নাদব্রহ্ম

আমার ঠাকুমার একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল—রাত বারোটার পর বাড়িতে কোনো গান বাজানো যাবে না।
কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন,
— “যক্ষ-গন্ধর্বেরা আসে।”
আমরা হেসে উড়িয়ে দিতাম। ঠাকুমাও রাগ করতেন না। শুধু বলতেন,
— “হাসিস, তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু রাতদুপুরে গান বাজিয়ে তাদের ডেকে আনিস না।”
ঠাকুমা মারা গেছেন দশ বছর হলো।
এখন আমি পেশায় একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। টালিগঞ্জের একটি স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মিক্স করি, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করি, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল বানাই। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার জীবিকা।
আর আজ এই কথাগুলো লিখতে বসেছি, কারণ অনেক দেরিতে হলেও বুঝতে পারছি—ঠাকুমা হয়তো ভুল বলেননি।
মায়ের একটা পুরোনো হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার দ্বারকিন কোম্পানির তৈরি। দাদুর আমলের সেই যন্ত্র বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফেটে গেছে, কয়েকটা রিডও বসে গেছে।
স্টুডিওর এক সরোদবাদক আমাকে চিৎপুরের এক পুরোনো দোকানের ঠিকানা দিলেন।
— “গলিটা খুঁজে পাবেন। দোকানের নাম ‘সুরালয়’। শম্ভুনাথ ওস্তাদকে খুঁজবেন। তবে একটা কথা…”
তিনি একটু থামলেন।
— “ওস্তাদের সব কথা বিশ্বাস করবেন না। আবার সব অবিশ্বাসও করবেন না।”
চিৎপুরের সেই গলিটা এত সরু যে ঠিকমতো রিকশাও ঢুকতে চায় না। চারদিকে বাদ্যযন্ত্রের দোকান, পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ড, পিতলের ঘণ্টা, মন্দিরের সামগ্রী। তাদের মাঝখানে একটি পুরোনো কাঠের দরজা।
উপরে হাতে লেখা সাইনবোর্ড—
সুরালয়
প্রোপ্রাইটর: শম্ভুনাথ চক্রবর্তী
তার নিচে আরও একটি লাইন—
“এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।”
‘সব কিছু’?
শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়?
মনে মনে হেসেছিলাম।
ভেতরে ঢুকেই মনে হলো যেন কোনো বাদ্যযন্ত্রের হাসপাতালের ওয়ার্ডে এসে পড়েছি। দেয়ালজুড়ে ঝুলছে ছেঁড়া বেহালা, ভাঙা এসরাজ, জীর্ণ তানপুরা, ক্ষয়ে যাওয়া সেতার।
ঘরের মাঝখানে নিচু কাঠের চৌকিতে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ।
ধবধবে সাদা দাড়ি, সাদা ধুতি, হালকা গেরুয়া ফতুয়া। চোখে মোটা কাচের চশমা, কানে হিয়ারিং এইড।
ব্যাপারটা আমার চোখ এড়াল না।
যে মানুষের জীবিকা শব্দ, তার নিজের কানই যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল।
আমার বিস্ময় বুঝেই তিনি মৃদু হেসে বললেন,
— “অবাক হচ্ছ?”
আমি কিছু বললাম না।
— “সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুটো শেষ হয়ে গেল। ডাক্তার বলেছে, আর বছর দুয়েক। তারপর সম্পূর্ণ নীরবতা।”
তিনি হেসে যোগ করলেন,
— “তবে আসল শোনা কানে হয় না।”
— “তাহলে কোথায়?”
তিনি নিজের বুকে আলতো টোকা দিলেন।
— “নাড়িতে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
— “শব্দ বলতে তুমি কী বোঝো? কানে শোনার জিনিস? শব্দ আসলে কম্পন। কনসার্টে যখন বেস বাজে, সেটা শুধু কানে শোনো, না বুকেও লাগে?”
আমি হারমোনিয়ামটা তাঁর সামনে রাখলাম।
তিনি ধীরে ধীরে ঢাকনা খুললেন। চোখ বন্ধ করে আঙুল বুলিয়ে দিলেন রিডগুলোর উপর। যেন কোনো অভিজ্ঞ বৈদ্য রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করছেন।
খুব আস্তে বললেন,
— “আহা… কতদিন কেউ বাজায়নি।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “ঠিক করা যাবে?”
— “যাবে। তবে একটা শর্ত আছে।”
আমি তাকিয়ে রইলাম।
— “আমি যন্ত্র বাঁধি চারশো বত্রিশে। তোমাদের স্টুডিওর চারশো চল্লিশে নয়।”
আমি ভুরু কুঁচকে বললাম,
— “চারশো বত্রিশ? A=432 Hz?”
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু এখন তো সারা পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ৪৪০ হার্টজ।”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ মাথা নাড়লেন।
— “জানি। উনিশশো ঊনচল্লিশ সাল থেকে। কিন্তু তার আগে?”
আমি চুপ করে রইলাম।
— “হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর নানা সভ্যতায় সুরের মাপকাঠি ছিল আলাদা। গ্রিকদের কথা শোনা যায়, মিশরীয়দের কথাও। আমাদের ধ্রুপদী সঙ্গীতেও নির্দিষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক মান ছিল না। তবু মানুষের গান ছিল, রাগ ছিল, ভক্তি ছিল। তারপর একদিন মানুষ ঠিক করল—এবার থেকে সবাই একই স্বরে গান গাইবে।”
তিনি রিডটা আলোয় তুলে ধরে দেখলেন।
— “আমি ইতিহাস নিয়ে তর্ক করি না। শুধু একটা জিনিস খেয়াল করেছি। চারশো বত্রিশে বাঁধা যন্ত্র শুনলে আমার মনে হয় নদীর ধারে বসে আছি। আর চারশো চল্লিশে শুনলে মনে হয় কেউ যেন কোথাও পৌঁছে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে তাড়া দিচ্ছে।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— “এটা কি বৈজ্ঞানিক সত্যি, না ব্যক্তিগত অনুভূতি?”
তিনি বিন্দুমাত্র বিরক্ত হলেন না।
— “হতে পারে শুধু অনুভূতি। কিন্তু অনুভূতিকেও তো একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। আমরা মানুষ—মেশিন নই।”
কথাটা শুনে আমার আপত্তি আর জোরালো হলো না।
স্টুডিওতে কাজ করতে গিয়ে আমিও অদ্ভুত কিছু জিনিস লক্ষ্য করেছি। কিছু মিক্স শেষ করার পর অকারণ ক্লান্ত লাগে, আবার কিছু ট্র্যাক শোনার পর শরীর অদ্ভুত হালকা হয়ে যায়। কেন হয়, কোনোদিন ভেবে দেখিনি।
ওস্তাদ যেন আমার মনের ভেতরটা পড়ে ফেললেন।
— “নিকোলা টেসলার নাম শুনেছ?”
— “অবশ্যই।”
— “তিনি বলেছিলেন, মহাবিশ্বকে বুঝতে হলে শক্তি, কম্পন আর তরঙ্গের ভাষায় ভাবতে হবে। সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে কথাটা আমার ভালো লাগে। কারণ শেষ পর্যন্ত সবকিছুই কাঁপে। মাটি, জল, বাতাস, তোমার শরীর, এমনকি চিন্তাও।”
তিনি মৃদু হেসে যোগ করলেন,
— “আমার গুরু বলতেন, পৃথিবীটা যেন এক বিশাল তানপুরা। আমরা প্রত্যেকে তার একটি করে তার। যতক্ষণ নিজের সুরে আছি, ততক্ষণ মিল আছে। একেকটা তার বেসুরো হলে গোটা সঙ্গীতটাই বদলে যায়।”
আমি এবার আর প্রতিবাদ করলাম না।
লোকটার কথায় বিজ্ঞান, দর্শন আর লোকবিশ্বাস এমনভাবে মিশে থাকে যে কোথায় যুক্তি শেষ হচ্ছে আর কোথায় বিশ্বাস শুরু হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন।
ঠিক তখনই তিনি আবার বললেন,
— “পৃথিবীরও একটা নিজস্ব কম্পন আছে। বিজ্ঞানীরা তাকে শুম্যান রেজোন্যান্স বলেন। আমার গুরু বলতেন, ওটাই পৃথিবীর মন্ত্র। গাছ, নদী, আকাশ, পাথর—সবাই সেই মন্ত্রে সাড়া দেয়। শুধু মানুষই নিজের কোলাহলে তাকে শুনতে পায় না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “আপনি শুনেছেন?”
প্রশ্নটা শুনে তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— “সাত দিন পরে এসো। তোমার হারমোনিয়াম তৈরি থাকবে।”
আমি বুঝলাম, উত্তরটা তিনি ইচ্ছে করেই দিলেন না।
এরপর থেকে প্রায়ই সুরালয়ে যেতে শুরু করলাম।
কাজ থাকুক বা না থাকুক।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ চা খাওয়াতেন, গল্প করতেন। সঙ্গীত নিয়ে, শব্দ নিয়ে, কখনও ইতিহাস, কখনও এমন সব তত্ত্ব নিয়ে, যেগুলো শুনলে মনে হতো অর্ধেক বিজ্ঞান, অর্ধেক সাধনা। বাড়ি ফিরে আমি সেগুলো যতটা মনে থাকত, লিখে রাখতাম।
সুরঞ্জনার সঙ্গে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে।
সেদিন দোকানে ঢুকেই বুঝলাম, ওস্তাদ নেই। তাঁর জায়গায় কাঠের চৌকিতে বসে আছে এক তরুণী। কোলে বেহালা। চোখ বন্ধ। বাঁ গালটা আলতো করে ঠেকানো যন্ত্রের গায়ে।
সে বাজাচ্ছিল।
সুরটা কোনো রাগ বলে চিনতে পারিনি। শুধু মনে হচ্ছিল, বহুদিনের চাপা ক্লান্তির উপর দিয়ে কেউ যেন ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আমি দরজায় দাঁড়াতেই চোখ না খুলেই সে বলল,
— “বসুন। দাদু ওষুধ আনতে গেছেন।”
আমি চুপচাপ বসে পড়লাম।
আরও মিনিটখানেক সে বাজিয়ে গেল। তারপর চোখ খুলে প্রথমবার আমার দিকে তাকাল।
— “আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার?”
আমি হেসে বললাম,
— “সম্ভবত।”
— “দাদু আপনার কথা বলেন।”
— “আশা করি ভালো কথাই বলেন।”
তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
— “বলেন, ছেলেটার কান আছে। শুধু কানের ব্যবহার এখনও শেখেনি।”
আমি হেসে ফেললাম।
— “মানে?”
সে উত্তর না দিয়ে বেহালায় পরপর দুটি স্বর তুলল।
— “বলুন তো, কোনো পার্থক্য শুনলেন?”
আমি মন দিয়ে শুনলাম। আবার শুনলাম। তারপর মাথা নাড়লাম।
— “না।”
সে যেন এই উত্তরটাই আশা করছিল।
— “প্রথমটা চারশো চল্লিশ। দ্বিতীয়টা চারশো বত্রিশ।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
— “শুধু এইটুকু?”
— “এইটুকুই। কিন্তু কানের চেয়ে বড় যন্ত্র যদি শরীর হয়, তাহলে ফারাকটা শুধু কানে ধরা পড়বে কেন?”
তার কথার ভঙ্গি ওস্তাদের মতোই শান্ত, কিন্তু কোথাও যেন আরও বাস্তব।
— “আপনারা স্টুডিওতে সারাদিন মানুষের কানে কাজ করেন। দাদু বলেন, একদিন যদি শরীর দিয়েও শুনতে শেখেন, অনেক কিছু বদলে যাবে।”
আমি বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না।
মেয়েটার গলায় আত্মবিশ্বাস ছিল, অথচ একফোঁটা বাড়াবাড়ি ছিল না।
তার নাম সুরঞ্জনা।
শম্ভুনাথ ওস্তাদের নাতনি।
স্থানীয় এক স্কুলে গান শেখায়। দোকানের কাজেও দাদুকে সাহায্য করে। বহু প্রজন্মের সঙ্গীতসাধনার উত্তরাধিকার যেন অদ্ভুত স্বাভাবিকতায় বহন করে চলেছে।
ঠিক তখনই গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা হর্ন বাজিয়ে চলে গেল।
সুরঞ্জনা বিরক্ত মুখে বাইরে তাকাল।
— “শুনলেন?”
— “কী?”
— “হর্নটা গত সপ্তাহ থেকে বেসুরো। অর্ধেক শ্রুতি নেমে গেছে।”
আমি হেসে বললাম,
— “রিকশার হর্নেরও আবার সুর আছে?”
সে বিস্মিত চোখে তাকাল।
— “সব কিছুরই সুর আছে। দোকানের সাইনবোর্ডটা পড়েননি?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
বেরিয়ে আসার সময় সে ডেকে বলল,
— “একটা কথা?”
— “বলুন।”
— “দাদুর সব কথা বিশ্বাস করবেন না।”
আমি হেসে বললাম,
— “আবার সব অবিশ্বাসও করব না?”
এই প্রথম সে খোলাখুলি হেসে উঠল।
— “দেখছি, খুব তাড়াতাড়ি শিখছেন।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে বুঝলাম, সুরালয়ে যাওয়ার কারণ আর শুধু শম্ভুনাথ ওস্তাদ নন।
সুরালয়ে যাওয়ার কারণ তখন দুটো।
একটা অবশ্যই শম্ভুনাথ ওস্তাদ।
আর অন্যটা—আমি নিজেকেও স্বীকার করিনি।
এক সন্ধ্যায় ওস্তাদ গঙ্গাস্নানে গিয়েছেন। দোকানে শুধু আমরা দুজন।
হঠাৎ সুরঞ্জনা জিজ্ঞেস করল,
— “স্টুডিওতে আসলে কী করেন?”
আমি একটু গর্বের সঙ্গেই বললাম,
— “যা দরকার হয় সবই। গান, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সাউন্ড ডিজাইন…।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— “জানেন, আপনি আসলে কী তৈরি করেন?”
আমি হেসে ফেললাম।
— “কী?”
— “অনুভূতি।”
আমি ভুরু তুললাম।
সে বলল,
— “একটা দুঃখের গান চালান। পাঁচ মিনিট পরে খেয়াল করবেন, আপনার কাঁধ কখন নুয়ে গেছে, মুখের হাসি কখন মিলিয়ে গেছে—নিজেই বুঝবেন না। আবার একটা বিজয়ের সুর বাজান, শরীর নিজে থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়ায়।”
সে আমার দিকে তাকাল।
— “কেউ আপনাকে দুঃখী বা সাহসী হতে বলেনি। তবু হলেন। কেন?”
আমি উত্তর খুঁজে পেলাম না।
— “মানুষ ভাবে সে নিজের মনের মালিক। কিন্তু শব্দ অনেক সময় মনের আগেই শরীরকে বদলে দেয়। শরীর বদলালে মনও তার পিছু নেয়।”
আমি বললাম,
— “সঙ্গীতের কাজ তো সেটাই।”
— “হ্যাঁ। আর সেই কারণেই সঙ্গীত খুব বড় দায়িত্ব।”
তার গলায় প্রথমবার কঠোরতা এল।
— “যে মানুষ অনুভূতি তৈরি করতে পারে, সে চাইলে অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “ইতিহাসে দেখবেন, যুদ্ধের আগে স্লোগান বদলায়। ছন্দ বদলায়। মার্চের তালে মানুষ হাঁটে। হাজার মানুষের গলা একসঙ্গে উঠতে উঠতে ব্যক্তিমানুষটা হারিয়ে যায়। তখন সে শুধু ভিড়ের অংশ।”
তারপর আবার আমার দিকে ফিরল।
— “শব্দ মানুষকে এক করতে পারে। আবার শব্দ দিয়েই মানুষকে ভেঙেও ফেলা যায়। যে জাতির স্মৃতি মুছে দিতে চাও, তার গান বদলে দাও। কারণ গান শুধু বিনোদন নয়; একটা জাতির স্মৃতিও বহন করে।”
আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।
স্টুডিওর ক্লায়েন্টদের কথা মনে পড়ছিল।
প্রায়ই তারা বলে,
“বিটটা আরও জোরে দিন। মানুষ যেন বসে থাকতে না পারে।”
সুরঞ্জনা যেন আমার নীরবতাটাই পড়ে ফেলল।
— “ভয় পাবেন না। আমি গানকে দোষ দিচ্ছি না। আমি শুধু বলছি, আগুন যেমন রান্নাও করে, ঘরও পোড়ায়—শব্দও তেমন।”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— “তাহলে উপায়? কানে তুলো দিয়ে ঘুরব?”
সে হেসে মাথা নাড়ল।
— “না। শুধু সচেতন হয়ে শুনবেন। মানুষ কী খাচ্ছে, সেটা নিয়ে খুব ভাবনা করে। কিন্তু সারাদিন কানে কী ঢুকছে, সেটা নিয়ে প্রায় কেউ ভাবেই না।”
ঠিক তখনই দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল।
একই সময়ে উল্টো দিকের ছোট্ট মন্দিরে সন্ধ্যার ঘণ্টা বেজে উঠল।
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর।
তবু একে অন্যকে আঘাত করছিল না।
বরং মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার আকাশে পাশাপাশি বয়ে চলেছে।
সুরঞ্জনা ধীরে বলল,
— “দেখলেন? মিল মানেই একরকম হওয়া নয়। ঠিক সুরে থাকাটাই আসল।”
আমি আর কোনো উত্তর দিলাম না।
সেদিন সুরালয় থেকে বেরোতে বেরোতে রাত ন’টা পেরিয়ে গিয়েছিল।
চিৎপুরের দিনের কোলাহল তখন স্তিমিত। একে একে দোকানের ঝাঁপ নামছে। কোথাও শেষবারের মতো হাতুড়ির শব্দ, কোথাও কাঠের বাক্স বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। বাতাসে পুরোনো কাঠ, ধূপ আর ধাতুর গন্ধ।
আমি গলির মুখে পৌঁছতেই থমকে দাঁড়ালাম।
খুব ক্ষীণ একটা বাঁশির সুর ভেসে আসছে।
এত নিচু যে শব্দ বললেও যেন ভুল হয়। আবার এত স্পষ্ট যে উপেক্ষা করাও যায় না।
আমি চারদিকে তাকালাম।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
একজন চায়ের দোকানদার গ্লাস ধুচ্ছে।
দুজন কুলি গল্প করতে করতে হেঁটে চলে গেল।
একটা কুকুর রাস্তার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।
কেউ যেন কিছুই শুনছে না।
শুধু আমি।
বাঁশির সুরটা অদ্ভুত।
কোনো পরিচিত রাগ নয়। অথচ মনে হচ্ছিল কোথাও যেন আগে শুনেছি।
কোথায়?
মনে করতে পারলাম না।
সুরটা ধীরে ধীরে আমাকে গলির ভেতরের দিকে টানতে লাগল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শম্ভুনাথ ওস্তাদের গলা ভেসে এল।
— “শুনতে পেয়েছ?”
আমি ফিরে তাকালাম।
উনি দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে।
চোখে সেই পরিচিত শান্ত দৃষ্টি নেই।
মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।
— “হ্যাঁ।”
উনি একটা কাপড়ের ছোট থলি খুলে একটা স্ফটিকের মালা আমার হাতে দিলেন।
— “রাখ”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “আজ রাতটা একটু সাবধানে থাকো।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কেন?”
উনি সরাসরি উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
— “সব সুর মানুষের জন্য নয়।”
কথাটা শেষ করে তিনি দোকানের ভেতরে ফিরে গেলেন।
আমি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাঁশির সুর তখনও ভেসে আসছে।
একবার মনে হলো বাড়ি ফিরে যাই।
আবার মনে হলো—সুরটার উৎসটা অন্তত একবার দেখে আসি।
কৌতূহল আর সতর্কতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ সাধারণত ভুল সিদ্ধান্তই নেয়।
সেদিন আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না।
গলির আরও গভীরে এগোতে লাগলাম।
চিৎপুরের এই অংশে আমি আগে কখনও আসিনি। রাস্তা ক্রমশ সরু হচ্ছে। দু’পাশের পুরোনো বাড়িগুলো যেন মাথা ঝুঁকিয়ে একে অপরের সঙ্গে গোপন কথা বলছে। কোথাও ভাঙা বারান্দা, কোথাও স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল। বাতাসে গঙ্গার আর্দ্র গন্ধ।
বাঁশির সুরটা এবার স্পষ্ট।
তবু উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মনে হচ্ছিল, সুরটা কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকে নয়—চারদিক থেকেই ভেসে আসছে।
“বাড়ি যাও নি ?”
চমকে পিছনে তাকালাম। ওস্তাদ নিঃশব্দে কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কে বাজাচ্ছে?”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ মাথা নাড়লেন।
— “জানি না।”
উত্তরটা অদ্ভুতভাবে আমাকে আশ্বস্ত করল না; বরং আরও অস্বস্তিতে ফেলল।
আমরা আর কয়েক পা এগোতেই খেয়াল করলাম, আশপাশের শব্দগুলো একে একে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ট্রামের ঘণ্টা নেই।
গাড়ির হর্ন নেই।
মানুষের কথাবার্তাও নেই।
শুধু বাঁশির সুর।
আর তার নিচে—
খুব সূক্ষ্ম একটা দীর্ঘ গুঞ্জন।
প্রথমে মনে হলো কানের ভুল।
তারপর বুঝলাম, না।
ওটা আছে।
খুব নিচু।
খুব গভীর।
গলির মধ্যে অন্ধকার জমাট বেঁধে একটা অস্পষ্ট অবয়ব নিচ্ছে যেন, মানুষ না, অব্যাখ্যাত কিছু, যা এই পৃথিবীর নয়।
আমি থেমে গেলাম।
শম্ভুনাথ ওস্তাদও দাঁড়ালেন।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
অনেকক্ষণ পরে আস্তে বললেন,
— “শুনতে পাচ্ছ?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি শুধু বাঁশি শুনছি না।
আরও কিছু শুনছি।
যার ভাষা নেই।
যার শুরু নেই।
শেষও নেই।
ওস্তাদ চোখ না খুলেই বললেন,
— “এটাই অনাহত নাদের ছায়া।”
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম,
— “অনাহত?”
তিনি ধীরে বললেন,
— “যে শব্দ দুই বস্তুর সংঘাতে জন্মায় না।”
একটু থেমে আবার বললেন,
— “ঘণ্টা বাজালে শব্দ হয়। শঙ্খে ফুঁ দিলে শব্দ হয়। তারে আঙুল ছোঁয়ালে সুর জন্মায়। কিন্তু কিছু কিছু ধ্বনি আছে—যাদের জন্ম হয়নি কখনও। তারা ছিল, আছে, থাকবে।”
আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।
চারপাশের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে এসেছে।
আর সেই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ভেসে চলেছে—
বাঁশি।
আর তারও গভীরে—
একটি অবিরাম, অনন্ত গুঞ্জন।
মনে হলো, পৃথিবী যেন নিজেই এক দীর্ঘ স্বর ধরে রেখেছে—
ওঁ…
আমি গলির দিকে তাকালাম।
কুয়াশার আবছা অবয়বগুলো যেন আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
এখনও তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না।
তবু মনে হচ্ছিল, তারা সবাই শুনছে।
ঠিক আমার মতো।
ঠিক তখনই বাঁশির সুর বদলে গেল।
সুরের ভেতর অদ্ভুত এক টান তৈরি হলো।
ডাকের মতো।
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ শূন্যতা নেমে এল।
মনে হলো—
আমাকে যেতে হবে।
এখনই।
সব ফেলে।
সব ছেড়ে।
কোথায়?
জানি না।
কেন?
সেটাও জানি না।
শুধু মনে হচ্ছিল, ওই সুরটার শেষ পর্যন্ত না গেলে আমার জীবনের একটা অংশ চিরকাল অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আমি এক পা বাড়ালাম।
হঠাৎ শম্ভুনাথ ওস্তাদের হাত বজ্রের মতো আমার কব্জি চেপে ধরল।
— “না।”
আমি চমকে উঠলাম।
— “কিন্তু…”
— “এইটাই ডাক।”
উনি খুব ধীরে বললেন।
— “প্রত্যেক সুরের একটা কেন্দ্র থাকে।”
আমি তাকিয়ে রইলাম।
তিনি যোগ করলেন,
— “কিছু কিছু কেন্দ্রের খুব কাছে যাওয়া মানুষের কাজ নয়।”
হাতের স্ফটিকের মালাটা হঠাৎ উষ্ণ হয়ে উঠল।
বাঁশির সুর আরও তীব্র।
কুয়াশার অবয়বগুলো স্থির।
যেন অপেক্ষা করছে।
তারপর—
হঠাৎ সব থেমে গেল।
বাঁশি নেই।
গুঞ্জন নেই।
বাতাস আবার হালকা।
কুয়াশার অবয়বগুলো ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ড্রেনের ধারে বসে থাকা ইঁদুরগুলো একসঙ্গে ছুটে পালাল।
চিৎপুর আবার আগের মতোই হয়ে গেল।
যেন কিছুই ঘটেনি।
শুধু আমার হাতের স্ফটিকের মালাটা তখনও অস্বাভাবিক উষ্ণ।
আমি আস্তে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কে বাজাচ্ছিল?”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “এই প্রশ্নটাই একদিন আমার গুরু করেছিলেন।”
— “উত্তর পেয়েছিলেন?”
ওস্তাদ মৃদু হাসলেন।
— “গুরু বলেছিলেন—যেদিন উত্তর পেয়ে যাবে, সেদিন আর মানুষ হয়ে থাকবে না।”
আমি নীরব।
উনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,
— “আমরা ভাবি, আমরা গান শুনি।”
একটু থেমে আমার দিকে তাকালেন।
— “কখনো কখনো গানও তার শ্রোতাকে খুঁজে নেয়।”
________________________________________

