রাষ্ট্র ও গামছা

আকাশী রঙের বিশাল লাক্সারী বাসটা রায়পুর থেকে চলতে শুরু করল । বাসে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বন্ধুরা, দাদারা মিলে জনা ২০ লোক জন ।

– শুনেছিস ভাই, ট্রেণে আসতে আসতে যে মাওবাদী হামলার কথা শুনেছিলাম তাতে ৫ টা লোক টপকে গেছে ! এই দেখ ফেসবুকে একটা বন্ধু লিখেছে ! ভাই আমাদের বাসটা ও তো ঐ রাস্তা দিয়েই যাবে ! কী হবে বাঁড়া ! যদি আমাদেরও অ্যাটাক ফ্যাটাক করে !

– করলে করবে, কী আর করা যাবে … চুপচাপ থাকো না, আমার কান খাচ্ছ কেন । ঘুমোতে দাও তো, ট্রেণে ঘুম হয়নি ।

– এই বোকাচোদা, খালি ঘুম না ? তুই টিমের লিডার বলে কথা । এবার থেকে বেরোনোর আগে আমাদের এল আই সি করে বেরোবি নইলে চুঙ্কু কেটে রেখে দেব … হে হে হে হে

এরা নিজেরাও ঘুমোবেনা, আমাকেও ঘুমোতে দেবেনা বুঝে অত্যন্ত্য অনিচ্ছা সহকারেও জানালার ধারে গিয়ে বসলাম । প্রায় ঘন্টা পাঁচেক লাগবে । লাল মাটির দেশের সবুজ জঙ্গল চিরে একটা মসৃণ পীচের রাস্তা । একটুক্ষণ পর পর থেকেই চোখে পড়তে লাগল জঙ্গলের মাঝে মাঝেই একটা করে বস্তা দিয়ে ঘেরা ছাউনি আর তার আড়ালে জলপাই টুপি আর উঁচিয়ে থাকা নল ।

যাইহোক রাস্তায় একবার মোটে গাড়ি থামিয়ে আর্মির লোকেরা কাগজপত্র দেখে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি । নির্বিঘ্নেই পৌঁছেছিলাম নারাইনপুরে ।

ব্যাপক জায়গা । চারিদিকে ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গল । অল ইন্ডিয়া ইউথ কনভেনশন । সারা ভারত থেকে প্রায় ১৫ হাজার লোক এসেছে । সে বিশাল ব্যাপার ।

দশদিন ব্যাপী বিরাট উৎসবের ইনগোরেশোন হল আমাদের অনুষ্ঠান দিয়ে । সেই প্রথম একসাথে প্রায় ১২ হাজার লোকের সামনে পারফরম্যান্স । অনবদ্য একটা অভিজ্ঞতা ।

যাই হোক তার পরের ৯ দিন কোনো কাজ কর্ম নেই । মালপত্র তো সেই রাত্রেই আবার বাক্সবন্দী হয়ে গিয়েছে । তাই পরের ৯ দিন চুপ চাপ খাওয়া ঘুমোনো ঘোরা আর অনুষ্ঠান দেখা ।

আমি শালা বোর হয়ে যাচ্ছিলাম । তাই ওখানকার আবাসিক ছাত্র আদিবাসী গোটা তিনেক বাচ্চার সঙ্গে জঙ্গল চষতে শুরু করলাম ।

একদিন ওদের বললাম ওদের গ্রামে নিয়ে যেতে । অদ্ভুত ভাবে সব কিছুতে দাঁত বের করে হেসে হ্যাঁ করা ছেলেগুলো কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গিয়ে কিছুতেই রাজি হতে চায়না । আমরা অনুষ্ঠান করার পরের দিনই হসপিটালে ভর্তি থাকা আহত বিদ্যাচরণ শূক্লের জীবনাবসানের খবর পাই । ভাবলাম হয়ত তারই জন্য কোনো চেকিং এর কড়াকড়ি আছে । তবু খুব জোড়াজুড়ি করতে থাকায় ওরা রাজি হল ।

বনের অনেক ভিতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যাওয়া । সোজা রাস্তায় গেলে মিলিটারি আইডেন্টিটি কার্ড দেখে পত্রপাঠ ঘর পাঠিয়ে দেবে । জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গেলে খোচর ভেবে বিপক্ষ দল সোজা ওপরে পাঠিয়ে দেবে । দূর থেকে দেখলাম মিলিটারীতে একটা এন জি ও ট্রাক থামিয়ে পেটি পেটি বিস্কুট, ওষুধ নামিয়ে নিজেদের গুদামে মজুদ করছে । শুনলাম ঐ এন জিও সংস্থা গুলো মাঝে মাঝেই আসে নানা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আদিবাসী গ্রামগুলোতে দিতে । কিন্তু মিলিটারী সব বাজেয়াপ্ত করে নিজের গুদামে মজুত করে নেয় । ওসব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ, হাই প্রোটিনের বিস্কুট, দুধের প্যাকেট এসব মাওবাদীদের হাতে পড়তে পারে, তাদের হাত শক্ত হতে পারে এই কারণ দেখিয়ে ।

অবুঝমার পাহাড়ের মাথায় গ্রামটা প্রস্তর যুগ থেকে সামান্যই এগিয়েছে । এমনকি এখনও অনেকে চামড়া পরে । শীকার আর বনের মধ্যে হওয়া ফল পাকুরই প্রধান উপজীব্য । এই গ্রামেই ধনসিং এর বাড়ি । ধনসিং তার বাড়ি অর্থাৎ একটা কঞ্চি আর পাতা দিয়ে তৈরি ঘরে আমায় যত্ন করে নিয়ে গেল । বাড়িতে শুধু ওর বুড়ি দাদিমা । তোবড়ানো কুঁচকোনো মুখ । একটা নেকড়া পড়ে আছে । ঊর্ধাঙ্গ এখানকার বেশীর ভাগ লোকের মতই অনাবৃত । পিঠের দিকে একটা গভীর ক্ষত, পুরোনো কিন্তু ট্রীটেবল । বোঝাই যাচ্ছে একটু বিটাডাইন কিম্বা টিংচার অব আয়োডীন ও পড়েনি । একটা পাথরের খোরায় পিঁপড়ের ডিম জড়ো করছে । আমার পকেটে বন জঙ্গলে ছড়ে টরে যাওয়ার ভয়ে একটা সুক্রাল এম ইউ মলম ছিল । ধনসিংকে দিয়ে বললাম ওর দাদীকে বলতে প্রতিদিন লাগানোর জন্য ।

একটু পরে ধনসিং ওর পিসিকে কোত্থেকে যেন ডেকে নিয়ে এল । হাতে কিছু উই ঢিবি থেকে তুলে আনা ছাতু । লাজুক মুখে মাঝে মাঝেই দাঁত বের করে হাসি টা লুকোচ্ছে । একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে । এর বরকে মিলিটারীরা ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে গিয়ে গুলি করার সময় এই লাজুক মেয়েটা বাধা দিয়েছিল । একটা মোটা সেগুনের ডালের বাড়ি পড়েছিল একটা মিলিটারী হেলমেটে । তাই পুরস্কার স্বরূপ তলপেটে আর দু পায়ের ফাঁকে কাঁটার নাল লাগানো বুটের লাথি জুটেছিল এলোপাথাড়ি । লাজুক মেয়েটার পরণে একটুকরো সাদা ন্যাকরা আর ঊর্ধাঙ্গে একটা শতচ্ছিন্ন গামছা । যার ফাঁকফোকড় দিয়ে মাঝে মাঝেই অনাবৃত হয়ে পড়ছে আবলুশ নিটোল স্তনবৃন্ত । একুশ বাইশ বছরের খোলা শরীর দেখে আমার অঙ্গবিশেষ শক্ত হয়ে উঠল না কোনো অজানা কারণে । বরং গোটা গায়ে রী রী করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এক অবর্ণনীয় অনুভূতি । ঘৃণা না অক্ষমতার …… জানিনা ।

শুনলাম গামছা ও নাকি মিলিটারীদের বাজেয়াপ্তকরণের হাত থেকে ছাড় পায়না । মাওবাদীরা মুখে গামছা নিয়ে যাতে ঘুরতে না পারে তার জন্য । সেদিন ওদের কে অঙ্গিকার করেছিলাম কয়েকটা গামছা ধনসিং আর তার বন্ধুদের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব আমার সীমিত সাধ্যানুসারে ।

নারাইনপুর থেকে ফেরার দিন কিছু গামছা কিনে ওদের হাতে দিয়েও ছিলাম ।

জানিনা সেগুলো পৌঁছেছে নাকি গামছা আর অবুঝমারের মাঝে অবুঝ রাষ্ট্র এসে পাঁচিল তুলেছে আর নিরুপায় হয়ে কটি প্রথম প্রজন্ম শিক্ষিত ছেলে গামছা গুলি মুখে বেঁধে নিয়েছে … কি করবে বল, পুরুষ তো, কাপুরুষের মত গলায় দিয়ে ঝুলে পড়তে তো আর পারেনা  …

