ফেব্রুয়ারী

 
“প্যায়ার মহব্বত …” সেলুনে চুল কাটতে কাটতে মাথা নাড়াতে ইচ্ছে করলেও পারছিলাম না ক্ষুর ও কাঁচির যুগপৎ প্রহরায় ।
 
যাইহোক গোটা গায়ে সহসাদ্ভুত সজারু ফিলিং নিয়ে বেরিয়ে দেখি “প্রেম বোলে” সিনেমার পোস্টারে ছয়লাপ চারিদিকের দেওয়াল । সিনেমাটা দেখতে যাব কিনা ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে গেল যে সুনন্দ দা একবার যেতে বলেছিল ওর বাড়ি কি যেন দরকার আছে বলে ।
 
অফিসের পথে যেতে মৌ এর সাথে দেখা অনেকদিন পর ভোরের বাসে । ফর্মাল কেমন আছিস, কি করছিসের পরেই সেই চিরকালীন প্রশ্ন যা যে কোনো সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবী অনেকদিন পর দেখা হলে পরস্পরকে করে থাকে – “কেমন চলছে তোর ?” । কোন প্রসঙ্গে বুঝতে না পারার ভনিতা সেরে চিরকালীন খোলসা করা উত্তর “মানে বলছি প্রেম ট্রেম করছিস ?”
 
মৌ এর সাবলিল ঝটিতি জবাবে জানলাম, হ্যাঁ সে প্রেম করছে । তার পর জিজ্ঞেস না করতেই বলে চলল বার বার বলে অভ্যস্ত স্ক্রিপ্টে, তার বসের সঙ্গে তার প্রেমের কথা আর একই সঙ্গে হয়তবা নিজের অজান্তেই বিবরণ দিয়ে যেতে থাকল তার বসের গাড়ির সংখ্যার, হাবিবে কাটা ফ্যাশন্ড চুলের স্টাইলের, মহার্ঘ্য ফ্ল্যাট আর তার বিছানার ইমপোর্টেড গালিচার কোমলতার ।
 
শুনতে শুনতে কখন যে শুধু দেহটা পড়েছিল জানালার দিকে তাকিয়ে আর মৌ নেমে গেছে করুণাময়ীতে ঝটিতি বাই বলে খেয়াল হয়নি । মনে পড়ে যাচ্ছিল সমর্পিতার কথা । সুনন্দদার প্রেমিকা সমর্পিতা । অবশ্য এখন আর প্রেমিকা নয়, বউ । বছর দুয়েক আগেই আইটি জায়েন্ট ইনফোসিসের উচ্চপদাসীন সুনন্দদাকে বিয়ে করেছে সমর্পিতা । আমি কোন দিনই কিছু বলিনি, সুনন্দদা বা অন্য কেউই আমার মনের অচেনা দিকটার খেয়াল বেখেয়ালের খবর রাখেনা । না রাখাটাই স্বাভাবিক ।
 
তবু মেয়েরা বোধ হয় মন পড়তে পারে তাই একদিন কোচিং সেরে একসঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে আমায় বলেছিল, “জানিস এবারে আমার জন্মদিনে সুনন্দ কি গিফট করেছে আমায় ? একটা অওসাম ডায়মন্ড পেন্ডেন্ট । তোকে দেখাব । বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি আনব একদিন । আর আমাকে হায়াতে ট্রীট দিয়েছিল জানিস ? আলিয়া, মীনতিরা সবাই গেছিল । তোকে তো বলতেই ভুলে গেছি , ইস দারুন একটা ট্রীট মিস করলি । যাইহোক বল এবার আমাদের চেয়ে বেশী লাভিং আর একটাও কাপল দেখেছিস কিনা !”
 
অফিসের পরিবেশটা এমনই সেখানে ঢুকলে কিছুক্ষণের জন্য অতিপ্রাচীন কিছু আদীম জীবে রূপান্তরিত হয়ে যেতে হয় বাই ডিফল্ট । ওখানে গলানো জিঙ্কের বাষ্প মেশানো বাতাসে নেশার গন্ধ ভাসে । আধো অন্ধকারে জ্বলে থাকে কামনা লাল সোডিয়াম ল্যাম্প । পদে পদে গনগনে তেতে থাকা গলিত লোহার ও মুভিং হয়েস্ট ক্রেণের সম্মিলনে সেখানে মৃত্যুরূপার মোহময়ী হাতছানি । তাই ফ্যাক্টরিতে ঢোকার পর বাধ্য হয়েই একরকম দেহবোধে ডুবে থাকে লোকজন পাশের বাড়ির বৌদি কিম্বা পানুর নায়িকার পাছার, যোনির গঠনের আলোচনায় । উপায় নেই যে, এখানে একবার যদি মন অন্য কোথাও ওড়ে কাজের মাঝে তবে দেহের পড়ে থাকাটা চিরকালীন হয়ে যাওয়াটা খুবই সাধারণ আর বারবার মহড়া হওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা ।
 
ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে এলেই আবার গেটে অ্যাটেন্ডেন্স খাতায় বন্ধক রেখে যাওয়া সত্ত্বাটা আপনায়িত হয় কানে গোঁজা হেডফোনে বাজা এলভিস কসলোর “শ্যি” এর সুরে । গুটি গুটি রাতের পরতে ঘুম জড়াতে থাকা শহরের বুকের গোপন খাঁজ বেয়ে অভস্ত্য খিলাড়ির আঙ্গুলের মত এগিয়ে চলে কিছু বাস বাড়ি নামক কয়েক ঘন্টার দৈনন্দিন আশ্রয়ে ।
 