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর কয়েক মুহূর্ত আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম।
গত রাতের ঘটনাটা কি সত্যিই ঘটেছিল?
নাকি অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে দেখা কোনো স্বপ্ন?
চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা স্ফটিকের মালাটার দিকে।
সূর্যের আলোয় দানাগুলো ছোট ছোট রঙধনুর মতো ঝিলিক দিচ্ছে।
আমি হাতে তুলে নিলাম।
ঠান্ডা।
সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
যেন রাতের সেই অস্বাভাবিক উষ্ণতার কোনো স্মৃতিই তার নেই।
স্টুডিওতে গিয়েও কাজে মন বসল না।
একটা ট্র্যাক মিক্স করতে করতে বারবার মনে হচ্ছিল, সুরের নিচে যেন আরেকটা স্তর আছে।
খুব নিচু।
খুব গভীর।
শোনা যায় না।
তবু যেন আছে।
একটানা বাজতে থাকা বিশাল এক তানপুরার মতো।
দুপুরের পর আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না।
আবার সুরালয়ে গেলাম।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন।
আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলেন,
— “ঘুম হয়েছিল?”
আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
উনি মৃদু হেসে বললেন,
— “আমারও প্রথমবার হয়নি।”
আমি বসে পড়লাম।
— “কাল রাতে কী ছিল?”
উনি চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিলেন।
— “জানি না।”
— “আপনিও জানেন না?”
— “না।”
তিনি এক চুমুক চা খেলেন।
তারপর বললেন,
— “মানুষের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। যেটার ব্যাখ্যা জানে না, সেটার একটা নাম দিয়ে ভাবে, বুঝে ফেলেছে।”
আমি চুপ।
উনি আবার বললেন,
— “ধরো, একটা পিঁপড়ে রেডিওর ভেতরে ঢুকে পড়ল।”
আমি তাকিয়ে আছি।
— “সে দেখবে তার, ট্রানজিস্টর, সার্কিট। সবই দেখতে পাবে।”
একটু থেমে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “কিন্তু গানটা কোথায়?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
— “আমরাও অনেকটা সেই পিঁপড়ের মতো।”
তিনি শান্ত গলায় বললেন।
— “আমরা কম্পাঙ্ক মাপি, তরঙ্গের ছবি আঁকি, মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া দেখি। কিন্তু সুর কোথায় জন্মায়—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও আমাদের জানা নেই।”
আমি প্রথমবার দোকানের ভেতরের দেয়ালের ছবিটার দিকে খেয়াল করলাম।
একজন বৃদ্ধ।
দীর্ঘ শুভ্র দাড়ি।
বন্ধ চোখ।
কোলে তানপুরা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “উনিই আপনার গুরু?”
শম্ভুনাথ ওস্তাদ উঠে দাঁড়ালেন।
ছবিটার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
— “না।”
আমি বিস্মিত।
— “উনি আমার গুরুর গুরু।”
ঘরের ভেতর যেন হঠাৎ আরও নীরব হয়ে গেল।
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ ছবির সামনে দাঁড়িয়েই বললেন,
— “১৯৪৬ সাল।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
— “দাঙ্গার বছর।”
বাইরে কোথাও একটা ট্রামের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ওস্তাদ ধীরে বললেন,
— “কলকাতা তখন আগুনে জ্বলছে। মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। রাস্তায় রক্ত, ঘরে ঘরে আতঙ্ক।”
তিনি একটু থামলেন।
— “সেই সময় এক রাতে গুরুদেব গঙ্গার ঘাটে তানপুরা নিয়ে বসেছিলেন।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “সেই অবস্থায়?”
— “হ্যাঁ।”
উনি শান্ত স্বরে বললেন,
— “তিনি বলতেন, শহরের সুর ভেঙে গেছে। তাকে আবার সুরে ফেরাতে হবে।”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।
আমি নিঃশব্দে শুনছিলাম।
— “তিন দিন ধরে তিনি একটিমাত্র স্বর ধরার চেষ্টা করেছিলেন।”
— “কোন স্বর?”
ওস্তাদ ছবির দিকে তাকিয়েই বললেন,
— “যে স্বরের উপর পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে।”
কথাটা শুনে আমার শরীরে কাঁটা দিল।
আমি জানতাম, এ কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।
তবু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, উনি গল্প বলছেন না।
স্মৃতি বলছেন।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ আবার বলতে শুরু করলেন।
— “তৃতীয় রাতের শেষে গুরুদেব হঠাৎ তানপুরা নামিয়ে রাখেন।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছি।
— “তারপর তিনি শুধু একটি বাক্য বলেছিলেন।”
ওস্তাদের গলা আরও নিচু হয়ে এল।
— “আজ বুঝলাম… আমরা একা নই।”
ঘরের নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।
আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম,
— “তিনি কী দেখেছিলেন?”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর ওস্তাদ ছবির ফ্রেমের নিচে আঙুল রাখলেন।
সেখানে ছোট অক্ষরে লেখা—
“যখন মানুষ সুর সৃষ্টি করে, তখন সে ভাবে সে একা গাইছে।
কিন্তু কখনো কখনো মহাবিশ্বও তার সঙ্গে গলা মেলায়।”
আমি লেখাটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
বাইরে তখন বিকেলের কলকাতা ধীরে ধীরে নিজের চেনা শব্দে ফিরে এসেছে।
ট্রামের ঘণ্টা।
বাসের হর্ন।
ফেরিওয়ালার হাঁক।
দূরের মন্দিরের ঘণ্টা।
আর তারও ওপরে, মসজিদ থেকে ভেসে আসা আসরের আজান।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
— “দেখলে?”
আমি প্রশ্ন করলাম,
— “কী?”
— “শহরটা কখনো নীরব হয় না।”
তিনি মৃদু হেসে যোগ করলেন,
— “প্রশ্ন শুধু এই—কোন শব্দটা তুমি শুনছ?”
বাইরে বিকেলের কলকাতা নিজের স্বাভাবিক শব্দে ফিরে গেছে।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
— “জানো, শব্দেরও নৈতিকতা আছে?”
আমি বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম।
তিনি জানালার বাইরে চোখ রেখেই বললেন,
— “যে সুর মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, সে ভালো সুর।”
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আর খারাপ?”
— “যে সুর মানুষকে নিজের থেকেই দূরে সরিয়ে দেয়।”
তিনি একটু থামলেন।
তারপর নিচু স্বরে বললেন,
— “সবচেয়ে বিপজ্জনক সুর কোনটা জানো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
— “যে সুর তোমাকে তোমার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও হাঁটতে বাধ্য করে।”
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
গত রাতের সেই ডাক।
সেই টান।
সব ফেলে কোথাও চলে যাওয়ার অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— “হ্যাঁ।”
তিনি বুঝেছেন।
আমি কিছু বলিনি, তবু তিনি বুঝেছেন।
— “তোমারও শুরু হয়েছে।”
কথাটা বলেই তিনি দেওয়ালে ছবিটার দিকে তাকালেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন,
— “সবাই শুনতে পায় না।”
আমি অপেক্ষা করছিলাম।
— “কিন্তু যারা একবার শুনে ফেলে…”
তিনি বাকিটা শেষ করতে একটু সময় নিলেন।
“…তাদের সামনে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটো পথ খোলা থাকে।”
— “কী পথ?”
তিনি আমার চোখের দিকে স্থির তাকিয়ে রইলেন।
— “একটা—সেই সুরের পিছু নেওয়া।”
একটু থামলেন।
— “আরেকটা—সারা জীবন তাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করা।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
আমি জানতাম না, এই দুই পথের কোনোটাই আসলে মুক্তির পথ কি না।
________________________________________

শম্ভুনাথ ওস্তাদ হারিয়ে গেলেন এক সোমবার সকালে।
‘হারিয়ে গেলেন’—কথাটা হয়তো ঠিক নয়।
মনে হয়েছিল, যেন তিনি পৃথিবী থেকে নিঃশব্দে মুছে গেছেন।
সেদিন সকালে সুরালয়ে গিয়ে দেখি ঝাঁপ আধখোলা।
ভেতরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সবকিছু নিজের জায়গায়।
তানপুরা।
সেতার।
বেহালা।
চায়ের ভাঁড়।
এমনকি আগের দিনের খবরের কাগজটাও ভাঁজ করে রাখা।
শুধু মানুষটা নেই।
সুরঞ্জনা শান্ত গলায় বলল,
— “ভোরে গঙ্গাস্নানে গেছেন বলেছিলেন। তারপর আর ফেরেননি।”
পুলিশে খবর দেওয়া হলো।
ঘাটে খোঁজা হলো।
হাসপাতালে।
মর্গেও।
কোথাও কোনো সন্ধান মিলল না।
তিন দিন পরে বাবুঘাটের এক মাঝি বলেছিল, ভোরের অন্ধকারে নাকি একজন বৃদ্ধকে শেষ সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখেছিল, হাতে একটা বীণা।
তার বেশি কিছু সে বলতে পারেনি।
আমরাও আর জানতে চাইনি।
কারণ তখন বুঝে গিয়েছিলাম—
সব প্রশ্নের উত্তর জানা মানুষের প্রাপ্য নয়।
জীবন ধীরে ধীরে নিজের ছন্দে ফিরে গেল।
অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হতো।
আমি স্টুডিওর কাজ চালিয়ে গেলাম।
সুরঞ্জনা স্কুলে গান শেখাতে থাকল।
কয়েক বছর পরে আমাদের বিয়ে হলো।
শম্ভুনাথ ওস্তাদ সেই বিয়েতে ছিলেন না।
তবু অদ্ভুতভাবে মনে হয়েছিল, তাঁর অনুপস্থিতিটাও যেন উপস্থিতিরই আরেক রূপ।
সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বারান্দার এয়ার-চাইমগুলো একটানা বেজে চলেছিল এলোমেলো অবিশ্রান্ত হাওয়ায়।
কেউ কিছু বলেনি।
আমিও না।
________________________________________
আমাদের মেয়ের নাম রেখেছিল সুরঞ্জনা।
শ্রুতি।
আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “সঙ্গীতের শ্রুতি?”
সে মাথা নেড়ে বলেছিল,
— “শুধু তা নয়। যা সবাই শুনতে পায়, আর যা কেবল কিছু মানুষ শোনে—দুটোই।”
________________________________________
শ্রুতির বয়স যখন তিন, প্রথম ঘটনাটা ঘটল।
একদিন বিকেলে ছবি আঁকতে আঁকতে সে হঠাৎ বলল,
— “বাবা, ওই কাকুগুলো কারা?”
আমি তাকালাম।
ছাদে কেউ নেই।
— “কোথায়?”
সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আঙুল তুলে দেখাল।
— “ওই যে… সাদা সাদা কাকুগুলো।”
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “ওরা কী করছে?”
শ্রুতি একটু ভেবে বলল,
— “শুনছে।”
— “কী শুনছে?”
সে বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকাল।
— “তুমি শুনতে পাচ্ছ না?”
________________________________________

সেদিন রাতে আমাদের কারও ঘুম হয়নি।
অন্ধকারে শুয়ে সুরঞ্জনা শুধু একবার বলেছিল,
— “দাদু বলতেন, কিছু কিছু কান বংশে বংশে আসে।”
________________________________________

