মৃত্যুকীট

“সে আসে নিঃশব্দে, কুরে কুরে খায় দেহ, ভয়লতম মহামারীর চেয়েও দ্রুত, পৃথিবীর আদিম অধিপতিদের প্রতিনিধি সে … তীব্র অজেয় বিষধর, অমর … সে আসছে তার প্রাচীন অধিকার কায়েম করতে …”


********

ঘটনা ১, সাল ২০১৫, স্থান – লন্ডণের সাউথকেনিংস্টন,

বাইরে ঠান্ডা হাওয়ার ঝলক বন্ধ করার জন্য দরজাটা টেনে দিলেন ডাক্তার জোহানা রোডস। রাত বেশী হয় নি। বড়দিনের ছুটির এই সময়টা তাঁর একান্ত ভাবেই পড়াশোনায় ডুবে নিজের মত সময় কাটানোর একটা সুযোগ বলেই বরাবর বিবেচনা করে এসেছেন তিনি। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। রাতের খাবার আগেই সারা হয়ে গেছে। এবার ট্যাবে নতুন কয়েকটা রিসার্চ পেপার পড়বেন বলে মিনিমাইজ করে রেখেছেন। ট্যাব টা হাতে নিতেই দেখলেন দুখানা ইম্পর্ট্যান্ট মার্কড ইমেল। জন ! খুব জরুরী দরকার না থাকলে তো সে এই সময় পারতপক্ষে তার শান্তি বিঘিত করবে না। না জন তো নয় ! তবে ? ইমেলটা খুলে পড়তে থাকলেন তিনি –“ প্রিয়, ডাক্তার রোডস,রয়্যাল ব্রম্পস এ অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের আই সি ইউ ও এইচডি ইউ পেসেন্টরা হঠাত করেই এক ভয়ঙ্কর সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন ও অধিকাংশই মারা যাচ্ছেন । মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশী, প্রায় ৭০% । বহু চেষ্টা করেও আমরা এই সংক্রমণএর মোকাবিলা করতে পারছি না। আমাদের জানা সমস্ত ওষুধ প্রয়োগ করেও এর সামান্যতম ক্ষতিও আমরা করে উঠতে পারছি না। অতি দ্রুত এই সংক্রমণ এক রোগীর দেহ থেকে অন্য রোগীর দেহে ছড়িয়ে পড়ছে, আর তার জন্য স্যালাইনের নল থেকে, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, অক্সিজেনের নল যেকোন কিছুকেই ব্যবহার করে নিচ্ছে মাধ্যম হিসাবে। এই ভয়াণক পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছে ……”
বার্তার আকস্মিকতায় বেশ কিছুক্ষণের জন্য অভিভূত হয়ে রইলেন জোহানা, বাইরে তখন হিমেল হাওয়ার গর্জন বেড়ে চলেছে। রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল , হৃদযন্ত্রের অসুখের ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চিকিৎসাকেন্দ্র। সবসময়েই লোকে গমগম করে চারতলা হসপিটালের প্রতিটি তলা। জোহানা এই হসপিটালে আগেও এসেছেন। অনেকটা অষ্টাদশ শতাব্দীর কাউন্ট দের প্রাসাদের মত এর গড়ন চিরকালই তাঁর অদ্ভুত লাগে, হসপিটালটা যেন অন্যান্য সব হসপিটালের থেকে আলাদা। দেখতেও যেমন অভিনব, তেমনই সেরা এদের কেবিন ও ওয়ার্ডগুলি, আর নার্সদের ব্যবহার।“ডক্টর রোডস ? নমস্কার, আমি অ্যালিনা, সিডিসি আর ডি ৩১ মেম্বার। আশা করি, আপনি সবই জানেন তবু আমার দায়িত্ব পুরোটা আরেকবার আপনাকে ব্রিফ করা, আসুন, পিপিই টা ড্রেসিং রুমে রাখা রয়েছে, ওখানে যেতে যেতেই আপনাকে ব্রিফ করি” জোহানা এগিয়ে চললেন অ্যালিনার সাথে, তাঁদের এখানে গন্তব্য আইসিউ, কোয়ারেন্টাইনড এলাকা এবং তার পর ল্যাবরেটরি। যে ল্যাবরেটরির একটা কালচার ডিস মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখতে দেখতে বছর পাঁচেক পর তিনি লিখবেন সেই ভয়ঙ্কর উক্তি … “আপনারা করোনাকে ভয়াণক ভাবছেন, আপনারা এখনও এই মাইক্রোস্কোপের নীচের এই বিভীষিকাটির সাথে পরিচিত হননি বলে”।


*****ঘটনা ২, সাল ২০১৫, ডিসেম্বর মাস, স্থান – হাওড়া, ধূলাগড়, ভারত

কদিন আগেই আগেই এই কোম্পানিটায় জয়েন করেছে রুদ্র। ওর জীবনে প্রথম হার্ডকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল চাকরি এটাই। এর আগে বিভিন্ন সার্ভিস প্রোভাইডিং , হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের টেকনিক্যাল পোস্টে কাজ করলেও ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাহিদাটা ছিলই কোর সেক্টরে কাজ করার। এই অদ্ভুত ধূলো ধোঁয়া গ্যালাভানাইজারের জিঙ্কের ঝাঁঝালো বাষ্প, অ্যাসিড পিটের সোঁদা গন্ধ নেহাত খারাপ লাগে না ওর। শুধু সমস্যা হয় ক্যান্টিনে খাওয়ার সময়। মারোয়াড়ী কোম্পানির ক্যান্টিনের সেই চিরকালীন একঘেয়ে নিরামিষ খাবার। তাই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খায় ও আর ওর সাবর্ডিনেট টেকনিশিয়ানের দল। সেদিন ও বাইরে থেকে আনিয়ে নেওয়া ঝুরি-ভাজা খাচ্ছিল ওরা সবাই। বলাই বাহুল্য রুদ্রই স্পন্সর। খেতেও যেমন ভালবাসে, খাওয়াতেও তাই। হঠাতই চিবোনোর সময় একটা টুকরো বেকায়াদায় মুখের ভিতরে উপরের অংশে, তালুতে আঘাত করল আর সঙ্গে সঙ্গে অপ্রত্যাশিত তীব্র যন্ত্রণায় দিগ্বিদিক অন্ধকার হইয়ে উঠল রুদ্রর সামনে।একটা সাধারণ খাবার খেতে গিয়ে এতটা ব্যাথা কিভাবে হতে পারে ভেবে অবাক হচ্ছিল রুদ্র, তাই মোবাইলের ক্যামেরার মাধ্যমে মুখের ভিতরের একটা ছবি তুলল সে । তালুতে অদ্ভুত গভীর এক ক্ষত, যা কোন ভাবেই খাবারের ছোট্ট একটা কণার আঘাতে হওয়া সম্ভব নয়। হাত ধুয়ে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে রুদ্র বুঝতে পারল তার তালুর প্রায় সম্পূর্ণটাই অবশ হয়ে রয়েছে, ব্যাথায় নয় … এ যেন ঠিক লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ইঞ্জেকশনের প্রভাবে হওয়া অবশতা … তবে ??

