নুনশাক, এক অবহেলিত বন্ধু

আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে এমন অনেক লতা-গুল্ম যাদের আমরা আগাছা বলে অবজ্ঞাই করে এসেছি চিরকাল, কিন্তু তাদের অদ্ভুত ভেষজ গুণের অজানা কাহিনী রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। সেরকমই কিছু অচেনা বন্ধুদের তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করব এই দুর্বল কলমসহায়ে। আজ প্রথম কিস্তিতে থাকুক, আমাদের বাড়ির আশেপাশের অযাচিত ভাবেই জন্মানো, অনাদরে বেড়ে ওঠা এই প্রতিবেশী।

এটি সংস্কৃতে লোণিকা নামে পরিচিত। বাংলায় কেউ বলে নুন শাক, কেউ বলে নুনে শাক, আবার কেউ বলে নুনিয়া বা নুন্তা শাক, ওড়িয়ায় বলে পুরনিশাক, হিন্দিতে খুরসা বা কুলফা । বিজ্ঞান সম্মত ল্যাটিন নাম – Portulaca oleracea ।

এটি আমার মতে একটি মিরাক্যাল গাছ। সব দিক থেকে প্রকৃতি ও মানুষের উপকারী একটি গুল্ম। এটি প্রবল খরাতেও নিজের বিপাকীয় ধরণ পরিবর্তন করে টিকে থাকতে পারে। মাটির আদ্রতা ধরে রেখে অন্যান্য গাছকে বাঁচতে সাহায্য করে। হয়ত এত গুণের জন্যই সেই কোন প্রাচীন কাল থেকে মানুষ এটিকে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে নানা সভ্যতায়। তারা যে শুধু এটিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত তাই নয়, অনেক সংস্কৃতিতে মনে করা হত, এই গাছ অপদেবতা ও বিপদকে দূরে রাখে।

এবার আসি এর ভেষজ ও খাদ্যগুণের কথায়, প্রথমেই বলি খাদ্যগুণ। নুনে শাক এর পাতা, ফুল, কান্ড পুরোটাই কাঁচা বা রান্না করে দুভাবেই খাওয়া যায়। গ্রীস, ফ্রেঞ্চ ও বেশ কিছু ইউরোপিয় সংস্কৃতিতে এটিকে স্যালাড হিসাবে টমেটো ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার চল ছিল। স্পেনে স্যুপ, স্ট্যু ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হত এটি আর মেক্সিকোতে তো এই শাক দিয়ে একদম মৌলিক একটা চিকেনের পদই জনপ্রিয় ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এর ছোট্ট ছোট্ট পোস্তদানার মত বীজগুলি সংগ্রহ করে বেঁটে বড়া বানানো হত। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এটিকে ভাজা, সিদ্ধ বা পালংশাকের মত করে রান্না করে খাওয়ার চল আছে।

নুনে শাকের টক – নোনতা স্বাদটি আসে মূলতঃ এর মধ্যে থাকা দুটি অ্যাসিডের কারণে, অক্সালিক অ্যাসিড ও ম্যালিক অ্যাসিড। এই ম্যালিক অ্যাসিড আমাদের অতি পরিচিত ফল আপেলেও থাকে। নুনে শাকে ভোরের দিকে ম্যালিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশী থাকে। তাই ঐ সময়ে এই শাক তুললে তা বেশী ম্যালিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ হয়।

১০০ গ্রাম পরিমাণ এই শাক ২০ ক্যালরি শক্তি দিতে পারে মানবদেহে। প্রায় ২ গ্রাম মত প্রোটিন ও খুবই সামান্য ফ্যাট থাকে। এছাড়াও এর থেকে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, পটাশিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মৌলগুলিও যথেষ্ট মাত্রায় পাওয়া যায়। এছাড়াও এর থেকে আমাদের অপরিহার্য্য ভিটামিনগুলির (Vitamin A, B1, B2, B3, B6, B9, C, E etc.)  প্রাত্যহিক চাহিদার ২০ শতাংশেরও অধিক পাওয়া যায়।