বছর গড়াতে লাগল।
শ্রুতি বড় হতে লাগল।
পাঁচ বছর বয়সে সে অনায়াসে ৪৩২ আর ৪৪০-এর পার্থক্য শুনে ফেলত।
সাত বছর বয়সে বৃষ্টির শব্দ শুনে বলে দিত, আর কতক্ষণ পরে বৃষ্টি থামবে।
নয় বছর বয়সে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বলল,
— “বাবা, আজ সূর্যটা খুব জোরে গাইছে।”
আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।
পরের দিন খবরের কাগজে পড়লাম—পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে গত এক দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়।
সেদিন প্রথমবার সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম।
কারণ আমি জানতাম—
শ্রুতি খবরের কাগজ পড়ে না।
________________________________________

এক রাতে ঘুম ভেঙে দেখি, সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে।
বাইরের অন্ধকারের দিকে স্থির তাকিয়ে আছে।
আমি ধীরে কাছে গিয়ে বললাম,
— “কী হয়েছে?”
সে উত্তর দিল না।
অনেকক্ষণ পরে ফিসফিস করে বলল,
— “ওরা আবার এসেছে।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
— “কারা?”
সে জানালার বাইরেই তাকিয়ে রইল।
— “যারা শুনতে আসে।”
ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
ঠিক সেইরকম।
বহু বছর আগে চিৎপুরের সেই গলিতে যেমন হয়েছিল।
দূরে কোথাও একটা ট্রামের ঘণ্টা বাজল।
তারপর আবার নীরবতা।
আর সেই নীরবতার ভেতর—
আমি আবার শুনলাম।
খুব নিচু।
খুব গভীর।
খুব পুরোনো।
একটা দীর্ঘ গুঞ্জন।
শোনা যায় না।
তবু আছে।
মনে হলো, পৃথিবী নিজেই যেন একটানা একটি স্বর ধরে রেখেছে।
হঠাৎ শম্ভুনাথ ওস্তাদের একটা কথা মনে পড়ে গেল।
— “পৃথিবীর নানা প্রান্তে কিছু মানুষ নাকি সবসময় এক অদ্ভুত গুঞ্জন শুনতে পায়। সবাই নয়—কেবল অল্প কয়েকজন। বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা খুঁজছে। নাম দিয়েছে। কিন্তু নাম দিলেই কি রহস্য শেষ হয়ে যায়?”
তখন আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “আপনি কী মনে করেন?”
তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বলেছিলেন,
— “যদি শব্দটা বাইরের না হয়?”
একটু থেমে।
— “যদি সে অপেক্ষা করে থাকে… কেউ একজন শুনে ফেলবে বলে?”
জানলার বাইরে রাতের কলকাতা নিশ্চুপ।
আর সেই নীরবতার ভেতর—
আবার।
ওঁ…
শ্রুতি তখনও বাইরে তাকিয়ে।
খুব আস্তে বলল,
— “বাবা?”
— “হ্যাঁ?”
— “দাদু কি ফিরে আসবেন?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে শম্ভুনাথ ওস্তাদের সেই কথাটা আবার মনে পড়ল—
“কখনো কখনো গানও তার শ্রোতাকে খুঁজে নেয়।”
আর তখনই আমার মনে হলো—
হয়তো আমরা এতদিন ভুল প্রশ্ন করেছি।
প্রশ্নটা এই নয়—
আমরা কী শুনছি।
প্রশ্নটা হলো—
এই মুহূর্তে…
আমাদের মধ্যে কাকে কাকে
শুনে ফেলা হয়েছে।

অমরবীজ

ড. অরিন্দম সেন সেদিন প্রথমে ভেবেছিলেন ব্যাপারটা ডেটাবেসের ভুল।

বেঙ্গালুরুর ভারতীয় মহাকাশ পুষ্টিবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের ল্যাবে বসে তিনি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ খাদ্যতালিকা নিয়ে কাজ করছিলেন। পৃথিবীর জন্য নয়। মঙ্গলের জন্য।

মানুষ যখন পৃথিবীর বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করবে, তখন সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হবে না সোনা, ইউরেনিয়াম বা জ্বালানি।

সবচেয়ে মূল্যবান হবে এমন একটি খাদ্য যা কম জায়গায় জন্মাবে, কম জল খাবে, কম যত্ন চাইবে, এবং তবুও মানুষের শরীরের প্রায় সব চাহিদা পূরণ করবে।

তালিকাটা খুব ছোট ছিল।

কিছু শৈবাল।

কিছু ডালজাতীয় উদ্ভিদ।

আলু।

সয়াবিন।

আর একটি নাম—

Amaranthus.

রামদানা।

অরিন্দম নামটা চিনতেন।

ছোটবেলায় দুর্গাপুজোর মেলায় রামদানার লাড্ডু খেয়েছেন।

হিমালয়ে ট্রেকিং করতে গিয়ে ভিক্ষুদের রামদানার রুটি খেতে দেখেছেন।

কিন্তু তার বেশি কিছু জানতেন না।

ডেটা টেবিলে চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎ তাঁর হাত থেমে গেল।

প্রোটিন — অসাধারণ।

ক্যালসিয়াম — অধিকাংশ শস্যের চেয়ে বেশি।

আয়রন — পালং শাকের চেয়েও বেশি।

সমস্ত অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড — উপস্থিত।

ভিটামিন সি — উপস্থিত।

স্কুয়ালিন — অস্বাভাবিক পরিমাণে।

তারপর নিচে একটা মন্তব্য।

মাত্র এক লাইন।

Selected not only for nutrition.

পুষ্টির জন্যই শুধু নির্বাচিত নয়।

অরিন্দম ভুরু কুঁচকালেন।

বিজ্ঞানীরা এভাবে লেখেন না।

বিজ্ঞানীরা অস্পষ্টতা পছন্দ করেন না।

সেখানে কারণ থাকে।

ডেটা থাকে।

রেফারেন্স থাকে।

এখানে কিছুই নেই।

শুধু একটা বাক্য।

তিনি ভেবেছিলেন পরে দেখবেন।

তারপর ভুলে গিয়েছিলেন।

কিন্তু কিছু প্রশ্নের অদ্ভুত স্বভাব আছে।

আপনি তাদের ভুলে যান।

তারা আপনাকে ভুলে যায় না।

দুই সপ্তাহ পরে তাঁর কাছে মেক্সিকো সিটি থেকে একটা মেইল এলো।

প্রেরক—

ড. এলেনা কাস্তিয়ো।

নৃতত্ত্ববিদ।

মেসোআমেরিকান ধর্মীয় সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন।

মেইলের বিষয়—

Regarding your inquiry on Amaranth.

মেইলের সঙ্গে একটা ছবিও ছিল।

ষোড়শ শতকের হাতে লেখা স্প্যানিশ পাণ্ডুলিপি।

কালি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

পাতার প্রান্ত ভেঙে গুঁড়ো হচ্ছে।

কিন্তু একটি বাক্য এখনো স্পষ্ট।

এলেনা তার নিচে অনুবাদ লিখেছিলেন।

“শস্যটা বিপজ্জনক ছিল না।

বিপজ্জনক ছিল মানুষ সেটা খাওয়ার সময় কী মনে করত।”

অরিন্দম অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন।

তারপর প্রথমবার তিনি হার্নান কোর্তেসের নাম খুঁজে দেখেছিলেন।

মানুষ ইতিহাসে সাধারণত শহর পোড়ানোর গল্প মনে রাখে।

মানুষ খুব কমই খাবার পোড়ানোর গল্প মনে রাখে।

১৫২১ সালে স্প্যানিশ সেনারা টেনোচটিটলান দখল করার পরে কেবল মন্দির ভাঙেনি।

ক্ষেতও জ্বালিয়েছিল।

রামদানার ক্ষেত।

বীজের ভাণ্ডার।

চাষিদের ঘর।

শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড।

চাষ করলে মৃত্যু।

বীজ রাখলে মৃত্যু।

বেচলে মৃত্যু।

কেন?

একটা শস্যের জন্য?

উত্তরটা কৃষিতে ছিল না।

উত্তরটা ছিল ধর্মে।

অ্যাজটেক পুরোহিতরা রামদানা, মধু এবং কখনও কখনও বলিদানের রক্ত মিশিয়ে দেবতার মূর্তি তৈরি করত।

মূর্তিগুলো মিছিল করে শহর ঘুরত।

তারপর ভেঙে ফেলা হতো।

আর হাজার হাজার মানুষ সেই মূর্তির অংশ খেয়ে নিত।

একটি পবিত্র ভোজন।

কোর্তেস ছিলেন ক্যাথলিক।

খ্রিস্টের শরীর ও রক্তের প্রতীক হিসেবে রুটি আর মদ খাওয়ার ধারণা তাঁর কাছে পরিচিত ছিল।

কিন্তু এখানে—

অন্য দেবতা।

অন্য আচার।

একই প্রতীক।

ক্যাথলিক কোর্তেস তার নথিতে লিখেছিলেন—

“শয়তানের অনুকরণ।”

তারপর আগুন নেমে এসেছিল।

শস্যের উপর।

স্মৃতির উপর।

সভ্যতার উপর।

অরিন্দমের মেক্সিকো যাওয়ার কথা ছিল না।

শেষ পর্যন্ত তিনি গেলেন।

টেহুয়াকান-কুইকাটলান উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তাঁর প্রথম মনে হয়েছিল, এখানে কোনো কিছু জন্মানোর কথা নয়।

ধুলো।

পাথর।

ফেটে যাওয়া মাটি।

তার মাঝখানে লালচে শীষে ভরা ক্ষেত।

এলেনা একটা শীষ ভেঙে তাঁর হাতে দিলেন।

“একটা গাছ থেকে কত বীজ হয় জানো?”

“কত?”

“পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার।”

অরিন্দম অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।

এলেনা হেসে বললেন,

“খরা সহ্য করে। গরম সহ্য করে। খারাপ মাটিতে জন্মায়।”

তারপর একটু থেমে বললেন,

“তুমি কি জানো, উদ্ভিদদের নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা কী?”

“কী?”

“আমরা ভাবি ওরা নিষ্ক্রিয়।”

সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা শুকনো শীষ তুলে নিল।

“কিন্তু একটা বন আসলে একটা জীব।”

“গাছেরা শিকড়ের নীচে ছত্রাকের জালের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে।”

“জল ভাগ করে।”

“সতর্কবার্তা পাঠায়।”

“একটা গাছ আক্রান্ত হলে অন্য গাছ প্রতিরক্ষা রাসায়নিক তৈরি করতে শুরু করে।”

“বিজ্ঞানীরা এখন ওটাকে বলে Wood Wide Web।”

সে একটু থামল।

“আমরা নিশ্চিত কীভাবে হবো যে বুদ্ধিমত্তার জন্য মস্তিষ্ক লাগে?”

অরিন্দম উত্তর দিতে পারেননি।

ট্রেকিং এ লাদাখের কাছে মনেস্ট্রীতে তাশি নোরবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এক বছর আগে।

বৃদ্ধ ভিক্ষু।

বয়স আশির কাছাকাছি।

সন্ধ্যার আলোয় তিনি রামদানার রুটি ভেঙে অরিন্দমের হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন,

“রামদানা শব্দের অর্থ জানো?”

“ভগবানের দেওয়া শস্য।”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“মানুষ নাম দেয় কারণ মানুষ কিছু দেখে।”

“কিন্তু সব সময় মানুষ যা দেখে, তা বোঝেও না।”

দূরের বরফঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,

“মানুষ ভাবে সে উদ্ভিদ চাষ করে।”

“হয়তো অনেক সময় উল্টোটাও সত্যি।”

অরিন্দম হেসে ফেলেছিলেন।

বৃদ্ধও হেসেছিলেন।

কিন্তু তাঁর চোখ হাসেনি।

ফিরে এসে অরিন্দম গবেষণাপত্র পড়তে শুরু করলেন।

তখন তিনি প্রথম জানলেন—

রামদানা C4 photosynthesis ব্যবহার করে।

ভবিষ্যতের উষ্ণ পৃথিবীর জন্য আদর্শ।

তিনি জানলেন—

গম, চাল, ভুট্টা— অধিকাংশ শস্যেই লাইসিন কম।

রামদানায় নয়।

তিনি জানলেন—

মানুষের যকৃত যে স্কুয়ালিন তৈরি করে, সেই একই যৌগ এই ছোট্ট বীজ তৈরি করে পৃথিবীর যেকোনো স্থলজ উদ্ভিদের চেয়ে বেশি পরিমাণে।

তিনি জানলেন—

NASA সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের জন্য এটিকে সম্ভাব্য ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

আর তারপর তিনি এমন একটা গবেষণাপত্র পেলেন, যেটা সম্ভবত তাঁর দেখা উচিত ছিল না।

বিষয়—

খাদ্যাভ্যাস এবং স্মৃতির জৈবরসায়ন।

সেখানে একটা লাইন ছিল।

খুব সাধারণ একটা লাইন।

“খাদ্য শুধু শরীর তৈরি করে না।

খাদ্য মস্তিষ্কের কাজ করার ধরনও তৈরি করে।”

অরিন্দম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইলেন।

যদি কোনো খাদ্য একটি সভ্যতার চিন্তার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে?

যদি কোনো উদ্ভিদ কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষের সিদ্ধান্ত, পছন্দ, বিশ্বাস এবং সামাজিক কাঠামোর উপর অদৃশ্য প্রভাব ফেলে?

তাহলে সেই সম্পর্কটাকে কী বলা হবে?

কৃষি?

সহাবস্থান?

নাকি অন্য কিছু?

তার কিছুদিন পরে স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে পরীক্ষাটা শুরু হয়।

চব্বিশ জন।

চার দেশ।

একই খাদ্যাভ্যাস।

একই পরিমাণ রামদানা।

আট সপ্তাহ।

অষ্টম সপ্তাহে প্রথম রিপোর্ট আসে।

একজন পেরুভিয়ান নারী লিখলেন—

“আমি বারবার একটা লাল সর্পিল শহরের স্বপ্ন দেখি।”

লাদাখের ইমিগ্রান্ট সন্ন্যাসী লিখলেন—

“বরফের মধ্যে সিঁড়িওয়ালা পাথরের রাস্তা।”

একজন মেক্সিকান কৃষক লিখলেন—

“অনেক মানুষ বীজ বহন করছে।”

একজন কেনিয়ান শিক্ষক লিখলেন—

“আমি জানি না কেন, কিন্তু স্বপ্নে মনে হয় আমি ওদের চিনি।”

অরিন্দম রিপোর্টগুলো আলাদা করে রাখলেন।

তিন সপ্তাহ পরে তিনি ভুলটা বুঝলেন।

স্বপ্নগুলো আলাদা ছিল না।

সবাই একই জায়গাকে দেখছিল।

ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে।

আরও অদ্ভুত ছিল অন্য বিষয়টা।

কেউ কাউকে দেখছে না।

কেউ কোনো দেবতা দেখছে না।

কেউ কোনো কণ্ঠস্বর শুনছে না।

তবু প্রত্যেকেই একই অনুভূতির কথা লিখেছে।

“মনে হচ্ছিল আমি বাড়ি ফিরছি।”

বিজ্ঞানী হিসেবে অরিন্দম জানতেন—

মস্তিষ্কের মধ্যে পরিচিতির অনুভূতি তৈরি করা যায়।

গন্ধ দিয়ে।

সুর দিয়ে।

স্বাদ দিয়ে।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য।

একই অনুভূতি,

একই সময়ে,

চারটি মহাদেশের মানুষ অনুভব করছে কেন?

সেই রাতে তিনি বারান্দায় একটা টবে রামদানার বীজ বুনেছিলেন।

কৌতূহল থেকে।

বিজ্ঞান থেকে।

অথবা হয়তো অন্য কিছু থেকে।

দশ দিন পরে প্রথম চারা উঠল।

পনেরো দিন পরে সেগুলো হাঁটু ছুঁয়ে ফেলল।

এক মাস পরে হাওয়ায় গোছা গোছা লাল শীষ দুলছিল।

অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।

অবিশ্বাস্য সহজে।

যেন তারা অপেক্ষা করছিল।

* * *

সেই রাতে অরিন্দম আর ঘুমোতে পারেননি।

বারান্দার টবে দাঁড়িয়ে থাকা রামদানার শীষগুলো বাতাসে নড়ছিল।

বাতাস ছিল না।

তবু নড়ছিল।

তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন, ক্লান্তির কারণে ভুল দেখছেন।

তারপর খেয়াল করলেন—

সবগুলো শীষ একই দিকে ঝুঁকে আছে।

একই দিকে।

আকাশের দিকে নয়।

বাড়ির ভেতরের দিকে।

তাঁর দিকে।

অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।

একটা শীষ হাত দিয়ে ছুঁলেন।

অদ্ভুত উষ্ণ।

প্রায় শরীরের তাপমাত্রার মতো।

ঠিক তখনই তাঁর মাথায় একটা চিন্তা এল।

চিন্তাটা তাঁর নিজের না।

তিনি সেটা জানতেন।

তবু চিন্তাটা এল।

স্পষ্ট।

সম্পূর্ণ।

নিঃশব্দ।

“আমরা ক্ষুধা তৈরি করি।”

অরিন্দম জমে গেলেন।

“ক্ষুধার পেছনে মানুষ চলে।”

আরেকটা।

“মানুষ বীজ বহন করে।”

আরেকটা।

“মানুষ শহর বানায়। রাস্তা বানায়। সাম্রাজ্য বানায়।”

দীর্ঘ বিরতি।

তারপর—

“আমরা শুধু অপেক্ষা করি। সঠিক আধারের”

অরিন্দম হঠাৎ মনে করতে পারলেন—

গমের উৎস মধ্যপ্রাচ্য।

ভুট্টার উৎস মেক্সিকো।

ধানের উৎস এশিয়া।

আলুর উৎস আন্দিজ।

মানুষই নাকি তাদের পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু যদি ব্যাপারটা উল্টো হয়?

যদি উদ্ভিদরাই মানুষকে ছড়িয়ে দিয়ে থাকে?

যদি সভ্যতা আসলে উদ্ভিদের পরিবহন প্রযুক্তি হয়?

তাঁর মনে পড়ল হারারির সেই লাইনটা।

“গম মানুষকে গৃহপালিত করেছে।”

হঠাৎ তিনি বুঝলেন—

ওটা রসিকতা ছিল না।

ওটা বিবরণ ছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনটা বেজে উঠল।

মেক্সিকো থেকে এলেনা।

ফোন ধরতেই ওপাশে কোনো কথা নেই।

শুধু শ্বাসের শব্দ।

তারপর খুব নিচু গলায় সে বলল—

“অরিন্দম…”

“হ্যাঁ?”

