রুদ্র তারা রূপকথারা – ৪

– এই দেখ, এরা কেমন লে লাদাখ গেছে … ফেসবুকে ছবি দিয়েছে …
– কই ?
– এই যে, দেখ না, কেমন সুন্দর ফুলে ভরা আস্ত একটা ভ্যালি, দুপাশ সবুজ রাস্তা …
– হুম
– দূরে নীল বরফের পাহাড়, কণকণে শীতের হাওয়া, ভোরের ছোঁয়ায় ফোটা ব্রহ্মকমল … আর কি চাই জীবনে …… কি সুন্দর না ? আমরাও একদিন যাব, কি বল ?
– হুম
– দূর কি খালি হুম হুম করে যাচ্ছ ? দেখ না এদিকে একবার … সারাদিনে এই একটুখানি মাত্র সময় আমাদের দেখা হয়, তাও তুমি প্রতিদিন এরকম অফিসের কাজ নিয়ে বসে থাক … আমার জন্য কি তোমার দিনে এই টুকু সময়ও নেই ?
– আঃ কেন প্রতিদিন এরকম সমস্যা কর ? একটা ছোট কোম্পানিতে কাজ করার ঝামেলা বোঝ ? একশটা দায়িত্ব তোমার ভাল লাগুক না লাগুক, তুমি পার না পার, শুধু তুমি ডেডিকেটেড আর অনেস্ট বুঝলেই তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে … তোমার ঘাম রক্তের ওপর অন্যকারোর ইমারত তৈরি হবে, তুমি বাধ্য হবে সেই ইশপের সোনার ডিমপাড়া হাঁসের মত নিজের সব কিছু, নিজের জীবন মালিকের ছুরির তলায় রেখে দিতে …

এত বড় কাগুজে লেকচারটা ভেঁজে তারার দিকে তাকাতেই ঐ গভীর কালো চোখ দুটোর স্বচ্ছতায় সম্বিৎ ফেরে রুদ্রর, মনে পড়ে চুপচাপ কর্মঠ এই মেয়েটা নিজেও একটা ছোট কোম্পানিতে কাজ করে সামান্য টাকা মাইনেয়, ভোরে উঠে ঘরের কাজ সেরে দুটো ট্রেণ বাস পালটে যেতে হয় অনেকদূর, কাঁধে নিতে হয় কোম্পানির জুতোসেলাই থেকে চন্ডীপাঠের সমস্ত দায়িত্ব। শুধু নিজের অথর্ব বাবা মায়ের শেষ জীবনের একটু সম্বল হওয়ার জন্য …

বিয়ের পর থেকে কি ই বা দিতে পেরেছে রুদ্র ? না একটা ভালো শাড়ি, না ভালো কোন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, না একটা বড় রেস্টুরেন্টে একদিনের ক্যান্ডেললাইট ডীনার … যা একান্তই অনায়াস তার বয়সী অন্যন্য ছেলেদের জীবনে … ভিতরে ভিতরে অসীম যন্ত্রণায় , অপরাধবোধে কুঁকড়ে যায় রুদ্র।

– কি গো ? কি হল ? অমন ভাবে ফাঁকা দেওয়ালের দিকে চেয়ে আছ কেন ? একি চোখে জল কেন ? কি হয়েছে গো ? এই পাগল …… আমি আছি তো তোমার কাছে। কি যে করি পাগলটাকে নিয়ে … এই পাগলের ছারপোকা … চোখ মোছ বলছি, আরে এত দুঃখ কিসের ? এই তো সামনে প্নচায়েত ভোট … আমার সংগে গ্রামে যাবে তো ? ছুটির অ্যাপ্লাই করেছ ? নাকি ভুলে মেরে দিয়েছ ?

অতয়েব এগার বছর বয়সী মাত্র ৮৫ সিসির রংচটা ছোট্ট স্কুটি টায় বাঁধা হল ব্যাগ। দক্ষিণেশ্বরের সাঁকো পেরিয়ে বালি ছাড়িয়ে হাইওয়ে হয়ে …… একটা রূপকথার ছবি আঁকা …… যেখানে উঁচুনীচু ফ্লাইওভারেরা পাহারি পথের বাঁক, আর পথের মাঝে হঠাত পাওয়া বর্ষা ধারায় ভোরের কুয়াশা … মেঘ মেঘ … সবুজ গাছের দেওয়াল …

ওদের চোখের খুশীতে উছলোনো আনন্দের বানে খেয়ালই হয়নি … সারা পথ জুড়ে ফুটে আছে ব্রহ্মকমল … অগুণতি ……

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ৩

– ক্ষিধে পেয়েছে তোমার ?
– আমার ? …… উম, তুমি দুপুরে কি খেয়েছ আজ ?
– অমনি, তোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ক্ষিধে পেয়েছে কিনা, আর তুমি কথা ঘুরিয়ে দিলে।
– বল না, এমন কর কেন ? একবার তো ফোন ও কর না।
– ফোন কি সবসময় করা যায় ? কাজ থাকে না ? জানোই তো চাকরিটা এখনও পার্মানেন্ট হয় নি। দুটো রুটি খেয়েছি। শান্তি ?

– মোটে দুটো ? তাহলে তো এখন খুব ক্ষিধে পেয়ে গেছে ? আর পাগলাটা আমায় জিজ্ঞাসা করছে ক্ষিধে পেয়েছে কিনা। বল কি খাবে ?
– আমি কিছু খাব না, বাড়ি গিয়ে তো রুটি খাবই, মা তো বানাচ্ছে নাকি।
– সে তো অনেক দেরী, এই আমিও আজ দুপুরে ইন্দ্রার থেকে দু তিন চামচ চিঁড়ে খেয়েছি, চল কিছু খাওয়া যাক।
– কেন !! খাবার আনতে পাঠাওনি কেন ?
– আরে তখন আর ইচ্ছে করছিল না, ও ঠিক আছে, চল কিছু খাব আমরা।
– অ্যাই সত্যি কথা বল তো ? কি কেস ? আমি আজ টাকা রেখে বেরোইনি না ? শ্যীট …
– এই, এত বকে বকে মাথা খারাপ করার হলে বাড়ি চল, তখন থেকে বলছি চল কিছু খাওয়া যাক, তা না উনি বকে যাচ্ছেন।

– কি খাবে ? মোমো খাবে ? আর কি বা পাওয়া যাবে …
– নাঃ বাব্বাঃ মোমো কাকুর দোকানে যা ভীড়, মোমো পেতে পেতে কাল সকাল হয়ে যাবে।
– তাহলে ?
– চল না, এগিয়ে দেখি, ঐ খানে কোথায় যেন একটা বিরিয়ানীর দোকান দেখেছিলাম …
– বি-বিরিয়ানী !!! আজ ! মানে এখন !! ………অজান্তেই একবার অল্প উঁচু পকেটটায় হাত চলে যায় রুদ্রর ।

– চলই না। …… রহস্যময় হাসি হেসে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায় তারা।

একটা প্রায় ফাঁকা শুনশান দোকানের সামনে এসে রুদ্রকে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় তারা। একটা মোটে বিরিয়ানির হাঁড়ি এক কোনে রাখা।
– এটাই ? এখানে বসে খাওয়া যায় ?
– নিশ্চই যায়, দাঁড়াও দেখি, দোকানে লোক কই … ও দাদা, বিরিয়ানি হবে ?
– হ্যাঁ হবে, ক প্লেট ? … দোকানের ভিতরের কুঠুরি থেকে একজন হাফপ্যান্ট পরা নিরিহ চেহারার মানুষ বেরিয়ে এল।
– কত করে দাদা ? … রুদ্র তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করে।
– সত্তর টাকা।

এবারে ব্যাগটা বার করতেই হয় রুদ্রকে, কয়েকটা দশ আর কুড়ির নোট মিলিয়ে ষাট টাকা বের হয় । হঠাত শ্রাবণের মেঘ নামে রুদ্রর মুখে …

– এই নাও দশ টাকা, আমার কাছে ছিল। …… তারা তার ব্যাগের গহীন কোন পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দেয় একটা নোট।

– তবে তুমি দুপুরে কিছু …… বলতে গিয়ে থেমে যায় রুদ্র, মনে পড়ে যায় সেক্টর ফাইভের মত জায়গায় কতটা অকিঞ্চিৎকর একটা জীর্ণ দশটাকার নোট। বড় জোর এক প্যাকেট বিস্কিট ছাড়া এই মূল্যবৃদ্ধির প্রবল নিদাঘে কি আর পাওয়া যায় ও টাকায় …

– থামো তো, কাকু এক প্লেটই দিন, এখানে খাব। … রুদ্রর হাত থেকে টাকা গুলো প্রায় কেড়ে নিয়েই একপ্রকার এগিয়ে দেয় তারা।
– হ্যাঁ গো, আর তো কিছু নেই, যাওয়ার পথে কিছু নেওয়ার ছিল না তো।
– কই না তো, মা তাহলে বলত ।

বলতে বলতে বিরিয়ানি চলে এল, কাগজের পাতায় সাদামাটা বিরিয়ানি, মাংসের পিসটা নেহাত ছোট নয়। ব্যাগ্র হয়ে দু গ্রাস মুখে তুলেই রুদ্রর মনে পড়ল সেই সেই দিনগুলোর কথা যখন সে আর তারা ফাইনাল ইয়ার, এরকমই সামান্য কটা টাকা জমিয়ে শিয়ালদা স্টেশনের পাশে ফুটপাথে … এরকমই একটা প্লেট একটু একটু গ্রাস তুলে দিত সে তারার মুখে। সেদিনের মতই এক গ্রাস তারার দিকে এগিয়ে দিতেই তারার দুচোখে হাজার প্রদীপের আলো … ঠিক সেই সেদিনের মতই।

– এই চিকেনটা খাও, এ আমি খেতে পারব না, জানই তো আমার দাঁতের অবস্থা …
– আবার বদমাইসি, আমি নরম গুলো ছাড়িয়ে দিচ্ছি, খাও বলছি। কিচ্ছু হবে না।

– দিদি আর রাইস লাগলে বলবেন, রাইস যত চাইবেন ফ্রী … দোকানের মানুষটির অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় হঠাত সব পাওয়ার আলো ওদের চোখে।

এই ভীষণ উত্তপ্ত সন্ধ্যেয় … একটু একটু করে বিরিয়াণির হাঁড়ির ঐ ভাপের মতই কিছু ক্ষণের জন্য মুছে যাচ্ছে গত কয়েক মাসের স্যালারি না হওয়া, চেনা সবার ভালো ভালো চাকরি হয়ে যাওয়া, একটা দাগ না কাটতে না পারা ছাপোষা যাপন, মুছে যাচ্ছে সব না পাওয়া গুলো, ব্যক্তিগত ব্যর্থতাগুলো, ছোট ছোট দুঃখ গুলো, অপূর্ণতা অপ্রাপ্তিগুলো … অন্ততঃ কিছুক্ষণের জন্য …

সব ভালোবাসার গল্পগুলো ছবির মত সতর্ক তুলিতে আঁকা হয় না, কিছু কিছু এমনই নেহাত প্রতিদিনের অবসরে হিজিবিজি কাটা কাগজের মত … কখন অলক্ষ্যে তাতে একটা রূপকথা আঁকা হয়ে যায় কেউ লক্ষ্যও করে না।

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ২

– এই দেখ দেখ, অনীশরা দীঘা গেছে, ফটো দিয়েছে, কি মিষ্টি লাগছে দুটোকে।

– আরে এই গরমে দীঘা ! পাগল … এই দেখ প্রিয়া রা কাশ্মীর গেছে, কি সুন্দর জায়গা, আপেল গাছ। সবুজ পাহাড় … যেতে হলে কাশ্মীর হ্যাঁ …

– দূর, কাশ্মীর গেলে ঠান্ডাতেই অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, এখানেই বলে শীত কালে হেঁচে হেঁচে অস্থির … তার চেয়ে দীঘা অনেকগুণে ভাল। গরম তো কী, সকালে রোদেই তো সমুদ্রে চান করে মজা, আর সন্ধ্যেয় সমুদ্রের হাওয়া, হুহু … কত দেশ , বন্দর, উপকূল ছুঁয়ে … বসে বসে সে হাওয়ায় ডুবে থাক, মাঝে মাঝে একটা একটা দেওয়ালীর আলোর মত মাছ ভাজার দোকান … পমফ্রেট, গুড়জাউলি, কাঁকড়া …

– কি গো ? কোথায় হারিয়ে গেলে ?

“আচ্ছা আমরা কোথাও যাব না ?” – সযত্নে অবচেতনের গোপনীয়তায় লুকিয়ে রাখা গুঞ্জনটা বেয়াড়া হতেই মেয়েটা বিব্রত … ও গুঞ্জন যে ছেলেটার চোখে নামায় নীচে জমা হওয়া কালির চেয়েও বেশী অক্ষম অন্ধকার তা বুঝেই তো প্রাণপণে কল্পনাযাপন।

“যাব তো, এই তো আর কটা দিন” … বলে ওঠে ছেলেটা। ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি, জল টলটল । ও যে জানে, এমাসেও কটা টাকায় ধার শোধ করে পড়ে থাকবে না কিছুই।

“আচ্ছা, শোনো তা হবে কেমন করে ? ও মাসে আমি দুটো টিউশনি শুরু করছি না ? — তার চেয়ে বরং শীতটা পড়ুক, তখন যাওয়া যাবে। আজ বিকেলে বরং চল, আমরা ঘুরে আসি”

“কোথায় ?” — ছেলেটার চোখে একরাশ বিস্ময়

“চলই না, সেই বিয়ের আগে যেমন আমায় সাইকেলে নিয়ে তুমি চেনাতে গাছের নাম, আকাশে একটা একটা করে ফোটা তারা, সেই রকম, যাবে ?”