ছেলেবেলা ছুঁয়ে দেখা – 1

আমার প্রিয় ঝড় …. সাইকেলের দোকানের গুমটিতে সাময়িক আশ্রয় , শীলাবৃষ্টি , ভিজে ভিজে রাস্তায় আধভিজে কাঁচা আম … সাইকেলের বলের পাশে থাকা নুনের কৌটো, সাইকেলের কাকা আর চিকু , টকে জরা জিভে …. আরেকবার ছেলেবেলা ছুঁয়ে দেখা ।

যুক্তি বিশ্বাস

সম্প্রতি ছ্যাঁকা খেয়েছি । পূর্বে যে কখনও ছ্যাঁকা খাইনি এমন নয় । তবে শুধু অভিজ্ঞ মাথা নেড়ে তো আর পোড়ার জ্বালা মেটানো যায়না । তাই বাস্তবিক ক্ষতস্থানে প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যাপক প্রদাহের সৃষ্টি হয়েছে ।

সেই কবে দশমশ্রেণীপাঠরত বালক প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর নয় । অবশ্য বালক আদৌ বলা যেত কিনা জানিনা, কারণ অন্য কারুর সাক্ষ্য দিবার প্রয়োজন নাই, নিজের কাছে মিথ্যে বলে কী লাভ । মনের পরিপক্কতা দেহের পরিপক্কতাকে রেসে বেশ পিছনেই ফেলে দিয়েছিল সে তথ্য রেসিং ট্রাক স্বরূপ বালক বা লোক টি ছাড়া কে ভাল জানবে ! যাই হোক সেই নৈব নৈব চ যে কখন কোন নালা দিয়ে গড়িয়ে গঙ্গা ভায়া হয়ে সাগরে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও ইতিহাস বিলীন করে দিল তার হিসেব লিখে রাখতে বেমালুম ভুলে গেছি ।

এর জন্য আমায় দোষ দিলে কিন্তু অনুচিত হবে । আছাড় খাওয়া, পোড়া ইত্যাদি বলে কয়ে, সাবধানতার ধার ধরে আসে না । সেজন্যই তো এগুলোকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে । সাবধানতা নিলে তবুও দুর্ঘটনা কিছুটা আটকানো যায় । কিন্তু বাঙালীর বিরহ মন্থিত দীর্ঘশ্বাসোদ্ভুত প্রতিজ্ঞা এক্ষেত্রে নির্জন গলির দেওয়ালে “এখানে প্রস্রাব করিবেন না” লেখার মতই নিষ্ফল ।

যাই হোক ক্যারদানী মারতে গিয়ে দুর্ঘটনার একটা মদীরার ন্যায় পূর্বরাগ থাকে । ট্রেণে ঘা খেয়ে অকালে চন্দ্রবিন্দু হওয়া ছেলেটাও “এই সেলফি টা ক হাজার লাইক পাবে” হিসেব গুণে মিচকি দাঁত কেলিয়ে টেলিয়ে টপকায় । তা আমার ছ্যাঁকা খাওয়াপূর্ব মধুচন্দ্রিমা (বাস্তবিক মনে করবেন না, অত সাহস আমার নেই, রূপকার্থে ব্যবহৃত) বছর চারেক চলেছিল । দিব্যি উড়ছিলুম, আগুনের লেলিহান সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে দেদার ঘি ঢেলে চলেছিলুম । আসলে আগের ছ্যাঁকা খাওয়ার স্মৃতি যে ততদিনে বেদম হাওয়া । ঘৃতপুষ্ট অগ্নী যে সময়-সুযোগ মত আমাকেই গ্রাস করবে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে স্বমেধ যজ্ঞ মোটামুটি অর্গানাইজ করে ফেলছিলুম ।

যাই হোক সে যা হয়েছে হয়েছে । গায়ে আবার একই রকম ফোস্কা পড়েছে । জ্বালার অভিন্নচরিত্রও হাড়ে হাড়ে মালুম হচ্ছে । পর্যায়ক্রমে ক্ষোভ, দুঃখ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, অসূয়াদি স্তর কেটে গিয়ে এখন কেবল বিষম জ্বালা আর “প্রমিসেস আর মেড টু বি ব্রোকেন” প্রবাদানুমতির দরাজ সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে অবিরাম খিস্তি করতে করতে এগেন প্রমিস (এবারে এক্কেবারে ক্ষত্রিয় টাইপ প্রমিস বুইলেন কিনা মশাই) পর্যায় চলছে মনে ।

তো বিরহ অতি বদ জিনিস । এমনি বিবাহিত লোকেদের বউ দুদিন বাপের বাড়ি গেল কিম্বা নবীন প্রেমী যুগলের (নবীন বললুম কারণ প্রেমের প্রবীণত্বের পরিণতির ভুক্তভুগী তো) বিরহ বেশ অম্ল-মধুর একটা জিনিস । কিন্তু “প্রাক্তন প্রেমিকা পাত্তা দিচ্ছেনা, সম্ভবতঃ অন্যকারুর সাথে মাল্টিপ্লেক্সে বসে পপকর্ণ খেতে খেতে নিউ রিলিজড সিনেমা দেখছে” এই টাইপের বিরহ অত্যন্ত অস্বস্তির একটা ব্যাপার যেটা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অনর্থক একটা বিরাগ তৈরি করে দেয় । যদিও সেটা গোপন অনুরাগের একটা রূপভেদ মাত্র তবুও সেই বিরাগ প্রথম প্রথম বাঁশের কেল্লার মতই আবেগদুর্ভেদ্য থাকে ।

তো বিরাগের সার্বক্ষণিক আঘাতে এবং এমনিতে অবদমিত কিন্তু অদৃশ্য প্রতিপক্ষ রিপ্লেসমেন্টটির প্রতি অসূয়াবশতঃ সহসাজাগ্রত শরীরের উৎপাতে তিতিবিরক্ত হয়ে একদিন গিয়ে হাজির হলুম বেণুদার আস্তানায় ।

বেণুদা লোকটি অত্যন্ত্য জ্ঞানী একজন ব্যক্তি । শুধু আনন্দ ঘন্টা জাতীয় মিডিয়ায় সশব্দ উপস্থিতির জন্য আবশ্যকর্ম তাঁবু বহন করে পশ্চাদানুসরণের পটুত্ব না থাকায় বাঙালী তাকে সেইভাবে চিনল না । তাতে অবশ্য তাঁর বিশেষ দুঃখ নেই । পেশায় ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার বেণুদা নির্দিষ্ট কোনো চাকরী করেন না । এখনও পর্যন্ত আমার জানা মতে ১৬ টি চাকরী ছেড়েছেন । এখন সম্ভবতঃ ১৭ নম্বরটির জন্য রেডি হচ্ছেন । চাকরী যে নিজেই ছেড়েছেন তা ১৬টি চাকরীর বিরাট লিস্ট দেখলেই বোঝা যায় । আসলে তাঁর অনন্যসাধারণ মেধার কথা কম্পানীগুলি ভাল ভাবেই জানে । তাই চাকরী ছাড়তে তাকে বিস্তর বেগ পেতে হলেও পেতে কোনো সমস্যা হয় না । চাকরীর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মৌলিক গবেষণা মাঝে মাঝে আমরা ইন্টারনেট ও ফেসবুকের কল্যাণে জানতে পারতাম । চাকরী সূত্রে মাঝে মাঝেই ভিন রাজ্যে উধাও হয়ে যাওয়া এবং আস্তানা পাল্টানো বেণুদার স্বভাব ছিল ।

তা গেছো দাদা কোথায় আছে পদ্ধতিতে রীতিমত হজবরল নেটওয়ার্ক খাটিয়ে বের করলুম গুজরাটের ১৬ নম্বর চাকরীটিতে ইস্তফা দিয়ে বাংলায় ফিরে ইদানিং তিনি বেহালার পৈত্রিক বাড়ির বদলে আমাদের পুরাতন আনন্দক্ষেত্র, কলেজস্মৃতি বিজড়িত বেলঘড়িয়ায় একটি মেস ভাড়া করে বসবাস করছেন ।