সাইকেল নেওয়ার সময় দেখা হল শশির সঙ্গে । যেদিন চেনা লোকেদের সঙ্গে দেখা হয় সেদিন হয়েই যেতে থাকে একের পর এক । শশি আমার পাতানো বোন, বেশ কয়েক বছরের জুনিয়র, স্কুলতুতো । অসম্ভব মিষ্টি দেখতে এই মেয়েটার সঙ্গে শেষ যখন দেখা হয়েছিল তখন ওর মাথা ভর্তি ঘন কাল চুল । এখনকার অনেকটাই কেশহীন মাথা ওর সৌন্দর্য্য ম্লান করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও অভিজ্ঞ চোখ সহজেই চিনে নিতে পারে থাইরয়েড ও অপুষ্টির যুগপৎ নখ দাঁতের পুরনো আঁচড় ।
 
ওকে জিজ্ঞাসা করতে হলনা, ভীষণ আদরের শশি অনেকদিন পর তার অন্যতম প্রিয় দাদা / বন্ধুকে কাছে পেয়ে অনর্গল বকে চলল প্রাণোচ্ছল স্বতঃস্ফূর্ততায় । তার বাবার আকস্মিক প্যারালিসিস, মাথার ওপর থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং এর পাহাড়প্রমাণ লোন, নিজের করা টিউশনি আর হ্যাঁ অবশ্যই জিৎ এর কথা । জিৎ আমার জুনিয়র, ওর কিশোরী বেলার বন্ধু আর যৌবনের ভালবাসা । মনে পড়ে এখনও ওদের মধ্যে হঠাত হঠাত করে অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে বেড়ে যাওয়া দূরত্বগুলো একসময় কিভাবে সামাল দিতে হত আমাকে । দুজনের দুজনকে নিয়ে যত অনুযোগ অভিমানের সাক্ষি ও প্রশ্রয়দাতা ছিলাম একমাত্র আমি ।
 
এখন জিৎ পড়ে মেসে থেকে । নিজের রোজকার বলতে একটা দুটো টিউশানি আর বাড়ির দেওয়া পকেটমানি । সাধ্য সীমাবদ্ধ হলেও শশির অধরা ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করার সাধ্যাতীত চেষ্টায় কোনও কোন দিন একবেলার খাওয়া বাদ তো কোনোদিন শুধুই পাঁউরুটি । অনেকদিন দেখা হয়নি তাই সুযোগ পেয়ে আমার কাছে শশির সে কি নালিশ — না খেয়ে খেয়ে যে ছেলেটার শরীর খারাপ হয়ে যাবে । “দেখা হয় ?” – উত্তরে সলজ্জ হেসে একসময়ের রীতিমত স্বচ্ছল বাড়ির মেয়েটা বলে, “হয় মাঝে মাঝে । মাসে একবার । জানই তো কত ভাড়া এখন যাওয়া আসার” … কথাটার বাস্তবিকতা ফুটে বেরচ্ছিল একশো টাকায় দু সপ্তাহের খরচ চালাতে শিখে যাওয়া মেয়েটার প্রাণবন্ত চোখের চঞ্চলতায় । সত্যি বোনটা আমার কত বড় হয়ে গেছে ।
 
লাস্ট ওদের দেখা হয়েছিল শশির জন্মদিনে । সেদিন জিৎ ওকে একটা পিঠে ঝোলানো ব্যাগ গিফট করেছে । ব্যাগটা খুব খুব দরকার হয়ে পড়েছিল যে শশির । নাঃ দামী দোকানের কেক আর সাধ্যে কুলোয়নি দশ বিশ করে প্রতিদিন টাকা জমানো ছেলেটার । তবে মেটিয়াবুরুজ স্টেশনের বেঞ্চিতে বসে সেদিন এলোমেলো পাগল হাওয়ায় প্যাকেটের ব্রিটানিয়া কেক ভাগাভাগি করে, কাড়াকাড়ি করে খেয়েছিল দুজনে । জিৎ স্বপ্নাবিষ্টের মত বলে চলেছিল একটা ছোট্ট বাড়ি আর দুজনের মোটামুটি দুটো চাকরির কথা । বুকে মুখ গুঁজে মুহুর্তের বাস্তব ভুলে স্বপ্নবিলাসসুখী মেয়েটা শুনে গিয়েছিল আর বিশ্বাস করেছিল মনে প্রাণে ।
 
রাত হয়ে গেছে অনেক তাই শশিকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাড়ির দিকে চলেছি । সুনন্দদার কাছে যাওয়ার ইচ্ছে নেই । ওর কোম্পানিরই আরও উচ্চপদস্থ একজনের সঙ্গে সমর্পিতার পালিয়ে যাওয়ার কথাটা দিন তিনেক আগেই সবাই জেনেছে পাড়ার । সেই সম্বন্ধেই কিছু হয়ত । নাঃ ওসবে মাথা দিতে ইচ্ছে করছেনা এখন ।
 
মন অভূতপূর্ব কিছু পাওয়ার আনন্দে মাতাল হয়ে গেছে আজ । অনেকদিনের পরে একটা উত্তর, একটা বাস্তব খুঁজে পেয়ে গেছি যে হঠাত করে পাওয়া মেঘমল্লারের সুরে ।
 
দেখা না-দেখায় মেশা হে বিদ্যুৎলতা,
 
কাঁপাও ঝড়ের বুকে একি ব্যাকুলতা ॥
 
গগনে সে ঘুরে ঘুরে খোঁজে কাছে, খোঁজে দূরে–
 
সহসা কী হাসি হাস’; নাহি কহ কথা ॥
 
আঁধার ঘনায় শূন্যে, নাহি জানে নাম,
 
কী রুদ্র সন্ধানে সিন্ধু দুলিছে দুর্দাম।
 
অরণ্য হতাশপ্রাণে আকাশে ললাট হানে,
 
দিকে দিকে কেঁদে ফেরে কী দুঃসহ ব্যথা ॥
 
————————————————
*** All the characters here are fictional.

