকগুলো পাঁচ-দশটাকার নোট, অনেকগুলো। মার্কারী ভেপারের গাঢ় হলুদ আলোয় ছেলেটার চোখমুখ দিয়ে ঠিকরে পড়া একটা অদ্ভুত-অজানা অভিব্যক্তি মিলে মিশে কোথাও যেন রাতের রহস্যময়তার সঙ্গত করছে। ঝিরঝির করে আণুবীক্ষণিক বৃষ্টি চিরে চাকায় কুয়াশা তোলা বাসগুলোও ধরার কোন তাড়া নেই ছেলেটার। ছোট্ট চায়ের গুমটিটায় গিয়ে বসল ছেলেটা, একটা চা আর একটা তিনটাকার সিগারেট নিল, রসালো গজাগুলো দেখল কয়েকবার, নেবে ? চারটাকা করে দাম, নিয়েই নিল একটা। কতদিন পর সিগারেট। মুখের ঘা টা যদিও অনেক দিন হল ভাল হয়ে গেছে, তবু…, অবশ্য আজ একটা খাওয়াই যায়। এবার বাড়ির দিকে যাওয়া যাক। নাঃ ছাতা বার করবেনা আজ। এরকম ইলশেগুঁড়ি … একটা ছেলেবেলা আর প্রথমপ্রেম মেশানো ফিলিংস। দোকানটা বন্ধ করবে করবে করছে, মায়ের ওষুধ গুলো কিনছে ছেলেটা। কটা নোট বেঁচে আছে। এই সেন্টটার, এই যে “ওসা” এটার দাম কত ? একশো আশি! ও … রেখে দিল আবার। ২৫ টাকায় মায়ের জন্য কি কেনা যায় ? ফলের দোকান গুলোও তো বন্ধ। এত রাতে, এই বৃষ্টির দিনে কে ই বা ওর জন্য বসে থাকবে। অনেকদিন এই জায়গাগুলো ভাল করে দেখতে পায়নি … অনেকগুলো বছর। প্রতিদিনই তো সেই কোন ভোরে বেরনো আর এই এত রাতে ফেরা। সপ্তাহে একটা উইক্লিঅফ, সেদিনও সারাদিন কয়েক ব্যাচ ছাত্র পড়ানো…
এই বৃষ্টির মধ্যেও ঘটিগরমওয়ালাটা এখনও একলা রাস্তায় ঝুমুরটা বাজিয়েই চলেছে। খাবে ? পাঁচটাকার নিয়েই নেওয়া যাক। এবার বাড়ির দিকে … সাহস করে একটা সি এল নিয়েই নিয়েছে ছেলেটা, কাল ওর ছুটি … একটা গোটা দিন শুধু ওর নিজের … ভাবতে ভাবতে ঠোঁটের কোনে একটু মুচকি হাসি নিয়ে হাঁটতে লাগল ছেলেটা …

স্বদেশও হাঁটছে।
একটা গুমটির ঝাঁপ বন্ধকরে ভিতরে ছোট্ট বিছানা করে শুয়ে আছে অল্পবয়সী ছেলেটা। চারদিকে পানের বাটা, বিড়ি আর সিগারেটের প্যাকেট, সুপুরির জার। মোবাইলটার স্ক্রিনে আসা যাওয়া করছে মেসেজ। নেট প্যাক ভরেছে আজ। মাঝে মাঝেই মুখ ভর্তি হাসি ছেলেটার। আবার টাইপিং চলছে।
প্যামের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে কি স্বদেশের ? এরকমই এস এম এস। অবশ্য এরকম পাতি চায়না ফোনে নয়, স্বদেশের ব্ল্যাকবেরী। ফেসবুকে স্বদেশ স্টেটাস চেঞ্জ করে করে দিল কমিটেড। সেই সেবার পূজোয় ভি আই পি পাস নিয়ে কলকাতার সবকটা প্যান্ডেলে ও আর প্যাম। এই রকমই একটা পানের গুমটির পাশে গাড়ি থামিয়ে বাবাএলাচ কিনেছিল ওরা। হেবি কাজের জিনিস, মদের গন্ধ পুরো হাওয়া করে দেয়।
এগারটা বেজে গেছে, কটা নাইট মিনিটস ফ্রি আছে হয়ত। গুমটির ছেলেটা হুড়মুড় করে ফোন লাগাচ্ছে, একটুখানি কথা হবে মাত্র, “কাল দেখা হবে তো ? তোর জন্য একটা জিনিস এনে রেখেছি, কি বলত ? নাঃ এখন বলব না। কাল আয়। আচ্ছা রে বাবা আচ্ছা, বলছি বলছি, ঐ নতুন উঠেছে সোনার মোহরের মত চকলেট, এখানে পাওয়া যায়না বুঝলি, আমি তোর জন্য আনিয়েছি। … আচ্ছারে বাবা কাল নিয়ে থ্যাঙ্কিউ বলিস, এখন বলতে হবেনা। এখন ঝট করে একটা দে তো, আঃ বাবা তো সবসময়ই থাকবে, আড়াল করে একটা … আহহ, আমার সোনাটা, আই লাভ ইউ … আচ্ছা আমি দেব ? এই নে, মুয়াহহহ … খুশী? এই পিঁক পিঁক করছে, রাখি? টা টা”…
ফোনটা বুকে চেপে ধরে ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ল …