মনের জ্বালা মেটাতে একদিন তাই বুড়ো সাধুর একটা পাঁট নিয়ে চললুম গুরুর কাছে । বেণুদা আমাকে দেখেই স্বভাবসিদ্ধ ভাবে খিস্তিয়ে আনন্দ প্রকাশ করল । দুপুরে জমিয়ে শূল্যপল সহযোগে ভাত আর বুড়ো সাধুর উত্তাপ নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু হল । প্রেমের অসারতা সম্পর্কে বেণুদা আমার সমস্ত সংশয় দূর করে দিল । ভেনডায়াগ্রামাদি করে এবং রীতিমত ক্যালকুলাশ কষে আমায় বুঝিয়ে দিল । প্রেম আসলে অগাণিতিক শূন্যের মতই একটা অসম্ভব বস্তু । বাংলা গল্প ও বিদেশের নানা কাহিনীর বিপথগামী নায়ক নায়িকাদের দৃষ্টান্ত ও তাঁর বক্তব্যকেই সমর্থন করল । জগতে প্রেমের আসল চরিত্র আমার কাছে একেবারে জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল । বেদে যেমন বলেছে “ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা” তেমনি “অভিনয় সত্য, প্রেম মিথ্যা” এ বিষয়ে আমার আর কোনো সংশয়ই রইল না । যাক দোলাচলে দোলার চেয়ে এ একরকম ভাল হল । এখনও ভালবাসে কি ভালবাসেনা ভাবতে ভাবতে প্রাত্যহিক হোয়াটসঅ্যাপের স্টেটাস চেক আর ফেসবুক ওয়াল আঁতিপাতি করে খোঁজার চেয়ে এ সত্যোপলব্ধী অনেক ভাল ।

বেশ হৃষ্ট চিত্তে সিগারেট টানতে বারান্দায় গেছিলাম । এসে দেখলাম বেণুদা মোবাইলে কার সঙ্গে যেন খুব হাসিখুশী ভাবে কথা বলছে । ফোন রাখার পরে আমার প্রশ্নের উত্তরে নির্বিকার ভাবে বলল “তোর হবু বউদি ফোন করেছিল” ।

আমি বিস্ময়ের চোটে প্রায় সাতহাত বাঞ্জি জাম্পিং এর মত লাফ দিয়ে বললাম, “মানে ???? তুমি ই না এই মাত্র আমায় প্রমাণ করে দেখালে যে প্রেম ট্রেম সব অসার । থিওরিটিক্যালি অসম্ভব জিনিস !!! আবার সেই তুমি তুমি এখন ……”

অত্যন্ত্য বিজ্ঞ মুখ করে বেণুদা বলল “তো কি হয়েছে !!!, তুই একটা আস্ত পাঁঠা । ওটা থিয়োরী, এটা বাস্তব । ওটা যুক্তি, এটা বিশ্বাস”

***********************

দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সেই মুহুর্তে বেণুদার চুরুটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে চলে এসেছি । সেই থেকে আর বেণুদার মুখদর্শন করছিনা, মেসেজের উত্তর ও দিচ্ছিনা । বোদ্ধা লোকজনকে আজকাল যদ্দুর পারছি এড়িয়ে চলছি … হুঃ !!!

একটা পুরোনো লেখা —- প্রথম চাকরী পাওয়ার পর লিখেছিলাম এটা

দিন পনের আগে আমাদের কলেজ থেকে আমাদের জনা ৪০ ছেলে কে একটা কম্পানীর ক্যাম্পাসিংএ পাঠিয়েছিল। ছোটখাট একটা কম্পানী, নাম টেক মাহিন্দ্রা । তো সেখানে গিয়ে আমি ফুল বাওয়ালী করলাম, ইন্টারভিউতে যা নয় তাই ত্যাঁদরামো করলাম, তার পর ও কেন জানিনা কম্পানীটা ৪০ জনের মধ্যে শুধু আমাকেই সিলেক্ট করে গেল । আমাদের কলেজের নিয়ম অনুযায়ী একটা কম্পানীতে পেয়ে গেলে আর পরের ক্যাম্পাসিংএ বসতে দেয় না । তাই এই চাকরীটাই মনে হয় করতে হবে । তো এরা প্রথম পোস্টিং দেবে হায়দ্রাবাদে । জুলাই আগস্ট নাগাদ জয়েনিং ।

যাই হোক যেটা নিয়ে এই প্রসঙ্গের অবতারণা, জয়েন করলে এটা আমার প্রথম বার হায়দ্রাবাদে যাওয়া হবেনা । এর আগেও বার চারেক গিয়েছি হায়দ্রাবাদে । ওখানকার বাঞ্জারা হিলস স্টুডিওতে একটা কন্নড় আর একটা তেলেগু রিয়েলিটি শো এর অ্যাসিস্টান্ট ডায়রেক্টর (স্পেশাল এফেক্টস) হিসাবে কাজ করতাম ।

তো হায়দ্রাবাদে গেলে মূল সমস্যা হচ্ছে খাবারদাবার । সুটিং ইউনিটের যে খাবারের ব্যবস্থা থাকত সেসব মুখে তোলার মত ছিল না। কি সব বদখত ডাল, তরকারী – যেমন উৎকট তাদের গন্ধ, তেমনি অখাদ্য তার স্বাদ । আর চারদিকে কোথাও একটা ভদ্র বাঙ্গালীর খাওয়ার মত দোকান নেই । সারাদিন অসম্ভব ক্ষিদে পেত, আর শুটিংএর মাঝে যে সামান্য সময় লাঞ্চ ব্রেক দিতো তাতে পাহাড় থেকে নেমে খোঁজাখুঁজি করে দোকান বের করে খাওয়াদাওয়া করা সম্ভব হত না । তা প্রথম কয়েকদিন তাই শুটিং ইউনিটের লাঞ্চ থেকে গুড্ডির (ডিমের) তরকারী থেকে গোটা দুয়েক ডিম তুলে নিয়ে সেটাকে বেশ করে জল দিয়ে ধুয়ে নিয়ে সেই ডিম আর সামান্য নুন দিয়ে ভাত মেখে খেতাম । সন্ধ্যের টিফিন টা সারতাম পাহাড়ের ওপরেই ছোট ছোট গুমটিতে বিক্রি হওয়া উকমা আর বিভিন্ন ফলের রস দিয়ে, সাপোটা (সবেদা), খরমুশা (ফুটির মত একরকম ফল) এগুলোর রস আমার ভীষণ প্রিয় ছিল । কোনো কোনো দিন শখ করে ভেলপুরী, চাটমশালা ও একটু আধটু খাওয়া হয়ে যেত । যে থ্রীস্টার হোটেলটায় আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সেটা ছিল স্টুডিও থেকে বেশ দূরে, পাহাড়ের নীচে, সমতলে । যদিও ফেরার জন্য গাড়ী ছিল তবুও শুটিং সেরে ফিরতে ফিরতে প্রায় ১০টা – ১১টা বেজে যেত । সেই সময় আর হোটেল খোঁজার উপায় বা এনার্জী কোনোটাই থাকতো না । তাই ওখানের বিখ্যাত সুইট ব্রেড উইথ অ্যাডেড ফ্রুট দিয়েই ডিনার টা সারতে হত । সে এক নিরস খাওয়া দাওয়া । এরকমই চলছিল, তো একদিন স্টুডিওতে ডায়রেক্টর সূরিয়াকীরণ জী আমার হালতের কথা জানতে পেরে আমাকে বললেন “আরে বোকা, তোমার হোটেলের পেছনেই তো ভালো একটা রেস্টুরেন্ট আছে … সেটা প্রায় সারা রাত খোলা থাকে। সেখানে যাওনি কেন ?” কী করে তাঁকে বোঝাব যে ভাষা কত বড় সমস্যা হতে পারে ! যাই হোক সেদিনই রাত্রে চলে গেলুম সেই রেস্টুরেন্টে , হোটেলের পেছনদিকটায় বলে আমার এতদিন চোখেই পড়েনি । একটা থালী অর্ডার করলাম, মনে মনে ভাবলাম দেখা যাক কী অখাদ্য নিয়ে আসে… কিন্তু যেটা এল সেটা দেখে আমার অবাক হওয়ার পালা । খুবই তৃপ্তি করে পেট ভরে বহুদিন পরে ঠিক-ঠাক খেয়েছিলাম । সেই প্রথম থালীটার একটা ছবি তুলে রেখেছিলাম, বহুদিন পরে সেটার কথা এই হায়দ্রাবাদ প্রসঙ্গে মনে পড়ল, আপনাদের সঙ্গে অভিজ্ঞতাটা আর সেইসঙ্গে ছবিটা শেয়ার করলাম । আবার তো যেতে হবে হায়দ্রাবাদ, এবার পাকাপাকি ভাবে …

পুনশ্চঃ – হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানীর খুব নাম শুনি, একদিন শখ করে থালীর বদলে সেটার অর্ডার দিয়েছিলুম, এতও অখাদ্য জিনিস বাপের জন্মে খাইনি …

1604932_10201829494208180_8419594962948903046_n 10156098_10201829494168179_3537554675579064120_n