মেরি এক্স মাস …………………

অন্যান্য বছরে আজকের দিনটা সকাল থেকে সাজো সাজো রব পড়ে যেত । কেক উৎসব বলে কথা । আগে আগে প্রেসার কুকারে হলেও মাইক্রো অভেন কেনার পর প্রতিবছর সেটার সদ্ব্যবহারে কোনো কার্পণ্য হয়নি । সকাল থেকে বেশ কএক কেজি ময়দা , ডজন খানেক ডিম , ভ্যানিলা, বেকিং সোডা ইত্যাদি নিয়ে কেক যজ্ঞ শুরু হয়ে যেত । তার পর চেনা লোকজনের বাড়িতে গিয়ে সেগুলো ডেলিভারি করার আনন্দ ।

এবারে সেসব কিছুই হয়নি । বহু সুযোগসুবিধা আর বড়লোকি লাইফস্টাইলের হাতছানিযুক্ত চাকরি স্বেচ্ছায় ছেড়ে কোর সেক্টারের স্বপ্নের পিছু পিছু লাফ দিয়ে পড়েছি হার্ডকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানির পাথুরে ধূলোওড়া জমি তে । ১১ ঘন্টার ডিউটি , ৪ ঘন্টার যাতায়াত আর তার সঙ্গেই সারাদিন গলানো লোহা – জিঙ্কের বিষাক্ত বাষ্প, লোহা কাটার তীক্ষ্ণ আওয়াজ । অবশ্য শেষ দুটো মন্দ লাগেনা । যন্ত্র আমার চিরকালীন নিজের করে না পাওয়া ক্রাশ । তাই জড়িয়ে ধরতে না পারলেও তার হাত ছুঁতে পারলে, তার শরীরের গন্ধ বা গলার আওয়াজ আমাকে নেশার মত আচ্ছন্ন করে । পঁচিশে ডিসেম্বরে আমার মত সামান্য কর্মচারীর ছুটি না পাওয়া তাই বঞ্চনা মনে হয়নি । অনেকটা তাকে দেখার আশায় ছুটির দিনেও কোচিং যাওয়ার মত ।

বেশ কয়েক মাস হল একটা বিরক্তিকর রোগ হয়েছে আমার । পায়ের আঙুলগুলো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক ঘেমে যাচ্ছে । কি জানি আমার মন কম্প্রোমাইসে অভ্যস্ত হলেও পায়ের আঙুল গুলো হয়ত কিছুতেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্যু এর দমবন্ধ আগলে নিজেদের স্বাধীনতা হরন মেনে নিতে পারছেনা তাই পচে যাচ্ছে একটু একটু করে গলিত কুষ্ঠের মত আমার গোপনীয়তায় ।

যাই হোক ধান ভাঙতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়া আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে । সে জন্যই উল্টোপাল্টা লিখে যাওয়ার মতই ফ্যাক্টরীর কাজ সামলানোর পাশাপাশি কখনও কখনও অন্য দিকেও চোখ চলে যায় । আজ যেমন চোখ পড়ে গেল একটা কনভার্সেশনের দিকে । কান পড়ে গেল বলাই ভাল ।

লিমিটেড হলেও কোম্পানির আসল মালিক একজনই । তার ইচ্ছাই কোম্পানির সংবিধান । তাই সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ বাবু ঢুকলে সবারই চোখ পড়ে । কি জানি কখন কার পেটে লাথি পড়ে যায় !

ইশান মিস্ত্রী বরাবর বাবুর জুতো পালিশ করে দেওয়ার ফ্রি সার্ভিস দিয়ে থাকে । দিয়ে আসছে গত সাঁইত্রিশ বছর । এই বাবুর বাবা যখন কোম্পানি তৈরী করেছিলেন তখন থেকে । ব্যান্ড স্য মেশিন চালায় । দৈনিক রোজ ১৪৩ টাকা । ওয়েজেস সিস্টেম, নো ওয়ার্ক নো পে। কোম্পানিকে বাঁ হাতের তিনটে আঙুল দিয়ে দিয়েছে বছর পনের হয়ে গেল । কোম্পানির কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি বাঁচাতে গিয়ে ।

– বাবু আজ এট্টু তারাতাড়ি বেরুব ? নাতিটা বড্ড কেকের বায়না ধরেছে, একটা কেক কিনতে যাব রানিহাটি বাজারে ।

– না না , অনেক কাজ আছে । মাসের শেষে পয়সা তো নিতে দেরী করনা । আর তুমি বেরোলে আমি ফেরার সময় জুতোটা কে পালিশ করে দেবে ? আজকে রাত্রে পার্টিতে যাব । পালিশ ছাড়া জুতো পরে যাব নাকি ?

