
আমার ঠাকুমার একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল—রাত বারোটার পর বাড়িতে কোনো গান বাজানো যাবে না।
কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন,
— “যক্ষ-গন্ধর্বেরা আসে।”
আমরা হেসে উড়িয়ে দিতাম। ঠাকুমাও রাগ করতেন না। শুধু বলতেন,
— “হাসিস, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু রাতদুপুরে গান বাজিয়ে তাদের ডেকে আনিস না।”
ঠাকুমা মারা গেছেন দশ বছর হলো।
এখন আমি পেশায় একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। টালিগঞ্জের একটি স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মিক্স করি, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করি, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল বানাই। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার জীবিকা।
আর আজ এই কথাগুলো লিখতে বসেছি, কারণ অনেক দেরিতে হলেও বুঝতে পারছি—ঠাকুমা হয়তো ভুল বলেননি।
মায়ের একটা পুরোনো হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার দ্বারকিন কোম্পানির তৈরি। দাদুর আমলের সেই যন্ত্র বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফেটে গেছে, কয়েকটা রিডও বসে গেছে।
স্টুডিওর এক সরোদবাদক আমাকে চিৎপুরের এক পুরোনো দোকানের ঠিকানা দিলেন।
— “গলিটা খুঁজে পাবেন। দোকানের নাম ‘সুরালয়’। শম্ভুনাথ ওস্তাদকে খুঁজবেন। তবে একটা কথা…”
তিনি একটু থামলেন।
— “ওস্তাদের সব কথা বিশ্বাস করবেন না। আবার সব অবিশ্বাসও করবেন না।”
চিৎপুরের সেই গলিটা এত সরু যে ঠিকমতো রিকশাও ঢুকতে চায় না। চারদিকে বাদ্যযন্ত্রের দোকান, পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ড, পিতলের ঘণ্টা, মন্দিরের সামগ্রী। তাদের মাঝখানে একটি পুরোনো কাঠের দরজা।
উপরে হাতে লেখা সাইনবোর্ড—
সুরালয়
প্রোপ্রাইটর: শম্ভুনাথ চক্রবর্তী
তার নিচে আরও একটি লাইন—
“এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।”
‘সব কিছু’?
শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়?
মনে মনে হেসেছিলাম।
ভেতরে ঢুকেই মনে হলো যেন কোনো বাদ্যযন্ত্রের হাসপাতালের ওয়ার্ডে এসে পড়েছি। দেয়ালজুড়ে ঝুলছে ছেঁড়া বেহালা, ভাঙা এসরাজ, জীর্ণ তানপুরা, ক্ষয়ে যাওয়া সেতার।
ঘরের মাঝখানে নিচু কাঠের চৌকিতে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ।
ধবধবে সাদা দাড়ি, সাদা ধুতি, হালকা গেরুয়া ফতুয়া। চোখে মোটা কাচের চশমা, কানে হিয়ারিং এইড।
ব্যাপারটা আমার চোখ এড়াল না।
যে মানুষের জীবিকা শব্দ, তার নিজের কানই যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল।
আমার বিস্ময় বুঝেই তিনি মৃদু হেসে বললেন,
— “অবাক হচ্ছ?”
আমি কিছু বললাম না।
— “সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুটো শেষ হয়ে গেল। ডাক্তার বলেছে, আর বছর দুয়েক। তারপর সম্পূর্ণ নীরবতা।”
তিনি হেসে যোগ করলেন,
— “তবে আসল শোনা কানে হয় না।”
— “তাহলে কোথায়?”
তিনি নিজের বুকে আলতো টোকা দিলেন।
— “নাড়িতে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
— “শব্দ বলতে তুমি কী বোঝো? কানে শোনার জিনিস? শব্দ আসলে কম্পন। কনসার্টে যখন বেস বাজে, সেটা শুধু কানে শোনো, না বুকেও লাগে?”
আমি হারমোনিয়ামটা তাঁর সামনে রাখলাম।
তিনি ধীরে ধীরে ঢাকনা খুললেন। চোখ বন্ধ করে আঙুল বুলিয়ে দিলেন রিডগুলোর উপর। যেন কোনো অভিজ্ঞ বৈদ্য রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করছেন।
খুব আস্তে বললেন,
— “আহা… কতদিন কেউ বাজায়নি।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “ঠিক করা যাবে?”
— “যাবে। তবে একটা শর্ত আছে।”
আমি তাকিয়ে রইলাম।
— “আমি যন্ত্র বাঁধি চারশো বত্রিশে। তোমাদের স্টুডিওর চারশো চল্লিশে নয়।”
আমি ভুরু কুঁচকে বললাম,
— “চারশো বত্রিশ? A=432 Hz?”
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু এখন তো সারা পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ৪৪০ হার্টজ।”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ মাথা নাড়লেন।
— “জানি। উনিশশো ঊনচল্লিশ সাল থেকে। কিন্তু তার আগে?”