ঘটনা ৩, সাল ২০১৬, স্থান – কলকাতার পার্কস্ট্রীট


স্মিয়ার টেস্টের রিপোর্ট হাতে নিয়ে বসে আছেন ডক্টর শুভম আগরওয়াল, ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ ম্যাক্সিবুলার অংকোলজিস্ট ডক্টর সৈদুল ইসলামের প্রিয় ছাত্র। কিন্তু সব হিসাব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাঁর পেসেন্ট এই ছেলেটির রোগের গতিপ্রকৃতি খুবই অদ্ভুত। প্রথম দিন ওর মুখের ভিতরের আক্রান্ত জায়গাটা দেখে তিনি বুঝেছিলেন এটা ক্যান্ডীডীয়াসিস। কিন্তু হিসেব টা মিলছে না …
ক্যান্ডীডীয়াসিস একটি ছত্রাক ঘটিত অবস্থা। ক্যান্ডিডা পাঁউরুটি তৈরিতে যে ইস্ট ব্যবহার হয় তার খুব কাছাকাছি গোত্রের একটি ছত্রাক বা পরজীবি (ব্যাক্টেরিয়া), মানুষের দেহে বিভিন্ন জায়গায় যেমন ত্বক, পাকস্থলী, মুখ ইত্যাদি জায়গায় অল্প পরিমাণে বর্তমান থাকে আজীবন। এরা বাতাসে ভেসে বেড়ায় স্পোর হিসাবে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পেলে বা বলা ভাল অনুকুল পরিবেশ পেলে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে। এরা দেহের বিভিন্ন নিসৃত পদার্থর মধ্যে থাকা শর্করা বা পুষ্টিদ্রব্যের উপর নির্ভর করে বাঁচে। কিন্তু কোন কারণে শরীরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অর্থাৎ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে এরা গোটা শরীরটাকেই খাদ্য বানিয়ে ফেলতে সচেষ্ট হয়। এই ধরণের ক্যান্ডিডার আক্রমণেই আমাদের অতি পরিচিত ত্বকের বিভিন্ন চর্মরোগ, নখের পচন ইত্যাদি হয়। আর একবার যদি এটি কোনভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশের উপায় খুঁজে পায়, তাহলে তার মাধ্যমে এটি সারা দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে আর সেগুলিকে ভিতর থেকে বিকল করতে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন শরীর কোন একটা ভাবে দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার অবস্থায় বা ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড হয়ে পড়বে। এটা অনেক ভাবে হতে পারে । কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করার জন্য হতে পারে, আর্সেণিক বা পারদের মত বিষাক্ত ধাতু অনেকদিন একটু একটু করে শরীরে বিষক্রিয়া করলে হতে পারে, অপুষ্টি – ভিটামিন বা খনীজ পদার্থের অভাব ঘটলে হতে পারে, কেমো বা রেডিয়েশন চললে হতে পারে, বড় কোন অপারেশনের জন্য হতে পারে, অত্যাধিক রক্তপাত হলে হতে পারে, ধূমপান – মদ্যপান করলে হতে পারে, জন্মগত রক্তাল্পতা থাকলেও হতে পারে, এরকম আরও বিভিন্ন কারণে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে চর্মরোগ ছাড়াও ক্যান্ডীডার অন্যতম প্রিয় আক্রমণস্থল হল মুখের ভিতরের মিউকাশ মেমব্রেন – গাল, জিভ, দাঁতের মাড়ি এছাড়াও যোনীমুখ ইত্যাদি, এই সব জায়গায় ক্যান্ডীডা সাদা পণীরের মত আস্তরণ তৈরী করে ও সেখানের মিউকাশ লেয়ার গুলিতে ছত্রাকের দেহে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দিয়ে অবশতা তৈরি করে । এর সঙ্গে বেশ কিছু অন্যান্য উপসর্গ জুড়ে যায় যদি ক্যাণ্ডীডা দেহের ভিতরে, অর্থাৎ পাকস্থলি বা অন্ত্রে পৌঁছে যায়। ডায়েরিয়া, যেকোন সময় খাওয়ার পরেই তীব্র নিম্নচাপ, প্রস্রাবে অ্যালকোহলিক গন্ধ, দুর্বলতা এসবও ক্যাণ্ডীডার লক্ষণ। এছাড়া ক্যান্ডীডা সুপার ইনভেসিভ স্টেটে যদি ব্লাডস্ট্রীমে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তীব্র জ্বর ও পরবর্তীতে আস্তে আস্তে মাল্টি অরগ্যান ফেলিওরের দিকে এগোতে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তি। এছাড়াও বেশ কিছু আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই ক্যান্ডীডা খুব তাড়াতাড়ি মানুষ্কের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে ব্রেন ডেথ ঘটাতে পারে খুব অল্প সময়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডিডা আক্রান্ত জায়গায় পরবর্তীতে ম্যালিগ্ন্যানান্সি বা ওরাল ক্যান্সার দেখা দিয়েছে , গবেষণাগারে দেখা গেছে ক্যান্ডীডীয়াসিস ওরাল ক্যান্সারের চান্স অনেকগুণে বাড়িয়ে দেয়।
তবে ক্যান্ডীডীয়াসিস দুরারোগ্য নয়, সাধারণতঃ অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ (ফ্লুকোনোজল ইত্যাদি) প্রয়োগ করলে, ইমিউনিটির উন্নতি ঘটালেই একে কাবু করে ফেলা যায়। নির্মূল ও করা যায়। কিন্তু হিসেবটা সত্যিই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে এই পেসেন্টটির ক্ষেত্রে …
এই ছেলেটির ক্যান্ডীডীয়াসিস তা কনফার্ম করা হয়েছে আগেই (কারণ ক্যান্ডীডীয়াসিস এর মত আরও অনেক অসুখ যেমন লাইক্যান প্লানুস ইত্যাদি মুখের ভিতরে সাদা দাগ – লিউকো প্ল্যাকিয়া তৈরি করতে পারে) । যথারীতি ওষুধও চলছে কড়া ডোজের । খাবার খাওয়ার সময় ন্যাচারাল স্ক্র্যাপিং হয়ে ক্যান্ডীডার ওপরের পণীরের মত সাদা স্তরের আস্তরণ টা উঠে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু ঐ জায়গায় (ছত্রাকের বেশ কিছুটা অংশ মিউকশাল লেয়ারের ভিতরে ইনভেড করায় আস্তরণ টা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সেই জ্যগাটা রক্তাভ লাল হয়ে থাকে ও তীব্র জ্বালার অনুভূতি থাকে) সাধারণ গোলাপী রঙ ফিরে আসার পরে পরেই দেখা যাচ্ছে যে আবার উপরের সাদা লেয়ারটা তৈরি হতে শুরু করেছে অর্থাৎ ক্যান্ডীডা নির্মূল হয় নি। ডিসেম্বর থেকে গত ৫ মাসে প্রায় বার দশেক এই ভাবেই ক্যান্ডীডা কক্ষনোই পুরোপুরি চলে যায় নি। এদিকে ওষুধ কখনও বন্ধ হয়নি। ক্যান্ডীডীয়াসিস ক্রণিক বা রিপিটেড হওয়ার নিদর্শন থাকলেও সেই সব ক্ষেত্রে একবার সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়ার অনেক দিন পরে আবার ইমিউনিটি কম হয়ে গেলে ক্যান্ডীডীয়াসিস ফিরে আসে কিন্তু এরকম একদমই নিরাময় না হওয়ার ঘটনা ডাক্তার আগরওয়াল আগে কখনও দেখেননি বা কোথাও পড়েনওনি। ছেলেটির রক্তে লৌহের মাত্রা কম থাকার কথা আগেই পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল বটে কিন্তু সঠিক সাপ্লিমেন্ট, ডায়েট পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে তা তো এখন নিয়ন্ত্রণে। তবে ? রোগিকে ডাক্তার আগরওয়াল পাঠালেন তাঁর অগ্রজপ্রতীম ডাক্তার অজয় মুখার্জ্জীর কাছে।উপায় একটা ডাক্তার মুখার্জ্জী খুঁজে বার করলেন ঠিকই, তবে সেটা আগে কখনও কেউ করেননি ক্যান্ডীডীয়াসিস নির্মূল করতে, এবং তাতে কাজ হল (চিকিৎসামন্ত্রকের বিশেষ বিধি-নিষেধ থাকায় বিস্তারিত পদ্ধতিটি এখানে লেখা সম্ভব হল না) । পরবর্তীতে যখন দুই ডাক্তার একত্রে বসে তাঁদের কাছে আসা গত কয়েক বছরের রোগীদের কেস ফাইলগুলি পর্যালোচনা করে দেখছিলেন তখন তাঁরা লক্ষ্য করলেন বেশ কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডীডা গোত্রের ছত্রাকের আক্রমণে (সাধারণতঃ ক্যান্ডীডা অ্যালবিকেন্স) সাধারণ অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ সহজে কাজ করছে না। অর্থাৎ ??? অর্থাৎ ক্যান্ডীডা আস্তে আস্তে তার উপর প্রয়োগ করার জন্য তৈরি ছত্রাকনাশক গুলিকে সহ্য করে বেঁচে থাকতে শিখে যাচ্ছে।

ঘটনা ৪, সাল ২০০৯, স্থান – নিউ দিল্লী

ডাক্তার অনুরাধা চৌধুরী তাঁর ল্যাবরেটোরিতে বজ্রাহতের মত বসে আছেন। নিওনেটাল ইউনিট থেকে আসা এই টেস্ট স্যাম্পেলগুলি কিসের ??? এমন কোন ছত্রাক তো তিনি আগে দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না তাঁর। এই ক্যান্ডীডা সদৃশ জীবানুটি একের পর এক শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে চলেছে আর তার চেয়েও বড় কথা প্রচলিত কোন ছত্রাকনাশক ওষুধই কার্য্যকারী হচ্ছে না এর প্রতিরোধে, অ্যাজোল, অ্যাম্ফোটেরিশিন, ফাঙ্গীন সব গ্রুপের ওষুধেই এরা শুধু যে বেঁচে থাকছে তাই না, বৃদ্ধিও হচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই। তবে কি এ নতুন কোন প্রজাতি আবিষ্কার করে ফেললেন তিনি ? হঠাত মনে পড়ে গেল জাপানের মেডিক্যাল জার্ণালে প্রকাশিত বছর দুয়েক আগের একটি ঘটনা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির কান থেকে প্রাপ্ত এই ছত্রাকের উল্লেখ ছিল, আর কানের ল্যাটিন নাম অরিস অনুযায়ী যার নামকরণ করা হয় ক্যান্ডিডা অরিস।
তড়িঘড়ি ডাক্তার চৌধুরী নির্দেশ দেন, সিল করে ফেলতে হবে আক্রান্ত সমস্ত ইউনিট গুলি, মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কারণ তিনিযে দেখেছেন কি ভয়ঙ্কর দ্রূত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে এই ছত্রাক, লেগে থাকে টেবিল, পোশাক, দরজার হাতল সর্বত্র … দৃঢ় ভাবে, সাবান, স্পিরিট কোন কিছু দিয়েই সহজে দূর করা যায় না একে, অতয়েব … আটকে দিতে হবে উৎসেই ……
ডাক্তার অনুরাধার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতকে এক ভয়ানক মহামারির হাত থেকে সেদিন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল, শুধু সেদিনই নয়, আবার কর্মীদের গাফিলতিতে ২০১৩ সালে যখন ছড়িয়ে পড়ছিল ক্যান্ডিডা অরিস বা সি অরিস দ্রুত গতিতে, তখনও মাঠে নেমেছিলেন ডাক্তার চৌধুরী … ত্রাতা হয়ে … যে খবর দেখানো হয়নি কোন সংবাদ মাধ্যমে …

ঘটনা ৫, সাল ২০২১, স্থান – পৃথিবী

ছত্রাক, পৃথিবীর অন্যতম আদিম অধিবাসী। প্রাণীর সঙ্গে যার অনেক মিল বৈশিষ্ট ও ব্যবহারে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক হল ছত্রাকের মাইসিলিয়ামের নেটওয়ার্ক যার জাল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মতই। তারা প্রবল, মৃত্যু তাদের পরিচারক, মৃত বস্তুই যে তাদের আহার। তারা অসীম শক্তিশালী, অনন্য সাধারণ তাদের ছড়িয়ে পড়ার, বংশ বিস্তারের ক্ষমতা।এ পৃথিবীর কিছুই তাদের অভক্ষ্য নয়।
এতদিনে চিকিৎসা জগতে ক্যান্ডীডা অরিস পরিচিত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এর ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতা, সত্তর শতাংশের কাছাকাছি মৃত্যুহার ভয় ধরিয়েছে সবার মনেই। আমেরিকার সিডিসি এটিকে পৃথিবীর অন্যতম বিপদ চিহ্নিত করেছে ২০১৯ সালে এবং হসপিটাল গুলিতে নিরন্তর এই ইনফেকশন খুঁজে বের করে তাকে কোয়ারেন্টাইন করে নির্মূল করার রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। যেহেতু এই সংক্রমণ মূলতঃ হাসপাতালে অসুস্থ (কোমরবিডীটিযুক্ত, ইমিউনোকম্প্রোমাইজড) ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ছড়াতে শুরু করে তাই এই সুপারবাগটিকে যাতে হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যায় তার জন্য কঠীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা, জাপান, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ভারতের মত দেশ। এই ভয়াণক সংক্রমণ যদি লোকালয়ে … বিশেষত ভারতের মত অধিক জনঘনত্বের দেশে ছড়িয়ে পড়ে তবে তার ফল হবে মারাত্বক। কিন্তু নিয়তির নির্মম অঙ্গুলীহেলনে করোনা ভাইরাস মহামারীর আঘাতে সম্ভব হল না এই পরিকল্পনা সফল করা। বিশাল সংখ্যক জনসংখ্যাকে হাসপাতালমুখী হতে হল কোভিড সংক্রমণ নিয়ে আর তার সাথে সাথেই সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ক্যান্ডীডা অরিস নামের অদৃশ্য শত্রু, যা করোনার থেকেও নির্মম মারক (করোনার ডেথ রেট যেখানে এক শতাংশের মত সেখানে ক্যান্ডিডা অরিসের মৃত্যু হার প্রায় ৩০ – ৭০ শতাংশ)। মাত্র কিছুদিন আগে আন্দামানের মত নির্জন সৈকতেও উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে ক্যান্ডিডা অরিস বা সংক্ষেপে সি অরিস এর, যার অর্থ সমুদ্রপথে বাহিত হয়ে এই ভয়ানক মৃত্যুকীট পৌঁছে গেছে সবকটি মহাদেশেই, পৃথিবীর কোন প্রান্তই আজ আর সুরক্ষিত নয় !


কারণ কি ?