বাঁশ

চাদ্দিকে প্রচুর বাঁশের মড়মড়ানি শুনতে পাচ্ছি । তো এই পোসোঙ্গে ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল ।

পড়ন্ত বেলার ভাঙা জমিদারবাড়ি কেমন হয় দেখেছেন তো ? আমার মামারবাড়ি বলতে তার একটা একজ্যাক্ট এগজাম্পেল চোখে ভাসে এখনও । তা বছর শ দুই আগে যখন অবস্থা ভাল ছেল, বুইলেন কিনা তখন পাশাপাশি দুই তালুকের জমিদার একদম তাদের তালুকের শেষ প্রান্তে বাড়ি করেছিলেন । যাতে একে অপরের ওপর নজরদারী করা যায় এবং টেক্কা দেওয়া যায় ।

যাই হোক, সেসব তো পুরোনো কথা । এখন সেই রামও নেই, অযোধ্যাও নেই ।

এই খেয়েছে, সরি দাদা ভুল করে ওসব “সাম্পোদায়িক শব্দ” লিখে ফেল্লুম । কিছু মনে করবেন না । আমি কিন্তু মৌল, যৌগ, মাও কোনোটার ই বাদী পক্ষ নই ।

তো দুপক্ষেরই সেই বিশাল জমিদারী ইদানিং দুটো বটে খাওয়া লাল ইঁটের পাঁজর বারকরা ধ্বংসস্তূপ আর কয়েকটা পুকুর, কয়েকটা আমবাগান, ১০ – ১২ বিঘা জমি আর কটা বাঁশ বাগানে এসে ঠেকেছিল ।

তো একবার দাদুর কিছু একটা কাজের জন্য বাঁশের কয়েকটা মই লাগবে । কিন্তু দাদুর বাঁশ বাগানে কয়েকদিন আগেই বেড়া দেওয়ার জন্য বাঁশ কাটায় ভাল বাঁশ নেই । তো বাধ্য হয়ে দাদুকে ওতরফের সুন্দরগোপাল দাদুর কাছে যেতে হত । ওদের বাঁশ বাগানে বেশ ভাল ভাল পাকা বাঁশ রয়েছে ।

দাদু গিয়ে বলল “সুন্দর তোমার বাঁশ বাগানে তো অনেক বাঁশ রয়েছে । আমায় গোটা কুড়ি দাও, খুব দরকার, চাষের মই গুলো একদম নষ্ট হয়ে গেছে, মুনিষরা তাগাদা করছে, বলছে ভাল মই না দিলে কাজ করবেনা আজ থেকে । এই কটা দাও আপাতত, তুমি আমার বাগানের থেকে পরে নিয়ে নিও ।”

সুন্দর দাদু উত্তর দিলেন, “বিশ্বনাথ দা, আমার যে বাঁশ এখন খুব দরকার । আমার গোয়াল গুলো একটু মেরামত করতে হবে । তার পর পূব সিমানার মাটির ঘর গুলো ও পড়ে যাবে একটু দেখভাল না করলে । তারপর একটা গরুর গাড়ি ও বানাতে হবে নতুন । আপনাকে কী করে দিই বলুন তো”

দাদু বলল, “সুন্দর তোমার তো অতবড় বাগান অত বাঁশ, তোমার এই এত সব কিছু করেও তো আদ্ধেক বাগান ভর্তি থাকবে । আমায় কটা দিলে তোমার এমন কিছু ক্ষতি হবে না”

সুন্দর দাদুর চট জলদি উত্তর ” না দাদা, কিছু বাঁশ তো রেখেও দিতে হবে । কখন কার পিছনে দিতে দরকার পড়ে”

অত্যন্ত ক্ষেপে দাদু সুন্দরদাদুর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে আমায় বলল, “দেমাক দেখলি । ঐ যে এবারের দূর্গাপূজোয় কলকাতা থেকে গানের আর্টিস্ট আনিয়েছিলুম, তার শোধ নিল । হিংসা, হিংসা । হাতি কাদায় পড়লে চামচিকিতেও লাথি মারে বুঝলি । আচ্ছা আমিও দেখব, এক মাঘে তো শীত যায় না । চঃ আপাতত কেশবচকের আড়তটা একটু ঘুরে যাই, যদি বাঁশ পাওয়া যায় ।”

কেশবচকেও বাঁশ পাওয়া গেল না । তবে তারা প্রতিশ্রুতি দিল যে দুদিন পরে এলে অবশ্যই পাওয়া যাবে ।

যেতে যেতে দাদু বলল, “পাওয়া যখন গেলনা কিছু তো করার নেই, মুনিষগুলো এই দুদিন না হয় বসেই থাকুক, কী আর করা যাবে । বাঁশের দামটাও বড় বেশী পড়বে, এই আড়তটা পাক্কা গাঁটকাটা, কিন্তু কিছু করার ও নেই কাছাকাছি কোথায়ই বা আর পাব ? যাক সেসব ছাড়, আজ সকালে যে কাতলাটা উঠেছে দেখেছিস । পেল্লায় মাছ । তাড়াতাড়ি চল আজ ওটার মুড়ো দিয়ে নিশ্চই মুড়িঘন্ট রাঁধবে তোর দিদা । পা চালিয়ে চল, গিয়েই পুকুরে ডুবটা দিয়ে খেতে বসে যাব । ”

বাড়ি ফিরে মজুর গুলোর একটাকেও দেখতে না পেয়ে দাদু দিদাকে জিজ্ঞাসা করল ” কি গো ? মুনিষ গুলো কি বাড়ি চলে গেল নাকি ?”

দিদার ঝামটা, ” ক্ষ্যাপার মরণ, বাড়ি যাবে কি জন্য শুনি ? তোমার পাঠানো মই গুলো নিয়ে ক্ষেতে গেছে ।”

এবার দাদুর মুখ ভ্যাবলা ” আমার পাঠানো মই !!!!!”

“ন্যাকা, এই তো খানিক্ষণ আগে সুন্দরঠাকুরপো কটা মুনিষ নিয়ে এসে তিনটে মই দিয়ে গেল । বলে গেল তুমি ওকে দিয়ে যেতে বলেছ । আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পও করে গেল ।
বলল ওর চাষটা এবারে বন্ধ রেখেছে, মই টই ওর এখন লাগছে না, আরও কিছু দরকার হলে গিয়ে বলতে বলেছে । আরও বলছিল কি সব গোয়াল – টোয়াল মেরামত করবে ।
আমি তখন মুড়িঘন্ট রাঁধছিলাম । তো বলল বৌঠানের হাতের রান্না সত্যি ই ঘ্রাণেন অর্ধ ভোজনম । তা আমি মুড়ি ঘন্টটা আর মাছের কালিয়ার থেকে গোটা পাঁচেক দাগা ওর বাড়ির জন্য দিয়ে দিলাম । বড় ভাল মানুষ । তোমার মত কুঁদুলে নয় ।”

দাদু ব্যাজার মুখে বিড়বিড় করে বলল, “সুন্দর হতচ্ছাড়া এই ভাবে আমায় বাঁশ দিলি !”

************

বাঁশ দেওয়া আমাদের বাংলার অতি প্রাচীন একটি ট্র্যাডিশন এবং সেটি সমানে চলছে শুধু হারিয়ে গেছে বাঁশে বাঁশে ঠোকাঠুকির পরও মিষ্টিমুখ করে “মধুরেণ সমাপয়েৎ” করার ঐতিহ্য ।

D + R

সে অনেকদিন আগের কথা । তখন ও সাদা হাফশার্টের সঙ্গে খাঁকি ফুল প্যান্টের অনুমতি মেলেনি । স্কুল কর্তৃপক্ষের এই অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের মানসিক প্রতিবাদ করতে করতে ক্লাস ফোরের আমি অজিত কাকুর ভাড়া রিক্সায় স্কুল যেতাম । স্কুল শেষে আবার রিক্সার ওপর চাপানো কাঠের এক্সট্রা বেঞ্চিতে বসে বাড়ি । প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিনে একমাত্র নুন-ঝাল-মশলা চাটতে পারতাম আমার জন্য বরাদ্দ নির্দিষ্ট সময়টুকুতে হামলে পড়ে “কারেজ দ্য কাওয়ার্ডলি ডগ”, “স্কুবি ডু”, “পপাই” বা “টম এন্ড জেরী” দেখায় । এর মধ্যেই সিন্থাসাইজার শেখার ক্লাসে একদিন পরিচয় হল রোজির সঙ্গে । ও শিখত অরগ্যান । আমারই বয়সী, রাজা রোডের কাছে থাকে ।