আমি চুপ করে রইলাম।
— “হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর নানা সভ্যতায় সুরের মাপকাঠি ছিল আলাদা। গ্রিকদের কথা শোনা যায়, মিশরীয়দের কথাও। আমাদের ধ্রুপদী সঙ্গীতেও নির্দিষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক মান ছিল না। তবু মানুষের গান ছিল, রাগ ছিল, ভক্তি ছিল। তারপর একদিন মানুষ ঠিক করল—এবার থেকে সবাই একই স্বরে গান গাইবে।”
তিনি রিডটা আলোয় তুলে ধরে দেখলেন।
— “আমি ইতিহাস নিয়ে তর্ক করি না। শুধু একটা জিনিস খেয়াল করেছি। চারশো বত্রিশে বাঁধা যন্ত্র শুনলে আমার মনে হয় নদীর ধারে বসে আছি। আর চারশো চল্লিশে শুনলে মনে হয় কেউ যেন কোথাও পৌঁছে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে তাড়া দিচ্ছে।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— “এটা কি বৈজ্ঞানিক সত্যি, না ব্যক্তিগত অনুভূতি?”
তিনি বিন্দুমাত্র বিরক্ত হলেন না।
— “হতে পারে শুধু অনুভূতি। কিন্তু অনুভূতিকেও তো একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। আমরা মানুষ—মেশিন নই।”
কথাটা শুনে আমার আপত্তি আর জোরালো হলো না।
স্টুডিওতে কাজ করতে গিয়ে আমিও অদ্ভুত কিছু জিনিস লক্ষ্য করেছি। কিছু মিক্স শেষ করার পর অকারণ ক্লান্ত লাগে, আবার কিছু ট্র্যাক শোনার পর শরীর অদ্ভুত হালকা হয়ে যায়। কেন হয়, কোনোদিন ভেবে দেখিনি।
ওস্তাদ যেন আমার মনের ভেতরটা পড়ে ফেললেন।
— “নিকোলা টেসলার নাম শুনেছ?”
— “অবশ্যই।”
— “তিনি বলেছিলেন, মহাবিশ্বকে বুঝতে হলে শক্তি, কম্পন আর তরঙ্গের ভাষায় ভাবতে হবে। সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে কথাটা আমার ভালো লাগে। কারণ শেষ পর্যন্ত সবকিছুই কাঁপে। মাটি, জল, বাতাস, তোমার শরীর, এমনকি চিন্তাও।”
তিনি মৃদু হেসে যোগ করলেন,
— “আমার গুরু বলতেন, পৃথিবীটা যেন এক বিশাল তানপুরা। আমরা প্রত্যেকে তার একটি করে তার। যতক্ষণ নিজের সুরে আছি, ততক্ষণ মিল আছে। একেকটা তার বেসুরো হলে গোটা সঙ্গীতটাই বদলে যায়।”
আমি এবার আর প্রতিবাদ করলাম না।
লোকটার কথায় বিজ্ঞান, দর্শন আর লোকবিশ্বাস এমনভাবে মিশে থাকে যে কোথায় যুক্তি শেষ হচ্ছে আর কোথায় বিশ্বাস শুরু হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন।
ঠিক তখনই তিনি আবার বললেন,
— “পৃথিবীরও একটা নিজস্ব কম্পন আছে। বিজ্ঞানীরা তাকে শুম্যান রেজোন্যান্স বলেন। আমার গুরু বলতেন, ওটাই পৃথিবীর মন্ত্র। গাছ, নদী, আকাশ, পাথর—সবাই সেই মন্ত্রে সাড়া দেয়। শুধু মানুষই নিজের কোলাহলে তাকে শুনতে পায় না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “আপনি শুনেছেন?”
প্রশ্নটা শুনে তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— “সাত দিন পরে এসো। তোমার হারমোনিয়াম তৈরি থাকবে।”
আমি বুঝলাম, উত্তরটা তিনি ইচ্ছে করেই দিলেন না।
এরপর থেকে প্রায়ই সুরালয়ে যেতে শুরু করলাম।
কাজ থাকুক বা না থাকুক।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ চা খাওয়াতেন, গল্প করতেন। সঙ্গীত নিয়ে, শব্দ নিয়ে, কখনও ইতিহাস, কখনও এমন সব তত্ত্ব নিয়ে, যেগুলো শুনলে মনে হতো অর্ধেক বিজ্ঞান, অর্ধেক সাধনা। বাড়ি ফিরে আমি সেগুলো যতটা মনে থাকত, লিখে রাখতাম।
সুরঞ্জনার সঙ্গে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে।
সেদিন দোকানে ঢুকেই বুঝলাম, ওস্তাদ নেই। তাঁর জায়গায় কাঠের চৌকিতে বসে আছে এক তরুণী। কোলে বেহালা। চোখ বন্ধ। বাঁ গালটা আলতো করে ঠেকানো যন্ত্রের গায়ে।
সে বাজাচ্ছিল।
সুরটা কোনো রাগ বলে চিনতে পারিনি। শুধু মনে হচ্ছিল, বহুদিনের চাপা ক্লান্তির উপর দিয়ে কেউ যেন ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আমি দরজায় দাঁড়াতেই চোখ না খুলেই সে বলল,
— “বসুন। দাদু ওষুধ আনতে গেছেন।”
আমি চুপচাপ বসে পড়লাম।
আরও মিনিটখানেক সে বাজিয়ে গেল। তারপর চোখ খুলে প্রথমবার আমার দিকে তাকাল।
— “আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার?”