 

এবার আসি ভেষজগুণে —

১) গনোরিয়ায় – এই বিরক্তিকর যৌনরোগটিতে একটি ভয়ঙ্কর উপসর্গ হল প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া এবং অতিরিক্ত পিপাসা। এক্ষেত্রে ১০ গ্রাম নুনেশাক ৪ কাপ জল দিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে ২ কাপ করতে হবে, এর পর ওটাকে ছেঁকে ঠান্ডা করে সকালে বিকেলে এক কাপ করে খেতে হবে প্রতিদিন। এটি ডায়াবেটিসের কিছু ক্ষেত্রেও সমান ধরনের উপসর্গের উপশম করতে সক্ষম।

২) বাচ্চাদের কাশি হলে – নুনশাকের রস একটু গরম করে ঠান্ডা হলে ১৫ ফোঁটা সেই রসে ৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সিরাপ তৈরি করা যায়। এটি দিনে ৩-৪ বার করে খাওয়ালে সাধারণ কাশি হলে ২-১ দিনের মধ্যে কাশি ভাল হয়ে যাবে। এছাড়াও শিশুদের অম্বল, আমাশয়েও এই সিরাপ সকালে ও সন্ধ্যায় ২-৪ ফোঁটা খাওয়ালে উপকার হয়।

৩) তোতলামিতে – দন্ত্য বর্ণ,  ওষ্ঠ বর্ণ বাদ দিয়ে বিশেষ কোন বর্গের অন্তর্গত বর্ণ গুলি (যেমন মূর্ধা বর্ণ) উচ্চারণে সমস্যা থাকলে নুনে শাকের রস দুচামচ পরিমাণ অন্ততঃ ১৫ মিনিট মুখে নিয়ে বসে থাকলে অনেকটা উপকার হয়।

৪) চোখ ওঠা বা চোখ লাল হওয়ায় – নুনেশাকের রস ছেঁকে যে স্বচ্ছ রস পাওয়া যায় তাকে সামান্য গরম করে ঠান্ডা করে একফোঁটা করে ২ – ৩ দিন দিলে উপশম হয়।

৫) চুলকানি ও বিষাক্ত কীট দংশনে – সাধারণ চুলকানিতে এবং বোলতা মৌমাছি পিঁপড়ে ইত্যাদি কামড়ালে, শুঁয়ো লাগলে কিম্বা বিছুটি আলকুশি ইত্যাদি লেগে চুলকালে নুনেশাক বেঁটে অল্প গরম করে প্রলেপ দিলে কার্যকরী হয়। তবে ভীমরুল বা কাঁকড়াবিছের বেলায় কিন্তু এটি নিষ্ক্রিয়।

৬) অর্শ্ব, বদহজম, কোলাইটিস ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রে নুনেশাক খাদ্য হিসাবে উত্তম যা এই রোগগুলির নিরাময় করে।

৭) নুনেশাকের বীজ জল দিয়ে খেলে তা ক্রীমি নাশ করে।

এছাড়াও এটি শরীরের বলকারক, তৃষ্ণা নিবারক, চোট আঘাত জনিত ফুলে যাওয়া বা সোয়েলিং কমাতে অত্যন্ত্য কার্য্যকারী।

পরিশেষে বলি, এমন যে গুণসম্পন্ন উদ্ভিত তাকে আমরা না চিনে প্রায়শঃই উপড়ে ফেলি নিতান্তি আগাছা ভেবে, তাই ভয় হয় অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এই বন্ধু হয়ত মানুষের সান্নিধ্য হারিয়ে আবার অরণ্যভূমীর গোপনিয়তাতেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