বাসটায় আলো নেই, একদম শেষের সারির জানলার পাশটায় বসেছিল স্বদেশ। কন্ট্যাক্টরটা বিড়ি খাচ্ছে। শেষবাস তাই স্টপেজের সংখ্যা হাতেগোনা।
সামনের দিকের লেডিস সিটে বসেছিল স্বপ্নলীনা। আর ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিনের ওপরের পাটাতনটায় ঝোলা কাঁধে আধবুড়ো লোকটা। এদিক ওদিক ছিটিয়ে কটা অল্পবয়সী ছেলে। সামনের স্টপেজটায় নামবে স্বপ্নলীনা, উঠে দাঁড়াল। হঠাত করেই গতি দ্বিগুণ করল বাসটা। ছেলেগুলো একটা একটা করে উঠে দাঁড়াচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গেটে পাহারায় কন্ট্যাক্টর আর এলোপাথারী কয়েকটা হাত শরীর থেকে অঙ্গগুলো উপড়ে নেওয়ার ক্ষিপ্রতায় গতিশীল হতে গিয়েও স্থির হয়ে গেল আচমকা গুলির শব্দে। আধবুড়ো লোকটার দুহাতে উঠে এসেছে দুটো পিস্তল। একটা ড্রাইভারের মাথায় ঠেকানো, আরেকটা এই মাত্র আগুণ ঝরিয়ে নিজের শক্তিপ্রমাণের পর উন্মত্ত জানোয়ারদের দিকে নিবদ্ধ। বাসটা থামল, আধবুড়ো লোকটা আর স্বপ্নলীনাকে নামিয়েই তিনগুণ গতিতে উধাও হয়ে গেল। লোকটা একটা পিস্তল স্বপ্নলীনার হাতে দিতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে বাঁটের কাছে কি খুঁজছে, নন্দরাম মার্কেট থেকে কেনা খেলনা বন্দুকের স্টিকারটা ঘষে ঘষে তুলে দিল, এবার হাতে দিয়ে বলল “ভবিষ্যতের জন্য” … তারপর ব্যাগ ভর্তি খবর কাগজের গোলায় পাটের দড়ি জড়িয়ে তৈরি করা জিনিসগুলোর মাঝে দ্বিতীয় পিস্তলটা রেখে হেঁটে চলল। কাল আরও অনেকের হাতে এরকমই “সাহস” তুলে দিতে হবে …
স্বপ্নলীনা আবার স্বপ্নের দেশে, হাতে ধরা পিস্তল, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে জামা ভিজছে … ফর্সা মুখে, কাল চশমা বেয়ে গড়াচ্ছে জলের ফোঁটা।
সুন্দর মুখটা, বাঁ চিবুকে একটা ছোট্ট তিল। প্যামেরও ছিল, তবে ডান চিবুকে। বোলেরো গাড়িটা নিয়ে লাস্টবার লংড্রাইভে যাওয়ার সময় ওর চিবুকেও ওরকম একটা তিল পেন দিয়ে এঁকে দিয়েছিল প্যাম। সেবার বেগুণি টপটা … ওটা পড়লে ওকে দারুণ মানাতো।
সেই বেগুণি টপটা তো সেদিনও পড়েছিল প্যাম, কিছু না বলেই যেদিন নীরজের পার্সোনাল জীমে ঢুকে পড়েছিল স্বদেশ। নীরজের কোলে মুখরেখে বসে থাকা প্যামকে দেখে থমকে গিয়েছিল স্বদেশ।
চারিদিকে অসংখ্য বোলতা, হলুদ ডোরা কাটা, এক্ষুনি পালাতে হবে তবু পালাতে পারছেনা … পা আটকে যায় এরকমই।
প্যাম মুখ সরিয়ে নিয়েছিল, শান্ত ভাবে, কিছু বলেনি। স্বদেশও কিচ্ছু বলেনি, বরং প্যান্টের জিপারটা আঁটতে আঁটতে নীরজই বলতে শুরু করেছিল। স্বদেশের বাবার দৌড় ঐ বোলেরো পর্যন্তই। নীরজরা কালই আরেকটা অডি কিনেছে। টেন প্লাস টু এর রেজাল্টটা বেরোলেই ওরা সুইজারল্যান্ড যাবে ঘুরতে। পামেলাও যাবে সঙ্গে। পামেলাকে ও কালকেই একটা আইফোন দিয়েছে, সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আগে একটা তানিস্কএর নেকলেসও দেবে, যেটা একবার ছুঁয়ে দেখতে পারলেই স্বদেশদের মত পাবলিকরা ধন্য হয়ে যায়। সুতরাং এর পর থেকে কারুর পার্সোনাল জীমে ঢোকার আগে পারমিশান নেওয়ার ভদ্রতাটা যেন শিখে রাখে স্বদেশ, আদারওয়াইজ ওদের নেপালী সিকিউরিটি গার্ড ঘাড়ধাক্কা দিতে কতটা দক্ষ তার ডেমো দেখিয়ে দেওয়া হবে স্বদেশকে …
নাইট্রাসিন টেন তিনপাতা ! হবেনা ভাই …… বেপরোয়া স্বদেশ হাজারটাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল …

ফুটপাথে বসে এক থালাতে ভাত খাচ্ছিল আনোয়ার আর অনিমা, বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে দুজনে। ওদের জমানোর কৌটোটায় ২০০ টাকা জমে গেছে। আনোয়ার শুনে অবাক ! তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে অনিমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল আনোয়ার। এঃ এঁটো হয়ে যাচ্ছে না … কি যে করে ছেলেটা ! ছোট্ট মোবাইল স্ক্রিনটায় সিনেমা দেখছে বাচ্চা বর আর তার বাচ্চা বউ, একই সিনেমা, নতুন সিনেমা ভরানো হয়নি অনেক দিন, দু-এক টাকা যা বাঁচে সব কৌটোয় তুলে রাখে অনিমা, ওর পুঁচের জন্য, কবে এসে পড়ে ঠিক তো নেই। তবে এই সিনেমাটা ভাল লোকটা ব্যাবসা করে কেমন বড়লোক হয়ে যায় শেষে, আর তার বউকে কত্ত ভালবাসে, ঘুরে ঘুরে গান গায়। ঠিক আনোয়ারের মত।
নিজের মনে রাস্তায় চলতে চলতে বেঁচে যাওয়া কুড়ি টাকাটা কি মনে করে ওদের সামনে রেখে চলে গেল ছেলেটা। দুজনেই একটু চমকে গেলেও অনিমাই প্রথম তুলে দেখল একটা কুড়ি টাকার নোট। হঠাত করে পেয়ে যাওয়া টাকাটা নিয়ে দুজনেরই মুখে হাসি আর ধরেনা। তখনই ঠিক হয়ে গেল, এর মধ্যে দশটাকা কৌটোতে রেখে দেওয়া হবে আর বাকি দশ দিয়ে কাল একটা নতুন সিনেমা ভরানো হবে …

স্বদেশ এগিয়ে গেল … রাস্তার মোড়ে দেওয়ালে আটকানো ছবিটার সামনে। মোমবাতি গুলো পুরোটা জ্বলার আগেই বৃষ্টিতে নিভে গেছে। কয়েকটা বাসি গোলাপ বৃষ্টিতে ভিজে টাটকা লাগছে, চারদিক শুনশান ।
ঐ উল্টোদিকের ফ্ল্যাটে শুয়ে বাচ্চা মেয়েটা … ভালো রেজাল্ট করায় কাল ওর বাবা ওকে কলেজস্ট্রীটে নিয়ে যাবে, ওর পছন্দ মত গোটা দুয়েক গল্পবই কিনে দেবে প্রমিস করেছে।
দূরের ঝুপরিটায় মেঝেতে চোখ খুলে শুয়ে মুকেশ, কাল ওর নতুন পাওয়া চাকরিটার জয়েনিং ডে … প্রথম চাকরি।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিমা ভাবছে আর তো মাত্র কটা দিন কাল, পরশু তরশু তার পরেই তো ওর বর ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে আসছে।

নিজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে স্বদেশ, এইচ এসের আগে তোলা ছবিটা। টাইটা একটু বেঁকে গেছে। পরীক্ষার প্রতিদিন ঠাকুমা চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দিত …
কাল ওর বন্ধুদের জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোনোর ডেট … ওর ও হতে পারত …
কিন্তু সবার কাল থাকলেও স্বদেশের যে কাল বলে আর কিছু নেই …
আর মাত্র কয়েকটা ঘন্টা,
রাতের অন্ধকারের সাথে সাথে ওর অস্তিত্বও ফিকে হতে থাকবে …

Happy Parents’ Day

এসিটা চলছে তবু গরম যেন আর কমছেই না। নাঃ এইচ ভি এ সি ডিপার্মেন্টের ছেলেগুলোকে ডেকে একবার ডাক্টিং টা দেখতে বলতে হবে। বসে বসে এসব ভাবছেন মিস্টার মজুমদার আর ঠিক সেই সময় ফোনটা এল।

– ইয়েস, মজুমদার স্পিকিং, … তাই নাকি ? … বেশ … তাহলে তো আর কোনো চিন্তাই রইল না । … আচ্ছা শোনো পুলিশ কোনো ঝামেলা করবে না তো ? … ওকে ওকে, থ্যাঙ্কস … হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই, কলকাতায় ফের, তোমার জন্য সারপ্রাইজ রেডি করছি হে।

যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। অত বড় জমিটা পেতে আর কোন সমস্যাই রইল না। এই জন্য স্যান্নালকে এত ভালবাসেন মজুমদার। নাছোড়বান্দা ফ্যামিলিটাকে নিশ্চই আচ্ছা করে কড়কেছে। যাই হোক রিয়েলেস্টেটের বিজনেস করতে গেলে ওরকম একটু করতেই হয়। আর তা ছাড়া ওরকম একটা জঙ্গুলে গাছ গাছড়ায় ভর্তি বুনো জমি ফেলে রেখে কারোর তো কোন লাভ হচ্ছিল না।

কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরে দেখতে পাচ্ছেন মজুমদার। রিশেপসনে অনুশ্রীর সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে, দেখে যদ্দুর মনে হচ্ছে সিডিউল ট্রাইব। হাবে ভাবে মনে হচ্ছে ওনার ঘরেই আসতে চাইছে। যদিও সিকুরিটি দুজন প্রায় টানাটানি লাগিয়ে দিয়েছে ওকে আটকাতে। অফিসবয়কে ডাকার বেলের সুইচে চাপ দিলেন জে এন মজুমদার।

* * *

– সারনেম আই মিন টাইটেল কি ?

সামনের চেয়ারে জড়সড় হয়ে বসে চায়ে চুমুক দিতে থাকা ছেলেটা মাথাটা একটু তুলে সসঙ্কোচে বলল “মাহাতো”

নাঃ অনুমান ভুল হয়নি তাহলে … বেশ একটু আত্মপ্রসাদ উপভোগ করলেন মজুমদার। …… “আর নাম টা কি যেন বললে?”

– আজ্ঞা স্যার পীপ্পহ্লাদ, পিপ্পহ্লাদ মাহাতো।

– পীপ্পহ্লাদ, নামটা খুব আনকমোন বাট কোথায় যেন শুনেছি শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। যাকগে এবার বলত, কি ব্যাপার ? মানে আমায় কি বলতে চাও ?