আমি হেসে বললাম,
— “সম্ভবত।”
— “দাদু আপনার কথা বলেন।”
— “আশা করি ভালো কথাই বলেন।”
তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
— “বলেন, ছেলেটার কান আছে। শুধু কানের ব্যবহার এখনও শেখেনি।”
আমি হেসে ফেললাম।
— “মানে?”
সে উত্তর না দিয়ে বেহালায় পরপর দুটি স্বর তুলল।
— “বলুন তো, কোনো পার্থক্য শুনলেন?”
আমি মন দিয়ে শুনলাম। আবার শুনলাম। তারপর মাথা নাড়লাম।
— “না।”
সে যেন এই উত্তরটাই আশা করছিল।
— “প্রথমটা চারশো চল্লিশ। দ্বিতীয়টা চারশো বত্রিশ।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
— “শুধু এইটুকু?”
— “এইটুকুই। কিন্তু কানের চেয়ে বড় যন্ত্র যদি শরীর হয়, তাহলে ফারাকটা শুধু কানে ধরা পড়বে কেন?”
তার কথার ভঙ্গি ওস্তাদের মতোই শান্ত, কিন্তু কোথাও যেন আরও বাস্তব।
— “আপনারা স্টুডিওতে সারাদিন মানুষের কানে কাজ করেন। দাদু বলেন, একদিন যদি শরীর দিয়েও শুনতে শেখেন, অনেক কিছু বদলে যাবে।”
আমি বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না।
মেয়েটার গলায় আত্মবিশ্বাস ছিল, অথচ একফোঁটা বাড়াবাড়ি ছিল না।
তার নাম সুরঞ্জনা।
শম্ভুনাথ ওস্তাদের নাতনি।
স্থানীয় এক স্কুলে গান শেখায়। দোকানের কাজেও দাদুকে সাহায্য করে। বহু প্রজন্মের সঙ্গীতসাধনার উত্তরাধিকার যেন অদ্ভুত স্বাভাবিকতায় বহন করে চলেছে।
ঠিক তখনই গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা হর্ন বাজিয়ে চলে গেল।
সুরঞ্জনা বিরক্ত মুখে বাইরে তাকাল।
— “শুনলেন?”
— “কী?”
— “হর্নটা গত সপ্তাহ থেকে বেসুরো। অর্ধেক শ্রুতি নেমে গেছে।”
আমি হেসে বললাম,
— “রিকশার হর্নেরও আবার সুর আছে?”
সে বিস্মিত চোখে তাকাল।
— “সব কিছুরই সুর আছে। দোকানের সাইনবোর্ডটা পড়েননি?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
বেরিয়ে আসার সময় সে ডেকে বলল,
— “একটা কথা?”
— “বলুন।”
— “দাদুর সব কথা বিশ্বাস করবেন না।”
আমি হেসে বললাম,
— “আবার সব অবিশ্বাসও করব না?”
এই প্রথম সে খোলাখুলি হেসে উঠল।
— “দেখছি, খুব তাড়াতাড়ি শিখছেন।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে বুঝলাম, সুরালয়ে যাওয়ার কারণ আর শুধু শম্ভুনাথ ওস্তাদ নন।
সুরালয়ে যাওয়ার কারণ তখন দুটো।
একটা অবশ্যই শম্ভুনাথ ওস্তাদ।
আর অন্যটা—আমি নিজেকেও স্বীকার করিনি।
এক সন্ধ্যায় ওস্তাদ গঙ্গাস্নানে গিয়েছেন। দোকানে শুধু আমরা দুজন।
হঠাৎ সুরঞ্জনা জিজ্ঞেস করল,
— “স্টুডিওতে আসলে কী করেন?”
আমি একটু গর্বের সঙ্গেই বললাম,
— “যা দরকার হয় সবই। গান, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সাউন্ড ডিজাইন…।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— “জানেন, আপনি আসলে কী তৈরি করেন?”
আমি হেসে ফেললাম।
— “কী?”
— “অনুভূতি।”
আমি ভুরু তুললাম।
সে বলল,
— “একটা দুঃখের গান চালান। পাঁচ মিনিট পরে খেয়াল করবেন, আপনার কাঁধ কখন নুয়ে গেছে, মুখের হাসি কখন মিলিয়ে গেছে—নিজেই বুঝবেন না। আবার একটা বিজয়ের সুর বাজান, শরীর নিজে থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়ায়।”
সে আমার দিকে তাকাল।
— “কেউ আপনাকে দুঃখী বা সাহসী হতে বলেনি। তবু হলেন। কেন?”