এই ছত্রাকের প্রজাতিগুলি বহুবছর ধরে মানুষের সাথে সহাবস্থান করছে, তাহলে আজ হঠাত এদের এই ভয়ানক হয়ে ওঠার প্রবণতা কেন ? বৈজ্ঞানিকরা বলছেন মূলতঃ দূষণ এবং মানুষের নির্বোধতা। গত কিছু দশকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে অনেকটা, আর তার সর্বোচ্চ প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর নিরক্ষীয় উষ্ণ অঞ্চলগুলিতে। আগে দেহের জীবাণু নিধনের অন্যতম অস্ত্র ছিল জ্বর। সংক্রমণ ঘটলে দেহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করার নামই জ্বর। কিন্তু এখন বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে জীবাণুগুলি বেশী তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাই জ্বর তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সংগে আছে বিভিন্ন রাসায়নিক মাত্রাতিরিক্ত হারে জলে ও মাটিতে ছড়িয়া পড়ে এই জীবানুগুলিকে বিষাক্ত পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম করে তোলা, আর সর্বোপরি মানুষের নিজে ডাক্তারী করার স্বভাব। অধিকাংশ মানুষই যেকোন রোগ হলে বিন্দুমাত্র পড়াশোনা, পরীক্ষা না করে, ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজে অথবা ফার্মাসিস্টের মুখস্ত বিদ্যার উপর ভরসা করে বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে নেন। এবং যে ওষুধটি খাচ্ছেন তার নিয়ম অনুযায়ী পুরো কোর্সটা কমপ্লিট করেন না। ধরা যাক কারোর সর্দি জাতীয় অসুখ হয়েছে, তিনি ডাক্তার না দেখিয়ে সর্দির গতিপ্রকৃতি বিচার না করে দোকানে গিয়ে অ্যাজিথ্রোমাইসিন কিনে আনলেন। দুটি খাওয়ার পরেই তাঁর সর্দি মোটামুটি কমে গেল, আর তিনিও বেশী অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কিডনি খারাপ হয়ে যাবে ইত্যাদি বিজ্ঞবাক্য স্মরণ করে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের বাকি তিনটি ওষুধ আর খেলেন না। এদিকে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মিনিমাম ডোজ হয়তো পাঁচটার। এর ফলে কি হল ? তিনি নিজের তো ক্ষতি করলেনই সাথে সাথে সমাজের ক্ষতি করলেন। দুটি ট্যাবলেট খাওয়ায় তাঁর শরীরে থাকা অধিকাংশ জীবানু হয়ত ধ্বংস হল, সেই কারণেই তাঁর অসুখের কিছুটা উপশম হল। কিন্তু কিছু জীবাণু যারা একটু বেশী সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন তারা সংখ্যায় কম হলেও কিন্তু টিকে গেল। এদের মারার জন্য দরকার ছিল ঐ বাকি তিনটি ট্যাবলেটও নিয়ম মত খেয়ে কোর্স কমপ্লিট করা। এই যে অ্যাজিথ্রোমাইসিন সহ্য করেও টিকে যাওয়া জীবানুগুলি ন্যাচারাল সিলেকশন অনুযায়ী যখন আবার বংশবিস্তার করে একটি নতুন কলোনী তৈরি করবে তাদের উপর কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিন আর তেমন করে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এই জীবানুগুলি হল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু, এখন এরা যদি এই প্রথম ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য কোন ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হয় তাহলে তিনি কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিনের পুরো কোর্স অনুযায়ী সব কটি ওষুধ খেলেও কিন্তু আর কাজ হবে না। এঁকে অন্য কোন গ্রুপের ওষুধ খেতে হবে। দ্বিতীয়ব্যক্তিও যদি আবার নতুন গ্রুপের ওষুধের কয়েকটি মাত্র খেয়ে আর কোর্সটা কমপ্লিট না করেন, তাহলে রয়ে যাওয়া জীবাণূগুলি অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সাথে সাথে এই নতুন অ্যান্টিবায়োটিকটিতেও রেজিস্ট্যান্ট হবে। এটা একটা সাধারণ উদাহরণ দিলাম মাত্র, কিন্তু বাস্তবিক এই রকম ভাবেই কিন্তু মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (অর্থাৎ যাদের উপর কোন পরিচিত ওষুধই কাজ করে না) জীবাণু তৈরি হয়। ক্যান্ডিডা প্রজাতির বিভিন্ন জীবাণুর যথা, অ্যারিস, অ্যালবিকন্স, হাইমুলনী ইত্যাদির মাল্টিড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠার পিছনে এগুলিই সম্ভাব্য কারণ।


করণীয় ?

সর্বাগ্রে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা যেকোন উপায়ে বাড়িয়ে তোলা, ভাল সুষম খাবার খাওয়া, খাদ্যে লৌহের মাত্রা ঠিকঠাক বজায় রাখা, কাঁচা ফল ইত্যাদি খাওয়া, ভিটামিন যুক্ত খাবার খাওয়া । দেখা গেছে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাস্থবান মানুষকে খুব সহজে ক্যান্ডিডা আক্রমণ করতে পারে না। ডায়াবেটিস, রেনাল ফেলিওর, স্থূলত্ব ইত্যাদি ক্যান্ডীডার আক্রমণকে সহজতর করে দেয়। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, নিমপাতাযুক্ত জলে স্নান, পরিস্কার থাকা, খুব দরকার না হলে পারতপক্ষে হাসপাতাল এড়িয়ে চলা, এগুলি জরুরী। সাথে সাথেই যদি ব্যক্টেরিয়াল ইনফেকশনে কারুর জ্বর হয়, এবং জ্বর কমানোর ওষুধ দেওয়ার পরও তাপমাত্রা না নামে তবে তাকে দেরী না করে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনা দরকার। ক্যান্ডিডা অরিস, হাইমূলনী ইত্যাদির মৃত্যুহার খুব বেশী হলেও সময় মত চিকিৎসায় অনেকক্ষেত্রে নিরাময় সম্ভব, ডাক্তাররা বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অতি উচ্চ মাত্রায় “এচিনোক্যান্ডিন্স” নামক একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন। আরেকটি কথা ক্যান্ডীডা আক্রান্ত মানুষের দেহে মাসাধিক কাল, কিছু ক্ষেত্রে বছরও ক্যান্ডীডার অস্তিত্ব থেকে যায়, তাই সংক্রমণএর ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলা ও সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা দরকার। গরম ফুটন্ত জল ক্যান্ডিডার বিনাশ করতে স্বক্ষম, তাই স্যানিটাইজেশনের জন্য যে যে জায়গায় সম্ভব ফুটন্ত জল ব্যবহার করা যেতে পারে। সর্বোপরি প্রতিটি মানুষ দায়িত্ব নিলে, সচেতন হলে, হয়ত আগামীর এই মহামারীকে রুখে দেওয়া সম্ভব।

বিঃদ্রঃ – এটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প ভেবে ভুল করবেন না।

আগাছা না বনৌষধি ? – ১

নমস্কার পাঠকবর্গ। আগের লেখাটিতেই আমি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলাম, পরিচিত হয়েও অপরিচিত উদ্ভিদগুলির ব্যবহার ও ভেষজ গুণগুলি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা যে কি ভীষণ দুরুহ তা অনুভূত হল, যখন দেখলাম আগাছা, অর্থাৎ যে উদ্ভিদেরা নিতান্তই অবহেলায় যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকে, আধুনিক ভেষজবিজ্ঞানে তাদের নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত দুর্লভ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বন্দময়। অপর দিকে প্রাচীন ভারতীয় ও অন্যান্য সংস্কৃতিতে তাদের ভেষজ ব্যবহার থাকলেও (যদিও তাদের যথাযথ বিবরণ, নাম, ইত্যাদি তথ্য হয় অস্পষ্ট নয়তো অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের শনাক্তকরণ অসম্ভব জটিল) তা আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক চোখে পরীক্ষিত নয়। তাই একটি মাত্র উদ্ভিদের সম্বন্ধে লিখতেও পাহাড় প্রমাণ গবেষণা করতে হচ্ছে। আরও একটি অসুবিধার কারণ উদ্ভিদবিদ্যা সম্বন্ধে আমার প্রথাগত শিক্ষার অভাব (আমি পেশায় একজন অধ্যাপক, বিদ্যুৎ প্রকৌশল ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাদি বিষয়ক)। তবুও আমার মত নেহাতই একজন শখের ভেষজপ্রেমীর কাজ যদি ভবিষ্যতে কোন যোগ্যতর ভেষজবীদের এ বিষয়ে বিশদ গবেষণার আগ্রহ জন্মাতে স্বার্থক হয়, তবে আমার পরিশ্রম সফলজ্ঞান করব ।

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, ছোট থেকেই আরেকটি শখ (প্রাচীন বস্তু খুঁজে বার করার প্রচেষ্টা) এর বশে বেশ কিছু পুরোনো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান করে খুঁজে পেয়েছিলাম বেশ কিছু পুঁথি (যেগুলি বর্তমানে এশিয়াটিক স্যোশাইটির কাছে গচ্ছিত)। যার মধ্যে একটি অতি দুর্লভ ছবি যুক্ত পুঁথিও ছিল, ছবিগুলি কালি দিয়েই আঁকা, খুব স্পষ্ট নয়, দেখতে উদ্ভিদের মতই। এশিয়াটিক স্যোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটার আগেই আমি পুঁথি প্রাপ্তিস্থানের নিকটবর্তি হুগলির পুরশুড়া গ্রামে হারান কবিরাজ (হারান ভট্টাচার্য্য) নামে অশীতিপর এক আয়ুর্বেদাচার্য্যের সন্ধান পাই। তিনি পুঁথিটির ভাষ্য উদ্ধার করতে সমর্থ না হলেও তাঁর সঙ্গে আমার দাদু-নাতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং মূলত তাঁর কারণেই পরবর্তিতে আমার বিভিন্ন উদ্ভিদের ঔষধি গুণ সম্বন্ধে আগ্রহ জন্মায়। তিনি আজ নেই, তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই সিরিজটি নিবেদন করে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার সামান্য প্রচেষ্টা করলাম।

হারান দাদু আমায় বিভিন্ন গাছ চিনিয়েছিলেন, এতে আজীবন উদ্দানপ্রেমী আমার মাতামহেরও যথেষ্ঠ উৎসাহ ছিল। তবে সেসময় অপরিণত বুদ্ধির কারণে তাঁর চেনানো উদ্ভিদগুলির কোন নির্দিষ্ট নোট নেওয়া নেই। তাই উদ্ভিদগুলি ও তাদের কিছু কিছু লোকায়ত ব্যবহার মনে থাকলেও তাদের নাম গুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিস্মৃত হয়েছি। একারণেই বর্তমানে নতুন করে সেগুলি নিয়ে খোঁজখবর করার জন্য প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য বই (এ ক্ষেত্রে ফেসবুক গ্রুপ মলাটের অবদান নতমস্তকে স্মরণ করি), ইন্টারনেটের (ফেসবুক গ্রুপ বৃক্ষকথার কাছে অনন্ত কৃতজ্ঞ) সাহায্য নিয়েছি।

আজকে যে উদ্ভিদটির কথা বলব তার কোন নির্দিষ্ট বাংলা নাম নেই। অনেক জায়গায় এটিকে বনপালং বলে উল্লেখ করা হলেও আসল বনপালং (Rumex crispus) সম্পূর্ণ আলাদা একটি উদ্ভিদ। হারাণ দাদু এর নাম যতদূর মনে করতে পারি বলেছিলেন “দুধেরা” বা “দুদরোয়া” কিন্তু আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তির ওপর খুব একটা নির্ভর করতে পারছি না। তাই এর নাম রাখলাম “মূলা পাতা”, কারণ এর অপরিণত পাতাগুলি অনেকটাই মূলার পাতার মত দেখতে, এছাড়াও নেপালে অনেক অঞ্চলে এটি “মূলা-পাত্তে” (मुलापाते) বলে পরিচিত। তবে এক্ষেত্রে একটি আগ্রহদ্দীপক তথ্য দিয়ে রাখি, নেপালের অনেক অঞ্চলে এটি কিন্তু “দুধে” (दुधे) বা “বন-রায়া” (बन रायो) বলেও পরিচিত।