ছেলেটাকে ভাল করে অবজার্ভ করতে থাকেন মজুমদার। কারণ তাঁর অভিজ্ঞতা বলে এই ভালো করে অবজার্ভেশন এবং রিলেটিং ভবিষ্যতে অনেক কাজে দেয়। ছেলেটার গায়ের রঙ কালো হলেও খুব কালো নয়। কপালের বাঁদিকে একটা কাটা দাগ। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল – শক্তপোক্ত চেহারা। সরল সাদাসিধে বলেই মনে হয়।

– স্যার আমার বাড়ি অনেক দূর, সেই রাঁচির নেতারহাট থেকে শুরু হয়ে গভীর জঙ্গলের ভিতরে। স্যার আমি আপনাকে একটা প্রস্তাব দিতে এত দূর এসেছি। তবে কথাটা খুব গোপনীয়।

এর আবার কি গোপনীয় কথা থাকতে পারে ? কিছু গছিয়ে টছিয়ে পয়সা ঝাড়ার তাল নাকি ?

– দেখ আমার চেম্বার সাউন্ডপ্রুফ। আর এই কাঁচটার ভিতর থেকে বাইরে দেখা গেলেও বাইরে থেকে ভিতরে দেখা যায়না। সুতরাং তুমি এখানেই যা বলার বলতে পার।

– স্যার আমি খবর কাগজে আপনার ছবি দেখেছি, পড়েছি, তাই আপনার কাছে ছুটে এসেছি। আমি জানি একমাত্র আপনিই আমায় সাহায্য করতে পারেন।

ঠিক যা ভেবেছিলেন তাই। ইনিয়ে বিনিয়ে সাহায্য চাওয়া কেস। সময়টাই নষ্ট হল। তবু যতদূর সম্ভব বিরক্তি চেপে বললেন, “ঠিক আছে, বুঝলাম, কিন্তু কি ব্যাপারে সেটা তো বলতে হবে …”

– স্যার আমাদের জঙ্গলের অনেক ভিতরে একটা জায়গায় আমি কয়েকটা জিনিস পেয়েছি। আমার মনে হচ্ছে মাটির তলায় উ জিনিস আরো আছে। অনেক মাটি খুঁড়ে যন্তর পাতি দিয়ে তুলতে হবে। খুব চুপে চুপে ভি করতে হবে। গরমেন্ট খবর পেলে আর কারুর নসিবেই কিছু জুটবে না। কিন্তু আমার তো অত টাকা নেই স্যার তাই আপনার কাছে এলাম। যদি আপনি আমার কথায় রাজি থাকেন স্যার তাহলে উ জায়গাটা আমি আপনাকে দেখিয়ে দেব।

– আরে জিনিসটা কি সেটা তো আগে শুনি।

একটা ছোট্ট নেকড়ার পুঁটুলি এগিয়ে দিল ছেলেটা। হাতে নিয়ে তালুতে উপুর করে বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত স্থির হয়ে গেলেন মজুমদার। তাঁর অভিজ্ঞ চোখ যদি ভুল না করে থাকে তাহলে তাঁর হাতের তালুর উপর রয়েছে উৎকৃষ্ট কোয়ালিটির তিনটে বড় বড় আনকাট ডায়মন্ড।

সামলাতে একটু সময় লাগল। অপহরণ টপহরণ কেস নয়ত ? পরখ করার জন্য বললেন, “এগুলো তো ক্রিস্টাল পাথর বলে মনে হচ্ছে, এগুলো তুলে কি আর এমন লাভ হবে ?”

– স্যার আপনি ভালই জানেন এগুলো কি, শুধু শুধু আমার সঙ্গে মজা করছেন। আচ্ছা ঠিক আছে, এই তিনটে আমি আপনাকে দিয়েই দিলাম। আপনি এগুলো যেভাবে খুশী দেখে নিন। আমার কাছে আরও গোটা পাঁচেক আছে। আমার শর্তটা শুনে রাখুন, যা মুনাফা হবে, তার ফিফটি ফিফটি। আজ আসি, দুদিন পরে আবার আসব। রাজি থাকলে বলবেন।

রুমালের ক্ষিপ্রতায় বিন্দু বিন্দু ঘাম আড়াল করে মজুমদার বললেন, “আরে শোন শোন, কোথায় থাক তুমি? তোমার ফোন নাম্বারটা তো দিয়ে যাও”