ইশান মুখ নামিয়ে নিল । দেখে বাবুর বুঝি করুণা হল ,

– আচ্ছা শোন । কোম্পানির সব লেবারদের আজ কেক দেওয়া হবে । কেক আনিয়েছি । আমি ক্যান্টিনে বলে দিচ্ছি । তোমায় যেন এক টুকরোর জায়গায় দু টুকরো দেয় । ওটা নিয়ে যেও নাতির জন্য । তোমার লাভই হল, নিজে কিনলে তো আর ওটার মত ভাল কেক কিনতে পারতে না । কি এবার খুশী তো ? যাও কাজ কর গিয়ে । ভাল কেক পাচ্ছ, কয়েকটা কাজ আছে , ক্রশ অ্যাঙ্গেল গুলো নর্থ শেড থেকে নিয়ে টাওয়ার শেডে সরিয়ে দিতে হবে, হিল গ্রাইন্ডিং মেশিনটার পাশে প্রচুর স্ক্র্যাপ জমে গেছে সরাতে হবে, আজ করে দেবে কিন্তু ।

অতিরিক্ত কাজের ফর্দ শুনিয়ে বাবু চলে গেলেন তাঁর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে । আর কেক পাওয়ার অনুগ্রহে কৃতার্থ হয়ে ইশা দা কাজ শুরু করে দিল ।

দুপুরে ক্যান্টিনে খেতে গেলাম । স্বাদহীন একঘেয়ে খাবারের সঙ্গে আজ এক্সট্রা প্রাপ্তি একটা কেক । এক কামড় দিয়েই মুখ ও মন দুটোই বিস্বাদ হয়ে গেল । বাজারের সবচেয়ে ওঁচা কেক বোধ হয় এটা । এমনকি এর চেয়ে বাপুজি কেক ও ভাল । লেবার রা অবশ্য তাই মহানন্দে একটু একটু করে বাঁচিয়ে ছোট ছোট কামড়ে খাচ্ছে …

এর মধ্যেই ঘটে গেল একটা দুর্ঘটনা । ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে এসব নিত্যনৈমিত্তিক রুটিনের অঙ্গ । প্রতিদিনই কারুর না কারুর কিছু না কিছু হচ্ছে । পরশু স্ট্যাম্পিং মেশিনে একজনের হাত কবজি থেকে কেটে বাদ হয়ে গেল তো আজ ১১ কেভি লাইনের তার ছিঁড়ে একজন কয়েক সেকেন্ডে জ্যান্ত রোস্ট হয়ে গেল, আবার কবে হয়ত গলন্ত দস্তা কারুর গায়ে পড়ে দিব্যি এক খানি ফুল সাইজ মানুষের কঙ্কাল যুক্ত মূর্তি হয়ে গেল ।
আসলে আমার ক্রাশ এমনিতে ভাল, স্নেহশীলা প্রেমিকার মত । কিন্তু আরও আরও মুনাফা আর কস্টকাটিং এ অসচেতন ধর্ষণের নীরোধহীনতার মতই তার শরীরে প্রবেশ করেছে মারণ ভাইরাসেরা ।

নিজের কাজ শেষ করে ইশা দা অতিরিক্ত কাজ করতে মানে গ্রাইন্ডিং মেশিনের পাশ থেকে স্ক্র্যাপ সরাচ্ছিল । গ্রাইন্ডিং মেশিন থেকে ছিটকে আসা লোহার টুকরো তার কপালে আর মুখের বিভিন্ন জায়গায় এসে লাগে । কেটে কুটে বেশ কয়েক জায়গায় ভাল ক্ষত হয়ে যায় ।

তবে ইশা দার কাছে এসব নতুন নয় সাঁইত্রিশ বছরে এমন কাটা কুটি হয়েছে বহুবার । তাই কোম্পানীর ডাক্তার, মানে কোনো এক অচীন গাঁ থেকে ধরে আনা কম্পাউন্ডারের লাগানো ট্যালট্যালে ডেটল , যাকে ডেটল জল বলাই ভাল । আর দু এক টুকরো তুলো । ইশা দা আবার রেডি ।

সময় মত বাবুর জুতো পালিশ ও করে দিল বাবুর বেরোনোর আগে । বাবু ফোনে কাকে যেন, ” ইয়েস সুইট হার্ট , আই অর্ডার্ড আ হিউজ ওয়ান ফ্রম ক্যাথলিন … ” ইত্যাদি বলতে বলতে গাড়ি নিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেলেন । আমরা সবাই সেদিনের মত হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম ।

আয়েশ করে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে জুতোটা খুল্লুম । অসম্ভব দুর্গন্ধ যুক্ত ভিজে যাওয়া মোজাটা বের করে আমার রুমের সামনের দড়িটায় টাঙ্গিয়ে দিলাম ।

তার পর দূরের দিকে চেয়ে থাকলাম । যেখানে হাইড্রার চাকায় ওড়া ধূলোয় সাদা হয়ে ইশা দা চলেছে কাঁধে লোহার ক্রশ অ্যাঙ্গেল নিয়ে , মাথার ক্ষতস্থানের তুলো থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত । পকেটে গোঁজা কাগজে মুড়িয়ে নেওয়া কেক । দু টুকরো । ভাত খাওয়ার সময় নিজের ভাগেরটাও না খেয়ে পকেটে ভরেছে ইশা দা ।