Wicca একটি অপভ্রংশের কাহিনী

উইচক্র্যাফট এখন উঠতি টিনেজ কলেজ বা একটু ইংলিশ ঘেঁষা স্কুলের বড় ক্লাসের ছেলে মেয়ে প্রধানতঃ মেয়েদের একটা বড় আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে । তারা সর্টকাটে কাজ হাসিল করা, মানে কোনো পছন্দের মানুষকে আকৃষ্ট করা, কেউ “বাওয়াল” করলে শক্তিতে তার সঙ্গে না পেরে উঠে অন্য উপায়ে তাকে জব্দ করা ইত্যাদির অলীক আশায় গুগল মামার সাজেস্টেড সার্চে বিভিন্ন “চ্যান্টিং”, “সার্কেল”, লাল নীল মোমবাতি নিয়ে গভীর মনযোগ দিয়ে বিভিন্ন ক্রিয়া কর্মের অভ্যাস করে যাচ্ছে । অনেকে আবার স্রেফ বন্ধুদের চোখে নিজেকে একটু অন্য রকম, একটু “হটকে” প্রমাণ করার জন্য উইচক্র্যাফটের চর্চা করছে । অদ্ভুত ব্যাপার হল যে এই বাচ্চাগুলি কিন্তু ভারতীয় তন্ত্র বা মোহিনী বা ডাকিনী বিদ্যা সম্বন্ধে তেমন ওয়াকিবহাল নয় । স্বাভাবিক ব্যাপার, কারণ এগুলির ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্যের যোগান গুগলে নেই । তাই এই উঠতি টিনেজ উইচরা তন্ত্রের ব্যাপারে প্রায় জ্ঞানহীন শুধু তাই নয়, তন্ত্রের চর্চা যারা করে তাদের এরা বেশ কিছুটা অবজ্ঞার চোখেই দেখে ।

দেখুন মশাই, আমি কিন্তু এখানে “সবই ব্যাদে আছে” অ্যাজেন্ডার প্রচার করতে আসিনি, নেহাত রাখাল আর রাজকণ্যার গল্প বুনতে বুনতে কলমটা হাঁপিয়ে গেছে তাই রাখাল একটু অন্য কিছুর খোঁজে। শুধু স্বার্থপর সুবিধাবাদী রাজকণ্যার কথা ভেবে জীবন কাটিয়ে দিলে কি চলবে ??? রাখালেরও তো একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে, সেই পৃথিবীর কত অচেনা গলি, রাজপথে ঘোরা বাকি আছে, কত অ্যাডভেঞ্চার বাকী আছে হারানো দিনের গল্পের, ইতিহাসের খোঁজে । চলুন আজ রাখালের হাত ধরে সেরকমই একটা লতায় ঢেকে যাওয়া, ভুলে যাওয়া গলির সন্ধানে যাত্রা করা যাক ।

ভারতীয় প্রকৃতি উপাসনা যা মূলতঃ আফ্রিকা থেকে লক্ষ বছর আগে ভারতের দক্ষিণ উপকূলে আসা মানুষদের সঙ্গে ভারতের তন্ত্রীতে সঞ্চারিত হয়েছিল তাই তামসিক সাধনা রূপে পরে পরবর্তী উন্নততর স্বাত্বিক বা একেশ্বরবাদী ব্রহ্ম উপাসক আর্যদের দ্বারা লীপিবদ্ধ হয় । পরে আর্য উপাসনার মূল স্রোতের সঙ্গে এর মিশ্রণে একটি স্বতন্ত্র ধারা তন্ত্র নামে আত্মপ্রকাশ করে । এই তন্ত্র ছিল মূলত বস্তুতান্ত্রিক ও বামধর্মী । তন্ত্রের বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো কিছুর সংযম বা সাধন তখনই সম্ভব যখন বস্তুটিকে সম্পূর্ণ রূপে জানা যাবে । বৈদিক একেশ্বরবাদের মত এটি শুধু সবই এক এই বিশ্বাস নির্ভর উপলব্ধীতে সীমাবদ্ধ ছিল না । বরং তন্ত্র ব্যবহারিক পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়ম গুলি উপলব্ধী করতে ও তাদের কে আয়ত্ত করে নিজ কাজে ব্যবহার করতে উৎসাহ দিত । যে কারণে প্রাচীন তান্ত্রিক দের কিমীয়া বিদ্যা বা অ্যালকেমী জানা আবশ্যিক ছিল । তন্ত্র বিশ্বাস করত একটি মানুষ যদি রসগোল্লার মিষ্টত্ব কখনও আস্বাদনই না করে, যদি কখনও সঙ্গমের সুখ অনুভবই না করে তবে সে তার অস্থায়ীত্ব ও অসারতা বুঝবেই বা কী করে আর স্বরূপ উপলব্ধী করার মাধ্যমে তাকে সংযমই বা করবে কী করে ।