এই উদ্ভিদটির সম্বন্ধে বলা হারাণ দাদুর কথাগুলির মধ্যে যেটি মনে আছে তা হল, যে এটি পাকস্থলী ও যকৃত দৌর্বল্য, মধুমেহ ইত্যাদি কঠীন রোগের ক্ষেত্রে ফলদায়ক, এছাড়াও এটি অনিয়মিত ঋতুর ক্ষেত্রেও বিশেষ উপকারী। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায় এটির নিরাময় ক্ষমতার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে এর পরিচয় খোঁজার ক্ষেত্রে খুবই সমস্যায় পড়লাম, নাম না মনে থাকায়। উদ্ভিদটির প্রথম যা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল সূর্যমুখী সদৃশ দৃষ্টি নন্দন ফুল। তাই সেই ফুলের ছবি ফেসবুকের বৃক্ষকথা গ্রুপে পোস্ট করে সাহায্য চাইলাম। সেখানে সমাপ্তি ভট্টাচার্য্য ঠাকুর লিখলেন যে এটি ব্লুমিয়া গোত্রের উদ্ভিদ। ব্লুমিয়ার সঙ্গে আমার আদৌ পরিচয় না থাকায় ইন্টারনেট সহায়ে বেশ কিছু পড়া-শোনা করে মূলা-পাতার ফুলের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে এমন একটি ব্লুমিয়া গোত্রের ফুল খুঁজে পাওয়া গেল। এই ব্লুমিয়াটি (Blumea Lanceolaria) মিজোরাম অঞ্চলে জন্মায় ও আঞ্চলিক ভাষায় “তেরাপাইব্বি” নামে পরিচিত। কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্ভিদের ছবি দেখে বুঝলাম এটি আমার পরিচিত উদ্ভিদটি নয়। তবে উদ্ভিদের বিবরণে আরেকটি লাইনে আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, তা হল এই তেরাপাইব্বি কে “মিজোরামের ড্যান্ডেলিয়ান” বলা হয়।

ড্যান্ডেলিয়ন বহু ভেষজগুণসম্পন্ন একটি উদ্ভিদ, তবে তার ফুলের সঙ্গে পরিচিত হলেও পুঙ্খানুপুঙ্খ গঠন আগে কখনও বিচার করে দেখিনি। ইন্টারনেটের সহায়তায় খুঁটিয়ে দেখে এর একটি প্রজাতির (Taraxacum officinale) সঙ্গে আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদের ফুলের সম্পূর্ণ মিল খুঁজে পেলাম। কিন্তু আবার নিরাশ হতে হল এর সম্পূর্ণ উদ্ভিদের গঠন দেখে, যা বেশ কিছু সাযুজ্য থাকলেও কখনই আমাদের আলোচিত উদ্ভিদটি নয়।

এর পর অনুসন্ধান করতে গিয়ে অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম কারণ এই রকম পুষ্প সম্বলিত একাধিক উদ্ভিদ আছে, যাদের নিজেদের গঠনের মধ্যে নানা সাযুজ্য থাকলেও তারা আলাদা গোত্রের, এবং কোন ভাবেই আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদটি নয়। এদের মধ্যে হকউইড (Crepis pulchra) ও বিড়ালকর্ণীর (Hypochaeris radicata) কথা উল্লেখযোগ্য। অবশেষে অনেক অনুসন্ধানের পর আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদটি, যার নাম দেওয়া হল মূলা-পাতা সেটিকে Sonchus wightianus হিসাবে শনাক্ত করা গেল। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত কিন্তু দারুণ তথ্যও এই সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এই ধরণের ফুল যুক্ত যে যে উদ্ভিদগুলি দেখলাম তারা আলাদা আলাদা গোত্রের হলেও দু একটি বাদ দিয়ে প্রায় সবকটিই ভেষজ গুণাবলি যুক্ত হওয়া ছাড়াও খাদ্যযোগ্য এবং পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তাদের ভোজ্য শাক হিসাবে প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহারের প্রমাণ আছে।

বিশেষ অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম, মূলা-পাতা ও ড্যান্ডেলিয়ান খুবই কাছাকাছি আত্মীয়। দুটিই একই পরিবারভুক্ত বলা চলে (Cichorieae)। তাই দুটির মধ্যে ফুল, পাতার গঠন, বীজ ছড়ানোর পদ্ধতি, বাসস্থান, আগ্রাসী প্রকৃতি ও ভেষজ গুণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসংখ্য সাযুজ্য দেখা যায়। যদিও এখনও মূলা-পাতা নিয়ে সেভাবে গবেষণা হয়নি তবে যদি সত্যিই ড্যান্ডেলিয়নের মত ভেষজ গুণ মূলা-পাতায় থেকে থাকে, তবে তা হবে আমাদের উপমহাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ড্যান্ডেলিয়ানের স্পষ্ট উল্লেখ আছে সিংহদন্তী নামে (এর পাতার আকার সিংহের দাঁতের মত খাঁজ কাটা বলে)। অসংখ্য প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সিংহদন্তীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন – চক্রদত্ত, সুশ্রুত, চরকসংহিতা, হরিৎসংহিতা, বাস্তুগুণদীপিকা, বাস্তুগুণপ্রকাশিকা ইত্যাদি। তাই মূলা-পাতার ভেষজ গুণ সম্বন্ধে আলোচনার আগে দেখে নেওয়া যাক ড্যান্ডেলিয়নের বিভিন্ন ব্যবহার ও ভেষজ গুণ।

ড্যান্ডেলিয়ান ফুলের সঙ্গে সূর্যমুখী ফুলের খুব মিল থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে অন্য একটি পরিচিত ফসলের সঙ্গে কিন্তু এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তা হল লেটুস, যে কারণে ড্যান্ডেলিয়ান গোত্রিয় বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ বন্য লেটুস, তেঁতো লেটুস ইত্যাদি নামেও পরিচিত। প্রায় ১৫০০০ বছর আগেকার কয়েকটি ফসিলে ড্যান্ডেলিয়ানের অস্তিত্বের নমুনা পাওয়া গেছে, অতয়েব বলা ই যায় এটি যথেষ্ট পুরানো একটি উদ্ভিদ। প্রাচীন কাল থেকেই এর ব্যবহার মানুষ ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে হয়ে আসছে। তবে এর স্বাদ যথেষ্ট তিক্ত। প্রাচীন কালেও এর তিক্ত স্বাদ বদলাবার উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ বহু বছর ধরে নির্বাচিত রোপন (সিলেক্টিভ ব্রীডিং) পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত কম তিক্ত প্রজাতিগুলির সন্ধান ও রোপনের মাধ্যমে আজকের লেটুসের সৃষ্টি হয়েছে।

ড্যান্ডেলিয়ান সাধারণতঃ কবোষ্ণ (নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, যেখানে শীত ও গ্রীষ্ম ছাড়াও শরত ইত্যাদি ঋতু গুলির আবহাওয়া পরিবর্তন স্পষ্ট) অঞ্চলে জন্মায়। কোন কোন অঞ্চলের আবহাওয়া ড্যান্ডেলিয়ান জন্মানোর উপযোগী, তার সমীক্ষা করে প্রকাশিত ভৌগলিক মানচিত্রে ভারতের উত্তরপূর্বের অনেকাংশ এবং বাংলাদেশের বেশ কিছুটা অঞ্চলও কিন্তু ড্যান্ডেলিয়ান জন্মানোর উপযুক্ত পরিবেশ বলে দর্শিত হয়েছে।

ড্যান্ডেলিয়ান সাধারণতঃ নদীর ধার, জলা জমির পাড়, রাস্তার পাশে, ফাঁকা জমিতে সর্বত্র জন্মাতে পারে এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে, অ্যাসিডিক মৃত্তিকাতে, কম জলের যোগানেও টিকে থাকতে পারে। এই সব কারণেই আমেরিকা ও ইউরোপের যে অঞ্চলগুলিতে এটি জন্মায়, সেখানকার কৃষকরা এটিকে আগাছা বলেই মনে করেন।

মজার ব্যাপার হল ড্যান্ডেলিয়ান প্রধানত ইউরোপ ও এশিয়ার উদ্ভিদ হলেও আমেরিকাতে প্রথম ড্যান্ডেলিয়ান নিয়ে যাওয়া হয় খাদ্য শষ্য হিসাবেই। আগেই বলেছি এটি প্রাচীন কাল থেকেই শাক হিসাবে খাওয়ার চল ছিল বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। ড্যান্ডেলিয়ান গাছের সবুজ অংশ পুষ্টিগুণে ভরপুর। একটু তালিকাটা দেখে নেওয়া যাক –

প্রতি ১০০ গ্রামে পুষ্টিগুণ – ৩.৫ আউন্স, এনার্জী ২৫ কিলোক্যালরি , কার্বোহাইড্রেট ৯.২ গ্রাম , শর্করা ০.৭২ গ্রাম , পৌষ্টিক ফাইবার   ৩.৫ গ্রাম , ফ্যাট ০.৭ গ্রাম , প্রোটিন ২.৭ গ্রাম ,

ভিটামিন এর পরিমাণ : ভিটামিন এ – ৫০৮ মাইক্রোগ্রাম , বেটা ক্যারোটিন – ৫৮৫৪ মাইক্রোগ্রাম, ল্যুটেনিন জেক্স্যান্থিন – ১৩৬১০ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন (ভিটামিন বি ১) – ০.১৯ মিলিগ্রাম, রাইবোফ্ল্যাভিন (ভিটামিন বি ২) – ০.২৬ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন (ভিটামিন বি ৩) – ০.৮০৬ মিলিগ্রাম, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি ৫) – ০.০৮৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ৬ – ০.২৫১ মিলিগ্রাম, ফোলেট (ভিটামিন বি ৯) – ২৭ মাইক্রোগ্রাম, ক্লোইন – ৩৫.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি – ৩৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই – ৩.৪৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে – ৭৭৮.৪ মাইক্রোগ্রাম,

খনিজের পরিমাণ : ক্যালসিয়াম – ১৮৭ মিলিগ্রাম, আয়রন – ৩.১ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম – ৩৬ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ – ০.৩৪২ মিলিগ্রাম , ফসফরাস – ৬৬ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম – ৩৯৭ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম – ৭৬ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক – ০.৪১ মিলিগ্রাম

এছাড়াও উদ্ভিদটি অত্যন্ত রস বা জল সমৃদ্ধ ।

ঠিক এই কারণেই এই উদ্ভিদটি বিভিন্ন দেশের মানুষ বিভিন্ন রকম ভাবে ব্যবহার করে থাকেন। বিভিন্ন দেশের বাজারে ড্যান্ডেলিয়ান বেশ উচ্চমূল্যে বিক্রিও হয়। শাক ভাজা হিসাবে খাওয়া ছাড়াও, কাঁচা পাতা স্যালাড হিসাবে বেশ জনপ্রিয়। কচি পাতা ও সিদ্ধডিমের একটি পদ তো রীতিমত ডেলিকেসি। এছাড়াও এর ফুল উৎকৃষ্ট সুরা, পানীয়, জ্যাম জেলী, মধু-বিকল্প ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়।

ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড় চূর্ণ উৎকৃষ্ট কফি বিকল্প হিসাবে ব্যবহার হয়। আর যেহেতু এই কফির স্বাদ কফির মতই কিন্তু ক্যাফেইন অনুপস্থিত, তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

এবার আসি এর নিরাময়ক গুণগুলির আলোচনায়। বিভিন্ন সংস্কৃতির বিশ্বাস অনুযায়ী ড্যান্ডেলিয়ান একটি যাদুময় উদ্ভিদ। এর বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আমি আগেই বলেছি প্রচলিত বিশ্বাস গুলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের আতসকাঁচের তলায় ফেলে যাচাই করে নেব।

আমাদের অনেকের কাছেই ল্যাসিক্স (Furosemide) একটি পরিচিত নাম, সাধারণতঃ রোগির প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে ভারতীয় হাসপাতালগুলিতে এই ওষুধটি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয় প্রস্রাব নিঃসরণ বৃদ্ধি করার জন্য। এটি একটি diuretic জাতীয় ওষুধ। Diuretic আরও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, যকৃত ও কিডনির রোগ ইত্যাদি। এছাড়াও প্রিডায়াবেটিক (অর্থাৎ যার অদূর ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হতে চলেছে) রোগির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়ে থাকে। ড্যান্ডেলিয়ানের মূত্রকারক গুণের কথা প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের জানা ছিল। বিশেষতঃ কাব্যপ্রিয় ফরাসীরা তো এর নামই দিয়ে দিয়েছিল “শয্যাসিক্তকারক” (pissenlit)। বর্তমানে ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় (https://www.liebertpub.com/doi/10.1089/acm.2008.0152) যদিও দেখা গেছে যে এটি মানুষকে বার বার প্রস্রাবে যেতে বাধ্য করলেও সমগ্র নিঃসারিত মূত্রের পরিমাণ একই থাকে। তাই মূত্র বেশী পরিমাণে তৈরিতে এটি কার্য্যকর নয়, যদিও মূত্রথলীর পেশীর কোন সমস্যার জন্য মূত্র বন্ধ হয়ে গেলে এটি যথেষ্ট কার্যকারী। তবে এবিষয়ক আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ড্যান্ডেলিয়ানের নির্যাস ও বাঁটা শিকড়ের প্রলেপ দাদ, একজিমা, ব্রণ সহ বিভিন্ন চর্মরোগের নিরাময় করতে সক্ষম। এমনকি চামড়ার ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। এখন দেখা যাক বর্তমান গবেষণা কি বলে এ বিষয়ে। আশ্চর্য্যজনক ভাবে ২০১৫ সালের প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফলে (https://www.hindawi.com/journals/omcl/2015/619560/) দেখা যাচ্ছে যে ড্যান্ডেলিয়ানের প্রলেপ ত্বকের জ্বালা, কন্ড্যূয়ণেচ্ছা (চুলকানি) কমাতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, এটি সূর্যের ক্ষতিকারক আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক কে রক্ষা করে, ফলে ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।

প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ সহ বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ভেষজবীদগণ মধুমেহ বা ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণে সিংহদন্তীর ব্যবহারের কথা বলে গিয়েছেন। ২০১৬ সালের ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় (https://doi.org/10.1900/RDS.2016.13.113) উঠে এসেছে, ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড়ের নির্যাসে ইন্যুলিন নামক এক ধরণের ডায়েটরি ফাইবার বর্তমান যা পাচনক্রিয়ায় কিছু প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রক্তে শর্করা যোগ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলশ্রুতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অন্যদিকে এর মধ্যে থাকা একটি অভূতপূর্ব জৈব যৌগ (বিজ্ঞানীরা এর গঠন সম্বন্ধে এখনও নিশ্চিত নন) অগ্ন্যাশয়ের কোষ গুলিকে বেশী মাত্রায় ইন্স্যুলিন ক্ষরণে সাহায্য করে, ফলে বাইরে থেকে ইন্স্যুলিন নেওয়ার পরিমাণ কমে।

ড্যান্ডেলিয়ানের যকৃতের অসুখে উপকারীতার কথা বার বার উঠে এসেছে প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও ইউনানী শাস্ত্রে। যদিও এতদিন একটি গবেষণায় (https://doi.org/10.3390/molecules22091409) সামান্য কিছু প্রমাণ পেলেও কার্য্য কারণের যথার্থ প্রয়োগ ও প্রমাণের অভাবে এই দাবীর সারবত্তা বিচার করা সম্ভব হয় নি। তবে ২০১০ সালে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় (https://doi.org/10.1016/j.jep.2010.05.046) বেশ কয়েকটি আশ্চর্য্য বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায়, ড্যান্ডেলিয়ান শিকড়ের নির্যাস ইঁদুরের যকৃতের ফাইব্রোসিস (যা পরবর্তীতে ক্যান্সারের মত কঠীন অসুখের রূপ নেয়) অসম্ভব দ্রূততায় কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। ক্ষতিকর কোষগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে যকৃতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটিকে ধীরে ধীরে নিরাময় হতে সাহায্য করছে। এই নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে।

আমাদের দেহের নিয়ম অনুসারে একটি কোষ বেশ কিছুদিনের পুরোনো হয়ে যাওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে, তার জায়গা নেয় নতুন একটি কোষ, এই ঘটনাকে কোষের প্রোগ্রামড ডেথ বা অ্যাপোপটোসিস বলে। কিন্তু ক্যান্সার কারক কোষ বা টিউমারের ক্ষেত্রে এই নিয়মানুযায়ী মৃত্যু ঘটেনা। সেটি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে এবং একটি বিশেষ পদার্থের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশের কোষগুলির মধ্যেও এইরকম প্রবণতা ছড়িয়ে দেয়। ২০১২ সালের কানাডার উইন্ডসর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় (https://doi.org/10.1097/MPA.0b013e31824b22a2) দেখা গেছে ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড়ের নির্যাস অগ্ন্যাশয় ও প্রস্টেটের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে টিউমার কোষটিকে অ্যাপোপটোসিস বা প্রোগ্রামড ডেথে বাধ্য করে। অন্য আরেকটি গবেষণায় (https://doi.org/10.18632/oncotarget.11485) এটাও দেখা গেছে যে ড্যান্ডেলিয়ানের অনুরূপ কিছু প্রজাতির এই রকম শিকড়ের নির্যাস কিছু বিশেষ লিউকোমিয়া ও মেলানোমার ক্ষতিকারক কোষ গুলির অ্যাপোপটোসিস ঘটাতে সক্ষম। তবে এই যুক্তিগুলির সপক্ষে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে।

তবে এই সঙ্গে এটাও বলে রাখা দরকার বিভিন্ন গবেষণায় (https://doi.org/10.3205/000203) এটা দেখা গেছে যে বিভিন্ন বাজার চলতি ওষুধের সঙ্গে ড্যান্ডেলিয়ানের কিছু প্রতিক্রিয়া বা ইন্ট্যার‍্যাকশন আছে। তাই কোন ওষুধ ব্যবহার করার সময় ড্যান্ডেলিয়ান ব্যবহার করতে হলে এ বিষয়ে বিশেষ ভাবে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। এছাড়াও ড্যান্ডেলিয়ানে থাকা একটি পদার্থ, ফাইটো ইস্ট্রোজেন, শরীরে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বৃদ্ধি করে, তাই এটি মহিলাদের (বিশেষত যাদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম রয়েছে) অনিয়মিত ঋতুতে বিশেষ উপকারী হলেও এটির গর্ভপাত করার ও পুরুষদের উর্বরতা হ্রাসের ক্ষমতা রয়েছে। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ড্যান্ডেলিয়ানে অ্যালার্জী ও তার প্রভাবে ত্বকে নানা উপসর্গ ও হজমের সমস্যা দেখা গেছে (https://doi.org/10.1016/j.jep.2015.03.067)।

যুক্তরাষ্ট্রে ঔষধের দোকানে ড্যান্ডেলিয়ান ক্যাপসুল হিসাবেও বিক্রয় হয়, এবং এটি একটি রেজিস্টার্ড ড্রাগ।

তাই আশা করি বুঝতেই পারছেন, বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশে ড্যান্ডেলিয়ানের সমগুণযুক্ত একটি উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া (যেটি আবার বিনা যত্নেই যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে) কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আসা যাক আমাদের মূল আলোচ্য উদ্ভিদ মূলা-পাতার কথায়। মূলা-পাতা একটি সঙ্কাস বা চলতি কথায় থিসল গোত্রের উদ্ভিদ। এর অন্য কয়েকটি প্রজাতি যেমন – Sonchus oleraceus , Sonchus arvensis ইত্যাদি বিশ্বের বহু দেশে স্যালাড হিসাবে খাওয়া হয়। এদের পাতার স্বাদও ড্যান্ডেলিয়ানের মতই তীক্ত। এছাড়া প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এদের ড্যান্ডেলিয়ানের মতই অনিয়মিত ঋতু নিরাময়ে, মধুমেহ নিয়ন্ত্রণে ও হজম সংক্রান্ত সমস্যা দূরিকরণে সদর্থক ভূমিকা আছে বলে জানা যায়।

মূলা-পাতা (Sonchus wightianus) সংক্রান্ত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে প্রত্যক্ষ কোন নথি আমি পাইনি, এর একটি কারণ হতে পারে এর সঠিক নামটি না জানা, তবু স্থানভেদে প্রচলিত এর ভেষজ ব্যবহারগুলি জানার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিশেষতঃ নেপালে এই উদ্ভিদের পাতার বহুল ব্যবহার হয় জ্বর নিরাময়ে। এছাড়াও প্রদাহ এবং সোয়েলিং বা ফুলে যাওয়া কমাতে, কর্ণপ্রদাহে এর পাতার ব্যবহার হয়। শিকড় মূলতঃ হজমের সমস্যায়, পেটে ব্যাথায়, জন্ডিস, হাঁপানি, হুপিং কফ ও ব্রঙ্কাইটিসে ব্যবহার হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এটি বৃক্কের পাথর ও জন্ডিস নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

এবার দেখা যাক, গবেষণায় উপরিউক্ত দাবি গুলির কোন প্রমাণ মেলে কিনা। মূলা-পাতা অর্থাৎ Sonchus wightianus এ সঙ্কাস গোত্রিয় অন্যান্য উদ্ভিদগুলি যেমন Sonchus oleraceus , Sonchus arvensis ইত্যাদির থেকে অনেক বেশী পরিমাণে ট্যার‍্যাক্সাস্টেরল ও ইনোসিটল (taraxasterol and inositol) থাকে। যা ড্যান্ডেলিয়ানেও একই রকম ভাবে বর্তমান। ইনোসিটল বিভিন্ন জটিল রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বলে বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলত্ব, মধুমেহ , সর্বোপরি মেটাবলিক সিন্ড্রোমে, সেইসঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমে। এছাড়াও বৈজ্ঞানিকরা এটির বিভিন্ন মানসিক রোগ, যেমন প্যানিক অ্যাটাক, ডিপ্রেশন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও কার্যকর হওয়ার সম্ভবনা আছে বলে মনে করেন। তবে এর সপক্ষে কোন জোরালো যুক্তি বা প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে ট্যার‍্যাক্সাস্টেরল অ্যাপোপটোসিস এর মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও এটি জীবাণুনাশক, প্রদাহনাশক, মধুমেহের ক্ষেত্রেও কার্যকারী। এমনকি এটির বেশ কিছু সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসাবেও কিছু ভূমিকা থাকতে পারে বলে বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন। এই দুটি যৌগই কিডনির পাথরের ক্যালসিয়ামের অংশটি ক্ষয় করতে সক্ষম।