কখন যেন নিজের মনেই বলে ফেলেছি মেরি ক্রিশমাস …

ভুল শুধরে

বড্ড ভুল করে ফেলেছি জানিস … তোর বড় বড় নিষ্পাপ চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে তোকে ভালবেসে … বড্ড বড় ভুল, তোর উত্তরে হ্যাঁ বলে ।

তোর কাছে তো কখনও কিছু চাওয়ার ছিলনা আমার, শুধু চাইতাম তোকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতে, তোর সব ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে, তোকে ভাল রাখতে, তোর যত্ন নিতে । কিন্তু কি অদ্ভুত দেখ, প্রতিটা মুহুর্তে তোর পাশে থেকে, প্রতিটা দিন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে, তোর সব কটা না পূরণ হওয়া ইচ্ছা পূরণের জন্য নিজেকে ক্ষইয়েছি একটু একটু করে … তবুও হাসি ফোটাতে পারিনি তোর মুখে উল্টে দিনের পর দিন একটু একটু করে বিরক্তির কুঞ্চন জড়ো হয়েছে তোর টানা টানা ভ্রূ যুগলে ।

আমার ইনকম্প্যাটিবিলিটি, আমার হ্যান্ডসাম না হওয়া, আমার বাউন্ডুলে হাব ভাব এতগুলো বছর ধরে তোর বন্ধুদের কাছে তোর মাথা নীচু করে দিয়েছে, … কি করব বল এই ছাপোষা স্বপ্নালু স্বভাবটা যে আমার শহর, আমার স্বত্ত্বাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখা শেকড় ।

তবু দেখ আমি কিছু না চাইতেও কেমন সুন্দর একটা উপহার দিয়ে বসলি আমায় … যে উপহারের প্যাকেট খুলতেই ভেসে এল আমাকে অবলীলায় ভুলে যাওয়ার, কিম্বা অন্যকারুর বক্ষলগ্না – অঙ্কবর্তিনী হয়ে তোলা ছবিদের গুঞ্জন । যা বার বার এসে হাজির হয় আমার নির্বাসিত টাইমলাইনে ।

তবে জানিস , ভুলটা শুধরে যাবে এত তাড়াতাড়ি বুঝতেই পারিনি । আমার এক দিদি অনেক দিন আগে বলেছিল, একফোঁটা ভালবাসার জন্য পৃথিবীতে কত লোক তীর্থের কাকের মত বসে থাকে । মরুভুমিতে অজ্ঞান মানুষটাকে জল না দিয়ে ফোয়ারার জৌলুশে মরুভূমির শোভাবর্ধনে কি লাভ ?

সেদিন না বুঝলেও কথাটা আজ বুঝি । বুঝি কিছু দামাল পাগল ছেলে মেয়ের সঙ্গে দুপুরের রাস্তায় ভালবাসা ভিক্ষা করে । না নিজের জন্য নয়, নেপালের বিধ্বস্ত মানুষগুলোর জন্য কলকাতা, শহরতলীর পথচলতি মানুষের ভালবাসা । জানিস, ওরা ফিরিয়ে দেয়নি রে । দেখ বিন্দু বিন্দু করে জমা হওয়া ভালোবাসায় বুকটা কেমন ভরে গেছে । নাঃ এর জন্য ওদের কিচ্ছু দিতে হয়নি জানিস ।

এতদিন তোর ছোট্ট ছোট্ট গজদাঁতের উঁকি দেওয়া একটা মিষ্টি হাসির জন্য অনেক চেষ্টা করেও তো তোর মনে বিরক্তি আর অবদমিত ঘৃণা ছাড়া কিছু সৃষ্টি করতে পারলাম না । আজ তোর বিরাট চাকরী আর হাই স্টেটাসের বন্ধুদের মাঝে তোর কিছুর দরকার নেই তাও জানি ।

তাই আজ ঐ অসহায় মানুষগুলোর জন্য একটু ভালবাসা বিলিয়ে দেখি, ওদের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলেও কান্নটা তো মোছাতে পারি ।

দামাল ছেলেমেয়ে গুলো যে ভালবাসার আসল স্বাদটা আমায় চিনিয়ে দিয়ে গেছে ।

রবীন্দ্র জন্মদিবস

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস … “বাঙালী মননে রবীন্দ্রসাহিত্য” গোছের কিছু একটা লিখলে বোধহয় মানাত । কিন্তু আমি মাইরি পাগলাচো- পাবলিক তাই কটা ভুলভাল ভাট না লিখে পারছি না ।

কিছু বাচ্চা ছেলেমেয়ে, যাদের অনেকের নামই আবার রবীন্দ্র রচনা থেকে নেওয়া, রবিন্দ্রানুরাগী কিনা জানিনা তবে ভীষণ রাগী প্রকৃতির রামচাঁটিতে পিষে যাওয়া কিছু পাহাড়ি মানুষের জন্য দিন নেই , দুপুর নেই, সন্ধ্যে নেই ত্রাণ সংগ্রহ করেই চলেছে । বহু মানুষ যেমন স্রেফ হাঁকিয়ে দিচ্ছে তেমনই অনেকে পরম মমতায় সাধ্যমত ভালবাসা রেখে যাচ্ছে হাতে ধরা পিচবোর্ডের বাক্সগুলোয়, নেপালের মানুষ গুলোর জন্য । আমার এখনকার বলার কথাগুলি এঁদের উদ্দেশ্যে নয় …