আস্তে আস্তে আমি জানতে শুরু করলাম ওর পছন্দের খাবার, পছন্দের ড্রেস, পছন্দের কার্টুন প্রায় সবকিছু এবং দুজনেই সবিস্ময়ে লক্ষ করতে লাগলাম আমাদের পছন্দ, অপছন্দের তালিকাটা যেন কার্বণ কপি করা । বন্ধুত্বটা আমাদের একঘেয়ে রুটিনের মধ্যে একটা ওয়েসিসের মত ছিল । প্রতি সপ্তাহে ওই একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করা আর কথা জমিয়ে রাখা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছিল । দিনগুলো আমাদের অজান্তেই অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল । বড়দিনের উৎসবের ঠিক আগে রোজি বলল, “এই সানডে কিন্তু আমি আসব না, এই কার্ডটা ধর”। মনটা মিইয়ে গেল । সামনে খুললে যদি হ্যাংলা ভাবে তাই রোজি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াতাড়ি খাম থেকে বের করে কার্ডটা খুললাম — উইলমল্ট ফ্যামিলি তাদের ক্রিস্টমাস ইভে আমাকে নেমন্তন্ন করেছে । কার্ডটা দোকান থেকে কেনা, তবে ছোট ছোট করে কাটা রিবন ভাঁজ করে আঠা দিয়ে লাগিয়ে কার্ডটা দারুন সাজিয়েছে রোজি । লেখাটাও ওর । কি সুন্দর ছাপার মত হাতের লেখা ওর । কার্ডটা যত্ন করে খাতার ভাঁজে রেখে বাড়ি ফিরলাম । ক্রিসমাসের অপেক্ষা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষন মনে মনে ।

ক্রিসমাসের দিন গেলাম ওর বাড়িতে । অজিত কাকুকে বলা ছিল, রিক্সায় করে আমাকে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে । খুব মিশুকে পরিবার । আঙ্কেল আন্টির সঙ্গে পরিচয় হল । রোজির ঘর দেখলাম । কত সুন্দর সুন্দর ছবি । দেখে আমার তো চোখ কপালে — আরিব্বাস কী সুন্দর ছবি আঁকে মেয়েটা !!! শুধু একটাই জিনিস দেখলাম বাজে, ঘরের একদিকের দেওয়ালে হিজি-বিজি আঁকিবুকি কেটে ভর্তি করেছে । কোনো জায়গায় নটিলাসের ছবি আঁকা, কোথাও ভূত প্রেত আঁকা, কোথাও নামতা লেখা, কোথাও ডি + আর লেখা কোথাও আবার পপাই – অলিভ আঁকা । আমার বাবা মা ছোট বেলা থেকে আমায় বুঝিয়েছিল যে দেওয়াল নোংরা করতে নেই । রোজি বোধ হয় ওসবের ধার ধারত না । রোজি, ওর কয়েকজন কাজিন আর পাড়ার বেশ কিছু ছেলে মেয়ে প্রচুর হুল্লোর হল । সে এক দারুণ মজার ব্যাপার । পার্টি শেষ হলে আবার অজিত কাকুর রিক্সায় বাড়ি ।

একসঙ্গে বড় হতে হতে ক্লাস ফাইভে উঠলাম । আমার নামটা নিয়ে রোজির ছিল ঘোর অনীহা । বলত “কী শক্ত নাম” । বলত, “তার চেয়ে তোকে ডেভিড বলে ডাকব, আমার দিদির এক বন্ধুর নাম আছে ডেভিড, কি সুন্দর নাম” । আমি আবার নিজের পিতৃদত্ত নাম বজায় রাখার ব্যাপারে এককাট্টা ছিলাম । রোজি তর্কে পারত না । লাস্টে আমায় খুশী করার জন্য “শতদূর” জাতীয় কিছু একটা বলে ডাকত । আমার শুনে হাসি পেয়ে যেত ।

রোজি আর আমার মধ্যে অদ্ভুত সব বিষয় নিয়ে কথা হত । যেগুলো অন্য কাউকে বলা যেত না । যেমন আমাদের প্ল্যান ছিল জলের তলায় কাঁচ দিয়ে ঘেরা একটা শহর বানাবো যেখানে সব কিছু থাকবে । কখনও প্ল্যান করা হত আমরা বড় হয়ে একটা সাবমেরিন বানাবো যেটায় নটিলাসের মত সব জিনিস পত্র থাকবে । আসলে আমার গিফট পাওয়া একটা জুলে ভার্ণের বই তখন দুজনে মিলে একসঙ্গে পড়ছি তো ।

এই করতে করতে চলে এল ১৩ই সেপ্টেম্বর । রোজির জন্মদিন । সেবারে ওর জন্মদিন বড় করে সেলিব্রেট হবে । বাবা গিফট দেওয়ার জন্য বিরাট বড় একটা সাদা টেডি কিনে এনে দিল । কপাল এমন, সেই দিনই বিকেলে পাড়ার ফাংশানে আমাকে বাজাতে বলল । অতি বিরক্তি সহকারে “পুরানো সেই দিনের কথার” মুখস্ত করা সুর নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে দেখলাম, অজিত কাকু আসেনি । কিন্তু যেতে যে আমায় হবেই । অন্য রিক্সা ভাড়া করে চললাম । চুমকি অনুষ্ঠানগৃহ বিটিরোডের একদম পাশেই ।

রিক্সা থেকে নামার পরই সুর কেটে যাওয়ার গন্ধ যেন বাতাসে ভর করে আমার অবচেতন মনকে সজাগ করে তুলল । চারিদিকে অবিন্যস্ত অথর্ব লোকজন আর টেবিলের ওপর না কাটা কেক । যেটুকু কানে এল তার বেশী কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস না করে অন্ধের মত ছুটলাম বলরামের দিকে । রিক্সা ধরার কথা মনে নেই । পায়ের চটি খুলে বেরিয়ে গেছে । পাশ দিয়ে হু হু করে ছুটে যাওয়া গাড়ি । আমার চোখ যেন সব দেখেও অন্ধ হয়ে গেছে ।

বলরামে পৌঁছেই ছুটে ভিতরে ঢুকে কিছুটা চেনা মুখের ভিড় গুলোর জটলায় প্রাণপণে নিজেকে গুঁজে দেওয়ার অদম্য চেষ্টা থেকে রোজির কাকার বলীষ্ঠ হাতও আমায় আটকাতে পারল না । থেঁতলে যাওয়া ছোট্ট একটা দেহ । টকটকে ফর্সা মুখটা আর কোনো দিনও দেখতে পাবোনা এই চরম সত্যিটা বাস্তব আমার প্রতি মুহুর্তে অস্বিকার করা মনে গেঁথে দিচ্ছিল । পাশ থেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়া আন্টির অস্ফুট গলার স্বর ” সেই তো এলি বাবা এত দেরী করে ফেললি । ও যে তোর আসার জন্য কেকটাও কাটেনি” আমার কানে ঢুকলেও মাথায় যাচ্ছিল না ।

আর কখনও সিন্থ বাজাই নি । জানি কখনও বাজাতেও পারব না ।

দিন কয়েক আগে গিয়েছিলাম সিমেট্রিতে । মাঝে মাঝেই যাই । “হিয়ার লাইস রোজি উইলমল্ট, আ লিটল অ্যাঞ্জেল” । সিমেট্রির পাশে বেঞ্চে বসে থাকি । সেদিনও বসে আছি । একটু দূরে দুটো সেভেন এইটের ছেলে মেয়ে একটা দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে । ওরা আমাকে দেখতে না পেলেও আমি ওদের দেখতেও পাচ্ছি । কথাও শুনতে পাচ্ছি ।

ছেলেটা বলছে “এই নে এই পেন্ডেন্ট টা তোর জন্য জাবং থেকে অর্ডার করে আনিয়েছি । দেখ এটাকে আলোয় ধরলে দেখতে পাবি ভেতরে একটা লেখা এমবেড করা আছে, আমার আর তোর নামের ফার্স্ট লেটার দুটো” । মেয়েটা পেন্ডেন্ট টা উঁচু করে দেখে বলল ” হ্যাঁ দেখতে পেয়েছি, D + R, হ্যাঁরে দীপ আমার নাম তো সংঘমিত্রা, তাহলে এস না দিয়ে আর দিয়েছিস কেন ??? এটা অন্য কারুর জন্য আনিয়েছিলিস ??? সত্যি করে বল” দীপ নামের ছেলেটি হেসে হেসে বলছে “তুই তো আমার রিয়া” তোকে আমি সংঘমিত্রা বলে ডাকবই না, কী লেন্দী নাম, হুস”

হঠাত করে অনেকদিন আগেকার একটা ফিরোজা কালারের দেওয়াল আর তাতে ছাপার মত সুন্দর হাতের লেখায় লেখা কয়েকটা লেটার চোখের সামনে ভেসে উঠল ।