তন্ত্রের কীমিয়া ও আয়ুর্বেদ অংশটি কোনো এক অজানা পথ ধরে একসময় ইউরোপে পৌঁছায় (সম্ভবতঃ ইজিপ্ট হয়ে) এবং বিভিন্ন রূপান্তর ও স্থানীয় প্রকৃতি উপাসনার অলৌকীকতা আরোপিত হয়ে উইক্কা নামে আত্মপ্রকাশ করে । মনযোগ দিয়ে দেখলে আজও তন্ত্রের নানা অবশেষ উইক্কার মধ্যে খুঁজে পাবেন । যদিও সেগুলি এতটাই পরিবর্তিত যে প্রায় চেনাই যায়না ।

উইক্কান সার্কেল বা গ্রীড আসলে স্থন্ডীল বা যন্ত্রমের পরিবর্তীত রূপ, এছাড়াও হেক্সিং – মারণ উচাটন, বশীকরণ, এরকম আরও অনেক কিছু খুঁজলেই পাওয়া যাবে যা আসলে তন্ত্রের ক্ষীণ স্মৃতিচিহ্ন । তবে তন্ত্রের সঙ্গে উইক্কার কিছু মূল ভাবগত পার্থক্য আছে । উইক্কা মূলত বিভিন্ন অলৌকিক প্রাকৃতিক শক্তির আয়ত্তকরণ ও নিজ প্রয়োজনে তাদের ব্যবহারের কথা বলে । কিন্তু তন্ত্র বলে উল্টো কথা । শক্তির প্রাপ্তীর মাধ্যমে ও তাকে স্বেচ্ছায় পরিহারের মাধ্যমে রিপু সংযম তথা আমিত্বের নাশ বা চরম সত্যের উপলব্ধির কথা বলে তন্ত্র । তন্ত্র পথের সাধনায় অলৌকিক শক্তি বা সিদ্ধাই অন্তরায় স্বরূপ । যদিও কিছু নীম্নস্তরের তান্ত্রিক মূলতঃ এই শক্তিগুলি পাবার জন্যই সাধনা করে থাকে । কিন্তু তাকে প্রকৃত সাধনা বলেনা এবং সেই ব্যক্তিকে গুণীন ওঝা বা ডাইন বলে চিহ্নিত করা হয়, যোগী বা সাধক নয় ।

আজ এখানেই কলম থামালাম, আপনাদের ভাল লাগলে পরে তন্ত্র ও উইক্কার বিভিন্ন বিভাগ গুলি নিয়ে আলোচনা করা যাবে ।

আন্তর্জালিক প্রতিবাদের রূপকার শহীদরা

ফেসবুক করা বন্ধ করে দিয়েছি, তবুও মাঝে মাঝে কিছু এমন ঘটনা ঘটে যাতে হয়ত হাজার বছরের ধ্যান ভেঙেও উঠে আসতে হয় । নইলে ভাবনার অন্তর্চিৎকারে দম বন্ধ হয়ে আসে ।