– লাগবে না স্যার, আমি ঠিক দু দিন পর আসব।

* * *

দু দিনে বেশ কয়েক জায়গায় পরীক্ষা করিয়ে মজুমদার সিওর হলেন ওগুলো শুধু জেনুইনই নয়। এ ক্লাস কোয়ালিটির। কি করবেন ঠিক করে ফেলেছেন মজুমদার। না না এ সুযোগ ছাড়া যাবেনা। আগে দেখে তো নেবেন জায়গাটা তারপর ওই ছোকরার যা করার করবেন। ছোকরা ধুরন্ধর, কিন্তু তাঁর সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেনা। তবে যা করতে হবে সব গোপনে, স্যান্নালকেও জানানো যাবেনা।

* * *

অতিগোপনীয়তার কারণে নতুন কেনা ছোট্ট অল্টো গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে যাচ্ছেন মজুমদার। পাশের সিটে ছেলেটা। বেশ খোশ মেজাজে দুজনেই, টুকটাক গল্প চলছে।

– জানো আজকের ডেটটা মানে ১লা জুন একটা স্পেশাল দিন ?

– কি স্যার ?

– আজকে হচ্ছে পেরেন্টস ডে। মানে বাবা মা এর দিন। তা তোমার বাবা মা কোথায় থাকেন ?

– “আমার বাবা সেই কোন ছোট বেলায় যাদুগোড়ার খনিতে কাজ করতে গিয়ে কি একটা অসুখ হয়ে মরে গেল। খনির বাবুরা কিছু আচার বিচার করতে দিলনা। কঙ্কালসার বাপটার দেহটা ভ্যানে উঠায়ে নিয়ে চলে গেল। মা খুব চেঁচামিচি করায় মায়ের মুখ টিপে ধরে পাশের ঝোপে নিয়ে গিয়ে … তার পর এক মুঠো নোট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। মা টা সেই রাত্রেই গায়ে আগুন দিল” … একটু চুপচাপ হয়ে গেল ছেলেটা।

– আহারে, তার পর তুমি কোথায় থাকতে ?

– তার পর স্যার আমি যাদের কাছে মানুষ হয়েছি উরাই আমায় খুব যত্নে রেখেছিল। উরাই আমার বাবা মা… এই যে স্যার এসে গেছে এবার পায়ে হাঁটা।

* * *

এই দেখুন স্যার এই গর্তটা দেখুন। দেখছেন নীচে ?

গর্তের নীচে দেওয়ালে লেগে থাকা চিকচিক করা হীরের টুকরো গুলো দেখে আনন্দবিহবল মজুমদারের মনে তখন কিন্তু প্রবল হয়ে উঠছে অন্য পরিকল্পনা। তাঁর জুতোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট পিস্তলটার গুলি অব্যর্থ। এই জঙ্গল থেকে বেরিয়েই সেটা ঠিক নিশানায় আঘাত করে তাঁকে এই হীরের খনীর একক মালিকে পরিণত করবে। ভাবতে ভাবতে পুলকিত মজুমদার হঠাতই অনুভব করলেন তাঁর পায়ের নীচে কিছুর একটা অমোঘ টানে তিনি গর্তের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ভয়ে অস্ফুট একটা আওয়াজ বের হল, আর প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গেই মজুমদার তলিয়ে গেলেন বিশাল গর্তটায়।

সর্পিল গতিতে দ্রুত এগিয়ে আসা গাছের মূলগুলো আস্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে দম আটকে দেওয়ার সময় হঠাত মজুমদারের মনে পড়ল … “পীপ্পহ্লাদ, দধিচীর পুত্র” … ছোটবেলায় পুরাণে পড়েছিলেন। বাবা মা আত্মাহুতি দেওয়ার পর বনের গাছপালা পশুপাখিদের হাতে মানুষ হওয়া অভিমানী পীপ্পহ্লাদ!

আর ঠিক তখনই দিল্লীর বিখ্যাত রিয়েল-এস্টেট জায়েন্ট মিস্টার নারায়ণমূর্তী, হিমাচলের কুখ্যাত কাঠ মাফিয়া শঙ্কর আর আরো অনেকের অফিসে ঢুকছে একটা কালো ছেলে, কপালে কাটা দাগ, হাতে একটা ছোট্ট কাপড়ের পুঁটুলি … “স্যার আসতে পারি ?”

* * *

পীপ্পহ্লাদ একবার শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে দেখল, মুখে তার তৃপ্তির প্রশান্তি। তার পর পিছন ফিরে হেঁটে চলল … ওদের পেরেন্টস ডের এখনো চার দিন বাকি।