বর্তমান একটি গবেষণায় (https://ijpsr.com/bft-article/human-ache-selective-inhibition-of-phytochemicals-of-sonchus-wightianus-of-nepal-origin-an-in-silico-approach/?view=fulltext) দেখা গেছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ক্রমবর্ধমান ও ভয়ংকর রোগ অ্যালঝাইমার্সের ক্ষেত্রে প্রচলিত ঔষধ acetylcholinesterase (AChE) inhibitors এর বর্তমান বাজার চলতি ধরণ গুলির থেকে বেশী শক্তিশালী AChE মূলা-পাতায় পাওয়া সম্ভব।

সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় (https://pdfs.semanticscholar.org/01c1/a8657ac3748e09cfba6026ac7bed89e119bd.pdf?_ga=2.132921870.1659048542.1613220090-719495840.1613220090) দেখা গেছে মূলা-পাতায় সহ  বিভিন্ন এমন জৈব যৌগ উপস্থিত, যা পারকিনসন্স, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি সহ বিভিন্ন অসুখে কার্যকর হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

একটি যৌথ গবেষণায় (https://li01.tci-thaijo.org/index.php/cast/article/download/135392/101175/ এবং https://www.researchgate.net/profile/Reshmi_Chatterjee4/publication/331161985_Establishment_of_Quality_Parameters_for_Leaf_Stem_and_Root_of_Sonchus_wightianus_DC_through_Pharmacognostical_Standardization/links/5c6996b9a6fdcc404eb72fe4/Establishment-of-Quality-Parameters-for-Leaf-Stem-and-Root-of-Sonchus-wightianus-DC-through-Pharmacognostical-Standardization.pdf?origin=publication_detail) মূলা-পাতার হজম সংক্রান্ত সমস্যা ও ডায়েরিয়া নিরাময়ের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কথা প্রমাণিত হয়েছে। সেই সঙ্গে এই গবেষণায় এটিও দেখা গেছে যে এই উদ্ভিদটি বিষাক্ত নয়।

অতয়েব বলাই বাহুল্য যে ভারতীয় উপমহাদেশে ড্যান্ডেলিয়ান বা সিংহদন্তী সহজলভ্য না হলেও মূলা-পাতা যথেষ্ট সহজলভ্য এবং ভবিষ্যতে এটির থেকে নানা অসাধারণ কিন্তু সুলভ ঔষধ বানানো হয়ত সম্ভব, সেজন্য প্রয়োজন নবীন গবেষকদের এগিয়ে আসা ও এ সম্বন্ধে গবেষণা প্রয়োজন।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ – এই প্রবন্ধটি গবেষণাধর্মী, বন্য ভেষজ কোন অভিজ্ঞ আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ নিরুপণ ব্যতীত ভক্ষণ বা ব্যবহার করা উচিত নয়।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

নুনশাক, এক অবহেলিত বন্ধু

আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে এমন অনেক লতা-গুল্ম যাদের আমরা আগাছা বলে অবজ্ঞাই করে এসেছি চিরকাল, কিন্তু তাদের অদ্ভুত ভেষজ গুণের অজানা কাহিনী রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। সেরকমই কিছু অচেনা বন্ধুদের তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করব এই দুর্বল কলমসহায়ে। আজ প্রথম কিস্তিতে থাকুক, আমাদের বাড়ির আশেপাশের অযাচিত ভাবেই জন্মানো, অনাদরে বেড়ে ওঠা এই প্রতিবেশী।

এটি সংস্কৃতে লোণিকা নামে পরিচিত। বাংলায় কেউ বলে নুন শাক, কেউ বলে নুনে শাক, আবার কেউ বলে নুনিয়া বা নুন্তা শাক, ওড়িয়ায় বলে পুরনিশাক, হিন্দিতে খুরসা বা কুলফা । বিজ্ঞান সম্মত ল্যাটিন নাম – Portulaca oleracea ।

এটি আমার মতে একটি মিরাক্যাল গাছ। সব দিক থেকে প্রকৃতি ও মানুষের উপকারী একটি গুল্ম। এটি প্রবল খরাতেও নিজের বিপাকীয় ধরণ পরিবর্তন করে টিকে থাকতে পারে। মাটির আদ্রতা ধরে রেখে অন্যান্য গাছকে বাঁচতে সাহায্য করে। হয়ত এত গুণের জন্যই সেই কোন প্রাচীন কাল থেকে মানুষ এটিকে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে নানা সভ্যতায়। তারা যে শুধু এটিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত তাই নয়, অনেক সংস্কৃতিতে মনে করা হত, এই গাছ অপদেবতা ও বিপদকে দূরে রাখে।

এবার আসি এর ভেষজ ও খাদ্যগুণের কথায়, প্রথমেই বলি খাদ্যগুণ। নুনে শাক এর পাতা, ফুল, কান্ড পুরোটাই কাঁচা বা রান্না করে দুভাবেই খাওয়া যায়। গ্রীস, ফ্রেঞ্চ ও বেশ কিছু ইউরোপিয় সংস্কৃতিতে এটিকে স্যালাড হিসাবে টমেটো ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার চল ছিল। স্পেনে স্যুপ, স্ট্যু ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হত এটি আর মেক্সিকোতে তো এই শাক দিয়ে একদম মৌলিক একটা চিকেনের পদই জনপ্রিয় ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এর ছোট্ট ছোট্ট পোস্তদানার মত বীজগুলি সংগ্রহ করে বেঁটে বড়া বানানো হত। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এটিকে ভাজা, সিদ্ধ বা পালংশাকের মত করে রান্না করে খাওয়ার চল আছে।

নুনে শাকের টক – নোনতা স্বাদটি আসে মূলতঃ এর মধ্যে থাকা দুটি অ্যাসিডের কারণে, অক্সালিক অ্যাসিড ও ম্যালিক অ্যাসিড। এই ম্যালিক অ্যাসিড আমাদের অতি পরিচিত ফল আপেলেও থাকে। নুনে শাকে ভোরের দিকে ম্যালিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশী থাকে। তাই ঐ সময়ে এই শাক তুললে তা বেশী ম্যালিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ হয়।

১০০ গ্রাম পরিমাণ এই শাক ২০ ক্যালরি শক্তি দিতে পারে মানবদেহে। প্রায় ২ গ্রাম মত প্রোটিন ও খুবই সামান্য ফ্যাট থাকে। এছাড়াও এর থেকে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, পটাশিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মৌলগুলিও যথেষ্ট মাত্রায় পাওয়া যায়। এছাড়াও এর থেকে আমাদের অপরিহার্য্য ভিটামিনগুলির (Vitamin A, B1, B2, B3, B6, B9, C, E etc.)  প্রাত্যহিক চাহিদার ২০ শতাংশেরও অধিক পাওয়া যায়।

 

এবার আসি ভেষজগুণে —

১) গনোরিয়ায় – এই বিরক্তিকর যৌনরোগটিতে একটি ভয়ঙ্কর উপসর্গ হল প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া এবং অতিরিক্ত পিপাসা। এক্ষেত্রে ১০ গ্রাম নুনেশাক ৪ কাপ জল দিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে ২ কাপ করতে হবে, এর পর ওটাকে ছেঁকে ঠান্ডা করে সকালে বিকেলে এক কাপ করে খেতে হবে প্রতিদিন। এটি ডায়াবেটিসের কিছু ক্ষেত্রেও সমান ধরনের উপসর্গের উপশম করতে সক্ষম।

২) বাচ্চাদের কাশি হলে – নুনশাকের রস একটু গরম করে ঠান্ডা হলে ১৫ ফোঁটা সেই রসে ৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সিরাপ তৈরি করা যায়। এটি দিনে ৩-৪ বার করে খাওয়ালে সাধারণ কাশি হলে ২-১ দিনের মধ্যে কাশি ভাল হয়ে যাবে। এছাড়াও শিশুদের অম্বল, আমাশয়েও এই সিরাপ সকালে ও সন্ধ্যায় ২-৪ ফোঁটা খাওয়ালে উপকার হয়।

৩) তোতলামিতে – দন্ত্য বর্ণ,  ওষ্ঠ বর্ণ বাদ দিয়ে বিশেষ কোন বর্গের অন্তর্গত বর্ণ গুলি (যেমন মূর্ধা বর্ণ) উচ্চারণে সমস্যা থাকলে নুনে শাকের রস দুচামচ পরিমাণ অন্ততঃ ১৫ মিনিট মুখে নিয়ে বসে থাকলে অনেকটা উপকার হয়।

৪) চোখ ওঠা বা চোখ লাল হওয়ায় – নুনেশাকের রস ছেঁকে যে স্বচ্ছ রস পাওয়া যায় তাকে সামান্য গরম করে ঠান্ডা করে একফোঁটা করে ২ – ৩ দিন দিলে উপশম হয়।

৫) চুলকানি ও বিষাক্ত কীট দংশনে – সাধারণ চুলকানিতে এবং বোলতা মৌমাছি পিঁপড়ে ইত্যাদি কামড়ালে, শুঁয়ো লাগলে কিম্বা বিছুটি আলকুশি ইত্যাদি লেগে চুলকালে নুনেশাক বেঁটে অল্প গরম করে প্রলেপ দিলে কার্যকরী হয়। তবে ভীমরুল বা কাঁকড়াবিছের বেলায় কিন্তু এটি নিষ্ক্রিয়।

৬) অর্শ্ব, বদহজম, কোলাইটিস ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রে নুনেশাক খাদ্য হিসাবে উত্তম যা এই রোগগুলির নিরাময় করে।

৭) নুনেশাকের বীজ জল দিয়ে খেলে তা ক্রীমি নাশ করে।

এছাড়াও এটি শরীরের বলকারক, তৃষ্ণা নিবারক, চোট আঘাত জনিত ফুলে যাওয়া বা সোয়েলিং কমাতে অত্যন্ত্য কার্য্যকারী।

পরিশেষে বলি, এমন যে গুণসম্পন্ন উদ্ভিত তাকে আমরা না চিনে প্রায়শঃই উপড়ে ফেলি নিতান্তি আগাছা ভেবে, তাই ভয় হয় অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এই বন্ধু হয়ত মানুষের সান্নিধ্য হারিয়ে আবার অরণ্যভূমীর গোপনিয়তাতেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