মাস কয়েক আগে মুক্তমনা ব্লগে বিদ্বেষমূলক একটি লেখার প্রতিবাদ করেছিলাম । এবং সেখানে মুক্তমনায় প্রকাশিত লেখার গুণমান নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলাম । সেই প্রসঙ্গেই আলাপ হয় অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে । সেদিন ছিল মিজানুর রহমানের মৃত্যু দিবস । আলাপ হয়েছিল তাঁর একটি লেখা পড়ে “শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব” বইটির ব্যাপারে  স্মৃতিচারণ । মুগ্ধ হয়েছিলাম । পরে মানুষটির সঙ্গে সরাসরি যখন আলাপ হয় তখন তাঁর ব্যক্তিত্বে আরও মুগ্ধ হই । বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছিল । আমার যাদুবিদ্যাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ভেলকি, বুজরুকির বিরুদ্ধে সরব হতে বলেছিলেন । এবিষয়ে লেখালেখি করতে বলেছিলেন । আমি বলেছিলাম “এখনই একটা লেখা দিচ্ছি, প্রকাশ করুন না” । কিন্তু উনি বলেছিলেন “নিয়মিত লেখ, সবার জন্য একই নিয়ম” ।

এই প্রকৃত মুক্তমনের মানুষটি আর নেই । তাঁকে কিছু বাংলাদেশী মৌলবাদী দুষ্কৃতী কুপিয়ে খুন করেছে । তাঁর যে মস্তিষ্ক ছিল অমূল্য উদ্ভাবনী লেখার আকর স্বরূপ । সেই মস্তিষ্ক ফাটিয়ে রাস্তায় ছড়িয়েছে । তাঁর স্ত্রীর আঙুল কেটে নিয়েছে, চোখ ফাটিয়ে দিয়েছে ।

এই মৌলবাদীদের উদ্দেশ্য ছিল মুক্ত মননের লেখাগুলি ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়া । মুক্তমনা ব্লগ আজ থেকে ইন্টারনেটে অনুপস্থিত ।

এই শুয়োরের বাচ্চাদের কি এভাবে জিততে দেওয়া যায় ???? আপনারাই বলুন ???

মুক্তমনা আজ পিতৃহীন । অস্তিত্ব লুপ্ত । কিন্তু এটা সাময়িক । এভাবে চুপ করানো যাবেনা মুক্তকন্ঠকে ।

যদি সত্যিই শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন তাহলে গর্জে উঠুন । লেখায় ধিক্কারের ঝড় তুলুন আন্তর্জালিক মাধ্যমে । আর যদি কোনো জায়গায় কোনো মৌলবাদীর উস্কানিমূলক, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য দেখেন । প্রতিবাদ করুন । বুঝিয়ে দিন ঐ বেজন্মা দের আমরা ভয় করিনা ।

অভিজিৎ রায় অমর । ব্লগার রাজীব অমর । আন্তর্জালিক প্রতিবাদের রূপকার শহীদরা এভাবেই অমর থাকবেন । বিদ্রোহের ভাষা হয়ে ফুটে উঠবেন কোটি কোটি বিক্ষুব্ধ মানুষের ঠোঁটে ।

উইক্কান সংবাদ – ১

প্যাগান বা প্রকৃতিবাদী বা পরবর্তী কালে ডাইনতন্ত্রী (ইউক্কান) বলে পরিচিত মানুষদের চিরকাল স্থান হয়েছে জ্বলন্ত আগুণে বা সমাজের এক কোণে । কারণ তারা নাকি পৃথিবীর অমঙ্গল চায় । ধর্মের বিরোধি তারা । এই ধারণা কিছু অংশে এখনও বিদ্যমান । বহুকালের জমা অন্ধকার দূর করা আমার ক্ষুদ্র সাধ্যের অতীত । তাই ওসব কচকচানি তে না গিয়ে একটা লেখা লিখলাম । আসলে এটা একটা উইক্কান মন্ত্রর অনুবাদ । প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরের উপাসকরা (মূলতঃ ডাইনি রা) এটি প্রার্থনার কাজে ব্যবহার করত । এই মন্ত্র তাদের দিত অমিত শক্তি । মন্ত্রটির মূল ইজিপ্সিয়ান আবৃত্তিটি আমার কাছে আছে । দরকার পরলে বলবেন । পোস্ট করে দেব ।