আজ আমার বলা সেই সব মানুষদের প্রতি … একই লোকেশনে আলাদা তারিখে ত্রাণ সংগ্রহের সময় যাঁরা বলছেন “কালকে তো দিয়েছি …”

প্রথমেই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাতে চাই আর বলতে চাই আপনাকে দেখে এই ভেবে গর্ব হচ্ছে যে আমাদের চারপাশে এখনও প্রকৃত মানুষেরা রয়েছেন, যাঁরা নিজের ব্যক্তিগত সুখ সুবিধার বাইরে গিয়ে একটু হলেও অন্যের কথা ভাবেন ।

কিন্তু দাদা / দিদি এখানেই কি আপনার সব দায়িত্ব শেষ ? একটা কথা ভেবে দেখেছেন কি এরকম আর কত দিন ? একটা নেপাল হয়েছে, আরেকটা গুজরাট কিম্বা কলকাতা কিন্তু যে কোনো দিন হতে পারে । তাই শুধু অর্থসাহায্য নয় । চাই সার্বিক সচেতনতার প্রসার । যে সচেতনতা শুরু হতে হবে আপনার থেকেই । কিভাবে সচেতনতা প্রসার করবেন তার কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই । যদি সত্যিই পৃথিবীর সৌম্য সুন্দর রূপ ধরে রাখতে চান, তবে নিজে জানার চেষ্টা করুন কিসের জন্য প্রকৃতি আর এই রুদ্র-ক্ষমাহীন রূপে সজ্জিতা । গুগল আছে, বই আছে আর একটা কমন সলিউশন রয়েছে ।
নেপালের মানুষদের স্মৃতিতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে “আমরা সমব্যথী” গোছের ফ্লেক্স না লাগিয়ে, মোমবাতি মিছিল না করে । নেপালের দুর্ভাগা মানুষ গুলোর স্মৃতিতে একটা করে অন্তত গাছ লাগান আর তার রক্ষণাবেক্ষণ করুন, যাতে এখনও বেঁচে থাকা মানুষগুলোকেও অকালে চলে যেতে না হয় ।

রবিঠাকুরের জন্মদিনের লেখা তে একটা কোটেশন-টোটেশন না দিলে আবার নম্বর কাটা যাবে … তাই এটা দিয়েই শেষ করলুম —

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লহ এ নগর
লও যত লৌহ লোষ্ট্র, কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নব সভ্যতা …”

স্রষ্টা, প্রেম ও মুক্তি

আচ্ছা জন্মের জন্য তো জননপ্রক্রিয়া লাগে, তাহলে এই সমগ্র মহাবিশ্বের সৃষ্টি জনন ব্যতীত কীভাবে হল ? আর কল্পকাহিনীর আদম ইভের থেকে মানব সৃষ্টি যদিও বা ধরে নেওয়া যায় তবে তাদের বাসস্থান ইডেন উদ্যানটির জন্মই বা হল কী ভাবে ?

যদি বলি সৃষ্টির আদি কারক হল প্রেম তাহলে কি আজগুবি বা ন্যাকামী ভেবে লেখাটা পড়া এখানেই বন্ধ করে দেবেন ? তবুও কিন্তু আমার কলম চলতেই থাকবে, রাখাল আর তার সখীদের প্রেমের রূপকথা বুনতে থাকবে অনন্ত কাল ধরে । কারণ রাখালের দেহাতীত কল্পপ্রেমেই যে কাহিনীর জন্ম হয়ে চলে কলমের নিব বেয়ে ।

কেউ কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন রাখালের ভালবাসা কী শুধু একটা ভেক বা সহানুভুতি কুড়োনোর মার্কেটিং নয় ? নইলে সে তার রাজকণ্যাকে ফেলে কুহকিনীর দেশেই বা যাবে কেন আর তার মনের অহঙ্কারের গরাদ ভেঙ্গে তাকে উদ্ধার করতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়ে মগ দেশের রাজকণ্যার উদ্দেশ্যেই বা যাত্রা করবে কেন ?

কারণটা খুবই সোজা, স্রষ্টা যেমন তাঁর সৃষ্টির কল্পনার সঙ্গে মিলনে জন্ম দেন মহাবিশ্বের তেমনই রাখালের অস্তিত্বও বেঁচে থাকে তার সহানুভূতির ক্রোড়ে জন্ম নেওয়া কাহিনীতে । তাই তো রাখাল বার বার তার মোহন বাঁশিতে সুর তোলে, প্রেম বিলোয় যুগযুগান্ত ধরে ।

কেউ কেউ এই ক্ষণে ক্ষণে বদলানো প্রেমের রূপ দেখে অবিশ্বাসী হন, ঠিক যেমন কবিগুরুর নাম মজলিশী পি এন পি সি তে হয়ে ওঠে বউদিবাজ । তাঁদের জানা নেই প্রেম মানেই শরীর সর্বস্ব, নিদেন পক্ষে নিষীদ্ধ আলাপচারিতা বা কঞ্জুগাল সম্পর্কের লিখিত আগরে বাঁধা পড়া নয়, প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ সহানুভূতি, প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ অফুরন্ত স্নেহের বরষণে একটি হৃদয়কে আশ্রয় দেওয়া, প্রেম মানে অনুভূতির আদান প্রদানে দুটি হৃদয়কে আলোকিত করা ।