আমি উত্তর খুঁজে পেলাম না।
— “মানুষ ভাবে সে নিজের মনের মালিক। কিন্তু শব্দ অনেক সময় মনের আগেই শরীরকে বদলে দেয়। শরীর বদলালে মনও তার পিছু নেয়।”
আমি বললাম,
— “সঙ্গীতের কাজ তো সেটাই।”
— “হ্যাঁ। আর সেই কারণেই সঙ্গীত খুব বড় দায়িত্ব।”
তার গলায় প্রথমবার কঠোরতা এল।
— “যে মানুষ অনুভূতি তৈরি করতে পারে, সে চাইলে অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “ইতিহাসে দেখবেন, যুদ্ধের আগে স্লোগান বদলায়। ছন্দ বদলায়। মার্চের তালে মানুষ হাঁটে। হাজার মানুষের গলা একসঙ্গে উঠতে উঠতে ব্যক্তিমানুষটা হারিয়ে যায়। তখন সে শুধু ভিড়ের অংশ।”
তারপর আবার আমার দিকে ফিরল।
— “শব্দ মানুষকে এক করতে পারে। আবার শব্দ দিয়েই মানুষকে ভেঙেও ফেলা যায়। যে জাতির স্মৃতি মুছে দিতে চাও, তার গান বদলে দাও। কারণ গান শুধু বিনোদন নয়; একটা জাতির স্মৃতিও বহন করে।”
আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।
স্টুডিওর ক্লায়েন্টদের কথা মনে পড়ছিল।
প্রায়ই তারা বলে,
“বিটটা আরও জোরে দিন। মানুষ যেন বসে থাকতে না পারে।”
সুরঞ্জনা যেন আমার নীরবতাটাই পড়ে ফেলল।
— “ভয় পাবেন না। আমি গানকে দোষ দিচ্ছি না। আমি শুধু বলছি, আগুন যেমন রান্নাও করে, ঘরও পোড়ায়—শব্দও তেমন।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— “তাহলে উপায়? কানে তুলো দিয়ে ঘুরব?”
সে হেসে মাথা নাড়ল।
— “না। শুধু সচেতন হয়ে শুনবেন। মানুষ কী খাচ্ছে, সেটা নিয়ে খুব ভাবনা করে। কিন্তু সারাদিন কানে কী ঢুকছে, সেটা নিয়ে প্রায় কেউ ভাবেই না।”
ঠিক তখনই দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল।
একই সময়ে উল্টো দিকের ছোট্ট মন্দিরে সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে উঠল।
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর।
তবু একে অন্যকে আঘাত করছিল না।
বরং মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার আকাশে পাশাপাশি বয়ে চলেছে।
সুরঞ্জনা ধীরে বলল,
— “দেখলেন? মিল মানেই একরকম হওয়া নয়। ঠিক সুরে থাকাটাই আসল।”
আমি আর কোনো উত্তর দিলাম না।
সেদিন সুরালয় থেকে বেরোতে বেরোতে রাত ন’টা পেরিয়ে গিয়েছিল।
চিৎপুরের দিনের কোলাহল তখন স্তিমিত। একে একে দোকানের ঝাঁপ নামছে। কোথাও শেষবারের মতো হাতুড়ির শব্দ, কোথাও কাঠের বাক্স বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। বাতাসে পুরোনো কাঠ, ধূপ আর ধাতুর গন্ধ।
আমি গলির মুখে পৌঁছতেই থমকে দাঁড়ালাম।
খুব ক্ষীণ একটা বাঁশির সুর ভেসে আসছে।
এত নিচু যে শব্দ বললেও যেন ভুল হয়। আবার এত স্পষ্ট যে উপেক্ষা করাও যায় না।
আমি চারদিকে তাকালাম।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
একজন চায়ের দোকানদার গ্লাস ধুচ্ছে।
দুজন কুলি গল্প করতে করতে হেঁটে চলে গেল।
একটা কুকুর রাস্তার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।
কেউ যেন কিছুই শুনছে না।
শুধু আমি।
বাঁশির সুরটা অদ্ভুত।
কোনো পরিচিত রাগ নয়। অথচ মনে হচ্ছিল কোথাও যেন আগে শুনেছি।
কোথায়?
মনে করতে পারলাম না।
সুরটা ধীরে ধীরে আমাকে গলির ভেতরের দিকে টানতে লাগল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শম্ভুনাথ ওস্তাদের গলা ভেসে এল।
— “শুনতে পেয়েছ?”
আমি ফিরে তাকালাম।
উনি দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে।
চোখে সেই পরিচিত শান্ত দৃষ্টি নেই।
মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।
— “হ্যাঁ।”
উনি একটা কাপড়ের ছোট থলি খুলে একটা স্ফটিকের মালা আমার হাতে দিলেন।
— “রাখ”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “আজ রাতটা একটু সাবধানে থাকো।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কেন?”
উনি সরাসরি উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
— “সব সুর মানুষের জন্য নয়।”
কথাটা শেষ করে তিনি দোকানের ভেতরে ফিরে গেলেন।
আমি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাঁশির সুর তখনও ভেসে আসছে।
একবার মনে হলো বাড়ি ফিরে যাই।
আবার মনে হলো—সুরটার উৎসটা অন্তত একবার দেখে আসি।
কৌতূহল আর সতর্কতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ সাধারণত ভুল সিদ্ধান্তই নেয়।
সেদিন আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না।
গলির আরও গভীরে এগোতে লাগলাম।
চিৎপুরের এই অংশে আমি আগে কখনও আসিনি। রাস্তা ক্রমশ সরু হচ্ছে। দু’পাশের পুরোনো বাড়িগুলো যেন মাথা ঝুঁকিয়ে একে অপরের সঙ্গে গোপন কথা বলছে। কোথাও ভাঙা বারান্দা, কোথাও স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল। বাতাসে গঙ্গার আর্দ্র গন্ধ।
বাঁশির সুরটা এবার স্পষ্ট।
তবু উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মনে হচ্ছিল, সুরটা কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকে নয়—চারদিক থেকেই ভেসে আসছে।
“বাড়ি যাও নি ?”