Wicca একটি অপভ্রংশের কাহিনী

উইচক্র্যাফট এখন উঠতি টিনেজ কলেজ বা একটু ইংলিশ ঘেঁষা স্কুলের বড় ক্লাসের ছেলে মেয়ে প্রধানতঃ মেয়েদের একটা বড় আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে । তারা সর্টকাটে কাজ হাসিল করা, মানে কোনো পছন্দের মানুষকে আকৃষ্ট করা, কেউ “বাওয়াল” করলে শক্তিতে তার সঙ্গে না পেরে উঠে অন্য উপায়ে তাকে জব্দ করা ইত্যাদির অলীক আশায় গুগল মামার সাজেস্টেড সার্চে বিভিন্ন “চ্যান্টিং”, “সার্কেল”, লাল নীল মোমবাতি নিয়ে গভীর মনযোগ দিয়ে বিভিন্ন ক্রিয়া কর্মের অভ্যাস করে যাচ্ছে । অনেকে আবার স্রেফ বন্ধুদের চোখে নিজেকে একটু অন্য রকম, একটু “হটকে” প্রমাণ করার জন্য উইচক্র্যাফটের চর্চা করছে । অদ্ভুত ব্যাপার হল যে এই বাচ্চাগুলি কিন্তু ভারতীয় তন্ত্র বা মোহিনী বা ডাকিনী বিদ্যা সম্বন্ধে তেমন ওয়াকিবহাল নয় । স্বাভাবিক ব্যাপার, কারণ এগুলির ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্যের যোগান গুগলে নেই । তাই এই উঠতি টিনেজ উইচরা তন্ত্রের ব্যাপারে প্রায় জ্ঞানহীন শুধু তাই নয়, তন্ত্রের চর্চা যারা করে তাদের এরা বেশ কিছুটা অবজ্ঞার চোখেই দেখে ।

দেখুন মশাই, আমি কিন্তু এখানে “সবই ব্যাদে আছে” অ্যাজেন্ডার প্রচার করতে আসিনি, নেহাত রাখাল আর রাজকণ্যার গল্প বুনতে বুনতে কলমটা হাঁপিয়ে গেছে তাই রাখাল একটু অন্য কিছুর খোঁজে। শুধু স্বার্থপর সুবিধাবাদী রাজকণ্যার কথা ভেবে জীবন কাটিয়ে দিলে কি চলবে ??? রাখালেরও তো একটা নিজস্ব পৃথিবী আছে, সেই পৃথিবীর কত অচেনা গলি, রাজপথে ঘোরা বাকি আছে, কত অ্যাডভেঞ্চার বাকী আছে হারানো দিনের গল্পের, ইতিহাসের খোঁজে । চলুন আজ রাখালের হাত ধরে সেরকমই একটা লতায় ঢেকে যাওয়া, ভুলে যাওয়া গলির সন্ধানে যাত্রা করা যাক ।

ভারতীয় প্রকৃতি উপাসনা যা মূলতঃ আফ্রিকা থেকে লক্ষ বছর আগে ভারতের দক্ষিণ উপকূলে আসা মানুষদের সঙ্গে ভারতের তন্ত্রীতে সঞ্চারিত হয়েছিল তাই তামসিক সাধনা রূপে পরে পরবর্তী উন্নততর স্বাত্বিক বা একেশ্বরবাদী ব্রহ্ম উপাসক আর্যদের দ্বারা লীপিবদ্ধ হয় । পরে আর্য উপাসনার মূল স্রোতের সঙ্গে এর মিশ্রণে একটি স্বতন্ত্র ধারা তন্ত্র নামে আত্মপ্রকাশ করে । এই তন্ত্র ছিল মূলত বস্তুতান্ত্রিক ও বামধর্মী । তন্ত্রের বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো কিছুর সংযম বা সাধন তখনই সম্ভব যখন বস্তুটিকে সম্পূর্ণ রূপে জানা যাবে । বৈদিক একেশ্বরবাদের মত এটি শুধু সবই এক এই বিশ্বাস নির্ভর উপলব্ধীতে সীমাবদ্ধ ছিল না । বরং তন্ত্র ব্যবহারিক পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়ম গুলি উপলব্ধী করতে ও তাদের কে আয়ত্ত করে নিজ কাজে ব্যবহার করতে উৎসাহ দিত । যে কারণে প্রাচীন তান্ত্রিক দের কিমীয়া বিদ্যা বা অ্যালকেমী জানা আবশ্যিক ছিল । তন্ত্র বিশ্বাস করত একটি মানুষ যদি রসগোল্লার মিষ্টত্ব কখনও আস্বাদনই না করে, যদি কখনও সঙ্গমের সুখ অনুভবই না করে তবে সে তার অস্থায়ীত্ব ও অসারতা বুঝবেই বা কী করে আর স্বরূপ উপলব্ধী করার মাধ্যমে তাকে সংযমই বা করবে কী করে ।

তন্ত্রের কীমিয়া ও আয়ুর্বেদ অংশটি কোনো এক অজানা পথ ধরে একসময় ইউরোপে পৌঁছায় (সম্ভবতঃ ইজিপ্ট হয়ে) এবং বিভিন্ন রূপান্তর ও স্থানীয় প্রকৃতি উপাসনার অলৌকীকতা আরোপিত হয়ে উইক্কা নামে আত্মপ্রকাশ করে । মনযোগ দিয়ে দেখলে আজও তন্ত্রের নানা অবশেষ উইক্কার মধ্যে খুঁজে পাবেন । যদিও সেগুলি এতটাই পরিবর্তিত যে প্রায় চেনাই যায়না ।

উইক্কান সার্কেল বা গ্রীড আসলে স্থন্ডীল বা যন্ত্রমের পরিবর্তীত রূপ, এছাড়াও হেক্সিং – মারণ উচাটন, বশীকরণ, এরকম আরও অনেক কিছু খুঁজলেই পাওয়া যাবে যা আসলে তন্ত্রের ক্ষীণ স্মৃতিচিহ্ন । তবে তন্ত্রের সঙ্গে উইক্কার কিছু মূল ভাবগত পার্থক্য আছে । উইক্কা মূলত বিভিন্ন অলৌকিক প্রাকৃতিক শক্তির আয়ত্তকরণ ও নিজ প্রয়োজনে তাদের ব্যবহারের কথা বলে । কিন্তু তন্ত্র বলে উল্টো কথা । শক্তির প্রাপ্তীর মাধ্যমে ও তাকে স্বেচ্ছায় পরিহারের মাধ্যমে রিপু সংযম তথা আমিত্বের নাশ বা চরম সত্যের উপলব্ধির কথা বলে তন্ত্র । তন্ত্র পথের সাধনায় অলৌকিক শক্তি বা সিদ্ধাই অন্তরায় স্বরূপ । যদিও কিছু নীম্নস্তরের তান্ত্রিক মূলতঃ এই শক্তিগুলি পাবার জন্যই সাধনা করে থাকে । কিন্তু তাকে প্রকৃত সাধনা বলেনা এবং সেই ব্যক্তিকে গুণীন ওঝা বা ডাইন বলে চিহ্নিত করা হয়, যোগী বা সাধক নয় ।

আজ এখানেই কলম থামালাম, আপনাদের ভাল লাগলে পরে তন্ত্র ও উইক্কার বিভিন্ন বিভাগ গুলি নিয়ে আলোচনা করা যাবে ।

আন্তর্জালিক প্রতিবাদের রূপকার শহীদরা

ফেসবুক করা বন্ধ করে দিয়েছি, তবুও মাঝে মাঝে কিছু এমন ঘটনা ঘটে যাতে হয়ত হাজার বছরের ধ্যান ভেঙেও উঠে আসতে হয় । নইলে ভাবনার অন্তর্চিৎকারে দম বন্ধ হয়ে আসে ।

মাস কয়েক আগে মুক্তমনা ব্লগে বিদ্বেষমূলক একটি লেখার প্রতিবাদ করেছিলাম । এবং সেখানে মুক্তমনায় প্রকাশিত লেখার গুণমান নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলাম । সেই প্রসঙ্গেই আলাপ হয় অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে । সেদিন ছিল মিজানুর রহমানের মৃত্যু দিবস । আলাপ হয়েছিল তাঁর একটি লেখা পড়ে “শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব” বইটির ব্যাপারে  স্মৃতিচারণ । মুগ্ধ হয়েছিলাম । পরে মানুষটির সঙ্গে সরাসরি যখন আলাপ হয় তখন তাঁর ব্যক্তিত্বে আরও মুগ্ধ হই । বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছিল । আমার যাদুবিদ্যাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ভেলকি, বুজরুকির বিরুদ্ধে সরব হতে বলেছিলেন । এবিষয়ে লেখালেখি করতে বলেছিলেন । আমি বলেছিলাম “এখনই একটা লেখা দিচ্ছি, প্রকাশ করুন না” । কিন্তু উনি বলেছিলেন “নিয়মিত লেখ, সবার জন্য একই নিয়ম” ।

এই প্রকৃত মুক্তমনের মানুষটি আর নেই । তাঁকে কিছু বাংলাদেশী মৌলবাদী দুষ্কৃতী কুপিয়ে খুন করেছে । তাঁর যে মস্তিষ্ক ছিল অমূল্য উদ্ভাবনী লেখার আকর স্বরূপ । সেই মস্তিষ্ক ফাটিয়ে রাস্তায় ছড়িয়েছে । তাঁর স্ত্রীর আঙুল কেটে নিয়েছে, চোখ ফাটিয়ে দিয়েছে ।

এই মৌলবাদীদের উদ্দেশ্য ছিল মুক্ত মননের লেখাগুলি ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়া । মুক্তমনা ব্লগ আজ থেকে ইন্টারনেটে অনুপস্থিত ।

এই শুয়োরের বাচ্চাদের কি এভাবে জিততে দেওয়া যায় ???? আপনারাই বলুন ???

মুক্তমনা আজ পিতৃহীন । অস্তিত্ব লুপ্ত । কিন্তু এটা সাময়িক । এভাবে চুপ করানো যাবেনা মুক্তকন্ঠকে ।

যদি সত্যিই শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে থাকেন তাহলে গর্জে উঠুন । লেখায় ধিক্কারের ঝড় তুলুন আন্তর্জালিক মাধ্যমে । আর যদি কোনো জায়গায় কোনো মৌলবাদীর উস্কানিমূলক, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য দেখেন । প্রতিবাদ করুন । বুঝিয়ে দিন ঐ বেজন্মা দের আমরা ভয় করিনা ।

অভিজিৎ রায় অমর । ব্লগার রাজীব অমর । আন্তর্জালিক প্রতিবাদের রূপকার শহীদরা এভাবেই অমর থাকবেন । বিদ্রোহের ভাষা হয়ে ফুটে উঠবেন কোটি কোটি বিক্ষুব্ধ মানুষের ঠোঁটে ।

উইক্কান সংবাদ – ১

প্যাগান বা প্রকৃতিবাদী বা পরবর্তী কালে ডাইনতন্ত্রী (ইউক্কান) বলে পরিচিত মানুষদের চিরকাল স্থান হয়েছে জ্বলন্ত আগুণে বা সমাজের এক কোণে । কারণ তারা নাকি পৃথিবীর অমঙ্গল চায় । ধর্মের বিরোধি তারা । এই ধারণা কিছু অংশে এখনও বিদ্যমান । বহুকালের জমা অন্ধকার দূর করা আমার ক্ষুদ্র সাধ্যের অতীত । তাই ওসব কচকচানি তে না গিয়ে একটা লেখা লিখলাম । আসলে এটা একটা উইক্কান মন্ত্রর অনুবাদ । প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরের উপাসকরা (মূলতঃ ডাইনি রা) এটি প্রার্থনার কাজে ব্যবহার করত । এই মন্ত্র তাদের দিত অমিত শক্তি । মন্ত্রটির মূল ইজিপ্সিয়ান আবৃত্তিটি আমার কাছে আছে । দরকার পরলে বলবেন । পোস্ট করে দেব ।