শীত পড়ে গেছে । সিমেট্রীর শুকনো খটখটে পাথর গুলো শিশিরে ভিজতে শুরু করেছে ।

দেওয়ালের সেই আঁকিবুকি গুলো আজ আর অর্থহীন মনে হচ্ছে না ।

হারমোনিয়াম

একটা বহু পুরোনো হারমোনিয়াম। দিদা দাদু তারকেশ্বরের বাড়ি বিক্রি করে চলে আসার পর নতুন “মামার বাড়ি” তে এলিগ্যান্ট মামীর আদেশে ওই অপ্রয়োজনীয় জঞ্জালটার ঠাঁই না হওয়াতে নিয়ে এসেছিলাম আমার বাড়ি । প্রতি দিনই ইচ্ছা হত ওটা সারিয়ে একবার যদি সুর বাঁধতে পারি তবে বেশ হয় । কিন্তু যন্ত্রটা বোধ হয় মানুষের অবহেলাতে অভিমান করে চিরদিনের মত নীরব হওয়ার পণ করেছিল । তাই প্রথম প্রথম একটু আধটু খুটখাট করার পরও তার অভিব্যক্তির কোন প্রকাশ ঘটাতে পারিনি সুরের ভাষায় । তাই পড়ে ছিল । মাঝে মাঝে দেখতাম মা তার ধূলো ঝেড়ে দিচ্ছে । সুর বাজবেনা জেনেও রিড গুলো নাড়াচাড়া করছে যেন ভুলে যাওয়া অভ্যাসে ।

মাঝে মাঝে মায়ের অন্যমনস্কতার লেন্সে যন্ত্রটার গায়ে একের পর এক ছায়াছবি পড়ত । আমি নিরব বিস্ময়ে মানস দর্শনে কখনও পৌঁছে যেতাম মায়ের ছোট্টবেলার সেকেন্ডহ্যান্ড হারমোনিয়ামের দেহরাখার অবকাশে যেদিন প্রথম বার নতুন অতিথি হয়ে এই ফোরঅক্টেভের গর্বিত মালিকের আবির্ভাব হয়েছিল । আবার কখনও পৌঁছে যাই আঞ্চলিক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থানাধীকারিণীর উচ্ছসিত হাতের স্পর্শে যেদিন ঝকঝক করত ওর বেলোর নকশা । কখনও এইচ এম ভির রেকর্ডিং রুমে । আবার কখনও বাবা ও মায়ের প্রথম দেখার দিন যেদিন দুপক্ষের সম্পূর্ণ অপরিচয়ও দুজনের একই সুরে বাঁধা হৃদয়কে আনন্দবিস্মিত করেছিল, মায়ের কন্ঠে নিজের অজান্তেই অনুরণিত হয়েছিল দুজনেরই প্রিয় গান “নয়ন ভরা জল গো … তোমার আঁচল ভরা ফুল”, সঙ্গতে ছিল এই হারমোনিয়াম ।

সেসব ওর সোনালী দিন । তার পর একদিন পুরোনো খেলামবাটি – বর বউ পুতুলের মত স্মৃতির ভার বুকে চেপে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হল বাক্সের অন্ধকারে । পরিত্যক্ততার আকস্মিক বিস্ময়ে চীৎকার করে ওঠার ক্ষমতা যে ছিলনা ওর, ওর ভাষা যে মানুষের হাতে বাঁধা ।

তারপর বহুদিন পরে ওর ঘুম ভাঙ্গালো এক ঝাঁকড়া চুলের কিশোর । ততদিনে বার্ধক্য গ্রাস করতে শুরু করেছে ওকে । টুপটাপ করে পড়া কাঁচা আম কুড়োনোর গরমের ছুটিতে মামারবাড়ীর একঘেয়ে দুপুরে এককোণে পড়ে থাকা বিরাট বাক্সটার মধ্যে থেকে অনেক কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করা অদ্ভুত যন্ত্রটার রীডে কচি হাত চালানোয় প্রথমে অবাক হলেও ভীষণ খুশী হয়ে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিল ও ।

আর সবচেয়ে অবাক হয়েছিল যখন অনেকটা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া ওর বহুকালের পুরোনো বন্ধু অনেকদিন পরে আবার সযত্নে ওর নতুন বন্ধুকে হাতে হাত ধরে শেখাচ্ছিল ওর মুখে ভাষা ফোটানোর অ – আ – ক -খ স্বরগম । নতুন আনন্দে নতুন আশায় ও যেন ওর বার্ধক্যকে হারিয়ে দিয়ে আবার সুরের ভাষায় একটা গোটা গল্প বলার জন্য ছটফট করছিল ।

কিন্তু সুখ বেশীদিন সইলনা । গরমের ছুটি তো একদিন শেষ হয়ে যায় । মানুষের ওপর চরম বিতশ্রদ্ধ হয়ে ও চিরকালের মত ঘুমিয়ে পড়ল কাঠের চৌকো কফিনটায় ।

যাই হোক মামীর গঞ্জনায় অস্থির হয়ে হারমোনিয়ামটার মতই পরিত্যক্ত বুড়ো বুড়ির ও ঠাঁই হল আমাদের বাড়িতে । সদা উচ্ছল নামকরা শিল্পী বলে খ্যাত দাদুকে দেখলে আজকাল চেনাই যায়না । ঠিক যেন হারমোনিয়ামটার মত । বিতশ্রদ্ধ, নির্বাক, মহাকালের যাত্রী ।

আজকে হাতে কিছুটা সময় ছিল, হারমোনিয়ামটাকে নিয়ে বসলাম । মনে অদম্য জেদ । খুব আদরে হাত রাখলাম ওর অন্তরে । গুটি কয় সন্ত্রস্ত আরশোলার সঙ্গে সঙ্গে আমার ছোট্ট বেলার কিছু সুখ স্মৃতি, বিক্রি হয়ে যাওয়া অত্যন্ত্য প্রিয় বাড়িটার কিছু টুকরো ছবিও যেন আমার দিকে উড়ে এল । শিথীল হয়ে যাওয়া ওর তন্ত্রীতে আন্তরিক আঁট আর আমার অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও অবজ্ঞা ভরে লক্ষ্য করছিল । কিছুটা অবাক ও হচ্ছিল নিশ্চই । আমি ওর কানে কানে বলছিলাম, “আর কখনও তোমাকে কেউ ফেলে রাখবেনা অনাদরে, আমি কথা দিচ্ছি ।”

মনে হয় ওর অভিমানটা কমে এসেছিল, হয়ত ও বুঝতে পেরেছিল ওই ঝাঁকড়া চুল ছেলেটা তখন ছোট ছিল । বায়না করার একটা সীমা ছিল তার । আজ সে বড় হয়েছে, নিজের সিদ্ধান্ত সে নিজে নিতে পারে । তাই বহু দিন পরে অনেক দিনের অনভ্যস্ত কন্ঠে আবার বেজে উঠল তার সুরধুনি । তার সুরের টানে রান্নাঘরের জ্বলন্ত গ্যাসে কড়া ফেলে রেখে ছুটে এল মা । ছাদের রোদের আদর ছেড়ে ছুটে এল কাঠের মত নিশ্চল বুড়োটা ।

তার পর সারাদিন শুধু গান আর গান । যদিও বুঝতে পারছিলাম বহুদিনের অবহেলায় ওর ফুসফুস জখম হয়েছে । আর কোনদিন হয়ত ও আর ওর আগের সুর ফিরে পাবে না । তবুও আজ ওর জন্য দাদু আবার তার যৌবন আর মা কৈশোরে ক্ষণিক হলেও পা রাখতে পারল । জীবনের কষ্ট, অনিশ্চয়তাকে ভুলে কিছুক্ষণের জন্য হলেও এ শুধু গানের দিন ।

এখন আমার ঘরে টেবিলের ওপর বসে ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে, কারণ আমি ওকে বলেছি আমার স্বপ্নের কথা । বলেছি ওকে থাকতেই হবে আর কটা দিন । নইলে আমার অনাগত অতিথিদের সুরের ভাষা শেখাবে কে …