* * *

শহরতলীর কোলাহল পেরিয়ে সবুজ ঘেঁসে বসেছে ছেলেটা আর মেয়েটা, সামনে নীলচে কালো মাঠে সন্ধ্যে নেমেছে অল্প আগে। ওদের সামনে প্লাস্টিকের টুলে হাতে গড়া গরম রুটি আর চিকেনের গিলে মেটে কষা, তিরিশ টাকা।

শহরের প্রান্তের এই ঠেলাগাড়ির পাশে খদ্দেরের ভীড় কম । ঠেলাগাড়ির ছাতা থেকে ঝোলানো একটা হলুদ আলো, দেওয়ালীর একটা প্রদীপের মত।

মেয়েটা পরম যত্নে রুটির টুকরো তুলে দিচ্ছে ছেলেটার মুখে … আর এক টুকরো নিজে। ছেলেটা অনন্ত প্রশান্তিতে চেয়ে আছে ওর ঘাম চিকচিক মায়াবী মুখটার দিকে। এমন অপার্থীব সুন্দর পৃথিবীর মানুষ হয় ?

তোলা উনুনে গরম রুটি সেঁকে চলে দোকানী। সামনের মাঠ উথাল পাথাল, অবিরল হাওয়া ছুঁয়ে যায় ওদের … সে হাওয়ায় সমুদ্রের গন্ধ মাখা …

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ১

– “বাবু দশটা টাকা দিবি ? খাব …”

পিছন ফিরে রুদ্র দেখল বৃদ্ধাকে, শাড়ীটা ময়লা হলেও এককালে বেশ যত্ন করে কেনা, আঁচলে ছোট ছোট গুটি, একেকটা গাছ। আঁচলে বাঁধা সম্বলেরা আজ ছড়িয়ে গেছে নাগাল ছাড়িয়ে অথবা আঁচলের আড়াল প্রয়োজনহীন।

পকেটের মানিব্যাগ খুলে দুটো একশো আর একটা পঞ্চাশের মাঝে আটকে থাকা দশটাকা টা কায়দা করে বের করল রুদ্র।

– “শোনো” … রুদ্রর পাঞ্জাবীর হাতায় টান দিল তারা, ফিসফিস করে প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলল, “দশ টাকায় কারুর খাওয়া হয় ?”
ক্ষণিকের বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে ঝটিতি পঞ্চাশের নতুন সবুজ নোটটা তুলে নিল রুদ্র, একবার তাকিয়ে দেখল, তার পর দিয়ে দিল বৃদ্ধার হাতে।

– “বেঁচে থাক বাপ, বেঁচে থাক মা”

মাত্র কয়েকটা বছর আগে, তখন মাস্ক পরত শুধুই পল্যুউশন সচেতন কয়েকজন। প্রত্যেক বারের মতই পূজোর আগে বোনাসের টাকা আর জমানো কিছু টাকায় ওঁদের জন্য আর ওঁদের ফুটপাথতুতো নাতি নাতনীদের জন্য কিনতো শাড়ি, জামা ফ্রক, রঙিন, কিন্তু ওঁচা নয়। সেই দোকান থেকে সেবার তারার জন্যও শাড়ি কিনেছিল রুদ্র, তাঁতের, মায়া মায়া আকাশী রঙের … তখনও ওদের বিয়ে হয় নি।

তারার জন্য একটা শাড়ি অবশ্য এবছরেও কিনেছে রুদ্র। তিনশো পঁচিশ টাকা দিয়ে। লাল, লতাপাতার নকশা, মাঝে একজায়গায় শুধু কোম্পানির নামটা ছাপানো।
আজ ওরা দুজনে বেরিয়েছে ওদের মফঃস্বলের কয়েকটা প্যান্ডেল ঘুরে দেখতে, পূজোর ঘোরা বলতে এইটুকুই।
তারা সেই শাড়িটা পরেই আর রুদ্র আগের বছর খান্না থেকে কেনা একটা পাঞ্জাবি, এখনও বেশ চকচকে। অষ্টমি থেকে নাকি বৃষ্টি হবে, তাই আগেভাগেই যেটুকু।

পূজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে কিছু না খেলে কি হয় ? এগরোল বড্ড প্রিয় ছিল তারার। তাই রুদ্র এগরোল খাওয়ার কথা বলতেই চকিতে তারা দু চোখে হাজার হীরের ঝলক হেসে উঠল।

– “কত দাদা এগরোল ?”

– “পঞ্চাশ, ডাবল ডিম ষাট”

– “সেকী ! কুড়ি টাকা ছিল যে ?”

– “সে বিটিস আমলে ছিল, কদ্দিন এগরোল খান নি দাদা ?”

সত্যিই বাইরের খাবার খাওয়া হয় না তা প্রায় বছর খানেক হয়ে গেল। রুদ্রর মনে পড়ে যায়, যখন সেক্টর ফাইভের চাকরীটা ছিল, মাঝে মাঝেই বাড়ী ফেরার পথে কটা চপ, নয়তো মোমো নিয়ে আসত তারার জন্য। আর এখন …
– “এই শোনো না, তোমায় বলা হয় নি, আজ সকাল থেকেই আমার পেটটা কেমন গুলোচ্ছে, এর মধ্যে এই বাইরের জিনিস খাওয়া ঠিক হবে ? তার চেয়ে চল, ঐ মহামায়া থেকে দুটো রসগোল্লা নিয়ে যাই, রাত্রে রুটি দিয়ে খাওয়া যাবে।”
কয়েক মুহুর্তের জন্য পৃথিবীটা একই সঙ্গে ভীষণ খারাপ কিন্তু মায়াময় গ্রহ মনে হতে লাগল রুদ্রের। তারা রুদ্রের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে চলল … বাড়ি ফিরতে হবে, অনেকটা হেঁটে। এখন তো আর গাড়িটা নেই, একদিকে ভালই হয়েছে বিক্রি করে দিয়ে। তেলের যা দাম আজকাল …

জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে তারার আটপৌরে মুখটায়, অনেক হেঁটেছে বেচারী, গভীর ঘুমে তলিয়ে রয়েছে। এই নিষ্পাপ মুখটার দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতে পারে রুদ্র। আজ যদিও তার চোখে ঘুম নেই … আচ্ছা সিনেমায় সিরিয়ালে তো অভিনেত্রী অভিনেতারা কেমন সুন্দর ইচ্ছে হলেই কাঁদতে পারে। সে যদি ওরকম কোন চরিত্রে সিলেক্ট হত ? প্রথমেই বাতিল হয়ে যেত নিশ্চই, হঠাতই হাসি পেয়ে যায় রুদ্রর। আর তার সঙ্গেই একটা পথ দেখতে পেয়ে আপন মনেই হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে পড়ে রুদ্র, প্রশান্তির ঘুম।

ভোরে পাখি ডাকতেই উঠে পড়ে রুদ্র, তারার আগেই। ফ্রীজের অনন্তকালের সঞ্চয়ভান্ডারের গহীনতম প্রদেশ হাতড়ে বের করল একটা আমুল চীজের বক্সে পড়ে থাকা দুটো কিউব। এটা বছর দুয়েক আগের বোধ হয়, তখন মাসে একবার বাড়িতেই পিতজা, বিরিয়ানি এসব হত, সাধারণতঃ শনিবার বা রবিবার করে।
চীজের এক্সপায়ারী ডেট অস্পষ্ট তাই পরীক্ষা করে দেখে চিজগুলো কুচিকুচি করল রুদ্র, তারপর একটা ডীম বাটিতে গুলে তাতে এক চামচে মত ময়দা দিয়ে গোলা বানিয়ে নিল। সসপ্যানে সেই গোলাটা দিয়ে তার ওপর চীজ, একটু পেঁয়াজকুচি, লংকাকুচি আর সস দিয়ে, গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে কায়দা করে ভাঁজ করে নিল। ব্যাস এইবার তারাকে ঘুম থেকে তোলা যাক। ডেকচিতে চা বসিয়ে তারা কে ডাকতে গেল রুদ্র, চা বিস্কুট খেয়েই তাকে বেরোতে হবে, দমদমে একটা জেরক্সের দোকানে টাইপিং এর কাজ নিয়েছে রুদ্র, বাংলা ইংরাজী হিন্দি, মাসে ছ হাজার টাকা।

তারার “তুমি একটু খাও” এর উত্তরে রুদ্র যখন বলে উঠল, “না তুমি খাও, আমি তোমায় একটু দেখি” তখন তারার মুখে ঠিক সেই সেদিনের মত পানপাতা সরানো সলজ্জ হাসি …… আর পাড়ার মন্ডপে ভোরে মাইক টেস্টিং এর জন্যই বোধয় হয় বেজে চলেছে, “দেখতে যাব, মা কে আমার সাজের কি দরকার …”

————————-
সব চরিত্র কাল্পনিক ?
#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

মৃত্যুকীট

“সে আসে নিঃশব্দে, কুরে কুরে খায় দেহ, ভয়লতম মহামারীর চেয়েও দ্রুত, পৃথিবীর আদিম অধিপতিদের প্রতিনিধি সে … তীব্র অজেয় বিষধর, অমর … সে আসছে তার প্রাচীন অধিকার কায়েম করতে …”


********

ঘটনা ১, সাল ২০১৫, স্থান – লন্ডণের সাউথকেনিংস্টন,

বাইরে ঠান্ডা হাওয়ার ঝলক বন্ধ করার জন্য দরজাটা টেনে দিলেন ডাক্তার জোহানা রোডস। রাত বেশী হয় নি। বড়দিনের ছুটির এই সময়টা তাঁর একান্ত ভাবেই পড়াশোনায় ডুবে নিজের মত সময় কাটানোর একটা সুযোগ বলেই বরাবর বিবেচনা করে এসেছেন তিনি। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। রাতের খাবার আগেই সারা হয়ে গেছে। এবার ট্যাবে নতুন কয়েকটা রিসার্চ পেপার পড়বেন বলে মিনিমাইজ করে রেখেছেন। ট্যাব টা হাতে নিতেই দেখলেন দুখানা ইম্পর্ট্যান্ট মার্কড ইমেল। জন ! খুব জরুরী দরকার না থাকলে তো সে এই সময় পারতপক্ষে তার শান্তি বিঘিত করবে না। না জন তো নয় ! তবে ? ইমেলটা খুলে পড়তে থাকলেন তিনি –“ প্রিয়, ডাক্তার রোডস,রয়্যাল ব্রম্পস এ অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের আই সি ইউ ও এইচডি ইউ পেসেন্টরা হঠাত করেই এক ভয়ঙ্কর সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন ও অধিকাংশই মারা যাচ্ছেন । মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশী, প্রায় ৭০% । বহু চেষ্টা করেও আমরা এই সংক্রমণএর মোকাবিলা করতে পারছি না। আমাদের জানা সমস্ত ওষুধ প্রয়োগ করেও এর সামান্যতম ক্ষতিও আমরা করে উঠতে পারছি না। অতি দ্রুত এই সংক্রমণ এক রোগীর দেহ থেকে অন্য রোগীর দেহে ছড়িয়ে পড়ছে, আর তার জন্য স্যালাইনের নল থেকে, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, অক্সিজেনের নল যেকোন কিছুকেই ব্যবহার করে নিচ্ছে মাধ্যম হিসাবে। এই ভয়াণক পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছে ……”
বার্তার আকস্মিকতায় বেশ কিছুক্ষণের জন্য অভিভূত হয়ে রইলেন জোহানা, বাইরে তখন হিমেল হাওয়ার গর্জন বেড়ে চলেছে। রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল , হৃদযন্ত্রের অসুখের ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চিকিৎসাকেন্দ্র। সবসময়েই লোকে গমগম করে চারতলা হসপিটালের প্রতিটি তলা। জোহানা এই হসপিটালে আগেও এসেছেন। অনেকটা অষ্টাদশ শতাব্দীর কাউন্ট দের প্রাসাদের মত এর গড়ন চিরকালই তাঁর অদ্ভুত লাগে, হসপিটালটা যেন অন্যান্য সব হসপিটালের থেকে আলাদা। দেখতেও যেমন অভিনব, তেমনই সেরা এদের কেবিন ও ওয়ার্ডগুলি, আর নার্সদের ব্যবহার।“ডক্টর রোডস ? নমস্কার, আমি অ্যালিনা, সিডিসি আর ডি ৩১ মেম্বার। আশা করি, আপনি সবই জানেন তবু আমার দায়িত্ব পুরোটা আরেকবার আপনাকে ব্রিফ করা, আসুন, পিপিই টা ড্রেসিং রুমে রাখা রয়েছে, ওখানে যেতে যেতেই আপনাকে ব্রিফ করি” জোহানা এগিয়ে চললেন অ্যালিনার সাথে, তাঁদের এখানে গন্তব্য আইসিউ, কোয়ারেন্টাইনড এলাকা এবং তার পর ল্যাবরেটরি। যে ল্যাবরেটরির একটা কালচার ডিস মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখতে দেখতে বছর পাঁচেক পর তিনি লিখবেন সেই ভয়ঙ্কর উক্তি … “আপনারা করোনাকে ভয়াণক ভাবছেন, আপনারা এখনও এই মাইক্রোস্কোপের নীচের এই বিভীষিকাটির সাথে পরিচিত হননি বলে”।