“আজ সকালে আমরা ক্ষেতটা কেটে ফেলেছি।”

“তারপর?”

দীর্ঘ নীরবতা।

“সন্ধ্যার মধ্যে আবার গজিয়ে উঠেছে।”

অরিন্দম কিছু বললেন না।

এলেনা বলল,

“আমরা মাটি পরীক্ষা করেছি।”

“বীজ ছিল?”

“না।”

“শিকড়?”

“না।”

“তাহলে?”

ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ নেই।

তারপর—

“মাটি ফুঁড়ে ওগুলো উঠেনি।”

“তাহলে?”

এলেনার গলা কাঁপছিল।

“মনে হচ্ছিল যেন ওগুলো…”

“…মনে করার চেষ্টা করছে।”

ফোনটা কেটে গেল।

অনেকক্ষণ পরে অরিন্দম খেয়াল করলেন—

বারান্দার টবে দাঁড়ানো রামদানার শীষগুলো আর তাঁর দিকে তাকিয়ে নেই।

এখন তারা সবাই ঘুরে গেছে।

একই দিকে।

পূর্ব আকাশের দিকে।

যেদিকে সূর্য উঠবে।

যেন কেউ আসছে।

অথবা—

যেন কেউ ফিরছে।

রুদ্র তারা রূপকথারা – ৫

ঠিকানা : কলকাতা স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন
জেনারেল ফিমেল ওয়ার্ড নং ৪

বউ,
দেখ বাইরে কেমন ঝড়, বৃষ্টিরা বাড়ছে, রেডিও টিভিতে সতর্কতা, হয়ত ওরাও চাইছে আজ আমি তোমার বেডের পাশের টুলখানাতে বসে তোমার মুখের দিকে চেয়ে থাকি সারা রাত, যেমন চেয়ে আছি এখন। তোমার অবসন্ন মুখটায় ঘুমের প্রশান্তি কি তোমার ছোট্ট ছোট্ট আঙ্গুলগুলোর মুঠোয় আমার হাতটা ধরে রয়েছ বলে ? কিন্তু কি করে তোমায় বোঝাই, তোমার এই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার সমস্ত জগত তোলপাড়।
তবুও তোমার ঘুমের নিষ্পাপ নিষ্প্রতিরোধে হাত ছাড়িয়ে চলে যাওয়ার কষ্ট বুকে চেপে আজ আমায় ফিরে যেতেই হবে হাওয়ার সাথে তর্ক আর জলের সাথে যুদ্ধ করে ।
তুমি ঘুমোও আমার পৃথিবী । আর কিছুদিন পরেই যে আমাদের বিয়ে । গায়ে-হলুদ খাওয়া দাওয়ার মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমোও সোনা। রাত্রে ঘুম ভাঙলে চিন্তা কোর না, আমি আছি তোমার খুব কাছেই। কাল ভোরে ঠিক চলে আসব প্রতিদিনের মত ফ্লাক্সে করে পেঁপে-গাজরের স্যুপটা নিয়ে। আর একটা চকলেট, একটাই কিন্তু । ঘুম ভাঙলেই জল খেও, আর হাত দুটোয় স্যালাইনের চ্যানেলটা ব্যাথা হলে কেঁদোনা সোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি কালই ব্যাথা কমার মলম টা কিনে আনব দেখো । আমার পাগলী, তোমায় যে জিততে হবেই ।
– ইতি তোমার বর

চিঠিখানা ভাঁজ করে গেলাসের পাশে চাপা দিয়ে আস্তে আস্তে পিছনে হাঁটছে রুদ্র ।
মহিলা ওয়ার্ড, তবু অনেক তোশামোদে ভিজিটিং আওয়ারের বাইরেও তাকে ঢুকতে দিয়েছে মেট্রন দিদি, পেশেন্ট রাত্রের খাওয়া খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সময়টুকু। দু কব্জীতে অবিরাম স্যালাইনে ফুলে থাকা হাতে না হলে যে খাওয়াই হত না তারার।
বেসরকারি নতুন চাকরির সামান্য আয়ে সরকারি হাসপাতালের বেশী কুলোয়নি রুদ্রর, বাকিটুকু তার ভালোবাসা দিয়ে পূরন করতে অনেক চেষ্টা করেও মানুষের সাধ্যের কাছে মাঝে মাঝেই হোঁচট খেতে হচ্ছে তাকে। তাই তো ভীষণ অনিচ্ছা আর একরাশ উদ্বেগ নিয়েও তারাকে আপাততঃ ছেড়ে যেতে হচ্ছে নির্বান্ধব এই মৃত্যুগন্ধী ডেঙ্গু ওয়ার্ডে। কাল সকালে এসে তারাকে খাইয়ে শৌচাদি করিয়েই আবার ছুটতে হবে অফিসে, সে যে শুনেছে এক ব্যাগ প্লেটলেট কিনতে লাগে অনেক অনেক টাকা, যে কোন মূল্যে পারলে নিজের রক্ত বেচেও সেটা তাকে জোগাড় করতেই হবে।
“শুধু এইটুকু চাহিদা তোমার কাছে ভগবান” —– অনেক অনেক টাকা, লটারী জিতে যাওয়া, মালয়েশিয়া ট্যুর, কিচ্ছু চাই না রুদ্রর । কারণ তার চেয়ে অনেক দামী সম্পদ যে তার আছে। যে অতি সামান্যতেই এক আকাশ খুশী গড়ে নিতে পারে, মাসশেষের অস্বচ্ছলতার মাঝেও ছোট্ট একটা সংসারের খেলামবাটির মত … তার পুতুল বরকে অবাক করে দিতে পারে অমৃতসম কয়েক ফোঁটা ঘী ছড়ানো ধোঁয়া ওঠা খিচুরী-বেগুন ভাজা আর ডিমসেদ্ধর সারপ্রাইজ ভোজে .. এই একমাত্র সম্পদটা যে হারাতে চায় না রুদ্র কোন মূল্যেই।

আসলে সুখ জিনিসটা ভোরের বরফ ঠান্ডা শিশিরের পুঁতির মত … আছে, অনন্ত, কিন্তু সবার চোখে ধরা দেয় না। আর যে চোখে সেই অমূল্য রত্ন একবার ধরা দিয়েছে সে সদাই সন্ত্রস্ত। অমোঘ নিদাঘে ঢেকে রাখে স্বপ্নের পুঁতিগুলো আপন অঞ্জলীর পরম মমতায় … অন্ততঃ যতক্ষণ সম্ভব … তাদের যে একটা ঘর হবে, ছোট্ট, মায়া মায়া রঙের দেওয়াল, যার ছাদে আকাশ মিশে যাবে অবলীলায়।

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ৪

– এই দেখ, এরা কেমন লে লাদাখ গেছে … ফেসবুকে ছবি দিয়েছে …
– কই ?
– এই যে, দেখ না, কেমন সুন্দর ফুলে ভরা আস্ত একটা ভ্যালি, দুপাশ সবুজ রাস্তা …
– হুম
– দূরে নীল বরফের পাহাড়, কণকণে শীতের হাওয়া, ভোরের ছোঁয়ায় ফোটা ব্রহ্মকমল … আর কি চাই জীবনে …… কি সুন্দর না ? আমরাও একদিন যাব, কি বল ?
– হুম
– দূর কি খালি হুম হুম করে যাচ্ছ ? দেখ না এদিকে একবার … সারাদিনে এই একটুখানি মাত্র সময় আমাদের দেখা হয়, তাও তুমি প্রতিদিন এরকম অফিসের কাজ নিয়ে বসে থাক … আমার জন্য কি তোমার দিনে এই টুকু সময়ও নেই ?
– আঃ কেন প্রতিদিন এরকম সমস্যা কর ? একটা ছোট কোম্পানিতে কাজ করার ঝামেলা বোঝ ? একশটা দায়িত্ব তোমার ভাল লাগুক না লাগুক, তুমি পার না পার, শুধু তুমি ডেডিকেটেড আর অনেস্ট বুঝলেই তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে … তোমার ঘাম রক্তের ওপর অন্যকারোর ইমারত তৈরি হবে, তুমি বাধ্য হবে সেই ইশপের সোনার ডিমপাড়া হাঁসের মত নিজের সব কিছু, নিজের জীবন মালিকের ছুরির তলায় রেখে দিতে …

এত বড় কাগুজে লেকচারটা ভেঁজে তারার দিকে তাকাতেই ঐ গভীর কালো চোখ দুটোর স্বচ্ছতায় সম্বিৎ ফেরে রুদ্রর, মনে পড়ে চুপচাপ কর্মঠ এই মেয়েটা নিজেও একটা ছোট কোম্পানিতে কাজ করে সামান্য টাকা মাইনেয়, ভোরে উঠে ঘরের কাজ সেরে দুটো ট্রেণ বাস পালটে যেতে হয় অনেকদূর, কাঁধে নিতে হয় কোম্পানির জুতোসেলাই থেকে চন্ডীপাঠের সমস্ত দায়িত্ব। শুধু নিজের অথর্ব বাবা মায়ের শেষ জীবনের একটু সম্বল হওয়ার জন্য …

বিয়ের পর থেকে কি ই বা দিতে পেরেছে রুদ্র ? না একটা ভালো শাড়ি, না ভালো কোন জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, না একটা বড় রেস্টুরেন্টে একদিনের ক্যান্ডেললাইট ডীনার … যা একান্তই অনায়াস তার বয়সী অন্যন্য ছেলেদের জীবনে … ভিতরে ভিতরে অসীম যন্ত্রণায় , অপরাধবোধে কুঁকড়ে যায় রুদ্র।

– কি গো ? কি হল ? অমন ভাবে ফাঁকা দেওয়ালের দিকে চেয়ে আছ কেন ? একি চোখে জল কেন ? কি হয়েছে গো ? এই পাগল …… আমি আছি তো তোমার কাছে। কি যে করি পাগলটাকে নিয়ে … এই পাগলের ছারপোকা … চোখ মোছ বলছি, আরে এত দুঃখ কিসের ? এই তো সামনে প্নচায়েত ভোট … আমার সংগে গ্রামে যাবে তো ? ছুটির অ্যাপ্লাই করেছ ? নাকি ভুলে মেরে দিয়েছ ?

অতয়েব এগার বছর বয়সী মাত্র ৮৫ সিসির রংচটা ছোট্ট স্কুটি টায় বাঁধা হল ব্যাগ। দক্ষিণেশ্বরের সাঁকো পেরিয়ে বালি ছাড়িয়ে হাইওয়ে হয়ে …… একটা রূপকথার ছবি আঁকা …… যেখানে উঁচুনীচু ফ্লাইওভারেরা পাহারি পথের বাঁক, আর পথের মাঝে হঠাত পাওয়া বর্ষা ধারায় ভোরের কুয়াশা … মেঘ মেঘ … সবুজ গাছের দেওয়াল …

ওদের চোখের খুশীতে উছলোনো আনন্দের বানে খেয়ালই হয়নি … সারা পথ জুড়ে ফুটে আছে ব্রহ্মকমল … অগুণতি ……

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ৩

– ক্ষিধে পেয়েছে তোমার ?
– আমার ? …… উম, তুমি দুপুরে কি খেয়েছ আজ ?
– অমনি, তোমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ক্ষিধে পেয়েছে কিনা, আর তুমি কথা ঘুরিয়ে দিলে।
– বল না, এমন কর কেন ? একবার তো ফোন ও কর না।
– ফোন কি সবসময় করা যায় ? কাজ থাকে না ? জানোই তো চাকরিটা এখনও পার্মানেন্ট হয় নি। দুটো রুটি খেয়েছি। শান্তি ?

– মোটে দুটো ? তাহলে তো এখন খুব ক্ষিধে পেয়ে গেছে ? আর পাগলাটা আমায় জিজ্ঞাসা করছে ক্ষিধে পেয়েছে কিনা। বল কি খাবে ?
– আমি কিছু খাব না, বাড়ি গিয়ে তো রুটি খাবই, মা তো বানাচ্ছে নাকি।
– সে তো অনেক দেরী, এই আমিও আজ দুপুরে ইন্দ্রার থেকে দু তিন চামচ চিঁড়ে খেয়েছি, চল কিছু খাওয়া যাক।
– কেন !! খাবার আনতে পাঠাওনি কেন ?
– আরে তখন আর ইচ্ছে করছিল না, ও ঠিক আছে, চল কিছু খাব আমরা।
– অ্যাই সত্যি কথা বল তো ? কি কেস ? আমি আজ টাকা রেখে বেরোইনি না ? শ্যীট …
– এই, এত বকে বকে মাথা খারাপ করার হলে বাড়ি চল, তখন থেকে বলছি চল কিছু খাওয়া যাক, তা না উনি বকে যাচ্ছেন।

– কি খাবে ? মোমো খাবে ? আর কি বা পাওয়া যাবে …
– নাঃ বাব্বাঃ মোমো কাকুর দোকানে যা ভীড়, মোমো পেতে পেতে কাল সকাল হয়ে যাবে।
– তাহলে ?
– চল না, এগিয়ে দেখি, ঐ খানে কোথায় যেন একটা বিরিয়ানীর দোকান দেখেছিলাম …
– বি-বিরিয়ানী !!! আজ ! মানে এখন !! ………অজান্তেই একবার অল্প উঁচু পকেটটায় হাত চলে যায় রুদ্রর ।

– চলই না। …… রহস্যময় হাসি হেসে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায় তারা।

একটা প্রায় ফাঁকা শুনশান দোকানের সামনে এসে রুদ্রকে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় তারা। একটা মোটে বিরিয়ানির হাঁড়ি এক কোনে রাখা।
– এটাই ? এখানে বসে খাওয়া যায় ?
– নিশ্চই যায়, দাঁড়াও দেখি, দোকানে লোক কই … ও দাদা, বিরিয়ানি হবে ?
– হ্যাঁ হবে, ক প্লেট ? … দোকানের ভিতরের কুঠুরি থেকে একজন হাফপ্যান্ট পরা নিরিহ চেহারার মানুষ বেরিয়ে এল।
– কত করে দাদা ? … রুদ্র তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করে।
– সত্তর টাকা।

এবারে ব্যাগটা বার করতেই হয় রুদ্রকে, কয়েকটা দশ আর কুড়ির নোট মিলিয়ে ষাট টাকা বের হয় । হঠাত শ্রাবণের মেঘ নামে রুদ্রর মুখে …

– এই নাও দশ টাকা, আমার কাছে ছিল। …… তারা তার ব্যাগের গহীন কোন পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দেয় একটা নোট।

– তবে তুমি দুপুরে কিছু …… বলতে গিয়ে থেমে যায় রুদ্র, মনে পড়ে যায় সেক্টর ফাইভের মত জায়গায় কতটা অকিঞ্চিৎকর একটা জীর্ণ দশটাকার নোট। বড় জোর এক প্যাকেট বিস্কিট ছাড়া এই মূল্যবৃদ্ধির প্রবল নিদাঘে কি আর পাওয়া যায় ও টাকায় …

– থামো তো, কাকু এক প্লেটই দিন, এখানে খাব। … রুদ্রর হাত থেকে টাকা গুলো প্রায় কেড়ে নিয়েই একপ্রকার এগিয়ে দেয় তারা।
– হ্যাঁ গো, আর তো কিছু নেই, যাওয়ার পথে কিছু নেওয়ার ছিল না তো।
– কই না তো, মা তাহলে বলত ।

বলতে বলতে বিরিয়ানি চলে এল, কাগজের পাতায় সাদামাটা বিরিয়ানি, মাংসের পিসটা নেহাত ছোট নয়। ব্যাগ্র হয়ে দু গ্রাস মুখে তুলেই রুদ্রর মনে পড়ল সেই সেই দিনগুলোর কথা যখন সে আর তারা ফাইনাল ইয়ার, এরকমই সামান্য কটা টাকা জমিয়ে শিয়ালদা স্টেশনের পাশে ফুটপাথে … এরকমই একটা প্লেট একটু একটু গ্রাস তুলে দিত সে তারার মুখে। সেদিনের মতই এক গ্রাস তারার দিকে এগিয়ে দিতেই তারার দুচোখে হাজার প্রদীপের আলো … ঠিক সেই সেদিনের মতই।

– এই চিকেনটা খাও, এ আমি খেতে পারব না, জানই তো আমার দাঁতের অবস্থা …
– আবার বদমাইসি, আমি নরম গুলো ছাড়িয়ে দিচ্ছি, খাও বলছি। কিচ্ছু হবে না।

– দিদি আর রাইস লাগলে বলবেন, রাইস যত চাইবেন ফ্রী … দোকানের মানুষটির অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় হঠাত সব পাওয়ার আলো ওদের চোখে।

এই ভীষণ উত্তপ্ত সন্ধ্যেয় … একটু একটু করে বিরিয়াণির হাঁড়ির ঐ ভাপের মতই কিছু ক্ষণের জন্য মুছে যাচ্ছে গত কয়েক মাসের স্যালারি না হওয়া, চেনা সবার ভালো ভালো চাকরি হয়ে যাওয়া, একটা দাগ না কাটতে না পারা ছাপোষা যাপন, মুছে যাচ্ছে সব না পাওয়া গুলো, ব্যক্তিগত ব্যর্থতাগুলো, ছোট ছোট দুঃখ গুলো, অপূর্ণতা অপ্রাপ্তিগুলো … অন্ততঃ কিছুক্ষণের জন্য …

সব ভালোবাসার গল্পগুলো ছবির মত সতর্ক তুলিতে আঁকা হয় না, কিছু কিছু এমনই নেহাত প্রতিদিনের অবসরে হিজিবিজি কাটা কাগজের মত … কখন অলক্ষ্যে তাতে একটা রূপকথা আঁকা হয়ে যায় কেউ লক্ষ্যও করে না।

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ২

– এই দেখ দেখ, অনীশরা দীঘা গেছে, ফটো দিয়েছে, কি মিষ্টি লাগছে দুটোকে।

– আরে এই গরমে দীঘা ! পাগল … এই দেখ প্রিয়া রা কাশ্মীর গেছে, কি সুন্দর জায়গা, আপেল গাছ। সবুজ পাহাড় … যেতে হলে কাশ্মীর হ্যাঁ …

– দূর, কাশ্মীর গেলে ঠান্ডাতেই অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে, এখানেই বলে শীত কালে হেঁচে হেঁচে অস্থির … তার চেয়ে দীঘা অনেকগুণে ভাল। গরম তো কী, সকালে রোদেই তো সমুদ্রে চান করে মজা, আর সন্ধ্যেয় সমুদ্রের হাওয়া, হুহু … কত দেশ , বন্দর, উপকূল ছুঁয়ে … বসে বসে সে হাওয়ায় ডুবে থাক, মাঝে মাঝে একটা একটা দেওয়ালীর আলোর মত মাছ ভাজার দোকান … পমফ্রেট, গুড়জাউলি, কাঁকড়া …

– কি গো ? কোথায় হারিয়ে গেলে ?