চমকে পিছনে তাকালাম। ওস্তাদ নিঃশব্দে কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কে বাজাচ্ছে?”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ মাথা নাড়লেন।
— “জানি না।”
উত্তরটা অদ্ভুতভাবে আমাকে আশ্বস্ত করল না; বরং আরও অস্বস্তিতে ফেলল।
আমরা আর কয়েক পা এগোতেই খেয়াল করলাম, আশপাশের শব্দগুলো একে একে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ট্রামের ঘণ্টা নেই।
গাড়ির হর্ন নেই।
মানুষের কথাবার্তাও নেই।
শুধু বাঁশির সুর।
আর তার নিচে—
খুব সূক্ষ্ম একটা দীর্ঘ গুঞ্জন।
প্রথমে মনে হলো কানের ভুল।
তারপর বুঝলাম, না।
ওটা আছে।
খুব নিচু।
খুব গভীর।
গলির মধ্যে অন্ধকার জমাট বেঁধে একটা অস্পষ্ট অবয়ব নিচ্ছে যেন, মানুষ না, অব্যাখ্যাত কিছু, যা এই পৃথিবীর নয়।
আমি থেমে গেলাম।
শম্ভুনাথ ওস্তাদও দাঁড়ালেন।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
অনেকক্ষণ পরে আস্তে বললেন,
— “শুনতে পাচ্ছ?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি শুধু বাঁশি শুনছি না।
আরও কিছু শুনছি।
যার ভাষা নেই।
যার শুরু নেই।
শেষও নেই।
ওস্তাদ চোখ না খুলেই বললেন,
— “এটাই অনাহত নাদের ছায়া।”
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম,
— “অনাহত?”
তিনি ধীরে বললেন,
— “যে শব্দ দুই বস্তুর সংঘাতে জন্মায় না।”
একটু থেমে আবার বললেন,
— “ঘণ্টা বাজালে শব্দ হয়। শঙ্খে ফুঁ দিলে শব্দ হয়। তারে আঙুল ছোঁয়ালে সুর জন্মায়। কিন্তু কিছু কিছু ধ্বনি আছে—যাদের জন্ম হয়নি কখনও। তারা ছিল, আছে, থাকবে।”
আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।
চারপাশের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে এসেছে।
আর সেই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ভেসে চলেছে—
বাঁশি।
আর তারও গভীরে—
একটি অবিরাম, অনন্ত গুঞ্জন।
মনে হলো, পৃথিবী যেন নিজেই এক দীর্ঘ স্বর ধরে রেখেছে—
ওঁ…
আমি গলির দিকে তাকালাম।
কুয়াশার আবছা অবয়বগুলো যেন আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
এখনও তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না।
তবু মনে হচ্ছিল, তারা সবাই শুনছে।
ঠিক আমার মতো।
ঠিক তখনই বাঁশির সুর বদলে গেল।
সুরের ভেতর অদ্ভুত এক টান তৈরি হলো।
ডাকের মতো।
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ শূন্যতা নেমে এল।
মনে হলো—
আমাকে যেতে হবে।
এখনই।
সব ফেলে।
সব ছেড়ে।
কোথায়?
জানি না।
কেন?
সেটাও জানি না।
শুধু মনে হচ্ছিল, ওই সুরটার শেষ পর্যন্ত না গেলে আমার জীবনের একটা অংশ চিরকাল অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আমি এক পা বাড়ালাম।
হঠাৎ শম্ভুনাথ ওস্তাদের হাত বজ্রের মতো আমার কব্জি চেপে ধরল।
— “না।”
আমি চমকে উঠলাম।
— “কিন্তু…”
— “এইটাই ডাক।”
উনি খুব ধীরে বললেন।
— “প্রত্যেক সুরের একটা কেন্দ্র থাকে।”
আমি তাকিয়ে রইলাম।
তিনি যোগ করলেন,
— “কিছু কিছু কেন্দ্রের খুব কাছে যাওয়া মানুষের কাজ নয়।”
হাতের স্ফটিকের মালাটা হঠাৎ উষ্ণ হয়ে উঠল।
বাঁশির সুর আরও তীব্র।
কুয়াশার অবয়বগুলো স্থির।
যেন অপেক্ষা করছে।
তারপর—
হঠাৎ সব থেমে গেল।
বাঁশি নেই।
গুঞ্জন নেই।
বাতাস আবার হালকা।
কুয়াশার অবয়বগুলো ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ড্রেনের ধারে বসে থাকা ইঁদুরগুলো একসঙ্গে ছুটে পালাল।
চিৎপুর আবার আগের মতোই হয়ে গেল।
যেন কিছুই ঘটেনি।
শুধু আমার হাতের স্ফটিকের মালাটা তখনও অস্বাভাবিক উষ্ণ।
আমি আস্তে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কে বাজাচ্ছিল?”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “এই প্রশ্নটাই একদিন আমার গুরু করেছিলেন।”
— “উত্তর পেয়েছিলেন?”