*****ঘটনা ২, সাল ২০১৫, ডিসেম্বর মাস, স্থান – হাওড়া, ধূলাগড়, ভারত

কদিন আগেই আগেই এই কোম্পানিটায় জয়েন করেছে রুদ্র। ওর জীবনে প্রথম হার্ডকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল চাকরি এটাই। এর আগে বিভিন্ন সার্ভিস প্রোভাইডিং , হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের টেকনিক্যাল পোস্টে কাজ করলেও ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাহিদাটা ছিলই কোর সেক্টরে কাজ করার। এই অদ্ভুত ধূলো ধোঁয়া গ্যালাভানাইজারের জিঙ্কের ঝাঁঝালো বাষ্প, অ্যাসিড পিটের সোঁদা গন্ধ নেহাত খারাপ লাগে না ওর। শুধু সমস্যা হয় ক্যান্টিনে খাওয়ার সময়। মারোয়াড়ী কোম্পানির ক্যান্টিনের সেই চিরকালীন একঘেয়ে নিরামিষ খাবার। তাই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খায় ও আর ওর সাবর্ডিনেট টেকনিশিয়ানের দল। সেদিন ও বাইরে থেকে আনিয়ে নেওয়া ঝুরি-ভাজা খাচ্ছিল ওরা সবাই। বলাই বাহুল্য রুদ্রই স্পন্সর। খেতেও যেমন ভালবাসে, খাওয়াতেও তাই। হঠাতই চিবোনোর সময় একটা টুকরো বেকায়াদায় মুখের ভিতরে উপরের অংশে, তালুতে আঘাত করল আর সঙ্গে সঙ্গে অপ্রত্যাশিত তীব্র যন্ত্রণায় দিগ্বিদিক অন্ধকার হইয়ে উঠল রুদ্রর সামনে।একটা সাধারণ খাবার খেতে গিয়ে এতটা ব্যাথা কিভাবে হতে পারে ভেবে অবাক হচ্ছিল রুদ্র, তাই মোবাইলের ক্যামেরার মাধ্যমে মুখের ভিতরের একটা ছবি তুলল সে । তালুতে অদ্ভুত গভীর এক ক্ষত, যা কোন ভাবেই খাবারের ছোট্ট একটা কণার আঘাতে হওয়া সম্ভব নয়। হাত ধুয়ে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে রুদ্র বুঝতে পারল তার তালুর প্রায় সম্পূর্ণটাই অবশ হয়ে রয়েছে, ব্যাথায় নয় … এ যেন ঠিক লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ইঞ্জেকশনের প্রভাবে হওয়া অবশতা … তবে ??

ঘটনা ৩, সাল ২০১৬, স্থান – কলকাতার পার্কস্ট্রীট


স্মিয়ার টেস্টের রিপোর্ট হাতে নিয়ে বসে আছেন ডক্টর শুভম আগরওয়াল, ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ ম্যাক্সিবুলার অংকোলজিস্ট ডক্টর সৈদুল ইসলামের প্রিয় ছাত্র। কিন্তু সব হিসাব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাঁর পেসেন্ট এই ছেলেটির রোগের গতিপ্রকৃতি খুবই অদ্ভুত। প্রথম দিন ওর মুখের ভিতরের আক্রান্ত জায়গাটা দেখে তিনি বুঝেছিলেন এটা ক্যান্ডীডীয়াসিস। কিন্তু হিসেব টা মিলছে না …
ক্যান্ডীডীয়াসিস একটি ছত্রাক ঘটিত অবস্থা। ক্যান্ডিডা পাঁউরুটি তৈরিতে যে ইস্ট ব্যবহার হয় তার খুব কাছাকাছি গোত্রের একটি ছত্রাক বা পরজীবি (ব্যাক্টেরিয়া), মানুষের দেহে বিভিন্ন জায়গায় যেমন ত্বক, পাকস্থলী, মুখ ইত্যাদি জায়গায় অল্প পরিমাণে বর্তমান থাকে আজীবন। এরা বাতাসে ভেসে বেড়ায় স্পোর হিসাবে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পেলে বা বলা ভাল অনুকুল পরিবেশ পেলে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে। এরা দেহের বিভিন্ন নিসৃত পদার্থর মধ্যে থাকা শর্করা বা পুষ্টিদ্রব্যের উপর নির্ভর করে বাঁচে। কিন্তু কোন কারণে শরীরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অর্থাৎ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে এরা গোটা শরীরটাকেই খাদ্য বানিয়ে ফেলতে সচেষ্ট হয়। এই ধরণের ক্যান্ডিডার আক্রমণেই আমাদের অতি পরিচিত ত্বকের বিভিন্ন চর্মরোগ, নখের পচন ইত্যাদি হয়। আর একবার যদি এটি কোনভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশের উপায় খুঁজে পায়, তাহলে তার মাধ্যমে এটি সারা দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে আর সেগুলিকে ভিতর থেকে বিকল করতে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন শরীর কোন একটা ভাবে দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার অবস্থায় বা ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড হয়ে পড়বে। এটা অনেক ভাবে হতে পারে । কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করার জন্য হতে পারে, আর্সেণিক বা পারদের মত বিষাক্ত ধাতু অনেকদিন একটু একটু করে শরীরে বিষক্রিয়া করলে হতে পারে, অপুষ্টি – ভিটামিন বা খনীজ পদার্থের অভাব ঘটলে হতে পারে, কেমো বা রেডিয়েশন চললে হতে পারে, বড় কোন অপারেশনের জন্য হতে পারে, অত্যাধিক রক্তপাত হলে হতে পারে, ধূমপান – মদ্যপান করলে হতে পারে, জন্মগত রক্তাল্পতা থাকলেও হতে পারে, এরকম আরও বিভিন্ন কারণে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে চর্মরোগ ছাড়াও ক্যান্ডীডার অন্যতম প্রিয় আক্রমণস্থল হল মুখের ভিতরের মিউকাশ মেমব্রেন – গাল, জিভ, দাঁতের মাড়ি এছাড়াও যোনীমুখ ইত্যাদি, এই সব জায়গায় ক্যান্ডীডা সাদা পণীরের মত আস্তরণ তৈরী করে ও সেখানের মিউকাশ লেয়ার গুলিতে ছত্রাকের দেহে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দিয়ে অবশতা তৈরি করে । এর সঙ্গে বেশ কিছু অন্যান্য উপসর্গ জুড়ে যায় যদি ক্যাণ্ডীডা দেহের ভিতরে, অর্থাৎ পাকস্থলি বা অন্ত্রে পৌঁছে যায়। ডায়েরিয়া, যেকোন সময় খাওয়ার পরেই তীব্র নিম্নচাপ, প্রস্রাবে অ্যালকোহলিক গন্ধ, দুর্বলতা এসবও ক্যাণ্ডীডার লক্ষণ। এছাড়া ক্যান্ডীডা সুপার ইনভেসিভ স্টেটে যদি ব্লাডস্ট্রীমে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তীব্র জ্বর ও পরবর্তীতে আস্তে আস্তে মাল্টি অরগ্যান ফেলিওরের দিকে এগোতে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তি। এছাড়াও বেশ কিছু আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই ক্যান্ডীডা খুব তাড়াতাড়ি মানুষ্কের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে ব্রেন ডেথ ঘটাতে পারে খুব অল্প সময়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডিডা আক্রান্ত জায়গায় পরবর্তীতে ম্যালিগ্ন্যানান্সি বা ওরাল ক্যান্সার দেখা দিয়েছে , গবেষণাগারে দেখা গেছে ক্যান্ডীডীয়াসিস ওরাল ক্যান্সারের চান্স অনেকগুণে বাড়িয়ে দেয়।
তবে ক্যান্ডীডীয়াসিস দুরারোগ্য নয়, সাধারণতঃ অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ (ফ্লুকোনোজল ইত্যাদি) প্রয়োগ করলে, ইমিউনিটির উন্নতি ঘটালেই একে কাবু করে ফেলা যায়। নির্মূল ও করা যায়। কিন্তু হিসেবটা সত্যিই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে এই পেসেন্টটির ক্ষেত্রে …
এই ছেলেটির ক্যান্ডীডীয়াসিস তা কনফার্ম করা হয়েছে আগেই (কারণ ক্যান্ডীডীয়াসিস এর মত আরও অনেক অসুখ যেমন লাইক্যান প্লানুস ইত্যাদি মুখের ভিতরে সাদা দাগ – লিউকো প্ল্যাকিয়া তৈরি করতে পারে) । যথারীতি ওষুধও চলছে কড়া ডোজের । খাবার খাওয়ার সময় ন্যাচারাল স্ক্র্যাপিং হয়ে ক্যান্ডীডার ওপরের পণীরের মত সাদা স্তরের আস্তরণ টা উঠে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু ঐ জায়গায় (ছত্রাকের বেশ কিছুটা অংশ মিউকশাল লেয়ারের ভিতরে ইনভেড করায় আস্তরণ টা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সেই জ্যগাটা রক্তাভ লাল হয়ে থাকে ও তীব্র জ্বালার অনুভূতি থাকে) সাধারণ গোলাপী রঙ ফিরে আসার পরে পরেই দেখা যাচ্ছে যে আবার উপরের সাদা লেয়ারটা তৈরি হতে শুরু করেছে অর্থাৎ ক্যান্ডীডা নির্মূল হয় নি। ডিসেম্বর থেকে গত ৫ মাসে প্রায় বার দশেক এই ভাবেই ক্যান্ডীডা কক্ষনোই পুরোপুরি চলে যায় নি। এদিকে ওষুধ কখনও বন্ধ হয়নি। ক্যান্ডীডীয়াসিস ক্রণিক বা রিপিটেড হওয়ার নিদর্শন থাকলেও সেই সব ক্ষেত্রে একবার সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়ার অনেক দিন পরে আবার ইমিউনিটি কম হয়ে গেলে ক্যান্ডীডীয়াসিস ফিরে আসে কিন্তু এরকম একদমই নিরাময় না হওয়ার ঘটনা ডাক্তার আগরওয়াল আগে কখনও দেখেননি বা কোথাও পড়েনওনি। ছেলেটির রক্তে লৌহের মাত্রা কম থাকার কথা আগেই পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল বটে কিন্তু সঠিক সাপ্লিমেন্ট, ডায়েট পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে তা তো এখন নিয়ন্ত্রণে। তবে ? রোগিকে ডাক্তার আগরওয়াল পাঠালেন তাঁর অগ্রজপ্রতীম ডাক্তার অজয় মুখার্জ্জীর কাছে।উপায় একটা ডাক্তার মুখার্জ্জী খুঁজে বার করলেন ঠিকই, তবে সেটা আগে কখনও কেউ করেননি ক্যান্ডীডীয়াসিস নির্মূল করতে, এবং তাতে কাজ হল (চিকিৎসামন্ত্রকের বিশেষ বিধি-নিষেধ থাকায় বিস্তারিত পদ্ধতিটি এখানে লেখা সম্ভব হল না) । পরবর্তীতে যখন দুই ডাক্তার একত্রে বসে তাঁদের কাছে আসা গত কয়েক বছরের রোগীদের কেস ফাইলগুলি পর্যালোচনা করে দেখছিলেন তখন তাঁরা লক্ষ্য করলেন বেশ কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডীডা গোত্রের ছত্রাকের আক্রমণে (সাধারণতঃ ক্যান্ডীডা অ্যালবিকেন্স) সাধারণ অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ সহজে কাজ করছে না। অর্থাৎ ??? অর্থাৎ ক্যান্ডীডা আস্তে আস্তে তার উপর প্রয়োগ করার জন্য তৈরি ছত্রাকনাশক গুলিকে সহ্য করে বেঁচে থাকতে শিখে যাচ্ছে।

ঘটনা ৪, সাল ২০০৯, স্থান – নিউ দিল্লী

ডাক্তার অনুরাধা চৌধুরী তাঁর ল্যাবরেটোরিতে বজ্রাহতের মত বসে আছেন। নিওনেটাল ইউনিট থেকে আসা এই টেস্ট স্যাম্পেলগুলি কিসের ??? এমন কোন ছত্রাক তো তিনি আগে দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না তাঁর। এই ক্যান্ডীডা সদৃশ জীবানুটি একের পর এক শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে চলেছে আর তার চেয়েও বড় কথা প্রচলিত কোন ছত্রাকনাশক ওষুধই কার্য্যকারী হচ্ছে না এর প্রতিরোধে, অ্যাজোল, অ্যাম্ফোটেরিশিন, ফাঙ্গীন সব গ্রুপের ওষুধেই এরা শুধু যে বেঁচে থাকছে তাই না, বৃদ্ধিও হচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই। তবে কি এ নতুন কোন প্রজাতি আবিষ্কার করে ফেললেন তিনি ? হঠাত মনে পড়ে গেল জাপানের মেডিক্যাল জার্ণালে প্রকাশিত বছর দুয়েক আগের একটি ঘটনা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির কান থেকে প্রাপ্ত এই ছত্রাকের উল্লেখ ছিল, আর কানের ল্যাটিন নাম অরিস অনুযায়ী যার নামকরণ করা হয় ক্যান্ডিডা অরিস।
তড়িঘড়ি ডাক্তার চৌধুরী নির্দেশ দেন, সিল করে ফেলতে হবে আক্রান্ত সমস্ত ইউনিট গুলি, মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কারণ তিনিযে দেখেছেন কি ভয়ঙ্কর দ্রূত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে এই ছত্রাক, লেগে থাকে টেবিল, পোশাক, দরজার হাতল সর্বত্র … দৃঢ় ভাবে, সাবান, স্পিরিট কোন কিছু দিয়েই সহজে দূর করা যায় না একে, অতয়েব … আটকে দিতে হবে উৎসেই ……
ডাক্তার অনুরাধার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতকে এক ভয়ানক মহামারির হাত থেকে সেদিন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল, শুধু সেদিনই নয়, আবার কর্মীদের গাফিলতিতে ২০১৩ সালে যখন ছড়িয়ে পড়ছিল ক্যান্ডিডা অরিস বা সি অরিস দ্রুত গতিতে, তখনও মাঠে নেমেছিলেন ডাক্তার চৌধুরী … ত্রাতা হয়ে … যে খবর দেখানো হয়নি কোন সংবাদ মাধ্যমে …