“আচ্ছা আমরা কোথাও যাব না ?” – সযত্নে অবচেতনের গোপনীয়তায় লুকিয়ে রাখা গুঞ্জনটা বেয়াড়া হতেই মেয়েটা বিব্রত … ও গুঞ্জন যে ছেলেটার চোখে নামায় নীচে জমা হওয়া কালির চেয়েও বেশী অক্ষম অন্ধকার তা বুঝেই তো প্রাণপণে কল্পনাযাপন।

“যাব তো, এই তো আর কটা দিন” … বলে ওঠে ছেলেটা। ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি, জল টলটল । ও যে জানে, এমাসেও কটা টাকায় ধার শোধ করে পড়ে থাকবে না কিছুই।

“আচ্ছা, শোনো তা হবে কেমন করে ? ও মাসে আমি দুটো টিউশনি শুরু করছি না ? — তার চেয়ে বরং শীতটা পড়ুক, তখন যাওয়া যাবে। আজ বিকেলে বরং চল, আমরা ঘুরে আসি”

“কোথায় ?” — ছেলেটার চোখে একরাশ বিস্ময়

“চলই না, সেই বিয়ের আগে যেমন আমায় সাইকেলে নিয়ে তুমি চেনাতে গাছের নাম, আকাশে একটা একটা করে ফোটা তারা, সেই রকম, যাবে ?”

* * *

শহরতলীর কোলাহল পেরিয়ে সবুজ ঘেঁসে বসেছে ছেলেটা আর মেয়েটা, সামনে নীলচে কালো মাঠে সন্ধ্যে নেমেছে অল্প আগে। ওদের সামনে প্লাস্টিকের টুলে হাতে গড়া গরম রুটি আর চিকেনের গিলে মেটে কষা, তিরিশ টাকা।

শহরের প্রান্তের এই ঠেলাগাড়ির পাশে খদ্দেরের ভীড় কম । ঠেলাগাড়ির ছাতা থেকে ঝোলানো একটা হলুদ আলো, দেওয়ালীর একটা প্রদীপের মত।

মেয়েটা পরম যত্নে রুটির টুকরো তুলে দিচ্ছে ছেলেটার মুখে … আর এক টুকরো নিজে। ছেলেটা অনন্ত প্রশান্তিতে চেয়ে আছে ওর ঘাম চিকচিক মায়াবী মুখটার দিকে। এমন অপার্থীব সুন্দর পৃথিবীর মানুষ হয় ?

তোলা উনুনে গরম রুটি সেঁকে চলে দোকানী। সামনের মাঠ উথাল পাথাল, অবিরল হাওয়া ছুঁয়ে যায় ওদের … সে হাওয়ায় সমুদ্রের গন্ধ মাখা …

#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

রুদ্র তারা রূপকথারা – ১

– “বাবু দশটা টাকা দিবি ? খাব …”

পিছন ফিরে রুদ্র দেখল বৃদ্ধাকে, শাড়ীটা ময়লা হলেও এককালে বেশ যত্ন করে কেনা, আঁচলে ছোট ছোট গুটি, একেকটা গাছ। আঁচলে বাঁধা সম্বলেরা আজ ছড়িয়ে গেছে নাগাল ছাড়িয়ে অথবা আঁচলের আড়াল প্রয়োজনহীন।

পকেটের মানিব্যাগ খুলে দুটো একশো আর একটা পঞ্চাশের মাঝে আটকে থাকা দশটাকা টা কায়দা করে বের করল রুদ্র।

– “শোনো” … রুদ্রর পাঞ্জাবীর হাতায় টান দিল তারা, ফিসফিস করে প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলল, “দশ টাকায় কারুর খাওয়া হয় ?”
ক্ষণিকের বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে ঝটিতি পঞ্চাশের নতুন সবুজ নোটটা তুলে নিল রুদ্র, একবার তাকিয়ে দেখল, তার পর দিয়ে দিল বৃদ্ধার হাতে।

– “বেঁচে থাক বাপ, বেঁচে থাক মা”

মাত্র কয়েকটা বছর আগে, তখন মাস্ক পরত শুধুই পল্যুউশন সচেতন কয়েকজন। প্রত্যেক বারের মতই পূজোর আগে বোনাসের টাকা আর জমানো কিছু টাকায় ওঁদের জন্য আর ওঁদের ফুটপাথতুতো নাতি নাতনীদের জন্য কিনতো শাড়ি, জামা ফ্রক, রঙিন, কিন্তু ওঁচা নয়। সেই দোকান থেকে সেবার তারার জন্যও শাড়ি কিনেছিল রুদ্র, তাঁতের, মায়া মায়া আকাশী রঙের … তখনও ওদের বিয়ে হয় নি।

তারার জন্য একটা শাড়ি অবশ্য এবছরেও কিনেছে রুদ্র। তিনশো পঁচিশ টাকা দিয়ে। লাল, লতাপাতার নকশা, মাঝে একজায়গায় শুধু কোম্পানির নামটা ছাপানো।
আজ ওরা দুজনে বেরিয়েছে ওদের মফঃস্বলের কয়েকটা প্যান্ডেল ঘুরে দেখতে, পূজোর ঘোরা বলতে এইটুকুই।
তারা সেই শাড়িটা পরেই আর রুদ্র আগের বছর খান্না থেকে কেনা একটা পাঞ্জাবি, এখনও বেশ চকচকে। অষ্টমি থেকে নাকি বৃষ্টি হবে, তাই আগেভাগেই যেটুকু।

পূজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে কিছু না খেলে কি হয় ? এগরোল বড্ড প্রিয় ছিল তারার। তাই রুদ্র এগরোল খাওয়ার কথা বলতেই চকিতে তারা দু চোখে হাজার হীরের ঝলক হেসে উঠল।

– “কত দাদা এগরোল ?”

– “পঞ্চাশ, ডাবল ডিম ষাট”

– “সেকী ! কুড়ি টাকা ছিল যে ?”

– “সে বিটিস আমলে ছিল, কদ্দিন এগরোল খান নি দাদা ?”

সত্যিই বাইরের খাবার খাওয়া হয় না তা প্রায় বছর খানেক হয়ে গেল। রুদ্রর মনে পড়ে যায়, যখন সেক্টর ফাইভের চাকরীটা ছিল, মাঝে মাঝেই বাড়ী ফেরার পথে কটা চপ, নয়তো মোমো নিয়ে আসত তারার জন্য। আর এখন …
– “এই শোনো না, তোমায় বলা হয় নি, আজ সকাল থেকেই আমার পেটটা কেমন গুলোচ্ছে, এর মধ্যে এই বাইরের জিনিস খাওয়া ঠিক হবে ? তার চেয়ে চল, ঐ মহামায়া থেকে দুটো রসগোল্লা নিয়ে যাই, রাত্রে রুটি দিয়ে খাওয়া যাবে।”
কয়েক মুহুর্তের জন্য পৃথিবীটা একই সঙ্গে ভীষণ খারাপ কিন্তু মায়াময় গ্রহ মনে হতে লাগল রুদ্রের। তারা রুদ্রের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে চলল … বাড়ি ফিরতে হবে, অনেকটা হেঁটে। এখন তো আর গাড়িটা নেই, একদিকে ভালই হয়েছে বিক্রি করে দিয়ে। তেলের যা দাম আজকাল …

জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে তারার আটপৌরে মুখটায়, অনেক হেঁটেছে বেচারী, গভীর ঘুমে তলিয়ে রয়েছে। এই নিষ্পাপ মুখটার দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতে পারে রুদ্র। আজ যদিও তার চোখে ঘুম নেই … আচ্ছা সিনেমায় সিরিয়ালে তো অভিনেত্রী অভিনেতারা কেমন সুন্দর ইচ্ছে হলেই কাঁদতে পারে। সে যদি ওরকম কোন চরিত্রে সিলেক্ট হত ? প্রথমেই বাতিল হয়ে যেত নিশ্চই, হঠাতই হাসি পেয়ে যায় রুদ্রর। আর তার সঙ্গেই একটা পথ দেখতে পেয়ে আপন মনেই হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে পড়ে রুদ্র, প্রশান্তির ঘুম।

ভোরে পাখি ডাকতেই উঠে পড়ে রুদ্র, তারার আগেই। ফ্রীজের অনন্তকালের সঞ্চয়ভান্ডারের গহীনতম প্রদেশ হাতড়ে বের করল একটা আমুল চীজের বক্সে পড়ে থাকা দুটো কিউব। এটা বছর দুয়েক আগের বোধ হয়, তখন মাসে একবার বাড়িতেই পিতজা, বিরিয়ানি এসব হত, সাধারণতঃ শনিবার বা রবিবার করে।
চীজের এক্সপায়ারী ডেট অস্পষ্ট তাই পরীক্ষা করে দেখে চিজগুলো কুচিকুচি করল রুদ্র, তারপর একটা ডীম বাটিতে গুলে তাতে এক চামচে মত ময়দা দিয়ে গোলা বানিয়ে নিল। সসপ্যানে সেই গোলাটা দিয়ে তার ওপর চীজ, একটু পেঁয়াজকুচি, লংকাকুচি আর সস দিয়ে, গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে কায়দা করে ভাঁজ করে নিল। ব্যাস এইবার তারাকে ঘুম থেকে তোলা যাক। ডেকচিতে চা বসিয়ে তারা কে ডাকতে গেল রুদ্র, চা বিস্কুট খেয়েই তাকে বেরোতে হবে, দমদমে একটা জেরক্সের দোকানে টাইপিং এর কাজ নিয়েছে রুদ্র, বাংলা ইংরাজী হিন্দি, মাসে ছ হাজার টাকা।

তারার “তুমি একটু খাও” এর উত্তরে রুদ্র যখন বলে উঠল, “না তুমি খাও, আমি তোমায় একটু দেখি” তখন তারার মুখে ঠিক সেই সেদিনের মত পানপাতা সরানো সলজ্জ হাসি …… আর পাড়ার মন্ডপে ভোরে মাইক টেস্টিং এর জন্যই বোধয় হয় বেজে চলেছে, “দেখতে যাব, মা কে আমার সাজের কি দরকার …”

————————-
সব চরিত্র কাল্পনিক ?
#রুদ্র_তারা_রূপকথারা

মৃত্যুকীট

“সে আসে নিঃশব্দে, কুরে কুরে খায় দেহ, ভয়লতম মহামারীর চেয়েও দ্রুত, পৃথিবীর আদিম অধিপতিদের প্রতিনিধি সে … তীব্র অজেয় বিষধর, অমর … সে আসছে তার প্রাচীন অধিকার কায়েম করতে …”


********

ঘটনা ১, সাল ২০১৫, স্থান – লন্ডণের সাউথকেনিংস্টন,

বাইরে ঠান্ডা হাওয়ার ঝলক বন্ধ করার জন্য দরজাটা টেনে দিলেন ডাক্তার জোহানা রোডস। রাত বেশী হয় নি। বড়দিনের ছুটির এই সময়টা তাঁর একান্ত ভাবেই পড়াশোনায় ডুবে নিজের মত সময় কাটানোর একটা সুযোগ বলেই বরাবর বিবেচনা করে এসেছেন তিনি। এবারেও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। রাতের খাবার আগেই সারা হয়ে গেছে। এবার ট্যাবে নতুন কয়েকটা রিসার্চ পেপার পড়বেন বলে মিনিমাইজ করে রেখেছেন। ট্যাব টা হাতে নিতেই দেখলেন দুখানা ইম্পর্ট্যান্ট মার্কড ইমেল। জন ! খুব জরুরী দরকার না থাকলে তো সে এই সময় পারতপক্ষে তার শান্তি বিঘিত করবে না। না জন তো নয় ! তবে ? ইমেলটা খুলে পড়তে থাকলেন তিনি –“ প্রিয়, ডাক্তার রোডস,রয়্যাল ব্রম্পস এ অভূতপূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, আমাদের আই সি ইউ ও এইচডি ইউ পেসেন্টরা হঠাত করেই এক ভয়ঙ্কর সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন ও অধিকাংশই মারা যাচ্ছেন । মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশী, প্রায় ৭০% । বহু চেষ্টা করেও আমরা এই সংক্রমণএর মোকাবিলা করতে পারছি না। আমাদের জানা সমস্ত ওষুধ প্রয়োগ করেও এর সামান্যতম ক্ষতিও আমরা করে উঠতে পারছি না। অতি দ্রুত এই সংক্রমণ এক রোগীর দেহ থেকে অন্য রোগীর দেহে ছড়িয়ে পড়ছে, আর তার জন্য স্যালাইনের নল থেকে, ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, অক্সিজেনের নল যেকোন কিছুকেই ব্যবহার করে নিচ্ছে মাধ্যম হিসাবে। এই ভয়াণক পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছে ……”
বার্তার আকস্মিকতায় বেশ কিছুক্ষণের জন্য অভিভূত হয়ে রইলেন জোহানা, বাইরে তখন হিমেল হাওয়ার গর্জন বেড়ে চলেছে। রয়্যাল ব্রাম্পটন হস্পিটাল , হৃদযন্ত্রের অসুখের ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম সেরা চিকিৎসাকেন্দ্র। সবসময়েই লোকে গমগম করে চারতলা হসপিটালের প্রতিটি তলা। জোহানা এই হসপিটালে আগেও এসেছেন। অনেকটা অষ্টাদশ শতাব্দীর কাউন্ট দের প্রাসাদের মত এর গড়ন চিরকালই তাঁর অদ্ভুত লাগে, হসপিটালটা যেন অন্যান্য সব হসপিটালের থেকে আলাদা। দেখতেও যেমন অভিনব, তেমনই সেরা এদের কেবিন ও ওয়ার্ডগুলি, আর নার্সদের ব্যবহার।“ডক্টর রোডস ? নমস্কার, আমি অ্যালিনা, সিডিসি আর ডি ৩১ মেম্বার। আশা করি, আপনি সবই জানেন তবু আমার দায়িত্ব পুরোটা আরেকবার আপনাকে ব্রিফ করা, আসুন, পিপিই টা ড্রেসিং রুমে রাখা রয়েছে, ওখানে যেতে যেতেই আপনাকে ব্রিফ করি” জোহানা এগিয়ে চললেন অ্যালিনার সাথে, তাঁদের এখানে গন্তব্য আইসিউ, কোয়ারেন্টাইনড এলাকা এবং তার পর ল্যাবরেটরি। যে ল্যাবরেটরির একটা কালচার ডিস মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখতে দেখতে বছর পাঁচেক পর তিনি লিখবেন সেই ভয়ঙ্কর উক্তি … “আপনারা করোনাকে ভয়াণক ভাবছেন, আপনারা এখনও এই মাইক্রোস্কোপের নীচের এই বিভীষিকাটির সাথে পরিচিত হননি বলে”।


*****ঘটনা ২, সাল ২০১৫, ডিসেম্বর মাস, স্থান – হাওড়া, ধূলাগড়, ভারত

কদিন আগেই আগেই এই কোম্পানিটায় জয়েন করেছে রুদ্র। ওর জীবনে প্রথম হার্ডকোর ইন্ডাস্ট্রিয়াল চাকরি এটাই। এর আগে বিভিন্ন সার্ভিস প্রোভাইডিং , হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের টেকনিক্যাল পোস্টে কাজ করলেও ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে চাহিদাটা ছিলই কোর সেক্টরে কাজ করার। এই অদ্ভুত ধূলো ধোঁয়া গ্যালাভানাইজারের জিঙ্কের ঝাঁঝালো বাষ্প, অ্যাসিড পিটের সোঁদা গন্ধ নেহাত খারাপ লাগে না ওর। শুধু সমস্যা হয় ক্যান্টিনে খাওয়ার সময়। মারোয়াড়ী কোম্পানির ক্যান্টিনের সেই চিরকালীন একঘেয়ে নিরামিষ খাবার। তাই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়েই বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খায় ও আর ওর সাবর্ডিনেট টেকনিশিয়ানের দল। সেদিন ও বাইরে থেকে আনিয়ে নেওয়া ঝুরি-ভাজা খাচ্ছিল ওরা সবাই। বলাই বাহুল্য রুদ্রই স্পন্সর। খেতেও যেমন ভালবাসে, খাওয়াতেও তাই। হঠাতই চিবোনোর সময় একটা টুকরো বেকায়াদায় মুখের ভিতরে উপরের অংশে, তালুতে আঘাত করল আর সঙ্গে সঙ্গে অপ্রত্যাশিত তীব্র যন্ত্রণায় দিগ্বিদিক অন্ধকার হইয়ে উঠল রুদ্রর সামনে।একটা সাধারণ খাবার খেতে গিয়ে এতটা ব্যাথা কিভাবে হতে পারে ভেবে অবাক হচ্ছিল রুদ্র, তাই মোবাইলের ক্যামেরার মাধ্যমে মুখের ভিতরের একটা ছবি তুলল সে । তালুতে অদ্ভুত গভীর এক ক্ষত, যা কোন ভাবেই খাবারের ছোট্ট একটা কণার আঘাতে হওয়া সম্ভব নয়। হাত ধুয়ে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে দেখতে গিয়ে রুদ্র বুঝতে পারল তার তালুর প্রায় সম্পূর্ণটাই অবশ হয়ে রয়েছে, ব্যাথায় নয় … এ যেন ঠিক লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া ইঞ্জেকশনের প্রভাবে হওয়া অবশতা … তবে ??