ওস্তাদ মৃদু হাসলেন।
— “গুরু বলেছিলেন—যেদিন উত্তর পেয়ে যাবে, সেদিন আর মানুষ হয়ে থাকবে না।”
আমি নীরব।
উনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,
— “আমরা ভাবি, আমরা গান শুনি।”
একটু থেমে আমার দিকে তাকালেন।
— “কখনো কখনো গানও তার শ্রোতাকে খুঁজে নেয়।”
________________________________________
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর কয়েক মুহূর্ত আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।
গত রাতের ঘটনাটা কি সত্যিই ঘটেছিল?
নাকি অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে দেখা কোনো স্বপ্ন?
চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা স্ফটিকের মালাটার দিকে।
সূর্যের আলোয় দানাগুলো ছোট ছোট রঙধনুর মতো ঝিলিক দিচ্ছে।
আমি হাতে তুলে নিলাম।
ঠান্ডা।
সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
যেন রাতের সেই অস্বাভাবিক উষ্ণতার কোনো স্মৃতিই তার নেই।
স্টুডিওতে গিয়েও কাজে মন বসল না।
একটা ট্র্যাক মিক্স করতে করতে বারবার মনে হচ্ছিল, সুরের নিচে যেন আরেকটা স্তর আছে।
খুব নিচু।
খুব গভীর।
শোনা যায় না।
তবু যেন আছে।
একটানা বাজতে থাকা বিশাল এক তানপুরার মতো।
দুপুরের পর আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না।
আবার সুরালয়ে গেলাম।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন।
আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন,
— “ঘুম হয়েছিল?”
আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
উনি মৃদু হেসে বললেন,
— “আমারও প্রথমবার হয়নি।”
আমি বসে পড়লাম।
— “কাল রাতে কী ছিল?”
উনি চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিলেন।
— “জানি না।”
— “আপনিও জানেন না?”
— “না।”
তিনি এক চুমুক চা খেলেন।
তারপর বললেন,
— “মানুষের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। যেটার ব্যাখ্যা জানে না, সেটার একটা নাম দিয়ে ভাবে, বুঝে ফেলেছে।”
আমি চুপ।
উনি আবার বললেন,
— “ধরো, একটা পিঁপড়ে রেডিওর ভেতরে ঢুকে পড়ল।”
আমি তাকিয়ে আছি।
— “সে দেখবে তার, ট্রানজিস্টর, সার্কিট। সবই দেখতে পাবে।”
একটু থেমে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “কিন্তু গানটা কোথায়?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
— “আমরাও অনেকটা সেই পিঁপড়ের মতো।”
তিনি শান্ত গলায় বললেন।
— “আমরা কম্পাঙ্ক মাপি, তরঙ্গের ছবি আঁকি, মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া দেখি। কিন্তু সুর কোথায় জন্মায়—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও আমাদের জানা নেই।”
আমি প্রথমবার দোকানের ভেতরের দেয়ালের ছবিটার দিকে খেয়াল করলাম।
একজন বৃদ্ধ।
দীর্ঘ শুভ্র দাড়ি।
বন্ধ চোখ।
কোলে তানপুরা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “উনিই আপনার গুরু?”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ উঠে দাঁড়ালেন।
ছবিটার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— “না।”
আমি বিস্মিত।
— “উনি আমার গুরুর গুরু।”
ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ আরও নীরব হয়ে গেল।
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ ছবির সামনে দাঁড়িয়েই বললেন,
— “১৯৪৬ সাল।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
— “দাঙ্গার বছর।”
বাইরে কোথাও একটা ট্রামের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ওস্তাদ ধীরে বললেন,
— “কলকাতা তখন আগুনে জ্বলছে। মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। রাস্তায় রক্ত, ঘরে ঘরে আতঙ্ক।”
তিনি একটু থামলেন।
— “সেই সময় এক রাতে গুরুদেব গঙ্গার ঘাটে তানপুরা নিয়ে বসেছিলেন।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “সেই অবস্থায়?”
— “হ্যাঁ।”
উনি শান্ত স্বরে বললেন,
— “তিনি বলতেন, শহরের সুর ভেঙে গেছে। তাকে আবার সুরে ফেরাতে হবে।”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
আমি নিঃশব্দে শুনছিলাম।
— “তিন দিন ধরে তিনি একটিমাত্র স্বর ধরার চেষ্টা করেছিলেন।”
— “কোন স্বর?”