————————————

আমিই সৃষ্টির আদি প্রেরণা , আমাতেই লয় ব্রহ্মান্ড
আমিই ত্রিলোকের পূজ্য, তবু আমিই বিশ্বের লজ্জা
আমিই পল্লীপ্রান্তের গণিকা, আমিই মোক্ষপথের সাধ্বী
আমিই অনূঢ়া কুমারী, এবং ভার্য্যা রূপে শয্যাসঙ্গিনী
আমি অবাধ্য দুহিতা এবং অনন্ত স্নেহশীলা জননী
আমার মতার বাহু দুটি আমারই প্রচ্ছন্ন প্রকাশ
আমিই বন্ধ্যা আর বহু সন্তানের জন্ম দায়িনী
আমি পরিণিতা এবং দায়গ্রস্ত পিতার বয়স্থা চিরকুমারী
আমি যন্ত্রণাক্ত জন্মদাত্রী তবু আমি অনাদি, অজাত
আমি অসহ্য প্রসব বেদনার সান্তনা, আমি পতি ও পত্নী
আমার সৃষ্টি আমার প্রেমিকের দেহ, আমার পিতার জন্ম আমারই জঠরে
আমিই আমার স্বামীর সহোদরা, আমার সঙ্গী আমারই পরিত্যক্ত পুত্র
আমার চিন্তাই তোমার স্থিতি ও জগত
আমার জঠরই তোমার সৃষ্টি ও অন্তিম গন্তব্য
আমি দেবী, তোমার সম্মুখে ও পার্শ্বে আমার অলক্ষ্যিত প্রকাশ

আশা

আজকের দিন টা শুরু ই হল একটা ব্যক্তিগত গোমড়া মেজাজ নিয়ে, কলেজের ইম্পর্টান্ট সেমিনার ছিল, তাড়াহুড়ো করে সব সেরে, ছাতা নিয়ে গিয়ে রিক্সায় উঠলাম, মিনিট কয়েকের মধ্যেই শুরু হল যে বৃষ্টি তা যদি এখন অব্দি চলত তাহলে মনে হয় নোয়ার মহাপ্লাবনকেও ছাড়িয়ে যেত । যাই হোক সেই বৃষ্টির ভয়ানক আগ্রাসী আদ্রতায় আমার জামা-প্যান্ট ভিজে ন্যাতা হয়ে তো গেলই এক্সট্রা হিসাবে আমার প্লাস্টিকে মোড়া মোবাইলটা কে ও ভিজিয়ে দিল ।

গরীব মানুষ, তায় কিপ্টে বলে বাজারে আমার বেদম বদনাম আছে, অতি কষ্টে মাস খানেক আগে নোকিয়ার এই ৫০১ আশার ছলনে ভুলি কিনেছিলাম পুরো সা—ড়ে—- চা ——র হাজার কড়কড়ে টাকা দিয়ে, আমাকে গোটা বেচে দিলেও বোধ হয় অত টাকা পাওয়া যাবেনা । সেই সাধের মোবাইলটি গেল মিইয়ে ।

কলেজে পৌঁছে পকেট থেকে বার করে দেখি, বাবুর এল সি ডি, হিস্টিরিয়া রুগির মত কম্পমান, দেখে তো আমার ব্রেণও পুরো জেনারেল থেকে ভাইব্রেশণ মোডে। সঙ্গে সঙ্গে অফ করলাম, ব্যাককভার খুলে ফেলতেই দেখলাম ঝরণার মত জল বেরিয়ে এল ভিতর থেকে । যাই হোক, ভাল করে ঝেড়ে মুছে, খানিক্ষণ শুকোতে দিলাম, বেশকিছুক্ষণ পর সেটাকে ব্যাটারি লাগিয়ে অন করতেই বাবু একবার ব্লিঙ্ক করে চিরনিদ্রার আভাস দিয়ে নিদ্রিত হয়ে পড়লেন, শত চেষ্টা করেও তাকে আর জাগানো গেল না ।