সে প্রেম কোনো নির্দিষ্ট একটি মানুষের অবয়বের শীকলে বাঁধা না পড়ে প্রতিটি মানুষের ভালবাসাকে আস্বাদন করতে পারে, সে প্রেম প্রেমিক প্রেমিকার বন্ধুত্ব করাতে পারে । কারণ সে প্রেমই হল মুক্তি । দেহের বা স্থাবর মায়ার অর্গল ভেঙ্গে বিশাল ব্যাপ্তিতে জঙ্গমত্ব প্রাপ্তি । হাতে হাতের আগেও মনের সঙ্গে মনের পরিচিতি ।

প্রেমের নিয়ন্ত্রণ যদি সত্যিই হরমোনের হাতে থাকত, তাহলে দেহজ তৃষ্ণার নিবৃত্তির সাথে সাথেই প্রেম এবং সহানুভূতিরও নিবৃত্তি ঘটত ।

আর প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট গঠন হয়না বলেই অকলঙ্কিত স্রষ্টাচরিত্র বিবাহিতা বান্ধবী বা নিজের অর্ধেক বয়ঃক্রমের খুকীর প্রেমরসে সিক্ত হয়ে চিদানন্দসাগরে অবগাহন করতে পারে ।

এই প্রেমই যে সৃষ্টির আকর, প্রেমিকার হৃদয়দর্পণ হতে প্রতিফলিত স্বীয় মননের সহানুভূতি ।

এই তো শিকল ভাঙা, এই তো পূর্ণতা , এই তো মুক্তি ।

**********

বহু দিনের অব্যাবহারে বন্ধ পুরোনো ভোডাফোন মোবাইলের হঠাত দেওয়া চার্জটা একদিন আবার নীরব থেকে নিঃশেষিত হয়ে যাবে । শেষ হবে আরেকটা অধ্যায় ……জন্ম হবে নতুন কাহিনীর ।

বহুরূপীর কালারটোন

যথাক্রমে ব্যাঘ্র ও সিংহ বেশধারী দুই বহুরূপীতে দেখা হওয়ার পর যদি তারা মুখোশ গুলো খুলে দুদন্ড সুখ দুঃখের গল্প বা মুখোশ ইত্যাদির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি- টিদ্ধি নিয়ে আলোচনা করে, তাহলে পৃথিবীটা আরেকটু সুন্দর হতে পারত ।কিন্তু বাস্তবে তো সেরকম হওয়া কষ্ট কল্পনা । বাস্তবে দুই বহুরূপীর দেখা হলে দুজন দুজনার স্বরূপ স্পষ্ট বোঝা সত্বেও একজন নিজেকে আসল বাঘ আরেকজন নিজেকে আসল সিংহ হিসেবে প্রতিপন্ন করার প্রাণপণ চেষ্টা করে ….

মানুষের স্বজাতি বিদ্বেষের সমান কালারটোনের কালিতে এ ঘটনা লেখা যায় কিনা জানা নেই তবে উড়ন্ত পাখীর চোখ দিয়ে দেখলে এই হার্দিক বা বৌদ্ধিক গোলযোগকেই সম্ভবতঃ

Egoল বলে ।

অর্ধচেতন সুখ বা দুঃখ

স্বপ্নহীন নীকষ কালো শান্তির মত ঘুম বা সুষুপ্তি হাতে গোনা কয়েকটা রাত জুড়ে থাকে । বেশীরভাগ রাতই দীর্ঘ গোটা একটা কিম্বা ভাঙা ভাঙা স্বপ্নের আনাগোনায় অনুভূতি মুখর ।

স্বপ্ন সেটা ভয়েরই হোক কিম্বা আনন্দের, ভাঙ্গে এবং সকাল হয় । কিছুটা সময় রেশ থেকে যায়, মনে ও পড়ে স্বপ্নটা অনেকটা সময় ধরে আবছা আবছা, ফিকে হতে থাকা । দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ আর অনুভূতির ভীড়ে মিশে যেতে থাকে, চাপা পড়তে থাকে স্বপ্ন ও তার অর্ধচেতন সুখ বা দুঃখ গুলো ।

তার পর আসে আরেকটা রাত ।

মানুষ ঘুমোতে যায় স্বপ্ন দেখবে জেনেও । মানুষ ঘুমোতে যায় এটা জেনেও যে কাল সকালে আবার ঘুম থেকে উঠতে হবে অদ্ভুত একটা হারিয়ে যাওয়া ভাব নিয়ে । মানুষ ঘুমোতে যায় স্বপ্নটা না শেষ হয়েই ভেঙ্গে যেতে পারে জেনেও ।

কারণ মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে । ব্রেণের ডিডাকটিভ অংশটার সাময়িক নিষ্ক্রিয় হওয়ার সুযোগে স্বপ্নের ঘটনা ও চরিত্রদের সত্যিকারের বিশ্বাস করতে ভালবাসে । কারণ মানুষ কোনো এক স্বপ্নের সত্যি হয়ে যাওয়ার আশায় বাঁচতে ভালবাসে ।

সেতু

তোমাকে কখনও কোনো অভিশাপ দিই নি, কেনই বা দেব ?