ঘটনা ৩, সাল ২০১৬, স্থান – কলকাতার পার্কস্ট্রীট


স্মিয়ার টেস্টের রিপোর্ট হাতে নিয়ে বসে আছেন ডক্টর শুভম আগরওয়াল, ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ ম্যাক্সিবুলার অংকোলজিস্ট ডক্টর সৈদুল ইসলামের প্রিয় ছাত্র। কিন্তু সব হিসাব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তাঁর পেসেন্ট এই ছেলেটির রোগের গতিপ্রকৃতি খুবই অদ্ভুত। প্রথম দিন ওর মুখের ভিতরের আক্রান্ত জায়গাটা দেখে তিনি বুঝেছিলেন এটা ক্যান্ডীডীয়াসিস। কিন্তু হিসেব টা মিলছে না …
ক্যান্ডীডীয়াসিস একটি ছত্রাক ঘটিত অবস্থা। ক্যান্ডিডা পাঁউরুটি তৈরিতে যে ইস্ট ব্যবহার হয় তার খুব কাছাকাছি গোত্রের একটি ছত্রাক বা পরজীবি (ব্যাক্টেরিয়া), মানুষের দেহে বিভিন্ন জায়গায় যেমন ত্বক, পাকস্থলী, মুখ ইত্যাদি জায়গায় অল্প পরিমাণে বর্তমান থাকে আজীবন। এরা বাতাসে ভেসে বেড়ায় স্পোর হিসাবে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পেলে বা বলা ভাল অনুকুল পরিবেশ পেলে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে। এরা দেহের বিভিন্ন নিসৃত পদার্থর মধ্যে থাকা শর্করা বা পুষ্টিদ্রব্যের উপর নির্ভর করে বাঁচে। কিন্তু কোন কারণে শরীরের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অর্থাৎ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে এরা গোটা শরীরটাকেই খাদ্য বানিয়ে ফেলতে সচেষ্ট হয়। এই ধরণের ক্যান্ডিডার আক্রমণেই আমাদের অতি পরিচিত ত্বকের বিভিন্ন চর্মরোগ, নখের পচন ইত্যাদি হয়। আর একবার যদি এটি কোনভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশের উপায় খুঁজে পায়, তাহলে তার মাধ্যমে এটি সারা দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে আর সেগুলিকে ভিতর থেকে বিকল করতে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন শরীর কোন একটা ভাবে দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার অবস্থায় বা ইমিউনো-কম্প্রোমাইজড হয়ে পড়বে। এটা অনেক ভাবে হতে পারে । কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করার জন্য হতে পারে, আর্সেণিক বা পারদের মত বিষাক্ত ধাতু অনেকদিন একটু একটু করে শরীরে বিষক্রিয়া করলে হতে পারে, অপুষ্টি – ভিটামিন বা খনীজ পদার্থের অভাব ঘটলে হতে পারে, কেমো বা রেডিয়েশন চললে হতে পারে, বড় কোন অপারেশনের জন্য হতে পারে, অত্যাধিক রক্তপাত হলে হতে পারে, ধূমপান – মদ্যপান করলে হতে পারে, জন্মগত রক্তাল্পতা থাকলেও হতে পারে, এরকম আরও বিভিন্ন কারণে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে চর্মরোগ ছাড়াও ক্যান্ডীডার অন্যতম প্রিয় আক্রমণস্থল হল মুখের ভিতরের মিউকাশ মেমব্রেন – গাল, জিভ, দাঁতের মাড়ি এছাড়াও যোনীমুখ ইত্যাদি, এই সব জায়গায় ক্যান্ডীডা সাদা পণীরের মত আস্তরণ তৈরী করে ও সেখানের মিউকাশ লেয়ার গুলিতে ছত্রাকের দেহে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে দিয়ে অবশতা তৈরি করে । এর সঙ্গে বেশ কিছু অন্যান্য উপসর্গ জুড়ে যায় যদি ক্যাণ্ডীডা দেহের ভিতরে, অর্থাৎ পাকস্থলি বা অন্ত্রে পৌঁছে যায়। ডায়েরিয়া, যেকোন সময় খাওয়ার পরেই তীব্র নিম্নচাপ, প্রস্রাবে অ্যালকোহলিক গন্ধ, দুর্বলতা এসবও ক্যাণ্ডীডার লক্ষণ। এছাড়া ক্যান্ডীডা সুপার ইনভেসিভ স্টেটে যদি ব্লাডস্ট্রীমে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তীব্র জ্বর ও পরবর্তীতে আস্তে আস্তে মাল্টি অরগ্যান ফেলিওরের দিকে এগোতে থাকে আক্রান্ত ব্যক্তি। এছাড়াও বেশ কিছু আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই ক্যান্ডীডা খুব তাড়াতাড়ি মানুষ্কের মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে ব্রেন ডেথ ঘটাতে পারে খুব অল্প সময়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডিডা আক্রান্ত জায়গায় পরবর্তীতে ম্যালিগ্ন্যানান্সি বা ওরাল ক্যান্সার দেখা দিয়েছে , গবেষণাগারে দেখা গেছে ক্যান্ডীডীয়াসিস ওরাল ক্যান্সারের চান্স অনেকগুণে বাড়িয়ে দেয়।
তবে ক্যান্ডীডীয়াসিস দুরারোগ্য নয়, সাধারণতঃ অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ (ফ্লুকোনোজল ইত্যাদি) প্রয়োগ করলে, ইমিউনিটির উন্নতি ঘটালেই একে কাবু করে ফেলা যায়। নির্মূল ও করা যায়। কিন্তু হিসেবটা সত্যিই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে এই পেসেন্টটির ক্ষেত্রে …
এই ছেলেটির ক্যান্ডীডীয়াসিস তা কনফার্ম করা হয়েছে আগেই (কারণ ক্যান্ডীডীয়াসিস এর মত আরও অনেক অসুখ যেমন লাইক্যান প্লানুস ইত্যাদি মুখের ভিতরে সাদা দাগ – লিউকো প্ল্যাকিয়া তৈরি করতে পারে) । যথারীতি ওষুধও চলছে কড়া ডোজের । খাবার খাওয়ার সময় ন্যাচারাল স্ক্র্যাপিং হয়ে ক্যান্ডীডার ওপরের পণীরের মত সাদা স্তরের আস্তরণ টা উঠে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু ঐ জায়গায় (ছত্রাকের বেশ কিছুটা অংশ মিউকশাল লেয়ারের ভিতরে ইনভেড করায় আস্তরণ টা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সেই জ্যগাটা রক্তাভ লাল হয়ে থাকে ও তীব্র জ্বালার অনুভূতি থাকে) সাধারণ গোলাপী রঙ ফিরে আসার পরে পরেই দেখা যাচ্ছে যে আবার উপরের সাদা লেয়ারটা তৈরি হতে শুরু করেছে অর্থাৎ ক্যান্ডীডা নির্মূল হয় নি। ডিসেম্বর থেকে গত ৫ মাসে প্রায় বার দশেক এই ভাবেই ক্যান্ডীডা কক্ষনোই পুরোপুরি চলে যায় নি। এদিকে ওষুধ কখনও বন্ধ হয়নি। ক্যান্ডীডীয়াসিস ক্রণিক বা রিপিটেড হওয়ার নিদর্শন থাকলেও সেই সব ক্ষেত্রে একবার সম্পূর্ণ নির্মূল হওয়ার অনেক দিন পরে আবার ইমিউনিটি কম হয়ে গেলে ক্যান্ডীডীয়াসিস ফিরে আসে কিন্তু এরকম একদমই নিরাময় না হওয়ার ঘটনা ডাক্তার আগরওয়াল আগে কখনও দেখেননি বা কোথাও পড়েনওনি। ছেলেটির রক্তে লৌহের মাত্রা কম থাকার কথা আগেই পরীক্ষায় জানা গিয়েছিল বটে কিন্তু সঠিক সাপ্লিমেন্ট, ডায়েট পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে তা তো এখন নিয়ন্ত্রণে। তবে ? রোগিকে ডাক্তার আগরওয়াল পাঠালেন তাঁর অগ্রজপ্রতীম ডাক্তার অজয় মুখার্জ্জীর কাছে।উপায় একটা ডাক্তার মুখার্জ্জী খুঁজে বার করলেন ঠিকই, তবে সেটা আগে কখনও কেউ করেননি ক্যান্ডীডীয়াসিস নির্মূল করতে, এবং তাতে কাজ হল (চিকিৎসামন্ত্রকের বিশেষ বিধি-নিষেধ থাকায় বিস্তারিত পদ্ধতিটি এখানে লেখা সম্ভব হল না) । পরবর্তীতে যখন দুই ডাক্তার একত্রে বসে তাঁদের কাছে আসা গত কয়েক বছরের রোগীদের কেস ফাইলগুলি পর্যালোচনা করে দেখছিলেন তখন তাঁরা লক্ষ্য করলেন বেশ কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্ডীডা গোত্রের ছত্রাকের আক্রমণে (সাধারণতঃ ক্যান্ডীডা অ্যালবিকেন্স) সাধারণ অ্যাজোল গ্রুপের ওষুধ সহজে কাজ করছে না। অর্থাৎ ??? অর্থাৎ ক্যান্ডীডা আস্তে আস্তে তার উপর প্রয়োগ করার জন্য তৈরি ছত্রাকনাশক গুলিকে সহ্য করে বেঁচে থাকতে শিখে যাচ্ছে।

ঘটনা ৪, সাল ২০০৯, স্থান – নিউ দিল্লী

ডাক্তার অনুরাধা চৌধুরী তাঁর ল্যাবরেটোরিতে বজ্রাহতের মত বসে আছেন। নিওনেটাল ইউনিট থেকে আসা এই টেস্ট স্যাম্পেলগুলি কিসের ??? এমন কোন ছত্রাক তো তিনি আগে দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না তাঁর। এই ক্যান্ডীডা সদৃশ জীবানুটি একের পর এক শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে চলেছে আর তার চেয়েও বড় কথা প্রচলিত কোন ছত্রাকনাশক ওষুধই কার্য্যকারী হচ্ছে না এর প্রতিরোধে, অ্যাজোল, অ্যাম্ফোটেরিশিন, ফাঙ্গীন সব গ্রুপের ওষুধেই এরা শুধু যে বেঁচে থাকছে তাই না, বৃদ্ধিও হচ্ছে স্বাভাবিক ভাবেই। তবে কি এ নতুন কোন প্রজাতি আবিষ্কার করে ফেললেন তিনি ? হঠাত মনে পড়ে গেল জাপানের মেডিক্যাল জার্ণালে প্রকাশিত বছর দুয়েক আগের একটি ঘটনা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির কান থেকে প্রাপ্ত এই ছত্রাকের উল্লেখ ছিল, আর কানের ল্যাটিন নাম অরিস অনুযায়ী যার নামকরণ করা হয় ক্যান্ডিডা অরিস।
তড়িঘড়ি ডাক্তার চৌধুরী নির্দেশ দেন, সিল করে ফেলতে হবে আক্রান্ত সমস্ত ইউনিট গুলি, মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কারণ তিনিযে দেখেছেন কি ভয়ঙ্কর দ্রূত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে এই ছত্রাক, লেগে থাকে টেবিল, পোশাক, দরজার হাতল সর্বত্র … দৃঢ় ভাবে, সাবান, স্পিরিট কোন কিছু দিয়েই সহজে দূর করা যায় না একে, অতয়েব … আটকে দিতে হবে উৎসেই ……
ডাক্তার অনুরাধার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতকে এক ভয়ানক মহামারির হাত থেকে সেদিন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল, শুধু সেদিনই নয়, আবার কর্মীদের গাফিলতিতে ২০১৩ সালে যখন ছড়িয়ে পড়ছিল ক্যান্ডিডা অরিস বা সি অরিস দ্রুত গতিতে, তখনও মাঠে নেমেছিলেন ডাক্তার চৌধুরী … ত্রাতা হয়ে … যে খবর দেখানো হয়নি কোন সংবাদ মাধ্যমে …

ঘটনা ৫, সাল ২০২১, স্থান – পৃথিবী

ছত্রাক, পৃথিবীর অন্যতম আদিম অধিবাসী। প্রাণীর সঙ্গে যার অনেক মিল বৈশিষ্ট ও ব্যবহারে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই সত্যি, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক হল ছত্রাকের মাইসিলিয়ামের নেটওয়ার্ক যার জাল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মতই। তারা প্রবল, মৃত্যু তাদের পরিচারক, মৃত বস্তুই যে তাদের আহার। তারা অসীম শক্তিশালী, অনন্য সাধারণ তাদের ছড়িয়ে পড়ার, বংশ বিস্তারের ক্ষমতা।এ পৃথিবীর কিছুই তাদের অভক্ষ্য নয়।
এতদিনে চিকিৎসা জগতে ক্যান্ডীডা অরিস পরিচিত হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এর ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতা, সত্তর শতাংশের কাছাকাছি মৃত্যুহার ভয় ধরিয়েছে সবার মনেই। আমেরিকার সিডিসি এটিকে পৃথিবীর অন্যতম বিপদ চিহ্নিত করেছে ২০১৯ সালে এবং হসপিটাল গুলিতে নিরন্তর এই ইনফেকশন খুঁজে বের করে তাকে কোয়ারেন্টাইন করে নির্মূল করার রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। যেহেতু এই সংক্রমণ মূলতঃ হাসপাতালে অসুস্থ (কোমরবিডীটিযুক্ত, ইমিউনোকম্প্রোমাইজড) ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ছড়াতে শুরু করে তাই এই সুপারবাগটিকে যাতে হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়া যায় তার জন্য কঠীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা, জাপান, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ভারতের মত দেশ। এই ভয়াণক সংক্রমণ যদি লোকালয়ে … বিশেষত ভারতের মত অধিক জনঘনত্বের দেশে ছড়িয়ে পড়ে তবে তার ফল হবে মারাত্বক। কিন্তু নিয়তির নির্মম অঙ্গুলীহেলনে করোনা ভাইরাস মহামারীর আঘাতে সম্ভব হল না এই পরিকল্পনা সফল করা। বিশাল সংখ্যক জনসংখ্যাকে হাসপাতালমুখী হতে হল কোভিড সংক্রমণ নিয়ে আর তার সাথে সাথেই সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ক্যান্ডীডা অরিস নামের অদৃশ্য শত্রু, যা করোনার থেকেও নির্মম মারক (করোনার ডেথ রেট যেখানে এক শতাংশের মত সেখানে ক্যান্ডিডা অরিসের মৃত্যু হার প্রায় ৩০ – ৭০ শতাংশ)। মাত্র কিছুদিন আগে আন্দামানের মত নির্জন সৈকতেও উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে ক্যান্ডিডা অরিস বা সংক্ষেপে সি অরিস এর, যার অর্থ সমুদ্রপথে বাহিত হয়ে এই ভয়ানক মৃত্যুকীট পৌঁছে গেছে সবকটি মহাদেশেই, পৃথিবীর কোন প্রান্তই আজ আর সুরক্ষিত নয় !


কারণ কি ?

এই ছত্রাকের প্রজাতিগুলি বহুবছর ধরে মানুষের সাথে সহাবস্থান করছে, তাহলে আজ হঠাত এদের এই ভয়ানক হয়ে ওঠার প্রবণতা কেন ? বৈজ্ঞানিকরা বলছেন মূলতঃ দূষণ এবং মানুষের নির্বোধতা। গত কিছু দশকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে অনেকটা, আর তার সর্বোচ্চ প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর নিরক্ষীয় উষ্ণ অঞ্চলগুলিতে। আগে দেহের জীবাণু নিধনের অন্যতম অস্ত্র ছিল জ্বর। সংক্রমণ ঘটলে দেহের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করার নামই জ্বর। কিন্তু এখন বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে জীবাণুগুলি বেশী তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাই জ্বর তাদের কোন ক্ষতিসাধন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর সংগে আছে বিভিন্ন রাসায়নিক মাত্রাতিরিক্ত হারে জলে ও মাটিতে ছড়িয়া পড়ে এই জীবানুগুলিকে বিষাক্ত পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম করে তোলা, আর সর্বোপরি মানুষের নিজে ডাক্তারী করার স্বভাব। অধিকাংশ মানুষই যেকোন রোগ হলে বিন্দুমাত্র পড়াশোনা, পরীক্ষা না করে, ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজে অথবা ফার্মাসিস্টের মুখস্ত বিদ্যার উপর ভরসা করে বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে নেন। এবং যে ওষুধটি খাচ্ছেন তার নিয়ম অনুযায়ী পুরো কোর্সটা কমপ্লিট করেন না। ধরা যাক কারোর সর্দি জাতীয় অসুখ হয়েছে, তিনি ডাক্তার না দেখিয়ে সর্দির গতিপ্রকৃতি বিচার না করে দোকানে গিয়ে অ্যাজিথ্রোমাইসিন কিনে আনলেন। দুটি খাওয়ার পরেই তাঁর সর্দি মোটামুটি কমে গেল, আর তিনিও বেশী অ্যান্টিবায়োটিক খেলে কিডনি খারাপ হয়ে যাবে ইত্যাদি বিজ্ঞবাক্য স্মরণ করে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের বাকি তিনটি ওষুধ আর খেলেন না। এদিকে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মিনিমাম ডোজ হয়তো পাঁচটার। এর ফলে কি হল ? তিনি নিজের তো ক্ষতি করলেনই সাথে সাথে সমাজের ক্ষতি করলেন। দুটি ট্যাবলেট খাওয়ায় তাঁর শরীরে থাকা অধিকাংশ জীবানু হয়ত ধ্বংস হল, সেই কারণেই তাঁর অসুখের কিছুটা উপশম হল। কিন্তু কিছু জীবাণু যারা একটু বেশী সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন তারা সংখ্যায় কম হলেও কিন্তু টিকে গেল। এদের মারার জন্য দরকার ছিল ঐ বাকি তিনটি ট্যাবলেটও নিয়ম মত খেয়ে কোর্স কমপ্লিট করা। এই যে অ্যাজিথ্রোমাইসিন সহ্য করেও টিকে যাওয়া জীবানুগুলি ন্যাচারাল সিলেকশন অনুযায়ী যখন আবার বংশবিস্তার করে একটি নতুন কলোনী তৈরি করবে তাদের উপর কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিন আর তেমন করে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এই জীবানুগুলি হল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু, এখন এরা যদি এই প্রথম ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য কোন ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হয় তাহলে তিনি কিন্তু অ্যাজিথ্রোমাইসিনের পুরো কোর্স অনুযায়ী সব কটি ওষুধ খেলেও কিন্তু আর কাজ হবে না। এঁকে অন্য কোন গ্রুপের ওষুধ খেতে হবে। দ্বিতীয়ব্যক্তিও যদি আবার নতুন গ্রুপের ওষুধের কয়েকটি মাত্র খেয়ে আর কোর্সটা কমপ্লিট না করেন, তাহলে রয়ে যাওয়া জীবাণূগুলি অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সাথে সাথে এই নতুন অ্যান্টিবায়োটিকটিতেও রেজিস্ট্যান্ট হবে। এটা একটা সাধারণ উদাহরণ দিলাম মাত্র, কিন্তু বাস্তবিক এই রকম ভাবেই কিন্তু মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (অর্থাৎ যাদের উপর কোন পরিচিত ওষুধই কাজ করে না) জীবাণু তৈরি হয়। ক্যান্ডিডা প্রজাতির বিভিন্ন জীবাণুর যথা, অ্যারিস, অ্যালবিকন্স, হাইমুলনী ইত্যাদির মাল্টিড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট হয়ে ওঠার পিছনে এগুলিই সম্ভাব্য কারণ।


করণীয় ?