কি জানি কেন আমার মনে হচ্ছিল যে ভিতরে হয়ত আরও জল জমে আছে বলেই বোর্ড শর্ট হয়ে গিয়ে মোবাইল টা অন হচ্ছেনা । বাড়ি এসে মোবাইল টা খুললাম, নোকিয়ার এই মডেলে কোনো ওয়ারেন্টি ব্রেক স্টিকার থাকেনা কোনো স্ক্রুর মাথায়, আমার কম্পিউটার রিপেয়ারিং এর স্ক্রুড্রাইভারের সেট টা বের করলাম, গুগুলে খুঁজে পেয়ে গেলাম এটা —- https://www.youtube.com/watch?v=g24s3wvCnSA । ব্যাস, শুরু হয়ে গেল আমার হাতের কাজ।

1610752_10202392529803718_470761194961084494_n

পুরো বোর্ডটা খুলে ফেললাম, যা অনুমান করা গেছিল, ভিতরে আরও প্রচুর জল জমে ছিল, প্রথমে কাপড় দিয়ে মুছলাম, তার পর সন্তুষ্ট না পেরে নিয়ে এলাম ভ্যাকিউম ক্লীনারটা । এটা অনেক দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ঘরবাড়ি পরিস্কার করার জন্য, কিন্তু মা ও কাজের মাসির খাঁটি স্বদেশী ঝ্যাঁটার ওপর অগাধ বিশ্বাস থাকায় ওটা পড়ে থেকে থেকে শেষে আমার নানা গবেষণামূলক কাজের অপরিহার্য্য অঙ্গ হয়ে ওঠে, ওটা এক্ষেত্রে ব্যবহার হল হট এয়ার ব্লোয়ার হিসাবে, ওটার গরম হাওয়া দিয়ে পুরো বোর্ড টা শুকনো করলাম আমি । তার পর খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে আশাকে জাগানোর চেষ্টা করলাম ।

জাগল না সে ।

এই সময় কম্পিউটারের মিডিয়া প্লেয়ারে সুমনের “হাল ছেড়োনা বন্ধু …” বাজিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেলুম । এবার মনে হল যে জল তো শুকিয়েছে, কিন্তু নিশ্চয়ই বাষ্প হওয়ার আগে আমাকে বাষ্পাকুল করার জন্য দ্রবীভূত বিভিন্ন লবণের দানা গুলো রেখে গেছে । সেগুলো কেলাসরূপে কন্ডাকটারের আভ্যন্তরীন রোধ বাড়িয়ে দেওয়াতেই মোবাইলটা সচল হচ্ছে না ।

কিন্তু কোথায় ঘটেছে সেটা বুঝব কী করে ? পি.সি.বি. তে সদ্য পড়া অক্সাইড বা সালফেট দেখতে কেমন হয় সেটা দেখিনি তো এর আগে ! আর মাইক্রোস্কোপিক অ্যানালিসিস করার যন্ত্র ও তো নেই আমার কাছে , কী করি ??? !!!

ফোন টা ওয়ারেন্টি তে ছিল, কিন্তু সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলেই যদি ধরে ফেলে লিকুইড ড্যামেজ !!! তাহলেই তো ওয়ারেন্টির কেল্লাম ফতেম !!!