শুধু সেফটি পোস্টার আটকাই দেওয়ালে …

তোমার ভাবনারা না একদিন জোট বেঁধে খুঁজে পায় সেতু

তোমার সিদ্ধান্তেরা না তোমারি দিকে অস্ত্র ধরে …

ভোর ৪টে ৪

যদি ঘুমের মাঝে স্বপ্নে তাকে পাওয়া যায় একদম সেই আগের মত করে ? আর ঘুম ভাঙ্গে এক বুক শূন্যতা নিয়ে … বাস্তবে । সে যে আমার থেকে অনেক দূরে, মনে পড়ে যায়, তার আনন্দউচ্ছল জীবনে আমার অস্তিত্ব অপ্রাসঙ্গিক ।

তবে সেই স্বপ্নকে কী বলবে ? সুস্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন ?

যত রাতেই ঘুমোতে যাইনা কেন, প্রতিদিন একই সময় হঠাৎ করেই ভেঙ্গে যাচ্ছে ঘুমটা । ভোর ৪টে ৪ । চোখের কোন গুলো আবারও ভিজে গেছে আজ ।

কাজ / অলস সময়ে

অলস সময়ে বন্ধ ঘরের তালা গুলো খুলে খুলে দেখি । ঘর একটা নয় । অনেক গুলো । একেকটা ঘরের একেকজন বাসিন্দা । আলাদা আলাদা দেওয়ালের রঙ, আলাদা সাজগোজ । একজনের ঘরে অন্য জনের প্রবেশাধিকার নেই । কেউ যখন চলে যায় তখন তার ঘরেও চাবি পড়ে যায় । কিন্তু সে ঘর শুধু তারই । নতুন করে কেউ আর সেখানে দখলদারী নিতে পারেনা ।

তাই অলস সময়ে একেকটা ঘর খুলি । কখনও তার ভিতরে গিয়ে আরাম কেদারায় বসি । টেবিলে ফেলে যাওয়া অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পড়ি । কখনও ইঁট, ধূলোয় হাত বোলাই ।

আজ বার বার অসতর্ক মুহুর্তের স্বপ্নগ্রস্ততার তাড়ণায় যে ঘরটায় ঢুকে পড়েছিলাম তার দেওয়ালে একটা সাদাকালো বেড়ালের ছবি হেলে রয়েছে । টেবিলে একটা বোর্ণভিলের প্রাগৈতিহাসিক প্যাকেট । দেওয়ালের পলেস্তারা খসা অংশে বেরিয়ে থাকা ইঁটে হাত বোলালাম । মনে পড়ে গেল এই ঘরটা গাঁথার ইঁট এসেছিল কত্ত জায়গা থেকে । কোনোটা আধো অন্ধকার গলির বুড়ো সাক্ষী পাঁচিলটা থেকে, কোনোটা আগরপাড়া স্টেশনের বসার জায়গা গুলো থেকে, কোনোটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে, কোনোটা মানিস্কয়ার, সিটি সেন্টার বা কলেজের পাশের অনেক দীর্ঘ প্রতীক্ষার সাক্ষী বট গাছটার বাঁধানো গুঁড়ির থেকে ।

ক্যালেন্ডারে চোখ পড়ল । কয়েকটা ডেট ফিকে হয়ে যাওয়া কালিতে গোল করা আছে । তার মধ্যে একটা ১৬ই আগস্ট ।

তারিখটায় চোখ পড়তেই কোত্থেকে দমকা একটা হাওয়া এসে অসমাপ্ত পান্ডুলিপিটা ছত্রাকার করে উলটে দিল । হাতে এসে পড়ল একটা পাতায় আঁকা একটাই দৃশ্যের ছবি —-

একটা নির্জন পুকুরের ধার, দুজন নতুন প্রিয় বন্ধু পাশাপাশি, হঠাত করে খুঁজে পাওয়া স্বপ্নের চরিত্রটার বাস্তবতা সম্বন্ধে অবাক হয়ে ভাবছে আর কী যেন বলি বলি করেও বলে উঠতে পারছে না । শেষে বড় বড় টানা টানা চোখের মেয়েটাই অসহিষ্ণু হয়ে বলে উঠল, “তোর কিছু একটা বলা উচিত । বল”

ছেলেটা সব জেনেও ব্যাপারটা সত্যি এটা বিশ্বাস করতে পারছিল না । তাই বুঝলেও আরেকবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলল, “কি? কি বলব ?”

মেয়েটা, “দ্যাখ, আমি কিন্তু সেই সব লোকেদের একদম পছন্দ করিনা যারা ভিতু”

ছেলেটা বেশ কয়েকবার ঢোক গিলে অতি কষ্টে, “আই …”

মেয়েটা উজ্জ্বল – উচ্ছল চোখে, “হ্যাঁ হ্যাঁ বল, বল”

– ” আই লাভ ইউ”

১ মিনিটের নিস্তব্দতা, শুধু পুকুরের ধারের রাউল গাছটায় একটা পাখি “টির-টির টির-টির” করে ডাকছে ।

হঠাত মেয়েটার বিশাল বিশাল স্বপ্নালু চোখ গুলো আরেকটু বড় হল আর “এত দিন সময় নিলি ! আমি যে কবে থেকে এটা শোনার জন্য ওয়েট করে আছি …”

.
.
.
নাঃ …… ঘরের তালাটা বন্ধ করে বেরিয়ে এলাম । আমার এখন প্রচুর কাজ আছে না । সামনে লক্ষ্ণৌএ শো, তার পর কতদিন ধরে ভাবছি সাইকেলের চেনটা ঠিক করতে হবে, ঘরটা একটু গোছাতে হবে … ধূলো ঝাড়তে হবে …

প্রচুর কাজ, প্রচুর …