ওস্তাদ ছবির দিকে তাকিয়েই বললেন,
— “যে স্বরের উপর পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে।”
কথাটা শুনে আমার শরীরে কাঁটা দিল।
আমি জানতাম, এ কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।
তবু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, উনি গল্প বলছেন না।
স্মৃতি বলছেন।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ আবার বলতে শুরু করলেন।
— “তৃতীয় রাতের শেষে গুরুদেব হঠাৎ তানপুরা নামিয়ে রাখেন।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছি।
— “তারপর তিনি শুধু একটি বাক্য বলেছিলেন।”
ওস্তাদের গলা আরও নিচু হয়ে এল।
— “আজ বুঝলাম… আমরা একা নই।”
ঘরের নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম,
— “তিনি কী দেখেছিলেন?”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর ওস্তাদ ছবির ফ্রেমের নিচে আঙুল রাখলেন।
সেখানে ছোট অক্ষরে লেখা—
“যখন মানুষ সুর সৃষ্টি করে, তখন সে ভাবে সে একা গাইছে।
কিন্তু কখনো কখনো মহাবিশ্বও তার সঙ্গে গলা মেলায়।”
আমি লেখাটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
বাইরে তখন বিকেলের কলকাতা ধীরে ধীরে নিজের চেনা শব্দে ফিরে এসেছে।
ট্রামের ঘণ্টা।
বাসের হর্ন।
ফেরিওয়ালার হাঁক।
দূরের মন্দিরের ঘণ্টা।
আর তারও ওপরে, মসজিদ থেকে ভেসে আসা আসরের আজান।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— “দেখলে?”
আমি প্রশ্ন করলাম,
— “কী?”
— “শহরটা কখনো নীরব হয় না।”
তিনি মৃদু হেসে যোগ করলেন,
— “প্রশ্ন শুধু এই—কোন শব্দটা তুমি শুনছ?”
বাইরে বিকেলের কলকাতা নিজের স্বাভাবিক শব্দে ফিরে গেছে।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
— “জানো, শব্দেরও নৈতিকতা আছে?”
আমি বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম।
তিনি জানালার বাইরে চোখ রেখেই বললেন,
— “যে সুর মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, সে ভালো সুর।”
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আর খারাপ?”
— “যে সুর মানুষকে নিজের থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়।”
তিনি একটু থামলেন।
তারপর নিচু স্বরে বললেন,
— “সবচেয়ে বিপজ্জনক সুর কোনটা জানো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
— “যে সুর তোমাকে তোমার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও হাঁটতে বাধ্য করে।”
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
গত রাতের সেই ডাক।
সেই টান।
সব ফেলে কোথাও চলে যাওয়ার অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— “হ্যাঁ।”
তিনি বুঝেছেন।
আমি কিছু বলিনি, তবু তিনি বুঝেছেন।
— “তোমারও শুরু হয়েছে।”
কথাটা বলেই তিনি দেওয়ালে ছবিটার দিকে তাকালেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন,
— “সবাই শুনতে পায় না।”
আমি অপেক্ষা করছিলাম।
— “কিন্তু যারা একবার শুনে ফেলে…”
তিনি বাকিটা শেষ করতে একটু সময় নিলেন।
“…তাদের সামনে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটো পথ খোলা থাকে।”
— “কী পথ?”
তিনি আমার চোখের দিকে স্থির তাকিয়ে রইলেন।
— “একটা—সেই সুরের পিছু নেওয়া।”
একটু থামলেন।
— “আরেকটা—সারা জীবন তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করা।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
আমি জানতাম না, এই দুই পথের কোনোটাই আসলে মুক্তির পথ কি না।
________________________________________
শম্ভুনাথ ওস্তাদ হারিয়ে গেলেন এক সোমবার সকালে।
‘হারিয়ে গেলেন’—কথাটা হয়তো ঠিক নয়।
মনে হয়েছিল, যেন তিনি পৃথিবী থেকে নিঃশব্দে মুছে গেছেন।
সেদিন সকালে সুরালয়ে গিয়ে দেখি ঝাঁপ আধখোলা।
ভেতরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সবকিছু নিজের জায়গায়।
তানপুরা।
সেতার।
বেহালা।
চায়ের ভাঁড়।
এমনকি আগের দিনের খবরের কাগজটাও ভাঁজ করে রাখা।
শুধু মানুষটা নেই।
সুরঞ্জনা শান্ত গলায় বলল,
— “ভোরে গঙ্গাস্নানে গেছেন বলেছিলেন। তারপর আর ফেরেননি।”
পুলিশে খবর দেওয়া হলো।
ঘাটে খোঁজা হলো।
হাসপাতালে।
মর্গেও।
কোথাও কোনো সন্ধান মিলল না।
তিন দিন পরে বাবুঘাটের এক মাঝি বলেছিল, ভোরের অন্ধকারে নাকি একজন বৃদ্ধকে শেষ সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখেছিল, হাতে একটা বীণা।
তার বেশি কিছু সে বলতে পারেনি।
আমরাও আর জানতে চাইনি।
কারণ তখন বুঝে গিয়েছিলাম—
সব প্রশ্নের উত্তর জানা মানুষের প্রাপ্য নয়।
জীবন ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফিরে গেল।
অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হতো।
আমি স্টুডিওর কাজ চালিয়ে গেলাম।
সুরঞ্জনা স্কুলে গান শেখাতে থাকল।
কয়েক বছর পরে আমাদের বিয়ে হলো।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ সেই বিয়েতে ছিলেন না।
তবু অদ্ভুতভাবে মনে হয়েছিল, তাঁর অনুপস্থিতিটাও যেন উপস্থিতিরই আরেক রূপ।
সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বারান্দার এয়ার-চাইমগুলো একটানা বেজে চলেছিল এলোমেলো অবিশ্রান্ত হাওয়ায়।
কেউ কিছু বলেনি।
আমিও না।
________________________________________
আমাদের মেয়ের নাম রেখেছিল সুরঞ্জনা।
শ্রুতি।
আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “সঙ্গীতের শ্রুতি?”