ঘটনা ৫, সাল ২০২১, স্থান – পৃথিবী

ছত্রাক, পৃথিবীর অন্যতম আদিম অধিবাসী। প্রাণীর সঙ্গে যার অনেক মিল বৈশিষ্ট ও ব্যবহারে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক হল ছত্রাকের মাইসিলিয়ামের নেটওয়ার্ক যার জাল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মতই। তারা প্রবল, মৃত্যু তাদের পরিচারক, মৃত বস্তুই যে তাদের আহার। তারা অসীম শক্তিশালী, অনন্য সাধারণ তাদের ছড়িয়ে পড়ার, বংশ বিস্তারের ক্ষমতা।এ পৃথিবীর কিছুই তাদের অভক্ষ্য নয়।
এতদিনে চিকিৎসা জগতে ক্যান্ডীডা অরিস পরিচিত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এর ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতা, সত্তর শতাংশের কাছাকাছি মৃত্যুহার ভয় ধরিয়েছে সবার মনেই। আমেরিকার সিডিসি এটিকে পৃথিবীর অন্যতম বিপদ চিহ্নিত করেছে ২০১৯ সালে এবং হসপিটাল গুলিতে নিরন্তর এই ইনফেকশন খুঁজে বের করে তাকে কোয়ারেন্টাইন করে নির্মূল করার রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। যেহেতু এই সংক্রমণ মূলতঃ হাসপাতালে অসুস্থ (কোমরবিডীটিযুক্ত, ইমিউনোকম্প্রোমাইজড) ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ছড়াতে শুরু করে তাই এই সুপারবাগটিকে যাতে হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যায় তার জন্য কঠীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা, জাপান, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ভারতের মত দেশ। এই ভয়াণক সংক্রমণ যদি লোকালয়ে … বিশেষত ভারতের মত অধিক জনঘনত্বের দেশে ছড়িয়ে পড়ে তবে তার ফল হবে মারাত্বক। কিন্তু নিয়তির নির্মম অঙ্গুলীহেলনে করোনা ভাইরাস মহামারীর আঘাতে সম্ভব হল না এই পরিকল্পনা সফল করা। বিশাল সংখ্যক জনসংখ্যাকে হাসপাতালমুখী হতে হল কোভিড সংক্রমণ নিয়ে আর তার সাথে সাথেই সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ক্যান্ডীডা অরিস নামের অদৃশ্য শত্রু, যা করোনার থেকেও নির্মম মারক (করোনার ডেথ রেট যেখানে এক শতাংশের মত সেখানে ক্যান্ডিডা অরিসের মৃত্যু হার প্রায় ৩০ – ৭০ শতাংশ)। মাত্র কিছুদিন আগে আন্দামানের মত নির্জন সৈকতেও উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে ক্যান্ডিডা অরিস বা সংক্ষেপে সি অরিস এর, যার অর্থ সমুদ্রপথে বাহিত হয়ে এই ভয়ানক মৃত্যুকীট পৌঁছে গেছে সবকটি মহাদেশেই, পৃথিবীর কোন প্রান্তই আজ আর সুরক্ষিত নয় !


কারণ কি ?

এই ছত্রাকের প্রজাতিগুলি বহুবছর ধরে মানুষের সাথে সহাবস্থান করছে, তাহলে আজ হঠাত এদের এই ভয়ানক হয়ে ওঠার প্রবণতা কেন ? বৈজ্ঞানিকরা বলছেন মূলতঃ দূষণ এবং মানুষের নির্বোধতা। গত কিছু দশকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে অনেকটা, আর তার সর্বোচ্চ প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর নিরক্ষীয় উষ্ণ অঞ্চলগুলিতে। আগে দেহের জীবাণু নিধনের অন্যতম অস্ত্র ছিল জ্বর। সংক্রমণ ঘটলে দেহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করার নামই জ্বর। কিন্তু এখন বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে জীবাণুগুলি বেশী তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাই জ্বর তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সংগে আছে বিভিন্ন রাসায়নিক মাত্রাতিরিক্ত হারে জলে ও মাটিতে ছড়িয়া পড়ে এই জীবানুগুলিকে বিষাক্ত পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম করে তোলা, আর সর্বোপরি মানুষের নিজে ডাক্তারী করার স্বভাব। অধিকাংশ মানুষই যেকোন রোগ হলে বিন্দুমাত্র পড়াশোনা, পরীক্ষা না করে, ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজে অথবা ফার্মাসিস্টের মুখস্ত বিদ্যার উপর ভরসা করে বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে নেন। এবং যে ওষুধটি খাচ্ছেন তার নিয়ম অনুযায়ী পুরো কোর্সটা কমপ্লিট করেন না। ধরা যাক কারোর সর্দি জাতীয় অসুখ হয়েছে, তিনি ডাক্তার না দেখিয়ে সর্দির গতিপ্রকৃতি বিচার না করে দোকানে গিয়ে অ্যাজিথ্রোমাইসিন কিনে আনলেন। দুটি খাওয়ার পরেই তাঁর সর্দি মোটামুটি কমে গেল, আর তিনিও বেশী অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কিডনি খারাপ হয়ে যাবে ইত্যাদি বিজ্ঞবাক্য স্মরণ করে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের বাকি তিনটি ওষুধ আর খেলেন না। এদিকে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মিনিমাম ডোজ হয়তো পাঁচটার। এর ফলে কি হল ? তিনি নিজের তো ক্ষতি করলেনই সাথে সাথে সমাজের ক্ষতি করলেন। দুটি ট্যাবলেট খাওয়ায় তাঁর শরীরে থাকা অধিকাংশ জীবানু হয়ত ধ্বংস হল, সেই কারণেই তাঁর অসুখের কিছুটা উপশম হল। কিন্তু কিছু জীবাণু যারা একটু বেশী সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন তারা সংখ্যায় কম হলেও কিন্তু টিকে গেল। এদের মারার জন্য দরকার ছিল ঐ বাকি তিনটি ট্যাবলেটও নিয়ম মত খেয়ে কোর্স কমপ্লিট করা। এই যে অ্যাজিথ্রোমাইসিন সহ্য করেও টিকে যাওয়া জীবানুগুলি ন্যাচারাল সিলেকশন অনুযায়ী যখন আবার বংশবিস্তার করে একটি নতুন কলোনী তৈরি করবে তাদের উপর কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিন আর তেমন করে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এই জীবানুগুলি হল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু, এখন এরা যদি এই প্রথম ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য কোন ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হয় তাহলে তিনি কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিনের পুরো কোর্স অনুযায়ী সব কটি ওষুধ খেলেও কিন্তু আর কাজ হবে না। এঁকে অন্য কোন গ্রুপের ওষুধ খেতে হবে। দ্বিতীয়ব্যক্তিও যদি আবার নতুন গ্রুপের ওষুধের কয়েকটি মাত্র খেয়ে আর কোর্সটা কমপ্লিট না করেন, তাহলে রয়ে যাওয়া জীবাণূগুলি অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সাথে সাথে এই নতুন অ্যান্টিবায়োটিকটিতেও রেজিস্ট্যান্ট হবে। এটা একটা সাধারণ উদাহরণ দিলাম মাত্র, কিন্তু বাস্তবিক এই রকম ভাবেই কিন্তু মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (অর্থাৎ যাদের উপর কোন পরিচিত ওষুধই কাজ করে না) জীবাণু তৈরি হয়। ক্যান্ডিডা প্রজাতির বিভিন্ন জীবাণুর যথা, অ্যারিস, অ্যালবিকন্স, হাইমুলনী ইত্যাদির মাল্টিড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠার পিছনে এগুলিই সম্ভাব্য কারণ।


করণীয় ?

সর্বাগ্রে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা যেকোন উপায়ে বাড়িয়ে তোলা, ভাল সুষম খাবার খাওয়া, খাদ্যে লৌহের মাত্রা ঠিকঠাক বজায় রাখা, কাঁচা ফল ইত্যাদি খাওয়া, ভিটামিন যুক্ত খাবার খাওয়া । দেখা গেছে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাস্থবান মানুষকে খুব সহজে ক্যান্ডিডা আক্রমণ করতে পারে না। ডায়াবেটিস, রেনাল ফেলিওর, স্থূলত্ব ইত্যাদি ক্যান্ডীডার আক্রমণকে সহজতর করে দেয়। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, নিমপাতাযুক্ত জলে স্নান, পরিস্কার থাকা, খুব দরকার না হলে পারতপক্ষে হাসপাতাল এড়িয়ে চলা, এগুলি জরুরী। সাথে সাথেই যদি ব্যক্টেরিয়াল ইনফেকশনে কারুর জ্বর হয়, এবং জ্বর কমানোর ওষুধ দেওয়ার পরও তাপমাত্রা না নামে তবে তাকে দেরী না করে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনা দরকার। ক্যান্ডিডা অরিস, হাইমূলনী ইত্যাদির মৃত্যুহার খুব বেশী হলেও সময় মত চিকিৎসায় অনেকক্ষেত্রে নিরাময় সম্ভব, ডাক্তাররা বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অতি উচ্চ মাত্রায় “এচিনোক্যান্ডিন্স” নামক একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন। আরেকটি কথা ক্যান্ডীডা আক্রান্ত মানুষের দেহে মাসাধিক কাল, কিছু ক্ষেত্রে বছরও ক্যান্ডীডার অস্তিত্ব থেকে যায়, তাই সংক্রমণএর ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলা ও সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা দরকার। গরম ফুটন্ত জল ক্যান্ডিডার বিনাশ করতে স্বক্ষম, তাই স্যানিটাইজেশনের জন্য যে যে জায়গায় সম্ভব ফুটন্ত জল ব্যবহার করা যেতে পারে। সর্বোপরি প্রতিটি মানুষ দায়িত্ব নিলে, সচেতন হলে, হয়ত আগামীর এই মহামারীকে রুখে দেওয়া সম্ভব।

বিঃদ্রঃ – এটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প ভেবে ভুল করবেন না।

আগাছা না বনৌষধি ? – ১

নমস্কার পাঠকবর্গ। আগের লেখাটিতেই আমি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলাম, পরিচিত হয়েও অপরিচিত উদ্ভিদগুলির ব্যবহার ও ভেষজ গুণগুলি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা যে কি ভীষণ দুরুহ তা অনুভূত হল, যখন দেখলাম আগাছা, অর্থাৎ যে উদ্ভিদেরা নিতান্তই অবহেলায় যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকে, আধুনিক ভেষজবিজ্ঞানে তাদের নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত দুর্লভ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বন্দময়। অপর দিকে প্রাচীন ভারতীয় ও অন্যান্য সংস্কৃতিতে তাদের ভেষজ ব্যবহার থাকলেও (যদিও তাদের যথাযথ বিবরণ, নাম, ইত্যাদি তথ্য হয় অস্পষ্ট নয়তো অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের শনাক্তকরণ অসম্ভব জটিল) তা আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক চোখে পরীক্ষিত নয়। তাই একটি মাত্র উদ্ভিদের সম্বন্ধে লিখতেও পাহাড় প্রমাণ গবেষণা করতে হচ্ছে। আরও একটি অসুবিধার কারণ উদ্ভিদবিদ্যা সম্বন্ধে আমার প্রথাগত শিক্ষার অভাব (আমি পেশায় একজন অধ্যাপক, বিদ্যুৎ প্রকৌশল ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাদি বিষয়ক)। তবুও আমার মত নেহাতই একজন শখের ভেষজপ্রেমীর কাজ যদি ভবিষ্যতে কোন যোগ্যতর ভেষজবীদের এ বিষয়ে বিশদ গবেষণার আগ্রহ জন্মাতে স্বার্থক হয়, তবে আমার পরিশ্রম সফলজ্ঞান করব ।

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, ছোট থেকেই আরেকটি শখ (প্রাচীন বস্তু খুঁজে বার করার প্রচেষ্টা) এর বশে বেশ কিছু পুরোনো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান করে খুঁজে পেয়েছিলাম বেশ কিছু পুঁথি (যেগুলি বর্তমানে এশিয়াটিক স্যোশাইটির কাছে গচ্ছিত)। যার মধ্যে একটি অতি দুর্লভ ছবি যুক্ত পুঁথিও ছিল, ছবিগুলি কালি দিয়েই আঁকা, খুব স্পষ্ট নয়, দেখতে উদ্ভিদের মতই। এশিয়াটিক স্যোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটার আগেই আমি পুঁথি প্রাপ্তিস্থানের নিকটবর্তি হুগলির পুরশুড়া গ্রামে হারান কবিরাজ (হারান ভট্টাচার্য্য) নামে অশীতিপর এক আয়ুর্বেদাচার্য্যের সন্ধান পাই। তিনি পুঁথিটির ভাষ্য উদ্ধার করতে সমর্থ না হলেও তাঁর সঙ্গে আমার দাদু-নাতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং মূলত তাঁর কারণেই পরবর্তিতে আমার বিভিন্ন উদ্ভিদের ঔষধি গুণ সম্বন্ধে আগ্রহ জন্মায়। তিনি আজ নেই, তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই সিরিজটি নিবেদন করে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার সামান্য প্রচেষ্টা করলাম।