একটা সত্যিকারের থ্রীলার

পূজো এসে গেল প্রায়, আর সেই সঙ্গেই একে একে লেয়ারে লেয়ারে সাজানো-গোছানো, রঙ্গীন বিজ্ঞাপন আর সূতোঝোলানো বুকমার্কের সঙ্গী হয়ে হাজির হল নিত্যনতুন থ্রীলার । যার নায়কের অসাধ্য কিছুই নেই, যাদের প্রবল পরাক্রম গরুকে গাছ তো তুচ্ছ জেট প্লেনে করে পৃথিবীর উন্নততম বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণীর প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহান্তরেও পাঠিয়ে দিতে পারে । যদিও যুগ বদলেছে, অতীতের জয়ন্ত-মাণিক, প্রখর রুদ্রের এক্সপিরিয়েন্স ঝালিয়ে তারা হয়েছে পরিমার্জিত, তার ওপর নেট ঘেঁটে সন্দেহপ্রুফ বিজ্ঞানের রঙ্ লাগিয়ে নিয়েছে এক্সট্রা প্রিকশান ।
যাই হোক এদের সম্বন্ধে কিছুই বলার নেই, কারণ প্রথমতঃ এইসব কাহিনীর স্রষ্টারা আমার শ্রদ্ধেয় গুরুজন এবং দ্বিতীয়তঃ শহরটা কলকাতা আর “সাজানো ঘটনা” একটি রাজনৈতিক টার্ম , যা আমার মত “রাজ” বা “দূর” কোনোরকম নীতিতেই অপারদর্শী লোকেদের কাছে “মার্জার”বাদীত্বের স্বীকৃতি হয়ে উঠতে পারে ।
দেখেছেন ? শিবের গীত করতে গিয়ে ধান ভেনে ফেলছি, তাও আবার যার তার পশ্চাদ্দেশে । আসল কথায় আসি । আজ রসেবশের রসগ্রাহীদের একটা ঘটনা শোনাব । মনে রাখবেন, গল্প না, ঘটনা ।
আমাদের সবার জীবনেই কিছু স্বপ্ন থাকে, গোল নয়, ড্রীমস । যেটাকে টেনে হিঁচড়ে পাওয়ার জেদ বা সুযোগ সাধারণতঃ মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের প্রথম বয়সে থাকেনা । তাই স্বাভাবিক ভাবে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । আমাদের ঘটনাটা একটা ছেলেকে নিয়ে যার স্বপ্নটা অপ্রত্যাশিত ভাবে কিছুটা সত্যি হয়ে গেছিল ।
ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই পাগলাটে, বইপড়ায় খুব ঝোঁক, আবার ডানপিটেমোতেও সবার চেয়ে ওস্তাদ । ক্লাস থ্রী ফোর থেকেই অন্যান্য বিষয়ের থেকে ইতিহাস তাকে বেশী টানত । আদীম মানুষের ক্রমবিবর্তন, ইজিপ্টের পিরামিড, সিন্ধুসভ্যতার মূর্তিটা সব ছিল তার নখদর্পণে । প্রায়দিনই একলা দুপুরে তার খাটটা হয়ে উঠত রাখালদাসের নৌকো, আলনাটা ভেঙ্গেপড়া জিগগুরাটের দেওয়াল আর সে নিজে ন্যাশানাল জিয়োগ্রাফিতে দেখানো তুলি-বুরুশ হাতে আর্কিওলোজিস্ট ।
যেদিন তাকে প্রথম কলকাতার যাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হল, সেদিন তার চোখে সব পাওয়ার ঝিকমিকি, যা তার পরের কয়েকদিন তাকে যেন অন্যকোনও জগতে বিচরণ করাত । আস্তে আস্তে রাখালদাসের নৌকার পাশের দেওয়ালের তাক গুলোর সবচেয়ে নীচেরটায় জমতে লাগল, রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া মূর্তি ভাঙ্গা, চিঠির খামের সঙ্গে আসা ডাকটিকিট আর একটু অন্যরকম দেখতে লাগা কয়েনের দল ।
সময় গড়াচ্ছিল নিজের হিসেবে, ছেলেটার বয়স বাড়ছিল, সাথে সাথে বাড়ছিল পাগলামীটা আঁকড়ে রাখার সাহস । এখন তার ক্লাস ফাইভ আর আজকাল সে সবসময়েই চারপাশে ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে বেড়ায় । যার ফল স্বরূপ তার ছোট্ট সংগ্রহশালা আজ স্থানাভাবে তাক থেকে একটা পুরোনো প্যাকিং বাক্সে স্থানান্তরিত হয়েছে ।
ছেলেটা বছরে দুবার মামারবাড়ী যায়, কালী-পূজো আর পরীক্ষার পরের ছুটিতে, যখন হঠাত করে আসা কালবৈশাখীর উদ্দাম নৃত্যের মাঝে আম কুড়োনো কিশোর মনে জাগায় যুগান্ত প্রাচীন জোগাড়ে মানুষের আদিম আনন্দ । এরকমই এক কালবৈশাখীর দুপুরে আমকুড়োনোর নেশায় মেতে ছেলেটা আম পড়ার শব্দ ধাওয়া করে ঢুকে পড়ে মজা নদীটার পাশের প্রায় দুর্ভেদ্য জঙ্গলটায় । কিছুটা এগোতেই সে যেন তার এতদিনের চরম আকাঙ্খিত মুহুর্তের সম্মুখীন হয় ।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বহু প্রাচীন, জঙ্গলাবৃত একটা ভগ্ন প্রাসাদ । ভয়ডর এমনিতেই ছিলনা ছেলেটার, তায় পাকা মৎসশিকারি যেমন ভুমিকম্প হলেও বিরক্ত হয়ে বলে, “আঃ জলটা নাড়িয়ে দিলে, মাছ পালাবে” তেমনি প্রবল আকর্ষণে আগুপিছু না ভেবে সাপ, বিছের তোয়াক্কা না করে ছেলেটা ঢুকে পড়ল ঐ পোড়ো বাড়িতে, আর অনেক খোঁজাখুঁজির পর কয়েকটা খুব পুরোনো ভাঙ্গা বাসন, একটা কৌটো, দুটো ছোট ছোট তামার পয়সা আর একটা স্বাধীনতার আগের খবরের কাগজের উইয়ে খাওয়া টুকরো নিয়ে বিজয়ীর গর্বে বাড়ি ফেরে, অতি সন্তর্পণে লুকিয়ে রাখে তার প্যাকিং বাক্সে কারণ তার বাবা মা বাড়ির জঞ্জাল পরিস্কারের ক্ষেত্রে খুবই সজাগ ।
এরপর ছেলেটা তার এই “যুগান্তকারী” আবিস্কার সবাইকে জানানোর ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে উঠল, কিন্তু বাড়িতে তো বলা যাবেনা, অগত্যা স্কুলের বন্ধুরা হল তার প্রথম শ্রোতা কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে এই অসামান্য আবিস্কারকাহিনি শুনে বন্ধুরা তাকে এক নতুন খেতাবে ভূষিত করল, “ঢপবাজ” !!!
হাল ছাড়ল না ছেলেটা, বই পড়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বড় বড় সংগঠনগুলিকে চিঠি লিখতে শুরু করল সে । প্রত্যাশিত ভাবেই কোনো উত্তর এলনা কোনো জায়গা থেকেই । কিন্তু নেশা ধরে গেল ছেলেটার, যেকোনো জায়গায় বেড়াতে গেলেই সে আশেপাশে ভাঙ্গা বাড়ির খোঁজ করত, আর প্রায়ই বিভিন্ন পচা কাগজ, টুকরো টাকরা জিনিসপত্র জমতে লাগল তার প্যাকিং বাক্সে । ক্লাস সিক্সের পরীক্ষার পর ছেলেটা মাসির বাড়ি বেড়াতে গেল । প্রত্যন্ত গ্রাম । যাওয়ার আগের দিন বহুদিন ধরে জমানো স্কুল যাওয়ার রিক্সা ভাড়ার টাকা দিয়ে সে একটা স্পীডপোস্ট করল এশিয়াটিক সোসাইটির নামে, মরীয়া হয়ে চিঠির সঙ্গে আঠা দিয়ে জুড়ে দিল তার খুঁজে পাওয়া দু-একটা পচা কাগজ ।
মাসির বাড়িতে এসে ছেলেটা শুনল, তারা খুব ভুল সময়ে এসে পড়েছে, চারদিকে প্রচুর ডাকাতি হচ্ছে । ঠিক হল দুদিন থেকেই আবার বাড়ি ফিরে যাওয়া হবে । যাই হোক ছেলেটা তার কাজ চালিয়ে যেতে লাগল । পৌঁছোনোর পরেরদিন সকালেই সে খোঁজ পেল একটু দূরে বাঁধের ধারে ষষ্ঠীপুকুরের জঙ্গলে একটা বহুপুরোনো রাজার গড় আছে । ব্যাস ছেলেটাকে আর পায় কে । সঙ্গে সঙ্গে ছুট ।