সে মাথা নেড়ে বলেছিল,
— “শুধু তা নয়। যা সবাই শুনতে পায়, আর যা কেবল কিছু মানুষ শোনে—দুটোই।”
________________________________________
শ্রুতির বয়স যখন তিন, প্রথম ঘটনাটা ঘটল।
একদিন বিকেলে ছবি আঁকতে আঁকতে সে হঠাৎ বলল,
— “বাবা, ওই কাকুগুলো কারা?”
আমি তাকালাম।
ছাদে কেউ নেই।
— “কোথায়?”
সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আঙুল তুলে দেখাল।
— “ওই যে… সাদা সাদা কাকুগুলো।”
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “ওরা কী করছে?”
শ্রুতি একটু ভেবে বলল,
— “শুনছে।”
— “কী শুনছে?”
সে বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকাল।
— “তুমি শুনতে পাচ্ছ না?”
________________________________________
সেদিন রাতে আমাদের কারও ঘুম হয়নি।
অন্ধকারে শুয়ে সুরঞ্জনা শুধু একবার বলেছিল,
— “দাদু বলতেন, কিছু কিছু কান বংশে বংশে আসে।”
________________________________________
বছর গড়াতে লাগল।
শ্রুতি বড় হতে লাগল।
পাঁচ বছর বয়সে সে অনায়াসে ৪৩২ আর ৪৪০-এর পার্থক্য শুনে ফেলত।
সাত বছর বয়সে বৃষ্টির শব্দ শুনে বলে দিত, আর কতক্ষণ পরে বৃষ্টি থামবে।
নয় বছর বয়সে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বলল,
— “বাবা, আজ সূর্যটা খুব জোরে গাইছে।”
আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।
পরের দিন খবরের কাগজে পড়লাম—পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে গত এক দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়।
সেদিন প্রথমবার সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম।
কারণ আমি জানতাম—
শ্রুতি খবরের কাগজ পড়ে না।
________________________________________
এক রাতে ঘুম ভেঙে দেখি, সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে।
বাইরের অন্ধকারের দিকে স্থির তাকিয়ে আছে।
আমি ধীরে কাছে গিয়ে বললাম,
— “কী হয়েছে?”
সে উত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ পরে ফিসফিস করে বলল,
— “ওরা আবার এসেছে।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
— “কারা?”
সে জানালার বাইরেই তাকিয়ে রইল।
— “যারা শুনতে আসে।”
ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
ঠিক সেইরকম।
বহু বছর আগে চিৎপুরের সেই গলিতে যেমন হয়েছিল।
দূরে কোথাও একটা ট্রামের ঘণ্টা বাজল।
তারপর আবার নীরবতা।
আর সেই নীরবতার ভেতর—
আমি আবার শুনলাম।
খুব নিচু।
খুব গভীর।
খুব পুরোনো।
একটা দীর্ঘ গুঞ্জন।
শোনা যায় না।
তবু আছে।
মনে হলো, পৃথিবী নিজেই যেন একটানা একটি স্বর ধরে রেখেছে।
হঠাৎ শম্ভুনাথ ওস্তাদের একটা কথা মনে পড়ে গেল।
— “পৃথিবীর নানা প্রান্তে কিছু মানুষ নাকি সবসময় এক অদ্ভুত গুঞ্জন শুনতে পায়। সবাই নয়—কেবল অল্প কয়েকজন। বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা খুঁজছে। নাম দিয়েছে। কিন্তু নাম দিলেই কি রহস্য শেষ হয়ে যায়?”
তখন আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “আপনি কী মনে করেন?”
তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বলেছিলেন,
— “যদি শব্দটা বাইরের না হয়?”
একটু থেমে।
— “যদি সে অপেক্ষা করে থাকে… কেউ একজন শুনে ফেলবে বলে?”
জানলার বাইরে রাতের কলকাতা নিশ্চুপ।
আর সেই নীরবতার ভেতর—
আবার।
ওঁ…
শ্রুতি তখনও বাইরে তাকিয়ে।
খুব আস্তে বলল,
— “বাবা?”
— “হ্যাঁ?”
— “দাদু কি ফিরে আসবেন?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে শম্ভুনাথ ওস্তাদের সেই কথাটা আবার মনে পড়ল—
“কখনো কখনো গানও তার শ্রোতাকে খুঁজে নেয়।”
আর তখনই আমার মনে হলো—
হয়তো আমরা এতদিন ভুল প্রশ্ন করেছি।
প্রশ্নটা এই নয়—
আমরা কী শুনছি।
প্রশ্নটা হলো—
এই মুহূর্তে…
আমাদের মধ্যে কাকে কাকে
শুনে ফেলা হয়েছে।

















