হারান দাদু আমায় বিভিন্ন গাছ চিনিয়েছিলেন, এতে আজীবন উদ্দানপ্রেমী আমার মাতামহেরও যথেষ্ঠ উৎসাহ ছিল। তবে সেসময় অপরিণত বুদ্ধির কারণে তাঁর চেনানো উদ্ভিদগুলির কোন নির্দিষ্ট নোট নেওয়া নেই। তাই উদ্ভিদগুলি ও তাদের কিছু কিছু লোকায়ত ব্যবহার মনে থাকলেও তাদের নাম গুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিস্মৃত হয়েছি। একারণেই বর্তমানে নতুন করে সেগুলি নিয়ে খোঁজখবর করার জন্য প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য বই (এ ক্ষেত্রে ফেসবুক গ্রুপ মলাটের অবদান নতমস্তকে স্মরণ করি), ইন্টারনেটের (ফেসবুক গ্রুপ বৃক্ষকথার কাছে অনন্ত কৃতজ্ঞ) সাহায্য নিয়েছি।

আজকে যে উদ্ভিদটির কথা বলব তার কোন নির্দিষ্ট বাংলা নাম নেই। অনেক জায়গায় এটিকে বনপালং বলে উল্লেখ করা হলেও আসল বনপালং (Rumex crispus) সম্পূর্ণ আলাদা একটি উদ্ভিদ। হারাণ দাদু এর নাম যতদূর মনে করতে পারি বলেছিলেন “দুধেরা” বা “দুদরোয়া” কিন্তু আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তির ওপর খুব একটা নির্ভর করতে পারছি না। তাই এর নাম রাখলাম “মূলা পাতা”, কারণ এর অপরিণত পাতাগুলি অনেকটাই মূলার পাতার মত দেখতে, এছাড়াও নেপালে অনেক অঞ্চলে এটি “মূলা-পাত্তে” (मुलापाते) বলে পরিচিত। তবে এক্ষেত্রে একটি আগ্রহদ্দীপক তথ্য দিয়ে রাখি, নেপালের অনেক অঞ্চলে এটি কিন্তু “দুধে” (दुधे) বা “বন-রায়া” (बन रायो) বলেও পরিচিত।

এই উদ্ভিদটির সম্বন্ধে বলা হারাণ দাদুর কথাগুলির মধ্যে যেটি মনে আছে তা হল, যে এটি পাকস্থলী ও যকৃত দৌর্বল্য, মধুমেহ ইত্যাদি কঠীন রোগের ক্ষেত্রে ফলদায়ক, এছাড়াও এটি অনিয়মিত ঋতুর ক্ষেত্রেও বিশেষ উপকারী। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায় এটির নিরাময় ক্ষমতার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে এর পরিচয় খোঁজার ক্ষেত্রে খুবই সমস্যায় পড়লাম, নাম না মনে থাকায়। উদ্ভিদটির প্রথম যা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল সূর্যমুখী সদৃশ দৃষ্টি নন্দন ফুল। তাই সেই ফুলের ছবি ফেসবুকের বৃক্ষকথা গ্রুপে পোস্ট করে সাহায্য চাইলাম। সেখানে সমাপ্তি ভট্টাচার্য্য ঠাকুর লিখলেন যে এটি ব্লুমিয়া গোত্রের উদ্ভিদ। ব্লুমিয়ার সঙ্গে আমার আদৌ পরিচয় না থাকায় ইন্টারনেট সহায়ে বেশ কিছু পড়া-শোনা করে মূলা-পাতার ফুলের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে এমন একটি ব্লুমিয়া গোত্রের ফুল খুঁজে পাওয়া গেল। এই ব্লুমিয়াটি (Blumea Lanceolaria) মিজোরাম অঞ্চলে জন্মায় ও আঞ্চলিক ভাষায় “তেরাপাইব্বি” নামে পরিচিত। কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্ভিদের ছবি দেখে বুঝলাম এটি আমার পরিচিত উদ্ভিদটি নয়। তবে উদ্ভিদের বিবরণে আরেকটি লাইনে আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, তা হল এই তেরাপাইব্বি কে “মিজোরামের ড্যান্ডেলিয়ান” বলা হয়।

ড্যান্ডেলিয়ন বহু ভেষজগুণসম্পন্ন একটি উদ্ভিদ, তবে তার ফুলের সঙ্গে পরিচিত হলেও পুঙ্খানুপুঙ্খ গঠন আগে কখনও বিচার করে দেখিনি। ইন্টারনেটের সহায়তায় খুঁটিয়ে দেখে এর একটি প্রজাতির (Taraxacum officinale) সঙ্গে আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদের ফুলের সম্পূর্ণ মিল খুঁজে পেলাম। কিন্তু আবার নিরাশ হতে হল এর সম্পূর্ণ উদ্ভিদের গঠন দেখে, যা বেশ কিছু সাযুজ্য থাকলেও কখনই আমাদের আলোচিত উদ্ভিদটি নয়।

এর পর অনুসন্ধান করতে গিয়ে অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম কারণ এই রকম পুষ্প সম্বলিত একাধিক উদ্ভিদ আছে, যাদের নিজেদের গঠনের মধ্যে নানা সাযুজ্য থাকলেও তারা আলাদা গোত্রের, এবং কোন ভাবেই আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদটি নয়। এদের মধ্যে হকউইড (Crepis pulchra) ও বিড়ালকর্ণীর (Hypochaeris radicata) কথা উল্লেখযোগ্য। অবশেষে অনেক অনুসন্ধানের পর আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদটি, যার নাম দেওয়া হল মূলা-পাতা সেটিকে Sonchus wightianus হিসাবে শনাক্ত করা গেল। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত কিন্তু দারুণ তথ্যও এই সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এই ধরণের ফুল যুক্ত যে যে উদ্ভিদগুলি দেখলাম তারা আলাদা আলাদা গোত্রের হলেও দু একটি বাদ দিয়ে প্রায় সবকটিই ভেষজ গুণাবলি যুক্ত হওয়া ছাড়াও খাদ্যযোগ্য এবং পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তাদের ভোজ্য শাক হিসাবে প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহারের প্রমাণ আছে।

বিশেষ অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম, মূলা-পাতা ও ড্যান্ডেলিয়ান খুবই কাছাকাছি আত্মীয়। দুটিই একই পরিবারভুক্ত বলা চলে (Cichorieae)। তাই দুটির মধ্যে ফুল, পাতার গঠন, বীজ ছড়ানোর পদ্ধতি, বাসস্থান, আগ্রাসী প্রকৃতি ও ভেষজ গুণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসংখ্য সাযুজ্য দেখা যায়। যদিও এখনও মূলা-পাতা নিয়ে সেভাবে গবেষণা হয়নি তবে যদি সত্যিই ড্যান্ডেলিয়নের মত ভেষজ গুণ মূলা-পাতায় থেকে থাকে, তবে তা হবে আমাদের উপমহাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ড্যান্ডেলিয়ানের স্পষ্ট উল্লেখ আছে সিংহদন্তী নামে (এর পাতার আকার সিংহের দাঁতের মত খাঁজ কাটা বলে)। অসংখ্য প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সিংহদন্তীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন – চক্রদত্ত, সুশ্রুত, চরকসংহিতা, হরিৎসংহিতা, বাস্তুগুণদীপিকা, বাস্তুগুণপ্রকাশিকা ইত্যাদি। তাই মূলা-পাতার ভেষজ গুণ সম্বন্ধে আলোচনার আগে দেখে নেওয়া যাক ড্যান্ডেলিয়নের বিভিন্ন ব্যবহার ও ভেষজ গুণ।

ড্যান্ডেলিয়ান ফুলের সঙ্গে সূর্যমুখী ফুলের খুব মিল থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে অন্য একটি পরিচিত ফসলের সঙ্গে কিন্তু এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তা হল লেটুস, যে কারণে ড্যান্ডেলিয়ান গোত্রিয় বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ বন্য লেটুস, তেঁতো লেটুস ইত্যাদি নামেও পরিচিত। প্রায় ১৫০০০ বছর আগেকার কয়েকটি ফসিলে ড্যান্ডেলিয়ানের অস্তিত্বের নমুনা পাওয়া গেছে, অতয়েব বলা ই যায় এটি যথেষ্ট পুরানো একটি উদ্ভিদ। প্রাচীন কাল থেকেই এর ব্যবহার মানুষ ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে হয়ে আসছে। তবে এর স্বাদ যথেষ্ট তিক্ত। প্রাচীন কালেও এর তিক্ত স্বাদ বদলাবার উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ বহু বছর ধরে নির্বাচিত রোপন (সিলেক্টিভ ব্রীডিং) পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত কম তিক্ত প্রজাতিগুলির সন্ধান ও রোপনের মাধ্যমে আজকের লেটুসের সৃষ্টি হয়েছে।

ড্যান্ডেলিয়ান সাধারণতঃ কবোষ্ণ (নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, যেখানে শীত ও গ্রীষ্ম ছাড়াও শরত ইত্যাদি ঋতু গুলির আবহাওয়া পরিবর্তন স্পষ্ট) অঞ্চলে জন্মায়। কোন কোন অঞ্চলের আবহাওয়া ড্যান্ডেলিয়ান জন্মানোর উপযোগী, তার সমীক্ষা করে প্রকাশিত ভৌগলিক মানচিত্রে ভারতের উত্তরপূর্বের অনেকাংশ এবং বাংলাদেশের বেশ কিছুটা অঞ্চলও কিন্তু ড্যান্ডেলিয়ান জন্মানোর উপযুক্ত পরিবেশ বলে দর্শিত হয়েছে।

ড্যান্ডেলিয়ান সাধারণতঃ নদীর ধার, জলা জমির পাড়, রাস্তার পাশে, ফাঁকা জমিতে সর্বত্র জন্মাতে পারে এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে, অ্যাসিডিক মৃত্তিকাতে, কম জলের যোগানেও টিকে থাকতে পারে। এই সব কারণেই আমেরিকা ও ইউরোপের যে অঞ্চলগুলিতে এটি জন্মায়, সেখানকার কৃষকরা এটিকে আগাছা বলেই মনে করেন।

মজার ব্যাপার হল ড্যান্ডেলিয়ান প্রধানত ইউরোপ ও এশিয়ার উদ্ভিদ হলেও আমেরিকাতে প্রথম ড্যান্ডেলিয়ান নিয়ে যাওয়া হয় খাদ্য শষ্য হিসাবেই। আগেই বলেছি এটি প্রাচীন কাল থেকেই শাক হিসাবে খাওয়ার চল ছিল বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। ড্যান্ডেলিয়ান গাছের সবুজ অংশ পুষ্টিগুণে ভরপুর। একটু তালিকাটা দেখে নেওয়া যাক –

প্রতি ১০০ গ্রামে পুষ্টিগুণ – ৩.৫ আউন্স, এনার্জী ২৫ কিলোক্যালরি , কার্বোহাইড্রেট ৯.২ গ্রাম , শর্করা ০.৭২ গ্রাম , পৌষ্টিক ফাইবার   ৩.৫ গ্রাম , ফ্যাট ০.৭ গ্রাম , প্রোটিন ২.৭ গ্রাম ,

ভিটামিন এর পরিমাণ : ভিটামিন এ – ৫০৮ মাইক্রোগ্রাম , বেটা ক্যারোটিন – ৫৮৫৪ মাইক্রোগ্রাম, ল্যুটেনিন জেক্স্যান্থিন – ১৩৬১০ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন (ভিটামিন বি ১) – ০.১৯ মিলিগ্রাম, রাইবোফ্ল্যাভিন (ভিটামিন বি ২) – ০.২৬ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন (ভিটামিন বি ৩) – ০.৮০৬ মিলিগ্রাম, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি ৫) – ০.০৮৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ৬ – ০.২৫১ মিলিগ্রাম, ফোলেট (ভিটামিন বি ৯) – ২৭ মাইক্রোগ্রাম, ক্লোইন – ৩৫.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি – ৩৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই – ৩.৪৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে – ৭৭৮.৪ মাইক্রোগ্রাম,

খনিজের পরিমাণ : ক্যালসিয়াম – ১৮৭ মিলিগ্রাম, আয়রন – ৩.১ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম – ৩৬ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ – ০.৩৪২ মিলিগ্রাম , ফসফরাস – ৬৬ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম – ৩৯৭ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম – ৭৬ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক – ০.৪১ মিলিগ্রাম

এছাড়াও উদ্ভিদটি অত্যন্ত রস বা জল সমৃদ্ধ ।

ঠিক এই কারণেই এই উদ্ভিদটি বিভিন্ন দেশের মানুষ বিভিন্ন রকম ভাবে ব্যবহার করে থাকেন। বিভিন্ন দেশের বাজারে ড্যান্ডেলিয়ান বেশ উচ্চমূল্যে বিক্রিও হয়। শাক ভাজা হিসাবে খাওয়া ছাড়াও, কাঁচা পাতা স্যালাড হিসাবে বেশ জনপ্রিয়। কচি পাতা ও সিদ্ধডিমের একটি পদ তো রীতিমত ডেলিকেসি। এছাড়াও এর ফুল উৎকৃষ্ট সুরা, পানীয়, জ্যাম জেলী, মধু-বিকল্প ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়।

ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড় চূর্ণ উৎকৃষ্ট কফি বিকল্প হিসাবে ব্যবহার হয়। আর যেহেতু এই কফির স্বাদ কফির মতই কিন্তু ক্যাফেইন অনুপস্থিত, তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

এবার আসি এর নিরাময়ক গুণগুলির আলোচনায়। বিভিন্ন সংস্কৃতির বিশ্বাস অনুযায়ী ড্যান্ডেলিয়ান একটি যাদুময় উদ্ভিদ। এর বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আমি আগেই বলেছি প্রচলিত বিশ্বাস গুলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের আতসকাঁচের তলায় ফেলে যাচাই করে নেব।

আমাদের অনেকের কাছেই ল্যাসিক্স (Furosemide) একটি পরিচিত নাম, সাধারণতঃ রোগির প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে ভারতীয় হাসপাতালগুলিতে এই ওষুধটি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয় প্রস্রাব নিঃসরণ বৃদ্ধি করার জন্য। এটি একটি diuretic জাতীয় ওষুধ। Diuretic আরও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, যকৃত ও কিডনির রোগ ইত্যাদি। এছাড়াও প্রিডায়াবেটিক (অর্থাৎ যার অদূর ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হতে চলেছে) রোগির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়ে থাকে। ড্যান্ডেলিয়ানের মূত্রকারক গুণের কথা প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের জানা ছিল। বিশেষতঃ কাব্যপ্রিয় ফরাসীরা তো এর নামই দিয়ে দিয়েছিল “শয্যাসিক্তকারক” (pissenlit)। বর্তমানে ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় (https://www.liebertpub.com/doi/10.1089/acm.2008.0152) যদিও দেখা গেছে যে এটি মানুষকে বার বার প্রস্রাবে যেতে বাধ্য করলেও সমগ্র নিঃসারিত মূত্রের পরিমাণ একই থাকে। তাই মূত্র বেশী পরিমাণে তৈরিতে এটি কার্য্যকর নয়, যদিও মূত্রথলীর পেশীর কোন সমস্যার জন্য মূত্র বন্ধ হয়ে গেলে এটি যথেষ্ট কার্যকারী। তবে এবিষয়ক আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ড্যান্ডেলিয়ানের নির্যাস ও বাঁটা শিকড়ের প্রলেপ দাদ, একজিমা, ব্রণ সহ বিভিন্ন চর্মরোগের নিরাময় করতে সক্ষম। এমনকি চামড়ার ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। এখন দেখা যাক বর্তমান গবেষণা কি বলে এ বিষয়ে। আশ্চর্য্যজনক ভাবে ২০১৫ সালের প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফলে (https://www.hindawi.com/journals/omcl/2015/619560/) দেখা যাচ্ছে যে ড্যান্ডেলিয়ানের প্রলেপ ত্বকের জ্বালা, কন্ড্যূয়ণেচ্ছা (চুলকানি) কমাতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, এটি সূর্যের ক্ষতিকারক আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক কে রক্ষা করে, ফলে ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।

প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ সহ বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ভেষজবীদগণ মধুমেহ বা ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণে সিংহদন্তীর ব্যবহারের কথা বলে গিয়েছেন। ২০১৬ সালের ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় (https://doi.org/10.1900/RDS.2016.13.113) উঠে এসেছে, ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড়ের নির্যাসে ইন্যুলিন নামক এক ধরণের ডায়েটরি ফাইবার বর্তমান যা পাচনক্রিয়ায় কিছু প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রক্তে শর্করা যোগ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলশ্রুতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অন্যদিকে এর মধ্যে থাকা একটি অভূতপূর্ব জৈব যৌগ (বিজ্ঞানীরা এর গঠন সম্বন্ধে এখনও নিশ্চিত নন) অগ্ন্যাশয়ের কোষ গুলিকে বেশী মাত্রায় ইন্স্যুলিন ক্ষরণে সাহায্য করে, ফলে বাইরে থেকে ইন্স্যুলিন নেওয়ার পরিমাণ কমে।

ড্যান্ডেলিয়ানের যকৃতের অসুখে উপকারীতার কথা বার বার উঠে এসেছে প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও ইউনানী শাস্ত্রে। যদিও এতদিন একটি গবেষণায় (https://doi.org/10.3390/molecules22091409) সামান্য কিছু প্রমাণ পেলেও কার্য্য কারণের যথার্থ প্রয়োগ ও প্রমাণের অভাবে এই দাবীর সারবত্তা বিচার করা সম্ভব হয় নি। তবে ২০১০ সালে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় (https://doi.org/10.1016/j.jep.2010.05.046) বেশ কয়েকটি আশ্চর্য্য বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায়, ড্যান্ডেলিয়ান শিকড়ের নির্যাস ইঁদুরের যকৃতের ফাইব্রোসিস (যা পরবর্তীতে ক্যান্সারের মত কঠীন অসুখের রূপ নেয়) অসম্ভব দ্রূততায় কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। ক্ষতিকর কোষগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে যকৃতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটিকে ধীরে ধীরে নিরাময় হতে সাহায্য করছে। এই নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে।

আমাদের দেহের নিয়ম অনুসারে একটি কোষ বেশ কিছুদিনের পুরোনো হয়ে যাওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে, তার জায়গা নেয় নতুন একটি কোষ, এই ঘটনাকে কোষের প্রোগ্রামড ডেথ বা অ্যাপোপটোসিস বলে। কিন্তু ক্যান্সার কারক কোষ বা টিউমারের ক্ষেত্রে এই নিয়মানুযায়ী মৃত্যু ঘটেনা। সেটি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে এবং একটি বিশেষ পদার্থের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশের কোষগুলির মধ্যেও এইরকম প্রবণতা ছড়িয়ে দেয়। ২০১২ সালের কানাডার উইন্ডসর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় (https://doi.org/10.1097/MPA.0b013e31824b22a2) দেখা গেছে ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড়ের নির্যাস অগ্ন্যাশয় ও প্রস্টেটের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে টিউমার কোষটিকে অ্যাপোপটোসিস বা প্রোগ্রামড ডেথে বাধ্য করে। অন্য আরেকটি গবেষণায় (https://doi.org/10.18632/oncotarget.11485) এটাও দেখা গেছে যে ড্যান্ডেলিয়ানের অনুরূপ কিছু প্রজাতির এই রকম শিকড়ের নির্যাস কিছু বিশেষ লিউকোমিয়া ও মেলানোমার ক্ষতিকারক কোষ গুলির অ্যাপোপটোসিস ঘটাতে সক্ষম। তবে এই যুক্তিগুলির সপক্ষে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে।

তবে এই সঙ্গে এটাও বলে রাখা দরকার বিভিন্ন গবেষণায় (https://doi.org/10.3205/000203) এটা দেখা গেছে যে বিভিন্ন বাজার চলতি ওষুধের সঙ্গে ড্যান্ডেলিয়ানের কিছু প্রতিক্রিয়া বা ইন্ট্যার‍্যাকশন আছে। তাই কোন ওষুধ ব্যবহার করার সময় ড্যান্ডেলিয়ান ব্যবহার করতে হলে এ বিষয়ে বিশেষ ভাবে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। এছাড়াও ড্যান্ডেলিয়ানে থাকা একটি পদার্থ, ফাইটো ইস্ট্রোজেন, শরীরে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বৃদ্ধি করে, তাই এটি মহিলাদের (বিশেষত যাদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম রয়েছে) অনিয়মিত ঋতুতে বিশেষ উপকারী হলেও এটির গর্ভপাত করার ও পুরুষদের উর্বরতা হ্রাসের ক্ষমতা রয়েছে। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ড্যান্ডেলিয়ানে অ্যালার্জী ও তার প্রভাবে ত্বকে নানা উপসর্গ ও হজমের সমস্যা দেখা গেছে (https://doi.org/10.1016/j.jep.2015.03.067)।

যুক্তরাষ্ট্রে ঔষধের দোকানে ড্যান্ডেলিয়ান ক্যাপসুল হিসাবেও বিক্রয় হয়, এবং এটি একটি রেজিস্টার্ড ড্রাগ।

তাই আশা করি বুঝতেই পারছেন, বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশে ড্যান্ডেলিয়ানের সমগুণযুক্ত একটি উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া (যেটি আবার বিনা যত্নেই যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে) কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আসা যাক আমাদের মূল আলোচ্য উদ্ভিদ মূলা-পাতার কথায়। মূলা-পাতা একটি সঙ্কাস বা চলতি কথায় থিসল গোত্রের উদ্ভিদ। এর অন্য কয়েকটি প্রজাতি যেমন – Sonchus oleraceus , Sonchus arvensis ইত্যাদি বিশ্বের বহু দেশে স্যালাড হিসাবে খাওয়া হয়। এদের পাতার স্বাদও ড্যান্ডেলিয়ানের মতই তীক্ত। এছাড়া প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এদের ড্যান্ডেলিয়ানের মতই অনিয়মিত ঋতু নিরাময়ে, মধুমেহ নিয়ন্ত্রণে ও হজম সংক্রান্ত সমস্যা দূরিকরণে সদর্থক ভূমিকা আছে বলে জানা যায়।

মূলা-পাতা (Sonchus wightianus) সংক্রান্ত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে প্রত্যক্ষ কোন নথি আমি পাইনি, এর একটি কারণ হতে পারে এর সঠিক নামটি না জানা, তবু স্থানভেদে প্রচলিত এর ভেষজ ব্যবহারগুলি জানার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিশেষতঃ নেপালে এই উদ্ভিদের পাতার বহুল ব্যবহার হয় জ্বর নিরাময়ে। এছাড়াও প্রদাহ এবং সোয়েলিং বা ফুলে যাওয়া কমাতে, কর্ণপ্রদাহে এর পাতার ব্যবহার হয়। শিকড় মূলতঃ হজমের সমস্যায়, পেটে ব্যাথায়, জন্ডিস, হাঁপানি, হুপিং কফ ও ব্রঙ্কাইটিসে ব্যবহার হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এটি বৃক্কের পাথর ও জন্ডিস নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

এবার দেখা যাক, গবেষণায় উপরিউক্ত দাবি গুলির কোন প্রমাণ মেলে কিনা। মূলা-পাতা অর্থাৎ Sonchus wightianus এ সঙ্কাস গোত্রিয় অন্যান্য উদ্ভিদগুলি যেমন Sonchus oleraceus , Sonchus arvensis ইত্যাদির থেকে অনেক বেশী পরিমাণে ট্যার‍্যাক্সাস্টেরল ও ইনোসিটল (taraxasterol and inositol) থাকে। যা ড্যান্ডেলিয়ানেও একই রকম ভাবে বর্তমান। ইনোসিটল বিভিন্ন জটিল রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বলে বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলত্ব, মধুমেহ , সর্বোপরি মেটাবলিক সিন্ড্রোমে, সেইসঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমে। এছাড়াও বৈজ্ঞানিকরা এটির বিভিন্ন মানসিক রোগ, যেমন প্যানিক অ্যাটাক, ডিপ্রেশন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও কার্যকর হওয়ার সম্ভবনা আছে বলে মনে করেন। তবে এর সপক্ষে কোন জোরালো যুক্তি বা প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে ট্যার‍্যাক্সাস্টেরল অ্যাপোপটোসিস এর মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও এটি জীবাণুনাশক, প্রদাহনাশক, মধুমেহের ক্ষেত্রেও কার্যকারী। এমনকি এটির বেশ কিছু সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসাবেও কিছু ভূমিকা থাকতে পারে বলে বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন। এই দুটি যৌগই কিডনির পাথরের ক্যালসিয়ামের অংশটি ক্ষয় করতে সক্ষম।

বর্তমান একটি গবেষণায় (https://ijpsr.com/bft-article/human-ache-selective-inhibition-of-phytochemicals-of-sonchus-wightianus-of-nepal-origin-an-in-silico-approach/?view=fulltext) দেখা গেছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ক্রমবর্ধমান ও ভয়ংকর রোগ অ্যালঝাইমার্সের ক্ষেত্রে প্রচলিত ঔষধ acetylcholinesterase (AChE) inhibitors এর বর্তমান বাজার চলতি ধরণ গুলির থেকে বেশী শক্তিশালী AChE মূলা-পাতায় পাওয়া সম্ভব।

সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় (https://pdfs.semanticscholar.org/01c1/a8657ac3748e09cfba6026ac7bed89e119bd.pdf?_ga=2.132921870.1659048542.1613220090-719495840.1613220090) দেখা গেছে মূলা-পাতায় সহ  বিভিন্ন এমন জৈব যৌগ উপস্থিত, যা পারকিনসন্স, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি সহ বিভিন্ন অসুখে কার্যকর হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

একটি যৌথ গবেষণায় (https://li01.tci-thaijo.org/index.php/cast/article/download/135392/101175/ এবং https://www.researchgate.net/profile/Reshmi_Chatterjee4/publication/331161985_Establishment_of_Quality_Parameters_for_Leaf_Stem_and_Root_of_Sonchus_wightianus_DC_through_Pharmacognostical_Standardization/links/5c6996b9a6fdcc404eb72fe4/Establishment-of-Quality-Parameters-for-Leaf-Stem-and-Root-of-Sonchus-wightianus-DC-through-Pharmacognostical-Standardization.pdf?origin=publication_detail) মূলা-পাতার হজম সংক্রান্ত সমস্যা ও ডায়েরিয়া নিরাময়ের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কথা প্রমাণিত হয়েছে। সেই সঙ্গে এই গবেষণায় এটিও দেখা গেছে যে এই উদ্ভিদটি বিষাক্ত নয়।