সর্বাগ্রে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা যেকোন উপায়ে বাড়িয়ে তোলা, ভাল সুষম খাবার খাওয়া, খাদ্যে লৌহের মাত্রা ঠিকঠাক বজায় রাখা, কাঁচা ফল ইত্যাদি খাওয়া, ভিটামিন যুক্ত খাবার খাওয়া । দেখা গেছে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাস্থবান মানুষকে খুব সহজে ক্যান্ডিডা আক্রমণ করতে পারে না। ডায়াবেটিস, রেনাল ফেলিওর, স্থূলত্ব ইত্যাদি ক্যান্ডীডার আক্রমণকে সহজতর করে দেয়। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, নিমপাতাযুক্ত জলে স্নান, পরিস্কার থাকা, খুব দরকার না হলে পারতপক্ষে হাসপাতাল এড়িয়ে চলা, এগুলি জরুরী। সাথে সাথেই যদি ব্যক্টেরিয়াল ইনফেকশনে কারুর জ্বর হয়, এবং জ্বর কমানোর ওষুধ দেওয়ার পরও তাপমাত্রা না নামে তবে তাকে দেরী না করে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনা দরকার। ক্যান্ডিডা অরিস, হাইমূলনী ইত্যাদির মৃত্যুহার খুব বেশী হলেও সময় মত চিকিৎসায় অনেকক্ষেত্রে নিরাময় সম্ভব, ডাক্তাররা বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অতি উচ্চ মাত্রায় “এচিনোক্যান্ডিন্স” নামক একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন। আরেকটি কথা ক্যান্ডীডা আক্রান্ত মানুষের দেহে মাসাধিক কাল, কিছু ক্ষেত্রে বছরও ক্যান্ডীডার অস্তিত্ব থেকে যায়, তাই সংক্রমণএর ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ দূরত্ব মেনে চলা ও সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা দরকার। গরম ফুটন্ত জল ক্যান্ডিডার বিনাশ করতে স্বক্ষম, তাই স্যানিটাইজেশনের জন্য যে যে জায়গায় সম্ভব ফুটন্ত জল ব্যবহার করা যেতে পারে। সর্বোপরি প্রতিটি মানুষ দায়িত্ব নিলে, সচেতন হলে, হয়ত আগামীর এই মহামারীকে রুখে দেওয়া সম্ভব।

বিঃদ্রঃ – এটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প ভেবে ভুল করবেন না।

আগাছা না বনৌষধি ? – ১

নমস্কার পাঠকবর্গ। আগের লেখাটিতেই আমি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলাম, পরিচিত হয়েও অপরিচিত উদ্ভিদগুলির ব্যবহার ও ভেষজ গুণগুলি নিয়ে লিখব। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা যে কি ভীষণ দুরুহ তা অনুভূত হল, যখন দেখলাম আগাছা, অর্থাৎ যে উদ্ভিদেরা নিতান্তই অবহেলায় যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকে, আধুনিক ভেষজবিজ্ঞানে তাদের নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত দুর্লভ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বন্দময়। অপর দিকে প্রাচীন ভারতীয় ও অন্যান্য সংস্কৃতিতে তাদের ভেষজ ব্যবহার থাকলেও (যদিও তাদের যথাযথ বিবরণ, নাম, ইত্যাদি তথ্য হয় অস্পষ্ট নয়তো অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের শনাক্তকরণ অসম্ভব জটিল) তা আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক চোখে পরীক্ষিত নয়। তাই একটি মাত্র উদ্ভিদের সম্বন্ধে লিখতেও পাহাড় প্রমাণ গবেষণা করতে হচ্ছে। আরও একটি অসুবিধার কারণ উদ্ভিদবিদ্যা সম্বন্ধে আমার প্রথাগত শিক্ষার অভাব (আমি পেশায় একজন অধ্যাপক, বিদ্যুৎ প্রকৌশল ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাদি বিষয়ক)। তবুও আমার মত নেহাতই একজন শখের ভেষজপ্রেমীর কাজ যদি ভবিষ্যতে কোন যোগ্যতর ভেষজবীদের এ বিষয়ে বিশদ গবেষণার আগ্রহ জন্মাতে স্বার্থক হয়, তবে আমার পরিশ্রম সফলজ্ঞান করব ।

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, ছোট থেকেই আরেকটি শখ (প্রাচীন বস্তু খুঁজে বার করার প্রচেষ্টা) এর বশে বেশ কিছু পুরোনো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান করে খুঁজে পেয়েছিলাম বেশ কিছু পুঁথি (যেগুলি বর্তমানে এশিয়াটিক স্যোশাইটির কাছে গচ্ছিত)। যার মধ্যে একটি অতি দুর্লভ ছবি যুক্ত পুঁথিও ছিল, ছবিগুলি কালি দিয়েই আঁকা, খুব স্পষ্ট নয়, দেখতে উদ্ভিদের মতই। এশিয়াটিক স্যোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটার আগেই আমি পুঁথি প্রাপ্তিস্থানের নিকটবর্তি হুগলির পুরশুড়া গ্রামে হারান কবিরাজ (হারান ভট্টাচার্য্য) নামে অশীতিপর এক আয়ুর্বেদাচার্য্যের সন্ধান পাই। তিনি পুঁথিটির ভাষ্য উদ্ধার করতে সমর্থ না হলেও তাঁর সঙ্গে আমার দাদু-নাতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং মূলত তাঁর কারণেই পরবর্তিতে আমার বিভিন্ন উদ্ভিদের ঔষধি গুণ সম্বন্ধে আগ্রহ জন্মায়। তিনি আজ নেই, তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই সিরিজটি নিবেদন করে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার সামান্য প্রচেষ্টা করলাম।

হারান দাদু আমায় বিভিন্ন গাছ চিনিয়েছিলেন, এতে আজীবন উদ্দানপ্রেমী আমার মাতামহেরও যথেষ্ঠ উৎসাহ ছিল। তবে সেসময় অপরিণত বুদ্ধির কারণে তাঁর চেনানো উদ্ভিদগুলির কোন নির্দিষ্ট নোট নেওয়া নেই। তাই উদ্ভিদগুলি ও তাদের কিছু কিছু লোকায়ত ব্যবহার মনে থাকলেও তাদের নাম গুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিস্মৃত হয়েছি। একারণেই বর্তমানে নতুন করে সেগুলি নিয়ে খোঁজখবর করার জন্য প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য বই (এ ক্ষেত্রে ফেসবুক গ্রুপ মলাটের অবদান নতমস্তকে স্মরণ করি), ইন্টারনেটের (ফেসবুক গ্রুপ বৃক্ষকথার কাছে অনন্ত কৃতজ্ঞ) সাহায্য নিয়েছি।

আজকে যে উদ্ভিদটির কথা বলব তার কোন নির্দিষ্ট বাংলা নাম নেই। অনেক জায়গায় এটিকে বনপালং বলে উল্লেখ করা হলেও আসল বনপালং (Rumex crispus) সম্পূর্ণ আলাদা একটি উদ্ভিদ। হারাণ দাদু এর নাম যতদূর মনে করতে পারি বলেছিলেন “দুধেরা” বা “দুদরোয়া” কিন্তু আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তির ওপর খুব একটা নির্ভর করতে পারছি না। তাই এর নাম রাখলাম “মূলা পাতা”, কারণ এর অপরিণত পাতাগুলি অনেকটাই মূলার পাতার মত দেখতে, এছাড়াও নেপালে অনেক অঞ্চলে এটি “মূলা-পাত্তে” (मुलापाते) বলে পরিচিত। তবে এক্ষেত্রে একটি আগ্রহদ্দীপক তথ্য দিয়ে রাখি, নেপালের অনেক অঞ্চলে এটি কিন্তু “দুধে” (दुधे) বা “বন-রায়া” (बन रायो) বলেও পরিচিত।

এই উদ্ভিদটির সম্বন্ধে বলা হারাণ দাদুর কথাগুলির মধ্যে যেটি মনে আছে তা হল, যে এটি পাকস্থলী ও যকৃত দৌর্বল্য, মধুমেহ ইত্যাদি কঠীন রোগের ক্ষেত্রে ফলদায়ক, এছাড়াও এটি অনিয়মিত ঋতুর ক্ষেত্রেও বিশেষ উপকারী। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের সহায়তায় এটির নিরাময় ক্ষমতার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে এর পরিচয় খোঁজার ক্ষেত্রে খুবই সমস্যায় পড়লাম, নাম না মনে থাকায়। উদ্ভিদটির প্রথম যা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল সূর্যমুখী সদৃশ দৃষ্টি নন্দন ফুল। তাই সেই ফুলের ছবি ফেসবুকের বৃক্ষকথা গ্রুপে পোস্ট করে সাহায্য চাইলাম। সেখানে সমাপ্তি ভট্টাচার্য্য ঠাকুর লিখলেন যে এটি ব্লুমিয়া গোত্রের উদ্ভিদ। ব্লুমিয়ার সঙ্গে আমার আদৌ পরিচয় না থাকায় ইন্টারনেট সহায়ে বেশ কিছু পড়া-শোনা করে মূলা-পাতার ফুলের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে এমন একটি ব্লুমিয়া গোত্রের ফুল খুঁজে পাওয়া গেল। এই ব্লুমিয়াটি (Blumea Lanceolaria) মিজোরাম অঞ্চলে জন্মায় ও আঞ্চলিক ভাষায় “তেরাপাইব্বি” নামে পরিচিত। কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্ভিদের ছবি দেখে বুঝলাম এটি আমার পরিচিত উদ্ভিদটি নয়। তবে উদ্ভিদের বিবরণে আরেকটি লাইনে আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়, তা হল এই তেরাপাইব্বি কে “মিজোরামের ড্যান্ডেলিয়ান” বলা হয়।

ড্যান্ডেলিয়ন বহু ভেষজগুণসম্পন্ন একটি উদ্ভিদ, তবে তার ফুলের সঙ্গে পরিচিত হলেও পুঙ্খানুপুঙ্খ গঠন আগে কখনও বিচার করে দেখিনি। ইন্টারনেটের সহায়তায় খুঁটিয়ে দেখে এর একটি প্রজাতির (Taraxacum officinale) সঙ্গে আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদের ফুলের সম্পূর্ণ মিল খুঁজে পেলাম। কিন্তু আবার নিরাশ হতে হল এর সম্পূর্ণ উদ্ভিদের গঠন দেখে, যা বেশ কিছু সাযুজ্য থাকলেও কখনই আমাদের আলোচিত উদ্ভিদটি নয়।

এর পর অনুসন্ধান করতে গিয়ে অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম কারণ এই রকম পুষ্প সম্বলিত একাধিক উদ্ভিদ আছে, যাদের নিজেদের গঠনের মধ্যে নানা সাযুজ্য থাকলেও তারা আলাদা গোত্রের, এবং কোন ভাবেই আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদটি নয়। এদের মধ্যে হকউইড (Crepis pulchra) ও বিড়ালকর্ণীর (Hypochaeris radicata) কথা উল্লেখযোগ্য। অবশেষে অনেক অনুসন্ধানের পর আমাদের আলোচ্য উদ্ভিদটি, যার নাম দেওয়া হল মূলা-পাতা সেটিকে Sonchus wightianus হিসাবে শনাক্ত করা গেল। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত কিন্তু দারুণ তথ্যও এই সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এই ধরণের ফুল যুক্ত যে যে উদ্ভিদগুলি দেখলাম তারা আলাদা আলাদা গোত্রের হলেও দু একটি বাদ দিয়ে প্রায় সবকটিই ভেষজ গুণাবলি যুক্ত হওয়া ছাড়াও খাদ্যযোগ্য এবং পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তাদের ভোজ্য শাক হিসাবে প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহারের প্রমাণ আছে।

বিশেষ অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম, মূলা-পাতা ও ড্যান্ডেলিয়ান খুবই কাছাকাছি আত্মীয়। দুটিই একই পরিবারভুক্ত বলা চলে (Cichorieae)। তাই দুটির মধ্যে ফুল, পাতার গঠন, বীজ ছড়ানোর পদ্ধতি, বাসস্থান, আগ্রাসী প্রকৃতি ও ভেষজ গুণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসংখ্য সাযুজ্য দেখা যায়। যদিও এখনও মূলা-পাতা নিয়ে সেভাবে গবেষণা হয়নি তবে যদি সত্যিই ড্যান্ডেলিয়নের মত ভেষজ গুণ মূলা-পাতায় থেকে থাকে, তবে তা হবে আমাদের উপমহাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ড্যান্ডেলিয়ানের স্পষ্ট উল্লেখ আছে সিংহদন্তী নামে (এর পাতার আকার সিংহের দাঁতের মত খাঁজ কাটা বলে)। অসংখ্য প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সিংহদন্তীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন – চক্রদত্ত, সুশ্রুত, চরকসংহিতা, হরিৎসংহিতা, বাস্তুগুণদীপিকা, বাস্তুগুণপ্রকাশিকা ইত্যাদি। তাই মূলা-পাতার ভেষজ গুণ সম্বন্ধে আলোচনার আগে দেখে নেওয়া যাক ড্যান্ডেলিয়নের বিভিন্ন ব্যবহার ও ভেষজ গুণ।

ড্যান্ডেলিয়ান ফুলের সঙ্গে সূর্যমুখী ফুলের খুব মিল থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে অন্য একটি পরিচিত ফসলের সঙ্গে কিন্তু এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তা হল লেটুস, যে কারণে ড্যান্ডেলিয়ান গোত্রিয় বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ বন্য লেটুস, তেঁতো লেটুস ইত্যাদি নামেও পরিচিত। প্রায় ১৫০০০ বছর আগেকার কয়েকটি ফসিলে ড্যান্ডেলিয়ানের অস্তিত্বের নমুনা পাওয়া গেছে, অতয়েব বলা ই যায় এটি যথেষ্ট পুরানো একটি উদ্ভিদ। প্রাচীন কাল থেকেই এর ব্যবহার মানুষ ও গবাদি পশুর খাদ্য হিসাবে হয়ে আসছে। তবে এর স্বাদ যথেষ্ট তিক্ত। প্রাচীন কালেও এর তিক্ত স্বাদ বদলাবার উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ বহু বছর ধরে নির্বাচিত রোপন (সিলেক্টিভ ব্রীডিং) পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত কম তিক্ত প্রজাতিগুলির সন্ধান ও রোপনের মাধ্যমে আজকের লেটুসের সৃষ্টি হয়েছে।

ড্যান্ডেলিয়ান সাধারণতঃ কবোষ্ণ (নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল, যেখানে শীত ও গ্রীষ্ম ছাড়াও শরত ইত্যাদি ঋতু গুলির আবহাওয়া পরিবর্তন স্পষ্ট) অঞ্চলে জন্মায়। কোন কোন অঞ্চলের আবহাওয়া ড্যান্ডেলিয়ান জন্মানোর উপযোগী, তার সমীক্ষা করে প্রকাশিত ভৌগলিক মানচিত্রে ভারতের উত্তরপূর্বের অনেকাংশ এবং বাংলাদেশের বেশ কিছুটা অঞ্চলও কিন্তু ড্যান্ডেলিয়ান জন্মানোর উপযুক্ত পরিবেশ বলে দর্শিত হয়েছে।

ড্যান্ডেলিয়ান সাধারণতঃ নদীর ধার, জলা জমির পাড়, রাস্তার পাশে, ফাঁকা জমিতে সর্বত্র জন্মাতে পারে এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে, অ্যাসিডিক মৃত্তিকাতে, কম জলের যোগানেও টিকে থাকতে পারে। এই সব কারণেই আমেরিকা ও ইউরোপের যে অঞ্চলগুলিতে এটি জন্মায়, সেখানকার কৃষকরা এটিকে আগাছা বলেই মনে করেন।

মজার ব্যাপার হল ড্যান্ডেলিয়ান প্রধানত ইউরোপ ও এশিয়ার উদ্ভিদ হলেও আমেরিকাতে প্রথম ড্যান্ডেলিয়ান নিয়ে যাওয়া হয় খাদ্য শষ্য হিসাবেই। আগেই বলেছি এটি প্রাচীন কাল থেকেই শাক হিসাবে খাওয়ার চল ছিল বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। ড্যান্ডেলিয়ান গাছের সবুজ অংশ পুষ্টিগুণে ভরপুর। একটু তালিকাটা দেখে নেওয়া যাক –

প্রতি ১০০ গ্রামে পুষ্টিগুণ – ৩.৫ আউন্স, এনার্জী ২৫ কিলোক্যালরি , কার্বোহাইড্রেট ৯.২ গ্রাম , শর্করা ০.৭২ গ্রাম , পৌষ্টিক ফাইবার   ৩.৫ গ্রাম , ফ্যাট ০.৭ গ্রাম , প্রোটিন ২.৭ গ্রাম ,

ভিটামিন এর পরিমাণ : ভিটামিন এ – ৫০৮ মাইক্রোগ্রাম , বেটা ক্যারোটিন – ৫৮৫৪ মাইক্রোগ্রাম, ল্যুটেনিন জেক্স্যান্থিন – ১৩৬১০ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন (ভিটামিন বি ১) – ০.১৯ মিলিগ্রাম, রাইবোফ্ল্যাভিন (ভিটামিন বি ২) – ০.২৬ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন (ভিটামিন বি ৩) – ০.৮০৬ মিলিগ্রাম, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি ৫) – ০.০৮৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ৬ – ০.২৫১ মিলিগ্রাম, ফোলেট (ভিটামিন বি ৯) – ২৭ মাইক্রোগ্রাম, ক্লোইন – ৩৫.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি – ৩৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই – ৩.৪৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে – ৭৭৮.৪ মাইক্রোগ্রাম,

খনিজের পরিমাণ : ক্যালসিয়াম – ১৮৭ মিলিগ্রাম, আয়রন – ৩.১ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম – ৩৬ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ – ০.৩৪২ মিলিগ্রাম , ফসফরাস – ৬৬ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম – ৩৯৭ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম – ৭৬ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক – ০.৪১ মিলিগ্রাম