বাড়িটায় ঢুকে আঁতিপাতি খুঁজতে খুঁজতে হঠাত সে কুলুঙ্গীতে রাখা একটা বড়সড় কাঠের বাক্স দেখতে পেয়ে গেল । চেষ্টা চরিত্র করে সেটা খোলার পর তার চোখে গুপ্তধন পাওয়ার আনন্দ, বাক্সের ভেতরে থরে থরে সাজানো প্রাচীন পুঁথি, উইয়ে খাওয়া আর হলুদ হয়ে যাওয়া হলেও তার বেশীরভাগই এখনও গোটা আছে । আনন্দে বিভোর হয়ে যাওয়ায় ছেলেটা খেয়ালই করলনা যে কখন তার পেছনে দুটো লোক এসে দাঁড়িয়েছে । হঠাত করে পেছন থেকে ঘাড় চেপে ধরায় চমকে উঠে ছেলেটা বুঝতে পারল যে সে চরম কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছে । লোকদুটো তাকে জিজ্ঞেস করল যে সে কে, কেন এসেছে, কি করছে ? কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল ছেলেটার মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হল না ।
লোকদুটো বেশী কথার মানুষ নয় বোঝা গেল । একটা লোক বাইরে থেকে একগোছা নারকেল দড়ী নিয়ে এসে কষে বাঁধল ছেলেটাকে, একটা তেলচিটে গন্ধওয়ালা ছেঁড়া গামছা নিয়ে এসে মুখটা চেপে বেঁধে দিল ।
গল্পের গোগোল দের মত ছেলেটা ক্যারাটে বা জুডো জানতনা, কিম্বা তার কাছে কোনো পুলিশ কাকুর দেওয়া বন্দুক ও থাকতনা তাই চমকে যাওয়া ছেলেটার গায়ে কেটে বসে যাওয়া নারকেল দড়ির জ্বালা চুপ করে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না । লোকদুটোর মধ্যে একটা অন্যটাকে বলল “ভাই না এলে তো এ মালের কিছু হিল্লে করা যাবেনা, একে কুঠুরিতে নামিয়ে দে । ভাই এলে দেখা যাবে ভাই কী বলে”।
লোকদুটো ছেলেটাকে নিয়ে একটা অন্ধকার ঘরের এক কোণে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল । ছেলেটা বাইরে লোক গুলোর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল । ওপরের কোন একটা ফুটো থেকে একটু আলো আসছিল, সেই আলোয় ছেলেটা লক্ষ্য করতে চেষ্টা করল সে ঠিক কোথায় । চারদিকে ঝুল আর ভাঙ্গা কাঠের আসবাব পত্র, সাপখোপ লুকিয়ে না থাকাটাই অস্বাভাবিক ব্যাপার । বেশ কয়েকবার বাঁধন খোলার চেষ্টা করে ছেলেটা বুঝল, চেষ্টা বৃথা, উল্টে দড়ি আরও কেটে বসে যাচ্ছে । ডানপিটে ছেলেটার চোখ জীবনে খুব কম বার ভিজেছে, সে বুঝতে পারছিল তার চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে ।
এইভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল, প্রচন্ড জলতেষ্টায় ছেলেটা ছটফট করছিল, ফুটো দিয়ে আসা আলো কমে আসছিল, ছেলেটা বুঝতে পারল সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নামছে । হঠাত বাইরে কথাবার্তা একটু জোড়ে হল, বোঝা গেল আরো কয়েকটা লোক এসেছে । একজনের গলা বেশ উদ্বিগ্ন শোনাচ্ছিল, সে বলছিল, “এক্ষুনি বেরোতে হবে, শালা মামু লেগে গেছে, মাল সব প্যাকিং আছে তো ?” পাশ থেকে একজন বলল “হ্যাঁ ভাই সব ঠিকঠাক, এখান থেকে ট্রেকারে সোজা স্টেশন তাই তো ?” আরেকজন বলল “কিন্তু গুরু একটা কেস হয়েছে, একটা বাচ্চা এখানে কি করতে চলে এসেছিল, ওই কুঠরি তে ভরে রেখেছি বেঁধে বুঁধে, নামিয়ে দেব ?”
ছেলেটার বুক ধ্বক্ক করে উঠল, এতটা সে ভাবেনি । সে মরে যাবে ? তার ওই বাক্সটা তাহলে কী হবে ? মা কে সে আর দেখতে পাবেনা ? ইসস বাড়ি গিয়ে আর ডেক্সটরস ল্যাবরেটরি দেখা হবেনা । ছেলেটা বুঝতে পারল, তার দু চোখ ছাপিয়ে আবার বন্যা নামছে ।
“নাহ, এখন আর লাফড়া বাড়াসনা, ঐ কুঠরিতে রেখেছিস তো, ও এমনিই খালাস হয়ে যাবে কদিনের মধ্যে । এখন আর লেট করিস না, চল” — কিছু ক্ষনের মধ্যে চারদিক নিস্তব্দ হয়ে গেল। এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারদিকে ঝিঁঝির আওয়াজ, জলতেষ্টাটা সত্যিই আর সহ্য করতে পারছে না ছেলেটা । এদিকে টয়লেটও পেয়েছে, অনেক্ষণ চেপে রেখেছে, আর পারছেনা, তলপেট ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায় । নিরুপায় ছেলেটার প্যান্ট ভিজে গেল একটু পরেই । প্রত্যেকবার খড়-খড় করে আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠতে লাগল ছেলেটা, প্রতি মুহুর্তে অপেক্ষা করতে লাগল তীক্ষ দুটো দাঁতের ত্বরিত আক্রমণের । এই ভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল । যেন অনন্তকাল । ডানপিটে ছেলেটা জীবনে প্রথমবার ভয়ে কাঁপতে লাগল, প্রথমবার মনে মনে বলতে লাগল “ভূত আমার পুত…” ইত্যাদি । একটা সময় ছেলেটার মাথাটা কেমন করতে লাগল, মুখ বাঁধা থাকায় সে ভাল করে দম নিতেও পারছিল না, ছেলেটা বুঝতে পারল, সে আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে এক অতল কূপে যেটা বাইরের অন্ধকারের থেকেও গাঢ় ।
কতক্ষণ কেটে গেছে হিসেব নেই, হঠাত করে যেন ক্ষীন হয়ে আসা কিছু দুর্বোধ্য কিন্তু চেনা শব্দ ছেলেটার ঘুম ভাঙাল । ঘরের ভিতরে ফুটো দিয়ে দুপুরের রোদ এসে পড়ছে আর বাড়ির খুব কাছেই যেন কারা তার নাম ধরে ডাকছে । ছেলেটা স্বভাববশে উঁ উঁ করে উঠতেই তার মনে পড়ে গেল যে তার মুখটা বাঁধা । ছেলেটা বুঝল এটা তাকে ভগবানের দেওয়া লাস্ট চান্স । কোনোক্রমে গড়িয়ে গড়িয়ে দরজার কাছে গেল ছেলেটা আর পা, মাথা যা পারল তাই দিয়ে দরজার গায়ে জোড়ে জোড়ে আঘাত করতে লাগল । কয়েকবার আঘাত করেই বুঝল তার কপাল জ্বালা করছে । তবু থামলোনা সে ।
আরো একবার অতল খাদটায় ডুবে যাওয়ার আগে সে এটুকু বুঝতে পারল দরজাটা খোলা হচ্ছে ।
এর মাস ৬-৭ পরের ঘটনা, এশিয়াটিক সোসাইটি ছেলেটিকে তার সাহসিকতার জন্য শংসাপত্র ও আজীবন গবেষক সদস্যের মর্যাদা প্রদান করেছে । তার বর্ণনা অনুযায়ী পুলিশ ডাকাতদলকে খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে । তার বাড়ির লোকজন তাকে প্যাকিংবাক্সের বদলে একটা শোকেশ কিনে দিয়েছে । তার খুঁজে পাওয়া পুঁথি পত্রের অনেকটাই আজ এশিয়াটিক সোসাইটির তত্বাবধানে বহু পণ্ডিতের গবেষণার কাজে লাগছে ।
কী পাঠক ? এর পর স্টোরিলাইনে কী থাকে ? মনে আছে তো ? বাঁধাধরা ছকে লেখা একটা থ্রীলার …
কিন্তু ঘটনার সঙ্গে গল্পের মিল যে সবসময় থাকবেনা সেটাই স্বাভাবিক । সিনেমার পাগলপ্রেমী নায়িকারা যদিও নায়ককে শত দুঃখকষ্টেও ছেড়ে যায়না কিন্তু বাস্তবের বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যেমন “সাজানো-সুখের সংসার আর শনি-রবি বারে স্বামীর হাতধরে সি সি ডি বা সিটি সেন্টারের” মত ঘটনা ঘটে তেমনই ইঞ্জিনিয়ারিং এর সঙ্গে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়ে যাওয়া ছেলেটা আজো প্রথম প্রেমের জমিয়ে রাখা এস এম এসের মত লুকিয়ে লুকিয়ে ইতিহাসের বই পড়ে ।