অতয়েব বলাই বাহুল্য যে ভারতীয় উপমহাদেশে ড্যান্ডেলিয়ান বা সিংহদন্তী সহজলভ্য না হলেও মূলা-পাতা যথেষ্ট সহজলভ্য এবং ভবিষ্যতে এটির থেকে নানা অসাধারণ কিন্তু সুলভ ঔষধ বানানো হয়ত সম্ভব, সেজন্য প্রয়োজন নবীন গবেষকদের এগিয়ে আসা ও এ সম্বন্ধে গবেষণা প্রয়োজন।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ – এই প্রবন্ধটি গবেষণাধর্মী, বন্য ভেষজ কোন অভিজ্ঞ আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ নিরুপণ ব্যতীত ভক্ষণ বা ব্যবহার করা উচিত নয়।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

তত্ত্ব

সাদা হয়ে যাওয়া দাড়ি আর চুলে হাত বুলিয়ে নিল ওঁ। তার প্রতিচ্ছবিতে মাথার দুপাশে অতিরিক্ত লোব গুলো আবার সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্রিয়েটম ফর্মুলা গুলো একবার মনে মনে আবৃত্তি করে নিল । নাঃ ঠিক আছে, ঠিক সময় মত খেয়ে নেওয়া গেছে। না হলে কমতে কমতে আবার একটা বলের মত ক্ষুদ্র গুটি তে সমস্ত সত্তা গুটিয়ে নিয়ে অনন্ত কালের অপেক্ষায় চেতনাহীন সুষুপ্তিতে লীন হয়ে যেতে হত।
 
সময় চলে যাচ্ছে, ছায়াপথ এর মধ্যেই এক চতুর্থাংশ আবর্তন সেরে ফেলেছে, আজ আর কালকের মত দেরী করলে চলবে না। খুব সন্তর্পণে নিজের শরীর থেকে এক কণা দেহকোষ তুলে নিল ওঁ।
 
* * *
 
আরো বেশ কিছুটা সময় চলে গেছে, কৃত্রিম কালচার মাধ্যমে রাখা দেহকোষটা ইতিমধ্যে আয়তনে বেশ কিছুটা বেড়ে গেছে। কালচারে খুব যত্ন নিয়ে কিছুটা পোষক দ্রবণ ঢেলে দিল ওঁ। গভীর মমতায় লালিত কোষটির দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, ওটি যে তারই অংশ, সন্তানবত্। ইতিমধ্যেই তার শরীরে আস্তে আস্তে পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। পাকা চুলের বদলে দেখা দিয়েছে কুঞ্চিত কাজলকৃষ্ণ কেশরাজী, বলিরেখারা অদৃশ্য হয়ে দেখা দিয়েছে পেলব কমনীয়তা। ফ্যাকাসে গাত্রবর্ণ হয়ে উঠেছে নীহারিকার মত উজ্জ্বল নীলাভ। সময় যে বেশী নেই বুঝতে পারছে ওঁ।
 
* * *
 
ছায়াপথের একটি সম্পূর্ণ আবর্তন সম্পূর্ণ করতে আর বেশী দেরী নেই …. ওঁ এখন প্রায় শিশুবত, মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তার জটাজাল ; কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না সে …. তার সমৃদ্ধ প্রজ্ঞার অধিকাংশই বিস্মৃতি গ্রাস করেছে এখন। সর্বগ্রাসী ক্ষুধা তাকে উন্মাদপ্রায় করে তুলছে … সময় যে আজকের মত শেষ .. কোনক্রমে অস্থির অঙ্গ সঞ্চালনে কালচার থেকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আপন দেহকোষটি তুলে নিয়ে ভক্ষণ করল ওঁ।
 
* * *
 
ছায়াপথের একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পূর্ণ হল, ধ্যানসুষুপ্ত ওঁর শরীরে বিপরীত পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে …. শিশুসুলভ কোমল দেহে এক এক করে ফুটে উঠছে বলিরেখা …..
 
© Satadru Banerjee

নুনশাক, এক অবহেলিত বন্ধু

আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে আছে এমন অনেক লতা-গুল্ম যাদের আমরা আগাছা বলে অবজ্ঞাই করে এসেছি চিরকাল, কিন্তু তাদের অদ্ভুত ভেষজ গুণের অজানা কাহিনী রয়ে গেছে আমাদের অগোচরে। সেরকমই কিছু অচেনা বন্ধুদের তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করব এই দুর্বল কলমসহায়ে। আজ প্রথম কিস্তিতে থাকুক, আমাদের বাড়ির আশেপাশের অযাচিত ভাবেই জন্মানো, অনাদরে বেড়ে ওঠা এই প্রতিবেশী।

এটি সংস্কৃতে লোণিকা নামে পরিচিত। বাংলায় কেউ বলে নুন শাক, কেউ বলে নুনে শাক, আবার কেউ বলে নুনিয়া বা নুন্তা শাক, ওড়িয়ায় বলে পুরনিশাক, হিন্দিতে খুরসা বা কুলফা । বিজ্ঞান সম্মত ল্যাটিন নাম – Portulaca oleracea ।

এটি আমার মতে একটি মিরাক্যাল গাছ। সব দিক থেকে প্রকৃতি ও মানুষের উপকারী একটি গুল্ম। এটি প্রবল খরাতেও নিজের বিপাকীয় ধরণ পরিবর্তন করে টিকে থাকতে পারে। মাটির আদ্রতা ধরে রেখে অন্যান্য গাছকে বাঁচতে সাহায্য করে। হয়ত এত গুণের জন্যই সেই কোন প্রাচীন কাল থেকে মানুষ এটিকে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে নানা সভ্যতায়। তারা যে শুধু এটিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করত তাই নয়, অনেক সংস্কৃতিতে মনে করা হত, এই গাছ অপদেবতা ও বিপদকে দূরে রাখে।

এবার আসি এর ভেষজ ও খাদ্যগুণের কথায়, প্রথমেই বলি খাদ্যগুণ। নুনে শাক এর পাতা, ফুল, কান্ড পুরোটাই কাঁচা বা রান্না করে দুভাবেই খাওয়া যায়। গ্রীস, ফ্রেঞ্চ ও বেশ কিছু ইউরোপিয় সংস্কৃতিতে এটিকে স্যালাড হিসাবে টমেটো ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার চল ছিল। স্পেনে স্যুপ, স্ট্যু ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হত এটি আর মেক্সিকোতে তো এই শাক দিয়ে একদম মৌলিক একটা চিকেনের পদই জনপ্রিয় ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এর ছোট্ট ছোট্ট পোস্তদানার মত বীজগুলি সংগ্রহ করে বেঁটে বড়া বানানো হত। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এটিকে ভাজা, সিদ্ধ বা পালংশাকের মত করে রান্না করে খাওয়ার চল আছে।

নুনে শাকের টক – নোনতা স্বাদটি আসে মূলতঃ এর মধ্যে থাকা দুটি অ্যাসিডের কারণে, অক্সালিক অ্যাসিড ও ম্যালিক অ্যাসিড। এই ম্যালিক অ্যাসিড আমাদের অতি পরিচিত ফল আপেলেও থাকে। নুনে শাকে ভোরের দিকে ম্যালিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশী থাকে। তাই ঐ সময়ে এই শাক তুললে তা বেশী ম্যালিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ হয়।

১০০ গ্রাম পরিমাণ এই শাক ২০ ক্যালরি শক্তি দিতে পারে মানবদেহে। প্রায় ২ গ্রাম মত প্রোটিন ও খুবই সামান্য ফ্যাট থাকে। এছাড়াও এর থেকে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, পটাশিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মৌলগুলিও যথেষ্ট মাত্রায় পাওয়া যায়। এছাড়াও এর থেকে আমাদের অপরিহার্য্য ভিটামিনগুলির (Vitamin A, B1, B2, B3, B6, B9, C, E etc.)  প্রাত্যহিক চাহিদার ২০ শতাংশেরও অধিক পাওয়া যায়।

 

এবার আসি ভেষজগুণে —

১) গনোরিয়ায় – এই বিরক্তিকর যৌনরোগটিতে একটি ভয়ঙ্কর উপসর্গ হল প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া এবং অতিরিক্ত পিপাসা। এক্ষেত্রে ১০ গ্রাম নুনেশাক ৪ কাপ জল দিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে ২ কাপ করতে হবে, এর পর ওটাকে ছেঁকে ঠান্ডা করে সকালে বিকেলে এক কাপ করে খেতে হবে প্রতিদিন। এটি ডায়াবেটিসের কিছু ক্ষেত্রেও সমান ধরনের উপসর্গের উপশম করতে সক্ষম।

২) বাচ্চাদের কাশি হলে – নুনশাকের রস একটু গরম করে ঠান্ডা হলে ১৫ ফোঁটা সেই রসে ৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সিরাপ তৈরি করা যায়। এটি দিনে ৩-৪ বার করে খাওয়ালে সাধারণ কাশি হলে ২-১ দিনের মধ্যে কাশি ভাল হয়ে যাবে। এছাড়াও শিশুদের অম্বল, আমাশয়েও এই সিরাপ সকালে ও সন্ধ্যায় ২-৪ ফোঁটা খাওয়ালে উপকার হয়।

৩) তোতলামিতে – দন্ত্য বর্ণ,  ওষ্ঠ বর্ণ বাদ দিয়ে বিশেষ কোন বর্গের অন্তর্গত বর্ণ গুলি (যেমন মূর্ধা বর্ণ) উচ্চারণে সমস্যা থাকলে নুনে শাকের রস দুচামচ পরিমাণ অন্ততঃ ১৫ মিনিট মুখে নিয়ে বসে থাকলে অনেকটা উপকার হয়।

৪) চোখ ওঠা বা চোখ লাল হওয়ায় – নুনেশাকের রস ছেঁকে যে স্বচ্ছ রস পাওয়া যায় তাকে সামান্য গরম করে ঠান্ডা করে একফোঁটা করে ২ – ৩ দিন দিলে উপশম হয়।

৫) চুলকানি ও বিষাক্ত কীট দংশনে – সাধারণ চুলকানিতে এবং বোলতা মৌমাছি পিঁপড়ে ইত্যাদি কামড়ালে, শুঁয়ো লাগলে কিম্বা বিছুটি আলকুশি ইত্যাদি লেগে চুলকালে নুনেশাক বেঁটে অল্প গরম করে প্রলেপ দিলে কার্যকরী হয়। তবে ভীমরুল বা কাঁকড়াবিছের বেলায় কিন্তু এটি নিষ্ক্রিয়।

৬) অর্শ্ব, বদহজম, কোলাইটিস ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রে নুনেশাক খাদ্য হিসাবে উত্তম যা এই রোগগুলির নিরাময় করে।

৭) নুনেশাকের বীজ জল দিয়ে খেলে তা ক্রীমি নাশ করে।

এছাড়াও এটি শরীরের বলকারক, তৃষ্ণা নিবারক, চোট আঘাত জনিত ফুলে যাওয়া বা সোয়েলিং কমাতে অত্যন্ত্য কার্য্যকারী।

পরিশেষে বলি, এমন যে গুণসম্পন্ন উদ্ভিত তাকে আমরা না চিনে প্রায়শঃই উপড়ে ফেলি নিতান্তি আগাছা ভেবে, তাই ভয় হয় অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এই বন্ধু হয়ত মানুষের সান্নিধ্য হারিয়ে আবার অরণ্যভূমীর গোপনিয়তাতেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

বোধন

“জাতির জনক, মহাত্মা গান্ধী সবসময় নিজের জীবনে মিতব্যয়ীতা ও পরিচ্ছন্নতাকে জোড় দিতেন, তিনি মনে করতেন, পরিচ্ছন্নতাই হল পূজার অন্যরূপ। এই প্রকৃতি আমাদের মাতৃস্বরূপা, তাই একে নির্মল, জঞ্জালমুক্ত রাখা আমাদের সবার কর্তব্য। তাই বন্ধুগণ আমাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হতে গেলে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোড় দিতে হবে। ফ্যাক্টরির প্রতিটি শেড পরিষ্কার ও সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে হবে, তবেই আমরা আমাদের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পালন করব। এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি, জয় হিন্দ।”
 
অবিন্যস্ত হাততালিতে মাহুর্তিক মুখরতা মেখে থাকল গিয়ার ফ্যাক্টরির অক্টোবরের দ্বিতীয় সকালটা।
 
মনোজ সেন পকেট থেকে একটা বেনসন এন্ড হেজেসের প্যাকেট বার করলেন, একটাই সিগারেট রয়ে গেছে ভিতরে। ঝটাপট ঠোঁটের ফাঁকে ব্যালেন্স করে লাইটার জ্বালিয়ে অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় খালি প্যাকেট টা ছুঁড়ে ফেললেন পাশের ঝোপে। দুটো টান মেরেই কাঁচ ঘেরা অফিস রুমটায় ঢুকে কাজে লেগে গেলেন দেরী না করে। আজ একটু বেলাবেলি বেরিয়ে পড়বেন ফ্যাক্টরি থেকে, মণিকাকে নিয়ে মলে যেতে হবে, পূজো তো আর মাত্র কটা দিন।
 
বেলা-বেলি বেড়িয়ে পড়লেও বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে সেই, সাড়ে চারটে হয়ে গেল, যা জ্যাম রাস্তায়, যত প্যান্ডেল বাড়ছে – ক্রাউড ও তত পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, ইস মণিকা নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ রেডি হয়ে ওয়েট করছে। আরে সামনের মোড়ে ওটা শুভ্র না !!! কি করছে ও ওখানে ? অবশ্য এখন তো ওর স্কুল থেকে ফেরারই সময়, বাসটা বোধহয় ড্রপ করে দিয়ে গেল। সুরযকে ওর কাছে গাড়িটা থামাতে বলে সিটের ডানপাশে চেপে বসলেন মনোজ।
 