এছাড়াও উদ্ভিদটি অত্যন্ত রস বা জল সমৃদ্ধ ।

ঠিক এই কারণেই এই উদ্ভিদটি বিভিন্ন দেশের মানুষ বিভিন্ন রকম ভাবে ব্যবহার করে থাকেন। বিভিন্ন দেশের বাজারে ড্যান্ডেলিয়ান বেশ উচ্চমূল্যে বিক্রিও হয়। শাক ভাজা হিসাবে খাওয়া ছাড়াও, কাঁচা পাতা স্যালাড হিসাবে বেশ জনপ্রিয়। কচি পাতা ও সিদ্ধডিমের একটি পদ তো রীতিমত ডেলিকেসি। এছাড়াও এর ফুল উৎকৃষ্ট সুরা, পানীয়, জ্যাম জেলী, মধু-বিকল্প ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়।

ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড় চূর্ণ উৎকৃষ্ট কফি বিকল্প হিসাবে ব্যবহার হয়। আর যেহেতু এই কফির স্বাদ কফির মতই কিন্তু ক্যাফেইন অনুপস্থিত, তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

এবার আসি এর নিরাময়ক গুণগুলির আলোচনায়। বিভিন্ন সংস্কৃতির বিশ্বাস অনুযায়ী ড্যান্ডেলিয়ান একটি যাদুময় উদ্ভিদ। এর বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আমি আগেই বলেছি প্রচলিত বিশ্বাস গুলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের আতসকাঁচের তলায় ফেলে যাচাই করে নেব।

আমাদের অনেকের কাছেই ল্যাসিক্স (Furosemide) একটি পরিচিত নাম, সাধারণতঃ রোগির প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে ভারতীয় হাসপাতালগুলিতে এই ওষুধটি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয় প্রস্রাব নিঃসরণ বৃদ্ধি করার জন্য। এটি একটি diuretic জাতীয় ওষুধ। Diuretic আরও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, যকৃত ও কিডনির রোগ ইত্যাদি। এছাড়াও প্রিডায়াবেটিক (অর্থাৎ যার অদূর ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হতে চলেছে) রোগির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়ে থাকে। ড্যান্ডেলিয়ানের মূত্রকারক গুণের কথা প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের জানা ছিল। বিশেষতঃ কাব্যপ্রিয় ফরাসীরা তো এর নামই দিয়ে দিয়েছিল “শয্যাসিক্তকারক” (pissenlit)। বর্তমানে ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় (https://www.liebertpub.com/doi/10.1089/acm.2008.0152) যদিও দেখা গেছে যে এটি মানুষকে বার বার প্রস্রাবে যেতে বাধ্য করলেও সমগ্র নিঃসারিত মূত্রের পরিমাণ একই থাকে। তাই মূত্র বেশী পরিমাণে তৈরিতে এটি কার্য্যকর নয়, যদিও মূত্রথলীর পেশীর কোন সমস্যার জন্য মূত্র বন্ধ হয়ে গেলে এটি যথেষ্ট কার্যকারী। তবে এবিষয়ক আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ড্যান্ডেলিয়ানের নির্যাস ও বাঁটা শিকড়ের প্রলেপ দাদ, একজিমা, ব্রণ সহ বিভিন্ন চর্মরোগের নিরাময় করতে সক্ষম। এমনকি চামড়ার ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। এখন দেখা যাক বর্তমান গবেষণা কি বলে এ বিষয়ে। আশ্চর্য্যজনক ভাবে ২০১৫ সালের প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফলে (https://www.hindawi.com/journals/omcl/2015/619560/) দেখা যাচ্ছে যে ড্যান্ডেলিয়ানের প্রলেপ ত্বকের জ্বালা, কন্ড্যূয়ণেচ্ছা (চুলকানি) কমাতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, এটি সূর্যের ক্ষতিকারক আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক কে রক্ষা করে, ফলে ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।

প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ সহ বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ভেষজবীদগণ মধুমেহ বা ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণে সিংহদন্তীর ব্যবহারের কথা বলে গিয়েছেন। ২০১৬ সালের ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় (https://doi.org/10.1900/RDS.2016.13.113) উঠে এসেছে, ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড়ের নির্যাসে ইন্যুলিন নামক এক ধরণের ডায়েটরি ফাইবার বর্তমান যা পাচনক্রিয়ায় কিছু প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে রক্তে শর্করা যোগ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, ফলশ্রুতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আবার অন্যদিকে এর মধ্যে থাকা একটি অভূতপূর্ব জৈব যৌগ (বিজ্ঞানীরা এর গঠন সম্বন্ধে এখনও নিশ্চিত নন) অগ্ন্যাশয়ের কোষ গুলিকে বেশী মাত্রায় ইন্স্যুলিন ক্ষরণে সাহায্য করে, ফলে বাইরে থেকে ইন্স্যুলিন নেওয়ার পরিমাণ কমে।

ড্যান্ডেলিয়ানের যকৃতের অসুখে উপকারীতার কথা বার বার উঠে এসেছে প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও ইউনানী শাস্ত্রে। যদিও এতদিন একটি গবেষণায় (https://doi.org/10.3390/molecules22091409) সামান্য কিছু প্রমাণ পেলেও কার্য্য কারণের যথার্থ প্রয়োগ ও প্রমাণের অভাবে এই দাবীর সারবত্তা বিচার করা সম্ভব হয় নি। তবে ২০১০ সালে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় (https://doi.org/10.1016/j.jep.2010.05.046) বেশ কয়েকটি আশ্চর্য্য বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দেখা যায়, ড্যান্ডেলিয়ান শিকড়ের নির্যাস ইঁদুরের যকৃতের ফাইব্রোসিস (যা পরবর্তীতে ক্যান্সারের মত কঠীন অসুখের রূপ নেয়) অসম্ভব দ্রূততায় কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। ক্ষতিকর কোষগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে যকৃতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটিকে ধীরে ধীরে নিরাময় হতে সাহায্য করছে। এই নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে।

আমাদের দেহের নিয়ম অনুসারে একটি কোষ বেশ কিছুদিনের পুরোনো হয়ে যাওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে, তার জায়গা নেয় নতুন একটি কোষ, এই ঘটনাকে কোষের প্রোগ্রামড ডেথ বা অ্যাপোপটোসিস বলে। কিন্তু ক্যান্সার কারক কোষ বা টিউমারের ক্ষেত্রে এই নিয়মানুযায়ী মৃত্যু ঘটেনা। সেটি আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে এবং একটি বিশেষ পদার্থের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশের কোষগুলির মধ্যেও এইরকম প্রবণতা ছড়িয়ে দেয়। ২০১২ সালের কানাডার উইন্ডসর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় (https://doi.org/10.1097/MPA.0b013e31824b22a2) দেখা গেছে ড্যান্ডেলিয়ানের শিকড়ের নির্যাস অগ্ন্যাশয় ও প্রস্টেটের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে টিউমার কোষটিকে অ্যাপোপটোসিস বা প্রোগ্রামড ডেথে বাধ্য করে। অন্য আরেকটি গবেষণায় (https://doi.org/10.18632/oncotarget.11485) এটাও দেখা গেছে যে ড্যান্ডেলিয়ানের অনুরূপ কিছু প্রজাতির এই রকম শিকড়ের নির্যাস কিছু বিশেষ লিউকোমিয়া ও মেলানোমার ক্ষতিকারক কোষ গুলির অ্যাপোপটোসিস ঘটাতে সক্ষম। তবে এই যুক্তিগুলির সপক্ষে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে।

তবে এই সঙ্গে এটাও বলে রাখা দরকার বিভিন্ন গবেষণায় (https://doi.org/10.3205/000203) এটা দেখা গেছে যে বিভিন্ন বাজার চলতি ওষুধের সঙ্গে ড্যান্ডেলিয়ানের কিছু প্রতিক্রিয়া বা ইন্ট্যার‍্যাকশন আছে। তাই কোন ওষুধ ব্যবহার করার সময় ড্যান্ডেলিয়ান ব্যবহার করতে হলে এ বিষয়ে বিশেষ ভাবে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। এছাড়াও ড্যান্ডেলিয়ানে থাকা একটি পদার্থ, ফাইটো ইস্ট্রোজেন, শরীরে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বৃদ্ধি করে, তাই এটি মহিলাদের (বিশেষত যাদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম রয়েছে) অনিয়মিত ঋতুতে বিশেষ উপকারী হলেও এটির গর্ভপাত করার ও পুরুষদের উর্বরতা হ্রাসের ক্ষমতা রয়েছে। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ড্যান্ডেলিয়ানে অ্যালার্জী ও তার প্রভাবে ত্বকে নানা উপসর্গ ও হজমের সমস্যা দেখা গেছে (https://doi.org/10.1016/j.jep.2015.03.067)।

যুক্তরাষ্ট্রে ঔষধের দোকানে ড্যান্ডেলিয়ান ক্যাপসুল হিসাবেও বিক্রয় হয়, এবং এটি একটি রেজিস্টার্ড ড্রাগ।

তাই আশা করি বুঝতেই পারছেন, বাংলাদেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশে ড্যান্ডেলিয়ানের সমগুণযুক্ত একটি উদ্ভিদ খুঁজে পাওয়া (যেটি আবার বিনা যত্নেই যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে) কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এবার আসা যাক আমাদের মূল আলোচ্য উদ্ভিদ মূলা-পাতার কথায়। মূলা-পাতা একটি সঙ্কাস বা চলতি কথায় থিসল গোত্রের উদ্ভিদ। এর অন্য কয়েকটি প্রজাতি যেমন – Sonchus oleraceus , Sonchus arvensis ইত্যাদি বিশ্বের বহু দেশে স্যালাড হিসাবে খাওয়া হয়। এদের পাতার স্বাদও ড্যান্ডেলিয়ানের মতই তীক্ত। এছাড়া প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এদের ড্যান্ডেলিয়ানের মতই অনিয়মিত ঋতু নিরাময়ে, মধুমেহ নিয়ন্ত্রণে ও হজম সংক্রান্ত সমস্যা দূরিকরণে সদর্থক ভূমিকা আছে বলে জানা যায়।

মূলা-পাতা (Sonchus wightianus) সংক্রান্ত আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে প্রত্যক্ষ কোন নথি আমি পাইনি, এর একটি কারণ হতে পারে এর সঠিক নামটি না জানা, তবু স্থানভেদে প্রচলিত এর ভেষজ ব্যবহারগুলি জানার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিশেষতঃ নেপালে এই উদ্ভিদের পাতার বহুল ব্যবহার হয় জ্বর নিরাময়ে। এছাড়াও প্রদাহ এবং সোয়েলিং বা ফুলে যাওয়া কমাতে, কর্ণপ্রদাহে এর পাতার ব্যবহার হয়। শিকড় মূলতঃ হজমের সমস্যায়, পেটে ব্যাথায়, জন্ডিস, হাঁপানি, হুপিং কফ ও ব্রঙ্কাইটিসে ব্যবহার হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এটি বৃক্কের পাথর ও জন্ডিস নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

এবার দেখা যাক, গবেষণায় উপরিউক্ত দাবি গুলির কোন প্রমাণ মেলে কিনা। মূলা-পাতা অর্থাৎ Sonchus wightianus এ সঙ্কাস গোত্রিয় অন্যান্য উদ্ভিদগুলি যেমন Sonchus oleraceus , Sonchus arvensis ইত্যাদির থেকে অনেক বেশী পরিমাণে ট্যার‍্যাক্সাস্টেরল ও ইনোসিটল (taraxasterol and inositol) থাকে। যা ড্যান্ডেলিয়ানেও একই রকম ভাবে বর্তমান। ইনোসিটল বিভিন্ন জটিল রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বলে বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলত্ব, মধুমেহ , সর্বোপরি মেটাবলিক সিন্ড্রোমে, সেইসঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমে। এছাড়াও বৈজ্ঞানিকরা এটির বিভিন্ন মানসিক রোগ, যেমন প্যানিক অ্যাটাক, ডিপ্রেশন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও কার্যকর হওয়ার সম্ভবনা আছে বলে মনে করেন। তবে এর সপক্ষে কোন জোরালো যুক্তি বা প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে ট্যার‍্যাক্সাস্টেরল অ্যাপোপটোসিস এর মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা রাখে। এছাড়াও এটি জীবাণুনাশক, প্রদাহনাশক, মধুমেহের ক্ষেত্রেও কার্যকারী। এমনকি এটির বেশ কিছু সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসাবেও কিছু ভূমিকা থাকতে পারে বলে বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন। এই দুটি যৌগই কিডনির পাথরের ক্যালসিয়ামের অংশটি ক্ষয় করতে সক্ষম।

বর্তমান একটি গবেষণায় (https://ijpsr.com/bft-article/human-ache-selective-inhibition-of-phytochemicals-of-sonchus-wightianus-of-nepal-origin-an-in-silico-approach/?view=fulltext) দেখা গেছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ক্রমবর্ধমান ও ভয়ংকর রোগ অ্যালঝাইমার্সের ক্ষেত্রে প্রচলিত ঔষধ acetylcholinesterase (AChE) inhibitors এর বর্তমান বাজার চলতি ধরণ গুলির থেকে বেশী শক্তিশালী AChE মূলা-পাতায় পাওয়া সম্ভব।

সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় (https://pdfs.semanticscholar.org/01c1/a8657ac3748e09cfba6026ac7bed89e119bd.pdf?_ga=2.132921870.1659048542.1613220090-719495840.1613220090) দেখা গেছে মূলা-পাতায় সহ  বিভিন্ন এমন জৈব যৌগ উপস্থিত, যা পারকিনসন্স, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি সহ বিভিন্ন অসুখে কার্যকর হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

একটি যৌথ গবেষণায় (https://li01.tci-thaijo.org/index.php/cast/article/download/135392/101175/ এবং https://www.researchgate.net/profile/Reshmi_Chatterjee4/publication/331161985_Establishment_of_Quality_Parameters_for_Leaf_Stem_and_Root_of_Sonchus_wightianus_DC_through_Pharmacognostical_Standardization/links/5c6996b9a6fdcc404eb72fe4/Establishment-of-Quality-Parameters-for-Leaf-Stem-and-Root-of-Sonchus-wightianus-DC-through-Pharmacognostical-Standardization.pdf?origin=publication_detail) মূলা-পাতার হজম সংক্রান্ত সমস্যা ও ডায়েরিয়া নিরাময়ের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কথা প্রমাণিত হয়েছে। সেই সঙ্গে এই গবেষণায় এটিও দেখা গেছে যে এই উদ্ভিদটি বিষাক্ত নয়।

অতয়েব বলাই বাহুল্য যে ভারতীয় উপমহাদেশে ড্যান্ডেলিয়ান বা সিংহদন্তী সহজলভ্য না হলেও মূলা-পাতা যথেষ্ট সহজলভ্য এবং ভবিষ্যতে এটির থেকে নানা অসাধারণ কিন্তু সুলভ ঔষধ বানানো হয়ত সম্ভব, সেজন্য প্রয়োজন নবীন গবেষকদের এগিয়ে আসা ও এ সম্বন্ধে গবেষণা প্রয়োজন।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ – এই প্রবন্ধটি গবেষণাধর্মী, বন্য ভেষজ কোন অভিজ্ঞ আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ নিরুপণ ব্যতীত ভক্ষণ বা ব্যবহার করা উচিত নয়।

© শতদ্রু ব্যানার্জ্জী

তত্ত্ব

সাদা হয়ে যাওয়া দাড়ি আর চুলে হাত বুলিয়ে নিল ওঁ। তার প্রতিচ্ছবিতে মাথার দুপাশে অতিরিক্ত লোব গুলো আবার সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্রিয়েটম ফর্মুলা গুলো একবার মনে মনে আবৃত্তি করে নিল । নাঃ ঠিক আছে, ঠিক সময় মত খেয়ে নেওয়া গেছে। না হলে কমতে কমতে আবার একটা বলের মত ক্ষুদ্র গুটি তে সমস্ত সত্তা গুটিয়ে নিয়ে অনন্ত কালের অপেক্ষায় চেতনাহীন সুষুপ্তিতে লীন হয়ে যেতে হত।
 
সময় চলে যাচ্ছে, ছায়াপথ এর মধ্যেই এক চতুর্থাংশ আবর্তন সেরে ফেলেছে, আজ আর কালকের মত দেরী করলে চলবে না। খুব সন্তর্পণে নিজের শরীর থেকে এক কণা দেহকোষ তুলে নিল ওঁ।
 
* * *
 
আরো বেশ কিছুটা সময় চলে গেছে, কৃত্রিম কালচার মাধ্যমে রাখা দেহকোষটা ইতিমধ্যে আয়তনে বেশ কিছুটা বেড়ে গেছে। কালচারে খুব যত্ন নিয়ে কিছুটা পোষক দ্রবণ ঢেলে দিল ওঁ। গভীর মমতায় লালিত কোষটির দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, ওটি যে তারই অংশ, সন্তানবত্। ইতিমধ্যেই তার শরীরে আস্তে আস্তে পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। পাকা চুলের বদলে দেখা দিয়েছে কুঞ্চিত কাজলকৃষ্ণ কেশরাজী, বলিরেখারা অদৃশ্য হয়ে দেখা দিয়েছে পেলব কমনীয়তা। ফ্যাকাসে গাত্রবর্ণ হয়ে উঠেছে নীহারিকার মত উজ্জ্বল নীলাভ। সময় যে বেশী নেই বুঝতে পারছে ওঁ।
 
* * *
 
ছায়াপথের একটি সম্পূর্ণ আবর্তন সম্পূর্ণ করতে আর বেশী দেরী নেই …. ওঁ এখন প্রায় শিশুবত, মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তার জটাজাল ; কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না সে …. তার সমৃদ্ধ প্রজ্ঞার অধিকাংশই বিস্মৃতি গ্রাস করেছে এখন। সর্বগ্রাসী ক্ষুধা তাকে উন্মাদপ্রায় করে তুলছে … সময় যে আজকের মত শেষ .. কোনক্রমে অস্থির অঙ্গ সঞ্চালনে কালচার থেকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আপন দেহকোষটি তুলে নিয়ে ভক্ষণ করল ওঁ।
 
* * *
 
ছায়াপথের একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পূর্ণ হল, ধ্যানসুষুপ্ত ওঁর শরীরে বিপরীত পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে …. শিশুসুলভ কোমল দেহে এক এক করে ফুটে উঠছে বলিরেখা …..
 
© Satadru Banerjee