তারপর ভাবলুম, আচ্ছা লিকুইড ড্যামেজ বলে ওয়ারেন্টি ক্যান্সেল করতে হলে তো আগে ধরতে হবে ড্যামেজটা কোথায় … আর সেটা ধরলেও আমার অল্প হলেও লাভ আছে ।

চলে গেলুম ব্যারাকপুরের নোকিয়া কেয়ারে । কাউন্টারে বসা সুন্দরীর কিউট হাসি দেখে ফোন খারাপ তো দূরের কথা, আমার যে একটা ফোন আছে, সেটাই ভুলে গেলাম (এটাও নোকিয়ার বিজনেস স্ট্রাটেজী নাকি !!!) … তার পর ফোনে কী সমস্যা সেটা দেখার অছিলায় সুন্দরী যখন হাতে হাত রাখল তখন তো নোকিয়ার সোকেশে সাজানো রঙ্গিন ব্যাক কভার গুলোকে একেকটা রঙ্গীন উড়ন্ত প্রজাপতি বলে বোধ হতে লাগল । ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া ( হৃদয় দেওয়া নেওয়ার আধুনিক ফার্স্ট স্টেপ ) ও হয়ত হয়ে যেত কিন্তু ওই যে একটা বিখ্যাত কথা আছে না কার যেন, “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

যাই হোক, ফোনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল স্পেশালিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে, রোগনির্ণয়ের জন্য । কিছুক্ষণ পর সুন্দরী তার সেটিং করে সাদা করা দাঁত কান অব্দি চওড়া করে বের করে আমাকে ডেকে বলল যে সে নাকি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছে যে আমার ফোনটিতে লিকুইড ড্যামেজ পাওয়া গেছে এবং সেটা নাকি এ——-ত গ—-ভী——র যে ওয়ারেন্টি তো ক্যান্সেল হবেই উপরন্তু আমি যদি টাকা দিয়ে অদের সারাতে বলি তাহলে ও নাকি ওদের ইঞ্জিনিয়ার রা রিস্ক নিয়ে কাজ করবে এবং আদৌ ঠিক করা যাবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই । আমি খুব শান্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম যে কত খরচা পড়তে পারে, সে বলল সেটা নাকি বলা যাচ্ছেনা । কারণ গ—ভী—র ড্যামেজ তো !!!

আমি এবার একটু সোজা হয়ে বসে অপেক্ষাকৃত কড়া গলায় বললাম, যে আমি কীকরে বুঝব যে আপনারা সত্যি বলছেন ? সত্যি ই লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে ? সে স্মার্ট হওয়ার উৎসাহে সঙ্গে সঙ্গে আমার ফোনের কোথায় কোথায় লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে সেই ছবি জুম করে করে কম্পিউটারে আমাকে দেখিয়ে দিল, আমিও বিমর্ষ মুখ নিয়ে সেগুলো দেখলাম । মেয়েটি সোৎসাহে আমাকে বুঝিয়ে চলল যে ড্যামেজের গভীরতা কতটা । ছবির সবুজ সবুজ অংশ গুলো নাকি লিকুইড ( বটে !!! … আমি তো জানতাম ওটাকে পি.সি.বি. বলে ) । তার বোঝানোর মাজে তাকে থামিয়ে দিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোনটা ফেরত চাইলাম । এবার বিমর্ষ হওয়ার পালা তার । ওই যে বলে — “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

বাড়ি এসে ফোন টা খুলে ছবি তে দেখে নেওয়া জায়গা গুলো তে ম্যাগনিফাইন্ড গ্লাস, এল ই ডী টর্চ আর একটা শক্ত ব্রাশ (রঙ করার) নিয়ে আলতো আলতো করে ঘসে সাদা সাদা কেলাসিত লবণ গুলোকে উঠিয়ে ফেললাম । গুঁড়ো গুলোকে আবার ক্লীনারের সাহায্যে পরিস্কার করলাম । সমস্ত পরিস্কারের পর স্ক্রু এঁটে, ব্যাটারী লাগিয়ে, আশার বোতামে চাপ ।

তার পর ?

ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাস ঠিকঠাক থাকলে আশা কি না জেগে পারে ?