একটা তেঢ্যাঙা মার্কা গাছ, কোন বাহারি গাছ হবে হয়ত, একটু শুকনো শুকনো, টবেই ছিল হয়ত এতদিন, এখন আর নেই, বোঝাই যাচ্ছে কারুর বাড়িতে ছিল, স্থান সংকুলান না হওয়ায় রাস্তার পাশে রেখে দিয়ে চলে গেছে। শুভ্র এক মনে তার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছে।
 
গাড়ির দরজাটা খুলে ডাকতেই বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল শুভ্র। “কি করছিলি বাবা এখানে ? স্কুল কখন ছুটি হল ?” প্রত্যাশিত ভাবেই শুভ্র নিরুত্তর রইল, ও একটু এরকমই চাপা ধরনের তাই মনোজ ও আর ওকে না ঘাঁটিয়ে মোবাইলের মেলবক্সে মন দিলেন।
 
 
দিনকয়েক ধরেই স্কুল থেকে বাড়ি আসতে একটু দেরী হচ্ছে শুভ্রর। মণিকা চুপিচুপি ফলো করে দেখেছে ওকে, ঐ গাছটার সামনে আজকাল শুভ্র বেশ কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে, কি যেন বিড়বিড় করে, যেন গল্প করছে গাছটার সাথে। মণিকা ভয় পাচ্ছে, মনোজকে বলেছে কিন্তু শুভ্র এতটাই চুপচাপ যে ওকে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও খুব একটা সাহস হয়না ওদের দুজনের।
 
 
সোমবার টা ছুটি আছে মনোজের। তাই একটু দেরী করেই ঘুম থেকে উঠলেন মনোজ, শুভ্র সেই সক্কালবেলা উঠে টিউশন এ চলে গেছে। একটু ফ্রেশ হয়ে মনোজ আজ অফিসারস ক্লাবে যাবেন একটু, অনেকদিন খেলা হয় না। সূরয কে গাড়িটা বের করতে বললেন।
 
একি সেই গাছটার সামনে ওটা শুভ্র না !! টিউশন থেকে ফেরার পথেও ও এখানে দাঁড়িয়ে !! সূরযকে গাড়িটা থামাতে বলে গাড়ি থেকে নেমে নিশ্চুপে শুভ্রর দিকে হেঁটে গেলেন মনোজ।
 
শুভ্র নিজের মনেই কি সব যেন বলে চলেছে, কোন দিকে মন নেই, যেন নিজের মধ্যে নিজেই তন্ময়। আরেকটু এগিয়ে গেলেন মনোজ।
 
“ঠাম্মা জান, তোমার মত করে আর কেউ জিজ্ঞেস করে না সারাদিন স্কুলে কি কি হল, আমার পিঠে পরশুদিন অনেকটা কেটে গেছে বেঞ্চে লেগে, কেউ জানেই না, কারুর চোখেই পড়েনি। তুমি কেমন আছ ঠাম্মা ? আচ্ছা ঠাম্মা তোমার কি শরীর খারাপ ? পাতাগুলো হলুদ হয়ে যাচ্ছে কেন ? তোমার কি জল তেষ্টা পেয়েছে ??? সেই সেবার রাতে যেমন হয়েছিল তোমার, রাত্রে কেউ ঘুমোতে পারেনি, সকালে মাম্মাম খুব রাগারাগি করছিল, সেরকম হয়েছে ?? আচ্ছা দাঁড়াও আমার বোতলে জল আছে”
 
 
এক পা এক পা করে পিছিয়ে এলেন মনোজ, নিশ্চুপে, অনেকটা যেন নিজের অজান্তেই। গাড়িতে উঠে সূরযকে সংক্ষেপে শুধু বললেন, “গাড়ি ঘোরাও, প্রবীণাবাসে চল……, ময়ের ট্রাঙ্ক আর হুইলচেয়ারটা ডিকিতে তুলে নিও …”
 
ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের কাঁচ দিয়ে দেখতে লাগলেন মনোজ, —
শুভ্রর হাতে জলের বোতল, আস্তে আস্তে ভিজে যাচ্ছে গাছটার তলার খটখটে মাটি।
পাশের পুকুর ঘাট থেকে সমস্বরে ভেসে আসছে —
 
ওঁ নমঃ আ-ব্রহ্মভুবনাল্লোকা, দেবর্ষি-পিতৃ-মানবাঃ ,
তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্ব্বে , মাতৃ-মাতামহাদয়ঃ ।
অতীত-কুলকোটীনাং, সপ্তদ্বীপ-নিবাসিনাং ।
ময়া দত্তেন তোয়েন, তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ং ।।

KURU-ক্ষেত্র

– ডাক্তার সাহেব আসব ?
 
– আসুন, বসুন ওখানে, বলুন কি সমস্যা ?
 
– কেমন আছেন ডাক্তারবাবু ? আমায় চিনতে পারছেন ?
 
– অ্যাঁ কে ? না ঠিক,… আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি রমেন না ? একি হাল হয়েছে তোমার !!!
 
– হ্যাঁ ডাক্তারসাহেব, আমি রমেন।
 
– My God !!!
 
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ধপ করে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন ডাক্তার রায়। মনে পড়ে গেল বেশ কয়েকটা বছর আগের কথা।
 
তিনি তখন মাসে চার বার করে বসতেন ট্রপিকাল মেডিসিনে। প্রচুর ভীড় হত পেশেন্টের। তাঁর অনন্য রোগনির্ণয় প্রতিভা, সিমট্যমের আভাসমাত্র পেয়ে রোগের চরিত্র নিমেষে আঁচ করে নেওয়ার ক্ষমতা তখনই তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল। সেই সময়েই একদিন ট্রপিকালের নার্স তুলসীর অনুরোধে তাদের পাড়ার ছেলে রমেনকে তাঁর পার্সোনাল চেম্বারে কিছুক্ষণ টাইম দিয়েছিলেন।
 
ঘাড়ে গর্দানে বিশাল চেহারার রমেন যখন তাঁর চেম্বারে ঢুকেছিল তখনই ডাক্তার রায় বুঝেছিলেন, একে সারানোর ক্ষমতা তাঁর নেই, ওবেসিটির কেস ট্রিটমেন্ট করা ভীষণ কঠিন, কারণ এতে ওষুধের চেয়েও বেশী জরুরী নিয়ন্ত্রিত জীবন, যেটা সম্পুর্ণ ভাবেই পেশেন্টের উপর নির্ভরশীল।
 
ডাক্তার রায় চিরদিনই স্পষ্ট কথার মানুষ, সোজা বলে দিয়েছিলেন যে ওষুধ দিতে তিনি পারবেন না।
রমেন সেদিন খুব অনুনয় করেছিল, কান্নাকাটি ও করেছিল। বলেছিল ওর বেকারত্বের কথা, এত মোটা বলে কেউ কাজ দেয় না। বলেছিল, একটা মেয়েকে খুব ভালবাসত ও, বলেওছিল তাকে, কিন্তু “বেকার, হাতির মত মোটা কুমড়োপটাশের কি যোগ্যতা আছে ?” প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে মাথা হেঁট করে চলে এসেছে ।
কিন্তু তাতে ডাক্তার রায়ের উত্তরটা পাল্টায় নি। অবশ্য তিনি ভাল করে বুঝিয়ে বলেছিলেন বাইরের তেলেভাজা খাবার না খাওয়ার কথা, নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, শরীরচর্চার কথা … তবে ওর ভাবভঙ্গী দেখে বুঝেছিলেন যে ভস্মে ঘী ঢালা হচ্ছে ।
 
আজ এত বছর পর সেই রমেন ! সেই বিশাল চেহারার বদলে কঙ্কালসার একটা মানুষ, টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, চলতে গেলে হাত কাঁপছে ! যেন দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর থেকে উঠে আসা, বহু দিন না খেতে পাওয়া একটা মানুষ !
 
কিন্তু সেদিনের ফুটো গেঞ্জী আর রংচটা প্যান্ট পরা রমেনের গায়ে আজ ব্র্যান্ডেড চকচকে পোশাক, হাতে দামী ঘড়ি। তাই আর যাই হোক খেতে না পেয়ে এই হাল এটা ভাবতে পারছেন না ডাক্তার রায়। তবে ???
 
– কি কর আজকাল ? কোথায় থাক ?
 
– বোম্বাই তে ডাক্তারবাবু , ওখানের ঐ মহাবলজী হসপিটাল আছে না ? ওর পাশে একটা সিনেমা হল আছে, রকি সিনেমা।
 
– হ্যাঁ হ্যাঁ চিনি, ঐ তো হাসপাতালের মর্গটা, তার পেছন দিক টায় যে রাস্তাটা আছে ওর opposite এ তো ? ওখানে গেছি বেশ কয়েক বার। তো ওখানে থাক তুমি ?
 
– হ্যাঁ ডাক্তার বাবু, ওখানে রেহানিয়া রেস্টুরেন্টে কাজ করি আমি। আগে ডিশ ওয়াশার ছিলাম, এখন সার্ভিং করি। সেই যে আপনার কাছে এসেছিলাম, তার মাস খানেক বাদেই কাজ খুঁজতে বোম্বে তে চলে গিয়েছিলাম, তখনই ওখানে কাজে ঢুকি। ভাল মাইনে দেয় আর মালিক আমাদের খুব ভালবাসে তাই ওখানেই রয়ে গেছি। হিঃ হিঃ হিঃ
 
ডাক্তার রায় অপলকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন রমেনের দিকে, মাঝে মাঝেই অকারণে হেসে উঠছে সে, হয়ত না বুঝেই হাসছে, ওর চোখ যেন কেমন মরা মাছের মত, যেন সব কিছুতেই মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছে …
 
– তা আজকাল কি খাওয়া দাওয়া একদম বন্ধ করে দিয়েছ নাকি ? শরীরের এই হাল বানালে কি করে ?
 
– না না ডাক্তারবাবু, খাওয়া দাওয়া বন্ধ করব কেন, আমাদের জন্য মালিক ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যে শিফটে ডিউটি থাকবে সে শিফটে তো বটেই অন্য শিফটেও আমাদের যা ইচ্ছা আমরা খেতে পারি ফ্রি তে। আমাদের রেস্টুরেন্টে মাংসের চপ, রেজালা, আটু মুলাই মানে মুড়ীঘন্ট এসব খুব বিখ্যাত। প্রচুর কাস্টমার আসে প্রতিদিন। তাই আমি বেশীরভাগ দিন দু বেলাই নান নয়ত পরোটার সঙ্গে রেজালা নয়ত আটু মুলাই খাই। অবশ্য আটু মুলাই টা ই আমার বেশী প্রিয়। তাও তো আজকাল বেশী খেতে পারি না … আগে রাত্রে ৮ -১০ পিস পরোটা আর দু তিন প্লেট মাংস খেয়ে ফেলতাম।
 
– তা রেস্টুরেন্টে তো প্রায় সব জায়গাতেই হাইজিনের কোন বালাই থাকে না। নিশ্চই ক্রনিক পেটের রোগ বাধিয়েছ ?
 
– না না ডাক্তারবাবু, আমাদের কিচেন খুব পরিষ্কার। শাক-সব্জী সব টাটকা দেখে বাজার থেকে আসে। মাংস , মাছ সব প্যাকেট করে আসে, সব প্রসেস করা দামী কোম্পানির মাল। আর সত্যি বলতে কি এই কবছরে দু একবার বাদ দিলে সেরকম পেট খারাপ কখনও হয়নি। শুধু এই দুর্বলতাটা, নিঃশ্বাস নিতে মাঝে মাঝে বড্ড কষ্ট হয় … ডাক্তারবাবু একটু দেখুন না, সবাই বলে আপনি ধন্বন্তরি, আমায় একটু ওষুধ দিন না …
 
– আচ্ছা বেশ, এই ওষুধটা লিখে দিচ্ছি, খাও দুবেলা খাবার পরে একটা করে, আর শোন এখন কদিন বাড়িতে রেস্ট নাও, একটু ঠিক হলে বোম্বে যাবে না হয় …
 
এই প্রথম ডাক্তার রায় স্পষ্ট কথার বদলে মিথ্যে বললেন। তিনি জানেন তাঁর লিখে দেওয়া দিনে দুটো করে প্যারাসিটামল কেন, কোন ওষুধই আর সারিয়ে তুলতে পারবে না রমেন কে। রোগটা এখন স্পষ্ট তাঁর কাছে। KURU বা স্পঞ্জিফর্মে আক্রান্ত রমেন কে তাও মিথ্যেই দিলেন ওষুধটা। কারণ আরও বড় একটা রোগের সন্ধান যে তিনি পেয়েছেন, যেটা এখনই সমূলে উপড়ে না ফেললে যে বড্ড দেরী হয়ে যাবে।
 
– ঠিক আছে রমেন, ওষুধটা খাও, আমাকে একটু বেরোতে হবে এখন…
 
– আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আজ তবে উঠি। নমস্কার।
 
রমেন বেরিয়ে গেল, ডাক্তার রায় ও তাঁর গাড়িটা নিয়ে বের হলেন। খুব তাড়াতাড়ি তাঁকে একটা টেলিগ্রাম করতে হবে বোম্বের মহাবলজীনগর পুলিশ স্টেশনে – “রেহানিয়া রেস্টুরেন্টে মানুষের মাংস বিক্রি হয় …”