————————————

আমিই সৃষ্টির আদি প্রেরণা , আমাতেই লয় ব্রহ্মান্ড
আমিই ত্রিলোকের পূজ্য, তবু আমিই বিশ্বের লজ্জা
আমিই পল্লীপ্রান্তের গণিকা, আমিই মোক্ষপথের সাধ্বী
আমিই অনূঢ়া কুমারী, এবং ভার্য্যা রূপে শয্যাসঙ্গিনী
আমি অবাধ্য দুহিতা এবং অনন্ত স্নেহশীলা জননী
আমার মতার বাহু দুটি আমারই প্রচ্ছন্ন প্রকাশ
আমিই বন্ধ্যা আর বহু সন্তানের জন্ম দায়িনী
আমি পরিণিতা এবং দায়গ্রস্ত পিতার বয়স্থা চিরকুমারী
আমি যন্ত্রণাক্ত জন্মদাত্রী তবু আমি অনাদি, অজাত
আমি অসহ্য প্রসব বেদনার সান্তনা, আমি পতি ও পত্নী
আমার সৃষ্টি আমার প্রেমিকের দেহ, আমার পিতার জন্ম আমারই জঠরে
আমিই আমার স্বামীর সহোদরা, আমার সঙ্গী আমারই পরিত্যক্ত পুত্র
আমার চিন্তাই তোমার স্থিতি ও জগত
আমার জঠরই তোমার সৃষ্টি ও অন্তিম গন্তব্য
আমি দেবী, তোমার সম্মুখে ও পার্শ্বে আমার অলক্ষ্যিত প্রকাশ

আশা

আজকের দিন টা শুরু ই হল একটা ব্যক্তিগত গোমড়া মেজাজ নিয়ে, কলেজের ইম্পর্টান্ট সেমিনার ছিল, তাড়াহুড়ো করে সব সেরে, ছাতা নিয়ে গিয়ে রিক্সায় উঠলাম, মিনিট কয়েকের মধ্যেই শুরু হল যে বৃষ্টি তা যদি এখন অব্দি চলত তাহলে মনে হয় নোয়ার মহাপ্লাবনকেও ছাড়িয়ে যেত । যাই হোক সেই বৃষ্টির ভয়ানক আগ্রাসী আদ্রতায় আমার জামা-প্যান্ট ভিজে ন্যাতা হয়ে তো গেলই এক্সট্রা হিসাবে আমার প্লাস্টিকে মোড়া মোবাইলটা কে ও ভিজিয়ে দিল ।

গরীব মানুষ, তায় কিপ্টে বলে বাজারে আমার বেদম বদনাম আছে, অতি কষ্টে মাস খানেক আগে নোকিয়ার এই ৫০১ আশার ছলনে ভুলি কিনেছিলাম পুরো সা—ড়ে—- চা ——র হাজার কড়কড়ে টাকা দিয়ে, আমাকে গোটা বেচে দিলেও বোধ হয় অত টাকা পাওয়া যাবেনা । সেই সাধের মোবাইলটি গেল মিইয়ে ।

কলেজে পৌঁছে পকেট থেকে বার করে দেখি, বাবুর এল সি ডি, হিস্টিরিয়া রুগির মত কম্পমান, দেখে তো আমার ব্রেণও পুরো জেনারেল থেকে ভাইব্রেশণ মোডে। সঙ্গে সঙ্গে অফ করলাম, ব্যাককভার খুলে ফেলতেই দেখলাম ঝরণার মত জল বেরিয়ে এল ভিতর থেকে । যাই হোক, ভাল করে ঝেড়ে মুছে, খানিক্ষণ শুকোতে দিলাম, বেশকিছুক্ষণ পর সেটাকে ব্যাটারি লাগিয়ে অন করতেই বাবু একবার ব্লিঙ্ক করে চিরনিদ্রার আভাস দিয়ে নিদ্রিত হয়ে পড়লেন, শত চেষ্টা করেও তাকে আর জাগানো গেল না ।

কি জানি কেন আমার মনে হচ্ছিল যে ভিতরে হয়ত আরও জল জমে আছে বলেই বোর্ড শর্ট হয়ে গিয়ে মোবাইল টা অন হচ্ছেনা । বাড়ি এসে মোবাইল টা খুললাম, নোকিয়ার এই মডেলে কোনো ওয়ারেন্টি ব্রেক স্টিকার থাকেনা কোনো স্ক্রুর মাথায়, আমার কম্পিউটার রিপেয়ারিং এর স্ক্রুড্রাইভারের সেট টা বের করলাম, গুগুলে খুঁজে পেয়ে গেলাম এটা —- https://www.youtube.com/watch?v=g24s3wvCnSA । ব্যাস, শুরু হয়ে গেল আমার হাতের কাজ।

1610752_10202392529803718_470761194961084494_n

পুরো বোর্ডটা খুলে ফেললাম, যা অনুমান করা গেছিল, ভিতরে আরও প্রচুর জল জমে ছিল, প্রথমে কাপড় দিয়ে মুছলাম, তার পর সন্তুষ্ট না পেরে নিয়ে এলাম ভ্যাকিউম ক্লীনারটা । এটা অনেক দাম দিয়ে কেনা হয়েছিল ঘরবাড়ি পরিস্কার করার জন্য, কিন্তু মা ও কাজের মাসির খাঁটি স্বদেশী ঝ্যাঁটার ওপর অগাধ বিশ্বাস থাকায় ওটা পড়ে থেকে থেকে শেষে আমার নানা গবেষণামূলক কাজের অপরিহার্য্য অঙ্গ হয়ে ওঠে, ওটা এক্ষেত্রে ব্যবহার হল হট এয়ার ব্লোয়ার হিসাবে, ওটার গরম হাওয়া দিয়ে পুরো বোর্ড টা শুকনো করলাম আমি । তার পর খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে আশাকে জাগানোর চেষ্টা করলাম ।

জাগল না সে ।

এই সময় কম্পিউটারের মিডিয়া প্লেয়ারে সুমনের “হাল ছেড়োনা বন্ধু …” বাজিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেলুম । এবার মনে হল যে জল তো শুকিয়েছে, কিন্তু নিশ্চয়ই বাষ্প হওয়ার আগে আমাকে বাষ্পাকুল করার জন্য দ্রবীভূত বিভিন্ন লবণের দানা গুলো রেখে গেছে । সেগুলো কেলাসরূপে কন্ডাকটারের আভ্যন্তরীন রোধ বাড়িয়ে দেওয়াতেই মোবাইলটা সচল হচ্ছে না ।

কিন্তু কোথায় ঘটেছে সেটা বুঝব কী করে ? পি.সি.বি. তে সদ্য পড়া অক্সাইড বা সালফেট দেখতে কেমন হয় সেটা দেখিনি তো এর আগে ! আর মাইক্রোস্কোপিক অ্যানালিসিস করার যন্ত্র ও তো নেই আমার কাছে , কী করি ??? !!!

ফোন টা ওয়ারেন্টি তে ছিল, কিন্তু সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলেই যদি ধরে ফেলে লিকুইড ড্যামেজ !!! তাহলেই তো ওয়ারেন্টির কেল্লাম ফতেম !!!

তারপর ভাবলুম, আচ্ছা লিকুইড ড্যামেজ বলে ওয়ারেন্টি ক্যান্সেল করতে হলে তো আগে ধরতে হবে ড্যামেজটা কোথায় … আর সেটা ধরলেও আমার অল্প হলেও লাভ আছে ।

চলে গেলুম ব্যারাকপুরের নোকিয়া কেয়ারে । কাউন্টারে বসা সুন্দরীর কিউট হাসি দেখে ফোন খারাপ তো দূরের কথা, আমার যে একটা ফোন আছে, সেটাই ভুলে গেলাম (এটাও নোকিয়ার বিজনেস স্ট্রাটেজী নাকি !!!) … তার পর ফোনে কী সমস্যা সেটা দেখার অছিলায় সুন্দরী যখন হাতে হাত রাখল তখন তো নোকিয়ার সোকেশে সাজানো রঙ্গিন ব্যাক কভার গুলোকে একেকটা রঙ্গীন উড়ন্ত প্রজাপতি বলে বোধ হতে লাগল । ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া ( হৃদয় দেওয়া নেওয়ার আধুনিক ফার্স্ট স্টেপ ) ও হয়ত হয়ে যেত কিন্তু ওই যে একটা বিখ্যাত কথা আছে না কার যেন, “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

যাই হোক, ফোনকে পাঠিয়ে দেওয়া হল স্পেশালিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে, রোগনির্ণয়ের জন্য । কিছুক্ষণ পর সুন্দরী তার সেটিং করে সাদা করা দাঁত কান অব্দি চওড়া করে বের করে আমাকে ডেকে বলল যে সে নাকি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছে যে আমার ফোনটিতে লিকুইড ড্যামেজ পাওয়া গেছে এবং সেটা নাকি এ——-ত গ—-ভী——র যে ওয়ারেন্টি তো ক্যান্সেল হবেই উপরন্তু আমি যদি টাকা দিয়ে অদের সারাতে বলি তাহলে ও নাকি ওদের ইঞ্জিনিয়ার রা রিস্ক নিয়ে কাজ করবে এবং আদৌ ঠিক করা যাবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই । আমি খুব শান্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম যে কত খরচা পড়তে পারে, সে বলল সেটা নাকি বলা যাচ্ছেনা । কারণ গ—ভী—র ড্যামেজ তো !!!

আমি এবার একটু সোজা হয়ে বসে অপেক্ষাকৃত কড়া গলায় বললাম, যে আমি কীকরে বুঝব যে আপনারা সত্যি বলছেন ? সত্যি ই লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে ? সে স্মার্ট হওয়ার উৎসাহে সঙ্গে সঙ্গে আমার ফোনের কোথায় কোথায় লিকুইড ড্যামেজ হয়েছে সেই ছবি জুম করে করে কম্পিউটারে আমাকে দেখিয়ে দিল, আমিও বিমর্ষ মুখ নিয়ে সেগুলো দেখলাম । মেয়েটি সোৎসাহে আমাকে বুঝিয়ে চলল যে ড্যামেজের গভীরতা কতটা । ছবির সবুজ সবুজ অংশ গুলো নাকি লিকুইড ( বটে !!! … আমি তো জানতাম ওটাকে পি.সি.বি. বলে ) । তার বোঝানোর মাজে তাকে থামিয়ে দিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোনটা ফেরত চাইলাম । এবার বিমর্ষ হওয়ার পালা তার । ওই যে বলে — “তুমি গারদের কোন পাশে আছ …”

বাড়ি এসে ফোন টা খুলে ছবি তে দেখে নেওয়া জায়গা গুলো তে ম্যাগনিফাইন্ড গ্লাস, এল ই ডী টর্চ আর একটা শক্ত ব্রাশ (রঙ করার) নিয়ে আলতো আলতো করে ঘসে সাদা সাদা কেলাসিত লবণ গুলোকে উঠিয়ে ফেললাম । গুঁড়ো গুলোকে আবার ক্লীনারের সাহায্যে পরিস্কার করলাম । সমস্ত পরিস্কারের পর স্ক্রু এঁটে, ব্যাটারী লাগিয়ে, আশার বোতামে চাপ ।

তার পর ?

ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাস ঠিকঠাক থাকলে আশা কি না জেগে পারে ?